আব্বার মাদকতা

আব্বার মাদকতা

হুট করে আম্মারে জিজ্ঞাসা করে বসলাম “আম্মা, আমার আব্বা কি মদ খায়?” প্রত্যুত্তরে আম্মা প্রথমে আমার বাম গালে একটা চড় পরে ডান গালে আরেকটা চড় মারল। আর ভ্রকুটি মেরে বলল “দিন দিন কি কুজাত হইতাছস”। দুই গালে ব্যাথার অনুভবে টের পেলাম এমন শক্তি দিয়ে আমার আম্মা আগে কোনদিন মারেনি৷ আম্মা ভাতের থালাটা হাত থেকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে সরে গেল আমার সামনে থেকে। পুরুষ লোকের কখনোই কাঁদতে হয়না এমন নিয়ম আছে বলেই হয়ত এত জোরে কষালো দুইটা চড় খেয়েও কাঁদলাম না৷ কেবল দুই গালে দুই হাত ধরে গাল দুটোকে লুকিয়ে এদিক ঐদিক তাকালাম একবার। পেছন থেকে “আম্মা, কই যাও?” বলে চেঁচাতে গিয়েও থেমে গেলাম অজানা কারণে।

ফোঁপাতে ফোঁপাতে রাত্রিবেলার খাবার না খেয়েই বিছানায় জড়সড় হয়ে শুয়ে পড়লাম। আম্মা অনেক চেষ্টা করেও রাগ ভাঙাতে পারেনি। আমার ছোট মনে জেদ ক্রমে বেড়ে ফুলে ফেঁপে সেটা প্রায় অনশন এ রুপ নিয়েছে। চারিদিক নিস্তব্ধ শুনশান, ঘুমিয়ে গেছে গোটা পাড়া খুব সম্ভবত তখন আমার বাবা ঘরে ঢুকেছে। আমার প্রশ্ন, আমার কৌতূহল, আমার জিজ্ঞাসা সব কিছুই হল “বাবার অনেক রাতে বাড়ি ফেরা নিয়ে”। একদিন একটা নাটকে দেখসিলাম এক বাচ্চা ছেলের বাবা অনেক রাত করে বাড়ি ফেরে, কারণ লোকটা গোটা রাত বন্ধুদের সাথে মদ খায়।

স্কুলের তাবত ছেলেমেয়েদের সাথে যখন গল্প করি, সবাই বাবার কত গল্প বলে। তাদের বাবা নাকি সূর্য্য ডুবতেই ফিরে আসে ঘরে৷ তাদেরকে গল্প শোনায়, তাদের সাথে খেলা করে৷ অথচ আমি আমার বাবাকে এক পলক চোখের দেখাটা পর্যন্ত দেখিনা৷ গভীর রাতে ফেরে আবার ভোরে ভোরে চলে যায়। টের পেলাম, বাবা আমার মাথাটা বুলিয়ে দিলেন একবার। আমি ভান ধরে ঘুমিয়ে থাকলাম। চোখ খুলব খুলব করেও আর খুললাম না। বাঁচিয়ে রাখলাম অভিমান কে। অভিমান নিয়ে ফোঁপাতে ফোঁপাতে কখন ঘুমিয়ে পড়লাম মনে নেই।

পরদিন সকালে নিজে নিজেই তৈরি হলাম স্কুলের জন্যে। পড়ার টেবিলের পেপার উলটে দেখি ঠিক জায়গায় যথারীতি টিফিনের টাকাটা খুজতে গিয়ে দেখি জায়গামতন টাকাটা রেখে যায়নি আব্বা। রাগ আরো বেড়ে গেল। হুট করে পেছন থেকে আমার মাথায় একটা হাত বুলিয়ে দেয়ার অনুভুতি টের পেলাম। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম আব্বা। আব্বা আমার মাথার চুল বুলাতে বুলাতে বলল ” আমার মানিক কি খোজে, ট্যাকা? ” আমি চুপ করে রইলাম। আমার সংকল্প হয়ে গেছে এক প্রকার, যে লোক মদ খায় তার সাথে আমার কোন কথা নেই। আড় চোখে খেয়াল করলাম আব্বা শার্টের পকেট থেকে বিশ টাকার একটা নরম নোট বের করে আমার প্যান্টের পকেটে গুজে দিলেন। আমার কপালে একটা চুমু খেলেন প্রথমে। এরপর বললেন “আমার মানিকরে কে বকসে? হের মায়? আমিও কিন্তু মানিকের মারে ইচ্ছামতন বইকা দিসি”। কথাটা শেষ করে আব্বা আমার কপালে আবার একটা চুমু খেয়ে বের হয়ে গেলেন ঘর ছেড়ে। আমিও পেছন পেছন বের হয়ে গেলাম স্কুলের পথ ধরে। কোন এক অদ্ভুত অনিচ্ছে জাপটে ধরল সেদিন আমাকে। মন আর পা কোনটাই আগাল না স্কুলের পথে। শেষমেশ স্কুলে গেলাম না আর। এক ধরণের তীব্র কোতূহল আমাকে টেনে নিয়ে গেল সেদিন আব্বার পিছু পিছু।

খুব সাবধানে এক দুই গুনা যায় মতন আস্তে আস্তে পা টিপ টিপ করে নজরে রাখতে আরম্ভ করলাম আব্বাকে। কই যায়? কোথায় বসে আড্ডাখানা? আব্বা এগুচ্ছে। আমিও এগুচ্ছি আব্বার পেছন। বিশাল পরিত্যক্ত যন্ত্র পাতির ইয়ার্ড। বড় বড় লোহা, লক্কর, লম্বা লম্বা লোহার পাইপ, ভারী ভারী ইলেক্ট্রিক মোটর। আমি দেখলাম আমার আব্বা এইগুলান একের পর এক কাঁধে করে ইয়া লম্বা একটা ট্রাকে তুলছে।স্পষ্ট খেয়াল করলাম লোহার ভাড়ে আব্বার কাধ গলিয়ে নেমে যাবে যাবে অবস্থা। মাথার উপর সূর্য্য তার সবটা শক্তি নিয়ে জানান দিচ্ছে রোদের দীপ্ততা৷ একসময় দুপুর গড়াল। অথচ তখন পর্যন্ত একবারও আমার আব্বা মদ খেল না। মনে মনে ভাবছি হয়ত কাজ শেষ করেই মদ খেতে বসবে। হৈ-হুল্লোড়, চেঁচামেচি বাড়ছে ক্রমশ, সূর্য্য প্রায় নিস্তেজ হতে শুরু করেছে ততক্ষণে। অথচ তখনো আমার আব্বার কাজ শেষ হয়না। আমার ছোট্ট মনে এখনো অদ্ভুত প্রশ্নটি তাড়া করে মারছে “তবে আব্বা মদ খাবে কখন?” হয়ত আরেক বার কাধ থেকে ভারটা নামিয়েই রওনা করবে আড্ডখানায়।

সূর্য্য নিভে গেল একসময়। আলতো করে নেমে পড়ছে সন্ধ্যার নিকষ অন্ধকার। আব্বা বাকী আর দশজনের সাথে লম্বা একটা সিরিয়ালে দাঁড়ালেন। আমার অবুঝ মন তখনো ধরে নিল এই বুঝি আব্বা দাঁড়ালেন মদের বোতলটা লুফে নেবেন বলে। একজন দুজন করে এগুতে এগুতে একসময় আব্বা গিয়ে দাঁড়ালেন একটা ছোট্ট জরাজীর্ণ টেবিলের সামনে, চেয়ারে বসে থাকা ভুড়িওয়ালা এক লোক কিছু টাকা দুই হাতের কড়ে তুলে নিয়ে পরপর দুইবার গুনে তুলে দিলেন আব্বার হাতে। আব্বা চটজলদি টাকাগুলো হাতে তুলে নিয়ে জ্বলজ্বল চোখ করে টাকাগুলো খুব ধীরগতিতে আরো একবার গুনে চটজলদি গুজে নিলেন গায়ের ঘর্মাক্ত শার্টের ভেজা পকেটে। কোন এক অদ্ভুত অনির্ণিত কারণে আনমনে চটজলদি আমার চকচক করা নতুন নেভি ব্লু প্যান্টের পকেট থেকে সকালে আব্বার গুজে দিয়ে যাওয়া সেই বিশ টাকার নোটখানা বের করে নাকের কাছে ধরলাম৷ জীবনে এই প্রথম এক অতি প্রাকৃতিক সুগন্ধ ভেসে এল আমার নাকে। আমি আনমনেই টাকাটার উপর আলতো করে বুলিয়ে দিতে লাগলাম, ঠিক যেমন বাবা আমার চুল বুলিয়ে দেয়। কিন্তু কেন?

ততক্ষণে আব্বা টাকাটা পকেটে গুজেই হাটা ধরলেন ইয়ার্ডকে পেছনে ফেলে নতুন গন্তব্যে। আমি ভাবলাম আব্বার বোধয় আজকে জলদি কাজ শেষ। তার মানে আব্বা এক্ষুণি যাচ্ছেন বন্ধুদের সাথে মদের আড্ডায়। কামানো টাকা উড়াবেন সেথায়। আব্বা হাটছেন, হাটছেন আর হাটছেন। আমিও আব্বাকে অনুসরণ করে মিটমিট পা করে হাটছি,হাটছি আর হাটছি। ততক্ষণে সন্ধ্যার বয়স বাড়তে শুরু করে রাতের দিকে ধাবিত হচ্ছে ক্রমে।
এভাবে প্রায় পনর মিনিট।

আব্বা এসে দাঁড়ালেন একটা বিশাল টার্মিনালে, ঢুকে গেলেন টার্মিনালের একটা ছোট্ট রুমে। এক মিনিট দু মিনিট তিন মিনিট। প্রায় দশ মিনিট পর আব্বা বের হলেন ছোট্ট রুমটা থেকে। আব্বার মাথায় বিশাল একটা ঝাকি, দূর থেকে মাথা উঁচিয়ে প্রত্যক্ষ করলাম সেই ঝাকির মধ্যে থেকে উঁকি মারছে আপেল, কমলা আর আঙুর। আব্বা ঝাকিটা মাথা থেকে নামিয়ে বসে গেলেন টার্মিনালের এক কোণায়। গলা উঁচিয়ে হাক ডাক করতে করতে চেচাতে লাগলেন জোরে খুব জোরে” লাগেনি আপেল, কমলা কি অদ্ভুত। আমার আব্বা একজন আপেল বিক্রেতা। কখনোতো বলেনি। নাকি বলেছে? আমি জানিনা? কিন্তু কেন? আব্বা এবার ও মদ খেল না। শুধু খেল একটা নোনতা বিস্কিট, এক মগ পানি আর এক কাপ চা। আব্বার শার্টের দুইটা পকেট। ঐ যে ইয়ার্ডে লোহা লক্কড় বয়ে যে টাকা পেল সেটা বাম পকেটে। আর আপেল কমলা বেঁচে পাওয়া টাকাটা ঢুকল ডান পকেটে।

রাত দশটা। আমার প্যাটে তীব্র ক্ষিদা৷ বুঝে নিলাম আব্বা আজ মদ খায়নায় আর। হয়ত খাবেনা। খাইলেও রাতে। দৌড় মারলাম বাড়ির দিকে। আম্মার কাছে। তখন মেলা রাত। ঘুম ধরেছে চোখে। দরজায় ধাক্কা দিলো কেউ। ঘুম ভেঙে গেলেও চোখ বুজে আছি। টের পেলাম আম্মা দরজা খুলে দিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই মাথায় হাত বুলানোর আরাম। উঠে বসতেই দেখলাম মাথার কাছে আব্বা। আরামে আমার চোখে কান্না। কিন্তু কেন? আব্বা চুল বুলাতে বুলাতে বললেন “আমার মানিকটা কাঁদে কেন? তার লাইগা একটা নতুন ঘড়ি কিইন্না আনসি। এই যে ঘড়ি। ক্যাসিও ঘড়ি। কি সুন্দর ঘড়িটা” ঘড়িটা পরলাম। আব্বাকে আম্মা ডাকল খাইতে। কি জানি কি মাথায় এল চট করে। টুক করে বিছানা ছেড়ে উঠে আব্বার শার্টের কাছে গেলাম। বাম পকেটে হাত দিলাম, পাঁচশ টাকার একটা নোট। ডান পকেটে হাত দিলাম। পকেট টা খালি। ঠিক খালি না। একটা কাগজ বের হইলো। কাগজে লেখা –

১. আপেল ২ কেজি ৮০ টাকা
২. কমলা ১ কেজি ৬০ টাকা
৩. আঙুর ১ কেজি ১২০ টাকা
মোট বিক্রি ২৬০ টাকা

পরের দিন সকাল। স্কুলে গেলাম না। গেলাম একটা ঘড়ির দোকানে। হাত থেকে ঘড়িটা খুলে দোকানদার চাচারে জিজ্ঞাসা করলাম “চাচা ঘড়িটার দাম কত?” চাচা বলল “২৫০ টাকা” আব্বার ডান পকেট। আপেল কমলা আর আঙুর। ২৬০ টাকা। একটা ক্যাসিও ঘড়ির দাম ২৫০ টাকা। বাঁচল ১০ টাকা। অর্থাৎ আমার আব্বা মদ খায়নি। কোনদিন ই মদ খায়নি। কারণ প্রত্যেক সকালেই ঘুম ভেঙে কখনো নতুন জামা পেয়েছি। কখনো নতুন প্যান্ট। স্কুলের ব্যাগ। বই। খাতা। এসব এসেছে আব্বার ডান পকেটের টাকায়। আর বাম পকেটের টাকায় এসেছে চাল ডাল আর ঘর ভাড়া।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত