একটি ঘুণপোকা এবং জোনাকিপোকার গল্প

একটি ঘুণপোকা এবং জোনাকিপোকার গল্প

“কেমন লাগলো?”

“ধ্যাত, ঘুম আসতেছে। এতো কিচ্চা কাহিনী কইতে ভাল লাগেনা।”

“এতো আয়োজন করলেন। হাত বাঁধলেন। পা বাঁধলেন। কামিজ ছিঁড়লেন। পাজামার ফিতা খুললেন। মজা পান নাই?”

“ঘুমাইতে দে। শরীর ক্লান্ত। কানের কাছে ভেজর ভেজর করিস না।”

“দুইটা মাংসের দলা আর সামান্য তুচ্ছ একটা যোনী পথের জন্য এতো লাফাইলেন। আর মাত্র এক ঘন্টার ভিতরেই সব ফাল পারা শেষ হইয়্যা গ্যাল।”

“তো কি কোলে কইরা নাচুম। কাম শেষ। এইবার ঘুমাইতে দে।”

“কয়েক ফোটা বীর্য বাইর করার জন্যি আমারে খাবলাইয়া খাইলেন। খাইয়াও তো আঁশ মিটাইতে পারেন নাই। আমারে খুন করলেন ক্যান?”

“হ তোরে জিন্দা রাখি আর তুই সবাইরে ক যে আমি তোরে রেইপ করছি। পথের কাঁটা আমি রাখি না।”

“ভাইয়া, আপনে কি আসলেই সুখ পাইছেন?”

“তুই আমারে ভাইয়া ডাকিস ক্যান মাগী?”

“আপনে তো আমার ধর্মের ভাই। দেশি ভাই। ভাই না ডাইকা কি ডাকুম?”

এপাশ ওপাশ করেও ঘুম আসছে না রাসেলের। মেয়েটাকে গলায় ফাঁস দিয়ে না মারলেও পারতো। কিন্তু মেয়েটা এমন চিৎকার শুরু করেছিলো। উপায় ছিল না। মাথার ভিতরে সেই মেয়ের কথা বেজেই চলেছে।

“ভাইয়া।”

“আমি তোর ভাই না কইলাম।”

“ধরেন এমন হইতে পারতো না। আপনে আমারে অনেক অনেক ভালবাসলেন। আমিও বাসলাম। আমারে বিয়া করলেন। আপনে বাইরে সারাদিন কাম কইরা সন্ধ্যায় ঘরে আইস্যা দেখলেন আমি সাজগোজ কইরা আপনের জন্য বইস্যা আছি। আমি শাড়ির আঁচল দিয়া আপনের কপালের ঘাম মুইছা দিলাম। এক গ্লাস পানি আগাই দিলাম…” “চুপ কর মাগী! চুপ কর।” গলাটা ধরা আসছে রাসেলের। বুকের উপরে ভারি পাথরের মতো কি যেন চেপে বসেছে। দম নিতে কষ্ট হচ্ছে।

“দুই বছর পরে আমাগো একটা পোলা হইলো। আমি আপনে হাত ধইরা পোলারে হাঁটা শিখাইলাম। আপনেরে যেইদিন প্রথম বাবা কইয়্যা ডাক দিবো আপনে সেইদিন আর কামে যাইবেন না। সারাদিন পোলারে কোলে নিয়া পোলার মুখের কাছে কান নিয়া বইস্যা থাকবেন আরেকবার বাপ ডাক শুনার জন্যি। আমারে বারবার জিগাইবেন- ও বউ তোমার মানিক বাবা ডাকে না ক্যান।”

“তুই চুপ কর।”

“আমাগো পোলাডা একদিন অনেক বড় হইবো। আপনার মতোই জুয়ান। একদিন কাম থেইক্কা ঘরে আইস্যা দেখলেন আমি মইরা পইরা আছি। আপনার পোলায় আমারে রেইপ কইরা আপনার মতোই গলায় ফাঁস দিয়া মারছে আমারে।” “এসব তুই কি কইস। ছেলে কি মায়েরে রেইপ করে।”

“আমি কি কারো মা হইতাম না। কারো বউ হইতাম না। আমারে কি আপনে রেইপ করেন নাই। আপনের মতো কাপুরুষ তো মা বইন দেখে না। মাইয়্যা মানুষ পাইলেই আপনাগো শরীরে ইবলিশ চইল্লা আসে। আপনে কি আপনের মায়েরেও ছাইরা দিবেন?” রাসেলের দম প্রায় বন্ধ হয়ে আসছে। এর আগেও সে অনেক মেয়েকে ধর্ষণ করেছে। কিন্তু এমনটা তো কখনো হয়নি।

“ভাইয়া।”

“বল।”

“আপনের মায়ের নাম কি?”

“কেন জিজ্ঞাস করতেছিস?”

“এমনি ভাই।”

রাসেল বিছানা ছেড়ে উঠে শার্ট গায়ে দেয়। লুঙ্গী ছেড়ে জিন্সের প্যান্ট পরে। রাত এখন সাড়ে তিনটা প্রায়। শীতের প্রায় শেষ। হালকা ঠান্ডা বাতাস বাইরে। ল্যামপোস্টের নিচে এই মাঝরাতে ঢাকা শহরকে আজ কেমন অচেনা মনে হচ্ছে রাসেলের।

মেয়েটার কথা ওর মনের কোণে এখনো প্রতিধ্বনি করছে। ওর ও তো একটা ভালবাসার মানুষ থাকতে পারতো। একটা বউ থাকতে পারতো। যে বউ এই পৃথিবীতে ওকে সবচেয়ে বেশি ভালবাসতো। ওর জন্য রোজ সন্ধ্যায় চাল ফুটিয়ে অপেক্ষা করতো। বাসায় ফিরলেই বউ এই পৃথিবীর সেরা হাসিটা দিয়ে ঘরের দরজা খুলে দিয়ে একপাশে দাঁড়িয়ে থাকতো। ওদের একটা বাচ্চা হতে পারতো। ফুটফুটে একটা মেয়েও থাকতে পারতো। বুকের সব ভালবাসা দিয়ে যেই মেয়েকে একটু একটু করে বড় করতো। মেয়েটা কলেজ যেতো। ভার্সিটি যেতো। মানুষের মতো মানুষ হতো।

আজ সন্ধ্যায় যেই মেয়েটিকে ও ধর্ষণ করে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে মেরে ফেলেছে সেই মেয়েটির বাবা মাও তো কতোনা আদরে ভালবাসায় মেয়েটিকে বড় করেছে। কিন্তু ওর মতো একটা কীট কিনা সেই মেয়েটিকে এভাবে অত্যাচার করে মারলো। রাসেল বুঝতে পারছেনা কেন আজ ওর সব এমন উলটপালট হয়ে যাচ্ছে। বিবেকের কাছে ওর তো কোন দায় ছিলনা কখনো। কেন আজ অপরাধ প্রবণতা ওকে বারেবারে ঘায়েল করছে।

“ভাইয়া!”

“কি।”

“আপনার কোন ফুল পছন্দ?”

রাসেল মনে করতে পারছে না। ফুল দেখে কি কখনো ওর মনে কোন ভাল লাগার জন্ম হয়েছিলো কিনা। কয়েকটা ফুলের নাম জানে ঠিকই। কিন্তু পছন্দের ফুল আবার কেমন হয় বুঝতে পারছে না।

“আমি জানিনা।”

“আমার কদম ফুল খুব ভাল লাগে ভাইয়া। আর কিছুদিন পরে বর্ষা আসবো। কদম ফুল ফুটবো। ভাইয়া আমার আর কদম ফুল দেখা হইবো না। আমি আর কখনো কদম ফুল ছুঁইয়াও দেখতে পারমুনা।”

রাসেল একটা সিগারেট ধরায়। চোখটা ঝাপসা হয়ে আসছে। রাসেল বুঝতে পারছেনা। চোখের কোণে পানি কেন জমছে। আজ নিজেকেই চিনতে পারছে না। কি হচ্ছে এসব ওর মাঝে। হাঁটতে হাঁটতে সেই নির্মিত ওভার ব্রিজের নিচে এলো। মোবাইলটা বের করে টর্চ জ্বালালো। সামান্য একটু দূরেই মেয়েটাকে ধর্ষণ করে লাশটা ফেলে রেখে পালিয়েছিলো।

“ভাইয়া আমারে তো এইখানে পাইবেন না। পুলিশ লাশ মেডিক্যাল নিয়া গেছে।”

“তুমি কেমনে জানো?”

“কি বলেন ভাইয়া আমার লাশ কই আমি জানমুনা। আপনে এইখানে কি জন্য আইছেন?”

“তোমারে নিতে আসছি। আমি পুলিশের কাছে ধরা দিমু।”

“লাভ কি ভাইয়া? পুলিশের কাছে না হয় ধরা দিলেন। আপনের শাস্তি হইলো। ফাঁসি হইলো। মইরা গেলেন। লাভ কি তাতে?” “আর কোন মাইয়্যাতো আমার হাতে ধর্ষিত হইবো না।”

“এইডা কোন কথা না। আপনারে শাস্তি পাইতে হবে বাইচ্চা থাইক্কা। যদি সত্যি আপনে মনে করেন যে আপনার শাস্তির দরকার আছে। আর কোন মেয়েরে আপনি নষ্ট করবেন না। খুন করবেন না। যদি বাইচ্চা থাইক্কা আপনি আপনার নষ্ট মনের সাথে যুদ্ধ কইরা ভাল থাকতে পারেন। যদি আরেকটা মেয়ে আপনার কাছ থেইক্কা ভাল থাকে, নিরাপদে থাকে। সেইটাই হইবো আপনার জন্য শাস্তি। আবার এইটাই হইবো আপনের জন্য পুরষ্কার।” “তুমি আমারে মাফ কইরা দাও।”

রাসেলের চোখ থেকে কখন যে অঝোর ধারায় পানি পরতে থাকলো ও বুঝতেও পারেনি। ওর মতো এই সমাজের একটা কীটের তো এতোটা বিবেকের দংশন হওয়ার কথা নয়। অনেক মেয়েকে এর আগেও ও অত্যাচার করেছে। রাসেল ফিরে যাচ্ছে ওর বাসার দিকে। টহল পুলিশের ভ্যান পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে। কি আশ্চর্য এতো রাতে টহল পুলিশ তো জিজ্ঞাসাবাদ না করে যায় না। রাসেলের খুব ইচ্ছে করছে চিৎকার করে পুলিশকে ডাক দিয়ে বলতে, ” স্যার আমারে এরেস্ট কইরা নিয়া যান। একটা মেয়েরে আইজকা আমি রেইপ কইরা গলায় ফাঁস দিয়া মারছি।” তখন মেয়েটা আবার কথা বলে উঠলো।

“ভাইয়া। আমি আপনেরে মাফ কইরা দিছি সেই কবে। আমারে যখন আপনে রেইপ করতেছিলেন, তখন মনে হইতেছিলো একটা কুত্তা জানোয়ার আমার শরীরের উপরে উইঠ্যা আমারে ছিঁড়া খাইতেছে। পুরুষ মানুষের উপরে এতো ঘেন্না আগে কখনো লাগে নাই। মনে হইতেছিলো আমারে কেউ কুমিরের খামারে ফালাই দিছে। আমার বাবার মুখটা ভাইস্যা উঠলো। কই ঐ মানুষটা তো এমন না। উনিও তো পুরুষ। আমার জীবনের সবচাইতে বড় ছায়া। আমারে এই দুনিয়ায় সবচেয়ে বেশি ভালবাসে আমার বাবা। কিন্তু বাবার মতোই পুরুষ শরীরের আরেকটা মানুষ আমারে এইডা কি করতেছে। ঘেন্নায় আমার বমি আসতেছিলো আপনের উপরে। চিল্লাইয়া ফালাই দিতে চাইছি আপনেরে শরীর উপর থেইক্কা। তখনই আমার মুখ চাইপা ধরলেন। ওড়নাটা গলায় ছিল। ফাঁস দিয়া ধরলেন। বিশ্বাস করেন ভাইয়া সেই মুহূর্তে আমার খুব বাঁচতে ইচ্ছে করতেছিলো। আমার খুব বলতে ইচ্ছে করতেছিলো ভাইয়া আমারে মাইরেন না। কিন্তু আপনে এতো জোরে আমার গলায় ফাঁস দিতেছিলেন আমার গলা দিয়া আর কথা বাইর হয় নাই।” “চুপ করো বইন চুপ করো।”

“আমি হাত পা ছুড়িতেছিলাম। আপনি আমার গায়ের উপরে সব শক্তি দিয়া চাইপা ধরলেন। ভাইয়া আপনে কি তখন বুঝতেছিলেন আজরাইল সেইখানে চইলা আসছিলো। জানি বুঝেন নাই। আমি দেখছিলাম আজরাইলরে। আপনি যদি দেখতেন তাইলে আর আমারে এইভাবে মারতে পারতেন না। আপনেও একদিন আজরাইলরে দেখবেন সেইদিন আপনের ঠিক মনে পরবে আমারে কতো কষ্ট দিয়া আপনে গলায় ফাঁস দিয়া মারছেন। জানটা এই শরীর থেইক্কা বাইর হওয়া যে কতো যন্ত্রণার ভাইয়া, আপনেও টের পাইবেন।”

“আর কিছু কইও না। আমি শুনতে চাইনা।” কানে দুই হাত চাপা দিয়ে রাস্তার পাশে একটা গাছের নিচে বসে পড়লো রাসেল। ওর মাথা ঘুরাচ্ছে। পেটের নাড়িভুঁড়ি উগড়ে আসতে চাইছে।

“যখন মইরা গেলাম তখন সবকিছু কেমন যেন শান্ত মনে হইলো। আপনের উপরেও কোন ক্ষোভ থাকলো না। তখনই মাফ কইরা দিছি। খুব অসহায় একজন মানুষ মনে হইতেছিলো আপনেরে। খুব মায়া হইতেছিলো। সামান্য একটা শরীরের জন্য আপনে এমন কুত্তার চাইতেইও নিচে নাইমা গেলেন। এতো ছোট মন নিয়া কি করে থাকে মানুষ। কতো অসহায় আপনে নিজের কাছে যে, সামান্য নারী দেহের লোভ সামলাইতে পারেন না। এইরকম একটা আবর্জনার উপরে রাগ কইরা লাভ কি। চাইলেও আপনেও হয়তো অনেক ভাল একটা মানুষ হইতে পারতেন। ঠিক আমার বাবার মতো।”

ফজরের আযান দিচ্ছে। কেমন যেন এক স্নিগ্ধতা এই ভোরের আযানে। আলো ফুটেনি। কি শান্ত নিঝুম চারপাশ। হালকা ঠান্ডা বাতাস বুক ভরে টেনে নিলে পুরো শরীরটা জুড়িয়ে যায়। “ভাইয়া আপনে নামাজ পড়েন?” “না।” “নামাজ পড়তে পারেন?” “আগে পারতাম। এখন দোয়া দুরুদ ভুইল্লা গেছি।” নামাজ পড়তে যাবেন?” “পারি না নামাজ পড়তে।”

“গোসল কইরা পাক পবিত্র হইয়্যা মসজিদে গিয়া বইস্যা থাকেন। নামাজ পড়তে না পারলেও মাথাটা আল্লাহ্‌র দিকে সিজদা দিয়া আল্লাহ্‌রে ডাকেন। দেখবেন আপনের মনটা শান্ত হইয়্যা যাবে।” “আমি আর ভাল হইতে পারবো না বইন।”

“ভাল হইতে কে কইছে ভাইয়া। আপনার ভাল হওয়ার দরকার নাই। আপনে অন্যদের ভাল রাখবেন। আপনের জন্য যেন আর কারো কোন ক্ষতি না হয়। ভাইয়া একটা কথা কই?”

“কও!”

“মইরা গিয়া যদি বাইচ্চা যাওয়ার চিন্তা করেন তার থেইক্কা ভুল আর কিছুতেই নাই ভাইয়া। মরতে একদিন হবেই। সেইটার জন্য চিন্তা না কইরা চিন্তা করেন কি কইরা বাঁচতে হবে। মরার আগ পর্যন্ত জীবনটা আপনের। মইরা গেলে আর এই জীবন পাইবেন না। ভুল আপনে অনেক করছেন এই দুনিয়ায়। ভুল গুলা এই দুনিয়াতেই শুধরাইতে হবে। না খায়া থাইকেন তাও কোন পাপ কইরেন না ভাইয়া। আমার কথাটা রাখবেন না?”

“হ রাখুম।”

“ইনশাআল্লাহ্‌ কন ভাইয়া। আল্লাহ্‌র উপর ভরসা রাইখা কন।”

“ইনশাআল্লাহ্‌ রাখবো।”

“ভাইয়া, ভোর হইতাছে দেখেন। একটু একটু কইরা সব কালো মুইছা যাবে একটু পরে। ভাল খারাপ নিয়াই এই জীবন। দিন আর রাইত নিয়াই এই দুনিয়া। বুক ভইরা নিশ্বাস নিয়া দেখেন ভাইয়া। আইজ যদি একটা শিশুর জন্ম হয় সেও এই বাতাসেই নিশ্বাস নিবে। সেই শিশুর জন্য বাতাসটা বিষাক্ত কইরেন না। আমার মতোই কোন মেয়ে শিশুই হয়তো জন্মাইছে।”

রাসেল রাতের শেষ অন্ধকার রাস্তা ধরে হেঁটে যাচ্ছে। ওর প্রতিটা পদক্ষেপের সাথে সাথে একটু একটু করে আলো ফুটছে পৃথিবীতে। আলো আঁধারীর গলিতে একটা নর্দমার কীট আবার মানুষের সমাজে ফিরে আসতে চাইছে। সে জানে না কেমন সকাল অপেক্ষা করছে তার জন্য। তবুও সে একটা নতুন সকাল দেখতে চায়।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত