বাসাভাড়া উপাখ্যান

বাসাভাড়া উপাখ্যান

বিকেলে বাসার মালিককে ভাড়া দিতে গেছি।। উনি আমাকে দেখেই খপ করে হাত চেপে ধরে বললেন- বাবা, তোমার এক টাকাও ভাড়া দেয়া লাগবে না।। তুমি শুধু আমার মেয়ের সাথে যোগাযোগটা বন্ধ করে দাও।। দরকার হলে মাসের শেষে, তুমি আমার কাছ থেকে উল্টা টাকা নিও।।

আমি হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছি।। আগারগাঁওয়ের এই বাসায় আসছি গত ফেব্রুয়ারী মাসে, বাসার মালিকের যে একটা মেয়ে আছে, আমি তো তাই জানতাম না।। আর এই লোক বলে কিনা, মেয়ের সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দিতে, তাজ্জব ব্যাপার।। আমি হতবিহব্বল হয়ে দাঁড়িয়েই আছি।। উনি আমার হাত ছাড়ে নি এখনো।। আমি কিছু একটা বলতে যাবো, উনি দরজার ওখান থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে উনার বাসার ভিতরে তাকালেন।। তারপর আমাকে একটু ঠেলে দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন।। আমি কৌতুহলী গলায় বললাম- আংকেল, আসলে ঘটনা কি, বুঝি নাই??

উনি আমার হাত ছেড়ে দিয়ে বলতে শুরু করলেন- বাবারে আমার মেয়েটা বোকা কিসিমের, কেবল মাত্র অনার্সে উঠছে, তুমি বাবা দয়া করে আমার মেয়ের সাথে আর ফোনে কথা-টথা বইলো না।। তোমার যতদিন খুশি এই বাসায় থাকো, ভাড়া দেয়া লাগবো না।। শুধু একজন মেয়ের বাবা হয়ে অনুরোধ, আর কথা বইলো না।।

উনার কথা শুনে আমার হাসি পাচ্ছে, ভীষণ মজাও পাচ্ছি।। উনাকে আমি কি বলবো বুঝতে পারছি না।। আমি ভাবলাম সত্যিটাই বলি যে, আমি উনার মেয়েকে চিনিই না, কথা বলা তো দূরে থাক্‌।। এমন সময় উনি তাগাদা দিয়ে বললো- তুমি উপরে যাও, আমি পরে তোমার রুমে আসতেছি।। যাও তুমি!!

বলে উনি বাসায় ঢুকে খট্‌ করে দরজা লাগিয়ে দিলেন।। আমি নির্বিকায় দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছি।। হাতে ৬ হাজার ২০০ টাকা, মানে কি এই মাস থেকে আর ভাড়া দেয়া লাগবে না।। এতগুলো টাকা বেঁচে যাবে।। কিন্তু উনার কেন মনে হইলো আমি উনার মেয়ের সাথে ফোনে কথা বলি।। আর যদি বলেও থাকি, কোথায় উনি আমাকে শাসাবেন, বা বাসা ছেড়ে দিতে বলবেন, তা না করে উল্টা আমার হাতে পায়ে ধরা শুরু করেছেন।। বাহ্‌, মজা তো, আমি যদিও বেশ অবাক, তবে মনের সুখে গান গাইতে গাইতে দু’তলা থেকে চারতলায় নিজের বাসায় উঠে যাচ্ছি।।

রুমে এসে ভাবতে বসলাম, কেন টিটু আংকেলের এমন মনে হইলো যে আমি উনার মেয়ের সাথে কথা বলি।। আচ্ছা উনার মেয়ের নাম কি, দেখতে কেমন, মাত্র নাকি অনার্সে উঠেছে।। বয়সে তো তাহলে কমই বলা চলে, হলো কি আসলে!! এমন সময় কলিং বেলের শব্দ পেলাম।। টিটু আংকেল এসেছে, উনাকে নিয়ে আমার রুমে বসলাম।। উনি আমার দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো- শোভন, তুমি আমার অদ্রির সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিবা, কথা দাও আমাকে।। আমি মনে মনে ভাবলাম, আচ্ছা মেয়ের নাম অদ্রি, বাহ্‌ সুন্দর নাম তো।। উনি আমাকে তাগাদা দিচ্ছেন- কি হলো বাবা, কি ভাবছো, কথা দাও!!

আমি উনাকে বললাম- ইয়ে মানে আংকেল, ঠিক আছে বলবো না।। উনি সাথে সাথে উঠে চলে যেতে যেতে বলছেন- আমি কিন্তু তোমার কথা বিশ্বাস করে নিলাম।। আমার একটা মাত্র মেয়ে বুঝলা, ওকে বকা দিতে পারি না আমি।। আমার বিয়ের ১২ বছর পরে এই মেয়েটা হইছে তাই তোমার কাছেই আমার অনুরোধ, তুমি বড় মানুষ, তোমাকে আমার ভদ্র ছেলে মনে হয়, তুমিই অফ হয়ে যাও।। আমি মাথা নাড়লাম!! উনি চলে গেলেন!!

আমি তো আসল ঘটনা কিছুই জানি না, শুধু জানি আজ থেকে প্রতি মাসে আমার ছয় হাজার দুইশত টাকা বেঁচে যাবে।। প্রচন্ড খুশি লাগছে, কিন্তু টিটু আংকেলের এমন ধারণা হবার পিছনে কারণ কি!! আমি মনে মনে একটা হিসাব কষলাম- আমার ধারণা, এমন কিছুই হবার সম্ভবনা বেশি, আমি যা ভাবছিলাম তাই হবে হয়তো।। দেখা যাক্‌ পরের টা পরে, এখন সব চিন্তা বাদ দিয়ে, এই বাড়তি ছয় হাজার দুইশন টাকা দিয়ে কেমন মজা-মাস্তি করা যাবে সেটাই ভাবলাম।।

দুইদিনেই ওই টাকা শেষ!! ইচ্ছামত ঘুরে ঘুরে খাইলাম আর হালকা পাতলা শপিং করে নিয়েছি।। আমার কোন চিন্তা নাই, মনের মধ্যে দুনিয়ার খুশি।। ইস্‌ মনে হচ্ছে অদ্রিকে সত্যি সত্যি বাগে আনতে পারলে ভালোই হতো।। এই মেয়ে অনার্সে পড়ে, কই পড়ে জানতে পারলে সুবিধা হতো।। বাইরে থেকে বাসায় ঢুকতে যাবো, এমন সময় টিটু আংকেলের সাথে নিচে গেটে দেখা।। উনি আমাকে দেখেই একগাল হেসে বললেন- আরে শোভন যে, আমি তো মনে মনে তোমাকেই খুঁজতেছি।। আমি পাল্টা হাসি ফেরত দিয়ে বললাম- জ্বী আংকেল, কেনো, কোন দরকার??

-আরে তুমি এই মাসের ভাড়াটা দিলা না তো!!

আমি ভ্রু কুঁচকে বললাম- আংকেল মানে কি, আপনিই না বললেন অদ্রির সাথে কথা না বলতে আর ভাড়া দেয়া লাগবে না।। উনি আমার দিকে কটমট করে তাকিয়ে বললেন- অদ্রি কি তোমার সাথে কথা বলতো নাকি, ও তো অন্য শোভনের সাথে কথা বলে।। আমি মেয়ের মোবাইলে শোভন লেখা দেখে আমি বোকার মত ভাবছি তোমার সাথে কথা বলে।।

আমার সাথে সাথে মন খারাপ হয়ে গেলো।। মনে মনে বললাম, এই হিসাবটাই তো মিলাইছিলাম।। কিন্তু, এখন আমার কি হবে, এই টাকা আমি কই থেকে দিবো, আমি তো ফূর্তিতে সব খরচ করে বসে আছি।। টিটু আংকেল তাগাদা দিয়ে বলছেন- কখন দিবা ভাড়া, সাথে আছে, নাকি বাসায় রাখা?? আমি চট করে, বুদ্ধি করে বললাম- আংকেল শুনেন, ওই যে অন্য শোভন আছে না, আমি তার সাথে আপনার মেয়ের কথা বলা বন্ধ করানোর ব্যবস্থা করতেছি।। প্রয়োজনে ওই ছেলেকে এমন ভয় দেখাবো, আপনার মেয়ে তো দূরের কথা কোন মেয়ের সাথেই কথা বলবে না।।

টিটু আংকেল ধমকের সুরে বললেন- খবরদার কি সব বলো, ওই ছেলেকে চিনো তুমি!! ওই ছেলে সরকারী চাকুরী করে, ওই ছেলের সাথে আমার মেয়ের বিয়ে দিবো আমি, ওদের উত্তরায় নিজেদের বাসাও আছে।। আমি সব খোঁজ নিয়েছি, যদিও অদ্রি বলছে, ওই ছেলে নাকি ওর যাস্ট ফেসবুকে পরিচিত, একটু আকটু ফোনে কথা বলে।। আমার ধারণা এসব মিথ্যা কথা, নিশ্চিত ওরা প্রেম করে।। আর প্রেম না করলে, আমি করাই দিবো, এমন সরকারী চাকরী করা সোনার টুকরা ছেলে হাত ছাড়া করা যাবে না।। যাও তো বাবা ভাড়া সাথে না থাকলে উপর থেকে নিয়ে আসো।। তোমার কিছুই করতে হবে না।।

আমার রাগে দুঃখে কান্না পাচ্ছিলো, উনার মেয়ে আমার সাথে শুধু কথা বলে এই ভেবে লোকটা কত নাটক করলো।। আর ঐ শোভনের ব্যাপারে সে বাড়াবাড়ি রকমের রাজী।। এখন তো এই বাড়তি ছয় হাজার দুইশত টাকা দিলে আমার পুরো মাস চলাই দুরহ হয়ে যাবে।। কি আর করার, বোকামির দণ্ড দিতে হবে।।

অগত্যা টিটু আংকেলকে বললাম- আচ্ছা উপর থেকে ভাড়া নিয়ে আসছি।। বলে গোমড়া মুখে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে যাচ্ছি।। দু’তলা আসতেই দেখি একটা মেয়ে কেবলি দরজা দিয়ে বের হলো, আমি বুঝে নিলাম এই সেই অদ্রি।। ভালো করে তাকাতেই মেয়েটাকে বড্ড চেনা চেনা লাগছে।। আরে এই মেয়ে তো ফেসবুকের আদ্রিতা লাবনী সারাদিন আমার গল্পে কমেন্ট করে আর বলে, ক্রাশ খাইছি, প্রেমে পড়ছি ভাইয়া।। চ্যাটেও নক দিছিলো, হালকা পাতলা কথাও হইছে, তবে ওভাবে সময় দিতে পারি নাই।। মেয়েটা আমাকে দেখে থ মেরে গেছে!! আমি একটা বিজয়ী চেহারা করে মেয়েটাকে বললাম- আমার মনে হয় আমি আপনাকে চিনি।। মেয়েটা আমাকে দেখেই যাচ্ছে, তারপর বললো- ও মাই গড, শোভন ভাইয়া ইউ আর মাই ক্রাশ।। বলেই একদম আমাকে অবাক করে মেয়েটা ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো।।

আমি আচমকা এমন জড়িয়ে ধরাতে তাল সামলাতে না পেরে একটু পিছিয়ে গেলাম।। কয়েক সেকেন্ড পর সিঁড়ি বেয়ে কারও উঠার পায়ের শব্দ পেয়ে পিছনে ফিরে তাকালাম, দেখলাম টিটু আংকেল ভূত দেখার মত করে আমাদের এই আলিঙ্গন দেখছে।। আমার ধারণা অদ্রির চোখ বন্ধ, তাই সে তার বাবাকে দেখতে পাচ্ছে না।। আমি শুধু মনে মনে বললাম- খেলা হবে বাড়ির মালিক, আসো খেলবো!!

সমাপ্ত

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত