কুঁড়েঘরে

কুঁড়েঘরে

লোডশেডিং হলে দুই কামরার বাসাটা অন্ধকারে পুরোপুরি তলিয়ে যায়। শুরুর সাতদিন কেমন ভয় লেগে উঠতো তখন নিশার। ওর বাবার বাসায় লোডশেডিং কখনো টের পায়নি,কারেন্ট যেতো, জেনারেটর চলতে শুরু করতো। তারও আগে,যখন জেনারেটর ছিলোনা,ছোটবেলায়, তখন কারেন্ট গেলেও বারান্দা দিয়ে আলো বাতাস দুটোই আসতো। এই বাসাটা একদম নিচতলায়, দুটো ঘর আছে ঠিকই,কিন্তু বারান্দা নেই কোনো। জানালা খোলা নিষেধ, নিচতলায় চোরের উৎপাত প্রচন্ড,তাই। ভুতূড়ে অন্ধকারে বসে থাকা অবস্থায় হঠাৎ ফোনের ভাইব্রেশনে চমকে ওঠে নিশা। এখানে আসার পর থেকে এই এক বদভ্যেস,হুটহাট চমকে ওঠার। রায়হান কল দিচ্ছে। রিসিভ না করে কেটে দিলো কল টা। ফোনের টর্চ জ্বেলে দরজার সামনে গিয়ে গলা তুললো ও,

-এসেছো? দরজার ওপাশ থেকে রায়হানের গলা শোনা গেলো,
-হ্যা,খোলো দরজা।

রায়হান ঘরে ঢুকতেই ফোনের টর্চের আলো সোজা ওর চোখে ফেললো নিশা। বিরক্ত হতে চেয়েও পারলোনা রায়হান,হেসে ফেললো।

-চোখে আলো ফেলে কেউ? তাকাতে পারছিনা তো!
-মুখ দেখে শিওর হচ্ছি তুমিই এসেছো কিনা! যদি অন্য কেউ হয়!
-হলে আর কি কথা শেষ না করেই রায়হান প্রসঙ্গ বদলালো।
-বালতিতে পানি ধরে রেখেছিলে নিশা? গোসল না করলেই না। যা গরম বাইরে
-হ্যা ধরা আছে। গোসল করে আসো ভাত বাড়ছি আমি।

পানি চব্বিশ ঘন্টা থাকেনা। সকাল আর বিকেলে পাম্প ছাড়া হয়,তখন ই পানি তুলে রাখতে হয়। নিশা এই ক’দিনে এতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে। রায়হান আর নিশা বিয়ে করেছে আজ ২৩ দিন। নিশা ২৩ দিন কতো ঘন্টা কতো মিনিট সেটাও জিজ্ঞেস করার সাথে সাথে বলে দিতে পারবে। রায়হান পারবেনা। এতোকিছু মনে থাকেনা ওর। এভাবে নিশার পরিবারের অমতে বিয়ে করার কোনো ইচ্ছেই রায়হানের ছিলোনা। তাও হয়ে গেলো সবটা কিভাবে যেন,খুব দ্রুত। এই চাকরীর বেতনে সংসার চালানো কঠিন। তার ওপর গ্রামে বাবা-মাকে কিছু টাকা পাঠানো লাগে। আজ মাসের ঊনত্রিশ তারিখ। টানাটানি যাচ্ছে খুব,বাজার তো করাই হয়নি গত দুদিন। ভাত বাড়ার কথা তো নিশা বললো,রান্না করলো টা কি! নিশার চিৎকারে ভাবা শেষ করতে পারলোনা রায়হান।

-তাড়াতাড়ি বের হও ভাত কিন্তু ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে! নিশার কথার উত্তর না দিয়ে ধীরে-সুস্থে গোসল শেষ করে বের হলো রায়হান। ঘরের এমাথা থেকে ওমাথা কোণাকুনি দড়ি টানানো,তাতেই ভেজা কাপড় নাড়া হয়। বারান্দা নেই,নাড়ার জায়গাই বা কোথায়! গামছাটা টানটান করে নেড়ে দিতে দিতে বললো,

-গরম ভাত বলে বলে যে আমার কানের পোকা বের করে দিচ্ছো,রান্না করলে টা কি! বাজার তো করিনি আমি। আলুও গতকাল বললে শেষ। আসার পথে পেলাম না কিছু,রাত হয়ে গিয়েছে তো…

-অল্প একটু ডাল ছিলো বুঝলে। চালডাল মিশিয়ে খিচুড়ি রেঁধে ফেললাম। রান্না শেষে দেখি খিচুড়ি কেমন সাদা সাদা রয়ে গিয়েছে। সাদা খিচুড়ি খেয়েছো কখনো?

নিজের কথায় নিজেই হেসে ফেললো নিশা। রায়হানও হেসে প্লেটে সাদা খিচুড়ি তুলে নিলো। মোমবাতির আলোও হিসেব করে খরচ করতে হয়। খাওয়া শেষ করেই তাড়াতাড়ি আলোটা নিবিয়ে দিলো নিশা। মোমবাতিরও দাম যেভাবে বাড়ছে! আর একবার কারেন্ট চলে গেলে দু’ঘন্টার আগে তো ফেরে না। কখনো হুটহাট কয়েক মিনিটের জন্য জানালা খুলে দাঁড়ালে মাধবীলতার ঘ্রাণ পাওয়া যায়। জানালার কাছ ঘেঁষে মাধবীলতার ঝাড় আছে একটা। এই ঘ্রাণটুকুর জন্যই হয়তো দম বন্ধ হয়ে যায়না নিশার,এমনটাই লাগে তার! এই একমাসে চোখের নিচে কালি গাঢ় হয়েছে। মায়ের নাম্বারে কল দিতে গিয়েও থেমে গিয়েছে বারবার! কি হবে কল দিয়ে? রায়হান একটা ছোটখাটো চাকরী করছে,সাথে চাকরীর পরীক্ষা দিয়ে চলেছে। কবে যে সে ঠিকঠাক প্রতিষ্ঠিত হবে…. নিশা নিজেও এ্যাপ্লাই করছে আর পরীক্ষা দিয়ে যাচ্ছে। মাস্টার্স শেষ করে বসে থাকার মতো ক্লান্তি আর কিছুতে কি আছে? বহুকষ্টে দুটো টিউশনি জোগাড় করেছে সে। তাহলে রায়হানের ওপর থেকে চাপ খানিকটা কমবে। সারাদিন অফিস করে, ভীড় ঠেলে বাড়ি ফিরে,মাঝরাতে পড়তে বসে মানুষটা।

মাঝেমাঝে নিশার মনেহয়,হয়তো হুট করে বিয়ের সিদ্ধান্তটা সে ভুল নিয়েছিলো। নিজের জন্য আফসোস না,রায়হানের জন্যই এমনটা মনে হয় তার। সংসারে টানাটানি,সে মেনে নেওয়া যায়,কিন্তু মানুষটার এতো দুশ্চিন্তা আর পরিশ্রম দেখতে ভীষণ কষ্ট হয় যে! ছুটিরদিনের সকালটা বরাবরই দেরিতে শুরু হয়। আজকে তেমন একটা দিন।শেষরাত থেকেই ঝুমবৃষ্টি। এজন্যই ভোরের দিকে ঘুমটা গাঢ় হয়েছে আরো। দুপুরে খাবারের পর সবে বিছানায় গা এলিয়েছে নিশা। ঘুমঘুম ভাব এসেই গিয়েছিলো। হঠাৎ লাফিয়ে উঠলো। উঠে বসে দেখে,রায়হান পায়ের কাছে বসে ওর পায়ে সুড়সুড়ি দিচ্ছে আর মিটিমিটি হাসছে। লাফিয়ে সরে গিয়ে বালিশ ছুঁড়ে মারলো রায়হানের দিকে।

– খুব বাঁদরামো শেখা হয়েছে,না? বালিশটা একহাতে সরিয়ে আরেকহাতে নিশাকে নিজের কাছে টেনে নিলো রায়হান।
-বাঁদরামো ঘরে না করলে কোথায় করবো বলো!
-বাহ্! কথাও শিখেছো!
-নিশা। ওঠো। চটপট রেডি হওতো! পনেরো মিনিট সময় দিলাম।
-মানে কি! রেডি হয়ে কোথায় যাবো!
-জানিনা রেডি হও তুমি। কতোদিন সাজগোজ করোনা! আয়নায় দেখেছো নিজের মুখটা? হেসে ফেললো নিশা। বললো,
-কিভাবে দেখবো বলো? আমাদের ঘরে আয়না নেইযে! তোমার চশমাটা খুলে দাও নিজেকে দেখি!
আয়না কেনা হয়নি বলে মন খারাপ করতে গিয়েও নিশার বলার ভঙ্গিতে না হেসে পারলো না রায়হান।

-চশমা চোখেই থাক,তুমি মুখ সামনে এনে আমার চশমাতে নিজেকে দেখো,আর আমি তোমাকে দেখি!
-উফফ এই,শুনো। নিশার গলার কাছের কয়েকটা চুল হালকা করে সরালো রায়হান।
-হু। বলো।
-তুমি যখন ভালো একটা জব পাবে,আমিও পাবো, তখন যখন আমরা নতুন একটা বাসায় উঠবো,ওটায় বড় একটা বারান্দা থাকবে,হু?
-হু। থাকবে। আর?
-আর বড় আয়না থাকবে। মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখা যাবে এরকম।
-দেখা গেলে কি হবে?

-তেমন কিছুনা। তুমি আর আমি পাশাপাশি দাঁড়ালে কেমন লাগবে সেটা দেখবো।
-হাহাহা! আচ্ছা। হবে আয়না। আর কিছু?
-আকাশী পর্দা,আর সাদা পর্দা লাগাবো। জানালায়। এরকম বাসা হতে হবে যাতে অনেক আলোবাতাস। আর বড় একটা কিচেন।
-নিশা?
-হু?
-তোমাকে খুব কষ্টে ফেলে দিয়েছি বিয়ে করে,তাইনা? এরকম ছোট্ট একটা বাসা,আলোবাতাস নেই রায়হানকে থামিয়ে দিলো নিশা।
-আমি ভীষণ ভালো আছি রায়হান!
-আচ্ছা। শাড়ি পরো। চোখে কাজল দিও। বের হবো।
-ঠিকআছে।

দেখতে দেখতে আরো একটা মাস কিভাবে যেন পার হয়ে গেলো চোখের পলকেই! দুটো টিউশনির বেতন একসাথে হাতে পেয়ে নিশার অদ্ভুত লাগছে খুব! বাসার জন্য বেশ অনেক কিছু কেনা দরকার। আচ্ছা থাক। ওসব রায়হানের সাথে বের হয়ে কিনলেই হবে। ,বাসায় ঢুকতে গিয়ে একটু অবাক হলো নিশা। তালাটা খোলা। রায়হান তো এতো আগে ফেরেনা! দরজা নক করতেই একমুখ হাসি নিয়ে দরজা খুললো রায়হান।

-আমিতো ভাবলাম আমার বউটা আজকে বাসায় আদৌ ফেরে কিনা! দরজা লাগাতে লাগাতে নিশা বললো,
-কেন বলোতো?
-দাঁড়াও বলছি। ঘরে চলো আগে।

ওদের শোবার ঘরটা ছোটই। মেঝেতে জাজিম পেতে বিছানা করা। বিছানা করে খুব বেশি জায়গা আর ফাঁকা থাকেনা। তারপরও সবকিছু কেমন ছিমছাম,নিশার গোছানোর তারিফ না করে পারেনা রায়হান। শোবার ঘরের দরজায় গিয়ে যেন পা আর এগোতে চাইলোনা নিশার। জানালাগুলো বন্ধ। জানালার ঠিক পাশে দেয়ালে হেলান দিয়ে ছয় ফিট বাই তিন ফিটের একটা আয়না দাঁড় করানো। আয়নার চারপাশের কাঠে ছোট ছোট নকশা করা। পা দুটো যেন আচমকাই ভীষণ ভারী হয়ে গিয়েছে। খুব ধীরপায়ে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো নিশা। হাত ধরে পাশেই রায়হান দাঁড়ানো । আস্তে করে রায়হান বললো,

-কি? মানিয়েছে দুজনকে পাশাপাশি?

কোনো উত্তর দিতে পারলোনা নিশা। ভীষণ কান্না পাচ্ছে অথচ চোখে পানি আসছেনা তার। গলায় কথাও আসছেনা। কিছুক্ষণ পর গলা খাঁকারি দিয়ে বুঝলো এবার কথা বলা যাবে। রায়হানকে বললো,

-হুট করে আয়না কেনার কি দরকার ছিলো বলোতো?এমনিতেই সময়টা খারাপ যাচ্ছে,তার মধ্যে শুধু শুধু….
-শোনো বউ। বিয়ের পর তো তোমার জন্য কিছুই কেনা হয়নি! আজকে বেতন পেয়ে বাড়িতে টাকা পাঠালাম, হুট করে মনে হলো তোমার জন্য কিছু কিনি। মাসটা তো দেখতে দেখতে কোনোভাবে চলেই যাবে,বলো? রাগ করোনা প্লিজ?

-আচ্ছা, করলাম না। তুমি কি খুব ক্লান্ত? একটু বের হওয়া দরকার। বাজার করতে হবে। টিউশনের বেতন তো পেয়েছি, এমনিতেও সামলে নেয়া যাবে সব।
-দাঁড়াও ঝটপট তৈরী হয়ে নিই আগে। একটু থেমে রায়হান আবার বলে উঠলো,
-শোনো?
-হু?
-ব্যাংকের চাকরীটা কনফার্ম হয়েছে বউ।

আজকে এ্যাপয়েনমেন্ট লেটার হাতে পেলাম। এবার আমাদের বারান্দাওয়ালা বাসা,নীল-সাদা পর্দা,এবার সব হবে,দেখো তুমি! মামার দোকানের মালাই চা খাবো আজকে,ভার্সিটির সময়ের মতো। তারপর বাজার করবো। হ্যা? নিশা কোনো কথা না বলে রায়হানের বুকে মুখ গুঁজলো। চাকরীর খবরটা শুনে হাত-পা ভীষণভাবে কাঁপছে ওর,কাজী অফিসে কাবিননামায় সই করার সময় এরকমই অদ্ভুত লাগছিলো সবকিছু। বিয়ের পর এই প্রথম ওর চোখ থেকে কয়েকফোঁটা পানি পড়ে রায়হানের শার্টের খানিকটা ভিজিয়ে দিলো। বাইরে মেঘ ডাকছে,বৃষ্টি নেমে গিয়েছে। কে জানে,আজ হয়তো ওদের বের হওয়া হবে। অথবা, হবেনা। না হলেই বা কি,মামার দোকানের মালাই চা, অথবা রান্নাঘরের কড়া লিকারের চা,যেটাই হোক,মানুষ তো এই দুজনই! চা তে কী ই বা আসে যায়!

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত