লাকি টুয়েন্টি ওয়ান

লাকি টুয়েন্টি ওয়ান

আমার ২১ দিনের গফ আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। সেই খুশীতে আমি পার্টি দেব। ফেবুতে কয়েকজনকে ট্যাগ মেরে পোস্ট দিয়ে ফেললাম সাথে সাথে। সবাইকে পার্টিতে দাওয়াতও দিলাম। খানিক বাদে যখন আমার নটিতে লাগাতার কম্পন অনুভব করলাম পোস্টে গিয়ে দেখি লাকি কমেন্ট বক্সে বোমা বর্ষণ শুরু করেছে! লাকি আমার সেই ২১ দিনের গফ। তার সাথে ব্রেকাপ হওয়ার পর সে নিজে আমাকে ব্লক মারে। কিন্তু তার ফেক আইডিটা থেকে যায়। আমার মনেই ছিলো না এই আইডিটার কথা। খুশির ঠেলায় কখন যে গফের ফেক আইডিকেও ট্যাগ মেরে ফেলেছি খেয়াল করি নি। তার আইডি নেম, Lucky 21। ঘটনা চক্রে ট্যাগও দিয়েছি ২১ জনকে।

তাকে যেদিন প্রপোজ করি সেদিন ২১ তারিখ ছিলো। তাকে ২১ টা লাল গোলাপ নিয়ে তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে প্রপোজ করি। আগেই জেনেছিলাম ২১ সংখ্যাটা তার জন্য লাকি। তাকে পেয়ে আমিও সেদিন নিজেকে লাকি মনে করেছিলাম। খুশির ঠেলায় ২১ সংখ্যার প্রতি আমার ভাব হয় নি। বরং আমার প্রাক্তন লাকির উচ্চ এবং নিম্ন চাপে পড়ে ২১ সংখ্যাটাকে সব জাগায় ফলাতে হয়েছে।

প্রথম দিন তাকে একুশটা গোলাপ দিতে হয়েছে। গোলাপ কিনতে গেছিলাম শাহবাগ। আমার সাথে ছিলো আমার চার পাঁচজন বন্ধু। পাঁচজনকে পাঁচ জায়গায় পাঠালাম, দরদাম করে কম টাকায় আনার জন্য। সেদিন শুক্রবার থাকায় ফুলের মার্কেটে আগুন ছিলো। প্রথমেই দাম চাইলো, বিশ টাকা পিছ। আমরা ঝাড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে বললাম, ৩ টাকা করে পাওয়া যায় মিয়া। কীসব বলেন না বলেন, যান নেব না আপনার গোলাপ। এরপর দ্বিতীয় রাউন্ড দিতে গিয়ে বাঁশ খেলাম। সব জায়গায় ৫০ টাকা করে পিছ চায়। কয়েক জায়গায় বিক্রি হয়ে যাওয়াতে আর আমাদের পাঁচজন ঘুরেফিরে ২১ টা গোলাপের দাম জিজ্ঞেস করায় সবাই ভেবেছে আজ বিশেষ দিন। ২১ সংখ্যাটার গুরুত্ব বেড়ে গেল। এক জায়গায় ২০টা ৩০ টাকা করে রাখবে। ২১ টা নিলে ৪০ করে দিতে হবে।

এহেন মুহূর্তে বারবার ফোন দিয়ে বিরক্ত করছিল লাকি। মেজাজ তখন গরম হয়ে গেছিল। যাইহোক ৪০ টাকা করে ২১টা গোলাপ এনে তাকে প্রপোজ করেছিলাম। এর দুদিন পর ছিলো ওর জন্মদিন। অনলাইনে ভ্যানিটি ব্যাগের কালেকশন দেখেছি। বাজেট ছিলো ২ হাজার টাকা। ভাবছিলাম, আরো কম টাকায় সেরে ফেলতে পারবো। সেদিন মার্কেটে নিয়ে ২১০০০ টাকার শপিং করলো। অথচ আমার পকেটে সর্বসাকুল্যে ছিলো ২১০০ টাকা। ২০০০ ওর জন্য গিফটের টাকা। বাকি ১০০ ভাড়া। শপিং শেষ হলে সবগুলো ব্যাগ আমার উপর একপ্রকায় ছুড়ে মেরে ইমার্জেন্সি কলের দোহাই দিয়ে ভাগল।

সেদিন বন্ধুদের ফোন দিয়ে ট্রীট দেব এই কথা বলে নিয়ে আসলাম। সবাইকে বললাম বড় পার্টি দেব, সুতরাং এতো টাকা আমার কাছে হবে না। তারা যেন ধার দেয় সোজন্য টাকা আনতে বলেছি। যদি জানতো আমার এই করুন দশা তাহলে হারামিগুলো একটাও আসতো না। যাইহোক সেদিন বড় বাঁচা বেঁচে গেলাম। সবে বাঁশ খাওয়া শুরু হয়েছে। প্রতিবার বাঁশ খেতাম আর প্রতিজ্ঞা করতাম আর জীবনেও প্রেম করব না।

এরপর ওর জন্য কখনো কিছু গিফট কিনতে হলে ২১০০ টাকার নিচে কিছু কেনা যাবে না। একবার কয়েকশো টাকার চকলেট নিয়ে গেছি সে খাবে না। মিঠাই থেকে দামী চকলেট কেন নিলাম না। নিম্নে ২১ শ টাকা বিল হতে হবে এটা তার প্রধান শর্ত। একদিন দেখি ওর কভারে গুলুমুলু লেখে এক ছেলের ফটো আপলোড দিয়েছে। ঐ ছেলে লাভ ইউ জানু লিখেছে। অনেক ছেলে হিংসায় জ্বলে যাওয়া কমেন্ট করেছে। তাকে জিজ্ঞেস করলাম এগুলো কী? সে বললো, এরা আমার বন্ধু। আমিও সেই ছেলেকে জিজ্ঞেস করলাম তুমি লাকির কী হও? সে বললো, বন্ধু হই।

আমাকেও লাকি বললো, দেখো কখনো আমাকে জিএফ বলবে না। আমরা যে রিলেশন করি আমার ফ্যামিলি জানলে প্রবলেম হবে। ওর দিকে তাকিয়ে এটাও মেনে নিলাম। গুলুমুলু পোলার ফটো একদিন ছিলো কভারে। সেই ছেলে আমাকে জিজ্ঞেস করে তোমার কী হয় লাকি? আমি বাধ্য হয়েছিলাম তাকে বোন ডাকতে। বলেছি লাকি আমার বোন হয়। এরপর এভাবে আরো অনেক ছেলের ফটো কভারে দিয়ে জানু সোনা সাথে কিস দিয়ে কভার দেয়। আমাকে ডাকতো লাল মিয়া। আরেকজনকে সোনা মিয়া। এভাবে গুনে দেখলাম ২১ জনকে কভার দিছে। সবার শেষে ছিলাম আমি। ২১ নম্বরে।

এরই মাঝে কুরবানীর ঈদ আসে। সে বলে হাটে যাবে। হাটে গিয়ে গরু দেখবে। আর আমি নাকি ওর জন্য লাকি। সব কাজে আমাকে চাই তার। যেদিন যাওয়ার কথা সেদিন ওর পেট ব্যথা শুরু হয়। তখন আমাকে একা পাঠায় গরুর হাটে। ২১ টা গরুর সাথে সেলফি তুলে তাকে সেন্ড করতে বলে। সাথে সাথে প্রতিটা গরুর দাম এবং বিক্রেতার ইন্টারভিউ নিতে হবে। সেদিন আমার নিজেকে সাংবাদিক সাংবাদিক মনে হচ্ছিলো। দুঃখ একটাই সেলফি তুলতে গিয়ে গুঁতো খেয়েছি গরুর কয়েকবার।

তারপর হাটে সেলফি উইথ গরু অভিযান শেষে যখন বাড়ি ফিরেছি তখন নিজেকে গাজি মনে হচ্ছিলো। মরলে তো শহীদ ই হয়ে যেতাম। সারা শরীর কাদা আর গোবরে মাখামাখি ছিলো। বাসায় যখন ঢুকি সন্ধ্যায় তখন ভূত বলে ঝাড়ু নিয়ে দৌড়ানি দিয়েছিলো আম্মু। অনেক কষ্টে আম্মুকে বুঝিয়ে বাসায় ঢুকে দে এক ঘুম। ঘুম থেকে উঠে মেসেজে লাকির খিস্তি শুনে মেজাজ বিগড়ে গেলো। তার অভিযোগ, সেলফি তোলার সময় আমার মুখ কোনটায় পাউট করা আবার কোনটা পাউট করা না। তবে সমস্যা সেখানে না। সমস্যা হলো, কেন একটা সেলফিতেও কোন গরুর মুখ পাউট করা নেই। গরু ব্যাপারীদের সাহায্য নিলে নাকি গরুর পাউট করা সেলফি পাওয়া যেত। এক সপ্তাহ পর একদিন তাড়াতাড়ি করে ও বের হতে বললো। পার্কে আমার সাথে নাকি প্রেম করবে। প্রেমের ছলে রোমান্টিক এক মুহূর্তে বললো তার লাখ খানেক টাকা লাগবে। ওর বাবা অসুস্থ। অনেক টাকার প্রয়োজন। আমি শুনেও না শোনার ভান করে ওর হাতে চুমো খেলাম। ও বলেই যাচ্ছে, বলেই যাচ্ছে। একসময় আবেগের চোটে মানবতার খাতিরে হ্যাঁ বলে দিলাম। কিন্তু টাকা পাব কই নিশ্চিত ছিলাম না। এরপর ও আরো বললো, এক লাখ তো দেবেই সাথে ২১ হাজার টাকাও দিও। জানোই তো, ২১ আমার লাকি সংখ্যা।

মনটা খারাপ হয়ে গেল আমার। আঙ্কেলের জন্য খারাপ লাগছিলো। তাকে দেখতে যাব বলায় ও বলে যেতে হবে না প্রবলেম হতে পারে উল্টো। বাড়ি ভাড়ার টাকাটা পকেট থেকে বের করে দেখি বিশ হাজার আছে। আরো এক হাজার মিলিয়ে ২১ হাজার দিয়ে নিজের মন শান্ত করলাম। বাসায় এসে টেনশনে পড়ে গেলাম। আমরা থাকি ব্যাচেলর বাসায়। বাড়ি ভাড়া তো দিয়ে দিলাম এখন কিভাবে টাকা ম্যানেজ করি। সাথে সাথে ভাইকে ইমুতে কল দিলাম। বুঝিয়ে বললাম আমি টুকটাক ব্যবসা শুরু করছি। একথা শুনে ভাইয়া খুব খুশি হলেন। দেশে থেকেও কুয়েত প্রবাসী ভাইয়ের চোখে আনন্দাশ্রু দেখতে পাচ্ছিলাম কল্পনায়। পরদিন টাকা ওর ব্যাংক একাউন্টে চলে গেলো।

হপ্তা দুয়েক পরের ঘটনা। আমি একটা কাজে কাকরাইল গেছিলাম। প্রচণ্ড গরমে সেদ্ধ হয়ে যাচ্ছিলাম। তখন ভাবলাম রমনা পার্কের ভেতরে গিয়ে গাছের ছায়ায় বসি। বাতাস ভালো ছিলো সেখানে। ঢুকে আয়েশ করে বসলাম লেকের ধারে একটা গাছের ছায়ায়। গুল্ডিফে টান দিয়ে হাওয়া খাচ্ছিলাম। হঠাৎ ক্ষীণ স্বরে পরিচিত কণ্ঠেের খিলখিল আওয়াজ শুনে অবাক হলাম। আমার বাঁ দিকে তাকিয়ে দেখি একটা ঝোপের পাশে বসে আমার গফ লাকি আরেকটা ছেলের সাথে চিপকায় আছে। আমি উঠলাম। কাছে গিয়ে নিশ্চিত হলাম, মেয়েটা লাকি আর ছেলেটা গুলুমুলু সেই কভার বয়।

সেই অবস্থায় গিয়ে ঠাস করে চড় বসিয়ে দিলাম লাকির গালে। ব্রেকাপ করে চলে আসলাম। এরপর আমি ওর সব কভার বয়দের কাছে ইনকোয়ারি করে জানতে পারলাম আমাকে নিয়ে ওর বফ ছিলে ২১ টা। ওর নাম্বার কয়েকটা ছিলো। টুকটাক ব্যবসা করতো তাই বিজি থাকলে কেউ কিছু বলতো না। বিউটি পার্লারের ব্যবসাও ছিলো ওর। এই প্রবলেম সেই প্রবলেম বলে টাকাটা নিয়েছিলো। পরে দিয়ে দিবে বলেছিল।

যাইহোক যেদিন ব্রেকাপ হয় সেদিন রিলেশনের ২১ তম দিন ছিলো। একদিকে খুশী ছিলাম অন্য দিকে জ্বলছিলাম। যাইহোক ফ্রেন্ডদের নিয়ে রেস্টুরেন্টে যাব ঠিক করলাম। ওরা বললো নতুন একটা রেস্টুরেন্ট হয়েছে আশেপাশে। মান নাকি খুবই ভালো। ব্রেকাপ পার্টিতে আমাকে কালো স্যুট টাই পড়িয়ে দিলো ওরা। যেন শোক দিবস পালন করছি। তো রেস্টুরেন্টের সামনে এসে চমকে গেলাম। রেস্টুরেন্টের সামনে উপরে বড় করে সাইনবোর্ডে লেখা “Lucky 21 Restaurant & coffee Shop ” আমি তো বেহুঁশ। তারপরও ভাবলাম মনে হয় ব্যাপারটা কাকতালীয়। প্রথমেই আমি ওয়াশরুমে গেলাম ফ্রেশ হতে। গিয়ে আবার টাস্কি খাওয়ার পালা। লাকির গুলুমুলু সেই কভার বয় যাকে লাকির সাথে লাস্ট রমনা পার্কে চুম্বনরত অবস্থায় দেখেছিলাম।

তাকে খুব উত্তেজিত মনে হচ্ছিল। আমাকে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠলো। আমি এড়িয়ে যাচ্ছিলাম বাট সেধে এসে বললো ভাই আপনাকে অনেক খুঁজেছিলাম, পাই নি। যাইহোক আপনি কেন এখনে। তাকে আমার ব্রেকাপ পার্টির কথা জানিয়ে তাকেও দাওয়াত দিলাম। ঐ পোলা বললো, ভাই এখন শোক মানানোর সময় না। এখন রিভেঞ্জ নেয়ার সময়। এই রেস্টুরেন্টটা লাকির। ওর বয়ফ্রেন্ড ছিলো ২১ জন। সবার কাছ থেকে ১ লক্ষ ২১ হাজার করে নিয়েছে বাবার অসুস্থতার কথা বলে। অথচ আঙ্কেল দিব্যি সুস্থ আছেন। আমি শিওর আপনিও তাকে টাকা দিয়েছেন। এখন আমরা ২০ জন আশেপাশে আছি্ আপনি সহ ২১ জন হলাম।

এরপর সে প্ল্যান শোনালো লাকিকে অপমান করে ভিডিও করে ফেসবুকে ভাইরাল করবে। আমি সাথে সাথে নাকচ করে দিলাম এই প্ল্যান। তাকে সুন্দর একটা আইডিয়া দিলাম। আমার ফ্রেন্ডদেরকেও তৈরি হয়ে যেতে বললাম। তারা জানালো ঘণ্টা খানেকের মধ্যে রেডি হয়ে আসছে। ঘণ্টা খানেক বাদে আমার ফ্রেন্ড সালমান আর আদনান পুলিশের পোশাক পরে ঢুকে। তারপর ডেস্কে গিয়ে মালিককে ডাকায়। সাথে কাগজ পত্র নিয়ে আসতে বলা হয়। এর কিছুক্ষণ পর লাকি দৌড়ে আসে। পুলিশ দেখে স্যার স্যার বলে ফেনা তুলে ফেলে।

সব প্ল্যান মাফিক চলছিলো। এরপর আমরা ২১ জন সিরিয়াল ধরে ঢুকি। আমাদের দেখে লাকির অবস্থা তেরটা বেজে গেছে বুঝা যাচ্ছিলো স্পষ্ট। এরপর সবইকে সিরিয়ালে দাঁড়াতে বলে আদনান আর সালমান। আমরাও জি স্যার জি স্যার বলে ফেনা তুলছিলাম। সবার অভিযোগ ওরা লিখে নেয়। তারপর মেয়েকে শোনায় যদি ওরা মামলা করে তাহলে লাকি শেষ। ৭ বছর থেকে ১৪ বছরের জেল হতে পারে। লাকি ভালোই ভয় পেলো। খুব সহজেই রেস্টুরেন্টের মালিকানা বুঝিয়ে দিলো আমাদের ২১ জনকে।

এরপর থেকে আমরা ২১ জনই লাকি ২১ রেস্টুরেন্টের মালিক। সাথে সাথে আমরা ওয়েটার আমরাই ক্যাশিয়ার আবার আমারই ডেলিভারি বয়। ওরা ২১ জন সবাই আমাকে যাবতীয় কাজ থেকে অব্যহতি দিলো আমার আইডিয়ার কারণে। আমার কাজ হলো শুধু ক্যাশে বসা। তাও সপ্তাহে তিনদিন করে। এভাবেই চলতে থাকে আমাদের লাকি টুয়েন্টি ওয়ান রেস্টুরেন্ট। আর আমার বন্ধু আদনান সালমানরা আজীবন ডিস্কাউন্টে রেস্টুরেন্টে খাওয়া দাওয়া করার সুবিধা পাবে এই মর্মে চিঠি পেলো তারা।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত