সন্তান

সন্তান

আজ আমার বিয়ে কিন্ত আমার বউ প্রেগন্যান্ট এবং বয়সে আমার থেকে প্রায় ৩-৪ বছরের বড় হবে। সবাই কেমন করে যেন আমার বউয়ের মুখ এবং পেটের দিকে তাকাচ্ছে। হঠাৎ আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধুটি আমাকে বলেই বসলো কি করলি এটা তুই? ডিভোর্সি.. এইটা কোন কথা? কিভাবে এটা করলি? আরেকজনের বউরে বিয়া করতে হইলো, আর দেশে কি মেয়ের আকাল পড়ছে? তুই কোন দিক দিয়ে কম? একজন ডাক্তার ছেলে, তুই তো একটা ভালো মেয়ে পাইতি আমি আমার বন্ধুকে জিজ্ঞেস করলাম, ভালো মেয়ে বলতে??

আমার বন্ধুটি বলল, ভালো মেয়ে বলতে বিয়ে হয়নি এমন? solid মেয়ে আমি বললাম,virgin মেয়ে? না মানে.. ইয়ে.. হ্যা..তুই কেন এমন একটা মেয়েকে, I mean বয়সেও বড় আবার ডিভোর্সি বিয়ে করতে গেলি?? আমি বলা শুরু করলাম আচ্ছা, আমার বাবা নেই, সেটাই তো তুই জানিস? আমার মা তো অপূর্ব সুন্দরী ছিলেন।তোর ভাষ্যমতে যেটাকে তুই Solid বলিস, আমার মা ওইটাই ছিলেন। কারন খুব অল্প বয়সেই মা বাবাকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন তবুও আমার বাবা কেন আমার মাকে এবং আমাকে ছেড়ে দিল? হাহাহা..এটার কি কোন উওর আছে তোর কাছে?

আসলে যেই বয়সটাতে আমার মা- বাবা পালিয়ে বিয়ে করেছিল তখন আমার মায়ের বয়স ১৭ কি ১৮ হবে।আর বাবার বয়স ২৫ বছর হবে, উনি মাত্র চাকুরী শুরু করেছে। যেহেতু গোপনে বিয়ে,তাদের সব কিছুই ছিল গোপনে। ফলাফল কিছুদিনের মধ্যেই আমি আমার মায়ের পেটে। মা যখন বাবাকে উনার প্রেগ্ন্যাসির কথা জানালো,বাবা নাকি চুপ করে ছিল অনেকক্ষন। বাবা কোন ভাবেই আমাকে এই পৃথিবীর আলো দেখাতে চায়নি। মাকে নিয়ে গেল হসপিটালে, মা নাকি খুব ঠান্ডা মাথায় এবরশান রুমেও ঢুকেছিল। কিন্তু শেষ মূহুর্তে আর পারলো না,পিছনের দরজা দিয়ে মা বাসায় চলে আসলো।

আমার নানা নানি সেই যুগ অনুযায়ী যথেষ্ট অগ্রগামী চিন্তা চেতনার মানুষ ছিলেন। আমার মা সব কিছুই উনাদের সাথে শেয়ার করেছিলেন।আমার বাবা এবং তার পরিবার সব কিছুই মেনে নিলেও এই সন্তানটাকে, মানে আমাকে মেনে নেয়নি। সমাজের চোখে নাকি তাদের সম্মান থাকবে না ,কত কি…আমার বাবা নাকি একদম চুপ ছিলেন। উনার মা বাবার সিদ্ধান্তই নাকি উনার সিদ্ধান্ত। আমার নানা নানিও বললো আমার মেয়ের সিদ্ধান্তও আমাদের শেষ সিধান্ত এরপর কি করলো তোর মা?? আমার মা আমার বাবা কে ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে দিল। মা আর কখনোও বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেয়নি।আমাকে বুঝতেই দেয়নি যে আমার বাবা থেকেও নেই।আমার মা শুধু আমাকে বলতেন,বাবারে তোকে সত্যিকারের মানুষ হতে হবে,আর মানুষের পাশে দাড়াতে হবে। মা আমাকে আজীবন একজন ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। আমিও সেই ছোটবেলাতেই আমার মায়ের ইচ্ছেটা বুঝে গিয়েছিলাম। আমি ডাক্তার হলাম,নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে আমি সব সময়ই মানুষের পাশে দাড়িয়েছি।

যাইহোক , আচ্ছা এই বার বল, আমার বাবা তো একজন পূর্ণ বয়সের মানুষ ছিলেন অন্যদিকে বয়সের দিক থেকে আমার মা অনেকটাই ছোট ছিলেন। আমার বাবা কোন দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে এই কাজটা করলো? চিন্তা চেতনা কিংবা বিবেকবোধ কই ছিল আমার বাবার ? আমার বাবা কি তখন বুঝেন নি, একটা ১৭ বছরের মেয়ে সমগ্র সমাজের বিরুদ্ধে গিয়ে উনার সন্তানকে পৃথিবীর মুখ দেখাতে চাচ্ছে? আমার মা উনাদের ভালবাসার ফসলটাকে নষ্ট করতে চায়নি। আমার মা এই সমাজের তুচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গির কাছে হার মানেননি….শোন বন্ধু দায়িত্ববোধের বিষয়টা অনেক সময় বয়স হলেও মানুষের হয়না, আবার অনেক সময় অনেক অল্প বয়সেই মানুষ তা অর্জন করে নেয়। এক সাথে ২টি মানুষ থাকতে গেলে, এক সাথে থাকার মানে টা বুঝতে হয়,পাশের মানুষটাকে চিনতে হয়, বয়স ওই খানে মুখ্য কোন বিষয় না আচ্ছা,সবই বুঝলাম কিন্তু এই ঘটনার সাথে তোর বিয়ের ব্যাপারটা বুঝতে পারলাম না।

কয়েকমাস আগের ঘটনা আমার হাসপাতালে নাইট ডিউটি পড়েছে। আমি হাসপাতালের করিডোর দিয়ে হেটে যাচ্ছি। হঠাৎ এক মেয়ে এসে আমাকে বললো আমার সন্তানটাকে বাঁচান,ওরা আমার সন্তানটাকে মেরে ফেলতে চায়। আমাকে বাঁচান, আমি কাউকেই চাই না,শুধু আমার সন্তানটাকে বাঁচাতে চাই। কিছুক্ষনের মধ্যেই আমি কয়েকজন ছেলেকে দেখলাম দৌড়ে আসছে। এর মধ্যে একজন ছেলে বলে উঠল, ভাই ওর মাথায় সমস্যা আছে। ও আমার গার্লফ্রেন্ড, কিছুটা abnormal, ওর ট্রিটমেন্টের জন্য এখানে এনেছিলাম। সাথে সাথে মেয়েটা আমাকে বললো,আমি abnormal না..আমার বাচ্চা টা নষ্ট করার জন্য ও আমাকে এখানে অজ্ঞান করে নিয়ে আসছে। ততক্ষনে আমি ব্যাপারটা বুঝে গেছি,আর আমাদের হসপিটালের কিছু ডাক্তার অল্প কিছু টাকার জন্য এই এবরশানের কাজটা যে করে সেটাও আমি জানতাম।

ছেলেটা এবার চিৎকার করে মেয়েটাকে বলে উঠলো, বলেছিলাম না সবাইকে জানিয়ে আবারো বিয়ে করবো, তোর মত মেয়ের সাথে আমি কখনোই থাকবো না। আর গোপন বিয়ে গোপন ই থাকবে, তোকে আমি ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে দিচ্ছি। আর তুই তো বাচ্চাটার মা হবি…দেখবো তো, তুই কেমনে থাকিস? আর কে তোকে বাচ্চা সহ বিয়ে করবে। তুই থাক আমিও ততক্ষণে আমাদের সিকিউরিটি গার্ড কে দিয়ে লোকটাকে বাইরে বের করে দিলাম।আমি বুঝতে পারছিলাম পুরো ঘটনাটাই মেয়েটা থরথর করে কাঁপছিল।আমি মেয়েটাকে আমার চেম্বারে নিয়ে আসলাম।ও আমাকে সব ঘটনা খুলে বললো। ছেলেটাকে অন্ধ বিশ্বাস করেছিল মেয়েটা। গোপনে বিয়েও করেছিল কিন্তু যখনই বাচ্চা পেটে আসলো বাচ্চাটাকে নষ্ট করার কথা বলতে লাগলো। আমার মায়ের সাথে তো আমার নান নানি ছিল, কিন্তু এই মেয়েটার সাথে কেউ নেই এমনকি মেয়েটার মা বাবাও চাচ্ছে না এই বাচ্চাটা পৃথিবীর আলো দেখুক। আমি মেয়েটাকে নিয়ে ওর বাসায় দিয়ে আসলাম। আর মেয়েটার মা বাবা কে যততুক সম্ভব বুঝালাম।

সেইদিন আমি আসলে মেয়েটাকে দেখছিলাম আর ভাবছিলাম আমার মা ঠিক এই ভাবেই আমাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিল। মেয়েটাকে কি অসহায় যে লাগছিল। কিন্তু কি প্রচন্ড সাহসের সাথে আমাকে বলছিল, যেভাবেই হোক নিজের সন্তানটাকে সে পৃথিবীর মুখ দেখাবে। নিজের সন্তানটাকে বাঁচানোর জন্য পুরো পৃথিবীর বিরুদ্ধে যেতেও যে একজন মা একটুকুও পিছপা হয়না সেইদিন আমি আবারো বুঝলাম। আসলে এই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা যে বরাবরই একজন মা,সেটা আমি আবারো প্রমান পেলাম তারপর কি হলো ওই মেয়েটার। এই যে মেয়েটা তোর চোখের সামনে বসে আছে।তোদের ভাবী। আমার বন্ধুটা আমাকে জড়িয়ে ধরে রাখলো অনেক্ষন। আমাকে বলতে লাগলো আমাকে মাপ করে দে বন্ধু,আমি আমার ভুল বুঝতে পারছি..আমাকে মাপ করে দে।

অনেকক্ষন আমার বউটা একা বসে আছে।আমি গিয়ে আমার বউয়ের পাশে গিয়ে বসলাম। আর কানে কানে ফিশ ফিশ করে বললাম, কি ব্যাপার? পেটের ভিতর থেকে আমার বাবা সোনাটা কি কিছু বলে?? আমার বউয়ের চোখ দিয়ে পানি পড়ছে,ও শক্ত করে আমার হাত আঁকড়ে ধরে আছে। আমি বুঝতে পারছিলাম এই হাত এক অগাধ বিশ্বস্ততার হাত, আজীবন এক সাথে থাকার নির্ভরতার হাত….

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত