রাক্ষস

রাক্ষস

বাসর রাতে জানতে পারলাম আমার বর একটা রাক্ষস!! বিয়ের আগে তার বন্ধুরা রাক্ষস বলত। কিন্তু তখন বুঝতে পারিনি। নতুন বউ খাটে বসে আছে তার কোন খেয়ালই নেই।আপন মনে খেয়েই চলছে।কিছুক্ষণ আগে এত্তগুলা কাচ্চি খেল এখন বেডরুমেও খাবার খাচ্ছে। “ভাইজান আপনের আর কিছু লাগলে বলবেন।” মানে কি? কাজের মেয়েটা এসে এরকম বলল কেন?

নাহ খাটে বসে থাকা আর সম্ভব হচ্ছে না।তাই খাট থেকে নেমে তাকে বললাম- কি হয়েছে? কিচ্ছুক্ষণ আগেই তো আমরা ডিনার করলাম। এখন সে কিছু না বলে খেয়েই চলছে।খাওয়া শেষ করে খাটে শুয়ে পরল।আমার সাথে কথাই বলল না। ব্যাপারটা বুঝতে পারলাম না।তিনি তো নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। সারারাত নাক ডাকার শব্দে ঘুমাতে পারিনি।তাই সকালে উঠতে দেরি হল।তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নিচে গিয়ে দেখলাম আমাকে ছাড়াই আমার জামাই নাস্তা শুরু করে দিয়েছে।বাসায় এত মেহমান তার সাথে ঠিক ভাবে কথাই বলতে পারছিলাম না।

বিকালে বাসায় আসলে আমার শ্বাশুড়ি বলে বউকে নিয়ে শপিং এ যেতে।যাক এবার ওর সাথে কথা বলতে পারব। শপিংএ যাওয়ার ১৫ মিনিট হাঁটার পর আমার বর বলে তার নাকি খুব ক্লান্ত লাগছে তাই সে একটা দোকানে বসলো। আমি ৩ঘন্টা শপিং সেরে তাকে ফোন করে জানতে পারলাম সে নাকি একটা রেস্ট্রুরেন্ট এ বসে আছে। আমি যাওয়াতে সে কোল্ড কফি অর্ডার করল।খাওয়া শেষ করে বিল দিতে গিয়ে দেখি ৫৯৯০টাকা এসেছে।

বিলটা দেখে হঠাৎ ২বছর আগের পুরানো স্মৃতি মনে পড়ে গেল।এমনি একটা রেস্ট্রুরেন্ট এ আমাদের প্রথম দেখা হয়েছিল।তখন আমি আর আমার বান্ধুবী টাকা জমিয়ে খেতে গিয়েছিলাম। দাম না দেখে পাস্তা অর্ডার করেছিলাম।তাই বিল এসেছিল ৫৯৯০টাকা। কিন্তু আমাদের দুজনের কাছে ৫০০টাকার বেশি ছিল না। টাকা দিতে না পারায় মেনেজার এসে আমাদের যা না তা বলে অপমান করছিল।তখন একটু বেকুব ছিলাম তাই কিছু বলতে পারিনি। পিছন থেকে কে জানি বলে উঠল- আমরা ৭জন খেলাম কিন্তু বিল আসল ৩২০টাকা!আপনারা আমাদের বিল ওনাদেরকে দিলেন কেমনে? এই রেস্ট্রুরেন্ট এর নামে মামলা করব, মেয়েদের হেনস্থা করার অপরাধে। তখন মেনেজার তার ভুল বুঝতে পারল।আর সরি বলল।সেইদিন সেই ছেলেটি আমাদের সাইড নিয়েছিল।সেদিন খুব ভাল লেগেছিল। অনেকদিন পর সেই ছেলেটিকে পিঠা উৎসবে আবার দেখা।

-আরে আপনি!কেমন আছেন?
-এইত ভাল।আপনার কি খবর?
-ভাল।আপনাকে থ্যাংকস দেয়া হয়নি।আপনি এত করলেন আমাদের জন্য।
– না না সে আর এমন কি?
-আপনি চাইলে কম বিল দিয়ে যেতে পারতেন।কিন্তু আপনি তা করেননি। তারপর এক ফুড ফেস্টিভ্যাল এ দেখা আর অবশেষে আমার বান্ধুবীর বিয়েতে ছেলে পক্ষ হিসাবে দেখা!
-আপনার বান্ধুবীর তো বিয়ে হয়ে যাচ্ছে।এবার নিশ্চয় আপনার পালা?
-তা জানি না,তবে এইবার একা একা ঘুরতে হবে।
-আপনি সময় দিলে বান্ধবীর জায়গাটা আমি পুরণ করতে পারি।

-আচ্ছা আপনার নামটাই তো জানা হয়নি।
-আমি মেঘলা,আপনি?
-আমি শ্রাবণ।

এরপর আসতে আসতে আমাদের একজন আর একজনকে ভাল লাগে। তারপর বিয়ে করে ফেলি। সেসব পুরানো কথা! কিন্তু এখন কথা হচ্ছে দুটা কোল্ড কফির দাম ৫৯৯০টাকা কিভাবে।শ্রাবণ টাকা বের করতে যাচ্ছে তখন তাকে থাকিয়ে ওয়েটারকে বললাম-

-এগুলা কি ডাকাতি নাকি?হ্যাঁ আমার জামাইকে পয়সাওয়ালা পেয়ে হাতানোর ধান্দা নাহ?আগে বেকুব ছিলাম এখন আর এসব হচ্ছে না।

-সরি মেম!আপনি আসার আগে আপনার হাসবেন্ড ৪টা পেস্ট্রি, ২টা আইসক্রিম,১টা লেইম জুস,পাস্তা,পিৎজ্জা,গ্রিল চিকেন আর ৬টা রোল অর্ডার করেছিল।তার সাথে এখন দুটা ক্লোড কফি মোট ৫৯৯০টাকা।

আমি রাগ করে কিছু না বলে রেস্ট্রুরেন্ট থেকে বের হয়ে গেলাম। বাসায় গিয়ে তাকে বললাম -এসবের মানে কি? সে কিছু বলতে যাচ্ছিল তখনি শ্বাশুড়ি এসে বলল- আহারে ৪ঘন্টা শপিংএ আমার ছেলেটা ক্লান্ত হয়ে গেছে।আয় বাবা তোকে খেতে দি। মানে কি? এতকিছু খাওয়ার পর পেটে জায়গা থাকে কিভাবে? আমার শ্বাশুড়ি সারাদিন বসে বসে কমপক্ষে ১২টা তরকারি রান্না করে।আর ছেলেও আরাম করে খায়। শ্রাবণের বাবার অনেক বড় ব্যবসা। তিনি নিজেই সামলাম।

কাজের মেয়েটা থেকে জানতে পারলাম আমার শ্বাশুড়ির বিয়ের ১৫বছর পর শ্রাবণ হয়েছে।তখন সে খুব রোগা ছিল,পুষ্টিকর খাওয়ার অভাবে মারাও যেতে পারে। তাই ডাক্তার বলেছে বেশি বেশি খাওয়াতে।তাই এখনো শ্বাশুড়ি মা তার একমাত্র ছেলেকে শুধু খাওয়ান।কোন কাজই করতে দেন না।তার সাথে তেমন ঘুরা হয়নি তাই বিয়ের আগে জানতে পারিনি। শ্রাবণের এই রাক্ষসের মত খাওয়ার জন্য কোথাও যেতে লজ্জা লাগে।সেদিন ছোট আন্টির বাসায় খেতে গিয়ে আর এক ঝামেলা।সে একাই ৬জনের খাওয়ার খেয়ে নিল।তাদের খাবার শট পড়ে গেছিল। দিন দিন তার খাওয়া বেড়েই যাচ্ছিল।সব কাজিনরা দেখা হলেই বলে-কিরে তুই দিন দিন শুকিয়ে যাচ্ছিস? –আরে কি বলিস শুকাবে না সব তো জামাইকেই খাওয়ায়।

-দুর কি যে বলিস তোরা!চুপ কর।মেঘলা তুই চিন্তা করিস না আমি কিন্ত ১০জনের এক্সট্রা খাবার রেখেছি। তোর জামাই খেতে পারবে।
-আচ্ছা তোর জামাই এত খায় তাও মোটা হয়না কেন?

শ্রাবণকে দেখতে অনেকটা হিরোদের মত। আমার জামাই নিয়ে কাজিনদের জামাইর সাথে অনেক তুলনা করেছিলাম।তাই তারাও এখন সুযোগ পেয়ে বাঁশ দিচ্ছে। একদিন পর পর দুইবেলা দাওয়াত খাওয়াতে তার বদ হজম হয়ে ডায়রিয়া হয়েছিল।ডাক্তার বলেছে ওভার ইটিং এর কারণে লিভার/কিডনির সমস্যা দেখা দিতে পারে।৩দিন হসপিটালে থাকতে হয়েছিল।ডায়েট চার্ট দিয়েছিল। বাসায় ফিরার আমার শ্বাশুড়ি মা বাড়তি খাবার রান্না কে ছেলেকে খাওয়ালেন।৩দিন নাকি হসপিটালে কিছুই খেতে পারেনি।কে শুনে আমার কথা আর কে দেখে ডাক্তারের ডায়েট চার্ট!

কয়েকমাস পর আমার শ্বাশুড়ির বোন অসুস্হ হয়ে যান।তাকে দেখতে তিনি গ্রামের বাড়ি যান।সব দায়িত্ব আমাকে দিলেও রান্নার দায়িত্বটা কাজের মেয়েকে দিয়ে যান। খুব চালাক মহিলা।কিন্তু আমিও কি কম চালাক নাকি? কাজের মেয়েটিকে টাকা পয়সা বাড়িয়ে দিয়ে ছুটি দিয়ে দিলাম। ডায়েট চার্টের মত সবজি মাছ আর ডাল রান্না করে দিলাম।প্রথমদিন একটু কষ্ট হলেও পরেরদিন আসতে আসতে অভ্যাস হয়ে গেল তার।
এভাবে খেলে আর অসুস্থ হবেনা। একদিন শ্রাবণকে বললাম-

-তোমার খুব কষ্ট হয় নাহ? এসব অখাদ্য খেতে?
-না না তুমি এত কষ্ট করে ভালবেসে রান্না করো আর আমার কষ্ট হবে কেন? (আহারে আমি শুধু শুধু আমার জামাইটার উপর রাগ করি কথা শুনাই।কিন্তু কত্ত ভালবাসে সে আমাকে।)

-আচ্ছা কালকে তো শুক্রবার কালকে তোমার জন্য চিকেন বিরিয়ানি করব।
-তুমি যা রান্না করবে সব খেতে রাজি আছি।

হঠাৎ কলিংবেল বেজে উঠল।প্রতিদিন একই সময়ে কেউ যেন আসে।আর আমার জামাইকে জিজ্ঞেস করলে ওহ এটা ওটা বলে বুঝিয়ে দেয়। আজকে দরজার সামনে গিয়ে যা দেখলাম চোখ কপালে উঠে গেল। আমার জামাই আমাকে দেখেই থতমত খেয়ে গেল।তার হাতে অনেকগুলা খাবারের প্যাকেট!!

-তার মানে তুমি আমাকে এতদিন মিথ্যা বলেছিলে?
-না,মানে, মেঘলা! তুমি যা রান্না কর তা খেতে পারিনা।তেল কম, লবণ কম,অখাদ্য!

-অখাদ্য!!আমি থাকব না তোমার সাথে।
-আরেহ!রাগ কর কেন।আজকে অফার চলছে আসো একসাথে খাই।

-শ্রাবণ!আমি না খাবার, কে ইমপরট্যান্ট তোমার কাছে? (রাক্ষসটা কিছুক্ষণ ভেবে বলল)

-বউ গেলে বউ পাব।অফার গেলে আর অফার পাব না। এই বলে সে আপন মনে খাওয়া শুরু করল,আর আমি আপন মনে তার দিকে তাকিয়ে আছি..

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত