প্রকৃতির প্রতিশোধ

প্রকৃতির প্রতিশোধ

আমাদের জিবনটা অনেকটা প্রথম দিকে রাস্তায় পরে থাকা প্লাস্টিকের বোতলের মতো। এর ওর লাথিগুড়ি খেয়ে একসময় বোতল কুড়নো একটা ছেলে যখন সেটা কুড়িয়ে নেয় তখনি আমাদের জায়গা হয় নতুনভাবে নিজেকে তৈরী করার জন্য। অথচ এই জিবনে নিজের নিশ্চয়তা খোঁজা তোমার কাছে বোকামি মনে হচ্ছে না?

সেদিন অফিস থেকে ট্যুরে গিয়েছিলাম গাজীপুরের এক রিসোর্টে। শহিদ ভাই তার স্ত্রীকে নিয়ে এসেছেন তাই আমাকে সঙ্গ দেওয়ার মানুষটাকে এখানে পাচ্ছিনা বললেই চলে। রাতের বেলা লেক পাড়ে সবাই বসে আছি। শহিদ ভাইয়ের গলার সুর অনেক ভালো। উনার স্ত্রী উনার ঘাড়ে হাত দিয়ে আছে আর উনি গীটারের তারে হাত বুলিয়ে গান ধরেছেন “প্রিয়তোমেষু”। এই গানের আসরগুলোতে একটা জিনিস খুব ভাল ভাবে লক্ষ্য করা যায়। নিঝুম সন্ধ্যায় এই শান্ত পরিবেশে সবার মনে প্রতিধ্বনিত হয় গানের কথাগুলো আবার কেউ বা শুনতেই পায় না এসব কথা। তবে জিবনের মানে খুঁজতে হলে পারিপার্শ্বিক প্রতিটা জিনিসই ভাবতে হবে, জানতে হবে। না জানাটা একটা অযোগ্যতা অবশ্যই তবে জেনেও না করাটা একটা নিজস্ব ব্যাপার।

সাদিয়া, আমার মনে খনিকের জন্য এসেও অনেক বড় একটা জায়গা দখল করে নিয়েছিল মেয়েটা। সে হয়তো আমার সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছিল এটা ভেবে যে ভার্সিটিতে আসলে প্রেম জিনিসটা মুখ্য। তাই আশেপাশে ছাগল খুঁজতে গিয়ে আমায় পেয়েছিল। ওর বন্ধুরাও জানতো যে ওর আমার সাথে সম্পর্ক আছে। তবে ওদের আড্ডা দেওয়া, ঘুরতে যাওয়া, কথা বলার ধরন, রাতের আকাশে কেউ চা আর কেউ সিগারেটের ধোঁয়া ছড়িয়ে নিজের অনুভুতি গুলো ব্যক্ত করা দেখে মনে হয়েছিল, আমি সাদিয়ার প্রেমিক নয়, বন্ধু হওয়া উচিৎ ছিল। অন্ততঃ ওর বন্ধুদের মতো সময় পেতাম ওর সাথে কাটানোর।

একদিন ওকে আমি জিজ্ঞেস করি যে সাদিয়া একটু শুনবে? ও সেসময় ওর বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছিলো। আমার প্রশ্ন শুনে ও বললো, “হ্যা, বলো কি বলবে”? আমি বললাম, একটু এদিকে আসবে কিছু কথা ছিলো? ও ওর বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বললো, “আসলে এখন পারছি না। একটু টিমওয়ার্ক করছি। তুমি নাহয় বিকেলে ফোনে বলো আমায় যা বলতে চাও”। আমি ঠিক আছে বলে চলে আসি। আসতে আসতে পেছনে ওর বন্ধুদের তাচ্ছিল্যের হাসির শব্দ শোনাটা আমার কাছে যেনো পুরো খাবারের মাঝে এক বোতল বিষ মনে হয়েছিল। তবুও ব্যাপারটা হজম করেছিলাম। পরে অবশ্য সাদিয়া নিজেই ফোন দিয়ে জানতে চেয়েছিলো। আমি কিছু না বলে কাটিয়ে দিয়েছিলাম।

আসলে তার সাথে থাকার শেষকদিন আমি খুব একটা ভালো অবস্থায় ছিলাম না। নিজের একটা ইন্টার্নশিপের জন্য হন্য হয়ে এদিক ওদিক দৌড়ে বেড়াচ্ছি, তখন মানিব্যাগেও দুর অবস্থা চলছে আর সেসময় সাদিয়া ফোন দিয়ে বললো, “সেন্ট মার্টিন যাবা? বন্ধুরা মিলে যাচ্ছি। যদি সমস্যা না হয় তবে আমাদের সাথে যেতে পারো”। আমি কিছুক্ষন কোনো কথাই বললাম না। শুধু বললাম, তোমরা ঘুরে আসো। এসময়ে একটু ব্যস্ত আছি আর ভার্সিটিতে কাজও আছে। তাই পরেরবার নাহয় যাওয়া যাবে। ও তখন আচ্ছা বলে ফোনটা কেঁটে দিলো। শুনেছিলাম আপন মানুষরা নাকি মুখের কথার থেকে মনের কথা ভালো বুঝতে পারে। প্রশ্নটা সেদিন নিজেকে করেছিলাম, সে আমার আপন মানুষ তো?

ও সেন্ট মার্টিন থেকে এসেই ফোন দিয়েছিলো আমায়। পরেরদিন দেখা করতে বললে আমি না করে দেই। একটু জেদ থেকেই এসব করা বলা যায়। তিনদিনের দিন ও যখন খুব জোড় করলো তখন আর না করতে পারি নি। দুজনে পাশাপাশি পার্কে বসে গল্প করছি। প্রথম মনে হচ্ছে আমরা চুটিয়ে প্রেম করছি। অন্যদিন কোন একটা রেষ্টুরেন্টে বসে নিত্যদিনে কি করলাম না করলাম এসব বলেই সময় চলে যেতো। কিন্তু আজ একটু অন্যরকম। সে চুপচাপ তবে আমি এই সেই জিজ্ঞেস করে যাচ্ছি। উত্তর যখন পাচ্ছি না তখন আমিও চুপ হয়ে গেলাম। ওকে ভালবেসে ফেলেছি অনেকটা। ওর থেকে অবহেলাটা মানতে পারি না আমি।

তাই তার থেকে হয় একবারে সরে আসবো নয়তো তাকে নিজের করে নেবো। জানি ভালবাসায় কোন শর্ত থাকে না তবে এবার কিছু শর্ত মানা হোক। এতে এই সম্পর্কটারই ভালো। ভেবেছিলাম, ও হয়তো আজ একটু সহানুভুতি নিয়ে কথা বলবে। তবে আমার ভাবনা যে এতোটা খারাপ, জানতাম না। হুট করেই ও বললো, “সাতদিন হলো কোন ফোন নেই, খোঁজ খবর নেই। নতুন কাউকে পেয়েছো বুঝি। অথচ তোমার মতো ছেলেরা সবি পারে”। আমি হাসলাম কথাটা শুনে। বললাম, নাহ, নতুন আর কে আসবে বলো? তুমি নিজেই তো অনেক কিছু সহ্য করে আছো। অন্যরা কি আমাকে সহ্য করতে পারবে? তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে তাকিয়ে ও বললো, “তোমার লজ্জা লাগে না এসব বলতে? নিজেকে একটু সাজানো যায় না? একটু তো এই দুনিয়ার সাথে তাল মেলাতে পারো”? এসব শুনে আমি কিছু বললাম না।

ও কিছুক্ষন চুপ থেকে বললো, “আমার মনে হয় এই টানাপোড়োনের সম্পর্কটা আর না এগোলেই ভালো হয়। তোমাকে নিয়ে আর পারছি না আমি”। অনেকটা আঘাত লাগলো মনে। একটু ক্ষতো তো হয়েছেই এটা নিশ্চিত। তার দিকে পিঠ করে নিজের মুখে হাত রেখে সংযত করছি। ভাবলাম সম্পর্ক কি আমার একার দারা টানা সম্ভব? সাদিয়ার দিকে হাসিমুখে তাকিয়ে শুধু এটুকু বললাম, আমি অবাক হয়েছি এটা শুনে যে তুমিই নাকি আমাকে মানতে পারছো না। যাই হোক, ভালো থেকো। বলেই শুকনো একটা হাসি দিয়ে চলে আসি। আর কিছুক্ষণ থাকলে হয়তো আমার চোখের কোনের পানিটা নিয়েও ও কটাক্ষ করতো।

নিজের জিবনের পুরনো কথায় চলে গেছিলাম সেদিন শহিদ ভাইর গান শুনে। গানটা লালন গীতি ছিল,  “হায়রে মানুষ রঙ্গিন ফানুষ, দম ফুরোলেই ঠুস। তবু তো ভাই কারোরি নাই একটুখানি হুস”। মানুষ এই ছোট্ট জিবনে কতই না রঙ্গিন স্বপ্ন সাজায়। তবে হিসেব থাকে ওসবেরই যেই স্বপ্নগুলো পুরন হয়। কত স্বপ্ন যে বিলীন হয় তার হিসেব শুধু ওই একজনই রাখে। আমিও চলে গিয়েছিলাম আমার পুরনো অধ্যায়ে কাটানো কিছু রঙ্গিন বেদনার করিডোরে। আমি বাস্তবে ফিরেছিলাম, যখন শহিদ ভাই গান শেষ করলে নিশি ম্যাডাম গান ধরতে বললো আমাকে। আমি অনেকটা অবাক হয়েছি।

এই মেয়েটা কেনো যেনো আমাকেই দেখতে পায়। প্রায় সময়ই মেয়েটা আমার সাথে কথা বলতে আসে। যদিও মেয়েটা অফিসে আমার সিনিয়র পোস্টে তবে বয়সে ও অনেক ছোটই হবে। আমি তো অনেক চড়াই-উতরাই পার করে আজ এখানে আর এই মেয়ে এক বছরেই উপরে উঠে গেছে। উনি আমাকে গান গাইতে বলে মুচকি মুচকি হাসছে। এদিকে চুপ করে আছি বলে শহিদ ভাই বললো, কই গান ধরো। কি গান গাচ্ছো বলতো? আমি হেসে অনুপমের ওই গানটাই কয়েক লাইন গেয়ে শোনালাম। “আমাকে আমার মতো থাকতে দাও, আমি নিজেকে নিজের মতো গুছিয়ে নিয়েছি”। নিশি ম্যাডাম একদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলো। গান শেষে শহিদ ভাই বলেছিলো, “তুমি এতো ভাল গান গাও, জানতাম না তো”। আমি মুচকি হেসে বললাম, আপনার সাথে মিশেই হয়ে গেছি কিছুটা।

গতকাল নিশি ম্যাডাম দুপুরে অফিস ক্যান্টিনে ডেকে নিয়ে জোর করে লাঞ্চ করালো। খেতে খেতেই উনি বললেন, “আপনাকে একটা কথা বলি”? আমি বললাম, এতে অনুমতির কি আছে, বলে ফেলুন। উনি খানিকটা রেগে বললো, “এখন আমরা লাঞ্চ করছি, অফিসে নেই। আর বয়সে আপনার কতো ছোট সেটা জানেন আপনি? অফিসে বাদ দিয়ে অন্যসময় তুমি করেই বলবেন, কি, মনে থাকবে”? মেয়েটা অধিকার খাটিয়ে কথা বলছে দেখে ভলো লাগলো। তবে এই অধিকার খাটানোর জন্য যতোটা ভাল সম্পর্ক থাকা দরকার ততোটা ওর সাথে নেই আমার। আমি একটু হেসে বললাম, আচ্ছা বলো কি বলবে? ও খানিকটা হেসে নিয়ে বললো, “দেখুন সোজাসাপ্টা বলছি। কোন কথা বারাতে চাই না। অনেকদিন আগে থেকেই আপনাকে না জেনেই পছন্দ করি। বলছি না যে ভালোবাসি। তবে আপনাকে খুব করে ভালোবাসতে ইচ্ছে হয়।

কেনো জানি মনে হয় আপনার ভেতরে অনেক হতাশা আর কষ্ট লুকিয়ে আছে। আমি সেই কষ্টগুলোর সঙ্গি হতে চাই। আপনার একাকিত্বের রাজত্বে হামলা করে আপনাকে পরাধীন করতে চাই। আপনাকে আমার রাজ্যের রাজা বানাতে চাই যেই রাজ্যে কোন প্রজা নেই তবে রাজা রানী আছে”। একটানে এতোসব কথা শেষ করে দিয়ে ও মাথা নিচু করে রইলো। আমার তখন শুধুই সাদিয়ার দেওয়া অবহেলার কথা মনে পড়ছে। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলেছি আমি। ওসব দিনের কথা মনে হলেই আমার ভালবাসা উসাইন বোল্টের মতো দৌড়ে পালায়। নতুন ভাবে এসব শুরু করার কোন ইচ্ছেটাই নেই। সমস্যা হল, মেয়েটাকে এসব কি করে বোঝাই সেটাই কথা। একটু সময় নিয়ে বললাম, তোমাকে দেওয়ার মতো কিছুই নেই আমার কাছে। আমার এই জিবনে কোন কিছুরই নিশ্চয়তা নেই। কোন কিছু স্থায়ী নয় আমার জিবনে।

তুমি কেনো পছন্দ করো আমাকে তা জানি না তবে এটুকু বলতে পারি তুমি আমার থেকে ভালো কাউকে পাওয়ার যোগ্যতা রাখো। আমি এসব বলেই খাওয়া বন্ধ করে মাথা নিচে করে ভাবছি কিছু একটা। কিন্তু সবকিছুই এলোমেলো। হটাৎ ও বললো, “খাচ্ছেন না কেনো? আমি আমার যোগ্যতা দিয়ে কাউকে বিচার করি না বুঝলেন। আপনাকে আমি অনেক ভাল ভাবেই দেখেছি এই অফিসেই। অনেক বুঝেছি আমি নিজের মাঝেই। তাই আজ ব্যাপারটা বললাম। আর সত্যি বলতে কেনো যেনো আপনার মাঝে আমি আমার নিশ্চয়তা দেখতে পাই৷ মনে হয় আপনি আমাকে ভালো রাখতে পারবেন, আমাকে বুঝবেন”।

আমাদের জিবনটা অনেকটা প্রথম দিকে রাস্তায় পরে থাকা প্লাস্টিকের বোতলের মতো। এর ওর লাথিগুড়ি খেয়ে একসময় বোতল কুড়নো একটা ছেলে যখন সেটা কুড়িয়ে নেয় তখনি আমাদের জায়গা হয় নতুনভাবে নিজেকে তৈরী করার জন্য। অথচ এই জিবনে নিজের নিশ্চয়তা খোঁজা তোমার কাছে বোকামি মনে হচ্ছে না? নিশি কিছুটা সময় তাকিয়ে থাকলো আমার দিকে। একটু হেসে বললো, “আমার না অনেক লজ্জা পাচ্ছে জানেন। তবে আপনার মনে আমার ভাবনাটা নিয়ে আসার জন্য এটুকু অনেক দরকার ছিলো।

এতোদিন তো আমাকে নিয়ে ভাবনার কোন ছিটেফোঁটাও দেখিনি। আপনি সময় নিন। আপনারও তো একটা পছন্দের বেপার আছে। যাই হোক, আপনি খাওয়া শেষ করে তারপর যাবেন, আমি উঠি”। বলেই মুখে হাত দিয়ে অনেক দোড়ে চলে গেলো। আমি ভুনা এক পিস মাংস মুখে দিয়ে ভাবছি এটা কি লজ্জা ছিলো নাকি কান্না লুকোনোর একটা পথ। আচ্ছা সে কি কাঁদতে পারবে আমার জন্য? পরোক্ষনে মনে হলো, মেয়েটা তো অসম্ভব বুদ্ধিমান। আমি এখনই তাকে নিয়ে ভাবতে শুরু করেছি।

ক্যান্টিন থেকে অফিসের ডেস্কে বসতেই পিয়ন এসে বললো, স্যার, একজন ম্যাডাম এসেছিলেন আপনার সাথে দেখা করতে। আপনি বাইরে ছিলেন তাই কিছুক্ষন বসে চলে গিয়েছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, উনার পরিচয় দিয়েছে কি? পিয়ন বললো, উনার পরিচয় জানা হয় নি স্যার। আমি পিয়নকে যেতে বলে ভাবতে লাগলাম কে আসতে পারে? সেরকম কেউই তো আমার পরিচিত নেই। এসব ভাবতেই ডেস্কে কম্পিউটার কি-বোর্ডে চোখ পরতেই দেখলাম, একটা কাগজ চাপা দেওয়া আছে।

কাগজটা হাতে নিতেই দেখলাম সেখানে লিখা, আমি জানি আপনার কোন অতীত আছে। তাই হয়তো আপনি এসব কিছু চিন্তাই করেন না৷ আপনি কি জানেন, এই সুন্দর জিবনে আমারও একটা কষ্টের অতীত আছে। আমার খুব ইচ্ছে জানেন, কোন এক নদীর পাড়ে, বিকেলে আপনার হাতে হাত মিলিয়ে আপনার কষ্টগুলোকে মুছে দিয়ে নিজের কষ্টগুলোকেও মুছে নেবো। নিজের মনের প্রশান্তি গুলো দুজনি দুজনার মাঝে খুঁজে নিবো। অনেক কঠিন মুহুর্তগুলোকে দুজনি একসাথে হাত মিলিয়ে সামনা করবো। আমি আপনাকে এতোটাই কাছের মানুষ ভাবতে চাই যে জিবনের সব দুর্যোগের মুহুর্তগুলোতে আমাদের ভালবাসার বন্ধনটা হবে আরও দৃঢ়। দেবেন কি এই সুযোগগুলো? চলুন না, একটাবার নিজেদের নতুন রুপে জিবন শুরু করি আমরা…

চিরকুট টা কার এটা আর বুঝতে বাকি রইলো না। কেনো জানি মনে হলো এই মেয়েটাকে নিজের সব কষ্টগুলো এখনি বলা দরকার আমার। বললে হয়তো অনেকটা প্রশান্তি লাগবে। হয়তো মনের মাঝের অদৃশ্য দেওয়ালটা ভেঙ্গে একটা সুশ্রী ফুলেল বাগান করা যাবে এবার। এসব ভাবতে ডেস্ক থেকে বেরিয়ে নিশিকে খুঁজতেই শুনলাম, ও নাকি বাসায় চলে গেছে। আমিও তাই ডেস্কে এসে কাজে মন দিলাম। ভাবলাম কাল ওকে নিয়ে কোথাও বেরিয়ে আসতে হবে।
এমনিভাবেই দুদিন চলে গেলো। কিন্তু এই দুদিন অফিসে নিশি আসলো না। কেউ কিছু বলতেও পারলো না তার বেপারে। আমার কাছে তার নাম্বার নেই রিসিপশন থেকে ফোন নাম্বারটা নিয়ে ফোনে সেভ করলাম। অনেকবার ফোন দিয়ে আবার সঙ্গেই কেটে দিলাম। ভাবছি ফোন দেওয়াটা উচিৎ হবে কি না? কি ভেবে যেনো ফোনটা দিয়েই দিলাম। ওপাশ থেকে নিশির গলার আওয়াজ শুনতে পেলে আমি কি বলবো সব ভুলে গেলাম। একটু চুপ থেকে নিশি বললো, “আমাকে মিস করেছেন কি”?

মুখ থেকে আপনা আপনি বের হয়ে এলো, খুব দেখতে ইচ্ছে করছে তোমায় জানো? কেনো আসলে না এ দুদিন? ওপাশ থেকে নিশি বললো, “আজ অফিসের জন্য বের হয়েও যেতে পারিনি। কেনো জানি আপনার সামনে যেতে লজ্জা পায় এখন আমার। আর তাছাড়া এই দুদিন আমাকে নিয়ে আপনি ভাববেন, আমি জানতাম। বলতে পারেন আপনাকে বোঝালাম আপনি কি চান”? আমি বললাম, তো বলো দেখি, আমি কি চাই? ওপাশ থেকে এবার কিছু শোনা গেলো না। আমি বললাম, খুব ইচ্ছে করছে তোমার সাথে দেখা করার। আসবে কি? ওপাশ থেকে ওর কাঁপা কাঁপা গলায় শুনলাম, কাল তো আসছিই। একটু নাহয় ধৈর্য ধরলেন। আমিও মুচকি হেসে ফোনটা রেখে দিলাম।

পরেরদিন অফিসে এসেই দেখলাম নিশি এসেছে। আমাকে দেখে মাথা নিচু করে নিয়ে হাসছে ও। আমিও চুপচাপ ডেস্কে এসে বসলাম। একটু পরে আমি নিজেই উঠে নিশির সামনে গিয়ে বললাম, আজ দুপুরে একটু সময় হবে ম্যাডাম? আপনাকে লাঞ্চ করাতাম যদি আপনার কোন সমস্যা না হয়। ও মুচকি হেসে বললো, হ্যা, সময় হবে তবে একটু নিরিবিলি কোন পরিবেশে নিয়ে যেতে হবে কিন্তু। আমি হাসিমুখে ডেস্কে এসে বসতেই পিয়ন এসে বললো, স্যার, সেদিনের ম্যাডাম আবার এসেছে আপনার সাথে দেখা করতে। আমি বললাম, তুমি উনাকে বসতে বলো, আমি আসছি। পিয়ন আবারও বললো, রিসিপশনে আরও লোকজন আছে স্যার। উনি দাড়িয়ে আছেন। আমি বললাম, তাহলে আপনি এখানেই নিয়ে আসুন। পিয়ন ফিরে গিয়ে নিয়ে আসলো উনাকে। যে আসলো তাকে দেখে আমি নিজেই দাড়িয়ে পরেছি। সাদিয়া এসেছে।

ওকে বসতে বলে পিয়ন কে বললাম, দুকাপ কফি পাঠিয়ে দিন। পিয়ন যেতেই সাদিয়া আমাকে কমল কন্ঠে বললো, কেমন আছো? মুচকি হেসে আমি বললাম, এইতো আছি, আগের থেকে ভালো। তোমার কেমন যাচ্ছে? ও মৃদ হাসলো। এর মধ্যেই নিশি আমার ডেস্কে আসলো। সাদিয়ার দিকে তাকিয়ে আমায় বললো, গতকালের কাজটা শেষ হলে আমাকে পাঠিয়ে দিন তো? আমি জানি ও সাদিয়াকে কোনভাবে দেখতে পেয়েছে তাই এখানে আসলো, নয়তো কথাটা সে টেলিফোনে বলতো পারতো। আমি জি বলতেই নিশি ধীর পায়ে চলে গেলো। সাদিয়া বললো, তোমার কি একটু সময় হবে? মানে আজকে লাঞ্চটা যদি আমার সাথে করতে? আমি হাসলাম, বললাম, চলো তবে বিলটা তুমি দিবে।

বের হয়ে নিশিকে দেখতে পেয়েই বললাম, সরি আজকে লাঞ্চটা আপনার সাথে করতে পারছি না। বলেই সাদিয়াকে নিয়ে একটা রেষ্টুরেন্টে বসলাম। খাবার অর্ডার করে বসে আছি। হঠাৎ সাদিয়া বললো, “তোমার শেষ দিনে কথা বলার সময় শুষ্ক হাসিটা আমাকে এখনো শান্তিতে ঘুমোতে দেয় না জানো? আমি জানি আমি ভুল ছিলাম তবে এর জন্য আমি ভুক্তভোগী। আমাকে কি ক্ষমা করা যায় না”? আমি হাসছি কেনো জানি। ওকে বললাম, তুমি হলে কি করতে? তুমি তো কোন ভুল করনি তবে তোমায় অনেক ভালবেসেছি তাই অবহেলা গুলো নিতে পারিনি। অনেক সময় লেগেছে তোমার ভুত মাথা থেকে নামাতে।

তবে কোন আক্ষেপ নেই জানো? তোমার ওপরে রাগও নেই। বুঝেছি এটাই যে তুমি বা আমি একে অপরের জন্য নই। নিশি করুন চোখে তাকিয়ে বললো, “তোমায় অনেক কষ্ট দিয়েছি কিন্তু বুঝতেও পারিনি। কিছুদিন আগে যখন অনেকদিনের অবহেলার পর রনিত আমায় ছেড়ে চলে গেলো তখন বুঝলাম অবহেলা কতটা কষ্ট দেয়। তোমার সাথে দেখা করে অনেক শান্তি পাচ্ছি জানো? আমাকে মন থেকে ক্ষমা করতে পারবে না মামুন? তোমার মতো আমাকে কেউ বোঝেনি জানো”। আমি আবারও হেসে বললাম, আমি তোমার ওপর কখনও রেগে থাকিনি শুধু জিবনে একটা শিক্ষা ভেবেছি৷ আমি জানতাম, তুমি একদিন এই অবহেলার স্বীকার হবে। আর সত্যি বলতে সেসময় আমরা লোক দেখানো প্রেম করেছি মাত্র। তবে আমার খুব ইচ্ছে ছিলো তোমার বন্ধু হওয়ার। অন্ততঃ তাদের মত সময় পেতাম।

একটা সময় ভালবাসতাম তো। আমার দিকে তাকিয়ে সাদিয়া বললো, “এখন আর ভালোবাসো না আমায়”? আমি খানিকটা হেসে বললাম, আমি এতোদিনে কাউকে ভালোবাসার সাহস করিনি। কিছুদিন আগে এক মেয়ে আমার মাঝে আবারও ভালবাসার বিন্দু অনুভুতি তৈরী করেছে। আমি চাই না কেউ আমার মতো কষ্ট পাক। তাই ভাবছি আমি তাকেই নিজের করে নেবো। ওর মুখটা কেমন যেনো অন্ধকার হয়ে গেলো। চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পরছে ওর। হঠাৎ ও চোখের পানিটা মুছে বললো, “তোমাকে যে ভালবাসতে ইচ্ছে করছে? আজ যদি আমি ফিরে আসতে চাই, নেবে না আমায়”? আমি আবারও হাসলাম। বললাম, এটা জিবন না সাদিয়া। জিবনে সুযোগ খুব কমই আসে। আমার জায়গায় তুমি হলেও মেনে নিতে না। আমার মনে হয় এবার আমাদের ওঠা উচিৎ। এটা বলেই আমি উঠতে চাইলে, সাদিয়া আমার হাত চেপে ধরলো। বললো, “তোমার পাশে কাউকে দেখলে মেরে ফেলবো আমি ওকে।

সত্যি করে বলতো, এটা কি অফিসের কেউ? একটু জোরেই হেসে বললাম, তুমি তো জানোই সেসময় তোমার কতটা খেয়াল রাখতাম আমি। তোমার কোন বন্ধু, হাত ধরতো তোমার, সেটাও আমি জানতাম। আর আমি নিশ্চিত তুমি এটা পারবে না। আর যদি এসব ভেবেও থাকো তবে মনে রেখো, তার সাথে সবসময় আমি আছি। ও তখন মাথা নিচু কাঁদছে। এটা দেখে দুহাত দিয়ে তার হাত চেপে ধরে বললাম, জিবনটা নতুন করে শুরু করো। আজকের দিনটার জন্য ধন্যবাদ। আমাদের বিচ্ছেদ হয় নি তবে সমোঝোতা হলো আজ। তুমি চাইলে আমি শুধুই একজন বন্ধু হিসেবে পাশে থাকবো আমি। বলেই যখন চলে আসছি তখনি সাদিয়া বললো, “ভালো থেকো মামুন”।

আজ আর অফিসে গেলাম না। কেনো যেনো খারাপ লাগছে সাদিয়ার জন্য। আবার মনে হলো নিশি মনে হয় দুপুরে লাঞ্চ করেই নি। সাদিয়াকে এসব বলতে গিয়ে আমারও কিছু খাওয়া হয় নি। আকাশটা মেঘলা আর আমি অফিসের বাইরে একটা টং দোকানে বসে আছি। অফিস ছুটির সময় হয়ে গেছে। একটু পরেই দেখলাম মুখ নিচু করে নিশি অফিস থেকে বের হলো। একটু পরে বৃষ্টি শুরু হতেই নিশি কেমন হুরমুর করে টং এর ছাউনির নিচে দাড়ালো। পেছন থেকে আমি বললাম, বৃষ্টিতে ভিজবে আমার সাথে?

ও চমকে উঠলো। আমি বললাম, তোমার হাতে হাত রেখে বৃষ্টিতে ভিজতে ইচ্ছে করছে। কেনো যেনো মনে হচ্ছে আমার ওপর অনেকটা অভিমান হয়েছে তোমার। চলো না এই বৃষ্টিতে ভিজে নিজের মনের গ্লানিগুলো মুছে ফেলি। নীলক্ষেতের বিরিয়ানি তে নিজের স্বাদ গুলো গুছিয়ে নেই। এরপর নাহয় তুমি আমি নতুন করে শুরু করবো। বলেই হাতটা বারিয়ে দিয়ে বললাম, ভিজবে কি? ও কেমন যেনো মাথাটা নিচু করে নিলো। বুঝলাম ওর মনে অনেক প্রশ্ন। তাই বললাম, জানি তোমার অনেক প্রশ্ন আছে আর আমি সেগুলোর উত্তর দিতে চাই। তাই বলছি, ভিজবে কি? মেয়োটা আমার দিকে তাকিয়ে আমার হাতটা ধরে টং থেকে বেরিয়ে এলো।

বৃষ্টিতে ভিজে দুজনি হেঁটে চলেছি আমরা। কতো মানুষই দেখছে আমাদের। হঠাৎ বজ্রপাতের শব্দে ও কেঁপে আমার হাতটা জড়িয়ে ধরলো। আমার হাসি পেলো। নিশিও মনে হয় একটু লজ্জা পাচ্ছে। শক্ত করে জড়িয়ে নিয়ে বললাম, একটু একটু করে ভালবাসতে ইচ্ছে করছে। ছেড়ে যেও না কেমন? নয়তো এবার আর মানিয়ে নিতে পারবো না। ও হাঁটা থামিয়ে গলা থেকে টাই টা খুলে বললো, “বিশ্বাস করেছেন যখন তবে এর অমর্যাদা করবো না। আর আমি আপনার বিশ্বাসেই ভালবাসা খুঁজে নেবো। শুধু বিনিময়ে একটুখানি ভালবাসিয়েন, যেই ভালবাসায় আমি খুঁজে নেবো নিজের মনে গোছানো নীল পদ্মের শুভ্রতা গুলো”। আমি ওর হাতটা ধরে সামনে এগিয়ে চললাম এক নতুন জিবনের সূচনায়।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত