সময়

সময়

মিহির সাথে তিন বছর সম্পর্কে থাকার পরেও মাঝে মাঝে মনে হয় “মিহি কি সত্যি আমাকে ভালোবাসে? সত্যি কি আমাকে চায়?” নাকি আমিই পাগোলের মতো ওর পিছু পিছু ছুটে যাচ্ছি। ওর কাছে চলে যাচ্ছি, নির্বোদের মতো ভালোবেসে যাচ্ছি।  এইচএসসি রেজাল্ট খারাপ আসার পর আমি খুব ভেঙ্গে পরেছিলাম। খুব ভালো পরিক্ষা দেওয়ার পরেও, যতটুকু রেজাল্ট আশা করেছি তার আশেপাশেও যেতে পারিনি। পুরো পৃথিবী আমার বিপরীতে চলে গিয়েছিলো, এমনকি বাবা, মা ও। খুব ভেঙ্গে পরেছিলাম। ঠিক তখনি পাশে এসে দাঁড়ায় মিহি।

মিহি আমার ক্লাস ফ্রেন্ড। স্কুল জীবন থেকেই আমরা একসাথে পড়াশোনা করছি। স্কুল পেরিয়ে আমরা একসাথে কলেজে ও। কলেজে অধ্যায়ন অবস্থায় মিহি ওর বান্ধবী নীলা কে দিয়ে প্রেমের প্রস্তাব দিলে আমি প্রত্যাক্ষান করে দেই। মিহি কে সবসময় বন্ধুর চোখে দেখতাম। কখনো ভালোবাসার নজরে বা ভালোবাসার মানুষ হিসেবে কল্পনায় ও রাখিনি। আর তাছাড়া প্রেম ভালোবাসার উপর একটা ঘৃনা ছিলো সবসময়ই।  কেনো ঘৃনা ছিলো সেটাও বুঝতাম না। শুধু বুঝতাম প্রেম ভালোবাসা আমাকে দিয়ে হবেনা।

খুব পরিশ্রম করেও যখন সাফল্য না আসে তখন ভেঙে পড়া এটাই স্বাভাবিক। আর এই ভেঙে পড়ার সময় যখন বাবা, মা ও পাশে না থাকে তখন পৃথিবীতে নিজেকে অসহায় ছাড়া কিছুই মনে হয় না। মিহি খারাপ সময়ে পাশে এসে দাঁড়ায়। মিহির আন্তরিকতা একটু একটু করে আমার হৃদয়ে ওর জন্য জায়গা করে নেয়।  খারাপ সময়ে যখন আমাদের পাশে কেউ এসে দাড়ায়, সাহায্যের দু-হাত বাড়িয়ে দেয় তখন খুব স্বভাবিক ভাবেই আমরা সে মানুষের উপর দুর্বল হয়ে যাই। আমি ও দুর্বল হয়ে পড়ি মিহির উপর। মিহি যখন কথা বলতো তখন মনে হতো এভাবেই চলতে থাকুক। ওর কন্ঠ খুবই ভালো লাগতো। ও যখন পাশে বসতো তখন ভাবতাম এভাবেই যদি সারাজীবনের মতো ওকে পাশে পেতাম।

মিহিকে ভালোবাসার কথা বলে দিলাম। মিহি ও জানিয়ে দিলো ‘ সে ও আমাকে ভালোবাসে।”  আমার সবকিছুতেই মিহি ছিলো। মিহি ছাড়া একটা সেকেন্ড ও আমরা চলতো না। সকালবেলা মিহির মুখের মিষ্টি কন্ঠে ” শুভ সকাল, আর ঘুমিওনা এবার ওঠে পড়ো ” না শুনলে আমার সকাল হতো না। সারাদিন শত ব্যাস্ততার মধ্যেও একটিবার মিহির সাথে দেখা না হলে ঐ দিন আমার পূর্ন হতো না।  রাতে মোবাইল ফোনে কথা বলার সাথে নীল আকাশ নিয়ে কথা না বললে ঘুম আসতো না।

মিহি মেডিকেলে চান্স পেয়ে গেলো। আমার রেজাল্ট মোটামুটি মানের হওয়ায় আমি রেজাল্ট অনুযায়ী মোটামুটি মানের ভার্সিটিতে আইনজীবী শাখায় ভর্তি হয়ে গেলাম। ছোট বেলা থেকেই স্বপ্ন ছিলো ডাক্তারি পড়বো, সাদা এপ্রোনে জড়িয়ে রাখবো নিজেকে।  কিন্তু রেজাল্টরে কারনে আর সেটা হলো না। অাফসোস থাকলেও আফসোস নেই কারন আমি না পারছি আমার মিহি তো ডাক্তারি পড়তেছে।

সম্পর্কে একটা দিন পার হওয়া মানে আমি আরো দুর্বল হয়ে যাই মিহির উপর। মিহি ওর পড়াশোনা নিয়ে ব্যাস্ত হয়ে পড়লো। আগে যেখানে কথা বলতে বলতে রাত দিন হয়ে যেতো, এখন সেটার নাম ও নেই। আমার পড়াশোনার প্রেশার থাকলেও সেটা মিহি কে বুঝতে দিতাম না।  সারাদিন পর যখন রাতেও ওর সাথে দশটা মিনিট কথা বলতে পারতাম না তখন খুবই খারাপ লাগতো। অনলাইনে ওর আগে এসে পড়ে থাকতাম। টেক্সট দিলে সিন করতো না সহযে,ফোন দিলে ব্যাস্ত বলে রেখে দিতো, দেখা করতে বল্লে অযুহাত দেখিয়ে না করে দিতো।

মিহির সাথে তিন বছর সম্পর্কে থাকার পরেও মাঝে মাঝে মনে হয় “মিহি কি সত্যি আমাকে ভালোবাসে? সত্যি কি আমাকে চায়?” নাকি আমিই পাগোলের মতো ওর পিছু পিছু ছুটে যাচ্ছি। ওর কাছে চলে যাচ্ছি, নির্বোদের মতো ভালোবেসে যাচ্ছি।

তিন বছরে সম্পর্কে ও ইদানীং মিহি কে বড্ড অচেনা লাগছে। আমার মনো হতো মিহি আমাকে ইগনোর করে, অবহেলা করে। কিছুদিন পর জানতে পারলাম মিহি ওর এক ক্লাসমেটের সাথে সময় কাটাচ্ছে, ঘুরতে যাচ্ছে। সবকিছু জেনেও মিহিকে ভালোবাসতাম। কিন্তু অবহেলাটা দিন দিন এতো বৃদ্ধি পাচ্ছিলো যেটা সহ্য করা যেতো না। একটা সমাধান চাইছিলাম মিহির কাছে। হয় আমি আর না হয় অন্য কেউ।

মিহি ওর ক্লাসমেট ডাক্তার কেই বেছে নিলো। কারন দেখালো ” মিহি ভবিষ্যত ডক্টর আর ওর ক্লাসমেট প্রেমিক ও ভবিষ্যৎ ডক্টর।” ওদের বোঝাপড়া খুবই ভালো আর ওদের খুবই ভালো মানাবে। আর আমি ভার্সিটি, কখন পড়াশোনা করে নিজের পায়ের নিচে মাটি শক্ত করতে পারি তার ঠিক নেই।

মিহির কথা অনুযায়ী ওর সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দিলাম। এবার আর আমি ভেঙ্গে পড়িনি। বরং নিজেকে শক্ত রেখে নিজের সাথেই লড়াই করে গেছি। একসময় চ্যালেন্জ নিতে ভয় পেতাম।  কিন্তু মিহি চলে যাওয়ার পর একটা চ্যালেন্জ নিয়েছিলাম ” আমি সফল হয়েই দেখাবো।

বেশ কয়েকবছর পর জানতে পারলাম মিহির বিয়ে হয়ে গেছে ওর ঐ ডাক্তার প্রেমিকের সাথেই। নিজেকে শক্ত রাখলাম। যে আমার কখনো ছিলোই না তাকে নিয়ে অযথা মন খারাপ করার প্রশ্নই আসে না। আমি আমার লক্ষ্যে হাটতে লাগলাম। আদালতে প্রেবেশ করে জর্জ চেয়ারে বসেই থমকে গেলাম। ডিভোর্স কেসের মামলায় আমার সামনে মিহি আর ওর স্বামী। কাপালে বেশ ঘাম জমে গেছে। ঘাম মুছে আদালতের কাজ শুরু করলাম।  মিহি আর ওর স্বামীর একই মতামত ওরা দুই-জন ডিভোর্স চায়।

মিহি আর ওর স্বামীর ডিভোর্স হয়ে গেলো তাও আমার সামনে, আমার হাতেই। এই মূহুর্তে আমার খুশি হওয়া উচিত নাকি, মিহি নামক মেয়েটার জন্য মন খারাপ করা উচিত সেটা আমি বুঝতে পারছি না।” অতীতে তোমার সময় ভালো ছিলো আর এখন আমার সময় ভালো। সময়, সবকিছুই পরিবর্তন করে দেয়। যেমনটা আজ আমি পরিবর্তন।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত