ব্যাকবেঞ্চার

ব্যাকবেঞ্চার

স্কুলে ব্যাকবেঞ্চার হিসেবে পরিচিত তিনজনের মধ্যে আমি একজন। বাকি দু’জন হলো অভ্র আর কাব্য। তিনজনকে একত্রে ব্যাকবেঞ্চার বলে ডাকে সবাই। নামটা ব্যাকবেঞ্চার হওয়ার পেছনকার কারণটা হচ্ছে স্কুলের পিছনের বেঞ্চটা আমাদের তিনজনের দখলেই। নিজেদের ইচ্ছায় পিছনের বেঞ্চ ছাড়া অন্য কোনো বেঞ্চে বসছি কিনা আমার মনে নেই।

যদি ও অন্যান্য শিক্ষকরা আমাদের এড়িয়ে চলে কিন্তু , মাহমুদা ম্যাডাম ছিলাম আমাদের বিরুদ্ধে সদা জাগরুক। ক্লাসে ঢুকেই সবার আগে চলে আসে আমাদের কাছে পড়া নেওয়ার জন্য। তাই, অনেক আগেই ম্যাডামের ক্লাস করা বাদ দিয়ে দিয়েছি। এসব কিছুর পরে ও ম্যাডামকে একটু ভালো লাগত। ঠিক ভালো লাগত বললে চলে না। ম্যাডামের মেয়ে নীলা। আমি, অভ্র, কাব্য তিনজনই তার প্রেমে পাগল। কিন্তু, মেয়ে পাত্তাই দেয় না। নীলাকে নিয়ে আমাদের তিন বন্ধুর মধ্যে প্রায়সময়ই ঝগড়া লেগে থাকত। ম্যাডামের মেয়েকে ভালো লাগে তাই সেইদিক দিয়ে ম্যাডামকে একটু ভালো লাগার অভিনয় করতাম।

সকালবেলা আম্মা ঘুম থেকে তুলে দিয়ে বলল, ‘সাইফ! উঠ।’ আমি চোখ কচলাতে কচলাতে বললাম, ‘মা, আজকে তো শুক্রবার। আরেকটু ঘুমাই।’ মা বললেন, ‘মাহমুদা ম্যাডাম কল দিয়েছিল। তোকে উনার বাসায় যেতে বলেছেন।’ মনে মনে ভয় পেয়ে গেলাম। ম্যাডাম আবার কি ফন্দি করল? বাসায় নিয়ে মারবে না তো? ভয়ে ভীত গলায় বললাম, ‘মা, ম্যাডাম আর কিছু বলেছে?’ ‘হুঁ। আজকে নাকি নীলার জন্মদিন। তোকে সেখানেই যেতে বলেছে।’ বলেই মা চলে গেলেন।

খবরটা শুনে মনের ভিতরটা খুশিতে লাফাচ্ছিল। আহা! আমাকে ইনভাইট করল! মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম, অভ্র, কাব্য কাউকে জানানো যাবেনা। একা একা চলে যাব। যেই ভাবা সেই কাজ। ভালো করে সাজুগুজু করে বের হয়ে পড়লাম নীলাদের বাড়ির উদ্দেশ্যে। দোকান থেকে এক জোড়া ফুল আর একটি ছোট্ট গিফট নিয়ে হাঁটতে লাগলাম। নীলাদের বাড়ির সামনে আসতেই চক্ষু চড়কগাছ। অভ্র দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে ও ফুল আর গিফট। ভ্যাবাচ্যাকা হয়ে আমি তার দিকে চেয়ে আছি আর ও আমার দিকে। হুট করে আবার কাব্যের আগমন। তার হাতে ও ফুল আর গিফট।

তিনজন একসাথে দাঁড়িয়ে আছি। কারো মুখে কোনো কথা নেই। সবার মুখ ফুটে বের হতে চাচ্ছে- ‘তোরা এখানে? আসার আগে আমাকে একটু জানানোর প্রয়োজন মনে করলি না?’ তবে আমাদের সেই পিনপতন নীরবতা ভেঙ্গে গেল ম্যাডামের ডাকে। উপর থেকে ম্যাডাম ডাক দিলেন – ‘তোরা উপরে আয়।” ম্যাডাম, নীলা, নীলার বাবা বসে আছে। আমরা তিনজন সালাম দিয়ে ভিতরে ঢুকলাম। আমাদের বসিয়ে দিয়ে ম্যাডাম ভিতরে চলে যান। লাজুক মার্কা হাসি দিয়ে নীলা ও ভিতরে চলে যায়। আমার মনে প্রশ্ন জাগছে, ক্লাসের এত ছেলে থাকতে ম্যাডাম আমাদের তিনজনকে কেন ডাকল? কিছুতেই প্রশ্নটার উত্তর পেলাম না।

অভ্র আর কাব্য মিলে ফিসফিস করে কি যেন বলছে! একটু দূরে একটি চেয়ারে বসে নীলার বাবা কি যেন লিখছেন। কাছে গিয়ে বুঝতে পারলাম হিসাব মিলাচ্ছেন তিনি। হঠাৎ করে আমার চোখ পড়ে উনার মাথার চকচকে টাকের উপর। বাহ! বেশ সুন্দর। টাকের উপর সরিষার তেল বেয়ে বেয়ে পড়ছে। আমি আস্তে করে হাত লাগিয়ে দিলাম উনার টাকে। কি ভালো অনুভূতি! মনের ভিতর এক অদ্ভূদ আনন্দ অনুভূত হচ্ছে। টাক মাথায় হাত বুলালে এত ভাল লাগে তা আগে জানতাম না। একটু পর লক্ষ্য করলাম অভ্র আর কাব্য ও একই কাজ করতেছে।

অবস্থা খারাপ দেখে আমি সোজা গিয়ে সোফায় বসে পড়লাম। অভ্র আর কাব্য তখনো হাত বুলাচ্ছে। তারপর শুরু হল খেলা। নীলার বাবা তেলে বেগুনে রেগে গিয়ে হাতে থাকা স্কেল দিয়ে লাগিয়ে দিলেন দুই ঘা। ‘ওমাগো’ বলেই তারা দুজন লাফিয়ে উঠল। ভিতর থেকে স্বয়ং ম্যাডাম চলে এলেন। মুখ ভর্তী রাগ। তারপর ও হাঁসিমুখে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি হয়েছে?’ নীলার বাবা সব ঘটনা খুলে বলার পর ম্যাডাম ওদের দিকে তাকিয়ে বললেন- ‘একটু শান্ত হয়ে থাক না বাবা।’

ম্যাডাম হাতে একটা কেক নিয়ে আসছেন। তার সাথে নীলা। নীল রংয়ের একটি শাড়ি পরে আসছে। চোখ দুটো কেমন যেন অদ্ভূদ রকমের হয়ে গেল। সদ্য ফোটে উঠা গোলাপের মত ঠোঁট দুটো। দেখে মনে হল স্বয়ং কোনো পরী। তিনজন মিলে অবাক চোখে তাকিয়ে আছি তার দিকে। কেক কাঁটা হলো। সবাই মিলে নীলাকে কেক খাইয়ে দিচ্ছে আর নীলা আমাদের। কাব্য একটু বেশি খেয়েছে বললে ভুল হবে না। সে যে কত বড় খাদক তার বর্ণনা দিতে গেলে কয়েকটা বড় বড় পুস্তক লিখে ও শেষ হবে না। এক বসায় কয়েকটা মুরগির রোস্ট শেষ করতে তার সময় লাগে খুবই কম।

যাহোক! বেশ ভালোভাবেই কেক কাঁটার পালাটা শেষ হল। ম্যাডাম একটা কাগজ বের করে আমার হাতে ধরিয়ে দিলেন। বললেন- ‘এইটা পড়ে শুনাও সবাইকে।’ আমি খুশিতে গদগদ হয়ে কাগজটা খুললাম। খোলামাত্রই খুশিটা উড়ে পালাল। এই কাগজটা ম্যাডামের হাতে কিভাবে? এইটা তো নীলাকে দিয়েছিলাম। কিছুই মাথায় ঢুকছে না। ম্যাডাম আমার দিকে তাকিয়ে বললেন- ‘কি হলো? পড়।’ আমি উপায়ান্তর না পেয়ে পড়তে শুরু করলাম।

‘প্রিয় গুলুমুলু নীলা, ভালো আছ মনে হয়। আমি কিন্তু একদম ভালো নেই। জান, আমি তোমাকে কত্ত ভালো বাসি? ওই অভ্র আর কাব্য দুইজন তো পুরাই লুইচ্চা। ওরা অনেক মেয়ের সাথে প্রেম করে বেড়ায়। তারা আবার তোমার সাথে ও প্রেম করতে চায়। তুমি তো জান, আমি কত ভালো একটা ছেলে। কোনো মেয়ের সাথে কথা বলা দূরে থাক, কারো দিকে তাকায় ও না, শুধু তুমি ছাড়া। তোমার আম্মুকে একটু বুঝিয়ে বলতে পার না আমার ব্যাপারে? আমাকে মারধর করে তাই উনার ক্লাস করিনা। তুমি বললে কিন্তু মার খেয়ে ও ক্লাস করব। ভালো থেকো। আমাকে ও ভালো থাকার ব্যবস্থা করে দাও।

ইতি
তোমার প্রিয় বাবু,
সাইফ।’

কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে বসে পড়লাম। অভ্র আর কাব্য দুইজন মিলে আমার দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। নীলা ঘোমটা দেওয়া বউয়ের মত লুকিয়ে আছে। ম্যাডাম সেই দাঁড়িয়েই আছে। আমি ধরা পড়া চোরের মত এক পাশে বসে আছি।

আমার চিন্তায় ছাপ ফেলে ম্যাডাম বলে উঠল, ‘তোরা সবাই বস। খাওয়া দাওয়া তো হল। এইবার অঙ্ক করতে বস।’ ম্যাডামের বলতে দেরি হলে ও আমার দৌঁড়াতে দেরি হল না। দরজা খোলা ছিল। সেইদিক দিয়ে সোজা বের হয়ে গেলাম। দরজা বাইরে থেকে লক দিয়ে চলে গেলাম। জানালা দিয়ে দেখলাম কাব্য প্রায় কেঁদে দিচ্ছে। অভ্র ও হাত-পা ছেড়ে দিয়ে বসে রইল। আমি পকেট থেকে কলম আর কাগজ বের করে একটি চিরকুট লিখে জানালা দিয়ে ফেলে দিলাম। তাতে লিখা আছে, ‘ব্যাকবেঞ্চাররা সবসময় ব্যাকবেঞ্চার-ই থাকবে। তারা কখনো ফার্স্টবেঞ্চার হবে না। যতই চেষ্টা করুন না কেন!’

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত