লুকোচুরি

লুকোচুরি

-সাদিক, কেমন আছো? কোমল কণ্ঠ। একদম হৃদয়ে লাগে৷ আমি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম। আমার মনে হয় আমি বোবা হয়ে গিয়েছি৷ কথা বলতে পারি না৷ বিয়ে বাড়ি৷ অনেক লোকজন। আমি আসতে চাইনি। শোরগোল খুব একটা পছন্দ করি না৷ প্রিয় বন্ধুর বিয়ে৷ খুব করে বলল। তাই এলাম। বড় অদ্ভুত ব্যাপার, একটা সময় যে ছেলেটা শোরগোল করে বেড়াতো আজ সে-ই বলছে শোরগোল তার পছন্দ নয়৷ যে বন্ধুদের জন্যে সে জান পর্যন্ত দিয়ে দিতে প্রস্তুত ছিল,

আজ সে বন্ধুই তাকে জোর করে বলেকয়ে নিজের বিয়েতে দাওয়াত দিয়েছে৷ তাকে তার বিয়েতে নিয়ে এসেছে। মানুষ কত পরিবর্তনশীল তাই না? যখনই একাকিত্ব আমাকে আঁকড়ে ধরে, আমি এসব নিয়ে ভীষণ ভাবি। এত পরিবর্তন নিয়ে। কীভাবে কী হয়ে গেল। বন্ধুরা কোথায় চলে গেল। আমি কোথায় চলে এলাম। কেন এত পরিবর্তন? আমার ভাবনা শেষ হয় না৷ যতক্ষণ না আমার বুকের বাঁ পাশটা কেঁপে উঠে। কান্না করে। আমি প্রচুর ভাবি৷ আমার খারাপ লাগে তখন। মেয়েটা আবার বলল,

-কিছু বলছো না যে?

আমি চুপ করে থাকলাম। তার দিকে তাকাইনি পর্যন্ত। নিচের দিকে তাকিয়ে থাকছি, এদিক ওদিক তাকাচ্ছি। এমন ভাব করছি যেন তাকে পাত্তাই দিচ্ছি। অথচ বুকের ভেতরে কী ভীষণ উৎসাহ তৈরি হয়েছে তাকে দেখার, কী ভীষণ আনন্দ হচ্ছে তার কোমল কণ্ঠ শুনে, বুকের ভেতর ধপ ধপ শব্দটা যেন দ্রুত গতিতে বেড়েই চলেছে, চোখে জল জমতে চাইছে অথচ আমি তা ভেতর থেকে আঁটকে রেখেছি, মনের সাথে যুদ্ধ করে তাকে দেখা থেকে বিরত থাকছি। অবাক লাগে, আমি নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ করা শিখে গেছি। কী নিখুঁত অভিনয় করছি। সত্যিই বড় অবাক হই। কী পরিবর্তন, আমি তো আগে এমন ছিলাম না৷ আসলেই মানুষ কত পরিবর্তনশীল তাই না? মেয়েটা এবার নিচু স্বরে বলল,

-কী হলো? কথা বলবে না আমার সাথে?

বিয়ে বাড়ি। লোকজন বেশি হয়। মেয়েটা না হয় এত লোকজনের ভিতরে হারিয়ে যেত! সিনেমার মতো কাছাকাছি থেকেও আমাদের দেখা হতো না! অল্পের জন্যে ধাক্কা লাগতে গিয়েও ধাক্কা লাগত না৷ একটুর জন্যে চোখে পড়ত না। কী হতো? কী এমন ক্ষতি হতো৷ সিনেমাতে তো এমন হয়। বাস্তবে কেন হয় না৷ কেনইবা সে সুমনের বোনের বান্ধুবি হতে গেল। আর কেনই বা তাকে দাওয়াত দিয়ে আনা হলো৷ আসলে বিধাতা চাইছেন কী? আমি তাকে যতই এড়িয়ে চলছি তিনি তাকে ততই আমার কাছে নিয়ে আসছেন। যেখানে আমি একবার থেমে গিয়েছিলাম, আমার জীবন থেমে গিয়েছিল, যেখানে আমি ফুলস্টপ দিয়ে এসেছিলাম, যেখানে সে আমাকে একা রেখে চলে গিয়েছিল, আমাকে একটা অন্ধকার ভুবন দিয়ে গিয়েছিল তিনি আজ আবার আমাকে সেই ফুলস্টপের,সেই অন্ধকার ভুবনের শেষ প্রান্তে এনে দাঁড় করালেন। কেন? কিসের আশায়? তিনি কী জানেন না আমি পরিবর্তন হয়ে গেছি। কী ভীষণ যন্ত্রণা আমার ভেতরটা গ্রাস করে নিয়েছে তিনি কি তা বুঝতে পারেন না? আমি যে দিনরাত একটা গোপন কষ্টে মরি সেটা কি তিনি জানেন না? মেয়েটার এবার ধরে আসা গলায় বলল,

-আ’ম সরি সাদিক। আমাকে ক্ষমা করে দাও? প্লিজ! আমি কিছু বললাম না। চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলাম। মেয়েটা আবার বলল,

-কথা বলো সাদিক। তোমার এমন চুপ থাকা আমায় ভীষণ পিড়া দেয়। আমার সহ্য হয় না। প্রথমদিন থেকে দেখছি, তুমি আমাকে এড়িয়ে চলছো,আমার দিকে তাকাচ্ছোও না। আমি মানছি, সব দোষ আমার। আমি যা করেছি ঠিক করিনি। কিন্তু তাই বলে তুমি আমাকে এভাবে কষ্ট দিতে পারো না৷ তুমি জানো আমার কী পরিমাণ কষ্ট হয়?
আমার খুব ইচ্ছে হলো কিছু বলি ওকে। কিন্তু কিছু বের হলো না মুখ দিয়ে। তাই চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলাম। নীরা মনে হয় আমার দিকেই তাকিয়েছিল। এমন সময় কোত্থেকে যেন সুমন দৌড়ে এল। আমার পাশে দাঁড়িয়ে বলল,

-নীরা, বহু কষ্টে ওকে বিয়েতে এনেছি। আসতে চাইছিল না। জোর করে তুলে নিয়ে এলাম। আমি চাই না কোনো কারণে আমার বন্ধু বিয়ে ফেলে চলে যাক। ও চলে গেলে আমি বিয়েই করব না৷ তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছো আমি কী বলতে চাইছি৷ তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল,

-আয় সাদিক,আমার সাথে আয়৷ বাগানের দিকে গিয়ে বসি।

আমি সাদিকের সাথে বাগানের দিকে গেলাম। আমার মনের ভেতর তখন উতালপাতাল ঝড় বইছে৷ কেমন জানি লাগছে। অতীত কোনো মতেই পিছু ছাড়ছে না৷ আঠার মতো লেগে আছে। বাগানের কাছে আসতেই আমি সিগারেট ধরালাম। সাদিকও নিল একটা। বললাম,

-সিগারেট ছাড়িসনি? ও ফিক করে হেসে ফেলল। বলল,
-নাহ। তবে এত বেশি খাই না৷ দৈনিক তিনটার মতো খাওয়া হয়৷
-ভাবি জানে?
-উহু। লুকায়া লুকায়া খাই।
-বিয়ের পর কী করবি? তখন তো লুকাতে পারবি না৷ ও লম্বা করে ধোঁয়া ছেড়ে বলল,
-ছাড়তে হবে আরকি। তবে অফিসে গেলে সেটা পুষিয়ে নিব।

কথাটা শেষ হতেই দুজনে মিলে হেসে উঠলাম। হাসির মাঝেই সুমনের ফোন বেজে উঠল। আমি তখন আপন মনে সিগারেটের ধোঁয়া গিলছিলাম। কিছু বাইরেও ছড়িয়ে দিলাম। ফোন ধরেই দেখলাম সুমনের মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। সিগারেটটা হাত থেকে পড়ে গেল। কোনো মতে বলল,

-আচ্ছা। আমার কৌতুহল জাগল। ফোন রাখতেই জিজ্ঞেস করলাম,
-কিরে? কী হয়েছে?

ও মুখ কালো করে এদিক সেদিক তাকাতে থাকল। হঠাৎ উপরের দিকে চোখ পড়তেই দেখল সেখানে নীরা এবং তার বোন ইশা দাঁড়িয়ে আছে। বিল্ডিং এর দ্বিতীয় তলার এপাশের রুমের বারান্দায়। আমি ভালো করে তাকাতেই দেখলাম ইশার হাতে একটা ফোন। সে ফোন নাড়িয়ে কিছু একটা দেখাল। ওমনি সুমন দৌড়ে গেল। নিশ্চয়ই ওকে ধরতে। আমি দাঁড়িয়ে থাকলাম৷ সিগারেট তখনও পুরোটা শেষ হয়নি। কী মনে হতে যেন আবার বারান্দার দিকে তাকালাম। দেখলাম নীরা দাঁড়িয়ে আছে। আমার দিকে মন মরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। অল্প কিছু সময়ের জন্যে হলেও আমাদের চোখাচোখি হলো। অনেকদিন পর তার চোখে চোখ রাখলাম আমি। আমার সমস্ত শরীর যেন শিউরে উঠল৷ অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো। আমি সঙ্গে সঙ্গে চোখ নামিয়ে নিলাম। ততক্ষণে সুমন চলে এল। ওকে ভীষণ চিন্তিত দেখাচ্ছিল। বললাম,

-কী হয়েছে?
-আর বলিস না। ইশাটা মহা ফাজিল হয়েছে। সিগারেট খাওয়ার ছবি তুলে নেহাকে পাঠিয়ে দিয়েছে৷ নেহা তো সেগুলো দেখে রেগে একাকার। বলেছে এখনই যদি দেখা না করি তাহলে সে বিয়ে ক্যান্সেল করে দিবে। আল্লাহ জানে আজ কপালে কী আছে। তোর ভাবি যা রাগি না! তারউপর ইশা ভিডিও-ও করেছে৷ আমাকে হুমকি দিয়েছে যদি তাকে নিয়ে এখনই মার্কেটে না যাই তাহলে সে ভিডিও টা নেহাকে পাঠিয়ে দিবে। আল্লাহ! এ কোন বিপদে ফেললে আমায়।
আমি ভ্রু কুচকে বললাম,

– ভিডিওতে কী আছে৷ ছবি তো পাঠিয়েই দিয়েছে।
-আরে বেটা আমি যে অফিসে গিয়ে পুষিয়ে নিব বলেছি না সেটা ভিডিওতে স্পষ্ট শোনা যায়। তুই ভাবতে পারিস, এই ভিডিও বিয়ের পর আমার উপর কেমন প্রভাব ফেলবে? পুরো জীবনটাই তেজপাত করে ছাড়বে। মেয়েদের বুঝিসই তো৷

-আস্তে কথা বললেই পারতি। তাহলে আজ এই পেইনটা নিতে হতো না।
-কে জানত ও ভিডিও করবে? সেদিন মার্কেট করা শেষে হঠাৎই একটা জামা পছন্দ হয়ে যায় ওর। আমাকে বলে কিনে দিতে। আমি দেইনি। যতই কিনে তার শেষ হয় না৷ আরো লাগে৷ না কিনে দেওয়ায় বলেছে এর প্রতিশোধ ও নিবে। কে জানত যে ও এমন প্রতিশোধ নিবে৷ পোড়া কপাল আমার।
-আরে ব্যাপার না। ছোট বোন থাকলে এমন হবেই। ভাবিকে কীভাবে মানাবি সেটা ভাব। আচ্ছা, তুই ভাবির সাথে দেখা করতে গেলে ইশাকে নিয়ে যাবি কীভাবে?

-আল্লাহ দিয়েছে আমাকে এক বোন৷ এত জেদি বলার মতো না। আগে ওকে নিয়ে মার্কেটে যাব। সেখান থেকে নেহার কাছে। সুমনের মুখটা বড় মর্মাহত লাগল আমার কাছে। খানিকটা মায়া হলো। বললাম,
-আমি যাব তোর সাথে?
-অবশ্যই। না গেলে আমি যাব কীভাবে? যদি মেরেটেরে ফেলে তাহলে তোকে লাশটা নিয়ে আসতে হবে না?
এই বলে ও হেসে উঠল। আমি হাসলাম। সিগারেট ফেলে দিয়ে বললাম,
-চল। দেরি করিস না। ভাবীর আগে পৌঁছাতে হবে ওখানে।
-চল। বাসার কাছে আসতেই দেখলাম ইশা আর নীরা বেরিয়ে আসছে। আমি মাথা নিচু করে নিলাম। ইশা কাছে এসেই বলল,
-চল ভাইয়া। আল্লাহ জানে ড্রেসটা এখন পর্যন্ত আছে কী না। যদি রে নাই পাই তাহলে তোর খবর আছে। মনে রাখিস।
সুমন ফ্যাকাশে হাসি দিল। তারপর নীরার দিকে তাকিয়ে বলল,

-নীরাও যাবে নাকি? ইশা বলল,
-হ্যাঁ। আমি গেলে তো ও যাবেই। চল নীরা। ভাইয়া জলদি আয়। নীরা আর ইশা সামনে এগুলো। সুমন আমার দিকে তাকিয়ে থাকল কিছু সময়। আমি হাসলাম। বললাম,
-চিন্তা করিস না। আমি ম্যানেজ করে নিব৷ মার্কেট পর্যন্তই তো। সুমন স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। বলল,
-চল। কয়েক পাঁ হেটে সুমন বলে উঠল,
-বাবা গাড়ি নিয়ে গেছেন। আমাদের রিক্সা বা সিএনজি নিতে হবে।
-উবারে কল দে?
-গ্রেট আইডিয়া। আয়। ওরা বেরিয়ে গেছে।

আমরা গেইট দিয়ে বের হলাম। দেখলাম ইশা আর নীরা দাঁড়িয়ে আছে। সামনে দুটো রিক্সা দাঁড়িয়ে। আমাদের দেখতেই ইশা খানিকটা জোরে বলল,

-ভাইয়া? এত দেরি করিস কেন হু? চল?
-রিক্সায় করে যাবি?
-এমন ভাবে বলছিস যেন কোনো দিন রিক্সায় উঠিসনি। আয় এদিকে। তুই আমার সাথে বসবি। নীরা আর সাদিক ভাইয়া এক সাথে বসবে।

সুমন কিছু বলতে যাবে তার আগেই আমি ওর হাত ধরে ফেললাম। ব্যাপারটা কেমন জানি দেখায়৷ অপমান জনক৷ পরে নীরার নিজেকে ছোট মনে হবে। অপমান বোধ করবে। আমি তা কখনই চাই না৷ তবে আমার কেন জানি মনে হলো এসব নীরা আর ইশার প্ল্যান। নীরা যাতে আমার সাথে বসতে পারে এর জন্যে। এমনটা কেবল আমার মনে হলো৷ এর ভেতর কী আছে কে জানে? রিক্সা চলছে। আমার পাশে নীরা বসে আছে। আমি অল্প হলেও দুজনের মাঝে ফাঁকা রাখার চেষ্টা করছি। আমার চেষ্টায় পানি ঢালল নীরা। সে আমাদের মাঝে কোনো দূরত্ব রাখতে চাইছে না৷ এক সময় আমি হাল ছেড়ে দিলাম। চুপচাপ বসে থাকলাম কেবল। নীরাও বসে থাকল আমার গা ঘেঁষে। আমার দিকে তাকিয়ে থাকল কেবল। আমি অস্বস্তি লাগতে থাকল। কেউ এভাবে এত কাছ থেকে তাকিয়ে থাকলে তো অস্বস্তি লাগবেই। আমি কী করব ভেবে পেলাম না৷ বহু কষ্টে চুপচাপ বসে থাকলাম। হঠাৎই নীরা খানিকটা কড়া স্বরে বলে উঠল,

-সিগারেট ধরেছো কবে? আমি কিছু বললাম না। চুপচাপ থাকলাম। নীরা আবার বলল,
-কী হলো? আমি কিছু জিজ্ঞেস করলাম যে শুনতে পাওনি?

আমার খানিকটা হাসি পেল। মেয়েটা এখনও অধিকার খাটাচ্ছে আমার উপর। কী ভেবে সে অধিকার খাটায়? আমি সত্যিই বুঝতে পারি না। নীরা আবার বলল,

-হাসছো কেন? আমি হাসির কথা বলেছি? আমি বললাম,
-নীরা, তোমার মনে আছে শেষ দিনের কথা। যেদিন আমাদের ব্রেকাপ হয়েছে। তাও ফোনের মাধ্যমে। তোমার মনে আছে তুমি কী বলেছিলে? নীরার মুখটা চট করেই ফ্যাকাসে হয়ে গেল। খানিকটা মলিন৷ আমি এবার সরাসরি দেখলাম তাকে। একদম খুব কাছ থেকে। প্রায় দু বছর পর। আজ দুবছর পর আমি ঠিক সেই অনুভূতিটা অনুভব করছি যেটা আমি দু’বছর আগে করতাম। ব্যবধান একটাই এই অনুভূতির এখন আর কোনো দাম নেই। আচ্ছা মানুষ তো পরিবর্তনশীল। তাহলে তাদের অনুভূতিও কী পরিবর্তনশীল? নীরার দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে বললাম,

-সেদিন তোমার বলা প্রতিটি শব্দ আমার মনে আছে। এখনও যেন স্পষ্ট শুনতে পাই সেই কর্কশ কণ্ঠ। তারপর শেষে কঠিন গলায় বললে,

“ইটস ওভার সাদিক। জাস্ট রিমেম্বার ইট৷ আমি এবং তুমি কেউই কারো জন্যে নই৷ আমাদের কাছে আর কোনো কিছুই বাকি নেই। এই পথচলা এখানে শেষ। গুড বাই।” কীভাবে পারলে? জানো নীরা, আমি ভীষণ অবাক হই এটা ভেবে যে তুমি কীভাবে এটা করতে পারলে? তুমি মেডিক্যালে চান্স পেয়েছো। ভালো কথা। তোমার পড়াশোনার প্রেশার বেশি। অনেক পড়তে হয়৷ তাই আমাকে সময় দিতে পারো। নীরা, চাইলেই কী পাঁচ দশ মিনিট সময় আমাকে দেওয়া যেত না? ফোন করতে তো পারতে? করেছো? এতো পড়া তোমার? দু মিনিট বের করে কথা বলতেও পারো না? হাহ! কী জানি! মেডিক্যাল হয়তো কোনো বাহানা ছিল আমার কাছ থেকে ছেড়ে যাবার কিংবা আসলেই তোমার পড়া শোনার চাপ ছিল অথবা মেডিক্যালে চান্স পাওয়ার অহংকার, যে কারণেই হোক তুমি আমার পাগলামো গুলোকে আর নিতে পারলে না৷

তোমার কলেজের সামনে গিয়ে উপস্থিত হওয়া, হোস্টেলের সামনে গিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা তোমার অপেক্ষা করা, তোমাকে বারবার ফোন দিয়ে বিরক্ত করাটা হয়তো তুমি ঠিকভাবে নিতে পারোনি৷ তাই ব্রেকাপ করেছো৷ আমি সেটা মেনে নিয়েছি৷ মেনে নিয়ে তোমার পথ ছেড়ে চলে এলাম বহুদূরে। তারপরেও কেন তুমি আবার এসেছ? আবার আমার উপর অধিকার খাটাচ্ছো? আমার সাথে কথা বলার বাহানা খুঁজছো? কিসের আশায়? তুমিই তো বললে ইটস ওভার৷ আমিও সেটা মেনে নিয়েছি। সেদিন ফোনে বলা দশমিনিট চল্লিশ সেকেন্ডের প্রতিটি শব্দ গিলে নিয়েছি। দম ধরে কেবল তোমার কথা গুলো শুনে গিয়েছি৷ প্রতিবাদ করিনি৷ তুমি ভালো থাকবে বলে৷ আজ যখন আমি ভালো থাকতে চাইছি তাহলে তুমি কেন আসছো বাধা দিতে? আমি তো তোমাকে বাধা দেইনি? নীরা তুমি চাচ্ছোটা কী? নীরা ফোঁপাতে থাকল। তার গাল বেয়ে অনবরত পানি পড়তে থাকল। আমি কিছু বললাম না৷ চুপ করে থাকলাম। অনেকটা সময় পর নীরা চোখ মুখ লাল করে ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল,

-সাদিক, একটা অপরাধবোধ আমায় কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল৷ আমার ভেতরটা জ্বলে যাচ্ছিল একদম। তোমার অবর্তমান আমায় কী ভীষণ ভাবাতো সেটা তোমাকে বলে বুঝাতে পারব না আমি৷ কতটা মিস করেছি তোমাকে সেটা যদি দেখাতে পারতাম! আমি ভালো ছিলাম না সাদিক। দুবছর আমার কীভাবে যে কেটেছে সেটা একমাত্র বিধাতাই ভালো জানেন৷ পাহাড় সমান আপরাধ আর তোমার না থাকা আমার কাছে বৃহৎ, অথচ কী গভীর কষ্টের সমুদ্রের মতো লাগছিল। কষ্টে ভাসছি আমি এধার ওধার। কিন্তু কোনো কূল কিনারা পাচ্ছি না। এক মাত্র তুমিই পারো আমাকে সেখান থেকে তুলে আনতে। তুলবে? আমি চুপ করে থাকলাম। এমন একটা ভাব করলাম যেন বড় অবেহালা নিয়ে তার কথা শুনছি৷ অথচ আমার ভিতরের যে আগ্রহ তা যদি নীরা দেখত! তাহলে হয়তো মেয়েটা খুশিই হতো। আপসোস, আমি তাকে খুশি করতে পারছি না৷ অভিমানের একটা বৃহৎ পাথর চাপা পড়ে আছে বুকের উপর। হৃদয়মন্দির খাঁ খাঁ করছে। কষ্ট সব ভালোবাসা চুসে নিয়েছে আমার। বললাম,

-বেশ! আমি তোমার এই উপকারটুকুও করলাম৷ তবে এরচে বেশি কিছু চাইতে পারবে না৷ চাইলেও আমি হয়তো তা দিতে পারব না। নীরা কিছু বলল না৷ ছল ছল চোখে আমার দিকে চেয়ে থাকল৷ আমি আবারও বললাম,

-আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছি নীরা৷ তোমার প্রতি কোনো রূপ রাগ আর আমার অবশিষ্ট নেই। আজ থেকে আমি তোমার সাথে নরমাল বিহেভ করব৷ তুমিও তাইই করবে৷ কোনো আশা ছাড়াই৷ ঠিকাছে? নীরা এবারেও চুপ করে থাকল৷ আমি তাকালাম তার দিকে। নাকের ডগাটা লাল হয়ে আছে। ওই এই জিনিসটা বড় ভালো লাগে আমার। এক কালে কত চুমু খেয়েছি ওই নাকের ডগায়। নীরা বলে উঠল,

-আমি তোমার কাছে ফিরে আসতে চাইছিলাম। এই একাকিত্ব জীবন আমার সহ্য হয় না আর৷ তুমি ছাড়া সব কেমন জানি লাগে। শূন্য শূন্য। বড় একা আমি৷ আসবে আমার কাছে?
-একাকিত্ব কেন? কেউ নেই কি?
-একজন ছিল। আর সেই তুমিই৷ তোমাকে ছাড়া অন্য কাউকে আমি ভাবতেও পারি না৷
-কথাটা কি ব্রেকাপের সময় মনে ছিল না?

প্রশ্নটার জাবাব দিল না নীরা। চুপ করে থাকল। নীরার এরূপ কথাবার্তা, আচরণ, চোখের জল আমার হৃদয়কে খানিকটা আদ্র করলেও অভিমানটা যেন ফুলে ফেঁপে উঠল। বললাম,

-আমি আশা করব তুমি এমন চাওয়া থেকে দূরে থাকবে। তুমি ইটস ওভার বলে দিয়েছো। আমি সেখানে ফুলস্টপ দিয়ে এলাম। এরপর নতুন করে শুরু করার কোনো মানেই হয় না৷ তুমিই তো বললে আমি আর তুমি এক না।

-ভুল করেছি। মস্তবড় ভুল৷ আর ভার সইতে পারি না আর আমি৷
-সেটা ভুলে করার পূর্বে ভাবা উচিৎ ছিল৷

নীরা চুপ করে থাকল এবার৷ আমিও থাকলাম চুপ করে। হঠাৎই আমার অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো৷ কেমন জানি লাগতে থাকল৷ কান্না পেল ভীষণ। নীরা বলল,

-তোমার চোখে বলে,তুমি এখনও আমায় ভালোবাসো। তাহলে এত বাধা কিসের? চল না এক হই?
-এই বুকের ভেতর না কষ্ট দলা ধরে পড়ে আছে৷ অভিমান জমে আছে। এতো সহজে কি এক হওয়া যায়?
-তুমি যে কষ্ট পাও?
-এতকাল সয়ে এসেছি। বাকিটাও সয়ে নিব। তুমি তো জানো ধৈর্য শক্তি একটু বেশিই আমার।
-আমার যে কষ্ট হয়?
-তার জন্যে কি তুমিই দায়ী নও?

নীরা এবারেও কোনো জাবাব দিল না। কেবল আমার দিকে চেয়ে থাকল৷ আমি চোখ ফিরিয়ে নিলাম৷ আকাশের দিকে তাকালাম একবার৷ মেঘ জমছে আকাশে৷ আকাশ কালো হচ্ছে৷ কেন জানি না হুট করেই আকাশটাকে বড় আপন মনে হলো। মনে হলো সে আমার খুব কাছের। নীরা বলল,

-বেশ, ক্ষমা তো করলে। বাকি কষ্টাটা না হয় আমি আমার কর্মফলের শাস্তি হিসেবে মেনে নিলাম।

এই বলে থামল নীরা৷ আমিও আর কথা এগোইনি৷ আমার অভিমান, কষ্টকে পাল্লা দেওয়া এত সহজ নয়৷ আমি চুপ করে থাকলাম। রিক্সা থামল। আমি নেমে পড়লাম। সুমনকে বড় অস্থির দেখালো। আমি বললাম,

-তোরা যা। আমি বাইরে অপেক্ষা করছি। সুমন কাছে এসে বলল,
-আমি যাব আর আসব। চিন্তা করিস না৷

সুমন আর ইশা সামনের দিকে আগালো। আমি পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে দেখলাম নীরা দাঁড়িয়ে আছে। আমার দিকে ভ্রু কুচকে তাকিয়ে আছে। ইশা ডাক দিল তখন,

-এই নীরা? আয় না? আমি ততক্ষণে একটা সিগারেট ঠোঁটে চেপে ধরেছিলাম। নীরা চাপা স্বরে বলল,
-খেও না প্লিজ! ইশা আবার ডাকল। আমি বললাম,
-তুমি যাও। তোমাকে ডাকছে ও। নীরা মাথা নিচু করে চলে গেল। আমি তখন সিগারেট জ্বালিয়ে ধোঁয়া ছাড়ছিলাম।মার্কেট থেকে সুমনকে বের হতে দেখলাম। এক। কাছে আসতেই বললাম,
-ওরা কই?ও খানিকটা হেসে বলল,
-ওখান থেকে আজ দুপুরের আগে বের হতে পারবে কী না সন্দেহ। চল। আমরা যাই৷

আমাদেরকে সেখান থেকে যেতে হলো একটা পার্কে। দূর থেকেই দেখলাম নেহা বসে আছে। সাথে অন্য আরেকটা মেয়ে। ভাবির রাগত চেহারা দেখে সুমনের মুখটা শুকিয়ে গেল। বেচারা সুমনের আজ খবরই আছে মনে হয়। আমরা কাছে যেতেই ভাবি আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

-আপনি সাদিক। তাই না? আমি খানিকটা হেসে বললাম,
-জ্বী ভাবি। কেমন আছেন?
-ভালো না। আমার মেজাজটা গরম হয়ে আছে৷ কী না কী বলছি বুঝতে পারছি না৷ আচ্ছা আপনারা সিগারেট কেনখান বলুন তো?
-ভাবি, আমার আসলে ব্রেকাপ হয়েছে। তাই একটু আদটু ধোঁয়া উড়াই। আপনি প্রশ্নটা সুমনকে জিজ্ঞেস করতে পারেন। ও ভালো উত্তর দিতে পারবে। সুমন বেচারা অসহায় দৃষ্টিতে দেখল আমায়। আমি বললাম,
-আপনারা তাহলে কথা বলুন। আমি আশেপাশেই আছি। সুমন ফোন দিস৷ কেমন? সুমন পারলে আমায় চিবিয়ে খায়। এমন একটা ভাব। ভাবি বললেন,

-সাদিক ভাই দাঁড়ান। পরিচয় করিয়ে দেই৷ এর নাম মিহিন। আমার বন্ধুবি৷ আপনারা দুজন এক সাথে থাকলেই ভালো হবে৷ খুঁজতে হবে না। আমি মৃদু হেসে বললাম,
-হ্যালো,আমি সাদিক রহমান। মিহিন মেয়েটা হাসল। অসম্ভব সুন্দর হাসি। বলল,
-আমি মিহিন। মিহিন আহমেদ। আমি আর মিহিন হাঁটতে থাকলাম। কেউ কোনো কথা বলছি না৷ কিছু পথ যেতেই মিহিন বলে উঠল,
-রিসেন্ট ব্রেকাপ? আমি খানিকটা চমকালাম। হতভম্বও হতে হলো। সামলে নিয়ে বললাম,
-জ্বী না। দু’বছর হলো৷
-দু’বছর?
-অবাক হলেন মনে হয়?
-তা তো হলামই।
-সত্যি কারের ভালোবাসা না মানে বয়স না মানে দিনক্ষণ। আপনি যদি একজন প্রেমিকা হতেন তাহলে ব্যাপারটাবুঝতে পারতেন।
-আপনার কী মনে হয়? আমার মাঝে কী প্রেমিকা প্রেমিকা ভাব আছে? দেখি, এই প্রেমিক আমাকে চিনতে পারে কী না।

আমি কিছু সময় দেখলাম মিহিনকে। অদ্ভুত একটা মেয়ে। রহস্য করতে ভারি পছন্দ করে মনে হয়। বললাম,
-আপনার দৃষ্টিতে অন্য কিছু আছে। যেমন একটা সাধারণ মেয়ে আমার দিকে তাকালে আমি বুঝতে পারি তার মনের ভেতর কী আছে কিংবা কারো দৃষ্টিতে আমি অবাক ভাব দেখি। তারা হয়তো এমন ভাবে যে ছেলেটা কী সুন্দর! হ্যান্ডসাম! এই টাইপের চিন্তা ভাবনা মনে আসে আরকি। আপনি কিন্তু নিজের প্রশংসা করছি না। ভুল বুঝবে না প্লীজ৷ মেয়েটা শব্দ করে হাসল। কী সুন্দর হাসিত শব্দ! হাসি মুখেই বলল,

-আচ্ছা বলুন। সমস্যা নেই। আমি এমন কিছু ভাবছি না৷
-আমি বলতে চাচ্ছি যে দশ জনে যে দৃষ্টিতে তাকায় আপনি মোটেও তেমন দৃষ্টিতে তাকান নি। সত্যি বলতে আপনি এখনও আমাকে ভালো করে দেখেনও নি৷ তো এমনটা কারা করে? যাদের কেউ একজন আছে। আপনার নিশ্চয়ই আছে কেউ একজন?মেয়েটা এবারেও শব্দ করে হাসল। আমি স্পষ্ট তার চেহারায় লজ্জার আভা দেখলাম। গাল লাল হলো তার। বললাম,

-কে সে?
-আছে একজন। না তাসফি আহমেদ।
-ও হো! তাই এই কারণেই আপনি আপনার বলেছেন মিহিন আহমেদ৷ রাইট?
-জ্বী।
-তা বিয়ে করে ফেলেছেন?
-নাহ। তবে করবো। পাজিটা এত তাড়াতাড়ি বিয়ে করতে চায় না। বলে নাকি বিয়ে করলেই আমি তার জীবনতেজপাতা করে দিব৷কথাটা বলে এবার দুজনেই হেসে উঠলাম। আমি হাসতে হাসতে বললাম,
-ভাই কিন্তু ভুল বলেনি। তা কী করেন উনি?
-জব করে। আর একটু আদটু লেখালিখিও।
-লিখালিখি? আচ্ছা ওই বদ লেখকটা? তাসফি আহমেদ! যে তার প্রায় গল্পেই আমার নাম ব্যবহার করে?
মিহিন হেসে বলল,

-হ্যাঁ। ওই বদ লেখকটাই।
-গেল গল্পে লিখল আমার জন্যে নাকি তার সংসার ভেঙ্গে যেতে যেতে যায় নি। আমি নাকি তার স্ত্রীর হাত ধরেছি। এ কারণে সে সংসার ত্যাগ করল। কী না কী লিখে এসব। মানুষ পড়ে?
-মানুষ না পড়লেও আমি পড়ি। কারণ ওর গল্পে নায়িকা আমিই হই। সে যাই হোক? আপনাদের ব্রেকাপ হলো কেন?
-তেমন কোনো কারণ নয়৷ ও মেডিকেলে চান্স পায়। এ কারণেই হয়তো!
-এটা কোনো কারণ হলো? মেডিকেলের মেয়েরা প্রেম করে না?
-কী জানি!

এই বলে আমি মাথা তুলে তাকালাম। সামনের দিকে চোখ যেতেই দেখলাম নীরা দাঁড়িয়ে আছে৷ আমার দিকে কাঁদো কাঁদো চেহারায় তাকিয়ে আছে৷ মিহিন দাঁড়িয়ে পড়ল। মৃদু স্বরে বলল,

-এই পিচ্চি মেয়ে কে? এভাবে তাকিয়ে আছে কেন? আমি অন্যদিকে তাকিয়ে বললাম,
-এ হচ্ছে নীরা। আমার সাবেক। এই বলে মেকি হাসলাম। মিহিনও হাসল। বলল,
-আমি ভাবলাম ও আরো বড় হবে।
-আমার ছোট ও। নিজেই প্রপোজ করেছে। প্রথমে এত ভালোবাসল যা বলে বুঝানো যাবে না৷ তারপর…। তবে কথাবার্তা সব বড়দের মতো বলে।
-মেয়েটা হয়তো এখনও আপনাকে ভালোবাসে। চোখে দেখেছেন! কী গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে! আমি কিছু বললাম না। চুপ করে থাকলাম। মিহিন আবার বলল,
-ওর কাছে যাচ্ছেন না কেন?
-কী প্রয়োজন? দুবছর কষ্ট দিয়েছে ও আমাকে৷ আমি এত সহজে মেনে যাব?
-কী জানি! মেয়েটাও হয়তো সেই একই কষ্টে ভুক্তভোগী।

একটা জিনিস কী জানেন! ইগোর কারণে অনেক প্রেমের বিনাশ ঘটে। অনেকে সুইসাইডও করে। অথচ একবার হ্যাঁ বলে দিলেই দুটো প্রাণই বেঁচে যেত। আমি কিছু বললাম না। চুপ করে থাকলাম। সামনের দিকে তাকাতেই দেখলাম ইশা আর নীরা দুজনেই তাকিয়ে আছে আমার দিকে। আমি মাথা নিচু করে নিলাম তখন। আমি ছাদের এক কোণায় দাঁড়িয়ে আছি। স্টেজের দিকে তাকিয়ে আছি৷ সবাই সুমনকে হলুদ লাগাচ্ছে। খুব ব্যস্ত সবাই। শোরগোল ভালো লাগছিল না। তাই একেবারে কোণায় চলে এলাম। পকেট থেকে সিগারেটে বের করতেই দেখলাম নীরা আমার দিকে এগিয়ে আসছে। বেশ লাগছে ওকে। হলুদ শাড়ি পরেছে। খোঁপায় ফুল দেয়া। চোখে গাঢ় কাজল। আমার বুকের ভেতরটা কেমন জানি করে উঠল৷ আমি অন্যদিকে তাকালাম। নীরা একদম আমার কাছে চলে এল। রেলিং ঘেঁষে দাঁড়াল। আমি সিগারেট জ্বালানোয় ব্যস্ত ছিলাম। নীরা বলল,

-মেয়েটা কে ছিল? আমি সিগারেটে টান দিয়ে বললাম,
-কোন মেয়ে? নীরা কিছু বলতে যাবে ঠিক তার আগেই ও কেশে উঠল। আমি ধোঁয়া ছাড়াতে সেটা হয়তো ওর নাকে লাগে। সহ্য করতে পারে না। ও একাধারে কাশতে থাকল। আমি সিগারেট ফেলে দৌড়ে পানি নিয়ে এলাম। ও পুরোটা পানি এক ঢোকে খেয়ে ফেলল। বললাম,

-এখানে কেন এলে? যেটা সহ্য করতে পারো না সেটা সইতে কেন আসো।
-তাহলে আমি কী করতাম। মারা যেতাম? মরে গেলে তো সব ঠিক হয়ে যাবে। আর কিছু সহ্য করতে হবে না৷ সাদিক, তুমি জানো আমি তোমার পাশে কোনো মেয়েকে সহ্য করতে পারি না৷ তাহলে কেন তুমি বারবার এমন করো?

-নীরা, তুমি কী বেশি বলে ফেলছো না?
-হ্যাঁ, আমিই বেশি বলি। সব দোষ তো আমারই।

এই বলে ও কান্না করতে থাকল৷ তারপর হুট করেই দৌড়ে চলে গেল। হঠাৎই আমার অদ্ভুত একটা অনুভূতি হতে থাকল। খানিকটা ভয়ও হলো। সুইসাইড করে ফেলে যদি? আমার বুকের বাঁ পাশটা ধরে এল যেন। চোখটা ভিজে এল। এমন সময় ইশা আমার পাশে এসে দাঁড়াল। বলল,

-ভাইয়া! আপনি খুবই লাকি৷ নীরার মতো একটা মেয়ে আপনাকে ভালোবেসেছে। আমি কিছু বললাম না। কেবল চুপ করে থাকলাম৷ ইশা আবার বলল,

-কাকতালীয় ভাবে নীরা আমার রুমমেট হয়। তা না হলে বুঝতেও পারতাম না কেউ একটা মানুষকে এতো ভালোবাসতে পারে। আমি বললাম,
-ইশা, তুমি কিছুই জানো না৷ নীরা…
-আমি সব জানি ভাইয়া।

আপনাদের যখন ব্রেকাপ হয় তখন আমি ওর সামনেই ছিলাম। ব্রেকাপ করে ও ঠিক করেনি। আমি ওকে অনেক বুঝিয়েছি। কত করে বলেছি। জানি না ও কেন এমন করেছে। ভাইয়া, বয়সটা তখন এমন ছিল যে ভালো মন্দটাও ঠিক মতো বুঝত না। আপনার সাথে ব্রেকাপ হওয়ার ঠিক এক সপ্তাহ পরে দেখলাম ও বিছানায় পড়ে কান্না করছে। আমি কাছে যেতেই আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। কান্না করতে করতে বলল,

-ইশু, আমি ওকে খুব মিস করছি রে! আমি বললাম,
-তাহলে ব্রেকাপ করলি কেন?
-আমার স্বপ্ন ছিল মেডিকেল। প্রতিজ্ঞা করেছিলাম ভর্তি হওয়ার পর মনযোগ দিয়ে পড়ব। কিন্তু ওর ফোন করা, দেখা করা এসবের কারণে পড়ায় মন বসছিল না। তাই রেগে গিয়ে ব্রেকাপ করি। কিন্তু এখন দেখছি আমার কষ্ট হচ্ছে। আমি ওকে প্রচণ্ড মিস করছি রে।

-হয়েছে হয়েছে। আর কান্না করতে হবে৷ ভাইয়াকে ফোন দেন। দেখবি উনি খুব খুশি হবেন। ইশা থামল। আমার দিকে সরাসরি তাকাল এবার। বলল,

-আপনাকে ফোনে পাওয়া যায়নি৷ নাম্বার বন্ধ। ফোনের পরে ফোন দেওয়া হয়। আপনাকে পাওয়া যায় না। দুজনে মিলে আপনাদের বাসায় যাই। গিয়ে দেখি আপনারা সেখান থেকে স্থানান্তরিত হয়েছেন। নীরা প্রায় উন্মাদের মতো হয়ে যায়। অসুস্থ হয়ে পড়ে। খাওয়া দাওয়া অনেকাংশেই ছেড়ে দিয়েছিল। আমি কত করে বুঝাই ওকে। ও বুঝতে চায় না৷ ভাইয়া, একেক রাতে নীরার কান্নার শব্দ শুনে আমি নিজেও কান্না করে দিতাম। বিশ্বাস করবেন না কী পরিমাণ কষ্ট নিয়ে মেয়েটা বেঁচে ছিল। আপনার ঠিকানা কারো কাছেই ছিল না। কিন্তু যখন ভাইয়া বলল ও আপনাকে দাওয়াত দিয়েছে, আপনি আসবেন, আমার মনে হয় আমার জীবনে প্রথম এত খুশি হয়েছি। আমি সাথে সাথে নীরাকে জানাই। সেদিন বিকেলেই ও আমাদের বাসায় চলে আসে। বিশ্বাস করেন ভাইয়া কী সব পাগলামো করছিল ও।

আপনি যখন পাশের বাসার মেয়েটার সাথে কথা বলছিলেন না তখন ও কেবল দূর থেকে তাকিয়ে ছিল। কোনো কথা বলতে পারছিল না। সেদিন পুরো বিকেলে কেঁদেছে ও। আর কাল পার্কে ওই মেয়ের সাথে দেখে তো খাওয়া দাওয়াই ছেড়ে দিয়েছিল। রাতে কিছুই খায়নি। সকালে আমি জোর করে পাউরুটি দু’পিস খাইয়েছি। এছাড়া এখন পর্যন্ত কিছুই খায়নি। মনের জোরে মেয়েটা বেঁচে আছে এখনও। তা না হলে কবেই ইশা চলে গেল। আমি দাঁড়িয়ে থাকলাম কেবল। আমার চোখে বিন্দু বিন্দু জল জমতে থাকল। বুকের ভেতরে কেমন জানি করছে। কী অদ্ভুত চিনচিনে এক অনুভূতি! আমার এখন কী করা উচিৎ? ওর কাছে চলে যাব? সিগারেট ধারব কি ধরাব না ভাবছি। এমন সময় ইশা দৌড়ে এল। আমার সামনে এসেই হাঁপাতে থাকল। বলল,

-ভাইয়া নীরা নেই। বাসার কোথাও ওকে খুঁজে পাচ্ছি না৷

আমার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। অদ্ভুত এক অস্থিরতা অনুভব করলাম আমি। আমি দৌড়ে গেলাম নিচে৷ পুরো বাসা খুঁজলাম। বাগানের দিকে খুঁজতে গেলাম। পেলাম না। গেইটের কাছে যেতেই দেখলাম দারোয়ান চাচা ভেতরে ঢুকছেন। আমি উনাকে আমার ওয়ালপেপারে থাকা নীরার ছবিটা দেখালাম। বললাম,

-চাচা, ওকে দেখেছেন? চাচা কিছু সময় ছবির দিকে চেয়ে থাকলেন। বললেন,

-আপামনিরে দেখলাম রেল ইস্টিশনের দিকে যাইতে। আমি জিগাইলাম কই যান। হেয় কিছুই কইল না।
আমি আর অপেক্ষা করলাম না। দৌড়ে গেলাম সেদিকে। প্রাণপণে দৌড়াতে থাকলাম। আমার মনে হয়না আমি কখনও এত জোরে দৌড়েছি। স্টেশনের কাছে যেতেই দেখলাম অনেকটা ফাঁকা হয়ে গিয়েছে। রাত তখন সাড়ে বারোটা বাজে। আমি নীরাকে এদিক সেদিক খুঁজতে থাকলাম। ঠিক তখনই চোখ গেল একটা বেঞ্চির দিকে। আমার সকল অস্থিরতা যেন চট করেই কমে গেল। স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম। একটা হলুদ পরী সেখানে বসে আছে। কান্না করছে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না করছে। চোখের কাজল লেপ্টে আছে। নীরাকে অদ্ভুত সুন্দর দেখাচ্ছিল। আমার অনুভূতিরা যেন শিরশির করে উঠল। তারাও যেন বলছে আর নয় লুকোচুরি। অনেক হয়েছে। এবার থামো। সব কিছুরই সমাপ্তি আছে। কিন্তু ভালোবাসার সমাপ্তি নেই৷ চাইলেও শেষ করা যায় না। আমি বললাম,

-নীরা? নীরা চট করেই আমার দিকে তাকাল। অবিশ্বাস্য চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থাকল। যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না। চোখ জোড়া যেন পুনরায় ছলছলিয়ে উঠল। বললাম,

-এবারও একা ফেলে চলে যাবে? বাঁঁচব কীভাবে? তুমি জানো? তোমার অবর্তমান কতো কষ্ট দেয় আমায়৷
নীরা এবার কান্না করে দিল। নীরা দৌড়ে এল আমার কাছে। বলল,
-আমারও। বিশ্বাস করবে না দম বন্ধ হয়ে আসে আমার।
-আমি পাগলের মতো হয়ে যাই। কী ভীষণ বেদনায় আচ্ছন্ন হয়ে থাকে হৃদয়। নীরা,তুমি কি ফিরবে আবার? আমরা নতুন করে প্রেমে পড়ব। ফিরবে?

নীরা কান্না করে দিল। শব্দ করে কান্না করল। চট করেই আমায় জড়িয়ে ধরল৷ গলা জড়িয়ে ধরে কান্না করতে থাকল৷ কী কান্না! আমি বাকি থাকলাম না। কান্না করে দিলাম। বুকের ভেতর হঠাৎই তীব্র আনন্দ অনুভব করলাম আমি৷ বড় ভালো লাগছিল আমার। যেন পৃথিবীর সমস্ত সুখ, সমস্ত ভালোবাসা আমার বুকের উপর লেপ্টে আছে। আমার বুকের সাথে মিশে আছে। আমি নীরাকে আরেকটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম। নীরা কান্নায় ব্যস্ত থাকল। আমাদের এমন মিলনে আকাশটাও যেন কেঁদে উঠল৷ ভারি বর্ষণ শুরু হলো হঠাৎই। নীরা ভেজা গলায় বলল,

-আমরা ভিজব।
-আচ্ছা।
-জড়িয়ে ধরে রাখবে। ছাড়বে না৷
-ছাড়ব না।
-চুমু খাবে? আমি ভেজা চোখে হাসলাম। বললাম,
-এখন ভিজি? ভেজা ঠোটে চুমু খাব পরে। কেমন?

নীরা মুখ লুকালো বুকে৷ দুজনেই এক হয়ে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকে ভিজতে থাকলাম। বৃষ্টির প্রতিটি ফোটা আজ ভিজিয়ে দিক আমাদের। মনের সকল মান-অভিমান, দুঃখ-কষ্ট ধুয়ে নিয়ে যাক নিজের করে। আমরা নতুন করে শুরু করব আবার৷ নতুন করে প্রেমে পড়ব দুজনের। প্রেম ভালোবাসায় কোনো সমাপ্তি নেই৷ কোনো সমাপ্তি থাকে না৷

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত