টুকরো গোশতের স্বপ্ন

টুকরো গোশতের স্বপ্ন

“স্যার, আগামী শুক্রবার আমার বাবার চল্লিশা। বাড়িতে তার জন্য দোয়া করাবো। মা আপনাকে অবশ্যই অবশ্যই যেতে বলেছেন! তাছাড়া ভাইয়াও জেলে। আপনি গেলে মা অন্তত ভাইয়ার প্রতিচ্ছবি আপনার মাঝে খুঁজে পাবেন।”

মোটা চশমার ফ্রেমের ফাঁক দিয়ে আড়চোখে ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী শুচির মায়া ভরা মুখের দিকে তাকালাম। তার কাজল মাখা চোখের কোণে অশ্রুবিন্দু জমা হয়েছে। চোখের পলক পরলেই যেন অশ্রুকণা গড়িয়ে পরবে অতি নীরবে, নিঃশব্দে, সযতনে।

শুচি আমার টিউশনের প্রিয় ছাত্রী। মুখে প্রাণখোলা হাসি দিয়ে ছাত্রীকে সম্মতি জানালাম। ও যেন বিশ্বাস করতে পারছিলো না। তার চোখের বাঁধভাঙা অশ্রুপাত আমার হৃদয়ের গভীরটাকে ক্ষত-বিক্ষত করে দিলো। মাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম। যাওয়ার সময় আহ্লাদিত ঢংয়ে আমাকে হুমকিস্বরূপ বললো,” শুক্রবার না গেলে আপনার কাছে আর পড়তেই আসবো না!”

শুচির বাড়ি আমার পাশের এলাকায়। মা ও বড় এক ভাই মিলে তাদের পরিবার। নদীবিধৌত চরাঞ্চালে তাদের বসবাস। নদীর ওপারে ছোট্ট একটা ঝুপড়ি ঘরে মা ও বড় ভাইয়ের সাথে থাকে। গত ডিসেম্বর মাসের শেষের দিকে স্কুল থেকে স্টুডেন্ট কালেকশনে চরে গিয়েছিলাম। সেখান থেকেই তাদের পরিবারের সাথে আমার সখ্যতা গড়ে ওঠে। তার বাবা তখন শয্যাশায়ী ছিলেন। খুপরি ঘরের পাশেই ছোট্ট একটা টং দোকানে তার মা চা বিক্রি করেন। এতেই টেনেটুনে কোনোরকমে খেয়ে না খেয়ে তাদের সংসার চলছে। বাবার চিকিৎসার জন্য উঠানো সাপ্তাহিক কিস্তি তো আছেই। এতোকাল উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশায় তারা চরাঞ্চল ছেড়ে শহরে ছিলো। কিন্তু তার বাবার অসুস্থতা বেশিদিন শহরে টিকতে দেয়নি।

স্টুডেন্ট কালেকশনে গিয়ে শুচির মায়ের টং দোকানে চা খাচ্ছিলাম। শিক্ষকরা মিলে তার মায়ের কাছে স্টুডেন্ট সংগ্রহের জন্য সাহায্য চাইলাম। কথা প্রসঙ্গে জানতে পারলাম, আন্টির মেয়ে (শুচি) শহরে থেকেই পিএসসি পাশ করেছে। আপাতত আর্থিক সমস্যার কারণে লেখাপড়া বন্ধ আছে। আন্টিকে হাজারো অনুনয়-বিনয় করেও তার মেয়েকে আমাদের স্কুলে ভর্তি করানোর জন্য রাজি করাতে পারলাম না। তার লেখাপড়ার যাবতীয় খরচ স্কুল কর্তৃপক্ষ বহন করবে এমন শর্তেও তিনি রাজি হননি। তিনি বললেন, তার স্বামীর চিকিৎসা খরচ যোগানোর জন্য সামনের জানুয়ারিতে মেয়ে ও ছেলেকে শহরে বাসা বাড়িতে কাজ করতে দিবেন। আমরা কেউই আর কথা বাড়াইনি। আমি মেয়েটির পরিবারের সাথে মাঝে মাঝে যোগাযোগ করতাম।

সঠিক পরিচর্যা, পুষ্টিকর খাবার ও প্রয়োজনীয় ওষুধের অভাবে আংকেল মারা গেলেন৷ আমাকে নাকি বলে গেছেন তার ছোট মেয়েটিকে যেন স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেই। কোনো সন্তানকেই তিনি পড়ালেখা করাতে পারেন নি। অন্তত ছোট্ট শুচি যেন পড়ালেখা শিখে প্রকৃত মানুষ হতে পারে। এটা যে তার বড় স্বপ্ন। শুচির পিএসসি’র রেজাল্টে এ+ দেখে আমি আবেগাপ্লুত হয়ে পরলাম। রোল নম্বর নেটে সার্চ করে দেখলাম ও স্কলারশিপও পেয়েছে। আমি আংকেলের কথা রাখলাম। শুচিকে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি করলাম। টিউশনেও পড়াই।

“তোমার ভাইয়া জেলে কেন?” বিষয়টি ছাত্রীর কথার আবেশে ভুলে গিয়েছিলাম। তাছাড়া ওর ভাই কিছুটা মানসিক ভারসাম্যহীন। মনে পরতেই পিছন থেকে তার কাছে জানতে চাইলাম।

>বাবার চল্লিশা ও কুরবানী উপলক্ষ্যে বাড়তি আয়ের আশায় মা ভাইয়াকে দিন ৩০০ টাকা ভাড়ায় অটো ভ্যান এনে দিয়েছিলেন। ভাইয়া (সুমন) গঞ্জ থেকে রুহুল কাকার (এলাকার প্রভাবশালী চেয়ারম্যান) আত্মীয় স্বজনদের তাদের বাসায় ভ্যানে করে পৌঁছে দেন। বাবার চল্লিশায় আপনাকে দাওয়াত করবো জেনে কাকার কাছে কুরবানীর দু’তিন টুকরো গোশত আগে ভাগে চেয়েছিলেন। ভাড়া চাইতে গেলে কাকা অনেক মারধর করেছেন। আত্মীয় স্বজনের সামনে তিনি নাকি অপমানবোধ করেছেন৷ তাই মিথ্যা অযুহাতে তাকে জেলে দিয়েছেন। আপনার টিউশনের ব্যস্ততায় আগে বলার সুযোগ পাইনি।

মেয়েটি চোখ মুছতে মুছতে বাড়ির উদ্দেশ্যে চলে গেলো। আমি তার চলে যাওয়া পথের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। গরুর গোশত আমার অত্যন্ত প্রিয় তা ছাত্রী মনে রেখেছে জেনে নিজেও কয়েকবার চোখ মুছলাম।

আমার বন্ধু এলাকার প্রভাবশালী ছাত্র নেতাকে ফোন করে সুমনের বিষয়ে বললাম। দুজনে মিলে স্থানীয় এমপির শরণাপন্ন হলাম। চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলাম। তিনি বিষয়টি তার উপর ছেড়ে দিতে বললেন। এমপি মহোদয় ঘটনার সত্যতা যাচাই করে সুমনকে ছাড়িয়ে আনলেন।

কোথাও কোমর সমান পানি আবার কোথাও হাঁটু সমান কাঁদা ডিঙিয়ে ছাত্রীর খুপরি ঘরে হাজির হলাম। গঞ্জের ওদিকের পথ কিছুটা ভালো হলেও আমাদের এদিকের পথ যথেষ্ট খারাপ। আংকেলের চল্লিশায় আসাটা আমার দায়িত্ব ও কর্তব্যের মধ্যেই পরে। হুজুর ও নিজেরা ছাড়া তেমন কোনো আত্মীয়স্বজনও আসেনি। দোয়া ও মিলাদের পরে আমাকে ছাত্রীর ভাঙাচোরা টেবিলে একাই খেতে দেওয়া হলো। তরকারী বলতে শুধুই ফার্ম মুরগী। ফার্ম মুরগী খাইনা বলে ঝোলে ভাত মেখে মুখে নিচ্ছিলাম। পরক্ষণেই ছাত্রী ছোট্ট একটা বাটি হতে আমার পাতে তিন টুকরো গরুর গোশত তুলে দিলো। আমি কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়লাম। এটা ছিলো আমার টিউশন জীবনের সেরা অভিজ্ঞতা। শুচি ফিসফিস করে বললো,

–আমরা তো আর কোরবানি দেইনি। শুধুমাত্র একজন প্রতিবেশী তিন টুকরো গোশত ও দুই টুকরো গরুর হাড় দিয়ে গেছেন। হাড়গুলো খাওয়ার অনুপযোগী বলে কুুকুরকে দিয়ে দিয়েছি। গোশত তিন টুকরো আপনার জন্য মা রান্না করে রেখেছেন। আপনি খেয়ে মজা পাবেন। পড়ালেখা শিখে বড় হয়ে যখন কুরবানি দিবো তখন আপনার জন্য এর চেয়েও বেশি গোশতের টুকরো রান্না করবো। মা কয়েকবার তিন টুকরো গোশত দিতে বারণ করেছিলেন। কিন্তু আমি শুনিনি। আপনাকে ভালোবেসে তিন টুকরো গোশত দেওয়া হাজার টুকরো গোশতের চেয়েও কি শ্রেষ্ঠ নয়???

ছাত্রীর কথার ফুলঝুরিতে আমি মুগ্ধ হলাম। তার মাধুর্য মাখা কথার উত্তর দিতে পারলাম না। শুধু শুচির পড়ালেখা শিখে নিজ উপার্জনের টাকায় দেওয়া কুরবানির টুকরো গোশতের স্বপ্নে বিভোর হয়ে রইলাম। তার হাতে দুই হাজার টাকা গুজে দিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে পা বাড়ালাম।

গল্পের বিষয়:
গল্প
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত