বাবা

বাবা

ভয়াবহ একটা আওয়াজ করে গাড়িটা ব্রেক কষলো।ততক্ষণে কাঁচা ঘুমটা ভেঙ্গে গিয়েছে আমার। বিরক্তি চোখে ড্রাইভারের দিকে তাকালাম। “টায়ার পাংচার স্যার।”“কতক্ষণ লাগবে?”আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে বলে উঠি। “ঠিক জানি না স্যার।তবে ভুল জায়গায় এসে টায়ার পাংচার হলো।ব্যাক আপ টায়ারও নেই।”আমি আর কথা না বাড়িয়ে গাড়ি বেরিয়ে পড়ি।

ঘন কুয়াশা;যেন এক শুভ্রতার চাদরে ছেয়ে গেছে এলাকাটা।হাড় কাঁপানো এ শীতেও যেন এ সৌন্দর্য অম্লান। আশপাশটায় তাকাই একবার,আঁধার এখনও ঠিক মত কাটে নি বললে ভুল হবে না।এ আঁধার ঘেরা সকালটা বোধহয় আমার কখনই দেখা হত না যদি দু সপ্তাহ আগের সে ঘটনাটা আমার সাথে না ঘটতো।মনের অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলি।পথের ওপারেই কিছু টং দোকান,পা বাড়াই সেদিকে।এককাপ চা পেলে মন্দ হতো না।

দু সপ্তাহ আগের কথা।দিনটা ছিল রবিবার।অফিস শেষ করে লিমার সাথে একটা জুয়েলারী দোকানে।এক সপ্তাহ বাদে বিয়ে আর আমার ব্যস্ততা মেয়েটার কাছে এক অগ্রহনযোগ্য কৈফিয়ত।ভালোবাসাটা কি আমার তবে কমলো বলে?আমি তার মনের কষ্টটা বুঝি,তাই হয়তো সকল ব্যস্ততাকে ফাঁকি দিয়ে তার পানে ছুটে আসি।নতুন শুরুটার উৎসবের প্রস্তুতিটাও একসাথেই হোক না।মাত্র দোকানে ঢুকতে যাব এমন সময় পকেটে ফোন বেজে ওঠে।আমি পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে স্ক্রিণের দিকে তাকাই। “অফিস থেকে নিশ্চয়ই?”কটমট চোখে লিমা আমার দিকে তাকায়। আমি মাথা নাড়ি।“না,বাসা থেকে।” অবাক হয় লিমা।“ এই অসময়ে?রিসিভ করো তো দ্রুত।” আমি রিসিভ করে কানে দিই।“হ্যালো?” “বাবা তুই কি একটু দ্রুত আসতে পারবি?”ওপাশ থেকে বাবার কন্ঠ।মনের ভেতর কেমন যেন খটকা লাগে।“কেন বাবা?” কিছুক্ষণের জন্য ওপাশ থেকে কোন শব্দ আসে না,আমি অস্থির অপেক্ষা করি।বুঝতে পারি বাবা কাঁদছেন।

“মামা কি লাগবো?” আমি কল্পনার জগত থেকে ফিরে আসি।পিছন ফিরে তাকাই;একটা ছোট ছেলে,বয়স ছয় কি সাত।চেহারা মায়াকাড়া।এ শীতের মধ্যেও তার গায়ে জড়ানো একটা রঙ চটা হাফ শার্ট আর হাফ প্যান্ট।কেন যেন ভেতরে ভেতরে একটা মায়া অনুভব করতে থাকি। “তোমার নাম কি?”জিজ্ঞেস করে উঠি। “নাম দিয়া কি করবেন,কামে আইয়েন।কি লাগবো?” আমি হেসে উঠি।“এক কাপ চা হলেই চলবে।”“রঙ নাকি দুধ?” “রং চা।”“চিনি বেশি নাকি কম?” “কমই দাও।”“ওকে বস।”ছেলেটা আমাকে একটা সেলুট দিয়ে হাটা আরম্ভ করে।আমি তার পথের দিকে চেয়ে থাকি।কেমন যেন অন্যরকম সারল্য,অভাব নেই দুশ্চিন্তা নেই।সুখের মানে কি এই?

জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়েই বিরক্তি ধরে গেলো।দরজাটার দেয়ালে সজোরে বাড়ি দিয়ে বসলাম। এত জ্যাম কেন?ঘড়ির দিকে একবার তাকালাম।লিমা আমার কাঁধে হাত রাখে। “দুশ্চিন্তা করো না,সব ঠিক হয়ে যাবে।” মনের অজান্তেই হেসে উঠি।জানালা দিয়ে বাইরে তাকাই একবার,কোন কিছুই আর ঠিক হবে না। ড্রাইভার দক্ষ লোক,কোথা থেকে যেন লোক জোগাড় করে ফেলেছে।টায়ার পরিবর্তন করে আমরা আবার রউনা হই। “রফিক।” “জি স্যার?”গাড়ি চালাতে চালাতে সে বলে উঠে। “পৌঁছাতে এপ্রক্সিমেটলি কতক্ষণ লাগবে?” হেসে ওঠে সে।“তা কি বলা যায় স্যার?এটা তো বাংলাদেশ।”পথ পরিবর্তন করে সে।“তবে ভাগ্য ভালো থাকলে আট ঘন্টার মধ্যে পৌছায়ে যাব,ইনশাল্লাহ।” আমি মাথা নাড়ি।চোখটা বোজার চেষ্টা করি,ঘুমোতে হবে।

“আপনি কি মি.হাসান মোরশেদ?” আমি মাথা তুলে নার্সের দিকে তাকাই।“জি।” “রোগী কি আপনার মা হন?” আমি মাথা নাড়ি।“জি।” “আপনাকে ডাক্তার ভেতরে যেতে বলেছেন।” দরজাটা ধীরে ধীরে খুলি।ছোট একটা কক্ষ,এক পাশে বাবা দাঁড়ানো,এপ্রন পরা একজন ডিউটি ডাক্তার।আমি সেদিক থেকে মায়ের দিকে চোখ ফিরাই।ছোট দেহটা যেন আরো ছোট লাগছে।আমি এগিয়ে যাই ধীর পায়ে।“মা।”আস্তে করে ডেকে উঠি।ধীরে ধীরে চোখজোড়া খুলেন,হাতটা এগিয়ে দেন ধীরে ধীরে।আমি কাঁপা কাঁপা হাতে সে হাত স্পর্শ করি।একটা সময় হাতটা ছাড়িয়ে অক্সিজেন মাক্সটা খুলে ফেলেন,কিছু কি বলতে চান?ডাক্তার এগিয়ে আসতে চান,আমি বাঁধা দিই। “বাবা।”

আমি এগিয়ে আসি।“কিছু বলবে?” “আমরা তোর বাবা মা না কেমন যেন ধাক্কা খাই আমি,বাবার দিকে তাকাই একবার।বাবা মাথা নিচু করে রাখেন।তবে কি এতদিনের সবকিছু মিথ্যা ছিল?চারপাশ কেমন যেন অন্ধকার হয়ে আসতে থাক মোবাইলটা বেজে উঠে।ঘুম ঘুম চোখে ফোনটা রিসিভ করি।“হ্যালো?” “কেমন আছো?”ওপাশ থেকে লিমার কন্ঠ। আমি হেসে উঠি।“কি মনে হয়?”“ঠিক জানি না।”একটু থামে মেয়েটা।“ভয় লাগছে?”“উঁহু।”“কেন?”“কেউ একজন পাশে আছে বলে।”ওপাশ থেকে লিমা কেমন যেন চুপ হয়ে যায়।“কি হলো?”আমি বলে উঠি। “কিছু না।”“তাহলে রাখি?”“আচ্ছা।”কি যেন ভাবে মেয়েটা।“শুনো?” কানের কাছে নিই মোবাইলটা।“কি?” “আমি অপেক্ষা কর জানালা দিয়ে বাইরে তাকাই।জীবন বড় রহস্যময়,ক্ষণিকের মাঝে বদলে যায় জীবনের মোড়।আমরা অসহায়,নিশ্চুপ দেখি।

বাবা পাশে এসে দাঁড়ান,কাঁধে একটা হাত রাখেন।“মনটা কি বেশি খারাপ?”আমি মাথা নাড়ি।“নাহ বাবা।সবাই তো একদিন চলে যাবে,বেচে থাকবে কেবল স্মৃতিগুলো।আমরা নিরুপায় নাটক দেখে যাব।”হেসে ওঠেন বাবা।বাবার দিকে ফিরি আমি।“উনি কোথায় থাকেন?”বাবা স্থির চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থাকেন।কি যেন খুঁজে বের করতে চেষ্টা করেন আমার মাঝে।আমি দুপা সামনে এগিয়ে আসি।“আমি তার সাথে দেখা করতে চাই।”“তুমি কেন যাচ্ছো?” ব্যাগটা আটকে তার দিকে তাকাই আমি।“জীবনের সংজ্ঞা পেতে মেয়েটা আমার দিকে তাকিয়ে থাকে।জানি তার মনে অনেক প্রশ্ন,অনেক সংশয়;হয়তো কিছুটা অবিশ্বাস।

ধীরে ধীরে দরজা খুলে যায়।একজন বয়স্ক লোক,পাতলা হয়ে যাওয়া সাদা চুলগুলো বাতাসে উড়ে বেড়াচ্ছে।চেহারা কেমন যেন আমার মতন। “কি চাই?”লোকটি বলে ওঠেন। “আপনি কি দেলোয়ার হোসেন?”“জি।”অবাক হন লোকটি।“কেন?” “আমি হাসান,”একটু থামি আমি।“খুব সম্ভবত আপনার সন্তান।”লোকটা অপলক চোখে আমার দিকে চেয়ে থাকে,স্পষ্ট দেখতে পাই সে চোখে অশ্রু। “কফি নাকি চা?”“কফি।” হেসে ওঠেন লোকটি।“আমার উপর তোমার অনেক রাগ,তাই না?” “রাগ করার সময়টুকুই পেলাম কোথায়?”তার দিকে এগিয়ে যাই আমি।“আমাকে ছেড়ে গেলেন কেন জানতে পারি?”আমার দিকে একটা কফির কাপ এগিয়ে দেন তিনি।“জানা কি খুব জরুরী?” “জরুরী না অধিকার।”

কফির কাপে চুমুক দিন তিনি,দীর্ঘ একটা শ্বাস নিন তিনি।“আমি আর তোমার মা প্রেম করে বিয়ে করি।স্বপ্নের মত ঘরটা গুছিয়ে নিতে শুরু করি আমরা।আমার সাফল্যের সাথে উপহার হয়ে আসো তুমি।হঠাৎ করে যেন সব পরিবর্তন হয়ে যেতে থাকে।সে আমাকে সন্দেহ করতে থাকে।সেদিন রাতে ঝগড়া করে বেরিয়ে যাই আমি।ও ছিল শ্বাসকষ্টের রোগী।ইনহেলারটা কেন যেন সেদিন বেয়াড়া হয়ে গেলো।সবার অগোচরে সে হারিয়ে গেলো না ফেরার জগতে।”লোকটা আমার দিকে ফিরে তাকায়।“আমি আর কখনো নিজেকে বিশ্বাস করতে পারি নি।চাই নি আমাকে তুমি কখনো বাবা ডাকো।আমি একজন পাপী,একজন নিশ্চুপ খুনী। ”আমি লোকটার দিকে নিশ্চুপ তাকিয়ে থাকি,কি বলব বুঝে উঠি না।

জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকি,সেখানে কালো আঁধার।মাঝেমধ্যে দু একটা গাড়ি পেরিয়ে যায় শো শো করে,তাদের নীল লাল আলোয় আমি মুগ্ধ হই।মানব জীবন বড় জটিল,অভাব না বুঝলে এ জীবনের মানেটাই যেন অর্থহীন। আমরা ভালোবাসা বলতে কেবলই কাউকে নিয়ে বেঁচে থাকাকে বুঝি,সে বেঁচে থাকার পাশাপাশি অন্য ভালোবাসাগুলোকে যেন আমরা ভুলে যাই খুব সহজে।ভালোবাসার অর্থটা আমাদের কাছে বড্ড সংকীর্ণ।চোখে এক বিন্দু অশ্রু বেরিয়ে আসে।খুব করে লোকটাকে একবার বাবা ডাকতে মন চাচ্ছে।আচ্ছা জোরে তাকে বাবা ডেকে উঠলে তিনি কি শুনবেন?মাইলের পর মাইল পেরিয়ে যাবে কি একজন সন্তানের ভালোবাসা? হয়তোবা।চোখটা দ্রুত বন্ধ করি,ঘুমোতে হবে।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত