জারজ

জারজ

এলিফ্যান্ট রোড এলাকাটি মার্কেট হলেও এমনিতে বেশ চুপচাপ! সারাদিন দোকান পাটের কারণে একটু হৈচৈ হয় সত্যি, তবে মার্কেট বন্ধ হবার সাথে সাথে একদম রুপ পাল্টে যায় পুরো এলাকাটির! এর আরেকটি কারণ হতে পারে নীচে দোকান পাট থাকলেও উপরে বেশ কিছু ফ্ল্যাটবাড়ি রয়েছে! রাত যত গভীর হয়, তার সাথে পাল্লা দিয়ে এলাকাটা নিশ্চুপ হতে শুরু করে ! রাত গভীর হলে এমন নিশুতি হয়ে যায়, মনে হয় একটি পিন পড়লেও যেন তার শব্দ পাওয়া যাবে! আর তাই আজ মাঝরাতের একটু পরে আল্পনা প্লাজার পিছনের গলিতে কে বা কারা যখন একটি শিশুকে ছুঁড়ে ফেলে দিলো, তখন শিশুটির আর্তনাদে খান খান হয়ে গেল রাতের নিশ্তব্ধতা!

যদিও তখন ফ্ল্যাটবাড়িটির সবাই ঘুমিয়ে পড়েছিল, তবুও একজন বাসিন্দা শিশুটির কান্না শুনতে পেলেন! তাঁর ইনসমনিয়া রয়েছে ,তাঁকে প্রতিটি রাত জেগে কাটাতে হয়! তবে এই মুহূর্তে শিশুটির কান্না তাঁকে ভীষণ ভাবে বিচলিত করে তুলেছে! এর অবশ্য দুটি কারণ রয়েছে! তিনি নিশ্চিত হতে পারছেন না এটা কি কোন শিশুর কান্না নাকি বিড়াল ছানার? দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি মানুষের বাচ্চা আর বিড়াল ছানার কান্নায় ভীষণ মিল রয়েছে। অন্য যে ব্যাপারটি তাঁকে বিচলিত করছে তা হল মাঝরাতে এই কান্নার শব্দে তাঁর স্বামীর ঘুম না ভেঙে যায়! তাঁর স্বামীকে খুব ভোরে উঠে কাজে যেতে হয়! একবার ঘুম ভেঙে গেলে তাঁর বাকিটুকু রাত আর ঘুম আসে না! সারারাত এপাশ ওপাশ করে তাঁর স্বামীর জন্য সকালে কাজে যাওয়া খুবই কষ্টকর হবে!

ভদ্রমহিলার আশঙ্কার কারণেই কিনা জানি না,ভাগ্য দেবী তাঁর প্রতি সুপ্রসন্ন হলেন! শিশুটির কান্না তাঁর স্বামীর কান পর্যন্ত পৌঁছাল না! তিনি এক ঘুমে রাত কাবার করে দিলেন! যদিও শিশুটি কিন্তু তার কান্না থামায় নি এক মুহূর্তের জন্যও! তার অবশ্য একটানা কান্না করবার অনেকগুলো কারণ রয়েছে! শিশুটি যখন মাটিতে এসে পড়ে তখন মাথায় গুরুতর আঘাত পায়! সেখানে আভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ শুরু হয়েছে! রক্ত পড়তে শুরু করেছে হঠাৎ টেনে ছিঁড়ে ফেলা কাঁচা নাভি থেকে। ডান হাতের কব্জির একটু উপরে সমান্তরাল যে হাঁড় রয়েছে যা কনুই এর দিকে উঠে গেছে, সেই হাঁড়টিকেও আঘাত করে ভেঙে দেবার চেষ্টা করা হয়েছে! এসব ছাড়াও হাঁড় কাঁপানো শীততো রয়েছেই! শীতের কারণেই বুঝি ফ্ল্যাটের বাসিন্দারা তাদের দরজা জানালা আটকে ঘুমাতে গিয়েছিল! তাই শিশুটির কান্না একমাত্র ঐ মহিলা ছাড়া আর কেউ শুনতে পেল না!

পৃথিবী তার নিজস্ব গতিতে চলে! রাতের শেষে শিশির ভেজা সকাল আসে! আজও এর ব্যতিক্রম হয় না! চারদিক আলো করে তখন সবে ভোর হতে শুরু করেছে পুরো শহরটিতে! এখানকার সবচাইতে কাছে যে বস্তি রয়েছে তার নাম কাঁটাবন বস্তি! সেখানকার একটি ঘরে বাস করেন মাঝবয়সী এক মহিলা! কাল রাতে তারও ভাল ঘুম হয়নি! বেড়ার ফাঁক দিয়ে আসা ঠাণ্ডা বাতাস একেবারে হাড়ের ভিতরে সূঁচের মতন বিঁধছিল! আর তাই ভোরের আলো ফুটবার পর রাজ্যের ঘুম এসে ভিড় করল তাঁর চোখের পাতায়!সেই ঘুম যখন ভাংল তখন সূর্য উঠে গেছে! তিনি নিজের উপর খুবই বিরক্ত হলেন! প্রতি রাতেই ভাবেন খুব ভোরে উঠে কাজে বেড়িয়ে পড়বেন! বাস্তবে কখনোই আর তা হয়ে উঠে না! তিনি পাতা কুড়ানোর কাজ করেন! তাদের এই পেশায় ভোরে কাজে যাওয়া জরুরি! বেশী বেলা হয়ে গেলে ভাল জিনিস গুলো অন্য পাতাকুড়ানিদের দখলে চলে যায়! তবে তার একটি টেকনিক আছে! তিনি বড় ফ্ল্যাটবাড়িগুলোর পিছনে যে কানা গলি থাকে, সচরাচর সেখানেই ঢুকে যান! বড়লোকরা তাদের ফ্ল্যাটের পিছনের কানা গলিতে কত কিছু যে ছুঁড়ে ফেলে! তিনি যখন আল্পনা প্লাজার পিছনের গলিটির মুখে এসে পৌঁছলেন তখন সকাল প্রায় সাতটা। গলিতে ঢুকে তিনি যে ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখলেন তার জন্য অবশ্য তিনি প্রস্তুত ছিলেন না!

অন্য সবদিনের মত ভদ্রমহিলার এলিফ্যান্ট রোডের ফ্ল্যাটটিতেও শুরু হয়ে গেল দৈনন্দিন সকালের ব্যস্ততা! স্বামীকে বিদায় দেবার সময় তিনি জিজ্ঞেস করলেন “ এই তুমি কি কোন বাচ্চার কান্না শুনতে পাচ্ছ? “এটা বাচ্চার কান্না নাকি? আমি তো ভেবেছিলাম কোন বিড়ালের বাচ্চা হবে! একসাথে অনেক গুলো বাচ্চা হয় তো, মানুষজন বিরক্ত হয়ে ছুঁড়ে ফেলে দেয় আবর্জনার স্তুপে! “তুমি কি যাবার সময়ে একটু দেখে যাবে, ব্যাপারটা কি? ““আচছা, দেখে তোমাক ফোন করছি! “

দুঃসংবাদ বাতাসের আগে যায়! তাই তাঁর স্বামীর ফোন পাবার জন্য তাঁকে খুব একটা সময় অপেক্ষা করতে হলো না! মাত্র এক মিনিটের কথোপকথনে তিনি যা জানতে পারলেন তা হলো, কান্নার আওয়াজ কোন বিড়াল ছানার ছিলো না! তবে বিড়াল ছানারই মতন বাড়তি হয়ে যাওয়ায় একটি মানব শিশুকে ত্যাগ করে ফেলে রেখে গেছে মানুষরুপী কিছু অমানুষ! সেই পরিত্যক্ত শিশুটিকে প্রথম দেখতে পায় পাতা কুড়াতে আসা এক মহিলা!

একজন মহিলাকে তাঁর স্বামী যত ভাল ভাবে চিনতে পারেন আর কেউ কিন্তু তেমনিভাবে পারে না! আর তাই কথা শেষ করবার আগে ভদ্রলোক তাঁর স্ত্রীকে সাবধান করে দেন, তিনি যেন এইসব উটকো ঝামেলায় না জড়িয়ে পড়েন!
এই ঘটনার বহুবছর আগে বঙ্কিম চন্দ্র নামের এক লেখক কপালকুন্ডলা নামের একটি অদ্ভুত সুন্দর উপন্যাস লিখেছিলেন! সেই উপাখ্যানে নবকুমার নামের এক যুবকের নৌকা ভাটায় আটকে গেলে তিনি পার্শ্ববর্তী বনভূমিতে কাঠ সংগ্রহ করতে যান! এমন সময় জোয়ারের পানি এসে গেলে নৌকার বাকি আরোহীরা বাঘে ভরা সেই বনে নবকুমারকে একলা ফেলে রেখে নৌকা ভাসিয়ে দেয়! অতঃপর সেই পরিচ্ছেদটি লেখক শেষ করেন নিম্নোক্ত ভবিষ্যৎ বাণী করে, “আমার এই উপাখ্যান পড়িয়া কেহ যদি ভাবিয়া থাকেন, কদাচ অপরের নিমিত্তে কাষ্ঠ সংগ্রহ করিতে যাইবেন না, তাহলে তিনি ভুল করিবেন! কাষ্ঠ সংগ্রহ করা যাহার ধর্ম তিনি সর্বদা কাষ্ঠ সংগ্রহ করিতে যাইবেন! তুমি অধম বলিয়া আমি উত্তম না হইব কেন? “

যদিও তিনি তাঁদের সুদীর্ঘ বিবাহিত জীবনে কখনো স্বামীর কথার অবাধ্য হননি, তবে আজ সকালে তিনি তাঁর স্বামীর কথা মতো কাজ করতে পারলেন না! আহত বিপন্ন এই শিশুটির পাশে দাঁড়ানোর জন্য তিনি নিজের ভেতরে এক অদ্ভুত তাগিদ অনুভব করলেন! যদিও তিনি জানেন এর জন্য তাঁর অনেক বড় মাশুল দিতে হতে পারে, তবুও তিনি শিশুটির সাহায্যে ঝাপিয়ে পড়বার সিদ্ধান্ত নিলেন! ঐ যে বল্লাম না, নবকুমার যাদের ভিতরে বাস করে তাঁরা কি সংকটের সময়ে চুপচাপ হাত গুটিয়ে বাস করতে পারে?

তিনি যখন আল্পনা প্লাজার পিছনের কানা গলিটির মুখে এসে পৌঁছলেন, তখন সেখানে একটি জটলার সৃষ্টি হতে শুরু করেছে! লোকের ভীড় পিছনে ফেলে একসময় তিনি শিশুটির কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হলেন! শিশুটিকে দেখার পর তিনি প্রথম যে কাজটি করলেন তা হলো, গভীর মমতায় শিশুটিকে বুকে তুলে নিয়ে নিকটস্থ হাসপাতালের দিকে ছুটতে শুরু করলেন!

ডাক্তারদের ছাত্রাবস্হায় কিছু কঠিন ব্রত নিতে হয়! পাশ করবার পর অনেকই সেইসব কথা মনে রাখে না! তবে হাসপাতালে যে ডাঃ শিশুটির চিকিৎসার ভার নিলেন তিনি একদম অন্য রকম! তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করলেন শিশুটির রক্তপাত বন্ধ করতে! নিরলস চেষ্টা করে তিনি যখন শিশুটির রক্তপাত বন্ধ করলেন ততক্ষণে শরীরের সব রক্ত হারিয়ে শিশুটি ফ্যাকাশে হতে শুরু করেছে!

পুরো একটি দিন বেঁচে থাকার জন্য যুদ্ধ করে শিশুটি শেষ পর্যন্ত মারা যায় হাসপাতালে ভর্তির পরের দিন! যে মহিলা শিশুটিকে নিজের সন্তান পরিচয় দিয়ে ভর্তি করিয়েছিলেন তিনি তখন বারান্দায় বসেছিলেন! আদর্শ মায়ের মত শিশুটির পাশে বসে থাকতে পারেন নি। কারণ শিশুটি মারা যায় প্রচন্ড কষ্ট পেয়ে! কোন সুস্থ মানুষের পক্ষে এই কষ্ট সামনে বসে দেখা সম্ভব না! তাছাড়া তাঁর মাঝে এক ধরণের লজ্জাও কাজ করছিল! শিশুটি মারা যাবার আগে কিছুক্ষণের জন্য একদম স্বাভাবিক নবজাতকের মতন আচরণ করছিল! নতুন জন্ম নেওয়া বাচ্চারা যেমন অপার বিস্ময়ে চেয়ে থাকে, শিশুটিও তেমনি তার বড় বড় কাল দুটি চোখ মেলে তাকিয়ে ছিলো তাঁর দিকে!

শিশুটির চোখ দুটি যেন কথা বলছিল! অভিযোগের সুরে যেন সে বলছিল “আমি তো ভালই ছিলাম, যেখানে ছিলাম! তোমাদের দুটি লোভী মানুষের শারীরিক লালসার কারণে আমাকে এই পৃথিবীতে আসতে হলো! আসার সময় আমাকে বলা হয়েছিল পৃথিবীর অসংখ্য প্রজাতির পশুর মাঝে সবচাইতে যারা শ্রেষ্ঠ, সেই  মানুষের সমাজে আমাকে পাঠানো হচ্ছে! পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জীব হয়ে এ তোমাদের কেমন আচরণ? এর চেয়ে সামান্য তেলাপিয়া মাছও তোমাদের থেকে উত্তম! জান সন্তান জন্ম দেবার পর মা মাছ কি করে? বাচ্চা বড় না হওয়া পর্যন্ত পুরো টা সময়ে বাচ্চাদের মুখের ভেতর রেখে বড় করে ! পাছে ভুলে নিজের বাচ্চা খেয়ে ফেলে এই ভয়ে বাচ্চা বড় করার সময়টুকু না খেয়ে পার করে দেয়! “

গল্পের বিষয়:
গল্প
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত