সব নারী এক নয়

সব নারী এক নয়

সন্ধ্যায় অফিস থেকে বাসায় ফিরেই জামিলের মনে হলো- কিছু একটা ঠিক নাই। অস্বাভাবিক নীরব পুরো বাসা। দুই মিনিটে পুরো ফ্ল্যাট চক্কর দিয়ে সে নিশ্চিত হলো- তার মাস খানেক আগে বিয়ে করে আনা অতি রূপবতী বউটি বাসায় নেই। তাকে ফোনে কিছু বলেওনি বাইরে যাওয়ার ব্যাপারে।

“কোথায় তুমি?”
“এই তো ফিরছি, প্রায় চলে এসেছি”
“কোথায় গিয়েছিলা?”
“একটু কাজে”
“আচ্ছা, আসো”

হীম শীতল গলায় কথা বলা শেষ করে ফোনটা সোফার সামনে টি-টেবিলে রেখে ধপ করে সোফায় বসে পড়ে সে- মাথাটা টনটন করছে। এমনিতেই প্রাইভেট ফার্মে চাকরি করে বলে প্রচন্ড মানসিক চাপে থাকে জামিল, তার উপর যদি বাসায় ফিরে দেখে জামিলের লাইফে আসা প্রথম মেয়েটার নাম ছিলো মুনিয়া। সেই ভার্সিটির সেকেন্ড ইয়ারের কথা… টানা দুই সেমিস্টার অনার্স মেরে ক্লাসের সবার সমীহ আদায় করে ফেলেছিলো জামিল, মুনিয়া মেয়েটা অনেকটা গায়ে পড়েই বন্ধুত্ব করে। জামিল মোটেও মেয়ে ঘেঁষা ছেলে ছিলো না… বন্ধুত্ব থেকে প্রেম… জামিলের লাইফের প্রথম এধরণের অভিজ্ঞতা। সে জান প্রাণ উজার করে দিয়ে ভালোবেসেছিলো… পরের সেমিস্টারেই রেজাল্টও ডাউন খেয়ে গেলো অতি অভিমানি ও ক্রমাগত তুচ্ছাতিতুচ্ছ কারণে মানসিক অশান্তিতে রাখা মেয়েটার কারণে। অবশ্য মাস ছয়েকের মধ্যেই দেখা গেলো- মেয়েটার গায়ে পড়ে প্রেমে পড়াটা ছিলো জামিলের ভালো রেজাল্টের কারণে পাওয়া খ্যাতির মোহ- অস্ট্রেলিয়া প্রবাসি এক কাজিনকে বিয়ে করে পড়াশুনা গুল্লি মেরে মেয়েটা চলে গেলো অন্যকারো ঘরে গৃহিণী হতে। যাবার আগে জামিলকে কিছু জানানোরই প্রয়োজন মনে করেনি।

জামিল বেশ বড়সড় ধাক্কা খেলো। এঘটনায় মেয়েদের ব্যাপারে তার মনের ধারণাটা চিরদিনের জন্য চেঞ্জ হয়ে গেলো। মেয়ে মাত্রই টাকার লোভী, মেয়েরা ভালোবাসে না, শুধু অভিনয় করে যায়, মেয়ে মাত্রই প্রতরক, পরকিয়ায় আসক্ত- এইটাইপের কথাবার্তা ফেসবুকে দেখলেই শেয়ার দেওয়া শুরু করলো। নানা পোস্টে সুযোগ পেলেই মেয়েদের এক হাত দেখে নিতো- কোথাও কোন মেয়ে ধর্ষণ বা নির্যাতনের শিকার হয়েছে- এরকম পোস্ট দেখলে সে বিচিত্র তৃপ্তি পেতো, সেসব পোস্টে “উচিৎ শিক্ষা হইসে, এগুলাই ডিজার্ভ করে” এধরণের কমেন্ট করে কত যে গালি খেয়েছে সে- হিসাব নাই। থোড়াই কেয়ার করে সে। আর টাকা থাকলেই যেহেতু মেয়ের অভাব হয় না- তাই সে আবার পড়াশুনা ভালোমত করে টাকা কামানোর ধান্দা শুরু করলো। বড় একটা আইটি ফার্মে বেশ বড় একটা পদে এক সময় নিজেকে পৌঁছাতে পারলো সে, খাটনি প্রচুর কিন্তু বেতনও অনেক। অবশেষে পরিবারের সাহায্যেই মধ্যবিত্ত ফ্যামিলির অতিরূপবতী এক মেয়েকে বিয়ে করে ঘরে নিয়ে এসেছে, মাঝে আর কোন মেয়েকে ধারে কাছেই আসতে দেয় নাই, অনলাইন-অফলাইনে কেবল মেয়েদের ঘৃণাই করে গেছে শুধু।

বিয়ের পর গত একমাস সে তার বৌএর জীবন যত ভাবে পারা যায় অতিষ্ঠ করে ফেলেছে। মেয়েটা এমনিতেই আগে বোরকা-হিজাব পরতো নিজের ইচ্ছাতেই, জামিল তাকে আরো কড়াকড়ি ড্রেসকোড দিয়েছে। চোখও ঢেকে রাখতে হবে, হাতে হাত মোজা পরতে হবে। মেয়েটা আপত্তি করে নি, মেনে নিয়েছে। প্রচন্ড রূপবতী মেয়ে বলে জামিল তাকে নিয়ে প্রচন্ড ইনসিকিউরিটিতে ভুগে- চাকরির কারণে তারা দুইজন আলাদা বাসা নিয়ে থাকে। সারাদিন খালি বাসা… মাথায় কত ভয়ানক আশংকা যে খেলা করে- সে খুব চেষ্টা করছে তার কিংবা মেয়েটার বাসা থেকে কোন মুরুব্বিকে এনে বাসায় রাখতে। কিন্তু কেই বা রাজি হবে নিজের সংসার ফেলে আরেকজনের বৌকে পাহারা দিতে? জামিলের শুধু টেনশন বাড়ে। হুটহাট অফিস থেকে বাসায় চলে আসে সুযোগ পেয়ে। বউ এর ফেসবুক পাসওয়ার্ড নিয়ে বসে আছে, নিজেরটা অবশ্য বৌকে দেওয়ার কথা মাথাতেও আসে নি।

তবে এখন পর্যন্ত তার বৌটা তার কোন কথায় আপত্তি করেনাই। এত সুন্দরী মেয়ে বিয়ে করা নিয়ে তার অনেক বন্ধুই তাকে সাবধান করেছিলো, কিন্তু মেয়েটার মধ্যে সুন্দরী মেয়েদর মধ্যে যে সহজাত অহংকারী ভাব থাকে সেটাও দেখা যাচ্ছে না। চুপচাপ, ঠান্ডা স্বভাবের একটা মেয়ে।

বাসায় ঢুকে জামিলের ঠান্ডা দৃষ্টি উপেক্ষে করেই বোরকা খুলতে খুলতে মেয়েটা বেডরুমে চলে গেলো। কিছুক্ষণ পর এসে জামিলের সামনে একগ্লাস ঠান্ডা পানি আর একবাটি সেমাই রেখে গেলো, বুঝা যাচ্ছে ফ্রিজে ছিলো। জামিল কিছু না বলে সেমাইটা হাপুসহুপুস করে খেয়ে নিয়ে এক ঢোকে গ্লাস খালি করে একটা বিশাল একটা ঢেঁকুর তুললো। নাহ, মেয়েটার রান্নার হাত অসাধারণ, জামিলের মাথাটা বিগড়ানো না থাকলে সে হয়তো বুঝতো কতটা লাকি সে!

“এই অসময়ে গিয়েছিলাটা কই?” “বিকাশ করতে। আম্মা ফোন দিয়ে বললেন ইমার্জেন্সি কিছু টাকা লাগবে, সামনের মোড়ে গিয়েছিলাম” জামিল মুখ বিকৃত করে বাজে কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে যায়, সে জানে বিকাশের টাকাগুলো মেয়েটার নিজের ইনকামের টাকা। এটা নিয়ে কিছু বলা যাবে না। পাশের বাসায় দুইটা ছোট ছোট মেয়ে দিনে একবার করে এসে ঘন্টা দুয়েক পড়াশুনা করে যায়। তার বিনিময়ে সামান্য কিছু যা দেয় তাই মেয়েটা বিকাশে রাখে। নানা কাজে লাগে।

“বাইরে যাচ্ছো, ফোন করে বলোনি কেন?”
“পাঁচমিনিটের ব্যাপার, ভেবেছি তুমি ফেরার আগেই চলে আসবো”
“ওহ তাই? তা এরকম আমি আসার আগেই কতবার বাইরে থেকে ঘুরে আসো?”

জামিলের কন্ঠে বিশ্রী নোংরা ইংগিত। রেবা, যার হাতে এইমাত্র তৃপ্তি করে খাওয়া সেমাইয়ের খালি বাটি, থমকে দাঁড়ালো। কিছুক্ষণ আগে বাইরে রোদের মধ্যে কালো বোরকা পরে যাওয়ায় ঘেমে ভিজে যাওয়া সেলোয়ার এখনও শুকায়নি, ঘরে ফিরেই কাজ শুরু করায় এখনও কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম, সে এক হাতে বাটি ধরে আরেক হাতে কপালের ঘাম মুছে খুব শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলো, “কি বললে?”

জামিল এই শান্ত গলার পিছনে যে ভয়ানক কাল বৈশাখী ঝড় লুকিয়ে ছিলো, টের পেলো না। সে আবারো দাঁত মুখ বাঁকিয়ে বললো, “তোমরা মেয়েরা যে কি চিজ তা আমার হাড়ে হাড়ে জানা আছে। তার উপর চেহারা সুরুত একটু ভালো হইলে তো কথাই নাই রেবা এক পা এগিয়ে এলো। জামিলের চোখে চোখ রেখে বললো, “কোন মেয়ের চেহারা সুন্দর হলেই মেয়েটা দুশ্চরিত্রা হয়?” জামিল টিটকারির সুরে বলে, “যে ফল যত গন্ধ ছড়ায় সেটা পঁচে তত তাড়াতাড়ি…” রেবা হাতের বাটিটা ভয়ানক গতিতে মাটিতে আছড়ে ফেললো। জামিল হকচকিয়ে গেলো একদম, এত বিকট শব্দ হয়েছে যে মনে হয় পাশের ফ্ল্যাটের মানুষেরাই শুনতে পাবে। সর্বদা শান্ত, সুবোধ রেবার এরকম রূপ এর আগে দেখেনি জামিল, মেয়েটার ফর্সা গাল টুকটুকে লাল হয়ে গেছে, নাকের পাটা ফুলে গেছে। মেয়েটা তীক্ষ্ম কন্ঠে বললো, “আমার চরম শত্রুও যে আমাকে কখনও আমার ক্যারেকটার নিয়ে কিছু বলার সাহস করে না, কে তুমি আমার দিকে আঙ্গুল তুলো? কে দিয়েছে তোমাকে এই অধিকার?” মেয়েটা জামিলের দিকে এক পা এগিয়ে যায়, “কে?” তার মুখের উপর চিৎকার করে সে। এই প্রথমবারের মত জামিল অসহায় অনুভব করে। সে কিছু বলতে পারে না।

রেবা কিছুক্ষণ চোখ মুখ দিয়ে আগুনের হল্কা বের করে ঝড়ের গতিতে বেডরুমে ফিরে যায়। উদ্ভ্রান্তের মত একটা বড় লাগেজ টেনে নিয়ে তাতে এলোপাথাড়ি ভাবে কাপড়চোপড় ছুঁড়ে ফেলতে ফেলতে থাকে। জামিল পেছনে এসে দাঁড়ায়। খুব আশ্চর্য গলায় জিজ্ঞেস করে, “কি হচ্ছে? কই যাও তুমি?”

রেবা তার দিকে না তাকিয়েই বলতে থাকে, “একটা মাস! একটা মাস আমি তোমার অত্যাচার চুপচাপ সহ্য করেছি। সারাজীবন স্বপ্ন দেখেছিলাম এখানে উখানে ভালোবাসা না বিলিয়ে একবারে কারো জন্য অপেক্ষা করলে কপালে ভালো একটা মানুষ জুটবে যে আমাকে বুঝবে, আমাকে সম্মান করবে। আর কপালে কি জুটলো? একটা লুজার, বলদ!”

জামিলের চোয়াল ঝুলে পড়ে। এসব কি ভাষা! এ কোন রেবাকে দেখছে সে! মেয়েটা হঠাৎ কাপড় গোছানো বাদ দিয়ে জামিলের সামনে এসে টিটকারির সুরে জিজ্ঞেস করে, “লাইফে তো একবারই ছ্যাক খাইসিলা, না? তাতেই এই অবস্থা? একটা মেয়েকে দিয়েই পুরো নারীজাতিকেই চিনে ফেলসো? এভাবে তাকানোর কিছু নাই, খোঁজ খবর আমরাও নিয়েছি!” জামিল মাছের মত খাবি খায় কিছুক্ষণ। কিছু বলতে পারে না।

“কখনও জানতে চেয়েছো, আমার জীবনটা কেমন ছিলো? গত চব্বিশটা বছর আমি কিসের মধ্য দিয়ে গিয়েছি? তোমার চোখে আমি শুধুই একটা গন্ধ ছুটানো পাকা ফল যাকে ঢেকে ঢুকে রাখতে হয়, শুধুই একটা দেখানোর শো-পিচ যেটা তুমি অনেক দাম দিয়ে দোকান থেকে কিনেছো। যেটা নিয়ে তুমি শুধু ভয়ে ভয়ে থাকো পঁচে যাবে কি না, অন্যকেউ চুরি করে নিয়ে যাবে কিনা… কিন্তু আমি তো ফল বা শো পিচ না, জামিল। আমি একটা মানুষ- আমি নিজে যদি পচে যেতে চাই তুমি কি দিয়ে আমাকে আটকাবা?” ফেসবুকে কমেন্টে অখাদ্য কুখাদ্য লজিক দিয়ে ঝড় তুলে ফেলা জামিল এখন মুখ ফুটে কোন শব্দ বের করতে পারে না।

“আমার সুন্দর চেহারাটা তোমার জন্য একটা ট্রফি হলেও আমার জন্য এইটা সারা জীবন অভিশাপ ছিলো, জানো? সেই ছোট বেলা থেকে… কাজিন, দূর সম্পর্কের ভাই, চাচা, মামা কত জন যে কাছে ঘেঁষতো, বাজে টাচ করতো। কিছু বুঝতাম, কিছু বুঝতাম না, কুঁকড়ে থাকতাম নিজের মধ্যে। কলেজে উঠার আগেই জীবন নরক যন্ত্রণার বানিয়ে ফেললো এলাকার ছেলে পেলেরা… প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার সময় হাজারটা উপায়ে টিজ, রাতের বেলা জানলায় ঢিল ছুড়া, প্রেম পত্র থেকে শুরু করে উঠায় নিয়ে যাওয়ার, এসিড মারার হুমকি- এই অশান্তিময় জীবনের যন্ত্রণা তুমি বুঝবা? স্কুল, কলেজ, ভার্সিটি… কোথাও কোন শান্তি নাই। চেহারা সুন্দর লাগে তাদের কাছে, তার মানে আমি যেন কোন দলিল সই করে রাখসি কোথাও তাদের যাবতীয় যন্ত্রনা আমাকে হাসিমুখে সইতে হবে। একেকজন কি হেডম, এই দলের নেতা, সেই দলের বড় ভাই- কারো কলিজা হয় নাই জামিল সামনে এসে পুরুষের মত মুখ ফুটে ভালোবাসার কথা বলবে- তারা শুধু আমাকে ভোগই করতে চেয়েছে, যখন পারে নাই পেছন থেকে ক্ষতি করতে চেয়েছে। কত অসহ্য দিন রাত ঘরে বন্দি হয়ে থাকা, দুঃস্বপ্ন দেখে রাত জাগা… তুমি এসবের কি বুঝবা জামিল? তুমি তো তাদেরই একজন!”

শেষ বাক্যটা জামিলের বুকের ভেতর গিয়ে ধ্যাঁচ করে লাগে। মেয়েটা তাকে এই দৃষ্টিতে দেখে? বখাটে কাপুরুষদের একজন? মেয়েটা চোখ টোখ মুছে কন্ঠস্বর বদলে ফেলে “আসলে আর কথা বলে লাভ নাই। ভেবেছিলাম তুমি এতদিনে বুঝে যাবা আমি মেয়েটা কেমন তাই তোমার যাবতীয় উদ্ভট আবদারে কখনও না করিনাই। কিন্তু একমাসে তুমি প্রমাণ করে দিসো বড় ডিগ্রী আর ভালো চাকরি থাকলেই হয় না। আর আজকের কথাগুলা প্রমাণ করে দিসে- কিছু মানুষের ভিতরটা একদম পঁচে যায়, আমি যতই লয়াল থাকি না কেন, তুমি সন্দেহই করে যাবা আজীবন। আজ যদি তোমার খোঁজে তোমার কোন বন্ধু তুমি না থাকা অবস্থায় বাসায় আসে, আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি তুমি আমার দিকেই তোমার নোংরা আঙ্গুল তুলবা। অভাব অনটনের সাথে সংসার করা যায় জামিল, শারীরিক ভাবে অসুস্থ একটা মানুষের সাথেও সংসার করা যায়- কিন্তু এক মন ভর্তি সন্দেহ নিয়ে ঘুরা মানুষের সাথে সংসার করা যায় না। তুমি আমাকে ভালোবাসো না, আমার মন পড়ার চেষ্টাও করো না। আমাকে মানুষ হিসেবেই দেখো না। তোমার স্টুপিডিটির সাথে গত একমাস বহু কষ্টে ছিলাম। বাকি জীবনটুকু কাটাতে পারবো বলে মনে হয় না। আমি বিদেয় হচ্ছি। তুমি বরং গন্ধটন্ধ ছড়ায় না এরকম কোন ফল খুঁজে নিও।” জামিল মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে মেয়েটা ঘুরে চলে যাচ্ছিলো, জামিল পেছন থেকে হাত ধরলো। রেবার শরীরে যেন বিদ্যুৎ শিহরণ খেলে গেলো। এতদিন তারা এক ছাদের নিচে আছে কিন্তু এই প্রথম রেবার শরীরে এরকম অনুভূতি হলো। সে ধীরে ধীরে আবার ঘুরে জামিলের দিকে তাকালো, ছেলেটার চোখে পানি। কি অদ্ভূতই না দেখাচ্ছে তাকে- জামিলের এরকম চেহারা আগে কখনও দেখেনি সে, জামিল ভাংগা গলায় বললো, “আমিও ভালোবেসেছিলাম। অনেক ভালোবেসেছিলাম। আমি সারাজীবনে আর কাউকে ভালোবাসিনাই, ঐ মেয়েটাকে ভালোবেসেছিলাম, জানো? আমার বুকের ভিতর সারাদিন তার জন্য ধুকপুক করতো, একদম প্রথম যখন মেয়েটা ভালোবাসি বলেছিলো, কি প্রচন্ড সুখী মনে হয়েছিলো নিজেকে- নিজের পড়াশুনা, ভালোমন্দ বাদ দিয়ে তাকে ভালো রাখতে চাইতাম, তার মন জয় করতে চাইতাম, তার দেওয়া কষ্টে আমি কত রাত হুহু করে কেঁদে চোখ ভিজাতাম… আমার সেই কান্না কেউ দেখেনি।

এত ভালোবাসতাম যারে, যাকে হারানোর ভয়ে বুকের মধ্যে রক্ত হঠাৎ হঠাৎ ছলকে উঠতো, সেই মেয়েটা আমাকে কিচ্ছু না বলে একদিন অন্য একটা ছেলের সাথে চলে গেলো, কিচ্ছু বলেনি আমাকে… কিচ্ছু না… অনেক কষ্ট… অনেক কাউকে বলতে পারি নাই, বুঝাতে পারে নাই, সবাই আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করতো, কেউ বুঝেনাই প্রতিটা রাতে মেয়েটার জন্য আমার বুকের ভিতরটা কিরকম ছিঁড়েখুঁড়ে যেত…. আমিও ভালোবাসতে চাই রেবা… কিন্তু আমার খুব ভয় লাগে… খুব ভয়…” জামিল চোখের পানিতে নাক মুখ মাখামাখি হয়ে গেছে, রেবা তাকে টেনে বুকের মধ্যে নিয়ে নেয়। ছেলেটা অবুঝের মত হাউমাউ করে কাঁদছে, গত ছয় বছর ঘৃণা দিয়ে চেপে রাখা কষ্টের বন্যাগুলো আজ চোখের পানিতে মুক্তি পেয়েছে। বিছনায় শুয়ে ছোট্ট বাচ্চার মত কান্নার দমকে কেঁপে কেঁপে উঠা জামিলকে বুকে লুকিয়ে রেখে রেবা মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে ফিস ফিস করে বলে “আবার ভালোবাসবা তুমি। এই বোকা ছেলে। এই! কান্না থামাও। আমি ঐ মেয়েটা না, আমি তোমার বিয়ে করা বউ, আমি কোত্থাও যাচ্ছি না, কোন ভয় নেই তোমার।

আমাকে ভালোবাসো। যত ইচ্ছা উজাড় করে ভালোবাসো। আমি তোমাকে আরো ডাবল ভালোবাসা দিবো। তোমার ভালোবাসার কিছু অংশতো নষ্ট হইসে, আমারটা দেখো, একদম ফ্রেশ। কাউকে দেইনি। একদম তাজা ফল, তোমার জন্য” জামিল মুখ তুলে তাকায়। নাকের পানি চোখের পানিতে রেবার জামা মাখামাখি করে ফেলেছে, তার মধ্যে কান্নামাখানো মুখটা দেখতে খুবই বিচিত্র লাগছে। ওড়না দিয়ে মুখটা মুছতে মুছতে রেবা ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করে, “উল্লুক মিয়া, প্রেম করবেন আমার সাথে?” চোখ ভর্তি পানি নিয়েই জামিল হেসে ফেলে, রেবা টের পায় তাদের ঘরের ভিতর এই রাত দুপুরে হঠাৎ এক মুঠো রোদ ঢুকে গেছে।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত