গরুদৌড়

গরুদৌড়

আব্বু ফোন দিছে বাড়ির নাম্বারে,বললো, তাওহীদকে তাড়াতাড়ি পাঠিয়ে দাও, গরু কিনছি রশি নিয়া আসতে বইলো আর পারলে কাউরে সাথে কইরা যাতে নিয়া আসে। মার আর কথাটা বলতে হলোনা,আমি যা বোঝার বুঝে গেছি,শুধু বললো রশি নিয়া যাইস আর পারলে কাউকে নিয়া যাইস। আমি মনে মনে বললাম,” যাচ্ছি এক কাউকে আনতে আবার কোন কাউরে নিয়া যাইম সাথে কইরা,কোন কাউকি আমার জন্য বইসা থাকবো” আমি আমার চিরাচায়িত নিয়ম অনুযায়ী একটু দেরী করেই বের হলাম। সময়টা ছিলো বিকালবেলা।আসর আজান তখনো হয়নাই কিন্তু দিনের বেলা যখন থেকে পড়ে আসে সেই অসম্ভব উপভোগ্য মুহুর্তটাতেই গরু বাড়িতে নিয়া আসার উদ্দ্যেশ্যে রওয়ানা দিলাম।

গায়ে রংচটা গেঞ্জি আর পরনে মাটিলাগা তখম।পানি পার হইয়া কাদার রাস্তা দিয়া আনমনে হাটতাছি।দেখি গেরামের মাথায় আইসা পড়ছি,কয়েকটা বন্ধু বইসা আড্ডা দিতাছে,টপিকঃ গাঁয়ের উন্নতি। ঐখান থেকে বেস্টুডারে ডাইকা সাথে কইরা হাটা ধরলাম।বারে বারে জিগাইতাছে কই যাবি,,বললাম ‘আয়না! কাজ আছে’ তারপরেও অন্যান্য সিক্রেট কথার ফাঁকে জিগাইতেছিলো,কইলাম,’বোজছ না?,কই যাইম,মুঞ্চাইলে চইলা যা’
কয় ‘না থাউজ্ঞা সমস্যা নাই,’ আমার প্ল্যান ছিলো দেরী কইরা বেরোইছি গরু নিয়া কতদুর আইসা পড়বো হয়তো,তাই ভালোভাবর যাইনাই।

কতদূর হাটার পর বেস্টু ডায় কইতাছে “এমনে হাটা যাইবো না গাড়ি ল,গালপেন হইলেতো আর হাটতানা’ বাইন্োস,দেহস না ক্যাম্নে আইছি,গফ থাকলে কি এমনে আইতাম? আর আমার যেই অবস্থা, বোজছ না টাকা নাই লগে, টাকা থাকলে কি হাটতাম” আমি কথা শেষ করার আগেই খোঁটা দিয়া কইলো”হ্,তুমি কত টাকা থাকলেই যাইতানে,আমি টাকা দিমনে ” তাও হেটে যাবেনা,, ঐ রুটে গাড়ি কম চলর, তাও দেখলাম একটা আইতাছে,কইলাম ‘দোস, থামাইছ,’ কয়’ তুই থামা,টাকাও আমি দিম্,থামাইমু ও,হুহ্,ওরে কইলাম আমি কইলে থামবো না,আমার যেই বেশ, তাও আমারে থামাইতে কইলো, ভ্যানওয়ালা কাছে আসার আগেই ইশারা দিয়া থামাতে বললাম কিন্তু ঘটনা যা হওয়ার তাই হলো,আমারে দেইখা থামাইলোনা,ইগনোর কইরা সাইড কাইটা চইলা গেলো,

কইলাম’তুই-ই বুঝতে চাইলি না আমার কাছে টাকা নাই,বাট বেটায় ও বুঝলো,কিন্তু মগার ব্যাপার তোরে দেইখা বেটায় ফকির ভাবছে,হাা গরীব”  ঐ ভ্যানওয়ালা আমারে যতবার ভালো ভাবে দেখছে বিদ্যালয়ে যাবার পথে অথবা সাইকেল চড়া অবস্থায় ততোবারেই চোখ নামায়া নিছে,আমি একটা ভোঁতা তাচ্ছ্যিল্যের হাসি দিতাম বুঝিয়ে দেই যে “পোশাক দেখে আর কখনো কোনো মানুষকে বিবেচনা কইরো না’। তারপর হাটার রাস্তায় আর কোনো ভ্যান আসেনাই,মিউচুয়াল ফ্রেন্ডদের প্রেমের কাহিনী শুনতে শুনতে স্পটে পৌছাইয়া গেলাম।। গিয়া দেখি এখনো আব্বা ঐখানে বসে আছে,গরু পাশে বাঁধা।জিজ্ঞেস কইরা হানতে পারলাম,গরু বিক্রেতাদেরই হাটের মাঝে দৌড়ানি দেওয়াইছে, খুবরকষ্টে লাগুর পাইছে গরুর রশি,তাই আর সাহস করেনাই আব্বা ঐটারে আনার জন্য,,

গরু হাতে নিয়াই খাচ্চরটা খোঁচাখুচি শুরু হয়ে গেছে “গরু নিয়া দিমু খাওয়াবিনা কিছু?” কইলাম,” বাড়ি গিয়া খাইছ,চল এহন,যা শুনলাম আমার তো ভয় করতাছে।” “ধুর বেডা, কোনো ব্যাপার না আল্লার রহমত,ভালোভাবে যাইবো,তুই খাওয়া আগে,নইলে….”ওরে আর বলতে দিলাম না,বললাম” থাউজ্ঞা,আর কইছনা,ভালো ভাবে গেলেই ভালো,খাওয়াইতাছি” আব্বার থেকে ১০ টাকা নিয়া বুট ভাজা কিন্না দিলাম,”খাঁ” হাতে একটা লাঠি নিয়া’,ওর সাথে সাথে গরু নিয়া আসতাছি,আমার দিকে গোরাইয়া গোরাইয়া তাকায় বাট ঐরকম কোনো সিনক্রিয়েট করে নাই”

ওদের বাড়ি পর্যন্ত আইসা বলতাছে, এবার যাইতে পারবি একা?” আমি অসম্মতি জানালে, ও বাড়ি পর্যন্ত এনে বেধে দিয়ে যায়। তারপর,, ও আবার আড্ডার দিকে চলে যায়,আব্বা আর সেজু ভাই মোটামুটি সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত ভালোভাবে সামলায়।খুব ঠান্ডা গরু,তুলনাই হয়না,।আমার এতক্ষনে মোটামুটি একটা বিশ্বাস তৈরী হইছে গরুটার প্রতি,যদিও এখনো গোরাইয়া গোরাইয়া তাকায়।  সন্ধ্যার আগে আব্বা চলে গেলো নামাযে, বাড়ির উত্তর পাশে বান্ধ্যা ছিলো গরু,আমারে আব্বা সতর্ক করে গেছে যাতে না সরাতে যাই গরু,।ভাইয়াও নামাজে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

উত্তর পাশে মশা কামড়াচ্ছে গরুটারে, ভাবলাম বাড়িতে নিয়া যাই,মাত্র তিন-চার নল জায়গা মাত্র। তাও যেই জায়গায় বাধব সেইখানে গিয়া রাস্তা অফ, একবার গোয়ালের দিকে নিতে পারলে আর সমস্যা নাই।তবে একখান সমস্যা আছে যেইখান থেকে নিবো সেখান দিয়ে দুইদিকে যাওয়া যায়।আমি বেড় দিয়ে রাখার সিন্ধান্ত নিয়ে যেইদিকে গরু যাবে তার বিপরীত দাড়ালাম,যাতে ঐদিকে গরু না যায়।কিন্তু হইলে যা,ভাবছিলাম তার বিপরীত,ও আমাকে ঘায়েল করার জন্য আমার দিকেই আসলো।পথ ছাড়লাম না,গুতো দিলো,তাল সামলাতে হালকা বামে সরে গেলাম।টাল সামলানোর আগেই ছুট দিলো ঐটা।যাওয়ার রাস্তাটা প্রায় এলোমেলো (S)আকৃতির।

যেখান দিয়া যেখান দিয়া আসছিলো, সেইখান দিয়ে সেইখান দিয়ে ম্যাপ করে যাইতেছে,হাত থেকে একবার রশি ছুটে গেছিলো কিন্তু ঘরের কোনায় বেধে যায়,ধরছিও তাও শেষ রক্ষা হয়নি,আবারো ছুট দেয়।দৌড়ায় আর গতি বাড়ায়।কতক্ষন দৌড়ালাম, থামাতে পারিনা,দৌড়ের উপর হাতে আরেকটা প্যাচ বাড়ালাম রশির, ভাবছি শয়তানটার গলায় টান লাগবে,কিন্তু গরু পালতেও যে অভিজ্ঞতা লাগে তা আমার কচি মাথায় ধরে নাই,অবশ্য নারকেলের মতো কিছু মাথা চারপাশ দিয়ে দৌড়িয়ে যাচ্ছিলো আর বুদ্ধি দিতেছিলো।হাতে আরো একটা প্যাঁচ বাড়াতে বাড়াতে হাটু গেড়ে বসে গাছের সাথে ইউটার্ন প্যা দিয়ে ফেললাম। গরুটা হালকা থমকে দাড়ালো।বর্তমানের এডিস মশা যেমন এরোসলে হালকা থেমে যায় ঐরকমই,আবার হ্যাঁচকা টান দিয়ে দৌড় দিলো,আমি গাছের সাথে পাতলুর মতো ঘুল্লা দিয়ে পড়ে গেলাম।এবার আর দাড়ানো কিংবা বসা নয় ডাইরেক্ট শুয়ে পড়ছি টাল সামরাতে না পেরে।

আগে হাতে দুইপ্যাঁচ দেওয়ায় যেরকম শক্তি পাইছিলাম, তেমনি এখন ঐগুলা আমরে প্যাচ বাজাচ্ছে।শোয়া অবস্থায় কাদার মধ্য দিয়ে মই এর মতো টানতেছে,ঐটাই সবচেয়ে বিপদের মুহুর্ত ছিলো।ওর চেনা রাস্তা ধরে ও দৌড়াইতেই আছে, থমার নাম নেই,বেস্টুগো বাড়িও পার হয়ে গেছি।যেনো আমি কোনো সার্কাস দেখাচ্ছি,বেটা মানুষ সন্ধ্যার টাইম তেমন বাড়িতে নেই আর মহিলারা বিনা পয়সায় সার্কাস দেখতেছে।কারো গরুর সামনে গিয়ে গরু থামানোর নাম নেই,হয়তো সাহসও নেই।কিভাবেই বা হবে এরকম অবস্থায কাউরে কারো মতো টানতে দেখলে।

এতক্ষনে কোনো মতে হাত থেকে রশি ছুটাইছি তারপর পাঁচ সেকেন্ড ভয়াবহতম তিন মিনিটের কথা ভাবছি,দেখি চেনা রাস্তা ধরে অরেকদূর চলে গেছে আবার পিছনে দে ছুট।। সামনে এক কাকিমা দেখি গরুর রাস্তা আটকাইছে(গরু পালার অভ্যাস আছে তার,এতক্ষনের যুদ্ধে গরুটাও কিছুটা দুর্বল হইছে,কাকি গল্পটা দেখবেনা তাও কাকিরে একটা থ্যাংকস)।

ও অন্যদিকে মোড় নিলো।না আমার দিকে,না ওর চেনা রাস্তায়।এক বাড়ির মধ্যখান দিয়ে প্রবেশ করে ডোবার মাঝের চিকন রাস্তা দিয়ে পশ্চিম চকে নেমে গেছে,এতো নোঙরা পানি ঐখানে যে কেউ সাড়ে সাতান্ন টাকার স্মারক নোট দিয়ে নামতে বললেও আমার ঐখানে নামার কথা না।ওর পিছু পিছু ছুটলাম।

ওরে হারাইয়া ফেলার ভয়ে শরীর কাপতেছিলো,হিতাহিতো জ্ঞান কাজ করতেছিলোনা।গায়ের শার্ট আর পরনের লুঙ্গি ছিড়ার পর জন্মের আগ থেকে যে জামা গায় দেয়া তাও যে কয়েক জায়গা দিয়ে ফুটো আর ছিড়ে যাচ্ছে অনেক জায়গা দিয়ে, তা টের নাই।রক্ত ছোপ ছোপ হয়ে ছিলো পায়ের বিভিন্ন জায়গায়।এবার একটু ভাবার চেষ্টা করলাম আর আল্লার রহমত প্রার্থনা করলাম।

ও ধানক্ষেতের এক আইল দিয়ে হেটে গন্তব্যবিহীনভাবে আগাইতেছে তবে দৌড়াচ্ছে না।এতক্ষনে দেখি খুজে খুজে সেজো ভাইও রশি নিয়ে এসে ডাকতেছে।আমি সাড়া না দিয়ে হুতি(নিচু) হয়ে গেরিলাদের মতো ধানক্ষেতের অন্য আইল দিয়ে এগুলাম,একটু দ্রুত ওকে পাড়ি দিয়ে একটা ধৈঞ্চা ভেঙ্গে ওর সামনে দাড়ালাম আর দৌড়ানি দিলাম।ও ভয় পেয়ে পিছু হটলো।ও ও হয়তো চিনতে পারেনাই আমারে,কাদামাটি মেখে চেহারা কিম্ভুতকিমাকার হয়ে ছিলে, চোক দুটুও ডিমাকার হইয়া ছিলো রাগে, ।চিনলো হয়তো আবার দৌড়ানি খেতাম ভাবতো আর হাসতো ওরে না এতক্ষন আমি দৌড়াইলাম।ধরা পড়ার পর অবশ্য হয়তো ভাবছে, “কেনো ওরে শেষে ভয় পাইলাম!”।

হালকা পানির ভিতর দিয়ে ওরে লাঠি হাতে দৌড়াইতেছি,দৌড়াতে দৌড়াতে যে ডোবার পাশ দিয়া আসছিলাম সেই রাস্তা খুজে না পেয়ে আল্লার রহমতে ডোবায় পরে যায়।আর সেজো ভাই টের পেয়ে এসে গলায় রশি টাইট করে বেধে ফেলে।।বেশি পানিতে পরে যাওয়ায় গরুটার শক্তি হ্রাস পায়, তাই কিছু ঝামেলা করতে পারেনাই আল্লাহর অশেষ রহমতে। তারপর দুই ভাই টেনে তুলে সাবধানে বাড়িতে নিয়ে আসি। “২৫ মিনিটের তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে এসে দেখি তিনটা মিসাইল পা’টা চিড়ে ফেলছে,তারপর গোসল সেড়ে ‘নিজস্ব মেডিকেল’ এ ভর্তি হই” ঘটনাটা আজীবন মনে থাকবে, “২৫ মিনিটের কালো অধ্যায়”

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত