জীবন

জীবন

আমি নিলিমা,,মা-বাবার ছোট মেয়ে,,,বড় আপার বিয়ে হয়ে গেছে আর বড় ভাই বাবার সাথে চাকরি করে।।আমাদের বাড়ি টা আর.কে গার্মেন্টস এর পেছনে হওয়াতে ভাড়া বেশ ভালোই চলতো,,,এক পাশে ব্যাচেলার আর এক পাশে ফ্যামিলি ভাড়া দিতো বাবা।। তখন আমি ৪র্থ শ্রেণী তে পড়ি,,ব্যাচেলার ম্যাচে নতুন একটা ছেলে আসলো,,নাম আবির,,বাবার সাথেই চাকরি করে।।বাবা বাসায় আসলেই আবির এর গল্প করতো ” ছেলে টা এতিমখানায় বড় হয়ছে,,কারো সাথে অকারনে কথা বলে না,,বড্ড ভাল ছেলে”।।

বাসার সব ভাড়াটে ও আবির কে দেখে অবাক হতো।।সকাল ৮ টাই অফিস টাইম হওয়াতে ৬টা থেকে কলপার আর বাথরুমে সিরিয়াল নিয়ে রোজ ঝগড়া হতো সবার সেখানে আবির ভোর ৫ টাই সব কাজ সেরে ঘুম দিত ৭টাই উঠে মুখে পানি দিয়ে খেয়ে অফিসে চলে যেতো,,কারো সাথে তার ঝামেলা নেই,, অপ্রয়োজনীয় কথা নেই।।তবু আবির যখন অফিসের কাজে ৫/৭ দিনের জন্য বাহিরে যেতো সবাই তারে মনে করতো।। এভাবেই চলে গেলো ২ বছর এখন আমি ৬ষ্ঠ শ্রেনীতে পড়ি।।কত ভাড়াটে এলো গেলো কিন্তু আবির আগের মতোই রয়ে গেলো।। বাবা মা আর ভাই কথা বলে ঠিক করলো আমার সাথে আবিরের বিয়ে দিবে,,আবিরের কাছে বিয়ের প্রস্তাব দিয়াতে সে বললো-

আবিরঃ নিলু তো বাচ্চা মেয়ে,,ওর বিয়ের বয়স হয় নি।।

বাবাঃতোমার কাকি রে যখন বিয়ে করছিলাম হেও নিলির মত ১২/১৩ বছরের ছিল,,এখন ৩ বাচ্চার মা।।

আবিরঃ আচ্ছা কাকা।

এর পরে খুব সাধারণ ভাবেই আমাদের বিয়ে হলো।।।বিয়ের পরে মেয়েরা অন্য বাড়ি যায় আমার বেলায় হলো উল্টা,, আবির ম্যাচ রেখে আমাদের বাসায় আসলো।। সে সময় ভালই লেগেছিল,ভাল যাচ্ছিল আমাদের সময়,, আবির সকালে আমাকে রেডি করে স্কুলে দিয়ে অফিসে যায়,,দুপুরে আমাকে বাসায় নিয়ে এসে খেয়ে অফিসে যায়।।।বিয়ে করে আমার যত্ন করার মানুষ বেড়েছে একজন।।আসে পাশের মানুষ গুলোর হিংসা করতো আমার ভাল থাকা দেখে,, অনেকে তো বলেও বসতো- মাহাবুব সাহেবের এই কালো মেয়ের কপালে এত সুখ!! মাঝে মাঝে আবির যখন অফিসের কাজে বাহিরে যেতো তখন অনেক কষ্ট হতো কিন্তু মানিয়ে নিয়েছিলাম।।।এভাবেই কেটে গেলো ৫ বছর,,,আমি এসএসসি পরীক্ষা শেষ করে বাসায় অবসর সময় কাটানোয় ব্যস্ত।।তখন আবির অফিসের কাজে ৭ দিনের ছুটি তে বাহিরে গেলো,,,এই যে গেলো মানুষ টা আর ফিরলো না,,লাশ টার ও খোজ পেলাম না।। সমাজের যারা আমার সুখ দেখে হিংসা করতো তারাও আমাকে বিধবা বলে করুনা করতে লাগলো।।

আবিরের শূন্যতাই জীবন থেমে যায় যায় অবস্থা তখন বড় ভাই প্রেরণা দিলো,,ভাইয়ের একটা কথাই মনে পড়ে ” টুকটুকি জীবনে যায় হয়ে যাক প্রাণ থাকতে স্বপ্ন থেকে সরবি না, তুই ডাক্তার হবি” ভাই কলেজে দিয়ে আসতো নিয়ে আসতো।। অনেক টাই স্বাভাবিক হয়ে গেছিলাম,, ভাল ভাবেই এইচএসসি দিলাম।। এইবার ভাইয়ের একটা বিয়ে দিতে হয় অনেক মেয়ে খুঁজে আমাদের কলেজের এক মেয়ের কথা বলল ভাই যাকে তার ভাল লাগে,,,ওই আমাকে দিয়ে আসতে নিয়ে আসতে দেখছে আর কি।।আমিও মেয়েটা কে দেখতাম আবিরের সাথে চেহারাতে বড্ড মিল।। সে যায় হোক,,খোজ নিয়ে জানলাম- মেয়েটা এখানে হোস্টেল এ থাকতো এক্সাম শেষ করে বাড়ি চলে গেছে,,,আমি বাড়ির ঠিকানা সংগ্রহ করি,,তার পরে সপরিবারে চলে যায় মেয়ের গ্রামের বাড়ি চাঁদপুর।।।

মেয়ের বাড়ি তে যেতেই সামনে পড়লো সেই চেনা মুখ যাকে মৃত মনে করে বেচে আছি এই ২.৫ বছর,, হ্যা আমার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে আমার স্বামী আবির।। আমি বাকরুদ্ধ হয়ে অবাক নয়নে চেয়ে আছি তার দিকে,,তার পরে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি,,যখন জ্ঞান ফিরলো জানতে পারলাম- ভাইয়া যে আবিরা কে পছন্দ করত সে আবিরের ছোট বোন,,আর আবির বিবাহিত,, বাচ্চা হয় না বলে রাগ করে সে সব রেখে নারায়ণগঞ্জ চলে গেছিলো,,আর আমাকে বিয়ে করেছিল তার বাবা হওয়ার ক্ষমতা আছে কি না বোঝার জন্য ( বলা হয় নি- ৯ম শ্রেণী তে আমার বাচ্চা নষ্ট করতে হয়েছিল),,যখন সে বুঝলো তার বাবা হওয়ার ক্ষমতা আছে সে তার বউ কে চিকিৎসা করাই এবং আমার এসএসসি পরীক্ষার ৩ দিন আগে জানতে পারে তার বউ গর্ভবতী কিন্তু সে সময় চলে আসলে আমার এক্সাম খারাপ হতো তাই আসে নি আমার এক্সাম শেষে এসেছে।।। মায়ের মুখে এসব কথা শুনে মনের অজানতেই বলে দিলাম-ভাগিস আমার এক্সাম এর কথা ভাবছিল।।

আমিঃবাবা চলেন বাসায় যাব।।

আবিরঃখেয়ে যাবেন সবাই।।

ভাইঃনা রে ভাই,,যা দেখলাম পেট ভরে গেছে

আবিরঃনিলু ডিভোর্স পেপার রেডি করছিলাম অনেক আগেই কিন্তু দেয়ার সাহস হয় নি,, সাইন করে দিয়ে যাও।।

আমিঃ নিয়ে আসেন আবির রুম থেকে পেপার আর একটা খাম নিয়ে আসলো।। পেপার টা আমার হাতে দিয়ে বললো – এইটা ডিভোর্স পেপার আর এই খামে কাবিনের টাকা আছে।।

আমিঃ( পেপার আর খাম হাতে নিয়ে) আপনার বাবু টা কই.? আবিরা একটা বাচ্চা মেয়ে কে নিয়ে এসে বলল- এইটা আবির ভাইয়ের মেয়ে নাম আনিরা।।

আমিঃ আবিরের দেয়া খাম টা আনিরা কে দিয়ে বললাম ” ভাল থেকো”

তার পরে বাসায় চলে আসছি,,ডিভোর্স পেপার টাই সাইন করি নাই,,যত্ন করে রেখে দিছি।। খারাপ কথা পাচ কান হতে সময় নেই না,, আবির মারা গেছে ভেবে যারা আমাকে বিধবা বলে করুনা করতো তারা এখন আমাকে ডিভোর্সি বলে উপহাস করে।। করুক তাতে কি আমি মানিয়ে নিবো।। এত কিছুর পরেও মানুষ টাকে খারাপ মনে হচ্ছে না,,ভালবাসি তো তাই,,,ভাল থাকুক। ভাবতেই অদ্ভুত লাগে জীবনের মানে বোঝার আগেই জীবন আমাকে কত রং দেখিয়ে দিলো।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত