সারপ্রাইজ

সারপ্রাইজ

— এই শাহেদ, এই শাহেদ উঠো দেখ অনেক বেলা হয়েছে আর কতক্ষণ এভাবে পড়ে পড়ে ঘুমাবা উঠো বলছি।
— উফফফ রিমি কি হয়েছে হ্যাঁ এভাবে ধাক্কাচ্ছো কেন একটু শান্তি মতো ঘুমাতেও দেবে না নাকি।
— আর কতো ঘুমাবা হুহ বেলা তো অনেক হয়েছে ফ্রেস হবাই বা কখন আর নাস্তাইবা কখন করবা উঠো বলছি।
— রিমি যাও তো এখান থেকে একটু ঘুমাতে দাও। তোমার জ্বালায় দেখি একটু শান্তি মতো ঘুমানোও যাবে না।
— আমার সাথে এমন ভাবে কথা বলছো কেন আগে তো কখনো এভাবে কথা বলতে না। আজ হঠাত্ কি এমন দোষ করলাম যে আমার সাথে এতো রেগে রেগে কথা বলছো।

— কি দোষ করেছো তুমি, এই তুমি এতো ন্যাকামো করো কেন বলতো। আমার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটিয়ে বলছো আমি কি দোষ করেছি।  উফফ কেন যে তোমাকে বিয়ে করতে গেলাম জীবনটাই তেজপাতা হয়ে গেছে।

— তুমি এভাবে কেন বলছো তোমার জীবন তেজপাতা হবে কেন। আর এর আগে কখনো তো সকালে তোমাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তুললে তুমি আমার সাথে এভাবে কথা বলোনি।
— না আমার জীবন তেজপাতা হয়নি আমার জীবনে শান্তিতে ভরে গেছে।

এবার এখানে দাড়িয়ে না থেকে যাও আমার জন্য নাস্তা রেডি করো। এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে, কি হলো যাও।  আমার এমন আচরণে রিমির চোখ দিয়ে তখন অঝোরে পানি পড়ছিল। মুখটাও কালো হয়ে গিয়েছে কারণ ও ভাবতে পারেনি সামান্য একটা কারণে আমি ওর সাথে এতটা খারাপ ব্যবহার করবো।  মেয়াটা কান্না করতে করতে রুম থেকে বের হয়ে গেলো।  আমি জানি ও অনেক বেশি কষ্ট পেয়েছে। ভালোবাসার মানুষের কাছে এমন আচরণ কোন মানুষই প্রত্যাশা করতে পারে না। আমি বিছানা থেকে উঠে ফ্রেস হয়ে তার পর অফিসের জন্য তৈরি হয়ে খাবার টেবিলে গিয়ে বসলাম। আর রিমি মাথাটা নিচু করে নাস্তা সাজাচ্ছিল আর ওর চোখ দিয়ে টিপ টিপ করে পানি পড়ছিল।

— এই যে এভাবে চোখের জল ফেলছো কেন।
—কোই না তো চোখে কি যেন একটা পড়ছে।

তুমি তাড়াতাড়ি খেয়ে অফিসে যাও। নাহলে তোমার অফিসের লেট হয়ে যাবে। আমি ওর কথার জবাব না দিয়ে খাবার খেতে থাকলাম। কিন্তু খাবার খেতে ইচ্ছে করছে না কারণ রিমি কষ্ট পেলে যে আমার খুব কষ্ট হয়। কিন্তু আজ আমি নিজেই ওকে কষ্ট দিয়েছি।

— বলছি একটা কথা বলবো!
— হুম বলো; ও কাপা কন্ঠে বললো;
— আজ অফিসে না গেলে হয় না আজ তো আমাদের; আমি ওকে থামিয়ে দিয়ে বললাম;
— দেখ আমাকে অফিসে যেতে হবে অফিসে আজ অনেক গুরুত্বপূর্ণ মিটিং আছে। হাতটা ধুয়ে বললাম;
— খেয়ে নিও আর আজ লাঞ্চ টাইমে দয়া করে ফোন দিও না আমি গেলাম।

অফিসে আসার পর থেকে কিছুই ভালো লাগছিল না আমার । আপনারা হয়তো ভাবছেন সামান্য একটু ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলার জন্য কেউ তার ভালোবাসার মানুষের সাথে এতোটা খারাপ ব্যবহার করতে পারে। আসলে ব্যাপারটা তা না আমি ওকে ভিশন ভালবাসি।  কিন্তু একটা বিশেষ কারণে আজ আমি ওর সাথে এমন খারাপ ব্যবহার করেছি। কারণটা আপনারা পরে জানতে পারবেন। খুব খারাপ লাগছিল নিজের কাছে।  নিজেকে খুব অপরাধী মনে হচ্ছিল। খুব বিচলিত লাগছিল নিজেকে, মনের মাঝে খুব অস্থিরতা কাজ করছিল।  বার বার রিমির কাঁদো কাঁদো মুখটা আমার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল।  মেয়েটাকে না কাদালেই পারতাম উহহ কিছু ভালো লাগছে না। কেন যে ওর সাথে অমন খারাপ আচরণ করলাম।  জানি পাগলীটা এখন হয়তো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না করছে।

— আসব শাহেদ সাহেব;
— আরে আফজাল ভাই যে আসুন আসুন।
— তা ভাই আজকে অফিসে ঢুকে কারো সাথে কোন প্রকার কথা না বলেই এভাবে রুমে চলে আসলেন। কোন কারণে কি আপনি আপসেট।
— আরে না ভাই আসলে অফিসে আসতে একটু দেরি হয়ে গিয়েছিল তো তাই আর কি।
— কিছু একটা তো হয়েছে যার কারণে আপনাকে এমন মনমরা মনমরা লাগছে, কোন সমস্যা হলে সেয়ার করতে পারেন।
— না ভাই কোন সমস্যা হয় নাই আমি ঠিক আছি।
— আচ্ছা যাই হোক যদি কোন সমস্যা হয় আমাকে বলবেন; আমি আসি তাহলে।

এই বলে আফজাল ভাই চলে গেলেন, আফজাল ভাই খুব মিশুক প্রকৃতির একজন মানুষ। অফিসের কোন কলিগ যদি কোন কারণে আপসেট থাকে তাহলে তিনি বুঝতে পারেন। আর সবার সাথেই উনার খুব ভালো সম্পর্ক। আর আমাকেও খুঁব স্নেহ করেন। আমার খুব খারাপ লাগছিল কিছুতেই মনটাকে শান্ত করতে পারছিলাম না। আর আজকে অফিসে কোন মিটিংও ছিল না ওকে মিথ্যা বলে এসেছি, আমার কোন কাজে মন বসছিল না।  এদিকে লাঞ্চেরও সময় হয়ে এসেছে। ও এখনো খেয়েছি কি না কি করছে। বার বার ফোনের দিকে তাকাচ্ছিলাম কিন্তু ওর নম্বর থেকে কোন কল আসছিল না। আর আসবেই বা কেন আমি তো নিজেই ওকে ফোন দিতে বারন করেছি।  আর স্থির থাকতে পারছিলাম না। তাই অফিস থেকে বের হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। অফিস থেকে বের হওয়ার সময় আফজাল ভাইকে বললাম।

— আফজাল ভাই আমি এখন চলে যাচ্ছি। আপনি বসকে একটু ম্যানেজ কইরেন।

আর আমার কক্ষে টেবিলের উপর একটা ফাইল আছে ওই ফাইলটা একটু চেক করে বসের রুমে পাঠিয়ে দিবেন প্লিজ।

— আচ্ছা ঠিক আছে আপনি কি কথাও যাচ্ছেন।
— জি ভাই একটু আর্জেন্ট কাজ আছে আসি ভাই।

আফিস থেকে বের হয়ে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি বিকেল পাঁচটা বাজে। তার পর একটা রিক্সা নিয়ে শপিং কমপ্লেক্স এর উদ্দেশ্য রওনা দিলাম।  শপিং কমপ্লেক্স পৌছে, একটা শাড়ির দোকানে গেলাম রিমির জন্য একটা শাড়ি কিনবো বলে।  রিমির নীল রং পছন্দ তাই ওর জন্য একটা নীল রং এর শাড়ি খুঁজছিলাম আর পেয়েও গেলাম।  তার পর ওর জন্য কাচের চুড়ি কিনলাম।  এর পর শপিং কমপ্লেক্স থেকে বের হয়ে কেক শপে গেলাম। কারণ আমি কাল একটা কেক অর্ডার দিয়ে রেখেছিলম।  তার পর সব কিছু কেনাকাটা সেরে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।  বাসায় পৌছে দরজার সামনে এসে কলিং বেল চাপলাম কিন্তু রিমি দরজা খুললো না। অন্য দিন হলে প্রথম বার কলিং বেল চাপতেই রিমি দরজা খুলে দিতো।

আবার চাপলাম কিন্তু ওর কোন সারা পেলাম না। তার পর দরজায় ধাক্কা দেই। দরজায় ধাক্কা দিতেই দরজাটা খুলে গেল। তার মানে ও দরজাটা আগেই খুলে রেখেছিল।  ভেতরে ঢুকে ওকে খুঁজতে থাকলাম কিন্তু ওকে কথাও দেখতে পাচ্ছিলাম না।  মেয়েটা অভিমান করে আবার বাপের বাড়ি চলে গেল না তো।  আমার হার্ট বিট বেড়ে যাচ্ছিল তার পর আমি বেডরুমের কাছে যেতেই। রুমের ভেতর থেকে ওর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার আওয়াজ শুনতে পেলাম।  তখন আমার মনটা একটু শান্ত হলো। কিন্তু ওকে আজ আমি অনেক কষ্ট দিয়ে ফেলেছি।  যার জন্য আজ সারাটা দিনই হয়তো ও কান্না করেছে।  আমি তখন ওকে দরজাটা খুলতে বললাম কিন্তু ও কিছুতেই দরজাটা খুললো না এক নাগাড়ে কান্না করেই যাচ্ছিল।  তার পর শাড়ি আর চুড়ি গুলো রুমের সামনে রেখে ছাদে চলে আসলাম।  তার পর পুরো ছাঁদটা মোমবাতি জ্বালিয়ে সাজালাম।

কিছু ব্যাবস্থা আগেই করে রেখেছিলাম এর কিছুই ও জানে না। কারণ আমি ওকে সারপ্রাইজ দিতে চাই। ও ভেবেছে আমি হয়তো আমাদের বিবাহ বার্ষিকীর কথাটা ভুলে গিয়েছি। কেকটা টেবিলের উপর রাখলাম। এর পর ওর ফোনে একটা টেক্সট দিলাম। আমি জানি ও কিছুক্ষণের মধ্যেই ছাঁদে চলে আসবে। পুরো ছাঁদটা মোমবাতির আলোতে আলোকিত হয়ে গেছে।  কিছুক্ষণ পর আমি ছাদে কারো আসার শব্দ শুনতে পেলাম তার মানে রিমি আসছে। রিমি ছাঁদে এসেছে ওর জন্য আনা নীল শাড়িটা পড়ে আর দুই হাতে কাচের চুড়িও পড়েছে।  মোমের আবছা আলোয় ওর মুখেটা আমি দেখতে পাচ্ছিলাম কান্নায় ওর চোখ দুটো ফুলে গিয়েছে। এখনো ওর চোখ দিয়ে পানি পড়ছে।  আমি তখন ধিরে ধিরে ওর কাছে গেলাম । ওর সামনে গিয়ে হাটু গেড়ে বসে এক গুচ্ছ গোলাপ ওর সামনে ধরে বললাম।

— আমি জানি আজ আমি তোমাকে অনেক বেশি কষ্ট দিয়ে ফেলেছি।

আমি জানি আজ আমি তোমার চোখে অনেক পানি ঝরিয়েছি।  এই পাগলী তুমি কি করে ভাবলে যে আমি আজকের দিনটার কথা ভুলে যাবো। তুমি জানো এই দিনটায় আমি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় গিফ্টটা পেয়েছিলাম আর সেটা হলে তুমি। কি ভাবে এই দিনটার কথা ভুলে যাবো বল। এই দিনটাতেই যে তুমি আমার সারাজীবনের সঙ্গী হয়ে আমার ঘরে এসেছিলে। আমি সরি আমি তোমাকে আজ অনেক কাঁদিয়েছি। আসলে আমি তোমাকে সারপ্রাইজ দিতেই এমনটা করেছিলাম।  বিশ্বাস করো তোমাকে কষ্ট দিয়ে আমি একটুও ভালো ছিলাম না।  আমি সরি, তুমি এখন আমাকে যা শাস্তি দিবে আমি মাথা পেতে নিবো। তবুও তুমি আর অভিমান করে থেকো না প্লিজ। আই লাভ ইউ happy marriage anniversary।  ও তখন এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে কান্না করতে থাকল। এমনিতেই পাগলীটা আজ অনেক কান্না করেছে। ওকে আর কান্না করতে দেওয়া যাবে না।

— এই পাগলী আর কান্না করো না। এই আমি কান ধরে উঠ বস করছি আর কখনো এমনটা হবে না।
— আমাকে কষ্ট দিয়ে তো তুমি খুব মজা পাও। আমাকে কাঁদিয়ে তুমি যদি আনন্দ পাও তাহলে আমাকে কাদাবে না কেন এখন থেকে আরো বেশি বেশি কাদাবা বেশি বেশি কষ্ট দিবা।
— আচ্ছা এই আমি তোমাকে প্রমিস করছি আর কোন দিন তোমাকে কষ্ট দিবো না। প্লিজ লক্ষ্মীটি আর কান্না করে না।  আচ্ছা ঠিক আছে এখন তুমি আমাকে যে শাস্তি দিবা আমি মাথা পেতে নিবো।
— হুম তোমাকে আজ আমাকে কষ্ট দেওয়ার শাস্তি পেতেই হবে। আর তা হলো আজ সারারাত এই ছাঁদে বসে আমার সাথে গল্প করতে হবে। আর আমাকে কবিতা আবৃত্তি করে শোনাতে হবে।

— জোহুকুম আমার ভালোবাসার রাজ্যের রাজকুমারী আপনার দেওয়া শাস্তি আমি মাথা পেতে নিলাম।
– তোর বর্ষা চোখে ঝরতে দেব না বৃষ্টি। তুই জাগবি সারারাত  আমি আসব হঠাত্। তোর শুকনো ঠোঁটে  ফোটাবো প্রেমের হাসি। তোকে প্রাণের চেয়ে  বড় বেশি ভালোবাসি,,,ইমরানের বর্ষা চোখে গানটা গেয়ে ওর কপালে আলতো করে একটা চুমু দিলাম। ও তখন অভিমানী কন্ঠে;

— কচু ভালবাসো তুমি আমাকে। যদি ভালবাসতে তাহলে আজ তুমি আমাকে এতটা কষ্ট দিতে পারতে না।
— আমি সরি তো লক্ষ্মীটি সারপ্রাইজ দিতেই তো আমি তোমাকে কষ্ট দিয়ে ফেলেছি।
— আমার এমন সারপ্রাইজ চাই না। যেই সারপ্রাইজ এর জন্য তোমার থেকে আমাকে কষ্ট পেতে হবে।

আমার চাই না এমন সারপ্রাইজ, যেই সারপ্রাইজ তোমার থেকে আমাকে দূরে রাখবে।  আমি শুধু তোমার ভালোবাসা চাই, আমার শুধু তোমাকে চাই।  তুমিই হলে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সারপ্রাইজ, আমার সবকিছু। বলেই ও আবার কান্না করে দিলো। আমি তখন ওর চোখের জল মুখিয়ে দিয়ে বললাম;

— আর কখনো তোমাকে কষ্ট দিবো না, আর কখনো তোমাকে কাঁদাবো না। আজ এখন থেকে অনেক বেশি ভালবাসা দিবো তোমাকে।  অনেক বেশি ভালবাসি তোমাকে। আর অভিমান করে থেকো না প্লিজ। ও তখন একটু মুচকি হেসে;

— মনে থাকে যেন এর পর যদি কোনদিন তুমি আমাকে কষ্ট দাও। তাহলে কিন্তু আমি তোমার থেকে অনেক দূরে চলে যাবো। তখন কিন্তু আমাকে আর ফিরে পাবে না।
— আমার মনে থাকবে, আর এমন অলক্ষ্মণে কথা বলো না প্লিজ, মিষ্টি বৌটা। আমি যে তোমাকে ছাড়া একটা মূহুর্ত কল্পনা করতে পারি না। আচ্ছা

এবার চলো কেকটা কাটি।  তার পর আজ সারাটা রাত দুজনে মিলে গল্প করবো। ওই দোলনাটায় বসে তুমি আমার কাধে মাথা রাখবা। আর আমি তোমাকে কবিতা আবৃত্তি করে শোনাবো। ভালবাসার রাজ্যে হারিয়ে যাবো দুজন। আজ এই রাত এই সময় শুধু তোমার আমার,,,,,,,,,,

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত