লাবণ্যর বাক্স

লাবণ্যর বাক্স

–সরি লাবণ্য! সরি! আমার পক্ষে আর পসিবল না।
–মানে! হঠাৎ সরি কেন? কি হলো হঠাৎ তোমার??
— না.. মানে.. ইয়ে মানে..
-বলো??

–আমতা আমতা করে একসময় বলেই দিলো,”আসলে অতিরিক্ত আবেগে পড়ে জীবনে একটা বড় ভুল করে ফেলেছি মনে হচ্ছে।”
–সেটা কি??
–হঠাৎ সামান্য ভালো লাগা থেকেই হুটহাট প্রপোজ করে দিয়েছিলাম তোমায়…! কিন্তু.. আসলে আমি মন থেকে তোমায় চাইনা এখন..

–ওহ! তো আরো আগে বলে দেওয়া উচিত ছিলো না তোমার?
–না মানে.. আমি ধরেই নিয়েছিলাম তুমি ভালো কিছু একটায় যাবে কিন্তু.. কি যে হয়ে গেল.. আমার বন্ধুদের দিকে দেখি যখন তখন খুব হিংসে হয়! একি পজিশন আমাদের অথচ তাদের এক একেকজনের গার্লফ্রেন্ডকে দেখলে চোখ কপালে উঠে যায়। আহা! কি মর্ডান ,কি আকর্ষণীয়! স্যাটাস ও ভালো,লেখাপড়া ও সব দিক দিয়েই সেই…!

–ও। তো,প্রদীপ?? তোমার কি মনে হয়না তুমি একটু বেশিই সময় নিয়ে নিলে আমার থেকে?? এতদিন পর হঠাৎ তোমার এসব কথাবার্তা.. বিশ্বাসই হচ্ছে না,জানো!
–সরি লাবণ্য সরি! আমার পক্ষে আর পসিবল না কন্টিনিউ করা। আই এম সরি।সরি ফর দ্যাট।
–মেয়েটি কিছু বলে না। নিচের দিকে তাকিয়ে মৃদ্যু হেসে যাচ্ছে..
— লাবণ্য?? কি হলো? কিছু বলো?
— উম.. হ্যাঁ হ্যাঁ। আচ্ছা তুমি একটু দাঁড়াও।
— আচ্ছা। ৫মিনিট পর লাবণ্য ফিরে আসলো হাতে একটা বাক্স নিয়ে

– আস্তে আস্তে এগিয়ে এসে নিচের দিকে দৃষ্টিপাত করে বললো, ” আজ আমি আর চিত্তাকর্ষক, আনন্দময়ী,উচ্চশিক্ষা থেকে হালকা দূরে সরে যাওয়ায়,সুভাষিনী, সুন্দর নই বলে তোমার এমন ডিসিশন।” হাহ হা! ভালোই!!!

— না। না৷ লাবণ্য, তুমি অনেক সুন্দর, অনেক ভালো! যে তোমায় পাবে সে কপাল গুণে পাবে তোমায়,বিশ্বাস করো!
— আচ্ছা শুন, এ বাক্সটা নাও। এটা আমার দেওয়া শেষ একটা স্মৃতি হিসেবে ধরে নাও।আর মনে রাখবা, ‘এ বাক্সটি ঠিক তখনি খুলবা যখন তোমার আমার জন্য খুব কষ্ট, খুব আফসোস আর খুব দেখার ইচ্ছা এবং খুব মনে পরবে। যখন আমাকে আবার ফিরে পাওয়ার ইচ্ছা হবে..তখনি খুলবা এর আগে না।’

–আচ্ছা যদি এমন কোন পরিস্থিতিই না আসে তাহলে??
— তাহলে ভুল করেও খুলবে না। ফেলে দিও। আচ্ছা-কথা দাও,যা বললাম সব অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে??
–আচ্ছা আচ্ছা।
–এই বলে মেয়েটি চলে যায়।
–লাবণ্য তুমি আমার চেয়ে বেটার কাউকে পাবা দেইখ! শরীরের খেয়াল রাখবা,একটু খাওয়া-দাওয়া ঠিক করে করবা।(চিৎকার করে বলতেছিলো) ( নোট১ )

-মেয়েটি একবারের জন্য ও আর ফিরে তাকায় না। চলে যায়। এরপর ??

-ছেলেটি পর পর ৫টি পছন্দসই মেয়েকে প্রপোজ করলো। ৫জনই গ্রহণ করলো।প্রথম ৪জন ১,২,৩,৪মাস এবং ৫নাম্বারেরটা ৬মাস স্থায়ী হয়েছিলো।

১ম মেয়ে:- দুঃখিত! আমি জানি আমি খুব সুন্দর। কিন্তু আমার বিএফ আমাকে ইগ্নোর করায় আমি তোমাকে কব্জা করে তাকে একটু jealous ফিল করালাম জাস্ট। যাতে করে সে বুঝে যে,বিএফ তৎক্ষণাৎ যোগানো আমার বা হাতের খেল।

২য় মেয়ে :- আসলে তুমি আমার প্রতি কেমন যেন একটা.. ভাল্লাগে না আর! তোমায় দেখলেই কেমন যেন একটা বিরক্ত বিরক্ত ভাব চলে আসে আমার! সরি।

৩য়:- সরি প্রদীপ। আমার একটা বাজে অতীত আছে,আমি তোমায় আর ঠকাতে চাইনা। আমি বিবাহিতা ছিলাম এখন তালাক হয়ে গেছে অলরেডি। তাই,এখন আবার ঐ পরাধীন, বাজে লাইফে ফিরে যেতে চাইনা। আমি আর বিয়েই করবো না কাউকে।সরি।

৪র্থ:- Sorry প্রদীপ। তুমি মুসলিম, আমি হিন্দু। তাই আমার পক্ষে ফেমেলির বিপক্ষে যাওয়া সম্ভব নয়। Bye.

৫ম:-পাক্কা ৬মাস পর… কাহিনীর সুত্রপাত -কোন কারন ছাড়াই রাগারাগি, চেচাঁমেচি, দোষারোপ করতো শুধু। তবে এ মেয়েটিকে প্রদীপ সত্যি সত্যিই পছন্দ করতো খুব।একদম সে যেমন চায় তেমনি।সব গুণে গুণান্বিত এ মেয়ে। তাই এ যাত্রায় সে দারুণ ধৈর্য্যের পরীক্ষা দিয়েছিল। প্রতিনিয়ত একটা একটা করে দামী গিফট চাইতো। সে প্রদীপের চেয়েও ভালো জায়গায় আছে পড়াশোনায়। কিন্তু মেয়েটির বড়লোকি হাভভাব আর উচ্চ বিলাষিতার যাতাঁকলে পরে ছেলেটির বাঁচা দুর্লভ হয়ে যাওয়ার উপক্রম। তাও সে হাল ছাড়েনি,নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে মেয়েটির জন্য করে যেত। অনেক অন্যায় আবদার ও সে মুখ বুজে সয়ে নিয়েছিলো। সামান্য বেতনের চাকরিজীবির সন্তান প্রদীপ,আর তার নিজের সামান্য রোজগারে কোনমতে লেখাপড়ার খরচ চালাতো। কিন্তু পাঁপড়ির জন্য সব রোজগার,জমানো টাকা পয়সা ক্রমশ শেষ হয়ে যাচ্ছিলো। তাও মেয়েটির মুখের হাসির জন্য সে সব করতো। যা যা বলতো সব। কিন্তু হঠাৎ একদিন, গভীর রাতে পাঁপড়িকে কল দেয় প্রদীপ।ব্যস্ত পায় বারবার। সামান্য পরখ করার জন্য প্রতিদিন একি কাজ করতে থাকলো।প্রতিদিনই একি ঘটনা! মেয়েটি ফোন ধরেই না! কয়েক সপ্তাহ বাদ, মেয়েটিকে এ নিয়ে জিজ্ঞেস করায় অকস্মাৎ ছেলেটিকে থাপ্পড় মেরে দিয়ে বলে-তুমি আমায় সন্দেহ করছো?? এত বড় স্পর্ধা তোমার!? আরে,কি আছে তোমার? কি দিতে পারছো তুমি আমায়?

–ছেলেটি ঘটনা বুঝতে না পেরে ভড়কে গেল। কাঁপা কাঁপা গলায় বললো-না পাঁপড়ি! কি আশ্চর্য! আমি তোমায় সন্দেহ করি কখন বললাম! শুধু তো জিজ্ঞেস করলাম! তোমার জন্য তো আমি জীবন দিতেও প্রস্তুত,সেখানে সন্দেহ!!

–তাহলে জিজ্ঞেস করলা যে..
–না পাঁপড়ি। রাত যত গভীর হয় ততই আমি তোমাকে মিস করি,মনে পরে খুব। কল দিলে একদিন ও পাইনা তোমায়,ব্যস্ত পাই। তাই…
–ওহ!(হতমত খেয়ে)
–হ্যাঁ দিতাম।পাশের রুমমেটকে যখন অত রাতে গার্লফ্রেন্ডকে নিয়ে ব্যস্ত থাকতে দেখি তখন আমারও ইচ্ছা করে পাঁপড়ি,একটু রাত জেগে কথা বলি তোমার সাথে।তাইজন্যই ফোন দেওয়া,আর কিছুনা।
— প্রদীপ! আসলে মানে..
— কি??
— আমি মেয়ে হয়েও তোমার চেয়ে ভালো জায়গায় পড়ি।

তাছাড়া আমার পারিবারিক অবস্থাও তোমার চেয়ে বহুগুণ ভালো। তুমি একটা গ্রাম্য ছেলে, বাবার স্বল্প বেতন,অতীব গেঁয়ো,সহজ-সরল,আধুনিকতার ছোঁয়া বিন্দুমাত্র নেই তোমার মাঝে। যতই জানছি,ততই বিরক্ত/ বোর হচ্ছি! আমি তো এমন লাইফ পার্টনার চাইনি। তোমার স্বাদ আছে,সাধ্য নেই। কিন্তু আমার দুটোই আছে। সেদিন এক বান্ধবীর বড় ভাইকে দেখেই ক্রাশ খেয়ে যাই! মনে হইলো, আমার কেন এমন একজন ধনী, স্মার্ট,হ্যান্ডসাম,ব্রিলিয়েন্ট বয়ফ্রেন্ড নেই!! কোন অংশে কম আমি!!কি নেই আমার? লেখাপড়ার গুন,সৌন্দর্য, আধিপত্য সব সব আছে আমার।তাহলে কেন আমি তোমার মতো একটা ছেলের সাথে…
ঐ ছেলেটা আমায় দেখে এক নিমিষেই পছন্দ করে ফেলছে, প্রপোজও করছে! এখন সে আমায় ভালোবাসে।রোজ গভীর রাতে কথা হয়,দিনে ব্যস্ত থাকি দুজনে তাই।তোমাকে ব্যপারটা বলবো করে আর বলা হয়নাই,আসলে কিভাবে যে শুরু করবো ঐটাই বুঝিনাই।এখন যখন তুমি নিজেই সুযোগ করে দিলে,তখন হাতছাড়া করার মতো বোকামি করলাম না। বলেই দিলাম।

— ছেলেটি কি বলবে,কি এক্সপ্রেশন দিবে বুঝতেই পারতেছে না। নির্বাক শ্রোতা ও দর্শক আজ প্রদীপ। কিছুই বলার নেই তার।
— প্রদীপ?? কিছু বলো? সরি প্রদীপ সরি! ক্ষমা করে দিও আমাকে,প্লিজ।
— প্রদীপ আচ্ছা বলে চলে যাচ্ছে।
— প্রদীপ,তুমি অনেক ভালো ছেলে।

অনেক। দেখবা,তুমি আমার চেয়ে বেস্ট কাউকে পাবা। আরো সুন্দরী,আরো গুণী,এডুকেটেড, ভালো কাউকে। আর শরীরের খেয়াল রাখবা,রাত জাগবা কম।বাই প্রদীপ।(চিৎকার করে বলতেছে)(নোট২) কথাগুলো কানে ভেসে আসলো প্রদীপের। ইচ্ছে করতেছে, এক্ষুনি মেয়েটাকে ৫-৬টা থাপ্পড় দিয়ে আসতে।কিন্তু কিছু না বলে,করেই চলে যায় প্রদীপ। মনে পড়ে যায়,একি কথা সেও একদিন লাবণ্য কে বলেছিল। বাসায় ফিরে ঘন্টাখানেক চুপ থেকে হজম করার চেষ্টা করলো সব। পারলো না। লাবণ্য কে খুব খুব মনে পরতেছে। সময় আসলো বাক্সটা খোলার। বাক্সটা খুললো একটা বই বাক্সের ভিতর! যে বইটা পড়ার খুব আগ্রহ পোষণ করেছিল একবার প্রদীপ কিন্তু কেনার সময়,সুযোগ হয়ে উঠেনি। লাবণ্য জানতো। বইয়ের পাতা উল্টাতেই একটা চিঠি পরলো হাতে..!! চিঠিতে লিখা— প্রিয় প্রদীপ,

সালাম নিও। জানো আজ কি? আজ সেইদিন যেদিন তুমি আমার জীবনে এসেছিলে। প্রদীপ,বাবা হঠাৎ আমার বিয়ে ঠিক করে ফেলতেছে। আমি তোমার কথা মাকে জানিয়েছি। কিন্তু বাবার নাকি ঐ ছেলেকে খুব পছন্দ হইছে।ছেলে খুব নম্র,ভদ্র,গুণী,প্রথম শ্রেণীর এডুকেটেড পার্সন।সেও আমাকে দেখেই পছন্দ করে ফেলছে।কিন্তু আমিতো তোমাকে পছন্দ করেছিলাম।তোমাকেই চাই। বইয়ের পিছনে লাগানো বিয়ের কার্ডটা আমারই। ভাবলাম,আজ তোমায় বাসায় নিয়ে গিয়ে বাবার কাছে তুমি,মা,আমি মিলে বুঝিয়ে বলবো সব। বাবার একমাত্র মেয়ে,তাই বুঝিয়ে বললে বুঝবে কারন বাবা আমায় খুব ভালোবাসে।কিন্তু,কি ভাগ্য আমার দেখ! আজি তুমি আমাকে বিদায় দিয়ে দিলে। ভালোই করলে:) আমার জন্য তোমার আর কিছুই করতে হলো না। আচ্ছা ভালো থেকো,আল্লাহর অশেষ রহমত থাকুক তোমার উপর,দোয়া রইলো। আর কখনো যদি আমার জন্য তোমার কিছু করার ইচ্ছা জাগে,তাহলে দু’হাত তুলে মোনাজাত কইরো,আমাকে তোমার মোনাজাতে একটু ঠাঁই দিও প্রদীপ। তোমার মনের ইচ্ছা পূরণ করুক আল্লাহ। আমি আসছি প্রদীপ। আসলাম। আল্লাহ হাফেজ।

ইতি, লাবণ্য।”ছেলেটির মাথায় জমতেছে তীব্র ঘাম,চোখ লাল হয়ে আসছে,বুক দড়পড় করছে,মনে হচ্ছে শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে।সাথে সাথে লাবণ্যকে কল করলো। ১৩নাম্বার কলটা রিসিভ করলো।

–হ্যালো! লাবণ্য??
–না,আমি ওর মা।তুমি কে বাবা?
–আন্টি আমি প্রদীপ। লাবণ্যকে দিন,প্লিজ?
–কান্নার আওয়াজ ভেসহ আসলো ফোন থেকে!!!
–কি হইলো আন্টি? কাঁদতেছেন কেন??কি হইছে????
–লাবণ্যের ভাই ফোন নিয়ে বললো, ৩মাস আগে আপু রোড এক্সিডেন্টে মারা গিয়েছে।এ নাম্বারে আর কখনো ফোন দিবেন না।রাখছি। বাই।

এরপর ??? এভাবেই, প্রদীপের লাবণ্যময় আলো নিভে গেল। তারপর থেকেপ্রতি বছর প্রদীপ লাবণ্যর মৃত্যু বার্ষিকীতে দোয়া পড়ানোর পাশাপাশি সারা দিন-রাত দরজা বন্ধ করে বাসায় থাকে।এইদিন তার অন্যসব কাজ বন্ধ থাকে।প্রতিদিন একবার করে কবরে যায়,প্রচুর কান্নাকাটি করে। কিন্তু,”রাত্রে যদি সূর্য শোকে ঝরে অশ্রুধারা, সূর্য কভূ নাহি ফেরে ব্যর্থ হয় তারা।”।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত