ভক্ত

ভক্ত

একটা অচেনা মেয়ে আইডি থেকে গতকাল একটা মেসেজ এসেছে, “আপু,আমি তোমার গল্পের বিরাট ভক্ত।আমি তোমাকে অনেকদিন ধরে ফলো করে আসছি।তোমার লিখাতে জাদু আছে। এত সুন্দর রোমান্টিক পোষ্ট কেউ লিখতে জানে,সত্যিই আমার জানা ছিলোনা। আমি তোমার গল্প,কবিতা নিয়মিত পড়ি। প্লিজ এক্সেপ্ট মি।”

জীবনে কেউ কোনোদিন আমার গল্পের প্রশংসা করেনি।আজ একটা অচেনা মেয়ে এসে আমার ফ্যান বনে গেলো।নিজেকে আট কপালে ছেড়ে ষোল কপালে মনে করতে শুরু করলাম। আমার লিখা গল্পের প্রশংসা শুনে আহ্ললাদে গদগদ হয়ে সাথে সাথে রিকু এক্সেপ্ট করে নিয়েছিলাম। মেয়েটা এইবার এডমিশন এক্সাম দিচ্ছে।এত ছোট মেয়ে কোনোদিন বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যে বলতে পারে না।ওর প্রশংসাই বলে দিচ্ছে, ও কতটা ইনোসেন্ট! এক্সেপ্ট করার পর থেকে সারাদিন মেয়েটার টুংটাং মেসেজ এসেই চলেছে। এক সময় সে লিখছে, “আপু,তোমাকে একটা পার্সনাল কথা শেয়ার করতে চাই।প্লিজ আমাকে একটু ইনফরমেশন দাও।”

দুপুরবেলা সে একটা ছেলের পিকচার সেন্ড করে লিখেছে, “আপু, এই ছেলে টার নাম তাফিম।আমি ওর প্রেমে পড়েছি। যাকে বলে মারাত্মক রকমের প্রেমে পড়া।আমি ওকে কিভাবে বুঝাবো যে,আমি ওকে ভালবাসি? প্লিজ আপু,কিছু সাজেস্ট করো।” ছেলে টার পিক দেখে আমার চোখ কপালের দুই ইঞ্চি উপরে চলে গেলো।ছেলে টা আমার ভার্সিটির সিনিয়র ভাই।আমার লিস্টেই আছে। কিছুদিন ধরে এই ছেলের উপর ক্রাশ খেয়ে সারাদিন তাকে ডেডিকেট করেই পোষ্ট দিয়ে আসছি।লাভ কাপল পেইজ গুলোতে রোমান্টিক কিছু পেলেই তারে মেনশন করে পালিয়ে আসি। যে আমি কোনোদিন সাজতেও জানতাম না, সেই আমিই সাজুগুজু করে রোমান্টিক পোজ দিয়ে ফেসবুকে ছবিগুলো আপলোড দিয়ে ক্যাপশন লিখি, ‘আমার সকল প্রচেষ্টা একমাত্র তোমার জন্য। ভালবাসি প্রিয়, S+T। ‘

ক্রাশ মাঝে মাঝে মুচকি হাসির ইমুজি দিয়ে কমেন্ট করে।তাতে ছোট খাট রিপ্লাইতে সেও জানিয়ে দেয় ‘আমিও তোমার প্রতি ফিদা সুহাসিনী।’ কোনো কোনো দিন দুই একটা লাভ রিয়েক্টও দিয়ে ফেলে। আর সম্ভবত দুই তিন দিনের ভিতরেই আমাদের প্রেম জমে ক্ষীর, সাথে হালুয়া,লাচ্ছাও হতে পারে। আমার সেই ক্রাশের উপর এই মেয়ে ক্রাশ খেয়ে এখন আমার কাছেই সাজেশন চাচ্ছে?  এতটা উদার আমি নই। কয়েকটা রাগের ইমুজি দিয় মেয়েটাকে রিপ্লাই দিলাম, “আরে আপু,তুমি এই ছেলের উপর ক্রাশ খেয়েছ?  তুমি জানো,ও কেমন ক্যারেক্টারলেস? আমার ভার্সিটিতেই পড়ে।লিস্টের প্রত্যেকটা মেয়েকে প্রোপোজ করেছে। আমার ক্যাম্পাসের ছেলে, আমি জানি ও কেমন।ভুলেও এই ছেলের পাল্লায় পড়ো না।ওর যে ক্যাম্পাসে কত এক্স গার্লফ্রেন্ড আছে, সেই লিস্ট তোমাকে দিতেও আমার লজ্জা লাগছে আপু।তুমি ওর থেকে সরে যাও।”

সে মেসেজ সীন করছে, কিন্তু রিপ্লাই দেয় না।সম্ভবত শোকে জমে পাথর হয়ে গেছে।এসব ভাবতে ভাবতেই খুশিতে অর্ধ পাগল হয়ে কখন জানি ঘুমিয়ে গেছিলাম।ঘুমের মধ্যে ক্রাশকে নিয়ে ভয়ংকর স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে গেলো।
ভয়ে ভয়ে সন্ধ্যার দিকে মেসেঞ্জারে গিয়ে ক্রাশ কে একটা রোমান্টিক কবিতা সেন্ড করতে গিয়ে দেখি আমার ক্রাশ আমাকে ব্লক দিয়েছে।সাথে কয়েকটা স্ক্রিণশট সহ ছোট একটা মেসেজ, “সুহাসিনী, আমি মনে করতাম তুমি আমার উপর সত্যি ক্রাশ খেয়েছ।ভেবেছিলাম, ২৫শে জুলাই তোমার জন্মদিনে তোমাকে প্রোপোজ করে একটা নীল শাড়ি গিফট করবো।শাড়িটা গতকাল কিনেও রেখেছি।

প্ল্যানিং করেছিলাম, দুজনে মিলে ক্যাম্পাসের লেকের পাড়ে বসে গল্প করবো।কিন্তু তুমি এক জুনিয়র মেয়ের সামনে আমারে ক্যারেক্টারলেস বানিয়েছ। তুমি কি এমন বিশ্ব সুন্দরী? জীবনে একটাও প্রেম করতে পেরেছ?আমি যে তোমাকে পাত্তা দিয়েছি এই তোমার এক আনা কপাল। আমি এখন থেকে রুপার সাথে প্রেম করবো। এই মেয়েটা আমাকে প্রচুর ভালবাসে। পরশুদিন ও আমাকে বলেছিল,তুমি আমাকে ক্যারেক্টারলেস ছেলেদের মত মনে করো।আমাকে নিয়ে নাকি মেয়েদের কাছে বদনাম করো। আমি অভিশাপ দিলাম, তোমার কপালে জীবনেও প্রেম জুটবে না।” এই রুপা মেয়ে তো আমার গতকালের সেই নতুন ভক্তের নাম। স্ক্রিনশটের মেসেজ গুলোও তো আমি একমাত্র ওকেই দিয়েছি। তার মানে সব কিছু রুপার কাজ।

ওর আইডিতে গিয়ে দেখি সেও ছোট একটা মেসেজ লিখে ব্লক দিয়ে রেখেছে। মেসেজে লেখা, “আমারে কি পাগলের ইঞ্জেকশন দিছে,যে তোমার গল্পের ভক্ত হবো?  তাফিমকে ট্যাগ দিয়ে যে উল্টাপাল্টা রোমান্টিক কবিতা দিতে,ওগুলা দেখলেই তো আমার গা জ্বলত।এত সুন্দর কিউট গুলুমুলু ছেলের সাথে তোমারে মানায়? তার উপর এইরকম কবিতা।কেউ তো ভুল করে একটা লাইকও দেয় না। পাগল একটা। ওগুলা পাবনার মানসিক হাসপাতালের সামনে গিয়ে পড়ো, পাগল গুলো এমনিতেই সুস্থ হয়ে গেইট ভেঙে দৌড়ে পালাবে।” আল্লাহ, আমি কাউরে বিশ্বাস করিনা।জীবনের একমাত্র ভক্ত আমার প্রেমিক ছিনিয়ে নিয়ে গেলো।আর আমার তাফিমের গিফটের নীল শাড়ি।এতক্ষণ নিশ্চয় ওরা দুজনে ক্যাম্পাসের লেকের পাড়ে বসে গল্প করছে.!!

“কেউ কথা রাখে নি, তাফিমের বাড়ির পাশের বাগানে দুজনের  আফিমের চারা লাগানোর প্রতিশ্রুতি। ঘোলা পুকুরে তিমি আর ইলিশের চাষ, সে স্বপ্ন আমার স্বপ্নই রয়ে গেলো রুপা করলো সর্বনাশ। তাফিম তুমি কোরো না অভিমান, সব ছেড়ে এসো উঠানের এক কোনে বুনি আমন ধান। তাফিম তুমি যেও না গো কোথাও, না ফিরে এসো তবু আমার এই বিরহের কবিতা শুনে যাও।”

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত