চোর

চোর

আগামীকাল টুম্পার সাথে দেখা করতে যাবো, পকেটে এক টাকাও নেই, ঘরের বেড়ার চিপায়, পলিথিন মোড়ানো আম্মার ১০০ টাকা চুরি করে দ্রুত ঘর থেকে বের হয়ে গেলাম। দাঁড়িগুলো খোঁচা খোঁচা হয়ে গেছে, সেলুনে গিয়ে অনেক রিকুয়েস্ট করে ৩০ টাকা দিয়ে চুল কাটালাম ও দাড়ি সেভ করালাম।

ঘরে ফিরে দেখি, ঘর আমার তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। আব্বা আর আম্মা কঠিন ঝগড়ায় লিপ্ত হয়েছে, ১০০টাকা চুরির সন্দেহে আম্মা আব্বাকে যা খুশি বলছে, আব্বাও কম নয়, আম্মার অন্যায় অভিযোগ কিছুতেই মাথা পেতে নিতে রাজি নন। ঝগড়া চলছেই, ঝগড়া দেখে আমি পাশ কেটে চলে গেলাম, তাদের সামনে গেলাম না, ভাবলাম তাদের সামনে গিয়ে যদি ধরা পড়ে স্বামী স্ত্রীর হাতে গণধোলাই খাই, তাহলে আলু মার্কা মুখমন্ডল নিয়ে কালকে আর টুম্পার সামনে যাওয়া হবে না।

তবে আব্বা মনে মনে ঠিকই আমাকে সন্দেহ করলেন, আব্বা ডাক দিলেন আমাকে, রবিন এই রবিন আব্বার ডাক শুনে আমারতো কলিজা শুকিয়ে গেলো, জ্বি আব্বা জ্বি আব্বা বলে ছুটে আসলাম আব্বাতো আমার চেহারার দিকে তাকিয়ে অবাক, হায় হায় চেহারা এতো পকপকা বানাইছো ক্যামনে? ওই হারামজাদি, দেখ তোর টাকা কই গেছে? তোর পোলায় তোর টাকা চুরি কইরা সেই টাকা দিয়া হিরো সাইজা আসছে ধোলাই খাওয়ার ভয়ে, একটু কান্না কান্না ভাব করে, আব্বা বিশ্বাস করেন আব্বা, আমি আম্মার টাকা চুরি করি নাই আব্বা,

তাহলে তুই সেভ করার টাকা পাইলি কই? দুই টাকা দিয়ে একটা ব্লেড কিনে নিজে নিজে করছি আব্বা, বিশ্বাস করেন আব্বা। আব্বা আমার চুল টেনে ধরে, মানলাম তুই দুই টাকা দিয়ে ব্লেড কিনে সেভ করছিস, কিন্তু চুল কাটলি ক্যামনে হারামজাদা? অার বুঝি বাঁচা গেলোনা, আব্বার মারের ভয়ে আমার শরির থরথর করে কাঁপছে, আমার মুখ দিয়ে আর কোন কথা বের হচ্ছেনা, আব্বাকে ফাঁকি দিয়ে পালাবার চেষ্টা করলাম, আব্বার কানে কানে গিয়ে ভয়ে ভয়ে বললাম,

ছাইড়া দেন আব্বা, আপনারেও কিছু দেবোনে, বলতেই হারামজাদা ঘরে আগুন লাগাইয়া আমারে ঘুষ দিতে চাস? বলে মারার জন্য হাত উঠাতে চাইলেই ছুঁটে পালিয়ে গেলাম। ওই হারামজাদা দাঁড়া দাঁড়া বলে আব্বা কিছুক্ষন পিছু পিছু দৌঁড়ালেন, কিন্তু আমাকে ধরতে পারলেন না। রাতে আর বাড়ী ফিরলাম না, পরদিন টুম্পার সাথে দেখা করতে চলে গেলাম গোমতী নদীর পাড়ে, যাওয়ার সময় টুম্পার জন্য ২০ টাকা দিয়ে এক সেট প্লাস্টিকের চুড়ি নিয়ে গেলাম। টুম্পাতো চুড়ি পেয়ে সেকি? তুমি এগুলো কিনতে গেলে কেনো? তুমি স্টুডেন্ট মানুষ টাকা নষ্ট করার দরকার কি?

আরে টাকা নিয়ে তুমি চিন্তা করো না, আমার আব্বা আম্মা আমাকে খুব ভালোবাসে, আমাকে হাত খরচ বাবদ প্রতিদিন ১০০ টাকা করে দেয়।টুম্পার সাথে চাপা মারছি, সবগুলো কথাই আব্বা শুনে ফেললেন, গত রাতে বাড়ীতে না যাওয়ার কারনে, আব্বা আমাকে খুঁজতে খুঁজতে অবশেষে এখানে এসে পৌঁছালেন। আব্বার উপস্থিতি আমি টের পাইনি, পাবো কিভাবে? গোমতী নদীর পাড়ে অনেকেই বেড়াতে আসে, কে রাখে কার খবর?

কিন্তু আমার কথাগুলো শুনে আব্বা চুপি চুপি চোখের জল ছাড়লেন, অভাবের সংসারে যেই ছেলেকে সপ্তাহে ৫টা টাকা দিতে পারিনা, সেই ছেলে বাবা মা প্রতিদিন ১০০টাকা দেয় বলে বন্ধুর কাছে চাপা মারছে? আমার ছেলের কাছে আমি হেরে গেলাম, আমি হেরে গেলাম। টুম্পার সাথে গল্প শেষে বাড়ী ফিরবো, এমন সময় আব্বাকে দেখতে পেয়ে আমি চমকে উঠলাম, হায় হায় আর বুঝি বাঁচা গেলো না?? দৌঁড়ে পালাবার চেষ্টা করতে লাগলাম, আব্বা পেছন থেকে মায়ার স্বরে ডাকলেন, দাঁড়া বাবা।

আমিতো আব্বার এমন ডাক শুনে অবাক, কি ব্যাপার? আব্বা হঠাৎ এত মায়ার স্বরে ডাকলো কেনো? ফন্দি করে কাছে ডেকে সাইজ করার বুদ্ধি নাতো? ভয়ে ভয়ে আব্বার হাতে ধরা দিলাম, আব্বা কিছুক্ষন আমার পানে চেয়ে থেকেতুই চুরি করস নাই, আমিই চুরি করছি! এ তুমি কি বলছো আব্বা? হ্যাঁ অামি ঠিকই বলছি… আমিই চুরি করছি। আব্বা আম্মা প্রতিদিন হাত খরচ বাবদ ১০০টাকা দেয় বলে, যেই ছেলে বন্ধুদের কাছে মা বাবার মুখ বড় রাখতে পারে, তার জন্য মাত্র ১০০টাকার চোর কেনো, লক্ষ টাবার চোর সাজতেও আমার কোন আপত্তি নেই। তুমি সব শুনে ফেলেছো আব্বা? হ্যাঁ সব শুনে ফেলেছি, চল বাড়ী চল।

আব্বা বাড়ী ফিরে শান্ত মেজাজে, রবিনের মা এই রবিনের মা, আব্বার ডাক শুনেই আম্মা তড়িঘড়ি করে ছুটে আসলো, তোমার টাকা আমিই চুরি করছি, আমার ছেলে করে নাই। যা বলার আমাকেই বলো, আমার ছেলেকে মিছে সন্দেহ করো না। আম্মা হঠাৎ আব্বার এমন নিরব আত্মসমর্পন দেখে বুঝতে পারলেন, নিশ্চয় কোন রহস্য আছে, আম্মা রহস্য বুঝতে পেরে, কিছুক্ষন চুপ করে থেকে, আরে আমারতো টাকা’ই চুরি হয় নাই! কাল খামোখা তোমার সাথে ঝগড়া করেছি! তুমি কিছু মনে করোনা রবিনের বাপ।

আমি নিরবে দাঁড়িয়ে আব্বা আম্মার কান্ড দেখছি… দুজনই আমার ১০০টাকা চুরির দায় ঘাড়ে নিতে চাচ্ছে, আব্বা বলছে টাকা আব্বা নিয়েছে, আম্মা বলছে আম্মার টাকা চুরি হয় নাই। আর আমি ভাবছি, সন্তানের প্রতি মা বাবার ভালোবাসা বুঝি এমনই হয়? সন্তানের প্রতি মা বাবার দায়িত্ব বুঝি এমনই হয়? তাহলে আমি কেনো স্বার্থপরের মত চুপ করে থাকবো? আমার চুরির দায় আমার ঘাড়েই নেয়া উচিৎ। টাকা আমি চুরি করেছি আম্মা আব্বা করে নাই আম্মা, টাকা আমি চুরি করেছি আম্মা।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত