ক্ষত

ক্ষত

রফিক সাহেব অফিসের একটা ইম্পর্ট্যান্ট মিটিং এ। ফরেনার দের সাথে মিটিং। নতুন একটা প্রজেক্ট নিয়ে।এদিকে তার মোবাইলে বারবার কল আসছে। মিটিংয়ের ফাঁকেই একবার ফোনের দিকে তাকিয়ে দেখলেন তাঁর স্ত্রী ফোন করছেন। ৪ নাম্বার কলটা আসার সাথে সাথেই ফোনটা অফ করে দিলেন। মনে মনে একটু রাগও করলেন। মনে মনে ভাবলেন নিশ্চয় তার স্ত্রী বাড়িতে কি কি নেই, কি কি কিনতে হবে এসব ই বলার জন্য ফোন করেছে। কিন্তু অফিস টাইমে কি এসব শুনতে ভালো লাগে?

মিটিং শেষ হতে ৩ ঘন্টা লাগল। এরপর ফোন ওপেন করার কথা ভুলে গেলেন। প্রাইভেট কোম্পানিতে জব। এতো কি আর মনে থাকে? সেদিন অফিসে আর কাজ না থাকায় তিনি অফিসের গাড়ি নিয়েই বাড়ির উদ্দেশ্যে বের হলেন। বাড়ির কাছাকাছি একটা দোকানে গাড়ি দাঁড় করালেন। তারপর দোকান থেকে একটা আইসক্রিমের বক্স কিনে আবার গাড়িতে উঠলেন। অনন্যা আইসক্রিম খেতে খুব ভালবাসে। অনন্যা রফিক সাহেবের একমাত্র মেয়ে। এইবার ক্লাস টেনে পড়ছে। বাবার চোখের মনি। রফিক সাহেবের স্ত্রী রোকেয়া পারভিন আগে চাকুরি করতো। অনন্যার জন্মের পর চাকুরী ছেড়ে দিয়েছে। বাড়িতে পৌঁছে রফিক সাহেবের চোখ কপালে উঠল। চারদিকে সব জিনিসপত্র পোড়া, ছাই। হাত থেকে আইসক্রিমের বক্সটা পড়ে গেল। বুকের ভেতর টা ধ্বক করে উঠল। ঠিক সেই সময়ে পাশের বাসার লতা ভাবী এসে বলল, ভাই আপনি কিছুই জানেননা? ভাবী আপনাকে অনেকবার ফোন করেছে। ভাই এখনি ঢাকা মেডিকেলে যান। ভাই দেরী করবেননা এখনি যান। আপনার মেয়ের অবস্থা ভালো না।

রফিক সাহেবের স্ত্রী বাড়িতে ছিলেননা। পাশের বাড়িতে গিয়েছিলেন কোন একটা কাজে। বাড়িতে ঢুকবে এমন সময়ে খুব জোড়ে বিস্ফোরণের শব্দ। পুরো বাড়ি যেন আগুনে জ্বলছে। রোকেয়া পারভিন চিৎকার করেই জ্ঞান হারালেন। জ্ঞান ফেরার পর দেখলেন আশেপাশের সবাই পানি ছিটিয়ে আগুন নেভাতে ব্যস্ত। তিনি আমার মেয়ে আমার মেয়ে বলে আগুনের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলেন। কিন্তু পাশের বাসার কিছু মহিলা তাকে আটকে রেখে বিভিন্ন স্বান্তনা দিচ্ছিলেন। অবশেষে সকলের প্রচেষ্টার পর অনন্যাকে উদ্ধার করা হল। কিন্তু অনন্যার শরীরের বেশিরভাগ অংশই পুড়ে গিয়েছিল। তারপর তাকে ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। রফিক সাহেব মেডিকেলে পৌঁছাতেই তার স্ত্রী তাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলেন।

– তোমাকে কতবার ফোন করেছি? কি হয়ে গেল এসব? বলনা আমাদের মেয়ে ঠিক হয়ে যাবে? ওর কিচ্ছু হবেনা।। বলনা?
– রোকেয়া শান্ত হও। কিচ্ছু হবেনা আমাদের মেয়ের। আমি আছি তো। দেখ সব ঠিক হয়ে যাবে।
– আমি কেন বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলাম?

কেন? আমার ফুলের মতো মেয়েটা !! ! ও কত কষ্ট পাচ্ছে? কি গো? তুমি পাষাণের মত চুপ করে আছো কি করে? তোমার কি কোন মায়া নেই?  রফিক সাহেব কিছু বলতে পারলেননা। বুঝাতে পারলেননা তাঁর মনের অনুভুতি। তাঁর মনে কি চলছে সেটা একমাত্র মহান আল্লাহপাক আর তিনি নিজেই জানেন। হয়তো নিজের স্ত্রীর মতো একটু কাঁদতে পারলেও শান্তি পেতেন।। এদিকে রোকেয়া পারভিন বার বার বলছেন আমার মেয়েকে ঠিক করে দাও। বলতে বলতেই রোকেয়া পারভিন আবার মূর্ছা গেলেন।

– রফিক সাহেব ডাক্তারের সাথে কথা বলে মেয়েকে দেখতে গেলেন। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারলেননা। অনন্যার মুখটা চেনা যাচ্ছেনা। রফিক সাহেব ডাক্তারকে বললেন যেকোন মূল্যেই আমার মেয়েকে বাঁচিয়ে দিন ডাক্তার। যত টাকা লাগে লাগুক, যা করতে হয় করবো। শুধু আমার মেয়েকে বাঁচিয়ে দিন। বলে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। ডাক্তার জানালেন তাঁদের যতটুকু সম্ভব তাঁরা চেষ্টা করবেন, তবে অনন্যার শরীরের ৮৭% পুড়ে গেছে। তার বাঁচার আশা খুবই কম। তবে সবই আল্লাহর ইচ্ছা। মহান আল্লাহপাক চাইলে সব কিছুই সম্ভব।।তাই আল্লাহকে ডাকুন। ২ দিন পর অনন্যার জ্ঞান ফিরেছে। ওর কষ্ট গুলো যেন রফিক সাহেবের বুকের ভেতরে সুঁচ হয়ে বিধে যাচ্ছে। হঠাৎ অনন্যা বলল বাবা, আমি আর বাঁঁচবোনা তাইনা?

-তুই ভাল হয়ে যাবি মা।। তোর কিছু হবেনা। তোর বাবা আছে তো।
-আমাকে খুব কুৎসিত লাগছে?
-না রে মা, খুব সুন্দর লাগছে। বলতে গিয়ে গলাটা ধরে গেল তাঁর। চোখ পানিতে ছলছল করছে।
– আমার খুব কষ্ট হচ্ছে বাবা।

রফিক সাহেব আর নিজেকে সামলাতে পারলেননা। খুব শব্দ করে কেঁদে উঠলেন। সেই রাতেই অনন্যা মারা গেল।
যেই মানুষটা কোন দিনও কাঁদতে পারতোনা হাজার কষ্টেও সেই মানুষটা এখন ওয়াশরুমে গিয়ে পাগলের মতো চিৎকার করে কাঁদে। কাজের প্রতি যার অনেক বেশী সন্মান আর আকর্ষণ ছিল, তিনি কেমন যেন আর কাজে মনোযোগ দিতে পারেননা।। এদিকে রোকেয়া পারভিন আর কারো সাথে কথা বলেনা। চুপচাপ থাকে। এখন আর কাঁদেওনা। হয়তো বেশী শোকে পাথর হয়ে গেছে।

একটা গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে একটা ফুলের মতো মেয়ে পুড়ে গেছে।। তার সাথে পুড়ে গেছে তার মা বাবার স্বপ্ন। পুড়ে গেছে বাবার মুখের হাসি। আর অন্তরে সৃষ্টি হয়েছে গভীর ক্ষত। কিছু ক্ষত হয়তো কখনোই সারেনা।। সারাজীবনই সেগুলো বয়ে নিয়ে যেতে হয়।।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত