খবিশ জামাই

খবিশ জামাই

বিয়ের পরের দিন সকালে ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে দেখি জামাই আমার শাড়ি পরে বসে আছে আমিতো তাকে দেখে অবাকের শীর্ষ সীমায়।

— বউ দেখোতো আমার লুঙ্গিটা খুঁজে পাচ্ছিনা।

বরের লুঙ্গি খুঁজতে খুঁজতে দেখি খাটের নিচে পরে আছে। জামাই আমার ঘুমিয়ে থাকলে সে থাকে এক জাগায় তার লুঙ্গি থাকে আর এক জাগায়। এখন আমার রোজ রুটিন জামাইয়ের লুঙ্গি খুঁজে বের করা। এতকরে বলি লুঙ্গি পরে ঘুমাতে পারোনা যখন তাহলে ট্রাউজার কিনে পরো। কে শোনে কার কথা তার একটাই কথা লুঙ্গির মত এত শান্তি নাকি অন্য কোন পোশাকে নাই। আমার বরের দশটা না পাঁচটা না একটা মাত্র লুঙ্গি।

আমাদের বিয়ে হয়েছে তিন মাস এই তিন মাসে কোন কিছুতে সাফিনের মন ভরাতে পারিনি সব কিছুতে সে খুত খুঁজে পায়। ওর নাম সাফিন বলে ডাকলে বিরক্ত হয়। সাফু বলে ডাকি না কেনো। শাশুড়ি সাফু বলে ডাকতো ওর কাছে সাফু নাম শুনতে ভালো লাগে। ঘর গুছিয়ে রাখলে তার বিরক্ত লাগে সে গোছানো ঘরে থাকতে পারে না। সাফিনের স্টাডি রুমের থেকে গরুর গোয়াল ঘর অনেক ভালো। সকালে সব সুন্দর করে গুছিয়ে রাখলে রাতে এসে চিৎকার চেঁচামিচি করবে কেন সাজিয়েছি। ও ফাইল পত্র, বই, খাতা এদিক সেদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখবে। এখন আমি আর রুমের ধারে কাছে যাই না।

আমার হাতের রান্না করা খাবারে কোন স্বাদ নাই জঘন্য। খাবার থেকে বিশ্রী গন্ধ পায় তার একটাই কথা মায়ের হাতের রান্নার সেকি স্বাদ অন্য রকম একটা ঘ্রান বের হয়। এখনো জিব্বার সাথে মায়ের হাতের রান্না করা খাবারের স্বাদ লেগে আছে চোখ বন্ধ করে নিঃশ্বাস নিলে সেই ঘ্রান পাই। সাফিনের কথা শুনে হাজার ও কষ্ট লাগলে কিছু বলিনা মায়ের প্রতি ওর ভালোবাসা দেখে।

আমার শাশুড়ি মারা গেছে দুই বছর বেঁচে থাকলে উনার কাছ থেকে সব রান্না শিখে রাখতাম। অন্ততো সাফিনের মুখ থেকে শোনা লাকতোনা এগুলো কি রান্না করিছো খাবানি কিরাম কইরে। তখন ইচ্ছা করে মাটি ফাঁকা করে নিচে ডুকে যাই। আজ সাফুর ফুফাতো ভাই আর ভাবি আসবে বেরাতে আল্লায় জানে ওরা কেমন হয় খুব ভয়ে আছি। রাইসা ভাবি অসাধারণ একটা মানুষ অল্প সময়ের মধ্যে মানুষের সাথে মিশে যেতে পারে।

সাফিন এখনো বাসায় ফেরেনি সবাই সাফুর জন্য অপেক্ষা করছে ও আসলে ডিনার করবো। ডাক্তারদের নিয়ে এই একটা সমস্যা পরিবারকে ঠিক মতো সময় দিতে পারেনা। প্রথম প্রথম সাফিনের জন্য দুপুরে রান্না করে নিয়ে যেতাম ভাবতাম ও অনেক খুসি হবে। খুসি তো দূরে থাক উল্টা অপমানিত হওয়া লাকতো ওর স্টাফদের সামানে বসে রান্না নিয়ে খোটা দিত লজ্জায় এখন আর খাবার নেই না। প্রতিটা মেয়েই চায় স্বামীর ভালোবাসা একটু আদর করবে সোহাগ করবে রোমান্টিক কথা বলবে। আমার শুধু দীর্ঘশ্বাস নিজের প্রয়োজন ছাড়া ভালবেসে হাতটাও কখনো ধরেনি।

রাতে আমার হাতের রান্না খেয়ে ভাবি, ভাইয়া প্রশংসায় পঞ্চমুখ এত ভালো রান্না তারা জীবনেও খাইনি। কিন্তু তাদের কথা শুনে সাফিনের চেহারার মধ্যে ছিল বিরক্তের ছাপ। ভাবি হয়তো বিষয়টা বুঝতে পেরেছিল। আমি বুঝতে পেরেছিলাম ভাবি আমাকে কিছু বলতে চায়। এই সুযোগ ভাবির কাছ থেকে শাশুড়ি আম্মা ব্যাপারে সব কিছু জেনে নেবো। ভাবির কথা শুনে প্রেশার হাই হয়ে গেছে। ভাবির কাছ থেকে শাশুড়ি আম্মার রান্না বান্নার সব কৌসল শিখে নিলাম।

সাফিনের পছন্দ অনুসারে সবকিছু রান্না করেছি। ঘর বাড়ি সব আউলা ঝাউলা করে রেখেছি দেখলে মনে হবে সুনামি হইছে। জামাই আমার খুসিতে আত্নহারা কি ব্যাপার মায়ের হাতের রান্নার ঘ্রান পাচ্ছি বলেই খাওয়া শুরু করে দিয়েছে। দেখে বোঝা যাচ্ছে অনেক দিন পর মন ভরে খাচ্ছে। ও খাচ্ছে আর আমি শাড়ীর আচল দিয়ে মুখ ঢেকে রেখেছি। রান্না করার সময় বেশ কয়বার বমি করেছি। সাফিন আজ খুব রোমান্টিক মুডে আছে। খুব হাসি খুসি এই প্রথম ওকে হাসতে দেখলাম। বুঝতে পেরেছি আমাকে একান্ত ভাবে কাছে পেতে চায়।

–লোপা তুমি ওভাবে মুখ ঢেকে আছো কেন। দূরে বসে আছো কেন কাছে আসো বাবু তোমাকে আদর করতে ইচ্ছা করছে।

— এই খবরদার তোমার ওই গন্ধ মুখ নিয়ে কাছে আসার চেস্টা করবে না। এখন থেকে তোমার সাথে থাকাতো দুরে থাক সব চুমা চুমি বন্ধ। সাত দিনেও আমার ধারে কাছে আসবে না পেস্টের সাথে হারপিক দিয়ে ব্রাশ করে তোর মুখের গন্ধ দূর করবি। আর শোন প্রতিদান আমি তোমার লুঙ্গি খুঁজে দিতে পারবোনা এখন থেকে নিজেরটা নিজেই খুঁজে বের করবে। আচ্ছা আমার একটা প্রশ্নের উত্তর দাও এতদিন কেনো তুমি আমার সাথে ভালো ব্যবহার করোনি..??

— আসোলে আমি যখন ঘরে ঢুকতাম এত গুছগাছ দেখলেই আমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত জ্বলে যেত ইচ্ছা করতো সব কিছু ভেঙে ফেলি। কোন কিছু ভাঙতে পারতাম না তাই তোমার সাথে বাজে ব্যাবহার করতাম।

— আচ্ছা তাই তোমার ফুলের বাগান পছন্দ না, তোমার ডাস্টবিন পছন্দ । আমি ভাবেছিলা তুমি কৃপণ এই জন্য তুমি সাবান, শ্যাম্পু কম ব্যবহার কর এখন দেখি সবি তোমার খোবিশ গিরি। ভাগ্যিস তুমি ডাক্তার না হলে অন্য কোন চাকরি করলে কবে তোমাকে অফিস থেকে বের করে দিতো।তুমি নিজে অপরিস্কার থেকে রোগির সেবাযত্ন করবে কিভাবে। এখন থেকে তোমার সাথে এক রুমে থাকবো না , আমি গেস্টরুমে থাকবো। তোমার চরিত্র যত দিন ঠিক না হবে আমার ধারে কাছেও ঘেসবে না বলেই গেস্ট রুমে চলে আসলাম।

আগে থেকেই গেস্ট রুম গুছিয়ে রেখেছিলাম। ভাবির কাছে যখন শুনালা আমার শ্বশুর বাড়ির লোকেরা একটু নোংরা পরিবেশে থাকতে পছন্দ করে। সাফিন ঐ পরিবেশে বড় হয়েছে তাই গোছালো জীবন ওর ভালো লাগেনা। এবার আমার শাশুড়ি রান্না কথা বলি সে কখনো মাছ রান্নার আগে ভালো ভাবে ধুয়ে নিতো না। মাছ, তরকারি বেশি ধুইলে নাকি সব ভিটামিন পানির সাথে ধুয়ে চলে যায়। সাফিনরা মশলা দেওয়া তারকারি খেতে পারেনা, ভাজি, ভুনা মাছ, মাংস খেতে পারেনা।ছোট বেলা থেকে মশলা ছাড়া ঝোল তরকারি খেতে অভ্যস্ত তাই আমার রান্না ওর কাছে ভালো লাগেনা ভালো লাগে আস্টে মার্কা গন্ধ আলা খাবার।

কয়লা ধুইলে ময়লা যায় না সাফিন ডাক্তার হয়েছে ঠিকেই কিন্তু ও যা কিছু শিখে এসেছে ওর ভিতরে তাই রয়ে গেছে। এভাবে চলতে থাকলে সমাজ, সংসার সবকিছু থেকে ছিটকে পড়বে। অনেক আগে কোথায় যেনো পড়েছিলাম.. কারো সাথে তুমি যদি সারাজীবন কাটাতে চাও হয় তুমি তার মতো হও, না হলে তাকে তোমার মতো গড়ে তোলো। আমিতো সাফিনের মতো হতে পারবো না।  তাই আমার মিশন আমার খোবিশ জামাইকে সুন্দর ভাবে বাঁচতে শিখানো। হয়তো সময় লাগবে সাফিন কে ঠিক করতে তবে মানুষ হল অভ্যাসের দাশ।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত