অশনি সংকেত

অশনি সংকেত

ছয় হাত লম্বা আর চার হাত চওড়া খাটের ঠিক মাঝখানে আমি সটান শুয়ে আছি। মাথার উপর ফ্যান ভনভন করে ঘুরছে। একটু আগে বৃষ্টি হওয়ার ফলে পরিবেশ শীতল। তারপরেও আমি কুলকুল করে ঘামছি। কারণ আমার খাটের নিচ থেকে ভয়ানক সব শব্দ হচ্ছে। একটু পরপরই কারো গোঙানোর শব্দ পাচ্ছি। আবার শুনতে পাচ্ছি ঝনঝন শব্দ। আবার কখনো ছোট বাচ্চাদের কান্নার শব্দ। সব মিলিয়ে খুব ভয়াবহ এক পরিস্থিতি। ভয়ে আমি নিশ্বাস নেয়া পর্যন্ত বন্ধ করে দেয়ার চেষ্টা করছি বারবার।

পাশের রুমে আমার প্রেমিকা অনামিকা ঘুমিয়ে আছে। তাকে ডেকে আনা দরকার। কিন্তু তাকে ডাকতে হলে নিচে নামতে হবে। আর নিচে নামলে যদি খাটের নিচ থেকে কেউ বেরিয়ে আসে?

ফোনটাও চার্জে লাগানো। ফোন আনতে হলেও খাট থেকে নিচে নামতে হবে। কিন্তু আমি মরে গেলেও খাট থেকে নিচে নামতে চাই না। যদি কেউ খাটের নিচ থেকে বেরিয়ে এসে আমার পা ধরে টান দেয়?

আমি আর অনামিকা পালিয়ে এসেছি বাসা থেকে। আমরা একে অপরকে ভালবাসি। কিন্তু পরিবারের কেউ আমাদের মেনে নিচ্ছে না। তাই আমরা পালিয়ে এসেছি। আগামী কাল আমরা বিয়ে করবো। তাই আজকের রাতটা কোনরকম একটা হোটেলে কাটিয়ে দেয়ার ইচ্ছা নিয়েই এই হোটেলে দুইটা ঘর বুকিং করলাম। কিন্তু কে জানতো এই হোটেলের ভেতর এমন ভূতুড়ে কান্ড ঘটবে?
অনেকক্ষন ধরে সোজা হয়ে শুয়ে থেকে সবকিছু ভয়ে জমে যাওয়ার জোগাড় হলো আমার। তাই মাত্রই হালকা একটু পা নাড়িয়েছিলাম। তখনই মনে হলো খাটের নিচে বুঝি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। তর্জন গর্জন, গোঙানোর শব্দ বেড়ে গেল আগের চেয়ে। আমি আবারো আগের মত সোজা হয়ে শুয়ে রইলাম।

ভয়ের চোটে আমি ঘেমে একাকার হয়ে গেছি। পুরো শরীর বেয়ে ঘাম ঝরছে। সেই ঘামে বিছানার চাদর ভিজে গেছে একেবারে। এরই ফাঁকে আমার হঠাৎ মনে পড়লো অনামিকার কথা। মেয়েটা তেলাপোকা দেখলেও চিৎকার দিয়ে আকাশ পাতাল কাঁপিয়ে দেয়। সেখানে যদি খাটের নিচে এমন উথালপাতাল শব্দ হয় তাহলে তো নির্ঘাত অজ্ঞান হয়ে যাবে মেয়েটা। অনামিকার কথা মনে পড়তেই সব ভয় ডর কোথায় যেন উবে গেল। আমার যা কিছুই হোক অনামিকার যেন কিছু না হয়।

পুরো ঘর অন্ধকার। তার উপর নতুন জায়গা। তাই প্রথমে ঠাওর করতে পারলাম না যে দরজাটা কোনদিকে। কিছুক্ষন ভাবার পর দরজার অবস্থান ঠিক করলাম। এরপর প্রান হাতে রেখে বিছানা থেকে দিলাম ঝেড়ে দৌড়। কিন্তু ঠুস করে গিয়ে ধাক্কা খেলাম দেয়ালে। মানে দরজাটা এদিকে না। আমি দম আটকে অন্ধকারে দেয়াল হাতড়ে দরজা খুঁজতে লাগলাম। কিন্তু মোটামুটি পুরো ঘর হাতড়ে দরজা খুলে পেলাম না।

এদিকে আবার খাটের নিচ থেকে শব্দ শোনা যাচ্ছে আগের চেয়ে আরো জোরে। মোবাইলটা কোথায় রেখেছি তাও বুঝতে পারছি না। অন্ধকারটা এতই বেশি যে আমি আমার নিজের হাতটা পর্যন্ত ঠাওর করতে পারছি না। কি করবো ভেবে না পেয়ে আমি দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে বসে পড়লাম। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। শ্বাস নিতে পারছি না। মনে হচ্ছে কেউ একজন আমার গলা টিপে ধরেছে। আমার মাথা ঝিমঝিম করছে, চোখের পাতা বন্ধ হয়ে আসছে।

যখন আমি চোখ খুললাম তখন নিজেকে আবিষ্কার করলাম একটা ঘরের ভেতর। চারদিকে আবছা নীল আলো। এই ঘরটা মোটেও আমাদের সেই হোটেলের ঘর না। ঘরে আসবাবপত্রে ঠাসা। দেয়ালে বিশাল এক ঘড়ি ঝুলছে। ঘড়িতে তিনটা চল্লিশ বাজছে। এখন কি দিন না রাত তা বুঝতে পারছি না।

আমি এতক্ষন দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে ছিলাম। এবার একটু উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু মনে হলো যে আমার পুরো শরীর জমে গেছে। অনেক চেষ্টা করেও হাত পা নাড়াতে পারলাম না। এসব কি হচ্ছে আমার সাথে বুঝতে পারছি না। অনেক চেষ্টার পর হাল ছেড়ে দিয়ে বসে রইলাম সেখানেই।

হঠাৎ ক্যাচ করে একটা শব্দ হলো। অনেকটা দরজা খোলার শব্দের মত। শব্দের পরপরই একটা মেয়ে ঘরে ঢুকলো। মেয়েটার চেহারা দেখে আমি স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম। অনামিকা চলে এসেছে তাহলে। আমি অনামিকার নাম ধরে ডাক দিলাম। কিন্তু আমার গলা দিয়ে কোন কথা বের হলো না। আমি আবার ডাক দিলাম। এবারেও একই ঘটনা ঘটলো। আমার গলা দিয়ে শব্দ বের হচ্ছে না। অনামিকা আমার সামনে দিয়ে কয়েকবার হেঁটে চলে গেল। কিন্তু আমার দিকে একবারও তাকালো না। অনামিকা কি আমাকে দেখতে পাচ্ছে না?

আবারো ক্যাচ করে শব্দ হলো, দরজা খুলে একটা ছেলে প্রবেশ করলো। ছেলেটার চেহারা দেখে আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। কারণ এই ছেলেটার চেহারার সাথে আমার চেহারার হুবহু মিল আছে।

— অনামিকা পাগলামী করো না। দেখো ওই মেয়েটার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। তুমি শুধু শুধু ভুল বুঝছো আমাকে।

ছেলেটা ঘরে ঢুকেই কথাটা বলে উঠলো। ওর কন্ঠটাও আমার মতই। এতটুকু পার্থক্য নেই। তাহলে কি ওই ছেলেটাই আমি?

— আবির তোমাকে আর মিথ্যা বলতে হবে না। আমি সব দেখেছি। আমি কেন যে তোমাকে বিয়ে করেছি আল্লাহ জানে। বাবা মায়ের কথামত যদি বিয়েটা করতাম তাহলে কি আমার এই অবস্থা হতো?

অনামিকা কথাটা বলে ওয়ারড্রব থেকে কাপড়চোপড় নামাতে লাগলো। অনামিকা ছেলেটাকে আবির বলে ডাকছে। তারমানে এই ছেলেটাই আমি? কিন্তু আমি তো এখানে বসে আছি।
কি হচ্ছে এসব আমার সাথে? আমার কি হ্যালুসিনেশন হচ্ছে? নাকি পাগল হয়ে গেলাম আমি?

— অনামিকা একটা মেয়ের সাথে রিক্সায় চড়াটা কি খুবই অন্যায়? ও আমার কলিগ। ওর সাথে রিক্সায় চড়ায় কি এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে গেছে? আর রাস্তায় তুমি মেয়েটার সামনে এমন আচরণ না করলেও পারতে।
— আরে মহাভারত অশুদ্ধ হবে কেন? তুমি শুধু রিক্সায় চড়বে কেন? যদি পারো মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকো, চুমু খাও, শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হও। কোন কিছুই অশুদ্ধ হবে না তোমার।

অনামিকা কথা বলতে বলতে ছেলেটার একেবারে সামনে চলে গেছে। ছেলেটার চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে। এই বুঝি থাপ্পড় মেরে বসে।

আমি যে এখানে বসে আছি ওরা কি তা দেখতে পাচ্ছে না? আরে দেখতে পাবে কেন? এসব তো কোনকিছুই বাস্তব না। সবই আমার হ্যালুসিনেশ।

— তুই একটা বদ মেয়ে লোক। যাহ ব্যাগ গুছিয়ে জাহান্নামে চলে যা।

একথা বলেই ছেলেটা অনামিকাকে একটা ধাক্কা মারলো। আকস্মিক ধাক্কায় অনামিকা টাল সামলাতে না পেরে উল্টো হয়ে পড়লো ফ্লোরে। সাথে সাথে ফ্লোর রক্তে ভিজে গেল। কারণ খাটের এক কোনায় ছিল তরকারি কাটার বটি। আর অনামিকা গিয়ে সেই বটির উপর পড়েছে। ছেলেটা ফ্লোরে এত রক্ত দেখে ভয়ে চিৎকার করে উঠে অনামিকার দেহের কাছে চলে গেল। আমি নিজেও ঘটনার আকস্মিকতায় চমকে গিয়েছি।

আমি আবার উঠতে চেষ্টা করলাম। এবার আমি উঠতে পারলাম। দৌড়ে চলে গেলাম অনামিকার দেহের কাছে। আমার পায়ে রক্ত লেগে গেল।

অনামিকার চোখ খোলা। সে নিষ্পলক চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমার মাথাটা আবার ঝিমঝিম করতে শুরু করেছে। চারদিক অন্ধকার হতে শুরু করেছে। চারদিক পুরোপুরি অন্ধকার হওয়ার পূর্বে নিজের অজান্তেই চোখ ঘড়ির দিকে চলে গেল। ঘড়িতে তিনটা পঞ্চাশ বাজছে।

চোখ খুলে দেখলাম আমি শুয়ে আছি হোটেলের বিছানায়। ঘড়িতে সাতটা বাজছে। মানে সকাল হয়ে গেছে। আমি এতক্ষন তাহলে স্বপ্ন দেখছিলাম? বুকের উপর থেকে একটা বোঝা নেমে গেল সহসাই।

সারাদিনে আমাদের অনেক দৌড়ঝাঁপ করতে হলো। এত কষ্ট সার্থক হলো যখন কাজি সাহেব বললেন আমি আর অনামিকা স্বামী স্ত্রী।

অনামিকা তো লজ্জায় প্রায় লাল হয়ে গেল কাজির মুখে কথাটা শুনে। সাক্ষী হিসেবে আমার দুই বন্ধু এসেছিল। তাদেরই একজনের বাসায় আমাদের বাসর ঘর সাজানো হলো। ভাবতেই অবাক লাগছে আজ আমাদের জীবনের সবচেয়ে মধুর রাত একটু পরেই শুরু হবে।

আমাদের বিয়ের চার বছর পূর্ণ হলো আজ। আমাদের পরিবার আমাদের বিয়ে মেনে নেয়নি আজও। তাই আলাদা একটা বাসায় থাকছি আমরা।

ইদানিং অনামিকা আমাকে কেমন যেন সন্দেহের চোখে দেখছে। অফিস শেষ করে ঘরে ফিরলেই এত দেরী করলাম কেন, এই সেই বিভিন্ন প্রশ্ন করছে। তার ধারনা আমি অফিসের মেয়ে কলিগদের সাথে ফষ্টিনষ্টি করে বেড়াচ্ছি।

এসব সন্দেহ অনামিকার মনে ঢুকিয়েছে পাশের ফ্ল্যাটের ভাবী। সারাদিন ভারতীয় গার্বেজ সিরিয়াল দেখে দেখে নিজে কুটনামি শিখেছে। এখন আমার অবুঝ বউটাকেও শিখাচ্ছে।

অফিস ছুটির পর ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ভাবছি কিভাবে অনামিকার মন থেকে সন্দেহ দূর করা যায়। এমন সময় একটা রিক্সা আমার পাশে এসে দাঁড়ালো। আমারই এক কলিগ রীনা আমাকে তার রিক্সায় ওঠার জন্য অনুরোধ করছে। সে বাসায় ফেরার সময় আমরা যে এলাকায় থাকি সেই এলাকার উপর দিয়েই যায়। তাই আমিও কিছু না ভেবে বসে পড়লাম রিক্সায়।

কিছুদূর যাওয়ার পর হঠাৎ আমাদের রিক্সা থেমে গেল। আমি কিছুটা অন্যমনস্ক ছিলাম বিধায় চমকে গিয়ে সামনে তাকালাম। দেখলাম অনামিকা রিক্সার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আর পাশেই দাঁড়িয়ে আছে সেই কুটনি ভাবী। অনামিকা তেড়ে এলো আমার দিকে। তারপর চেঁচিয়ে বললো,

— বাহ ভালই তো রিক্সা ভ্রমন চলছে। এই জন্যই বলি তোমার শার্টের থেকে মেয়েদের পারফিউমের গন্ধ আসে কেন সবসময়। ভাল তো, ঘরের বউ তো পুরোনো হয়ে গেছে তাই এখন নতুন মেয়ে জুটিয়ে নিয়েছো।

কথাটা বলে অনামিকা দাঁড়ালো না। হনহন করে হেঁটে চলে গেল। আর আমি বোকাচন্দ্র হয়ে রিক্সায় বসে রইলাম। রীনা নিজেও বুঝতে পারলো না যে আসলে কি ঘটে গেল।

আমি লজ্জায় আর রীনার দিকে তাকাতে পারলাম না। রিক্সা থেকে নেমে বাসার দিকে হাঁটা ধরলাম। মেজাজটা সপ্তমে চড়ে গেছে আমার। আজ এর একটা কিছু না করলে হচ্ছে না।

আমি তাড়াতাড়ি হেঁটে বাসায় পৌছালাম। ঘরের দরজা খোলা পেয়ে ঘরে ঢুকে গেলাম। অনামিকা তখন কাপড়ের ব্যাগ বের করে বিছানার উপর রেখেছে মাত্রই।

— অনামিকা পাগলামী করো না। দেখো ওই মেয়েটার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। তুমি শুধু শুধু ভুল বুঝছো আমাকে।

কথাটা বলে আমি থামলাম। অনামিকা আমার কথা শুনে তেড়ে এলো আমার দিকে। আমি ঠায় দাঁড়িয়ে রইলাম।

— আবির তোমাকে আর মিথ্যা বলতে হবে না। আমি সব দেখেছি। আমি কেন যে তোমাকে বিয়ে করেছি আল্লাহ জানে। বাবা মায়ের কথামত যদি বিয়েটা করতাম তাহলে কি আমার এই অবস্থা হতো?

অনামিকা কথাটা বলেই ওয়ারড্রবের দিকে এগিয়ে গেল। তারপর তার সব কাপড় একে একে বের করে বিছানায় রাখতে শুরু করলো।

— অনামিকা একটা মেয়ের সাথে রিক্সায় চড়াটা কি খুবই অন্যায়? ও আমার কলিগ। ওর সাথে রিক্সায় চড়ায় কি এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে গেছে? আর রাস্তায় তুমি মেয়েটার সামনে এমন আচরণ না করলেও পারতে।
— আরে মহাভারত অশুদ্ধ হবে কেন? তুমি শুধু রিক্সায় চড়বে কেন? যদি পারো মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকো, চুমু খাও, শারীরিক সম্পর্কে………….!

আরো কিছু কথা বলতে গিয়েও অনামিকা থেমে গেল। আমারো হঠাৎ মনে পড়ে গেল একটা কথা। আমি সচকিত হয়ে তাকালাম ঘড়ির দিকে। ঘড়িতে তিনটা পঞ্চাশ বাজছে। আমি অনামিকার দিকে তাকালাম। অনামিকা নিজেও তখন ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আছে।
আমি এবার তাকালাম খাটের কোনার দিকে। তরকারি কাটার বটি সেখানে পড়ে আছে। অনামিকা নিজেও তাকিয়ে আছে সেদিকে।
আমার মনে পড়ে গেল চারবছর আগে হোটেলে শুয়ে দেখা সেই স্বপ্নের কথা। তারমানে ওটা কোন স্বপ্ন ছিল না? ওটা ছিল আমাদের ভবিষ্যতের একটা ছোট্ট দৃশ্য।

— অনামিকা তুমিও কি সে রাতে…….!

আমি কথা শেষ করতে পারলাম না। তার আগেই অনামিকা আমাকে সজোরে জড়িয়ে ধরলো। তারপর ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বললো,

— প্লীজ আবির আমাকে ধাক্কা দিয়ো না।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত