ভেলা

ভেলা

টিনের চালে ঝুম বৃষ্টির শব্দ শুনে ঘুম ভেঙে যায় আতিকুল মিয়ার। পাশে চেয়ে দেখে স্ত্রী সাহেরা বেগম আর ছেলে জাহিদ নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। নিজের শরীরের কাঁথাটা তাদের গায়ে ভালো করে গুজে দিয়ে দরজার সামনে গিয়ে বসে। বাহিরে প্রচুর বৃষ্টি। মাঝেমধ্যে প্রচণ্ড বেগে বাতাস বয়ছে। একটা বিড়ি জ্বালিয়ে টানতে টানতে আতিকুল মিয়া ভাবতে থাকে, সারারাত যে বৃষ্টি হলো নদীর পানি কম হলেও এক হাত বেড়ে গেছে। আজ মনে হয় না জলিল মাঝি নৌকা নিয়ে ঘাটে যাবে। গেলেও রিকশা পার করবে না। যা বাতাস! নদীর পানির ঢেউয়ের বেগ থাকবে প্রচুর। এমনিতেই জলিল মাঝি প্রচুর ভীতু।

ভাবতে ভাবতে আযানের শব্দ শুনতে পায় আতিকুল মিয়া। ধীরে ধীরে হালকা আলো দেখা যাচ্ছে বাহিরে। এদিকে ঝড়বৃষ্টি কমার কোনো নাম গন্ধই নেই। আতিকুল মিয়া একদিন রিকশা নিয়া বের না হলে সেদিন তার ঘরের চুলো বন্ধ। হঠাৎ কাঁধে গরম কিছুর স্পর্শ পেয়ে পিছনে তাকায়। দেখে স্ত্রী সাহেরা বেগম দাঁড়িয়ে। জিজ্ঞেস করে, কোন সময় উঠছ? আতিকুল মিয়া লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়া বলে, এই তো একটু আগেই। তুমি উইটা পড়লা যে?
“ঘুম ভাইঙ্গা গেছে। কিছু চিন্তা করতাছ?” “চিন্তা করতাছি আইজ রিকশা নিয়া বাহির হমু কেমনে? যা ঝড়বৃষ্টি। তবুও যাইতে পারতাম কিন্তু মনে হয় না জলিল চাচা নৌকা নিয়া ঘাটে আইব।”  “তাইলে কী করবা আইজ?””হেইডেই চিন্তা করতাছি।”

পুরোপুরি সকাল। বৃষ্টি একটুও কমেনি। এদিকে জাহিদেরও ঘুম ভেঙে যায়। উঠে দেখে মা-বাবা একসাথে বসে আছে। আস্তে আস্তে এসে মায়ের কোলে বসে। মা একটু আদর করেই জিজ্ঞেস করে, ঘুম ভাইঙা গেছে বাবা?
জাহিদও সুন্দর করে উত্তর দেয়, হ মা। টিনের ফাঁক দিয়ে বৃষ্টি পড়তাছিল চক্ষে! কিছুক্ষণ পর জাহিদ মায়ের কানেকানে বলে, “মা আইজ কী বাজান রিকশা নিয়া যাইব না?” মা সাহেরা বেগম জোরে শব্দ করে উত্তর দেয়,  “নারে বাবা। যে ঝড়বৃষ্টি জলিল চাচা মনে হয় না নৌকা নিয়া ঘাটে আইব। তুই গিয়া চাচার বাড়িত একটু দেইখা আইবি নৌকা নিয়ে আইজ ঘাটে যাইব কিনা?”

আইচ্ছা মা আমি যাইতাছি, বলেই দৌড়ে ঘর থেকে বাহির হয়ে যায় এগারো বছরের জাহিদ। পিছন থেকে বাবা আতিকুল মিয়া ডাকতে থাকে, যাইস না জাহিদ। বৃষ্টি কমুক পরে যাইস।  কে শুনে কার কথা? জাহিদ এক দৌড়ে চলে যায় জালিল মাঝির বাড়িতে। খোঁজ নিয়ে জানতে পারে জলিল মাঝির ডায়রিয়া। তার উপরে এই ঝড়বৃষ্টির মাঝে নৌকা নিয়ে যেতে পারবে না। প্রচুর মন খারাপ হয় জাহিদের। তার বাবা রিকশা নিয়া না গেলে তারা আজ খাবে কী? তারা একবেলা না খেয়ে থাকলে তো কেউ তাদের খেতে দেয় না! হঠাৎ করে জাহিদের মনে পড়ে তার বন্ধু তপুর কথা। তপুর একটা কলাগাছের ভেলা রয়েছে। ভেলা দিয়ে তারা পানির মধ্যে ঘুরে, খেলা করে। ভেলেটা তপুর বাবা বানিয়ে দিয়েছে। জাহিদও মাঝেমধ্যে তপুর সাথে ভেলা দিয়ে ঘুরতে যায়। তপু যদি ভেলাটা দেয় তাহলে তার বাবার রিকশাটা পার করতে পারবে।

জাহিদ সোজা চলে যায় তপুর বাড়িতে। গিয়া ডাকতে থাকে, তপু ও তপু? তপু বাহির হয়ে দেখে জাহিদ বৃষ্টিতে কাকভেজা হয়ে বাহিরে দাঁড়িয়ে আছে। জিজ্ঞেস করে, কীরে জাহিদ এত সকালে তুই? কী অইছে? জাহিদ মিনতি গলায় বলে, তপু তোর ভেলাটা দিবি? বাজানের রিকশাটা পার করার লাগি। তপু জিজ্ঞেস করে, জালিল নানার নৌকা কী অইছে? জলিল নানার অসুখ। আর ঝড়বৃষ্টির মাইধ্যে নৌকা লইয়া যাইত না। ঠিক আছে বাড়ির সামনে ক্ষেতে দেখ লইয়া যা বলে তপু অনুমিত দেয়। কত দরদ বন্ধুর জন্য। ছোট মন কত বড় করে বন্ধুত্ব বুঝে! তপু ভেলা নিয়ে চলে যায় নদীতে। একটা খুঁটিতে কোনোরকম বেধে দৌড়ে আবার আসে বাড়িতে। হাঁপাতে হাঁপাতে বাবাকে বলে জলিল মাঝির অসুস্থের কথা। ভেলা ঘাটে বেধে রেখে এসেছে সেই কথা। এগারো বছরের জাহিদ বাবাকে সাহস দেয়, বাজান চিন্তা কইরো না পার করন যাইব রিকশা। এইডা দিয়া আমরা চাইরজন ঘুরি।

আতিকুল মিয়া চোখের জল মুছে জাহিদের দিকে স্নেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে ঘর থেকে রিকশাটা বের করে ধীরেধীরে নদীর ঘাটে যায়। পিছনে পিছনে যায় জাহিদ। রিকশা ভেলাতে তুলার সময় পানিতে নেমে জাহিদ ভেলাটাকে ঘাটের দিকে শক্ত করে ঠেলে রাখে, যেন এদিক সেদিক না যায়। আতিকুল মিয়া ঝুঁকি নিয়েই রিকশা ভেলায় তুলে। তারপর আস্তে আস্তে নদীতে সাঁতার কেটে ভেলাটা এক হাতে টানতে টানতে অনেক কষ্টে রিকশা পার করে ঐপাড়ে। এ পাড় থেকে জাহিদের চিন্তার আর শেষ হচ্ছিল না। মাঝ নদীতে যদি কিছু হয়ে যায়? অবশেষে জাহিদের মুখে হাসি ফুটে।
রিকশা ঘাটে তুলার পর জাহিদ চিৎকার দিয়ে এ পাড় থেকে বলে, বাজান আসার সময় বাদাম আইনো।

গল্পের বিষয়:
গল্প
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত