ঈদের আনন্দ

ঈদের আনন্দ

খড়া ঝড় বাদল বৃষ্টি উপেক্ষা করে রিক্সা চালিয়ে মঈন মিয়ার সংসারটা কোন রকমে চলছে। এর মধ্যে যে বাসা বাড়িতে তারা থাকেন একটু বৃষ্টি হলেই ঘরের ভেতরে টিনের ছিদ্র দিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে পানি পরে সব কিছু ভিজে যায়। বৃষ্টি বাদলের দিনে রাতের বেলায় ঘুমাতে পারেননা। দেখে শুনে মোটামুটি একটা ভালো বাসায় গিয়ে উঠবেন সেটাও সম্ভব হচ্ছেনা। গরীবের সংসার মঈন মিয়া যা কিছু কামাই রুজি করেন সেগুলি দিয়ে সংসারটা কোন রকমে চলছে। আট বছরের তুলি আর ছোট্ট মেয়ে ঝুমাকে নিয়ে তাদের সংসার। ঢাকা শহরে তিন হাজার সাড়ে তিন হাজার টাকায় ভালো কোন বাসা ভাড়া পাওয়া যায়না। তাই জোড়া তালি দিয়ে ঠিকঠাক করে কোন রকমে থাকেন। এ ভাবেই কেটে যাচ্ছে তাদের দিনকাল। হাজারো অভাব অনটনের মধ্যে থাকলেও তাদের সংসারটা সুখ শান্তিতে ভরা। তারা স্বামী স্ত্রি দুজনেই মিলে মিশে সংসারটা চালাচ্ছেন। সব সময় সংসারের ভালো মন্দ নিয়ে পরামর্শ করে চলেন।

বড় মেয়ে তুলি খুব লক্ষি সহজে বাবা মায়ের কাছে কোন জিনিসের জন্য বায়না ধরেনা। কখনো যদি কিছু চায় সেটা দিতে পারলে তুলি খুব খুসি হয়। না দিতে পারলে ও রাগ করেনা। ও বুঝতে পারে বাবা মায়ের সমস্যার কথা। তুলি প্রাইমারি স্কুলে তৃতীয় শ্রেনীতে পড়ছে। ওকে কিছু বলতে হয়না সংসারের কাজে তুলি তার মা কে সহযোগিতা করে। ছোট মেয়ে ঝুমাকে নিয়ে নুরজাহান বেগম কোন বাসা বাড়িতে কাজ করতে পারেননা। মাঝে মধ্যে তাকে নিয়ে যেতে হয়। না নিয়ে গেলে মেয়েটা খুব জেদ করে।

মেয়েটা একটু চন্চল স্হির থাকতে পারেনা। বাড়ির বাচ্চাদের সঙ্গে খেলতে চায়। একটু চেচা মেচি করলে সবাই বিরক্ত হয়ে যায় কারো সহ্যৃ হয়না। বাচ্চাটাকে অগোচরে বাড়ির লোকেরা চোখ রাঙিয়ে ভয় দেখায়। মেয়েটি ভয়ে তার শাড়ির নিচে গিয়ে লুকায়। সবাই খিটমিট করে নুরজাহান বেগম সেটা বুঝতে পারেন। কষ্ট পেলেও তার বলার কিছু নেই। এ গুলি মেনে নিয়েই তাকে কাজ করতে হচ্ছ । প্রতিদিন তুলি স্কুল থেকে বাসায় আসার পরে ওর কাছে রেখে নুরজাহান বেগম কাজে চলে যায়। নুরজাহান বেগম দুটি বাসায় রান্নাবান্নার কাজ করে। মায়ের অনুপস্হিতির কারনে মেয়ে দুটির সমস্যা হতে পারে এটা ভেবে তাকে বাসায় কাজ কর্ম করতে মঈন মিয়া মানা করে ছিলেন।

নুরজাহান বেগম তাকে বুঝিয়ে সব কিছু খুলে বলেন সংসারের খরচ দিনদিন বাড়ছে এটা কখনো কমবেনা।  বাসাভাড়া,সংসারের খরচ,মেয়েদের লিখাপড়া,রোগে শোকে চিকিৎসা,মেয়েরা বড় হচ্ছে ওদের বিয়ে সাদী, নিজেদের ভূত ভবিষ্যতের কথা তুলে ধরেন। তার একা কামাই রুজিতে এই সংসারটা আর চলবেনা। আয় রুজির একটি রাস্তা,আর ব্যায়ের বহু রাস্তা। বাস্তব জিনিসটা বড়ই কঠিন এটা কখনো মনের আবেগ ও কল্পনায় চলতে পারেনা। বাস্তবের সাথে লড়াই করে তাদের টিকে থাকতে হবে। অনেক ভেবে চিন্তে মঈন মিয়া নুরজাহান বেগমকে কাজ করার অনুমতি দিলেন। আজ প্রায় এক বৎসর নুরজাহান বেগম দুটি ফ্যামিলি বাসায় কাজ করছেন। মাসটা শেষ হলেই পারিশ্রমিকের ছয় হাজার টাকা হাতে পেলে কষ্টের কথা গুলি ভুলে যান।

এখান থেকে কিছু টাকা সংসারে খরচ করে বাকী টাকা গুলি ব্যাংকের সেভিংস একাউন্টে জমা রাখে। বর্তমানে তাদের সংসারে অনেক স্বচ্ছলতা ফিরে এসেছে। মঈন মিয়া এবং নুরজাহান খুব খুসি। সব সময় নামাজ কালাম পাঠ করে আল্লাহ তায়ালার শুকরিয়া আদায় করেন। সবার শারীরিক সুস্হতা ও স্বচ্ছলতার জন্য আল্লাহর নিকট সাহায্য কামনা করেন।

মঈন মিয়া ঈদ উপলক্ষে সব সময়ই তার সাধ্যমতো স্ত্রী ও সন্তানদের শাড়ী জামা কাপড় সহ সব কিছুই কিনে
দেন। দূঃখের ব্যাপার হলো নিজের জন্য একটা লুঙ্গি কিনলে পান্জাবীটা কেনেনা। আবার পান্জাবী কিনলে লুঙ্গিটা কেনে না পুরুনোটা দিয়েই চালিয়ে দেয়।

এটা নিয়ে স্বামী স্ত্রির মধ্যে কথা কাটাকাটি ও হয়ছে। মানুষটির জন্য সব সময়ই নুরজাহান বেগমের খুব মায়া লাগে। এই সুন্দর মনের মানুষটিকে হৃদয় থেকে উজাড় করে ভালবাসেন। এবার তুলির আব্বুকে রাজি করিয়ে সবাইকে নিয়ে মার্কেটে যাবেন কিছু কেনা কাটার জন্য। নুরজাহান বেগম নিশ্চিত তুলির আব্বু রাজি হবেন। তার মনের খবরটা নুরজাহান বেগম ভালো করেই জানেন। এইতো সেই দিনের কথা তুলির আব্বুকে মার্কেটে নিয়ে যাওয়ার কথাটা বলেছিলেন। মঈন মিয়া একটু মুচকি হেসে বলেছেন আচ্ছা ঠিক আছে সময় মতো তোমাদেরকে মার্কেটে নিয়ে যাবো। তুলি আর তার আম্মু দিন গুনছেন সেই দিনটির জন্য। তাদের অপেক্ষার প্রহর যেনো শেষ হচ্ছেনা।

শাওন মিয়া এলাকারই লোক সেও রিক্সা চালায় তাদের সঙ্গে খুব ভালোা সম্পর্ক। দুই বছর যাবৎ ঈদুল আযহার দিন বাহিরে কোথাও যেতে মানা করেন। তুলির  আব্বুকে সঙ্গে নিয়ে কোরবানীর গরুর মাংস বানানোর জন্য সাথে করে নিয়ে যান। এবারও বলে রেখেছেন তার সঙ্গে যাওয়ার জন্য। শাওন মিয়া যার কোরবানির গরুর মাংস বানাবেন তার সঙ্গে আগেই চুক্তি করে রাখেন। তাদের পারিশ্রমিকের টাকা গুলি পরিশোধ করার পর খুসি হয়ে মালিক তাদের খাওয়ার জন্যে মাংস ও দিয়ে দেন।

নুরজাহান বেগম ও তুলি কোরবানির মাংস গুলি দেখে খুব খুসি হোন। মঈন মিয়া কাজ করে যে মাংস গুলি পান সে গুলি দিয়ে তারা কয়েকটি দিন ভালো মতোই খেতে পারেন। অসহায় বিপন্ন গরীব দুঃখী মানুষ গুলি একটু কোরবানির মাংসের জন্য বাড়ি বাড়ি গুরে বেড়ায়। এ সময়ে অনেকেই তাদের কথা ভুলে যান। আমরা যেনো তাদের প্রতি একটু খেয়াল রাখি।

ছোট্ট মেয়ে ঝুমা বাপের জন্য খুব পাগল। তাই অধিক রাত পর্যন্ত জেগে থাকে। ওর আব্বু বাসায় না ফেরা পর্যন্ত ঘুমায়না। প্রতিদিন ওর আব্বু কিছু না কিছু নিয়ে বাসায় আসে। মেয়েটি তার আব্বুকে জড়িয়ে ধরে ওম্মা ওম্মা করে দুটি গালে চুমু খেতে থাকে আর খিলখিল করে হাসে। মনে হয় ওর হাসিতে যেনো মুক্তা ঝরে। ওর আব্বু কোলে তুলে নিয়ে সোহাগ করে খাবার জিনিস গুলি ওর হাতে তুলে দেয়। বাবা মা কে খুসি করার জন্য মেয়েটির ফন্দি ফিকির ও জানা আছে। ঈদুল আযহার আর মাত্র অল্প কয়েকটি দিন বাকি  আছে। গরু ছাগল ভেড়া উট দুম্বার হাট গুলি আস্তে  আস্তে জমে উঠছে। ছোট বড় ধনী গরিব সকলের জন্যেই ঈদ।

আমাদের সবারই আশে পাশে অসহায় বিপন্ন গরীব দূঃখি মানুষেরা বসবাস করে। আমরা সবাই ধনী গরিব ছোট বড় ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে,তাদেরকে নিয়ে পবিত্র ঈদুল আযহার আনন্দ উপভোগ করবো ইনশা আল্লাহ। ঈদ হোক খুসির,ঈদ হোক আনন্দের,সবার জীবনে বয়ে আনুক অনাবিল সুখ শান্তি স্বচ্ছন্দ ও সমৃদ্ধি এটাই কামনা করছি। সবাইকে জানাচ্ছি ঈদুল আযহার
আগাম শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা।

ঈদ মোবারক, ঈদ মোবারক, ঈদ মোবারক।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত