পাত্র দেখা

পাত্র দেখা

এই মুহূর্তে আমি আমার জন্য পাত্রের বাসায় পাত্র দেখতে এসেছি। পাত্র আমার সামনে মেরুন রঙের শার্ট আর সাদা প্যান্ট পরে বসে আছে। মাথায় সামান্য জেলও লাগিয়েছে।মাঝে মাঝে আড়চোখে আমার দিকে তাকাচ্ছে আর আমাদের হাতে চায়ের কাপ বিতরণ করছে। ছোট মামা চেয়েছিলেন পাত্রের ফ্যামিলি আমাকে দেখতে আসবে।কিন্তু,আমি সেটা মানতে নারাজ।

অনেক জোরাজুরি করে ফ্যামিলি কে উল্টা পাত্রের ফ্যামিলিতে দেখার জন্য রাজি করিয়েছি। আমি সরকারী চাকরী করি,পেশায় ম্যাজিস্ট্রেট। পাত্র তিনবার মাস্টার্স ফেইল করে এখনো বেকার বসে আছে। শুনেছি, তার ফ্যামিলি নাকি বংশগত কোটিপতি।তারাই কোটিপতিত্বের দাপটে বিয়ের প্রোপোজাল দিয়েছিল।  ছোট মামা তার জীবনে কোনোদিন মেয়ে সাথে নিয়ে পাত্র দেখতে যান নি। উনি লজ্জায় কোনো প্রশ্নই করছেন না। কিন্তু,লাইফ পার্টনার তো আমার,তাই আমিই মুখ খুললাম।

~কি যেন নাম আপনার? পাত্র একবার ওর বাবার দিকে তাকালো।তারপর নরম স্বরে উত্তর দিলো,
~জ্বি আপু, তাসরিফ।
~আমার ফ্যামিলির পছন্দ হলে,সম্পর্কে আপনি আমার স্বামী হতে চলেছেন। সেই আমাকে আপু সম্বোধন করছেন? কি অদ্ভুত! হা হা। পাত্র লজ্জা পেয়ে চুপচাপ বসে আছে।  চায়ের কাপে লম্বা একটা চুমুক দিয়ে পাত্রের বাবাকে বললাম,

~ পাত্র তো তিনবার মাস্টার্স ফেইল।আচ্ছা, সমস্যা নেই, আমি তো একজন ম্যাজিস্ট্রেট। শুনেছি,আপনারা অনেক কোটিপতি। মামা এই কারণেই চাচ্ছিলেন, আপনার ছেলের সাথে বিয়ে দিতে। কিন্তু, ছেলের গায়ের রঙ কেমন জানি একটু চাপা। পাত্রের চাচা চমকে উঠে পাত্রের দিকে একটু খানি পলক ফেললেন। তারপর বললেন,

~আরে না, না।কই চাপা?কিছুদিন ফ্রেন্ডদের সাথে কক্সবাজার ঘুরতে গেছিল তো,তাই একটু রোদে পুড়েছে।এখন এরকম রঙ ই চলছে।
~ও আচ্ছা তাসরিফ,আপনি গিটার বাজাতে পারেন? সে কাপা কাপ গলায় উত্তর দিলো,

~জ্বি না, আগে একটু একটু ট্রাই করতাম।এখন প্র‍্যাক্টিস করার সময় পাইনে।
~এমনিতেই গায়ের রঙ চাপা,তার উপর গিটার বাজাতেও পারেন না। এ যুগে ছেলেরা আর কিছু না পারুক,গিটার বাজানো টা সবাই শিখে রাখে।  ফ্রেন্ডদের সাথে আড্ডা দেন,তাই তো? পাত্র নিরুত্তর।পাত্রের মা পিছন থেকে আগ বাড়িয়ে উত্তর দিলো,

~আরে না।আমার ছেলে তো কারো সাথেই মেশে না।সোনার টুকরো ছেলে আমার।সারাদিন আমার কাছাকাছিই থাকে।

~এত সোনার টুকরো হলে তো সমস্যা। সংসারে কি ঘরে বসেই বাপের কোটি কোটি টাকা খরচ করবেন? নাকি অন্য কোনো প্ল্যানিং…

~আসলে মাস্টার্স ফেইল করে আমার আর কিছুই ভাল লাগে না।টো টো করে ঘুরে বেড়াই।তাই মা চাচ্ছেন বিয়ে দিয়ে সংসারী করাতে।

~আচ্ছা, আচ্ছা, ফেইল করলে সব বাবা মা ই তাদের ছেলে মেয়েদের অন্য কারো ঘাড়ে ঝুলিয়ে দেয়। ছোট মামা আমার দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছেন। যেন, আমি ডোনাল্ট ট্র‍্যাম্পের রাষ্ট্র চালানোর ভুল ধরিয়ে দিয়েছি। উনি রাগ রাগ ভাব নিয়ে বললেন,

~ছেলে মানুষের একটু একটু দোষ থাকে।এটা মানিয়ে নিতে হয়। আমি মামার কথা কানে নিলাম না। পাত্রের মাথার দিকে ভাল করে খেয়াল করে জিজ্ঞেস করলাম,

~আপনার চুলগুলো হাত দিয়ে সোজা করুন তো। মাথায় টাক নেই তো? এমনিতেই ফেইল করতে করতে বয়স ত্রিশ পার করে ফেলেছেন। আমার টাক ছেলে মোটেও পছন্দ না।একে তো ছেলের বয়স বেশি,তারপর যদি টাক থাকে,তবে এই বিয়ে আমার দ্বারা করা সম্ভব না। পাত্রের মা সামান্য ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বললেন,

~ আমার ছেলের জীবন এভাবে শেষ হতে পারে না।ফেইল করা ছেলে বলে কেউ মেয়ে দিতে চায় না। আইবুড়ো ছেলেকে ঘরে বসিয়ে রাখলেও নানান লোকে নানান কথা বলে। তারউপর আমার ছেলের জন্মগত হাপানী রোগ শুনে আর কোনো পাত্রীই রাজি হয় না। এ আমার ছেলের কি পোড়া কপাল.! হাপানীর কথা শুনে ছোট মামা আঁৎকে উঠলেন।

~ও মা! সে কি? ছেলের বংশগত হাপানী? আমি মুখে আঙুল চেপে ধরে মামার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম।তারপর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বললাম,

~ছি, ছি। ছেলের এতবড় সমস্যা।আমাদের কাছে লুকিয়ে গেলো? এরপর যদি আমি এই ছেলে কে বিয়ে করি, আমার ছেলে পুলে, নাতী~নাতনী, তাদের ছেলে পুলে সব কয়টা হাপানী তে পড়বে। আর আমি ওদের জন্য তেল গরম করতে করতে জীবন পার করে দেবো।ছেলের চাচা লজ্জায় মাথা চুলকাচ্ছে। উনার একদম সামনে দাঁড়িয়ে বললাম,

~ম্যাজিস্ট্রেট হতে গিয়ে বয়স ছাব্বিশ পার করে ফেলেছি। শুনেছিলাম, আপনি এতেই নাকি নাক সিটকিয়েছিলেন। এখন আপাতত নাক,কান,গলা মাথা সমস্ত চুলকান। নিয়ম মত পাত্রী দেখতে এলে পাত্রপক্ষ মেয়ে পছন্দ না করলেও হাতে পাঁচশো টাকা ধরিয়ে দেয়। আমারও সেই সূত্রে একটা দ্বায়িত্ব আছে। পাত্র কে একপাশে ডেকে নিয়ে হাতে এক হাজার  টাকার পাঁচ টা নোট গুঁজে দিয়ে বললাম, “বন্ধুদের নিয়ে লুভিং খাইয়ো কুবের।”

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত