দুঃস্বপ্ন

দুঃস্বপ্ন

রিকশায় চড়ে পরীক্ষার হলে যাচ্ছি। এমন সময় আম্মু ইশারা করে পাশের রিকশার ছেলেকে দেখিয়ে বলল,  “দেখছোস? পোলাটা কত ট্যালেন্টেড? রিকশায় যাইতে যাইতেও বই পড়তাছে?”

-“আম্মু, ওরা সারাবছর পড়ে না। এজন্যই শেষ সময়ে নাক ডুবিয়ে পড়তেছে।”
-“তুই না সারাবছর পড়ছোস? তোর বইয়ের কভারের ধুলায় তো তোর চৌদ্দগুষ্টির নাম লেখা যাইবো।”

রিকশায় বসে বসে আম্মু আমার দুই বছরের পড়াশোনার একটা সংক্ষিপ্ত ইতিহাস বলে ফেলল, সাথে এটাও মনে করিয়ে দিল এবার পরীক্ষায় ফেল করলে পড়াশোনা বন্ধ। আম্মু তো আর বুঝে না আমি মনে মনে এটাই চাই!
পরীক্ষার হলের সামনে এসে রিকশা থামলো। আমি ঢুকতে যাবো ঠিক এমন সময় আম্মু কঠোর গলায় মনে করিয়ে দিলো, যেন মনযোগ দিয়ে লিখি, কোন কোয়েশ্চেনের এন্সার যেন না ছাড়ি! রিকশাওয়ালা ও আমাকে অবাক করে দিয়ে বলল, “আম্মাজান, ভালোমত পরীক্ষা দিয়েন।” বলে ভাড়া নিয়ে চলে গেল।

পরীক্ষার হলে ঢুকে দেখি আরেক সংকট! সিট খুঁজে পাচ্ছি না! একে ওকে জিজ্ঞেস করাতে সিট বের করে দিল। যেদিকে বাঘের ভয় সেদিকে সন্ধ্যা হতেই হবে। সিট পড়েছে একেবারে সামনের বেঞ্চে! তাকিয়ে দেখলাম আমার সিটের পাশে অন্য কলেজের ছেলের সিট! মিষ্টি কুমড়া যেমনটা হয় ঠিক তেমন সাইজের একটা মোটু আমার সীটের পাশে বসে আছে! কি বিরক্তিকর! এই মোটু বসবে আমার পাশে? জায়গা হবে তো? আমি চুপচাপ বসে পড়লাম। আজকে যে কপালে কী আছে! কিছুক্ষণ পর একটা ছেলে এসে আমার সামনে দাঁড়ালো। ছেলেটাকে দেখেই মোমবাতির কথা মনে পড়ে গেল। সাদা আর চিকন ঢ্যাঙঢ্যাঙে শরীর! তার উপর চুলগুলো লালচে রঙের। আমার পাশের মোটুটাকে বলল, “এই পটকা! উঠ আমার সীট থেকে।” সঙ্গে সঙ্গে মোটু উঠে সামনের বেঞ্চে বসলো। মোমবাতি বসলো আমার পাশে। আমার পানির ফ্ল্যাক্স ইশারা করে বললো, “এক্সকিউজ মি? পানিটা কি একটু খেতে পারি?”

-“হ্যাঁ।” বলেই আমি কপালের ঘাম মুছলাম। পরীক্ষার টেনশনে আমার কলিজাও শুকিয়ে গেছে। আমি পানি খাওয়ার জন্য বোতলে হাত দিতেই দেখি মোমবাতি আমার বোতলের পানি অর্ধেক করে ফেলেছে। স্যার আসলেন। একজন আসলেন না, রেলগাড়ির মতো পরপর পাঁচজন রুমে ঢুকলেন। এতো কড়া গার্ড জেল হাজতেও হয় কিনা সন্দেহ! স্যার খাতা দিলেন। যেখানে অভাগা তাকায় সেখানেই নদী শুকায়! ঠিক আমার বেলায় এসে খাতা গেল শেষ হয়ে। একজন সহকারী দ্রুত গিয়ে খাতা এনে দিলেন। সবার পরীক্ষা শুরু হওয়ার ৫ মিনিট পর শুরু হলো আমার পরীক্ষা।

১০ মিনিট পর হঠাৎ করে দমকা হাওয়ায় জানালা দিয়ে কোয়েশ্চেন পেপার গেল উড়ে! কার মুখ দেখে যে সকাল হয়েছিল! নতুন কোয়েশ্চেন পেপার দেওয়া হলো। গেল আমার মোট দশ মিনিট!
দুই পৃষ্ঠা লিখেই কলমের কালি ফুরিয়ে গেল। অথচ আমি নতুন কলম এনেছিলাম। ব্যাগ চেক করেও আর কোন কলম পেলাম না! অবশেষে মোমবাতির থেকে একটা কলম ধার নিলাম যার ক্যাপ উধাও এবং পশ্চাৎদেশ কামড়ানো! যতদূর পারলাম হাতের স্পিড বাড়িয়ে লিখতে লাগলাম। ৫ নং সৃজনশীলের ক এর উত্তর কিছুতেই মনে করতে পারছি না! কনক শব্দের অর্থ কী? ফিসফিস করে পাশের ছেলেটাকে ডাকলাম, “এই মোমবাতি?” ছেলেটা এদিক ওদিক তাকালো, আমি কলম দিয়ে টোকা দিলাম বেঞ্চে। ছেলেটা বলল, “আমাকে বলো?”

-“কনক শব্দের অর্থ কি?”
-“সোনা।”
-“কি?”
-“সোনা সোনা। মানে স্বর্ণ।”

আচ্ছা, আমিও লিখলাম কনক শব্দের অর্থ স্বর্ণ। পরীক্ষার সময় প্রায় শেষ। আর মাত্র পাঁচ মিনিট বাকি! অথচ আমার আরও দুইটা সৃজনশীল বাকি! কীভাবে কি করবো! দ্রুত হাত চালিয়ে লিখতে লাগলাম। প্রয়োগ শেষ করেছি ঠিক এমন সময় স্যার এসে খাতা টান দিলেন। “সময় শেষ!” হায় হায়! অথচ আমার লেখা এখনও বাকি! স্যারকে অনুনয় বিনয় করতে করতে কাঁদতে লাগলাম। স্যার না না বলে জোর করে খাতা টেনে নিলেন। এমন সময় “ঘ্যাঁচ” করে শব্দ হলো। খাতা ছিঁড়ে গেছে।

সর্বনাশ! আমার পরীক্ষার খাতা শেষ! আমার লাইফ শেষ! বেঞ্চে মাথা নিচু করে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলাম। ঠিক এমন সময় আম্মুর কন্ঠ শুনতে পেলাম। মাথায় হাত বুলিয়ে বলছে, “কিরে, তুই কান্দোস ক্যান? কি হইছে? জলদি ঘুম থেকে উঠ। পরীক্ষা দিতে যাবি না?” আমি চোখ মেলে তাকালাম। নিজের ঘরে নিজের বিছানায় শুয়ে নিজের চোখের পানিতে নিজের বালিশ ভেজাচ্ছি আমি। যাক বাবা! আল্লাহ বাঁচিয়েছে। তাহলে এতোক্ষণ যা দেখছিলাম সব দুঃস্বপ্ন ছিল!

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত