ডিভোর্স

ডিভোর্স

অরিন্দম নিজের ফ্ল্যাট বিল্ডিংয়ের নীচে নিজের হোন্ডা সিটির বোনেটের ওপর হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানতে টানতে ভাবছিল দিতিপ্রিয়ার কথা। দিতিপ্রিয়া কি ফ্ল্যাট ছেড়ে চলে গেছে! নিশ্চই চলে গেছে। না, হলে ফোন করত। ফোন তো গত সাত দিনে করে নি। চিঠিটা না পাওয়ারও কোনও কারণ নেই। বিছানার ওপর রেখে এসেছিল। না পেলেও অবশ্য দিতিপ্রিয়া ফোন করত। অরিন্দম বুঝতে পারছে না সাত দিন পর ব্যাঙ্গালোর থেকে ফিরে এসে ফ্ল্যাটে যেতে ইচ্ছে করছে না, কেন। তাহলে কি সে ভুল করল! আধ ঘন্টা হলো সে গাড়িতে ঠেস দিয়ে ফ্ল্যাট বিল্ডিংয়ের নিচেই দাঁড়িয়ে আছে।

অরিন্দম আবার একবার নতুন করে দিতিপ্রিয়ার কথা ভাবতে লাগল। দিতিপ্রিয়া যে নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী, তা অরিন্দম যে জানত না, তা নয়। তবে সে যে তার ক্যারিয়ারের জন্য দশ বছরের ভালোবাসাকে উপেক্ষা করতে দ্বিধাবোধ করবে না, তা অরিন্দম ভাবতেই পারছে না।

দিতিপ্রিয়ার সাথে অরিন্দমের প্রথম আলাপ হয়েছিল সব্যসাচী স্যারের বাড়িতে। অরিন্দম তখন বি আই টি এস, পিলানিতে পড়ে। পিলানিতে জয়েন করার মাস তিনেক পর দু তিন দিনের জন্য ছুটিতে বাড়িতে এসেছিল। বাড়িতে আসার পরদিনই বিকেলে সে সব্যসাচী স্যারের বাড়িতে তার সাথে দেখা করতে গিয়েছিল।

সব্যসাচী স্যার তার স্কুলের টিচার ছিলেন না। এমনকি আদর্শ বিদ্যালয়ের অঙ্কের টিচার সব্যসাচী মিত্রের কাছে অরিন্দম প্রথাগত ভাবে নিয়মিত টিউশন নিতেও যেত না। অরিন্দমদের প্রতিবেশী হিসাবে যাতায়াত ছিল। পড়াশোনায় ভালো ছেলে হিসাবে পাড়ায় অরিন্দমের নাম ডাক ছিল। সেই সূত্রেই সব্যসাচী স্যার প্রায়ই অরিন্দমের পড়াশোনার খবরাখবর নিত, অরিন্দমকে খুব স্নেহ করত। তিনি তার স্কুলের বহু ছাত্রকে টিউশন দিতেন। তবে তাছাড়াও অরিন্দমের মত অনেক মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীর তার বাড়িতে যাতায়াত ছিল। দিতিপ্রিয়াও ছিল সেরকম সব্যসাচী স্যারের স্নেহের ছাত্রী। দিতিপ্রিয়া পড়ত কমলা গার্লস স্কুলে আর থাকত পাশের পাড়ায়।

সেদিন অরিন্দম সব্যসাচী স্যারের বাড়িতে ঢুকে সোজা পৌঁছে গিয়েছিল সেই বাইরের দিকের বড় ঘরটায়, যেখানে সব্যসাচী স্যার ছাত্র-ছাত্রীদের টিউশন দিত। ঘরে ঢুকেই দেখে সব্যসাচী স্যার একটি মেয়েকে ডিনামিক্সের কোন অঙ্ক বোঝাচ্ছেন। অরিন্দম ঘরে ঢুকতেই, সব্যসাচী স্যার আর সেই মেয়েটি একসাথে তার দিকে তাকাল। অরিন্দমকে দেখেই সব্যসাচী স্যার বলে উঠলেন,’অরিন্দম! তুই কবে এলি? যাকগে, ভালোই হয়েছে, তুই এসেছিস। দিতিপ্রিয়ার ডিনামিক্সের তিন-চারটে প্রবলেম আছে। দ্যাখ তো একটু।

সলভ করে ওকে একটু বুঝিয়ে দে। আমি ততক্ষণে একটু বাগচী বাবুর বাড়ি থেকে ঘুরে আসছি। শুনলাম ওনার মা মারা গেছেন।’ এই কথা বলে, সব্যসাচী স্যার ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। অরিন্দম দিতিপ্রিয়ার দিকে তাকাল। দিতিপ্রিয়া তখনও এক দৃষ্টে অবাক চোখে অরিন্দমের দিকে তাকিয়ে আছে। অরিন্দম মেয়েদের এরকম দৃষ্টির সাথে বেশ পরিচিত। সে জানে যে তার চেহারা, মুখমন্ডল খুব সহজেই যে কোন মেয়েকে আকৃষ্ট করে। সে তাই একটুও ইতস্তত না করে, সোজা গিয়ে দিতিপ্রিয়ার পাশের চেয়ারটা টেনে নিয়ে বসে সরাসরি দিতিপ্রিয়ার চোখের ওপর চোখ রেখে বলল,’দেখাও দেখি প্রবলেম গুলো। স্যার তো আমার ওপর ভরসা করে চলে গেলেন। জানি না পারব কি না। অবশ্য তোমার ওই দাস মুখার্জির পুরো বইটাই আমার গুলে খাওয়া আছে। আশা করি হয়ে যাবে।’

দিতিপ্রিয়া দাস মুখার্জির স্টাটিক্স, ডিনামিক্সের বইরের যে পৃষ্ঠায় প্রবলেম গুলো আছে, টিক মার্ক করে, তার মাঝে পেনটা রেখে অরিন্দমের হাতে ধরিয়ে দিতে দিতে বলল,’সব্যসাচী স্যার, সব সময় তোমার কথা, তোমার প্রশংসা সবার কাছে করেন। বলেন যে তোমার মত মেধাবী ছাত্র উনি আর দ্বিতীয়টি দেখেন নি।’ কথা শেষ করেই দিতিপ্রিয়া লজ্জা পেয়ে জিব কেটে নিজের মনেই বলে উঠল,’এ মা!’ অরিন্দম বইটা হাতে নিয়ে বলল,’কি হলো?’ দিতিপ্রিয়া বলল,’ আমি তোমাকে আপনি না বলে তুমি বলে সন্মধন করছি। ধ্যূত! আবার তুমি বলে ফেললাম।’ অরিন্দম হেসে ফেলল। হাসতে হাসতেই বলল,’ তুমি বলায় কোনও অপরাধ নেই। তুমি শব্দটা, আপনি র চেয়ে শুনতে ভালোই লাগে। বেশ আপন আপন ভাব আছে।’ এই কথা বলে অরিন্দম প্রবলেম গুলো পড়তে শুরু করল।

অরিন্দম খুব সহজেই প্রবলেম তিনটে সলভ করে দিতিপ্রিয়াকে বুঝিয়ে দিয়ে বলেছিল,’আর কিছু আছে?’ দিতিপ্রিয়া হেসে বলেছিল,’আপাতত নেই। তুমি শুধু ভালো ছাত্রই নয়, বেশ ভালো টিচারও বটে। খুব ভালো বুঝিয়ে দিলে।’ দিতিপ্রিয়ার কথার মধ্যে যেন একটা অন্যধরণের আকর্ষণ অরিন্দম অনুভব করছিল। এক ঘণ্টাও হয় নি, আলাপ হয়েছে, কিন্তু দিতিপ্রিয়া এমনভাবে কথা বলছিল যে অরিন্দমের মনে হচ্ছিল দিতিপ্রিয়া যেন তার বহুদিনের পরিচিত। আর এই আকর্ষণের ফলেই হয়ত অরিন্দমের দিতিপ্রিয়ার সাথে কথা বলতে ভালো লাগছিল।

সব্যসাচী স্যারের বাগচীবাবুর বাড়ি থেকে ফিরতে আরও ঘন্টা খানেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। আর সেই এক ঘন্টা ধরে অরিন্দম, দিতিপ্রিয়ার সাথে গল্প করেছিল। কথায় কথায় দিতিপ্রিয়া বলেছিল,’ তুমি তো আবার পিলানি চলে যাবে। দরকার পরলে কি যোগযোগের কোনও উপায় আছে?’ অরিন্দম বলেছিল,’ আমি একটা নম্বর দিচ্চি। ওই নম্বরে ফোন করে তোমার নম্বর দিয়ে শুধু বলে দিতে হবে যে আমি যেন তোমাকে ফোন করি। সেক্ষেত্রে আমি ক্যাম্পাসের বাইরে এসে এস টি ডি/পি সি ও থেকে তোমাকে ফোন করতে পারব।’ দিতিপ্রিয়া বলল,’ তার চেয়ে তো একটা ভালো রাস্তা আছে। যদি অবশ্য তোমার আপত্তি না থাকে।’

অরিন্দম জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে দিতিপ্রিয়ার দিকে তাকাতেই দিতিপ্রিয়া নিজের খাতা থেকে একটা কাগজ ছিড়ে তার ওপর নিজের বাড়ির ফোন নম্বরটা লিখে, কাগজটা অরিন্দমের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,’ শনিবার রাত্রে রাত্রে তুমি বরং আমাকে ফোন কোরো।’ অরিন্দম হেসে বলল,’ তবে ফোনে কি আর প্রবলেম সলভ করা যাবে? যাইহোক, চেষ্টা করব।’ অরিন্দমের কথা শেষ হওয়ার আগেই সব্যসাচী স্যার ঢুকলেন। ঢুকেই দিতিপ্রিয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন,’ কিরে হয়ে গেছে তো?’ দিতিপ্রিয়া ঘাড় নাড়ল। তিনি আবার বললেন,’ আর হ্যাঁ, তুই একটু অরিন্দমের সাথে যোগাযোগ রাখিস। খুব ভালো গাইড করতে পারবে তোকে।’

সব্যসাচী স্যার আসার পর, অরিন্দম আর দিতিপ্রিয়া একসাথেই বেরিয়ে পড়েছিল। বেশ কিছুটা রাস্তা হাঁটতে হাঁটতে গল্প করেছিল। তারপর অরিন্দমের বাড়ির সামনে এসে, অরিন্দম বলল,’এই হচ্ছে আমাদের বাড়ি। সামনের রবিবার পর্যন্ত আছি। যদি সময় হয় তো চলে আসতে পার।’ সত্যি সত্যি তার দুদিন পর, শনিবার বিকেলে দিতিপ্রিয়া, অরিন্দমের বাড়িতে এসেছিল। বেশ কয়েকটা ফিজিক্সের প্রবলেম নিয়ে। কিন্তু অরিন্দমের মনে হয়েছিল, ফিজিক্সের প্রবলেম নয়, দিতিপ্রিয়া যেন তার সাথেই দেখা করতে এসেছিল। এরপর কথা অনুযায়ী প্রতি শনিবার রাত্রে অরিন্দম, দিতিপ্রিয়াকে ফোন করত। না, পড়ার বিষয় নিয়ে কথা হতো না। পড়া বাদ দিয়ে আর সব কিছুই কথা হতো। মাস তিনেকের মধ্যেই ওরা একে অপরকে যে ভালোবাসতে শুরু করেছে, তা দুজনেই বুঝতে পেরেছিল।

অরিন্দম বি আই টি এম থেকে পাস করে বেরোনোর পর অনেক ভালো ভালো চাকরির অফার পেয়েছিল। অধিকাংশই ছিল বড় বড় মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানি। এমনকি বিদেশে যাওয়ার সুযোগও বেশ কয়েকটা পেয়েছিল। কিন্তু অরিন্দম সব কটা লোভনীয় চাকরির সুযোগ ছেড়ে দিয়ে যোগ দিয়েছিল একটা আধা সরকারি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থায়। মাইনের দিক দিয়ে দেখতে গেলে খুবই সাধারণ চাকরি। দিতিপ্রিয়া বার বার বলা স্বত্বেও, অরিন্দম মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিতে জয়েন করে নি। সে দিতিপ্রিয়াকে বলেছিল,’ক্যারিয়ার বা আর্থিক দিক দিয়ে ওই মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানির চাকরি গুলো খুবই আকর্ষণীয়।

কিন্তু ওই আকর্ষণে সাড়া দিলে, ভবিষ্যতে শুধু ওই ক্যারিয়ার আর অর্থের পেছনেই দৌড়াতে থাকব, খোলা মেলা জীবনটা হয়তো হারিয়ে যাবে। তুমি জানো আমি বই পড়তে ভালোবাসি, একটু আধটু ছবি আঁকার শখ আছে, আমি বেড়াতে ভালোবাসি। ওই সব চাকরিতে জয়েন করলে, আমাকে আমার এই ছোট্ট ছোট্ট শখ বা ভালোলাগা গুলোকে বিসর্জন দিতে হবে। তাছাড়া এখন রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা গুলোতেও পেশাদারি মনোভাব এসে গেছে, কারণ তাদেরকেও এখন প্রাইভেট কোম্পানি গুলোর সাথে কমপিট করেই টিকে থাকতে হচ্ছে। তাছাড়াও আর একটা ব্যাপার আছে, আর তা হলো আমি জানি যে এই ধরণের আধা সরকারি মকোম্পানির চাকরিতে এটলিস্ট বসের পুরোপুরি গোলাম আমাকে হতে হবে না। আর ওই মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিতে কিন্তু একটু স্বস্তি বা শ্বাস নেওয়ার সময় পাব না। তাই আমার মনে হয়, আমি ভুল করছি না। ‘ অরিন্দমের সাথে এ নিয়ে দিতিপ্রিয়া আর বেশি তর্ক করে নি।

বছর ঘুরতে না ঘুরতেই দিতিপ্রিয়াও আহমেদাবাদ থেকে এম বি এ শেষ করে যোগ দিল এক মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিতে। না, অরিন্দম আপত্তি করে নি। সে জানত দিতিপ্রিয়ার স্বপ্নের কথা। দিতিপ্রিয়ার সাথে পরিচয়ের কয়েক দিনের মধ্যেই দিতিপ্রিয়া বলেছিল যে তার স্বপ্ন বড় মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানির এক্সিকিউটিভ হওয়া। অরিন্দম সেই স্বপ্নের কথা শুনে তখন খুব খুশিই হয়েছিল। মনে মনে ভেবেছিল, দিতিপ্রিয়া আর পাঁচটা মেয়ের থেকে একটু আলাদা। তখনও সে ভাবতে পারে নি যে তার মত সাদা মাটা ছেলের এই ধরণের উচ্চাকাঙ্ক্ষী মেয়ের সাথে সংসার করা কতখানি কঠিন হতে পারে! আর যখন বুঝল, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।

সমস্যাটা প্রথম দেখা দিল দিতিপ্রিয়া চাকরি পাওয়ার তিন বছর পর, বিয়ের ঠিক পরে পরেই। অরিন্দমের অফিস ধর্মতলায় আর দিতিপ্রিয়ার অফিস সল্টলেক। ফলে অরিন্দমদের কোন্নগরের বাড়ি থেকে দিতিপ্রিয়ার যাতায়াতের খুব অসুবিধা হচ্ছিল। তাকে সকাল আটটার মধ্যে বেরিয়ে যেতে হচ্ছিল। রাত্রেও ফিরতে প্রায় নটা।

দিতিপ্রিয়া প্রায়ই বলতে শুরু করল,’আমাদের একটা কলকাতায় ফ্ল্যাট নিলে হয় না?’ অরিন্দমের কথাটা শুনে খুব খারাপ লাগত। সে বাবা, মায়ের এক ছেলে। বাবা সবে রিটায়ার করেছেন। এরকম অবস্থায় বাবা, মাকে ছেড়ে দিয়ে সে কলকাতায় ফ্ল্যাট নিয়ে থাকবে, বাবা, মা হয়ত কিছু বলবে না, কিন্তু মনে মনে কষ্ট পাবেন। তাছাড়া, সেও তো চেয়েছিল বাবা, মার সাথেই থাকতে। তার বড় বড় মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানি বা বিদেশের চাকরির সুযোগ ছেড়ে দেওয়ার অন্যতম কারণ তো ছিল এটাও। সে আমতা, আমতা করে দিতিপ্রিয়াকে বলত,’হ্যাঁ, মনে হচ্ছে, তাই করতে হবে।’ মুখে বললেও, অরিন্দম ফ্ল্যাট কেনার ব্যাপারে কোনও উদ্যোগ নিচ্ছিল না। হঠাৎ একদিন রবিবার দুপুরে খেতে খেতে অরিন্দমের বাবাই কথাটা বলল,’আমার মনে হয় তোদের কলকাতায় একটা ফ্ল্যাট কিনে নেওয়া ভালো। বউমার যাতায়াতে ভীষণ ধকল হচ্ছে। যদি টাকা পয়সার দরকার পরে তো বলিস।’ অরিন্দমের বাবার কথা শোনার পর থেকে দিতিপ্রিয়া নিজেই উদ্যোগ নিয়ে কলকাতায় একটা ফ্ল্যাট কিনে ফেলল অরিন্দমের নামে ব্যাঙ্ক থেকে লোন নিয়ে। মাস দুয়েকের মধ্যে ওরা কলকাতার ফ্ল্যাটে শিফট করে গেল।

ফ্ল্যাটে আসার পর থেকে অরিন্দমের জীবনটা যেন আরও দুর্বিসহ হয়ে উঠল। অরিন্দম অফিস থেকে ফিরত সাতটা, সোয়া সাতটা নাগাদ। বাড়িতে যখন ছিল, সে ঘরে ফিরলেই মা চা বানিয়ে দিত। চা খেয়ে ফ্রেস হয়ে বাবা, মার সাথে একটু-আধটু গল্প করে নিজের ঘরে গিয়ে বই পড়ত বা কখনও ইচ্ছে হলে একটু রবীন্দ্র সংগীত শুনত। ফ্ল্যাটে এসে সমস্যায় পড়তে হলো। নিজেই চা বানিয়ে খেত। ফ্রেস হয়ে ব্যালকনিতে গিয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে বসে থাকত। দিতিপ্রিয়া অনেক দেরিতে ফিরতে শুরু করল। আগে সাতটায় অফিস থেকে বেরিয়ে পড়ত। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই তার প্রমোশন হলো। তার ফিরতে ফিরতে সাড়ে নটা বেজে যেত। প্রায়ই অফিস থেকে বেরোনোর সময় ফোন করে অরিন্দমকে বলত,’ খাবার গুলো গরম করে রেখো, আমি কয়েকটা রুটি কিনে আনছি।’

দিতিপ্রিয়া মাসের অর্ধেকের বেশি দিন ট্যুরেই থাকতে শুরু করল। এমনকি মাঝে মধ্যেই তাকে হেড অফিস প্যারিসে যেতে হচ্ছিল। কলকাতায় থাকলে সে রাত্রে ফিরে কোনোক্রমে হাত মুখ ধুয়ে, খেয়ে দেয়ে, স্নান করে ঘুমিয়ে পড়ত। মাঝে মধ্যে রাত এগারোটা, বারোটাও হয়ে যেত। অরিন্দম কখনো দেরি হওয়ার কারণ জিজ্ঞেস করত না। কিন্তু খুব বেশি দেরি হলে দিতিপ্রিয়া নিজেই বলত,’আজ অফিসে পার্টি ছিল। তাই একটু বেশি দেরি হয়ে গেল।’ অরিন্দমের বার বার মনে হত সে যেন একা। দিতিপ্রিয়ার সাথে তার যেন কোনো সম্পর্কই নেই। বিয়ের ঠিক পর পরই হানিমুন করতে পাঁচ দিনের জন্য পাটায়া গিয়েছিল।

সেই পাঁচ দিনের সুখস্মৃতি ছাড়া তাদের বিবাহিত জীবনে আর কোনও মধুর স্মৃতি যেন নেই। এমনকি রবিবার বা ছুটির দিনেও সেরকম কোন সময় থাকত না, যে দুজনে বসে একটু সময় কাটাবে। সারাদিন ঘরদোর সাফাই আর বাজার হাট করতেই কেটে যেত। ধীরে ধীরে অরিন্দম মানসিক অবসাদে ভুগতে শুরু করল। সেই মানসিক অবসাদ থেকেই অরিন্দম নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ল। প্রায় রোজই সে অফিস থেকে ফেরার পথে মদ কিনে আনত। ব্যালকনিতে বসে একা একাই মদ খেত। একদিন অফিস থেকে ফিরে বিরক্ত হয়ে দিতিপ্রিয়া বলল,’কেন এসব ছাই পাস গুলো গিলছ। আগের মত গল্পের বই পড়া, গান শোনা, ছবি আঁকা, এসবের কি হলো?’ অরিন্দম নেশার ঘোরে ছিল। তাই সেও মেজাজ হারিয়ে বলল,’আমি কি করব, কি খাব, তা নিয়ে তোমার মাথা না ঘামালেও চলবে।

-আমার যদি মাথা ঘামানোর অধিকারই না থাকে, তাহলে আমাকে বিয়ে করলে কেন? আমার সাথে আছোই বা কেন?

-এই প্রশ্নটা তো আমার তোমাকে করা উচিত ছিল।

-মানে?

-মানে টা কি তুমি বোঝ না? ঠিক, আমরা বিয়ে করেছি। কিন্তু আমরা কি আর স্বামী-স্ত্রী আছি? আমার তো মনে হয় রাত্রে তোমার একটা থাকার জায়গা চাই, তাই এই ফ্ল্যাটটা কিনেছি। তোমার অফিসের কাজকর্ম মিটিয়ে আর কি আমার সাথে দু দন্ড বসে কথা বলার সময় আছে? এ ভাবে কত দিন চলতে পারে?

-কেন? তুমি কি জানতে না, আমি কি চাই? আমি তো তোমাকে সব কথাই বলেছিলাম।

-ঠিক, তুমি বলেছিলে। কিন্তু তারজন্য তুমি আমাকেও ভুলে যেতে পারছ? সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কোম্পানির কাজ করছ, কোম্পানি মাসের শেষে মোটা অঙ্কের এমনকি আমার মাইনের দ্বিগুণের বেশি টাকা তোমার ব্যাঙ্ক একাউন্টে জমা হচ্ছে। কিন্তু ওই টাকা গুলো দিয়ে কি হবে, যদি এ ভাবেই চলতে থাকে?

-আমার মাইনের মোটা অঙ্কটা দেখে তোমার হিংসে হচ্ছে?

-তুমি— অরিন্দম কিছু একটা বলতে গিয়েও চুপ হয়ে গেল। দিতিপ্রিয়ার শেষ কথাটায় সে ভীষণ আঘাত পেল। সে ঘর থেকে উঠে ব্যালকনিতে গিয়ে একটা সিগারেট ধরাল। মনে মনে ভাবছিল, দিতিপ্রিয়া কি সব ভুলে গেল? সে ও তো কত বড় বড় চাকরি পেয়েছিল। কিন্তু সে ওই চাকরি গুলো করে নি, শুধুমাত্র একটু কোয়ালিটি টাইম যাতে সে দিতিপ্রিয়া আর তার বাবা, মাকে দিতে পারে। দু তিনটে পর পর সিগারেট খেয়ে সে চোখ বন্ধ করে বসে ছিল। তার দু চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে গেল বেয়ে নেমে আসছিল। কতক্ষন অরিন্দম ও ভাবে বসেছিল তার খেয়াল ছিল না। সম্বিৎ ফিরল দিতিপ্রিয়ার কথায়,’ ভেতরে এস। খেতে দেব।’ অরিন্দম চোখ বন্ধ করেই বলল,’ তুমি খেয়ে শুয়ে পড়। আমার আজ আর খাওয়ার ইচ্ছে নেই।’

সেই রাত্রের পর থেকে অরিন্দম আর দিতিপ্রিয়ার কথা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। অরিন্দম অফিস থেকে বেরিয়ে আর সোজা ফ্ল্যাটে ফিরত না। এদিক, সেদিক ঘুরে কোনও রেস্ট্রুরেন্ট খেয়ে ঘরে ফিরত। তবে সেই রাতের পর থেকে সে মদ খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। এ ভাবেই প্রায় মাস খানেক কেটে গেল। একদিন রাত আটটা নাগাদ অরিন্দম পার্ক স্ট্রিটের একটা রেস্ট্রুরেন্টে ঢুকেছিল। একটা টেবিলে বসে ওয়েটারকে খাওয়ার অর্ডার দিতে দিতে তার চোখ গেল দূরের কোনের দিকে একটা টেবিলে। অরিন্দম চমকে উঠল। দেখে দিতিপ্রিয়া আর মিস্টার থমাস বসে আছে। ওরাও বোধ হয় খাওয়ারের অর্ডার দিয়ে বসে আছে। অরিন্দম ভালো করে তাকিয়ে দেখে টেবিলের ওপর দুজনে, দুজনের হাত একে অপরের ওপর রেখে খুব নিচু স্বরে কথা বার্তা বলছে। মিস্টার থমাসের মুখটা দেখা যাচ্ছে না, তবে দিতিপ্রিয়ার চোখ দুটো পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। দিতিপ্রিয়া মৃদু মৃদু হাসছে। অরিন্দমের অর্ডার দেওয়া হয়ে গিয়েছিল। তাও সে খাবারের অপেক্ষা না করে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল। ধীর পায়ে রেস্ট্রুরেন্ট থেকে বেরিয়ে পড়ল। মনে মনে ভাবল এই তা হলে দিতিপ্রিয়ার অফিসের পার্টি!

মিস্টার থমাসের সাথে অরিন্দমের পরিচয় ছিল। সে দিতিপ্রিয়ার বস। বেশ কয়েকবার ট্যুরে যাওয়ার সময়, অরিন্দম এয়ারপোর্টে দিতিপ্রিয়াকে ড্রপ করে দিয়ে এসেছিল। মিস্টার থমাস ও ওই সব ট্যুরে দিতিপ্রিয়ার সাথে ছিল। দিতিপ্রিয়াই, মিস্টার থমাসের সাথে অরিন্দমের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল, প্রথম একসাথে ট্যুরে যাওয়ার সময়।

সব কিছু বোঝার পরও অরিন্দম দিতিপ্রিয়াকে কিছু বলে নি। কিন্তু সে নিজেকে সংযত রাখতে পারে নি। অনেকটা সন্দেহপ্রবন স্বামীর মত সে দিতিপ্রিয়া আর মিস্টার থমাসের ব্যাপারে, বিশেষ করে তাদের দুজনের সম্পর্কের ব্যাপারে খোঁজ খবর নিতে শুরু করল। সে কয়েকদিনের মধ্যেই সব কিছু জেনে গেল। কিন্তু না, অরিন্দম দিতিপ্রিয়ার সাথে ঝগড়া তো দূর, কথা কাটাকাটি, এমনকি কোনও কথাও বলে নি। একদিন অফিসে বসে সে লিখতে শুরু করল- দিতিপ্রিয়া,

সেদিন সন্ধ্যের পর পার্কস্ট্রিটের রেস্ট্রুরেন্টে তোমাকে আর মিস্টার থমাসকে দেখলাম। এ ব্যাপারে তোমাকে প্রশ্ন করলে তুমি হয়ত বলতে ‘এই ধরণের কোম্পানিতে টিকে থাকতে হলে বা ক্যারিয়ারকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে, মাঝে মধ্যে একটু-আধটু বসকে সঙ্গ দিতেই হয়।’ আমি হয়ত তাই বিশ্বাস করতাম। কিন্তু প্রশ্নটা আমার করার প্রয়োজন হলো না। কারণ সত্যিটা আমি জেনেই গিয়েছি। অবাক হচ্ছো? কি করে জানলাম? সেদিন শুধু তোমাদের দুজনকে বসে থাকতেই দেখি নি, দূর থেকে হলেও তোমার মিস্টার থমাসের সাথে তোমার সম্পর্কটা কিন্তু তোমার দু চোখের ভাষায় লেখা ছিল, যেটা আমার পড়তে অসুবিধা হয় নি। কারণ, ভুলে যেও না, আমিও একজন প্রেমিক। অবশ্য আমার মিস্টার থমাসের চোখের ভাষা পড়ার সুযোগ হয় নি, তাই বলতে পারব না, সে ঠিক কেমন প্রেমিক।

দশ বছর ধরে একজনের সাথে প্রেম করে বিয়ে হওয়ার পর, সে যে আর কাউকে ভালোবাসতে পারবে না, এরকম কথা কোথাও লেখা নেই আর আমি বিশ্বাস করি, এরকম হতেই পারে। তাই তোমার মধ্যে কোনও দোষ আমি দেখি নি। আসলে দোষটা আমারই হয়েছিল। তুমি আমাকে সত্যিই ভালোবাসতে কি না জানি না, তবে আজ বুঝি তোমার প্রথম প্রেম ছিল ক্যারিয়ারের সাথে।

তাই খুব সহজেই তুমি আর এক ক্যারিয়ারিস্ট মিস্টার থমাসের প্রেমে মজে গেছ। তোমার পক্ষে একটা ছেলে যে ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবে না, মা, বাবার সাথে থাকতে চায়, ছবি আঁকতে ভালোবাসে, গল্পের বই পড়তে ভালোবাসে, রবীন্দ্র সংগীত শুনে সময় কাটাতে চায়, তাকে আর কত দিন ভালোবাসতে পারবে? তাই যা হওয়ার তাই হয়েছে। তোমার মনে আমার জায়গায় এসে গেছে মিস্টার থমাস। যত দূর জানি, সে বিবাহিত, তার একটি মেয়ে আছে। সেই বিবাহিত পুরুষের সাথে ট্যুরের নামে দেশ বিদেশে ঘুরে বেড়াছ, হোটেলের এক রুমে রাত কাটাচ্ছো। এর মধ্যেও দোষের কিছু নেই। যদিও সমাজের চোখে এটা ব্যভিচার ছাড়া আর কিছু নয়। কিন্তু আমার মনে হয়, তুমি আমাকে ঠকাচ্ছো আর মিস্টার থমাস, তার স্ত্রীকে ঠকাচ্ছেন। আমি জানি না, মিস্টার থমাসের তার স্ত্রীকে ডিভোর্স দিতে কি অসুবিধা আছে?

তবে আমার তরফ থেকে তোমায় বলি যে আমি তোমায় ডিভোর্স দিয়ে মুক্তি দিতে চাই, মুক্তি পেতে চাই আমিও। আমি সাত দিনের জন্য বাইরে যাচ্ছি। চাবি পাশের ফ্ল্যাটের রেনু বউদিকে দিয়ে যাচ্ছি। যদিও জানি তোমার কাছেও আমাদের ফ্ল্যাটের চাবি আছে। সাত দিন পর ফিরে এসে যেন তোমায় আর আমার ফ্ল্যাটে না দেখি। জানি তোমার মত বড় কোম্পানির ম্যানেজারের পক্ষে একটা ফ্ল্যাট খুঁজে নেওয়ার জন্য সাত দিন যথেষ্ট। আর হ্যাঁ, আমার উকিল ডিভোর্সের নোটিস তোমার অফিসের ঠিকানায় পাঠিয়ে দেবে। ভালো থেকো। তোমার আর মিস্টার থমাসের জন্য আগাম শুভ কামনা রইল।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত