ইরা

ইরা

অফিসের কাজে ব্যস্ত ছিলাম, এমন সময় মা ফোন করলেন। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে কাঁদোকাঁদো কণ্ঠে মা বললেন, “হাবিব? তোর বড়নানী খুব অসুস্থ রে! যায় যায় অবস্থা। আমি মিরপুরে চলে আসছি। তুইও তাড়াতাড়ি চলে যায়।” আমি অফিসের জরুরি কাজ ফেলে রেখে বড়নানীকে দেখার জন্য মিরপুরে রওনা দিলাম। বড়নানী মায়ের খালা হন। আমাকে প্রচণ্ড স্নেহ করেন। বেশ ক’দিন ধরেই শরীরের অবস্থা তাঁর ভালো যাচ্ছে না৷ মায়ের কান্না শুনে আমার মন ধ্বক করে উঠেছে।

গিয়ে দেখি বড়নানীকে দেখতে আরও অনেক মানুষ ভীড় জমিয়েছে। ঘরভর্তি মানুষ, তাদের মধ্যে আমার মা-ও মুখে আঁচল ধরে কান্না চেপে বসে আছেন বড়নানীর মাথার কাছে। আমাকে ডেকে নানীর পাশে বসালেন। তাকিয়ে দেখলাম, শুকনো একটা মুখ, একদিনেই যেন গুঁটিসুটি একটা বাচ্চা হয়ে গেছেন! যেন তাকে কোলে তুলে নেওয়া যাবে। বড়নানী ফোঁকলা দাঁতে আমাকে দেখে হাসলেন, বললেন, “ভালা আছো ভাই?” আমি কিছু বলতে পারলাম না। সালাম দিলাম। নানী বিড়বিড়িয়ে সালামের জবাব নিলেন। আমার মনটা কেমন যেন হুঁ হুঁ করে উঠলো।

ঘরভর্তি মেহমান। এদের খানাপিনা, আতিথিয়েতার কাজ করছেন বড়নানীর বড় ছেলে, অর্থাৎ বাবুল মামা। বাবুল মামার মেয়ে ইরা এসে আমাদের খাওয়ার দিয়ে যাচ্ছে। কার কী লাগবে জেনে নিচ্ছে, সবার সাথে হাসিখুশিভাবে কথা বলছে, বড়নানীর ভেজা কাঁথা পাল্টে দিচ্ছে, তার মাথায় তেল দিয়ে দিচ্ছে। আমি পরহেজগার মানুষ। নামাজ কালাম পড়ি, সবসময় চেষ্টা করি চোখের দৃষ্টি অবনত রাখতে। তাই পর্দার জন্যই কখনোই আমি ইরাকে দেখিনি। আজ এই প্রথম আমি যখন মেয়েটিকে দেখলাম, তখন চোখ সরিয়ে নিলেও মন থেকে তাকে সরাতে পারলাম না৷ কি খুশি মনে সে একের পর এক সমস্ত কাজ অক্লান্তভাবে হাসিমুখে করে যাচ্ছে, সবাইকে আপন করে নিতে পারছে। বড়নানীকে কত স্নেহ করে তার নাপাকি পরিষ্কার করছে। সবার সাথে হাসিমুখে কথা বলছে, অথচ সেই হাসির বা কথার শব্দ সেই ব্যক্তি ছাড়া আর কেউ শুনছে না। সে মাথায় কাপড় দিয়ে নিজেকে আড়াল করে সমস্ত কাজ করছে অথচ তাতে বিরক্ত হচ্ছে না। ইরা চলে যেতেই বড়নানী বললেন, “মাইয়াটারে দেখছো ভাই? এতো কাম করলো অথচ মাথার ঘুমটাটা পড়লো না।” কিছুক্ষণ থেমে আবার বললেন, “তুমার লগে খুব মানাইতো ওরে।” আমি শুধু নানীর মাথায় হাত বুলিয়ে ইশারা করলাম, যেন আর কোন কথা না বলেন। এই অসুস্থ অবস্থায় কথা বলা একেবারেই ঠিক না। বড়নানী আমার কথা শুনলেন। কথা বলা বন্ধ করে দিলেন। ঘন্টা দেড়েক পর ডাক্তার জানালো বড়নানী মারা গেছেন কিছুক্ষণ আগে!

পুরো বাড়িতে কান্নার রোল পড়ে গেল। সবাই ডুকরে কাঁদতে লাগলো। কাঁদতে পারলাম না শুধু আমি। ছেলেদের চোখে যে পানি মানায় না! তাদের কান্না বারণ! বড়নানী কবরে শুইয়ে একমুঠো মাটি ছিটিয়ে একলা রেখে বাসায় ফিরে এলাম। যেই মানুষটা সবার মাঝে এতো যত্নে ছিল, আজ সে অন্ধকার ঘরটাতে একা একা কেমন করে ঘুমাবে? বড়নানী মারা গেছে প্রায় এক মাস হয়ে গেছে। বাড়ির অবস্থা অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। বাড়িতে আমার বিয়ের কথা চিন্তাভাবনা করছে। এখনও এব্যাপারে কেউই কিছু আমার সাথে আলোচনা করেনি, তবে ছোটভাইবোনগুলোর বদৌলতে কথাগুলো আমার কানে ভেসে আসতে বেশি সময় নিচ্ছে না। অফিস থেকে বাসায় ফিরে আসার পর শুয়ে শুয়ে মোবাইলে গজল শুনছি আর বিশ্রাম নিচ্ছি। এমন সময় মা দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকলো। আমি উঠে বসলাম।

– ঘুমাচ্ছিলি হাবিব?
– না মা, এইতো গজল শুনছি। কিছু বলবে?
– তুই বোধ হয় জানিস, তোর বিয়ের কথা ভাবছি আমরা। তোর কি মত?
– তোমরা যা ভালো বুঝো।
– তোর বাবা শান্তা মেয়েটাকে খুব পছন্দ করে। শান্তাকে চিনেছিস?

আমি চুপ করে রইলাম। শান্তাকে আমি চিনি এবং খুব ভালোমতোই চিনি। শান্তা জহির আংকেলের মেয়ে, কিন্তু শান্তার বাবা জহির আংকেল নন। বছরের পর বছর অতিক্রম হয়ে যাওয়ার পরেও যখন তাদের বাবা মা ডাক শোনার সৌভাগ্য হয়নি তখন শান্তাকে এতিমখানা থেকে নিয়ে আসেন জহির আঙ্কেল। তিনি মারা যাওয়ার আগে তাঁর সমস্ত সম্পত্তি লিখে দিয়ে গেছেন শান্তার নামে। আর ঠিক এই লোভটাই বাবা দমাতে পারছেন না। সম্পত্তির লোভে শান্তাকে পুত্রবধূ করে ঘরে আনতে চাইছেন। কিন্তু শান্তাকে আমার মোটেই পছন্দ না। এর একটাই কারণ! শান্তা প্রচন্ড উচ্ছৃঙ্খল, বখে যাওয়া একটা মেয়ে। বরাবর ভেবে এসেছি আমার স্ত্রী হবে একজন সুশীল, নম্র ভদ্র একটা মেয়ে, সেখানে শান্তাকে আমি স্থান দেই কেমন করে?

মাকে আমি সাফ সাফ জানিয়ে দিলাম শান্তাকে আমি আমার ঘরে জানতে চাই না। বিয়ে যদি করতেই হয় তবে ইরাই হোক আমার স্ত্রী। মা আমার কথা চুপটি করে শুনলেন, বোধ হয় ইরাকেও মায়ের বেশ পছন্দ! মা ফিরে গিয়ে বাবাকে জানালেন আমার মতামত। সাথে সাথে ওঘর থেকে বাবার তীব্র হুংকার শোনা গেল। তিনি কিছুতেই ইরাকে তার পুত্রবধূ করবেন না, কারণ ইরার বাবা মধ্যবিত্ত একজন মানুষ, দিন আনেন দিন খান। তাছাড়া আত্মীয়তার মধ্যে আত্মীয়তা করে আত্মীয়তার সম্পর্ক নষ্ট করতে তিনি চান না। বাবাও সাফ সাফ জানিয়ে দিলেন, আমি যেন তার পছন্দের মেয়ে শান্তাকেই বিয়ে করি নয়তো তিনি আগামী তিনদিন আমাকে বাসার ভেতরে ঢুকতে দিবেন না।

আমিও পরদিন চলে এলাম বন্ধু পলাশের বাসায়। ওর বাসা থেকেই অফিসে যাই। ওর বাসাতেই রাতটা কাটাই। মা শুধু ফোন করে কাঁদেন। মায়ের কান্না শুনে বাড়ি ফেরার জন্য মনটা ছটফট করলেও বাবার কঠোর চেহারা মনে পড়লেই তা মুহূর্তে দূর হয়ে যায়। অবশেষে টানা পাঁচদিন পর বাড়ি ফিরলাম। পরিস্থিতি আগের থেকে অনেকটা স্বাভাবিক। বাবাও যেন কিছুটা চুপসে গেছেন। আগের মতো উপচে পড়া ক্রোধ তার নেই। মা কেঁদে কেঁদে বলতে লাগলেন, “তুই বিয়েতে মতটা দিয়ে দে বাবা৷ তোর বাবার রাগ তো জানিস। তাছাড়া তুই যার জন্য বসে আছিস তার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। তোর মামা জানালো আগামী শুক্রবারে ইরার বিয়ে!”

আমার পায়ের নিচ থেকে যেন মাটি সরে গেল। যাকে পাওয়ার ইচ্ছেটুকু ছিল, সেই শেষ ভরসাটাও নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল? প্রথম যাকে মনে স্থান দিলাম সেও চলে যাবে আমার কাছ থেকে? মনকে মানাতে চাইলেও পারলাম না। একটিবার তাকে দেখার জন্য, কিছু বলার জন্য মনটা কাতর হয়ে গেল। বৃহষ্পতিবার! দিন যাচ্ছে আর ইরার বিয়ের দিন ঘনিয়ে আসছে। ইরার গায়ে হলুদ। সারাটা দিন বাইরে বাইরে কাটালাম। দুপুরের দিকে মা কল দিয়ে জানালেন, আমি যেন এক্ষুণি বাসায় যাই। জরুরি কথা আছে। হন্তদন্ত হয়ে আমি ছুটে গেলাম বাসায়। কোন অঘটন ঘটলো না তো?

মা যা বললেন তা শুনে যেন আবারও আমার মাথা শূন্যতায় ভরে যেতে লাগলো। দুপুরে ইরার বাবা ফোন দিয়েছিলেন মায়ের কাছে। মামা কাঁদতে কাঁদতে জানিয়েছিলেন, ইরার বিয়ে ভেঙে গেছে। আজ সকালেই পাত্রপক্ষ হুট করে জানিয়েছে ওরা ইরাকে তাদের ঘরে তুলবে না। কারণ তাদের যৌতুকের টাকা আর আসবাবপত্র কিছুই মামা দিতে পারেননি। ওরা রেগে গিয়ে বিয়ে ভেঙে দিয়েছে। মামা ভেঙে পড়েছেন, কারণ বিয়ের মাত্র একদিন আগেই মেয়েটার বিয়ে ভেঙে গেল। লোকজন সবাইকে বিয়ের দাওয়াত দেওয়া হয়ে গেছে, এখন কি করে এতগুলো মানুষের কাছে তিনি লজ্জায় মুখ দেখাবেন? নিজের সম্মান আর মেয়ের ভবিষ্যৎ বাঁচাতে মামা প্রাণপণে অনুরোধ করছেন যেন ইরাকে আমি আমার স্ত্রী করে ঘরে নিয়ে আসি।

মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি! আল্লাহ আমার চাওয়া নিজ হাতে পূরণ করে দিতে চাইছেন তবে আমি কেন তা ফিরিয়ে দিব? বড়নানী মৃত্যুর আগে ঠিক এই ইচ্ছেটাই করেছিলেন। তবে কি সেটাই কবুল হয়ে গেল? মাকে জানিয়ে দিলাম, “আমি ইরাকে ঘরে আনতে রাজি। তুমি ব্যবস্থা করো।”মা সব ব্যবস্থা করলেন। বাবা মুখ ফিরিয়ে গোমড়া হয়ে থাকলেন। আমার মনের আশা পূর্ণ হলেও তার আশা যে একেবারে ধূলিসাৎ হয়ে গেল!

বড় আপু ইরার জন্য বিয়ের শাড়ি কিনে আনলো, মায়ের কিছু গহনা ইরার জন্য বের করা হলো। যার এই ঘরে পা পড়ার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা ছিল না, তাকে বধুরূপে বরণ করে নেওয়ার জন্য এই স্বল্পসময়েই সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়লো।শুক্রবারে বিনা আড়ম্বরে, কিন্তু খুব ঘটা করে ইরাকে বিয়ে করে নিয়ে আসলাম আমার ঘরে। আশ্চর্য! বিয়ে ভেঙে যাওয়ার কোন কালো ছায়া তাকে স্পর্শ করেনি। বিষন্নতা গ্রাস করেনি। বরং সে যেন খুশিতে ঝলমল করেছিল। তার হাসির ঝলকে পুরো আলোকিত হয়েছিল আমার ঘর!

ইরার মতো ঠিক এমনই মিষ্টি হাসি পেয়েছে আমাদের প্রথম মেয়ে মীরা। বিয়ের দু’বছর পরেই আমাদের দুজনের ঘর আলো করে এসেছে তৃতীয়জন। এইযে বাবার কোলে মীরা যখন হাত পা ছুঁড়ে খেলতে থাকে, বাবার শুভ্র-সাদা দাঁড়িগুলো ছোট ছোট হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখার চেষ্টা করে আর আধো আধো বোলে ‘দা…দ্দু’ বলার চেষ্টা করে তখন আমি অবাক হয়ে দেখি। এ যেন মীরার মাঝেই ইরার অস্তিত্ব, তারই ছায়া। তাইতো আমার কঠোর বাবাও তার মাঝে স্নেহ খুঁজে পান।ইরা এক কাপ চা নিয়ে এসে আমার পাশে দাঁড়িয়ে দাদা- নাতনীর খেলা দেখতে লাগলো। ধোঁয়া উঠা গরম কাপে ছোট্ট চুমুক দিয়ে আমি বিড়বিড়িয়ে বললাম, “আলহামদুলিল্লাহ।”

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত