পড়শী

পড়শী

বিয়ের ১৫ দিনের মাথায় বরের সাথে পা রেখেছিলাম এই গ্রামে। বাবা মায়ের অতি আদরের অষ্টাদশী কন্যা আমি তেমন কোন কাজ করতে পারতাম না।বিয়ের পর প্রায় কয়েকদিন ডিম ভাজতে গিয়ে পুড়িয়ে ফেলেছি এছাড়াও যা কিছু রান্না করতাম তা নিতান্তই কুখাদ্য বলা চলে। এরপরও আমার স্বামী ইফতি আমায় তেমন কিছু বলত না। মাথা নিচু করে চুপিচুপি খেয়ে নিতো সে খাবারগুলো।একে তো কোনো কাজ ঠিক মতো করতে পারতাম না তাঁর উপর আবার বাবা,মা ভাই,বোন সবাইকে ছেড়ে এসেছি সম্পূর্ণ অচেনা এক জায়গায়। ইফতি অফিসে চলে গেলে একা ঘরে আমার একদম থাকতে ইচ্ছে হতো না। মাঝেমাঝে সবার কথা মনে করে খুব কাঁদতাম। ইফতির পোস্টিং এখানে হওয়াতে সবাইকে ছেড়ে আজ এখানে আমার একা থাকতে হচ্ছে।

ওর সাথে দেখা হয়েছিলো সেই প্রথম দিনই। পুকুরপাড়ে গোসল করতে গিয়ে ওর সাথে পরিচয়।আমার বাসার পাশের রুমটায় ওরা থাকে আর এ মাসে ওরা ও নতুন এসেছে এই বাড়িতে। এ বাসার বাড়িওয়ালা আমাদের কাছে বাসা ভাড়া দিয়ে শহরাঞ্চলের দিকে তার নিজের বাড়িতে চলে গিয়েছিলো। মেয়েটার নাম ছিলো কৃষ্ণা। আমার মতো সেও ছিলো সদ্য বিবাহিত এবং আমরা ছিলাম প্রায় সমবয়সী। সেদিন পরিচয়ের পর থেকেই ধীরেধীরে ওর সাথে আমার সখ্যতা গড়ে ওঠে। আমার রান্না থেকে শুরু করে অন্যান্য সকল কাজ আমাকে সুন্দর করে শিখিয়ে দিচ্ছিলো ও। আমাদের বাড়িটা ছিলো বিশাল একটা জায়গা নিয়ে বিস্তৃত যেখানে ঠাসা ছিলো আম,জাম,কাঁঠাল,পেয়ারা সহ অসংখ্য গাছপালা।

তাই রাত হলেই এখানে শোনা যেতো ঝিঁঝি পোকার ডাক আর বর্ষাকালে ব্যাঙের ঘ্যাঙরঘ্যাঙ গান। বৃষ্টি নামলেই আমরা সব কাজ ফেলে রেখে দৌঁড়ে ভিজতে বের হতাম এবং ভিজে ভিজেই পুকুরে সাঁতারের প্রতিযোগিতায় মেতে উঠতাম। জোরে একটু বাতাস হলেই বৃষ্টির দিনে দৌঁড়ে আম কুড়াতে যেতাম।শীতের দিনে শিশির ভেজা মাঠে আমরা হাত ধরে হেঁটে বেড়াতাম। ফাল্গুনে আমরা শিমুল গাছের লাল ফুল কুড়াতাম। এভাবেই কেটে যাচ্ছিলো আমাদের দিনগুলো। এর প্রায় বছর দুয়েক পর কৃষ্ণার একটা ছেলে হয় আর আমার একটা মেয়ে হয় তার ঠিক মাস ছয়েক পরে। কিছুদিন আগের ও সেই দুরন্তপনা বাদ দিয়ে আমরা ব্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম আমাদের ছেলেমেয়েদের নিয়ে। তারপর দিনের শেষে সন্ধ্যায় আমরা ৪ জন মিলে আবারো মেতে উঠতাম বিভিন্ন গল্পে। সেখানে অতিথি স্বরুপ থাকতো কেবল দু’টি শিশু।

এর প্রায় কয়েকমাস পর আবারো ইফতির বদলির জন্য আমাদের চলে যেতো হয়েছিলো অন্য আর এক জায়গায়। কৃষ্ণা আর ওর ছোটো ছেলেকে ছেড়ে একদম আসতে ইচ্ছে হচ্ছিলো না আমার। আসার দিন সকাল থেকেই কৃষ্ণার সাথে মিছেমিছি অভিমান করে কথা বলিনি আমি। ভেবেছিলাম এতে হয়তো আসার সময় কষ্টটা কম হবে। কিন্তু না! কোনো কষ্ট কমেনি বরং সেদিন আমরা গলা জড়িয়ে ধরে খুব কেঁদেছিলাম। এতো মায়া কোথা থেকে এসেছিলো তা আজো অজানা! সেই থেকে আর কখনো কারো সাথে এতোটা সখ্যতা গড়ে ওঠেনি। তারপর জীবন থেকে অতীত হলো আরো অনেকগুলো বছর।জীবনে বিভিন্ন ব্যস্ততার অজুহাতে আর কখনো খোঁজ নেয়া হয়ে ওঠেনি কৃষ্ণার। ঐন্দ্রিলার লেখাপড়া প্রায় শেষের পথে।ওর বাবা রীতিমতো তার মেয়েকে বিয়ে দেয়ার জন্য পাগল হয়ে গেছে। ঐন্দ্রিলার বিয়ের কথা ভাবতেই হঠাৎ মনে পড়লো কৃষ্ণার ছেলে অমিতের কথা। অমিত ও নিশ্চয় ঐন্দ্রিলার মতো বড় হয়েছে। আজ মনটা হুহু করে কেঁদে উঠলো কৃষ্ণার জন্য।

ইফতিকে বলতেই সে এক ধমক দিয়ে বললো, “সেই কতবছর আগের কথা! এখনো কি ওরা সেখানে আছে নাকি?আমি নিশ্চিত ওরা এখন আর সেখানে নেই। শুধু শুধু এখন সেখানে যাওয়া সময় নষ্ট করা ছাড়া আর কিছুই না”। ইফতিকে অনেক বুঝিয়ে সুজিয়ে রওনা দিলাম আবারো সেই রায়পুর গ্রামের দিকে। আমার মনে হয়েছিলো ওরা ওখানে না থাকলেও সেই বাসার বাড়িওয়ালার কাছে ওদের কোনো না কোনো খোঁজ মিলবেই। দীর্ঘ ভ্রমনের পর এসে উপস্থিত হলাম “রায়পুর” গ্রামে। সেই বহুবছর আগের বাড়ি এখনো ঠিক আগের মতোই আছে,একটুও বদলায়নি। বাড়ির উঠোনে পা দিতেই একটা ১৫/১৬ বছর বয়সী মেয়ে চোখে পড়লো। মেয়েটা আমার দিকে ঢ্যাবঢ্যাব করে তাকিয়ে রইলো। একটুপরে মেয়েটা চিৎকার দিয়ে বলে উঠলো , “মা তোমার সাথে না একটা আন্টির ছবি আছে এ্যালবামে সেই আন্টিটা এসেছে”। একটুপরে একটা মহিলা ঘর থেকে বেড়িয়ে এলো।আমার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে সেই চিরচেনা একজন মানুষ।

দৌঁড়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে বললাম, “এখনো এখানে আছিস”? সে উত্তর দিলো, “তোরা চলে যাওয়ার কয়েকবছর পর বাড়িওয়ালা এই বাড়িটা বিক্রি করে দিয়ে দেশের বাহিরে যেতে চেয়েছিলো। পরে অমিতের বাবাকে অনেক বলে এই বাড়িটা কিনে নিয়েছিলাম। তো, এতদিন পরে মনে পড়লো আমাকে? আমি জানতাম তুই ঠিকই একদিন আমার খোঁজ নিতে আসবি”! অভিমান মিশ্রিত কথাগুলো বলে কৃষ্ণা আবার আমাকে জড়িয়ে ধরলো। সেই ২০ বছর আগের কৃষ্ণা একটুও বদলায়নি শুধু সেই কালো চুলগুলো আজ সাদা রঙে রূপান্তরিত হয়েছে। অমিতের দিকে তাকিয়ে দেখলাম সেও অনেক বড় হয়ে গেছে। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম ঐন্দ্রিলার বিয়ে আমি অমিতের সাথেই দেবো।

অতঃপর ঝিঁঝি পোকা ডাকার রাতে আজ আমরা আবারো মেতে উঠলাম সেই বহু বছর আগের পুরনো গল্পে।
আজ আর অতিথি হিসেবে সেই ছেলেমেয়েরা নেই। ওরা মেতে উঠেছে ওদের নিজেদের গল্পে। হঠাৎ সেই বহুবছর আগেরকার পড়শী আমার হাত ধরে বললো, “থেকে যা না রে এখানে! বাকি জীবনটা আবারো না হয় একসাথে কাটিয়ে দেই আমরা। আবারো একসাথে ভিজবো বৃষ্টিতে,বসন্তে শিমুল ফুল কুড়বো আর শিশিরভেজা ঘাসে হেঁটে চলবো অনেকটা পথ!

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত