ত্রিকোণমিতি

ত্রিকোণমিতি

চোখ বড় বড় করে তানহাকে যখন বললাম “নিজে তো প্রেম করতে পারো না। অন্যের প্রেম করা দেখলে হিংসে হয়। এতো জ্বলে ক্যান? দুনিয়াই কি আর মেয়ে নাই? ওদের দেইখা কিছু শিখতে পারোস না? মন চাইতেছে থাপড়াইয়া এই চাপার দাঁত ঐ চাপায় নিয়ে যাইতে।তুই নাদিয়ার কাছে আমার ব্যাপারে এসব কেন বললি? আমার এতো বড় ক্ষতি করলি কেন?” আমার কথা শুনে সে ভ্রু কুচকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে বললো “মুখ সামলে কথা বল।তুই আমাকে কি থাপড়াবি? আমি তোকে থাপড়াবো।

যেই মেয়েরে ভালো লাগে সে মেয়েরেই প্রপোজ করিস।তোর মত ছ্যাক খাওয়া পাবলিক আমি? আমার যেদিন প্রেম করার ইচ্ছা হবে সেদিন প্রেম কররো। বিয়ের পর জামাই এর সাথে করবো।তোর মত লুচু ক্যাটাগরির না।নাদিয়ার কাছে আমি গিয়েছিলাম নাকি নাদিয়া আমার কাছে তোর ব্যাপরে জানতে আসছে। আমি মিথ্যা বলতে পারি না। যা সত্য তাই বলছি। আর তোর পাশে তো ও দাঁড়ালে ভাই বোন লাগে। একমাসও হয় নাই মেয়েটা এই ভার্সিটিতে আসছে তার মধ্যেই প্রপোজ করছিস। তুই না সিনিয়র।নিজের দামটা রাখছোস? ছ্যাচড়া।’

আমি এদিক ওদিক তাকিয়ে দাঁত কিড়মিড় করতে থাকি। তারপর একবার বাম দিকে কয়েক পা হাটি আবার ডান দিকে কয়েক পা হেটে ওর সামনে দাঁড়িয়ে চুল গুলো এলোমেলো করে বললাম “দেখ মেজাজ খুব খারাপ।তোর জন্য নাদিয়া আমার হাত থেইকা ছুইটা গেছে। জানোস নাদিয়ার নাকটা বাশির মত। চোখ গুলা বিড়ালের বাচ্চার মত। সব হারালাম। এই বাশি আর চোখ নিয়ে কত স্বপ্ন অলরেডি হয়ে গেছে।’’ এটা বলেই ওর পাশে বসলাম। আমার কথা শুনে ও হাসতে থাকে। তানহা যখন এই হাসিটা দেয় আমি কেমন করে যেন ওর দিকে তাকিয়ে থাকি সব সময়। আমার ভিতরে তখন কেমন কেমন লাগে। মনে হয় নদীর স্রোত বয়ে যায় আর আমি তার মধ্যে ভাসতে থাকি। তানহা আমাকে বললো “তা নাদিয়ার নাক বাঁশির মত লাগে। আমার নাক তোর কাছে কেমন লাগে শুনি তো।

আমি কিছুক্ষন সময় নিয়ে বললাম “আমার দিকে তাকা।” সে আমার দিকে তাকায় একটা ভাব নিয়ে। আমি ফিল্মি স্টাইলে হাত দুইটা ওর নাকের সামনে নিয়ে এক চোখ বন্ধ করে মাপতে মাপতে বললাম “দুর বেটি এইটা একটা নাক হইলো? এই নাক কেমনে বানাইছিস? এটাতো নাক না, পুরা একটা লাউ। এইটারে নিয়ে চলাফেরা করতে তোর অসুবিধা হয় না? বাইচা আছোস কেমনে?” আমার কথাটা মনে হয় সে ঠিক মত হজম করতে পারেনি। কিন্তু আমি বুঝতে পারলাম আমাকে এখান থেকে কাটতে হবে। আমি আমতা আমতা করে বসা থেকে উঠে বললাম “এই তুই আমার দিকে এমন করে তাকিয়ে আছিস কেন? দেখ এই ভাবে তাকাবি না। মাইয়া মাইনষের এইভাবে তাকাতে নেই। মাইয়া মাইনষে তাকাবে হরিণের মত। টানা টানা চোখ নিয়ে। যা তোরে মাফ করে দিছি। তোর প্রতি আমার কোন রাগ নেই।” তানহা আমার কথা শুনেই যেই বসা থেকে উঠে আমাকে ধরতে চাইলো আমি দৌড় দিলাম। দৌড় দিতে দিতেই শুনলাম ও বলছে “তোরে আমি সকাল সন্ধ্যা থাপড়াবো। তোর পিছনে ছুটার আমার দরকার নাই তো। আমার হাতের সামনে তুই এমনিই আসবি।”

আমি দৌড়াতে দৌড়াতে ভাবতে লাগলাম ও যা বলেছে মিথ্যা না। আমার ভার্সিটিতে সব চাইতে ভালো বন্ধুটা হচ্ছে তানহা। আমার ভালো লাগা মন্দ লাগা সব কিছু ও জানে। এটাও জানে আমার সময় কেমন করে কাটে। আব্বা মাঝে মাঝে যখন বাসায় জায়গা দেয় না এইসব হাবিজাবির কারণের জন্য আমি তখন ওরে ফোন দিয়ে শুধু এইটুকুই বলি “আজকে ঘুমাতে না পারলে কিন্তু সকালে তোর সাথে দেখা হবে না। আমার কিছু করার নেই। আমারে দোষ দিতে পারবি না।” এর কিছুক্ষন পরই এসে সে আমারে আমাদের বাসায় নিয়ে যাবে। তারপর বাবা মায়ের সামনে দু একটা বকা দিয়ে বলবে “সামনে তোমার পরীক্ষা, আর তুমি রাত বিরাতে রাস্তায় রাস্তায় বসে মশা মারো নবাবজাদা। এই করে সেই করে বেড়াবি। তোর বাবা মায়ের তোকে নিয়ে কত আশা। তোর ছোট ভাইকে দেখ। কত নিষ্পাপ একটা ছেলে। দেখলে মায়া লাগে। তোর থেকে সে এগুলা শিখছে না? আংকেল আন্টিকে স্যরি বল।

আমি মাথা নিচু করে প্রতিবার স্যরি বলি। আর বাবা মা চুপ করে তানহার দিকে তাকায় থাকে। বাবা মায়ের মুখটা মাঝে মাঝে আমি কেমন যেনে হয়ে যেতে দেখি। হয়তো ওরা ভাবে আমার আর একজন অভিভাবক হচ্ছে তানহা। তারপর তানহা একটা হাসি দিয়ে প্রতিবার বলে “আন্টি বদমাইশটা কিছু খায় নাই। কিছু না খেলে শরীর ঠিক থাকবে না। আর শরীর ঠিক না থাকলে পড়ালেখায় মনোযোগ বসবে না।” অনেক সময় আম্মা তানহার বলার আগেই বলে ফেলে “আমি জানি মা তুমি এখন কি বলবে “গাধাটা কিছু খায় নাই। কিছু না খেলে শরীর ঠিক থাকবে না। আর শরীর ঠিক না থাকলে পড়ালেখায় মন বসবে না। কিন্তু হারামজাদাটা কি পড়ালেখা করে। ও তোমাকে ব্যবহার করে তুমি বুঝো না।? তানহার যখন কিছু আর বলার থাকে না তখন সে আমাকে বলে “শাহরিয়ার বাসায় আমাকে দিয়ে আয়। এমন করলে আমি সত্যি আর আসবো না আংকেল আর আন্টির কাছে তোর জন্য সাফাই গাইতে। আমার কি খেয়ে দেয়ে কাজ নেই?” কিন্তু ও প্রতিবার আসে ওর এই খাওয়া দাওয়ার কাজ বাদ দিয়ে।

ঘন্টাখানেক পর ইরার সাথে দেখা। আমি বেশ খানিকক্ষন ওর দিকে তাকিয়ে থাকলাম।ওকে দেখার পরই আমার মনের ভিতর আকাশ ভেঙ্গে যেন বৃষ্টি নামলো। এই মেয়েটাকে আমি এই প্রথম খোলা চুলে দেখছি। ভোরের আলো ফুটলেই চারপাশে যেমন একটা স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে পড়ে ঠিক তেমন। ইরা হলো নাদিয়ার ফ্রেন্ড। একবার ভাবলাম ওর সাথে কথা বলি। কিন্তু সে নিজেই আমার কাছে এসে বললো “কেমন আছেন ভাইয়া? নাদিয়া কোথায় বলতে পারেন?” এই কথার কি প্রত্যুত্তর দিব আমি বুঝলাম না।

ওর দিকে তাকিয়ে থেকেই বললাম “নাদিয়ার খবর আমি কি করে বলবো? মনে হয় আমি এমন একটা মানুষ দুনিয়ার মানুষের খবর আমার কাছে আছে?” ও একটু অবাক হয়ে বললো “এমা আমি কি তাই বলেছি? আপনি তো ওকে পছন্দ করেন। আবার সেটা বলেছেনও। আপনার তো জানার কথা ও কোথায়।তাই জিজ্ঞেস করেছি। ওর ফোনটাও বন্ধ।” আমি একটু সময় নিয়ে বললাম “দুর তুমি কি না কি বলো। ওর পাশে আমি দাঁড়ালে ভাই বোনের মত লাগে। আমার বন্ধু তানহা বলছে। ও যা বলে সত্য কথাই বলে। ওর কথা আমি বিশ্বাস করি।কিন্তু একটা বিষয় খেয়াল করলাম তোমার নাকটা না বাঁশির মত।আগে খেয়াল করলাম না কেন বলো তো। একটু ভুল হয়ে গেলো না?” আমার কথা শুনে সে হাসতে লাগলো। তারপর হাসতে হাসতেই বললো “আমি যাই।দেখা গেলো আমি আর কিছুক্ষন এখানে থাকলে আপনাকে আর এই জগতে পাওয়া যাবে না।সবার কাছে আপনার ব্যাপারে যা শুনেছি।আপনি এমন কেন?”

আমি কিছু বলার প্রয়োজনবোধ করলাম না।ইরা এই কথা বলেই চলে গেলো। অনুধাবন করি আসলে আমি মানুষটা এমন কেন? এই প্রশ্নটা আমাকে প্রায় মানুষ করে থাকে। আমার ভিতরে জমা থাকা শিশির বিন্দু গুলোর হয়তো কোন কষ্ট নেই।থাকলেও কষ্টের ছাপটা আমাকে ছুয়ে দিতে পারে না বলে খুব সহজে আমি মানুষের মনে প্রবেশ করে তাদেরকে ছুয়ে দিতে পারি, ভালোবাসতে পারি।যে মানুষ অপর মানুষকে গভীর চোখে এঁকে ভালোবাসতে পারে তার কষ্ট থাকার কথা না।কিন্তু আমি মানুষটা ছন্নছাড়া কেউ আমাকে আঁকতে চায় না। তখন আমার ভিতরে ভীষন অভিমান জমা হয়।অসীম ভালোবাসার অভিমান।এ সব কিছুর মাঝেই আমার জীবন। আমার জীবনে যা কিছু করতে মন চায় তাই করি। এই জীবনে চলার মাঝে নিজেকে বুঝতে পারলেও আমি বুঝতে পারি না আমার ভিতরে লুকিয়ে থাকা ছায়াটাকে। আসলে আমি মানুষটা কেমন? মাঝে মাঝে তানহাকে নিয়ে ভাবি আমার উদ্ভট আচরন, কথা গুলো ও কিভাবে হজম করে?

গভীর রাতে আমি যখন ঘুমে আচ্ছন্ন তখন তানহা ফোন দিয়ে আমাকে যে কথাটা বললো আমি প্রায় বিষম খেয়ে গেলাম।ও আমাকে বললো “তুই আমার ঘুম নষ্ট করছিস। আমি না বাসায় আসার পর থেকেই আয়নার সামনে বসে খতিয়ে খতিয়ে দেখেছি আমার নাক লাউ এর মত কিনা। আমার স্টুডেন্ট ক্লাস ফাইভে পড়ে না? ওরে জিজ্ঞেস করেছিলাম। বলছে আমার নাক কিন্তু লাউ এর মত না।এমন কথাটা তুই আমাকে ক্যান বললি?” আমি কিছুক্ষন সময় নিয়ে হামি দিয়ে বললাম “আমার না মাঝে মাঝে মনে হয় তোর আক্কেল বলতে কিছু নেই।এতো রাতে তুই ফোন করছিস এই কথা বলার জন্য হারামজাদী?

এই তোর আক্কেল দাঁত উঠছে?” ও মিন মিন করে বললো “দেখ তুই এমন করে বলতি পারিস না।” আমি আরও একটু জোরে বললাম “ঐ আমি কি পারি বা না পারি তোরে বলতে হবে? রাখ ফোন।” এটা বলেই ফোন রেখে আমি ফেনের দিকে তাকিয়ে ভাবি মানুষের অনুভূতি গুলো কেমন? এটা মানুষকে কিভাবে জাগ্রত করে? এই অনুভূতি মেঘে মেঘে উড়ে যায় কোন এক মায়াজালে। সেই মায়াজালে থাকে অসীম প্রেম, বিরহ।এসব ভাবতেই তানহা আবার ফোন করলো। আমি তিক্ত মন নিয়ে ফোন ধরে চুপ করে থাকতেই সে বললো “কথায় কথায় রাগিস ক্যান বেয়াদব। রাগ আমার করার কথা বুঝছিস। একটা কথা শোন না।” আমি হুম করে উচ্চারন করাতেই সে একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বললো “রাগবি না বলে দিলাম।আমার নাক কিন্তু লাউ এর মত না।” এর প্রত্যুত্তর কি দেওয়া উচিৎ আমি জানি না। আমার আর কিছু বলতেও ইচ্ছে করে না। শুধু অনুধাবন করতে ইচ্ছে করে অনুভূতি গুলো মেঘে মেঘে কিভাবে উড়ে?

ডিভোর্সের ছয় বছর পর আদনানের সাথে মিতুর আবার দেখা হয়ে যাবে আদনান এটা মনে করতেই ভিতরে ভিতরে কেমন যেন অনুভব করলো।আলাদা হওয়ার আগে মিতু খুব ভালো করেই বলে দিয়েছিল “ভুল করেও আমার সাথে দেখা করার চেষ্টা করবে না।” আদনান জানে প্রিয় মানুষটাকে নিজের কাছে রেখে দিতে হয়। কিন্তু প্রিয় মানুষটাই যখন আত্মার বন্ধনের মায়া ত্যাগ করে চলে যেতে চায় তখন নিজের কাছে রাখা যায় না। তাকে আকাশে মুক্ত পাখির মত স্বাধীনতা দিতে হয়। যখন আদনান বলতে যাবে “দুঃখিত ভুল করে দেখা হয়ে গেলো দেখোই না। ভালো আছো?” কিন্তু এই কথাটা বলার আগেই মিতু বললো “তোমার স্বভাবটা গেলো না। একদম বদলাওনি।আগের মতই আছো দেখছি।একটা মানুষের সাথে তোমার এতো বছর পর দেখা হলো তাকে অন্তত জিজ্ঞেস করা উচিৎ তুমি কেমন আছো?” আদনান নিজেই মনে মনে একটু হাসলো মিতুর কথা শুনে। তারপর বললো “তুমি কি আসলে ভালো আছো?” মিতু কিছুক্ষন ভাবলো এই কথার কি প্রত্যুত্তর দিবে। আসলে ও নিজেও কেমন যেন হয়ে গেছে।

মিতু বললো “তোমার সাথে আমার দেখা করার কারনটা হলো আমার নিজের জন্য না।আমার মেয়েটার জন্য।ও প্রায় ওর বাবার কথা জিজ্ঞেস করে। ওর বাবা কেমন, ভালো না খারাপ। আমি ইনিয়ে বিনিয়ে অনেক কথা বলি। তোমার একটা ছবিই আমার কাছে ছিল। যেদিন বিয়ের দিন আমার সাথে ছবি তুলেছিলে। সেই ছবিটাই। সে ছবিটা এখন আমার কাছে নেই। নেহার কাছে।নেহা আমাকে প্রায় বলে সবার বাবা সবার সাথে থাকে কিন্তু আমার বাবা আমার সাথে থাকে না কেন? আমার বাবা কি খুব খারাপ মামনি? আমি প্রথম কথার কোন উত্তর দিতে না পারলেও দ্বিতীয় কথার উত্তর দিয়ে বলতাম তোমার বাবা খুব ভালো একটা মানুষ। তুমি তোমার বাবার মত দেখতে হয়েছো। ও অনেক গভীর টাইপের কথা বলে। বলবেই তো। বাবার রক্ত বইছে শরীরে। আমি মাঝে মাঝে প্রায় অবাক হই পাঁচ বছরের এইটুকু একটা মেয়ে এমন টাইপের কথা কি করে বলে?

আদনান অনেকক্ষন মিতুর দিকে তাকিয়ে থাকলো ছলো ছলো চোখে।এই প্রথিবীর বুকে অনেক বিশাল বিশাল নদী, সমুদ্র আছে।কিন্তু আমাদের মানুষের মাঝেও সেই বিশাল নদী সমুদ্র থেকে অনেক বিশাল আকাশ সমান সমুদ্র আছে। সেই সমুদ্রটা দেখা যায় না। যখন ভিতরটা নাড়া দিয়ে ওঠে তখন সেই বিশাল সমুদ্র থেকে কয়েক ফোটা জল গড়িয়ে পড়ে।আদনান বুঝতে পারে না ওর কি বলা উচিৎ। গলাটা কেমন যেন শুকিয়ে যাচ্ছে। তবুও ফ্যাশফ্যাশ করে বললো “আমার মেয়ের নাম নেহা? ওর চোখ দুটো কি আমার মত হয়েছে? ওকে কি আমি একবার দেখতে পারি? ছুয়ে দিতে পারি?” মিতু আদনানের অস্তিরতাটাকে অনুভব করলো। মিতু আদনানের চোখের ভাষা একটু হলেও বুঝতে পারে। মিতু বললো “হ্যাঁ পারো। ওকে আমি কথা দিয়েছি বাবা দিবসে তোমার সাথে ওকে আমি দেখা করাবো। এবার বুঝতে পেরেছো কেন এতো বছর পর তোমার সাথে আমি দেখা করেছি?” আদনান কোন উত্তর দিল না। শুধু বললো “আমার মেয়েটা কোথায়?”

ছোট বেলাই আদনান ওর বাবা মাকে হারায়। সেবার বিশাল বন্য বয়ে গেলো।বড় বড় স্রোতে সব কিছু লন্ডভন্ড হয়ে গিয়েছিলো।শত শত মানুষের মাঝেও আদনানের বাবা মা ও হারিয়ে যায়। যেদিন হারিয়ে যায় তার দুদিন আগে আদনান তার খালার সাথে বেড়াতে এসছিল চট্টগ্রামে।জীবনের স্রোত কোন দিক দিয়ে গড়ায় শুধু মাত্র উপর ওয়ালাই জানে।এই স্রোত বুঝার অসীম শক্তিটা কারো নেই। তারপর থেকেই জীবনের এই মায়াজালে আদনান খালা খালুর কাছেই মানুষ হয়। আকাশের রংটা হুট করেই কি করে বদলে যায় আদনান বুঝে গিয়েছিল। তখন তার বয়স মাত্র বারো। যদিও তার রাশেদা খালার একটা মেয়ে আছে তনিমা। এই রাশেদা খালার ইচ্ছা ছিল একটা সময় দুজনে সাবালক হলে তনিমার সাথে আদনানের বিয়ে দিবে। ছেলে মেয়ে দুটোই নিজের চোখের সামনে থাকবে।দিন যত অতিক্রম হয়, মানুষ, পরিবেশ, পরিবেশের ছায়াও পালটে যায়। সময়ের সাথে সাথে তনিমার মনেও ভালোবাসা জন্মায়। তবে এই ভালোবাসাটা আদনানের জন্য না।তার কলেজেরই ছেলে আহনাফের জন্য। যেদিন তনিমা আহনাফের হাত ধরে পালিয়ে যায় ঠিক সেদিন আদনানই ট্রেনে ওদের উঠিয়ে বিদায় দেয়। আর বলে “জীবন সুন্দর হোক।”

জীবনে এতো কিছু হওয়ার পরও আদনান পড়ালেখায় ভালো ছিল। যেদিন তনিমাকে ট্রেনে উঠিয়ে দিল তার পর দিনই রাশেদা খালা আদনানের গালে একটা থাপ্পড় মেরে বলেছিল “জীবনটা এতো সোজা না বুঝছিস? কয়েক মাস পর দেখিস এই মেয়ে আমার ঘাড়েই আবার উঠছে।” জীবনটা আসলেই এতো সোজা না। খালার কথা মতই তনিমা ছয় মাস পর তার মায়ের কাছে হাজির হয়। নিজের মেয়ে বলে কথা। মা ফেলতে পারে না। মা কি কোন সন্তানকে ফেলতে পারে?

এই কঠিন জীবনের মাঝেও মিতু কি করে আদনানের জীবনে চলে আসলো তার অধ্যায়টা একটু অন্য রকম। ঢাকা ভার্সিটিতে পড়ার সুযোগ পায় আদনান। আসলে ব্যাপারটা সুযোগ না। যোগ্যতা। জীবনকে আমরা যেভাবেই সাজাই যেভাবে পরিচালনা করি সেরকমই সাফল্য জীবনে আসবে। ভার্সিটিতেই মিতুর সাথে পরিচয় আদনানের।

মিতু ছিল ঘুমকাতুরে মেয়ে।ক্লাসে হঠাৎ করে ঘুমিয়ে যাবার কারনে মিতুর এই ঘুমকাতুরে উপাধিটা হয়ে গিয়েছিল।বয়স দিন দিন বাড়ার পর বা ভার্সিটিতে পড়লেও একটা মানুষের ভিতর যে পার্সোনালিটি প্রভাব কাজ করে সেদিক দিয়ে মিতুর মন যা চাইতো তাই করতো।যদিও ভার্সিটিতে পড়লেই একজন মানুষের ভিতর পার্সোনালিটি বা ব্যক্তিত্ব দেখা যাবে এমন কোন নিয়ম নেই। ব্যক্তিত্ব বলতে একজন মানুষের চিন্তা, মানসিক প্রক্রিয়া তার আচার আচরন, তার কথা বলার ধরন, কেমন করে চলতে হবে, কার সাথে কেমন কথা বলতে হবে, তার কাজে অন্য দশটা মানুষ কি ভাববে এ সব কিছুই মিলিয়ে একটা মানুষের ভিতর যে মনোভাবটা তৈরি হয় তাকেই মূলত পার্সোনালিটি বা ব্যক্তিত্ব বলা যায়। খুব কম সময়ে বা কম বয়সে অনেক মানুষ আছে জীবনটাকে যখন বুঝে ফেলে জীবনের গল্পটা কেমন হবে অনুমান করতে পারে সে মানুষ গুলোর মাঝেই ব্যক্তিত্বটা চলে আসে। তার মধ্যে আদনান একজন।

মিতুর সাথে আদনানের বন্ধুত্বটা হওয়ার পরই মিতুর প্রায় এসাইনমেন্ট আদনান করে দিত। মাঝে মাঝে জীবনের গল্প শোনাতো। সব মানুষের জীবনের আলো এক না, জীবনের আঁকা আয়নায় মানুষকে কিভাবে আঁকা যায়, সমুদ্রের নিস্তব্দ রাতের শব্দ, সাদা বালি আর পাথরের ওপর নীল জলের আঁছড়ে পড়া দৃশ্য, নিরব থেকে শরতের কাঁশফুলকে ছুয়ে দেওয়া কিংবা গ্রামের সবুজ ছায়ায় কিভাবে প্রাণ ভরে নিশ্বাস নেওয়া যায় সে সব কথা শোনাত আদনান। মিতু প্রায় অবাক হয়ে চুপ করে শুনতো আর মনে মনে বলতো এই ছেলেটা এমন কিসিমের কেন।

অন্য আর পাঁচটা ছেলে থেকে আলাদা কেন? আর ওর এমন গভীর টাইপের কথা আমি এতো মনোযোগ দিয়ে শুনিই বা কেন? এতো কিছু বুঝা, একটা মানুষকে খুব কাছ থেকে চেনা জানার পরও একটা সময় মিতু আদনানকে কাছের মানুষ করে নেয়।আদনান একদিন বলেও ছিল “ঘুমকাতুরে তুমি একদিন আমার থেকে পালাতে চেষ্টা করবে, ক্লান্ত হয়ে যাবে অনেক ক্লান্ত” মিতুর চুপ থাকা দেখে আদনান ছটফট করতে করতে আবার বললো “আমার মেয়েটা নিশ্বচয় আশে পাশে আছে। আমার মন বলছে। ওর গায়ের গন্ধটা কি কাঠগোলাপরে মত হবে?” মিতু আরও একটু সময় নিয়ে আদনানের দিকে তাকিয়ে থাকলো তারপর ইতস্তত করে বললো “সামনে যে কালো গাড়িটা দেখা যাচ্ছে তার ভিতরেই ও বসে আছে।” আদনান শুধু আস্তে করে বললো “আমি কি ওর কাছে যেতে পারি?” মিতুর কোন প্রত্যুত্তর না পেয়ে আদনান সামনের দিকে হাটতে লাগলো।

দেখতে দেখতে আমার অনার্স, মাস্টার্স দুটোই কেমন করে কমপ্লিট হয়ে গেলো তার কিছুই আমি বুঝতে পারলাম না। বছর খানেক হলো একটা চাকরি করছি।আসলে জীবন মানুষকে অনেক কিছু শিখিয়ে দেয়। বাধ্য করে তাকে জীবনের সাথে লড়তে।এই জীবনের লড়াইয়ে সময় গুলো এতো দ্রুত কেমন করে কাটে বুঝা যায় না।? আমি প্রায় ভাবি সময়ের কি কোন পরিবর্তন হয়েছে? অনার্সটা শেষ করার পর তানহার সাথে আমার যখন শেষ দেখা হলো ও আমাকে বললো “আমি রাজশাহীতে চলে যাবো। তোর কি খারাপ লাগবে না?” আমি ওর মুখটায় কেমন একটা আবছায়া ভাব দেখতে পেয়েছিলাম।

এই আবছায়াকে আমি উপেক্ষা করে বলেছিলাম “দুর বেটি খারাপ লাগবে কেন? যত তাড়াতাড়ি যাবি তত আমার জন্য ভালো।প্রতিদিন তোর এতো প্যারা আমার ভালো লাগে না। আমি কই যাই, কোথায় কি করি, ক্লাসে আসতে এতো দেরি হলো কেন, কোন মেয়েকে কি বলছি সব তোরে বলতে হবে। সব কিছুর রেজিস্টার খাতা তুই। তোর কাছে লিপিবদ্ধ করতেই হবে। এই রেজিষ্টার করতে আমার আর ভালো লাগে না।মাফ কর তাড়াতাড়ি বিদায় হ।” আমার কথা শুনে ও মাথাটা নিচের দিকে করে ফেলেছিল। একটু সময় নিয়ে বলছিল “তুই কি শুধু আমার বন্ধুই ছিলি? আমাকে নিয়ে তুই কখনো কি কোন কিছুই ভাবিসনি?”

আমি অনেক জোরে হেসেছিলাম ওর কথা শুনে। হাসতে হাসতেই বললাম “তোর কথা গুলো কেমন যেন অন্য রকম লাগতেছে। এই যে মাঝে মাঝে আমি ছ্যাকা খেয়ে এসে তোর সাথে যেমন করে উলটা পালটা বলি না ঠিক এমন।” এরপর তানহা আমার সাথে এই ব্যাপারে আর তেমন কোন কথা বলেনি। শুধু বলেছিল “তুই অনেক ভালো একটা ছেলে এটা কি জানিস? তোর ভিতরটা একদম পরিষ্কার।কোন প্যাচ নেই। যা বলিস খুব সহজ করে বলে ফেলতে পারিস। এমন করে সব সময় থাকিস কেমন?”

আমার কি বলা উচিৎ ছিল আমি বুঝতে পারিনি।ওর কথা গুলোর মাঝে কেমন পাগলাটে টাইপের গভীর ভাব ছিল। যখন ও চলে যাচ্ছিল আমি ওকে থামিয়ে বললাম “আমার আর কাউকে এখন ভালোবাসতে ইচ্ছে করে নারে। জীবনে মেয়েদের কাছ থেকে ছ্যাকা খেতে খেতে জীবনটার মাঝে আমি এখন কোন রঙ এর ছাপ পাই না। এই জীবনে ভালোবাসা বলতে কিছু নেই।

একদম সত্য কথা বিশ্বাস কর যাকেই আমার ভালো লেগেছে তার ছবিটা এই যে ভিতরটা আছে না ভিতরটা দেখতেছিস না সেখানে ওরে আঁকতাম। কিন্তু ওরা বিশ্বাস করতো না। মনে করতো আমি মজা করি, ফাজলামো করি, তারাও ফাজলামো করতো। আমার ভালোবাসাটা নিয়ে মশকরা করতো।একটা সময় দুরে সরে যেত। আমিও বাধা দিতাম না।কষ্ট লাগতো। কিন্তু আমি তো কাউরে কিছু বুঝতে দেই নাই।তারপর সবকিছু ভুলে গিয়ে নতুন করে ভালোবাসা খুঁজতাম। আমি নিজে নিজে ভাবতাম, বলতাম আমিও একদিন ভালোবাসতে পারবো।অন্য আর পাঁচটা মানুষ ভালোবাসতে পারলে আমি কেন পারবো না। কিন্তু আসলে কি জানোস আমি যাদের ভালোবাসতে চেয়েছি তাদের কোন দোষ নেই। তাদের কোন ভুল নেই। মুল কথা আমি মানুষটাই ভালোবাসতে পারি না। কিভাবে ভালোবাসা আর একটা মানুষের কাছে পেশ করতে হয় সেটাই আমি জানি না।

এই জিনিসটা আমার মাঝে নেই। যেই মানুষটার মাঝে ভালোবাসা নেই তাকে কি করে অন্য আর একটা মানুষ ভালোবাসবে বল তো?” তানহা আমার কথা শুনে অনেকক্ষন কেমন করে যেন তাকিয়ে ছিল।ওর চোখের কোনে আমি জল দেখেছিলাম।তারপর দু্ হাতে আমার টিশার্টটা মুঠোয় করে ধরে একটু জোরে বলেছিল “তুই ভালোবাসাটাই কি সেটা চিনিস না। ভালোবাসতে যাস কোন সাহসে? এতো সাহস কেন তোর? কে দিয়েছে তোকে এতো সাহস? আমি যে একটা মানুষ ভালোবাসা নিয়ে তোর দরজায় বার বার হাজির হয়েছি বুঝতে পারিসনি? সব কিছু খুলে বলতে হবে কেন? আমার ভালোবাসাটা বুঝোস না?” এটা বলেই আমার গালে একটা কষে থাপ্পড় মেরে চলে গিয়েছিল। আমি শুধু চুপ করে সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম।তখন কি চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া আমার আর কিছু করার ছিল?

দিন গুলোর কথা মনে পড়লেই আমার কাছে এখন কেমন যেন লাগে। জীবনটা শুকনো মাঠের মত মনে হয়।চারপাশে শুধু খা খা রোদ।এই রোদমাখা আলোয় আমি তেমন কোন ছন্দ খুজে পাই না।মা আর কখনো হারামজাদা বদমাইস বলে বকা দেয় না।বাবাও দেয় না।বাবা বকা দেওয়ার এই শক্তিটা আর নেই। উপরে যে একজন আছে সব কিছুর মালিক তিনি কবেই বাবাকে নিয়ে গেছেন। আজকাল বাবাকে অনেক মনে পড়ে।যখন মনে পড়ে তখন আমি মায়ের কাছে গিয়ে বসে থাকি।

আমার এই বসে থাকার কারণটা মা বুঝে আমি জানি। একদিন হাউমাউ করে কান্না করতে করতে বলে উঠি “এখন আমাকে কেউ হারামজাদা, বদমাইস বলে বকা দেয় না কেন? কেন দেয় না? আমার বাবাটা এতো তাড়াতাড়ি চলে গেলো কেন? ও মা? তোমার কি এই শক্তিটা ছিল না বাবাকে আটকে রাখার?” মা কিছু বলেনা। আমি আবার চিৎকার দিয়ে বলেছিলাম “ও মা কথা বলো।বাবাকে ছাড়া ভালো লাগে না। বাসাটা ফাকা ফাকা লাগে।” আমার মা তারপরও চুপ করেছিল আর আমার সাথে অনেক কেঁদেছিল।ছোট ভাইটাও পাশে এসে কান্না শুরু করে দিয়েছিল। আমি সেদিনই বুঝে গিয়েছিলাম আমার উপর এখন অনেক দায়িত্ব। আমার ভাইও বুঝে গেছে আমাদের মাথার উপর ছায়াটা সরে গেলে জীবনটা কেমন হয়ে যেতে পারে।

তানহার সাথে শেষ যেদিন আমার কথা হয়েছিল তারপর থেকেই ওর সাথে আমার আর যোগাযোগ নেই। মাঝখানে আমি কয়েকবার ফোন করেছিলাম। ও শুধু ভদ্রতার খাতিরে, এইতো ভালো আছি, তোর খবর কি, টুকটাক কথা বলে আমার কথার শুধু প্রত্যুত্তর দিয়েছিল। আমি বুঝতে পেরেছিলাম আমার প্রতি ওর অনেক অনেক অভিমান জমে গেছে।এটাও বুঝতে পেরেছিলাম ও আমার জীবনে কি ছিল। দুরত্ব মানুষকে অনেক কিছু বুঝিয়ে দেয়, শিখিয়ে দেয়। এই দুরত্বটা আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছিল আমি ওকে কতটা মিস করা শুরু করেছি, কতটা ভালোবাসতে শুরু করেছি।সত্যিকার ভালোবাসাটা আমি তখনই অনুভব করতে পেরেছিলাম। ভেবেছিলাম তাকে সামনা সামনি বলবো।

এক বর্ষন মুখর সন্ধ্যায় কিংবা রাতের জোৎস্না আলোয় হেমন্তের বাতাস হয়ে।আস্তে আস্তে সময় দিন অতিক্রম হতে লাগলো। কিন্তু আমার মনের অব্যক্ত কথা গুলো অনুভূতির দরজায় নিয়ে যেতে পারলাম কই? মাস্টার্স দেওয়ার একমাস পরই বাবা হার্ট অ্যাটাক করে মারা গেলেন। কি করবো বুঝতে পারছিলাম না। মাথা থেকে সব অনুভূতিরা কোথায় যেন হারিয়ে গেলো।মাথায় ভর করতে লাগলো দায়িত্ব। এই দায়িত্ব জিনিসটা একটা পুরুষকে কিভাবে তাড়া করে বেড়ায় আমি একটু একটু করে বুঝতে পেরেছিলাম। বাবার জন্য কাঁদতাম। বাবারা হলো একটা পরিবারের বটবৃক্ষ। একটা গাছ। কয়েকটা মানুষের জীবন। কয়েকটা মানুষের অক্সিজেন। কয়েকটা মানুষের ছায়া। সেই মানুষটা হারিয়ে গেলে কতটা ক্ষতি হয়ে যায় চারপাশের মানুষের।আমি নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।এই ব্যস্ততার মাঝে একটা বছর কেমন করে কেটে গিয়েছিল কিছুই বুঝতে পারিনি। নিজেকে, নিজের পরিবারের শক্তি হিসেবে গড়ে তুললাম। তারপরই আমার জীবনে একটা ব্যতিক্রম ঘটনা ঘটলো।যেটার জন্য আমি কখনো আশা করিনি।

অফিস শেষে রাস্তার ফুটপাথে আমি হাটতে থাকি। কাধের ব্যাগটা ঠিক করতেই আামার ফোনটা বেজে ওঠে। পকেট থেকে ফোনটা নিয়েই আমি অনেকক্ষন ফোনটার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। তারপর রিসিভ করতেই বলতে লাগলো “যা যা বলে দিয়েছিলাম মনে আছে তো? আজকাল তো তোমার কিছুই মনে থাকে না। মায়ের ডায়াবেটিসের ঔষধ আনতে হবে। আর আবরারের জন্য কিছু চক পেন্সিল।” আমি শুধু “হুম মনে আছে” এটা বলেই ফোনটা রেখে দেই।সত্য বলতে কি আমি সব ভুলে গিয়েছিলাম। যে মানুষটা আমাকে ফোন করেছে সে আমার স্ত্রী।তানহা। আর আমার ছেলে হাসিন আবরার।ঐ যে বললাম জীবনে একটা ব্যতিক্রম ঘটনা ঘটে গেছে।বাবা মারা যাওয়ার এক বছর পর হঠাৎ করেই একদিন তানহা বাসায় হাজির। আমি অফিস থেকে সবে বাসায় ফিরেছিলাম। সে আমাকে দেখেই বললো “তুই জীবনে মানুষ হবি না।

এতো কিছু হয়ে গেলো আমাকে কিছুই জানাসনি।স্বার্থপর তুই একটা। আমি জানি তুই এরকমি থাকবি। তাই নিজের অধিকারটা নিজেই নিতে আসছি।আন্টির পাশে আমাকে থাকতে হবে, সংসারটাকে গুছাতে হবে।তোর ছোট ভাইটার একজন বড় বোন হিসেবে থাকতে হবে।তুই একা দায়িত্ব পালন করবি? দায়িত্ব আমিও পালন করতে পারি বুঝছিস? এই দায়িত্বটা আমাকে দিবি না?” আমি শুধু মায়ের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। সেদিন অনেক কেঁদেছিলাম। ওর বাসার সবাই আমাকে চিনতো। এই মেয়েটা আমাকে কি পরিমান ভালোবাসে আমি সেদিন স্পষ্ট দেখতে পেয়েছিলাম।এমন কোন কিছুরই আমি আশা করিনি। তারপরই কিভাবে বিয়েটা হয়ে গেলো। আর এতো গুলো বছর কেমন করে কেটে গেলো। আমি ফুটপাথে হাটতে লাগলাম আর ভাবতে লাগলাম আজকে আমিও একটা পরিবারে বটবৃক্ষ, একজন বাবা, একজন বড় ভাই, একজন স্ত্রীর স্বামী, একজন মায়ের সন্তান।এটাইতো জীবন।

পরিশিষ্ট মিতু, নেহার সাথে আদনানের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পরই আদনান যখন বললো “তোমার নাম নেহা?” নেহা মাথা নেড়ে বললো “ফারিহা ইসলাম নেহা।আমাকে তোমার পুরো নামটা বলেনি আম্মু তাই না? সে যাকগে আমি ছোট্ট একটা পরী, ছোট পরীদের ছোট নামেই ডাকা ভালো।আচ্ছা তুমি এমন করে তাকিয়ে আছো কেন? মাঝে মাঝে আম্মু এমন করে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে আর আকাশ পাতালের ছাইমার্কা কথা বলে।কিন্তু আমি শুনতে চাইতাম বাবার কথা। আম্মু মুখ গোমড়া করে রুমে গিয়ে কান্না করতো।

আচ্ছা মানুষ কাঁদে কেন? মন খারাপ হলে? তুমি কাঁদতে পারো?” আদনান নেহার কথা শুনে বেশ অবাক হয়ে মিতুর দিকে তাকায়। মিতু নেহার ব্যাপারে যা বলেছে তা সত্য। আদনান ভাবে তার মেয়েটা কি অদ্ভুত ভাবে কথা বলে। আদনান বললো “আমার জীবনটা কেমন যেন।এই জীবনটায় আমি না পারি হাসতে আর না পারি কাঁদতে। তুমি অনেক মিষ্টি করে কথা বলো তো।” নেহা তার বাবা আর মাযের দিকে তাকায়।মিতু চুপচাপ দাঁড়িয়ে বাবা মেয়ের কথা শুনছে। আর এমন কথা শুনে ভিতরে ভিতরে কেপে উঠছে।নেহা সুন্দর করে একটা হাসি দিয়ে বললো “আমি সুন্দর করেও হাসতে পারি।আজকের এই দিনটা আমি আম্মুর কাছ থেকে চেয়ে নিয়েছি।আম্মু,আমি এখন বাবার সাথে কিছুক্ষন থাকতে পারি?” মিতু শুধু মাথা দিয়ে হ্যাঁ সূচক ইশারা দিল।

মিতুর সাথে আদনানের বিয়ে হওয়ার পরবর্তী জীবনটা কয়েক মাসের জন্য রঙ্গিন স্বপ্নের মত মনে হলেও একটা সময় মিতু এই জীবনটাকে অন্য রকম ভাবতে লাগলো। বুঝতে পারলো বিয়ের আগের আদনান আর বিয়ের পর আদনান দুটোই আলাদা। বিয়ের আগের আদনান গভীর, কাব্যিক, হলেও বিয়ের পরের আদনান পুরোটাই ভিন্নরকম। আগের মত ভালোবাসার কথা, জোৎস্নাবিলাসীর কথা, শরতের কাশফুলের কথা দিয়ে গল্প সাঁজায় না। যে গল্পে অসীম ভালোবাসার বৃষ্টি ঝড়ে।

মিতু বিরক্ত হয়ে গিয়েছিল জীবনটার প্রতি।পূর্বের মিতু আর বিয়ে পরের মিতুর জীবন আকাশ পাতাল তফাৎ। আদনান ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল সংসারটাকে কিভাবে চালাতে হবে। সত্যিই মিতু এই জীবনটার প্রতি অনেক ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিল। নেহা তখন মিতুর মাঝে একটু একটু করে বড় হচ্ছিল।এই ব্যাপারটা মিতু বুঝতে পারেনি।যখনি আদনানকে ছেড়ে চলে গেলো তার দশ কি পনেরো দিন পর মিতু বুঝতে পারলো তার মাঝে কেউ একজন আসছে।চলে যাওয়ার পূর্বে আদনান একটা বারের জন্যও মিতুকে আটকায়নি।আদনান মনে করে জীবনটা যার যার মতো।এই জীবনে কাউকে জোর করে ধরে রাখা যায় না।তবে চলে যাওয়ার সময় একবার বলেছিল “আকাশটার রং পালটায় জানি যখন পুরো আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয়ে যায়। আজ স্ব চোক্ষে দেখলাম ভালোবাসাটাও কিভাবে বদলে যায়।”

নেহা তার বাবার হাত ধরে যখন হাটতে লাগলো নেহা বুঝতে পারলো তার বাবা কাঁদছে। নেহা বললো “তোমার চোখে পানি কেন?” আদনান এই কথার প্রত্যুত্তর না দিয়ে বললো “তুমি কিছু খাবে? আইসক্রিম বা চকলেট কিনে দেই?” নেহাও তার বাবার কথার প্রত্যুত্তর না দিয়ে কিছুক্ষন সময় নিয়ে বললো “তুমি চাইলে আমাকে কোলে নিতে পারো। আবার আমার কপালে চুমুও খেতে পারো।” আদনান কোলে নিতেই নেহা তার বাবার চোখের পানি মুছে দিয়ে বললো “আর কাঁদবে না ঠিকাছে।” আদনান কি বলবে বুঝতে পারে না।শুধু বুঝতে পারলো তার মেয়েটা কেন কোলে উঠার কথা বললো। আদনান কিছু না বলেই এবার হাউমাউ করে কান্না করে দিয়েই তার মেয়ের কপালে চুমু খেয়ে বলে “আমার জীবনের সব আলপনা গুলো হারিয়ে গেছেরে মা।আজ এতো বছর পর এই আলপনা গুলো নড়ে উঠলো।জীবনে ধাক্কা খেতে খেতে আজকে আমি এখানে।

বিশ্বাস কর মা আমার এই জীবনের দুঃখের মাঝে যা ভালোবাসা পেয়েছি তা স্বল্প সময়ের জন্য।এই যে দেখ তোকে জড়িয়ে ধরে যে ভালোবাসাটা অনুভব করছি তা একটু পরই আবার হারিয়ে ফেলবো।ভাবতে অনেক কষ্ট লাগে কেন মানুষ গুলো আমার কাছ থেকে হারিয়ে যায়।” নেহা আদনানের চোখের পানি আবার মুছতে মুছতে বললো “হারিয়ে যায় না বাবা। তুমি হারিয়ে দিতে চেয়েছো বলেই হারিয়ে গেছে।” আদনানের ভিতরটা ধক করে উঠে নেহার এমন কথা শুনে। আদনান বললো “এই টুকু বয়সে এমন করে কিভাবে বলতে পারিস মা?” নেহা কিছু বলে না।শুধু আদনানের দুগালে দুটো চুমু দিয়ে বললো “তুমি অনেক ভালো।আম্মুও তাই বলে।তোমাকে যেমন মিস করতাম।আজকের পর তার থেকে বেশি মিস করবো।”

ঘন্টা খানেক নেহার সাথে সময় কাটানোর পরেই নেহাকে মিতুর কাছে ফিরিয়ে দিতেই মিতু নেহাকে গাড়িতে উঠতে বলে। তারপর আদনানকে ইতস্তত করে বললো “আমরা মানুষেরাই ভালোবাসাটাকে আঁকি আবার এটাকে বিচ্ছিরি করে ফেলি।আমার প্রতি তোমার অনেক অভিযোগ থাকতে পারে।সব কিছুর দোষ আমার। তোমারও দোষ ছিল। আমাকে বাধা দিতে পারতে।কিন্তু তুমি একটুও চেষ্টা করোনি। আমিও মনে করেছিলাম এ জীবনটা তুমিও চাচ্ছো না।চাইলে ঠিকি বাধা দিতে। আমাকে বুঝাতে।

মেয়ে তোমার সাথে যোগাযোগ করতে চাইলে আমি কখনো আটকাবো না। নেহা যেমন আমার মেয়ে তোমারও মেয়ে। ভালো থেকো।” আদনান কোন কথাই বললো না। শুধু ভাবলো আসলে ঠিক ও চাইলে বাধা দিতে পারতো।গাড়িটা স্টার্ট দেয়।নেহা আয়নার গ্লাস নামিয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে থাকে। আদনানও তার মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারচোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ে। সে পানি আদনান মুছার চেষ্টা করে না।আজ তার আর দোকানে বসার ইচ্ছে নেই। খালু মারা যাবার পর আদনানই ব্যবসাটা দেখে আসছে। গাড়িটা আস্তে আস্তে অনেক দুর চলে যায়। আদনান আকাশটার দিকে তাকায়। পুরো আকাশ জুড়ে একটা উদাসীনতা ভাব।এই আকাশটার মত আদনানের মনেও উদাসীনতা ছেয়ে গেছে আর চোখ দিয়ে সমস্ত উদাসীনতা ঝড়ে পড়ছে…

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত