নীড়ে ফেরা পাখিরা

নীড়ে ফেরা পাখিরা

রিনি আর অর্ণি লিভিংরুমের সোফায় আধশোয়া হয়ে আয়েশ করে গল্প করছিলো । মাসুমা রান্না শেষে ডাকতেই অর্ণি উঠে রান্নাঘরে গেলো আর রিনি সামনে রাখা ম্যাগাজিনটা পাতা উল্টে দেখছিলো । বিনোদনের পাতায় এসে মনটা কেমন যেন উদাস হয়ে গেলো রিনি’র । প্রতি যুগে, প্রতিটা জেনারেশন এর সাথে সাথে অন্য সব কিছুও পাল্টে যায় । বিনোদন পাতায় একটা নায়ক, নায়িকাকেও তার চেনা মনে হলো না । সব নতুন মুখ । তাদের সময়ের সব চেনা মুখগুলো কোথায় হারালো কে জানে?

অর্ণি রান্নাঘর থেকে চেঁচিয়ে উঠলো, আপা অর্নবকে নিয়ে ডাইনিং এ চলে আয়, খাবার রেডি । রিনি ম্যাগাজিনটা পাশে রেখে উঠে বসলো । খুলে যাওয়া খোঁপাটা ঠিক করে নিয়ে অর্নবকে ডাকার জন্য অর্ণি’র রুমের দিকে গেলো । দরজার কাছে এসেই রিনি’র মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠলো । এমন দৃশ্য দেখতে হবে, তাও বোনের বাড়িতে এসে, এতোটা রিনি কল্পনাই করেনি । অর্নব অনেকক্ষণ ধরে অর্ণির রুমে বসে গেমস খেলছিলো মোবাইলে । রিনিও নিশ্চিন্ত মনে গল্প করছিলো বোনের সাথে । রিনি দেখলো, অর্নব ওয়ারড্রবের ড্রয়ারে কী যেন খুঁজছে । একটু ঘেঁটেঘুঁটেই তুলে আনলো জিনিসটা! অর্ণির হাতব্যাগ । রিনি মনে মনে প্রার্থনা করছিলো অর্নব যেন ব্যাগটা রেখে দেয় কিন্তু রিনি’র প্রর্থনায় কাজ হলো না ।

ব্যাগের চেইন খুলে দ্রুত হাতে সবকিছু এলোমেলো করতে লাগলো অর্নব । হঠাৎ করেই মুখটা খুশিতে ভরে উঠলো অর্নবের । ব্যাগ থেকে হাত বের করে এনে টাকাগুলো গুনলো অর্নব । এক হাজার টাকার তিনটা নোট । টাকাটা প্যান্টের পকেটে চালান করে দিয়ে ব্যাগের চেইন আটকে আবার জায়গামতো রেখে দিলো সে । ড্রয়ারটা বন্ধ করে ঘুরে দাঁড়াতেই মা’র সাথে চোখাচোখি হয়ে গেলো অর্নবের । রিনি ভেবেছিলো অর্নব হয়তো লজ্জা বা ভয় কিছু একটা পাবে কিন্তু তাকে আরো হতবাক করে দিয়ে ছেলে বললো, কিছু বলবে মা ? কিছুটা ধাতস্থ হয়ে রিনি নিচু গলায় কঠিন স্বরে বললো – টাকাটা এক্ষুনি রেখে দাও যেখান থেকে নিয়েছো সেখানে । তুমি টেনশন কোরো না, খালামনি ধরতেই পারবে না । ব্যাগের মধ্যে একগাদা টাকা । সো চিল মা, চিল ।

রিনি’র মনে হলো কেউ যেন মাথার ঠিক মাঝখানে হাতুড়ি দিয়ে জোরে একটা বাড়ি মারলো । ছেলের বয়স মাত্র তেরো অথচ এই বয়সের একটা বাচ্চা, তার নিজের বাচ্চা তার সাথে কথা বলছে ক্রিমিনালের মতো করে ! নিজের রাগ সামলে অর্নবের কাছে এসে রিনি হাত বাড়িয়ে দিলো – টাকা দাও । সরি মা । আমি তোমাকে টাকা দেই না? বেগারের মতো প্রতিদিন পঞ্চাশ টাকা নিতে আর ভালো লাগে না । আমি বলছি টাকাটা আমাকে দাও । বললাম তো আমার দরকার । রিনি অর্নবের হাতটা চেপে ধরতেই মাসুমা এসে ঢুকলো রুমে – আন্টি খাইতে আসেন, টেবিলে খাবার দিসি । মাসুমার সামনে ছেলেকে আর কিছু বললো না রিনি । অর্নবকে নিয়ে খেতে গেলো ।

অর্নব খাবার দেখে খুব খুশি । তার পছন্দের মোরগ পোলাও রান্না করেছে খালামনি । খালামনিকে তার ভীষণ ভালো লাগে । তাকে যে কত্তো আদর করে খালামনি । এই একটা মানুষই আছে যে তাকে বুঝতে পারে । বাবা-মা তো তাকে একটুও বুঝতে পারে না, সময়ও দেয় না । সে এখন নিজের ইচ্ছে মতো থাকতে চাইছে সেটাও করতে দেয় না । অর্নবকে খাবার তুলে দেয়ার পর অর্নব নিজে আরো একটা রোস্ট পাতে নিয়ে খেতে শুরু করলো । অর্ণি খেয়াল করলো রিনি ভাতের পাশে আলু ভর্তা আর মিষ্টি কুমড়া ভাজি নিয়ে চুপচাপ বসে আছে । একটা ভাতও মুখে দিচ্ছে না । অর্ণি বললো –

আচ্ছা রোমেল ভাই আসলো না কেন বলতো আপা? আমাকে প্রমিস করলো আসবে বলে অথচ দেখ কেমন করে ফাঁকি দিলো । বাবা কীভাবে আসবে বলো তো খালামনি? বাবা মা তো একজন আরেকজনের সাথে কথাই বলে না । কেন তুমি জানো না ? কথা বলে না, একসাথে খায় না , একসাথে ঘুমায় না । অর্নব! ধমকে ওঠে রিনি । আমাকে ধমক দিও না । আমি তোমাদের ভয় পাই না । কথাগুলো বলেই খাওয়ায় মনোযোগ দেয় অর্নব । অর্ণি এতেটুকু বাচ্চার মুখে এমন কথা শুনে বোকার মতো তাকিয়ে থাকে বোনের দিকে । এরপর পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে বলে ওঠে –

আরে না, বাবা-মা কেন কথা বলবে না? তুমি বুঝতে পারোন খালামনি আমি এখন বড় হয়ে গেছি, সব বুঝি । আচ্ছা খেয়ে নাও । কী হলো আপা, খাচ্ছিস না কেন? রিনি কথাটা অর্ণিকে কীভাবে বলবে সেই দ্বিধার মধ্যেই কাটলো কতক্ষণ । তারপর সব দ্বিধা ঝেড়ে বলেই ফেললো – অর্ণি, সরি । কেন আপা, সরি বলছিস কেন? আমার ছেলে তোর ব্যাগ থেকে টাকা চুরি করেছে । কথাটা বলেই কেঁদে ফেললো রিনি । টুইটি এতোক্ষণ সাইকেলে চড়ে পুরো বাড়ি ঘুরছিলো আর মা’র কাছে এসে খাবার খেয়ে যাচ্ছিলো । কথাটা শুনে অবাক চোখে জিজ্ঞেস করলো – ভাইয়া তুমি চোর? আমি না কোনোদিন চোর দেখিনি । অর্ণি টুইটিকে থামিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করে – কীসের কথা বলছিস, কে টাকা চুরি করেছে? টুইটি বললো – মা ভাইয়া তোমার টাকা চুরি করেছে ।

অর্নব বললো, আরে দুর বাদ দাও খালামনি । মা খুব বেশি ফালতু কথা বলে । অর্নব! এটা কেমন কথা? মা’র সাথে এভাবে কথা বলতে হয়? বাবাও তো বলে । বাবা বলে, মা একটা ফালতু মহিলা । ছিঃ তুমি না ভালো ছেলে , এভাবে আর কথা বোলো না । অর্ণি তুই অর্নবের কাছ থেকে টাকাটা নিয়ে নে । অর্নব সোনা তুমি টাকা নিয়েছো? টাকা লাগবে তোমার? আমাকে বলো । অর্নব এতোটুকু লজ্জা না পেয়ে টাকা বের করে টেবিলে রাখে । গুনে দেখ কতো টাকা? রিনি বলে । অর্ণি টাকা নিয়ে রিনি’র দিকে তাকায়, দুই হাজার । বাকিটা বের করে দাও, ধমকে ওঠে রিনি । বিরক্তি নিয়ে টাকাটা বের করে রিনি’র দিকে ছুঁড়ে দেয় অর্নব । অর্ণি বুঝতে পারে অবস্থা সিরিয়াস । খাবার টেবিলে সে আর কোনো অপ্রতিকর ঘটনা চায় না । থমথমে পরিবেশে সবাই খাওয়া শেষ করে । খাওয়া শেষে অর্নব যেয়ে টিভি খুলে কার্টুন দেখতে বসলো ।

অর্ণি হাতের কাজ গুছিয়ে এসে দেখলো রিনি মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে, চোখ দু’টো বোঁজা । কাছে এসে বোনের মাথায় হাত রেখে বললো – আপা, সত্যি করে বলতো তোদের কী হয়েছে? রোমেল ভাইয়ের সাথে কী তোর ঝগড়া হয়েছে? চোয়ালটা শক্ত হয়ে যায় রিনি’র – তোকে একটা কথা বলা হয়নি, আমি আর রোমেলের সাথে থাকবো না । মানে কী ! আমি আর পারছি না অর্ণি । সংসারটা বোধহয় আমার আর করা হবে না । মনোমালিন্য কিছুদিন ধরেই চলছিলো তবে গত দুইমাস ধরে যা হচ্ছে তাতে আর সম্ভব না ঐ লোকের সাথে থাকা যায় না । দুই মাস ! দুই মাসে তোর সাথে আমার অন্তত পঞ্চাশবার ফোনে কথা হয়েছে । একটাবারও কী বলতে পারতি না কী চলছে তোদের মধ্যে?

অর্ণি আমি খুব ধৈর্য্য ধরে ছিলাম । বারবার ভাবছিলাম সব ঠিক হয়ে যাবে । নিজের মতো করে চেষ্টা করছিলাম । এই যে দেখ এতোটুকু একটা বাচ্চা, এই বাচ্চাটাও আমার কথা শোনে না । আমি খুব অবাক হচ্ছি আপা অর্নবের আচরণে । ও না বলে এতগুলো টাকা নেবেই বা কেন ! আমার সংসারে আমার আর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই অর্ণি । স্বামী তার নিজের মতো চলে, এতটুকু বাচ্চা সেও হয়েছে একটা চোর, বাটপার । আপা তুই একটু শান্ত হয়ে বস । আমাকে একটু বলবি কী করে হঠাৎ সব এমন এলোমেলো হয়ে গেলো ?এই ক্লাসে ওঠার পর থেকেই দেখছি ছেলেটা হঠাৎ আরো বেশি বিগড়ে গেছে । কী করেছে অর্নব?

হুটহাট দামী জিনিসের আবদার করে। রোমেলেরও দোষ আছে, চাওয়া মাত্রই কিনে দেয় সব । ওকে চারশো টাকা দিয়ে ঘড়ি কিনে দিয়েছিলাম । একদিন দেখি হাতে অন্য কারো ঘড়ি দিয়ে স্কুল থেকে ফিরেছে । কার ঘড়ি জিজ্ঞেস করতেই বললো, নিহানের কাছ থেকে ধার নিয়েছে একদিনের জন্য । বিনিময়ে নিহানকে পঞ্চাশ টাকা দিয়েছে । ফাস্ট ট্র্যাক এর ঘড়িটা তারও লাগবে । ছেলেকে বকা দিতেই রোমেল উল্টো আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে বললো, কেন, তুমি তোমার কলিগদের দেখানোর জন্য দামী জামা, ব্যাগ কেনো না? ছেলের এটুকু আবদার মেটানোর ক্ষমতা আমার আছে । আমার কোনো নিষেধ রোমেল শুনলোই না । ক্লাস সেভেন এ পড়া বাচ্চাকে তিন হাজার টাকার ঘড়ি কিনে দিল । হাতে এতো দামী ঘড়ি থাকলে যে কোনো বিপদ হতে পারে কিন্তু রোমেল শুনলোই না আমার কথাটা । দিন দিন ছেলের আবদার বাড়ছেই । সেই সাথে আচার-আচরণে কেমন যেন অভদ্র হয়ে যাচ্ছে দিনকে দিন । এই নিয়ে সংসারে নিত্য অশান্তি লেগেই আছে । এখন রোমেল আমার ঘাড়ে পুরো দোষ চাপাতে চায় । আমি নাকি বাচ্চা মানুষ করতে পারিনি । নিজের চাকরী আর ক্যারিয়ার গোছানো নিয়েই ব্যস্ত থেকেছি । তার এখন এক কথা, চাকরী ছেড়ে ছেলে সামলাও । কেন আমি কেন চাকরী ছাড়বো ? অর্নব তো রোমেলের কারণেই নষ্ট হয়েছে ।

টাকাপয়সা কবে থেকে সরানো শুরু করেছে নাকি আজই প্রথম ? ক্লাসে একটা ছেলে আছে, ফারদিন নাম । সে নাকি প্রতিদিন তিন,চারশো টাকা আনে টিফিন খেতে । নিজেও খায়, বন্ধুদেরও খাওয়ায় । অর্নব একদিন রোমেলের কাছে পাঁচশো টাকা চেয়ে বসলো । রোমেল না করাতে মুখের উপর উত্তর দিয়ে দিলো –

টাকা দিতে না পারলে বাবা হয়েছো কেন? বিশ্বাস কর অর্ণি, কথাটা শোনার পর আমার মনে হয়েছিলো, আমার কানে যেন কেউ গরম সীসা ঢেলে দিলো । এরপর থোকে ওকে পঞ্চাশ টাকার বেশি দেই না । এরপর থেকেই দেখি টুকটাক নতুন জিনিসপত্র ওর হাতে । আমিও মাঝে মাঝে দু’চারশো টাকার হিসাব মেলাতে পারি না । কোথায় পেয়েছে জিজ্ঞেস করলেই বলে, নিহান দিয়েছে । শেষে নিহানের মা’কে ফোন করলাম দু’কথা শোনাবার জন্য । ছেলের হাতে কেন এতো টাকা তুলে দেন ওনারা ? নিহানের মা উল্টো আমাকে বললো, ওনার ছেলে কখনো বাসা থেকে টাকা নিয়ে স্কুলে যায় না । এমনকি টিফিন পর্যন্ত বাড়ি থেকে নিয়ে যায় । আমি অর্নবের হাতে এতো টাকা দেই দেখে উনি আমাকে ফোনও করেছেন কয়েকবার কিন্তু অর্নব এটা সেটা বলে আমাকে ফোন দেয়নি । তুই বুঝতে পারছিস, আমার ছেলেটা কোন লেভেলের খারাপ হয়ে গেছে?

আপা একটা কথা বলবো তোকে? কিছু মনে করবি না তো? তোদের নিজেদের যে কিছু সমস্যা আছে সেটা কী বুঝিস ? বাচ্চারা জন্ম থেকে এমন থাকে না । আমাদের দেখেই কিন্তু ওরা শেখে । মনে আছে গত বছর গাড়িটা যখন কিনলি? তোদের আগের গাড়িটা দিয়ে কিন্তু দিব্যি চলে যাচ্ছিলো । রোমেল ভাইয়ের বন্ধু সিজার ভাইয়ের নতুন গাড়ি দেখে তোরা দুজনেই মরমে মরে গেলি । পুরোনো গাড়িতে চড়লে তোদের দু’জনেরই মাথা কাটা যাচ্ছিলো । পুরোনা গাড়িটা বিক্রি করে একগাদা টাকা ব্যাংক লোন নিয়ে নতুন গাড়িটা কিনলি । কেন তোদের অন্যদের সাথে প্রতিযোগিতা করতে হবে ? সিজার ভাইয়ের টাকা আছে উনি কিনেছেন । তোরা কেন নিজেদের যা আছে তা নিয়ে খুশি থাকতে পারিস না? বাচ্চা তো তোদের দেখেই শিখছে । তোরা দু’জন মিলেই বাচ্চাটাকে নষ্ট করেছিস । ভাবছি ওকে কোনো বোর্ডিং স্কুলে পাঠিয়ে দেবো ।খুব ভালো চিন্তা করেছিস । যতটুকু বাকি আছে সেটাও নষ্ট হবে তারপর । বোর্ডিং স্কুলে দিয়ে তুই নিজের দায়িত্ব এড়াতে পারিস না আপা । আমি আর সহ্য করতে পারছি না রে অর্ণি । দুজনের অত্যাচারে আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি ।

তোকে পারতে হবে আপা । বাচ্চাকে দুরে পাঠানোর চিন্তা বাদ দিয়ে সবার আগে নিজের ভেতর জমে থাকা কমপ্লেক্স থেকে বের হয়ে আয় । দিন পাল্টে গেছে আপা । বহু যদুমধু এদিক ওদিক করে পয়সা কামিয়ে লোক দেখানো বাহাদুরি শুরু করেছে । তারা নিজেরা কোত্থেকে উঠে এসেছে সেটা ভুলে যাওয়ার জন্যই দামী গাড়ি, বাড়ি, পোশাক-আশাক এগুলো দিয়ে শো অফ করার চেষ্টা করে । বাচ্চাদের হাতে দামী সব জিনিস তুলে দিয়ে নিজ হাতে বাচ্চা নষ্ট করছে । ওদের দেখে ওদের মতো হতে চাস না আপা । মধ্যবিত্ত জীবনটা হয়তো টানাপোড়েনের কিন্তু শান্তিও তো আছে অনেক । নিজের স্বকীয়তা ভুলে যাস না । তোদের সুখের সংসারটা তোরা নিজের হাতে নষ্ট করছিস । এখনো সময় আছে আপা, অর্নব এখনো ছোট । ওকে সময় দে দুজন মিলে । তোদের দুজনের অবহেলায় আর আদিখ্যেতায় ছেলের আজ এই অবস্থা । আমি রোমেল ভাইকে ফোন করছি । সবাই মিলে বসে একটা সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে । নাবিল কখন ফিরবে? চলে আসবে সন্ধ্যার আগেই ।

অর্ণির জোরাজুরিতে রোমেল বিকেলে এসে হাজির হলো । নাবিল ফিরলো তারও কিছুক্ষণ পর । রোমেল ভাইকে অন্য সময় যেমন হাসিখুশি দেখা যায় আজ তেমনটা দেখা গেলো না । রোমেল রিনি’র সাথে কোনো কথাই বললো না শুধু জানতে চাইলো অর্নব কোথায় ? অর্নব তখন ঘুমিয়ে গেছে অর্ণির রুমে । অর্ণি এরমধ্যেই নাবিলকে ফোনে কিছুটা বলেছে তাই নাবিল ঐ বিষয়ে কোনো কথা বললো না । অর্ণি রিনিকে বলে রেখেছিলো রোমেল এলে যেন হৈচৈ শুরু না করে । ধীরেসুস্থে কথা বলতে হবে অথচ রিনি কথা শুরুই করলো হৈচৈ করে – তোমার ছেলে আমার বোনের বাড়িতে এসে টাকা চুরি করেছে । চোর একটা, চোরের বাচ্চা চোর ।মানে কী! তুমি চোরের বাচ্চা বলছো কাকে আর অর্নব কেন টাকা চুরি করবে ! ধমকে ওঠে রোমেল ।তোমার জন্য নষ্ট হয়েছে অর্নব । ছেলের লোভ বাড়িয়ে দিয়েছো, যা চেয়েছে সাথে সাথে হাজির করেছো । এখন তার চাওয়া পূরণ হচ্ছে না দেখে চুরি শুরু করেছে ।

কী যা তা বলো তুমি? তোমার দায়িত্ব ছেলে মানুষ করা । তুমি সময় দাও বাচ্চাকে? সারাদিন অফিস তারপর অফিস থেকে ফিরে মোবাইল, বন্ধুবান্ধব এগুলো নিয়ে ব্যস্ত থাকলে ঘরে মন বসবে কী করে? কতোবার বলেছি চাকরী ছেড়ে দাও। কয় টাকা পাও চাকরী করে? এই যে অর্ণি চাকরী না করে ঘরসংসার সামলাচ্ছে দেখে ওরা এতো সুখে আছে । বোনকে দেখেও তো কিছু শিখতে পারো ।

রোমেল ভাই আপনাদের দু’জনেরই কিছু ভুল হচ্ছে । বিষয়গুলোকে সব গুলিয়ে ফেলছেন আপনারা দু’জন মিলে । এই যে নিজেদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি, দ্বন্দ্ব বাধিয়ে রেখেছেন, এতে কার লাভ হচ্ছে ? আরো উপরে ওঠার নেশা আপনাকে পেয়ে বসেছে । মধ্যবিত্তের তকমা ঝেড়ে উচ্চবিত্তের কাতারে সামিল হতে চাচ্ছেন । এতোটাই কী সহজ রোমেল ভাই ? আপনি গাড়ি, ফ্ল্যাট পাল্টানোর সাথে সাথে বন্ধুও পাল্টে ফেলেছেন । এখন যাদের সাথে বন্ধুত্ব করেছেন এদের দেখলেই তো কেমন অস্বস্তি লাগে আমার । এরা কেউ আপনার বন্ধু না, এরা আপনার টাকার গন্ধ পেয়ে গেছে । যতোদিন টাকা ঢালতে পারবেন, এরা আপনার পা চাটবে । আর আপার চাকরী ছাড়ার কথা আসছে কেন? যারা চাকরী করে তাদের বাচ্চা কী মানুষ হয় না? আপনি ভাবছেন টাকা দিলেই দায়িত্ব শেষ । ছেলে এমনিতেই মানুষ হয়ে যাবে । অর্নবের বয়ঃসন্ধি কাল শুরু হচ্ছে মাত্র ।

এই সময়ে আপনাদের উচিৎ ওকে আরো বেশি করে সময় দেয়া । যতোক্ষণ বাড়িতে থাকেন, দুজন মিলে ওকে সময় দেন । সাথে নিয়ে টিভি দেখেন, ছাদে যেয়ে একটু খেলাধুলা করেন , ও সারাদিন স্কুলে কী করলো তার গল্প শোনেন, গল্পের ছলে বইখাতাগুলো নিয়ে চেক করেন । খারাপ কিছু দেখলে তাকে ঠান্ডা মাথায় বুঝিয়ে বলেন রোমেল ভাই । আর সবার আগে আপনারা দুজন নিজেদের ঝগড়া মিটিয়ে নেন । আরেকটা কথা বলি আপা , নিজের পরিচয় নিয়ে কখনো লজ্জা পাস না । আমাদেরকে আম্মা আব্বা একটা আদর্শে বড় করেছেন । সেই আদর্শ নিয়ে আমি গর্ব করি আপা । তোমার বোনকে বোঝাও । সংসার ঠিক রাখার দায়িত্ব তার । সে সংসারে মন দিক। বাদ দে অর্ণি । উলু বনে মুক্তা ছড়াচ্ছিস তুই । ওকে কী নাবিলের মতো মনে করেছিস যে তোর কথামতো চলবে?

ভুল বললি আপা । নাবিল আমার কথামতো চলে না । আমরা দু’জন দু’জনকে বুঝতে পারি । আমরা আমাদের এই জীবন নিয়ে অনেক খুশি আছি আপা । আমার যা আছে তা নিয়ে আমি কখনো হীনমন্যতায় ভুগি না । আমার কাছে মনে হয়েছে টুইটিকে সময় দেয়া বেশি প্রয়োজন চাকরী করার চেয়ে । এখানে নাবিল আমাকে কোনোভাবেই ফোর্স করেনি । আমার মনে হয় কী আপা, তোর চাকরী ছাড়ার দরকার নেই কিন্তু বাকী সময়টা অর্নবের জন্য বরাদ্দ রাখ । প্রয়োজন হলে অফিস থেকে ছুটি নে, একমাস-দু’মাস যতো সময় লাগে । এই ছেলেকে আমি আর লাইনে আনতে পারবো না । ও তো তোর কথা খুব শোনে । তুই একবার চেষ্টা করে দেখবি নাকি ওকে তোর কাছে রেখে?

এটাও তোর আরেকটা ভুল চিন্তা । এখন তোদের সবচেয়ে বড় কাজ হচ্ছে অর্নবের সাথে দুরত্ব কমিয়ে আনা । হ্যাঁ প্রথমে হয়তো খুব বেয়াদবি করবে, কোনো কথাই শুনবে না কিন্তু আদর ভালোবাসা দিয়ে ছেলেকে আগের মতো কাছে নিয়ে আয় আপা । রোমেল ভাই, আপনি মাঝে মাঝে নাবিলকে তাচ্ছিল্য করেন, আমি বুঝি । নাবিল কিন্তু কোনোদিন আপনাকে নিয়ে একটাও খারাপ কথা বলে না । ও এগুলো মনে রাখে না । এটা ওর পারিবারিক শিক্ষা । পারিবারিক শিক্ষাটা খুব জরুরি বিষয় । মানুষ এটা সারাজীবন বয়ে বেড়ায় । তাই নিজের জেদ, অহংকার ভুলে নিজেকেও শুধরে নেন আর বাচ্চাটার জীবনটা নষ্ট হওয়া থেকে বাঁচান । সারাক্ষণ বকাঝকা না করে আদর দিয়ে কথা বলেন । দেখবেন আমাদের অর্নব ঠিক বদলে যাবে । রোমেল কোনো কথা বলে না, চুপ করে বসে হাতের তালুতে আঁকিবুঁকি করতে থাকে ।বাড়ি ফিরে এসে ছেলেকে টাকা চুরি নিয়ে আর কোনো কথা বলে না ওরা । নিজেরা ঠিক করে, অর্নবের ভালোর জন্য ওরা নিজেরা আর কোনো ঝগড়া, কোনো খারাপ কথা বলবে না ।

ছেলের পিছে পিছে রুমে ঢোকে রিনি । নিজেই অবাক হয়, কতোদিন পর অর্নবের রুমে ঢুকলো সে । অর্নব পিছে ফিরে মা’কে দেখে বলে ওঠে – আমার রুমে ঢুকছো কেন? কী চাই ? রুমটা খুব এলোমেলো হয়ে আছে । শাহানা একদম খেয়াল করে না । দাঁড়াও আমি তোমার রুমটা গুছিয়ে দেই । না, তুমি আমার কিছুতে হাত দেবে না । তুমি কিছুই পারো না ।

কিছু বলতে যেয়েও নিজেকে সামলে নেয় রিনি । আচ্ছা চলো তাহলে দুজন মিলে গুছিয়ে ফেলি । যেটা আমি পারবো না, তুমি আমাকে দেখিয়ে দিও । মা বকা না দিয়ে এতো সুন্দর করে কথা বলছে দেখে একটু অবাক হয় অর্নব । আর কিছু না বলে দরজা থেকে সরে দাঁড়ায় । রিনি রুমে ঢুকে ব্যস্ত হাতে সবকিছু গোছগাছ করতে থাকে । অর্নব অনিচ্ছা সত্ত্বেও মা’কে এটা ওটা এগিয়ে দেয় । রুম গোছানো হয়ে গেলে রিনি অর্নবের বিছানায় বসে বলে – ইশ তোমার রুমে কী সুন্দর বাতাস আসছে । মনে হচ্ছে আজ এখানেই থেকে যাই । এতো ন্যাকামি কোরো না তো মা । মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে সব । হাত মুঠ করে রাগ আর অপমানটা হজম করে রিনি । নিজেকে বুঝায়, একদিনে সব ঠি হবে না । সময় দিতে হবে ছেলেকে ।

অনেকদিন ছেলের টিফিনের খোঁজ নেয় না রিনি । আজ ইচ্ছে করেই অফিসটা মিস দিলো । অর্নব ঘুম থেকে ওঠার আগে মোরগ পোলাও রান্না করে ফেললো । অর্নব একেবারে তৈরি হয়ে রুম থেকে বের হয় । ডাইনিং টেবিলে এসে মা’কে দেখে অবাক হয়ে বললো – তুমি অফিসে যাওনি? না আজ অফিস ফাঁকি দিলাম । তুমি যেমন মাঝে মাঝে স্কুল ফাঁকি দাও, তেমন । আচ্ছা তাড়াতাড়ি নাস্তা করে নাও । টিফিন বক্স আর ওয়াটার পটটা ব্যাগে ভরে দেই আমি । কীসের টিফিন বক্স! কেন তোমার টিফিন । আমি বাচ্চা না মা । ক্যান্টিন থেকে কিনে খেতে পারি । আহা একদিন নিয়েই দেখো না । তোমার বন্ধুদের জন্যও দিয়েছি । আমার বন্ধুরা আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করবে । নিহান তো সবসময় বাড়ি থেকে টিফিন নিয়ে যায় । আর এখানে তোমার পছন্দের মোরগ পোলাও আছে ।

মোরগ পোলাও শুনে অর্নব আর কোনো কথা বলে না । নাস্তা খেয়ে টিফিন বক্সটা নিয়ে ব্যাগে ভরে । বাড়ি থেকে বের হওয়ার মুখে রিনি দৌড়ে আসে – চলো আমিও যাবো তোমার সাথে । তোমাকে স্কুলে ড্রপ করে দিয়ে ব্যাংকে যাবো একটু । মা তুমি কী আমাকে পাহারা দেয়া শুরু করেছো? রিনি’র মনটা খারাপ হয়ে যায় – আচ্ছা ঠিক আছে তুমি যাও । রাজু তুমি অর্নবকে স্কুলে নামিয়ে দিয়ে বাসায় চলে এসো । মা’র সাথে এভাবে কথা বলাটা ঠিক হয়নি, হঠাৎ মনে হয় অর্নবের । সরি বলতে গিয়েও বলে না । আচ্ছা চলো মা , একই তো রাস্তা । রিনি গাড়িতে উঠে বসে । মা’কে কোনো কথা বলতে না দেখে অর্নব বলে – জানো মা এবারের ছুটিতে ফারদিন, রুদ্র, তাসদিক ওরা সবাই দেশের বাইরে যাচ্ছে ।

তুমি যাবে? চলো আমরাও প্ল্যান করে ফেলি । আমি অফিস থেকে ছুটি নিয়ে নেই । কোথায় যেতে চাও বলো ? কক্সবাজার, রাঙামাটি, সাজেক নাকি নানাবাড়ি? ধ্যাত, মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেলো । এগুলো বেড়ানোর জায়গা হলো! ফারদিনরা আগের ছুটিতে দুবাই গিয়েছিলো । অনেক কিছু আছে দেখার । ওরা বুর্জ খলিফাতেও গিয়েছিলো ।

অর্নব একটা কথা মন দিয়ে শোনো, তোমার বাবা’র ফারদিনের বাবা’র মতো অতো টাকা নেই । ওরা সারা দুনিয়া ঘুরে বেড়াতে পারে । কোনোদিন আমাদের টাকা হলে আমরাও যাবো কিন্তু এখন না । নীলগিরি, সাজেক অনেক সুন্দর জায়গা । আমার কলিগ রুমিন আপা ওনার বাচ্চাদের নিয়ে বেড়িয়ে এসেছে । বাচ্চারা খুব মজা পেয়েছে । আমি ভেবেছিলাম তোমাকে নিয়ে যাবো ।

আমি এইসব ওয়াক মার্কা জায়গায় যাবো না । ঠিক আছে । আর কোনো কথা না বলে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকে রিনি । গাড়ি স্কুলের গেটে এসে থামলে অর্নব নেমে সোজা হেঁটে চলে যায় । রিনি ভেবেছিলো ছেলে একবার ফিরে তাকিয়ে টাটা দেবে । মনটা আবারো খারাপ হয়ে যায় । রাতের খাবারটা এখন তিনজন একসাথে খেতে বসে । খাবার টেবিলে বসে অর্নব বললো – মা তোমার সাজেক না ফাজেক ওটা নাকি অনেক সুন্দর । তিশা আর আরফান ওদের ফ্যামিলির সাথে যাচ্ছে এই ছুটিতে । আচ্ছা । আমি ভাবছিলাম আমরাও যদি ঐ সময়ে যাই তাহলে খুব মজা হবে ।

রোমেল ধমকে ওঠে – কে কোথায় যাচ্ছে? আমার এখন অনেক কাজ । কোনো বেড়া বেড়ি হবে না । আমি জানতাম তো তোমরা যাবে না শুধু শুধু বলার জন্য বলেছো । আমরা যাবো অর্নব । তোমার বাবাও যাবে । রোমেল রিনি’র দিকে তাকাতেই রিনি শান্ত গলায় বলে – অর্নবের ভ্যাকেশনের টাইমে আমরা তিনজন বেড়াতে যাচ্ছি। থ্যাংক ইউ মা, বলেই অর্নব উঠে এসে রিনি’র মাথায় একটা চুমু দেয় । রিনি’র মনটা ভালোলাগায় ভরে ওঠে । কতোদিন পর ছেলের স্পর্শ পেলো সে । রোমেল ছেলেকে তেমন সময় দিতে না পারলেও বকাঝকা করা বন্ধ করেছে । ছেলের সামনে রিনি’র সাথে ঝাগড়াও করে না আর । রিনি এটুকুতেই কৃতজ্ঞ রোমেলের প্রতি ।

নীলগিরিতে যাওয়া উপলক্ষ্যে শপিং করতে এসেছে মা-ছেলে । অর্নব যেটা ভালো লাগছে সেটাই নিতে চাইছে । ব্র্যান্ডের জিনিসের প্রতি খুব ঝোঁক হয়েছে তার । রিনি শুধু বললো, তোমার যদি নিতে মন চায় তুমি নাও । শুধু মনে রেখো জিনিসটা যেন তোমার কাজে লাগে । আর ব্র্যান্ডে কী যায় আসে বাবা ? যেটা আমি পাঁচশো টাকায় পাচ্ছি, সেটা কেন শুধু নামের কারণে ডাবল টাকায় কিনবো? ও আচ্ছা তুমি আমাকে কিনে দেবে না তাহলে ? আমি তো না করিনি । তোমার যদি তারপরও নিতে মন চায় আমার কষ্ট হলেও আমি তোমাকে কিনে দেবো । কী মনে করে অর্নব বলে, ঠিক আছে মা তোমার যেটা ভালো লাগে আমি সেটাই নেবো ।

নীলগিরি গিয়ে দেখা হয় আরো দু’টো পরিবারের সাথে । তিশা আর আরফানের পরিবার । তিশা’রা দুই বোন আর আরফান’রা দুই ভাইবোন । রিনি মুগ্ধ হয়ে যায় বাচ্চাগুলোকে দেখে । ওদের তুলনায় অর্নব যেন একটু বেশিই অন্যরকম, একরোখা, জেদি আর বেয়াদব । তবে রিনি খেয়াল করে বাচ্চাদের সাথে মিশে অর্নবও যেন অনেক বেশি প্রাণবন্ত আর হাসিখুশি ।

রোমেল শুরুতে একটু ভাব নিয়ে থাকলেও অন্যান্য বাচ্চাদের বাবা-মায়ের আন্তরিক কথাবার্তার পর বেশিক্ষণ আর ভাবে থাকতে পারলো না । তিশা আর আরফানের বাবা’র সাথে তুমুল আড্ডা জুড়ে দিলো । অর্নব, তিশা আর আরফান হাত ধরে কোনো একটা প্ল্যান করছে আর ওদের ছোট ভাইবোনগুলো হাততালি দিয়ে যাচ্ছে । হাত ছেড়ে তিশা বললো – মা’কে বলে আসি। মা নাহলে টেনশন করবে । তুমিও আন্টিকে বলে আসো । আরে তাকে বলতে হবে কেন? সে কোনো টেনশন করবে না ।

তুমি কী মা’কে সে বলো ! বড়দের তো সে বলা যায় না, তুমি জানো না অর্নব? বড়দের তিনি বলতে হয় আর মা তো সবচেয়ে বেশি টেনশন করেন আমাদের নিয়ে । তুমি দাঁড়াও আমি মা’কে বলে এক্ষুণি আসছি । বলেই তিশা দৌড়ে মা’র কাছে চলে যায় । আরফানও যেতে যেতে বলে, দোস্ত তুই দাঁড়া, আমিও আম্মুকে বলে আসি । রিনি দেখলো তিশা মা’র কাছে যেয়ে গলা জড়িয়ে ধরে কিছু একটা আবদার করলো তারপর তিশার মা মেয়ের এলোমেলো চুলগুলো ঠিক করে দিতেই তিশা দৌড়ে চলে এলো অর্নবের কাছে । ঘটনাটা দেখে রিনি’র মনটা বিষাদে ভরে ওঠে । এতো চেষ্টা করছে ছেলেটাকে শুধরনোর কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না । এই দুরত্ব কী কখনো ঘুঁচবে ? সে আকাশের দিকে তাকিয়ে মেঘেদের ভেসে যাওয়া দেখতে থাকে ।

দুইদিন থাকার প্ল্যান নিয়ে আসা হয়েছিলো কিন্তু থাকা হলো চারদিন । সবাই মিলে দুটো গাড়ি নিয়ে কক্সবাজার চলে এলো যদিও কক্সবাজার আসার কথা ছিলো না । তিশা’র বাবা জুবায়ের ভাই অমায়িক মানুষ । ওনাদের নিজেদের পারিবারিক বিরাট ব্যবসা । ওনার ভাগে পড়েছে সিরামিক প্রোডাক্ট আর প্রিন্টিং সাইডটা । রিনি খুব অবাক হয়ে লক্ষ্য করছিলো মানুষের সাথে কথা বলা, মানুষকে সন্মান জানানো, বাচ্চাদের সাথে আচরণ সবকিছুর মাঝেই একটা স্নিগ্ধ, মার্জিত ভাব আছে । কোনো রকম হামবড়া ভাব বা অহংবোধের লেশমাত্র নেই । রিনি’র কেবলই মনে হচ্ছিলো, তাদের নিজেদেরই এখনো অনেক কিছু শেখার বাকী । অর্নবের আচরণ আজ তাদের কাছে অসহ্য মনে হচ্ছে অথচ তাদের কারণেই ছেলেটা এমন হয়েছে । এখানে এতো মানুষের মধ্যে এসে বিষয়টা যেন রিনি খুব বেশি করে অনুভব করতে পারছিলো ।

চারটা দিন যেন অর্নবের জীবনটা পাল্টে দিয়ে গেলো, সেই সাথে রিনি আর রোমেলের জীবনটাও । ভেতরে জমে থাকা রাগ, কষ্ট, ভুল বোঝাবুঝি আর জড়তার মেঘ অনেকখানি কেটে গেলো । অর্নব খুব মন দিয়ে লক্ষ্য করছিলো মা-বাবার সঙ্গে বন্ধুদের অন্তরঙ্গতা । অর্নব মা’র আশেপাশে ঘোরাফেরা করছে কিন্তু সংকোচে কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারছে না । রিনি নিজে থেকেই এগিয়ে এলো ছেলের সাথে সম্পর্কটা সহজ করে নিতে । অন্যদের দেখাদেখি তারাও অনেকগুলো ফ্যামিলি ছবি তুললো । রোমেলকে জড়িয়ে ধরে ছবি তুললো, যেমন ছবি তারা তুলেছিলো গতবার কক্সবাজার এসে । রোমেল ছেলেকে নিয়ে স্পীড বোট আর বীচ বাইকে চড়লো । এইসব কিছুর ফাঁকে রিনি খেয়াল করলো , অর্নবের কথা বলার ধরণ অনেকটুকু পাল্টে গেছে ।

রাজু স্টেশনে এসেছে তাদের নিতে । ঢাকায় ফিরে সবাই সবার কাছে থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ির পথে রওনা দিলো । অর্নব হঠাৎ রিনি’র হাতটা ধরে ফিসফিস করে বললো –

সরি মা, আমি অনেক বেয়াদবি করেছি তোমাদের সাথে । আর করবো না । খালামনিকে যেয়ে সরি বলবো । কথাগুলো বলেই অর্নব রিনি’র কাঁধে মাথা রাখলো । রিনি’রও চোখে জল উছলে উঠলো । এই চারদিনের যাত্রা তাদের এলোমেলো জীবনটাকে গুছিয়ে দিয়েছে অনেকখানি । অপরিচিত মানুষগুলো তাদের বড় উপকার করে গেলো । নতুন করে ফিরে পাওয়া জীবনটাকে সে আর হারাতে দেবে না, কিছুতেই না । রোমেল কতখানি পাল্টে গেছে ঠিক বুঝতে না পারলেও রিনি দেখলো রোমেলের মুখেও স্নিগ্ধ একটা হাসি লেগে আছে । দাম্ভিকতার মুখোশটা দেখা যাচ্ছে না আর ।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত