বেড়াজাল

বেড়াজাল

আইরিন ভাবীর সাথে আমার বেশ ভাব জমেছে বলা যেতে পারে। স্বামী থাকা স্বত্তেও মেয়েটা কেন যেন আমার সাথে কত আহ্লাদ, ঢং নিয়ে কথা বলে। উৎসব বা আনন্দের আভা কখনো আমার চারপাশে বিরাজ করেনি। কেন যেন আমার দেহে প্রফুল্লতার ভাব টা কাজ করে না। আমি যে বাড়িটাতে কিছু দিন যাবৎ থাকি সেটা দুতলা। আইরিন ভাবীর বিয়ে হয়েছে পাচঁ মাস। তার স্বামী আফজাল ভাই। আফজাল ভাইয়ের বয়স আনুমানিক পয়তাল্লিশ এর কাছে হবে। সেই হিসেবে আইরিন ভাবীর বয়সের সাথে আফজাল ভাইয়ের বয়স অনেক তফাৎ। আইরিন ভাবীর বয়স বিশ। আমার থেকে চার বছরের ছোট। তারপরো ভাবী বলেই ডাকি।

এই শহরের অলি গলি, বাতাসের সাথে আমি পরিচিত না। পরিচিত না এই শহরের আকাশে উড়ে যাওয়া কা কা করা শব্দের কাক গুলোর সাথে। পরিচিত না এই শহরের মানুষের সাথে। আমি অনুধাবন করি এই শহরের মানুষ গুলো কি আমার মতো গভীর অন্ধকারে সময়ের জন্য অপেক্ষা করে? কিছুদিন ধরে আকাশের মন ভালো নেই। হঠাত্ হঠাত্ করে কান্না করে। এই মাত্র আবার কান্না শুরু করে দিল। আমি জানালা ধরে দাঁড়িয়ে আছি। একটু পরেই দেখলাম আইরিন ভাবী ছাদে উঠে এলো। উঠে দৌড়ে আমার রুমে এসে হাপাতে লাগলো। খোপা করা চুল গুলা ছেড়ে দিয়ে হাত দিয়ে ঝাকুনি দিল। আমি বললাম”বৃষ্টির মধ্যে আসতে গেলেন কেন আবার?

উনি একটু চুপ করে রইলো। তার চুপ থাকার কারণ আমার বুঝার বাহিরে। তারপর ইতস্তত করে বললো “আপনার সাথে বৃষ্টি দেখবো বলে আসছি।” আমি কিছু বললাম না। উনার আচরণ গুলা আমি কেন যেন খুব প্রশ্রয় দিচ্ছি। আমি এটাও জানি এইসবের কোন কিছুই উচিৎ না। আইরিন ভাবী তার খোলা চুল কাধের সামনে এনে আমাকে বলে ”ভিজবেন?” আমি মাথা দিয়ে না সূচক ইশারা দেই। উনি হাসতে লাগলো। তারপর বললো “ভয় পেয়েছেন বুঝি? ভাবছেন কেউ দেখলে নানান কথা বলবে তাই তো?” এইটা বলেই হাসতে লাগলো। এই কথার উওরে আমি কিছু বললাম না। উনি দরজার কাছে গিয়ে দরজার এক পাশে হেলান দিয়ে বৃষ্টির ফোটা হাত দিয়ে স্পর্শ করছে। আর গুন গুন করছে তুমি মোর আনন্দ হয়ে  ছিলে আমার খেলায় আনন্দে তাই ভুলে ছিলেম কেটেছে দিন হেলায় গোপন রহি গভীর প্রানে আমার দুঃখ সুখের গানে সুর দিয়েছো তুমি , আমি তোমার গান তো গাই নি আমি চুপ করে শুনতে লাগলাম।

উনি আমার দিকে তাকিয়ে বলে “আপনি জানেন কেন আপনার সাথে আমার কথা বলতে ভালো লাগে?” আমি না সূচক ইশারা দেই। এদিকে বৃষ্টিটা আস্তে আস্তে কমতে থাকে। তার কান্না মনে হয় আপাতত থেমেছে। আবার কখন শুরু করবে কে জানে। আইরিন ভাবী বললো আমি একজনকে খুব চাইতাম জানেন। লোকটা খুব সাধা সিদে ছিল। তাকে আকার ইঙ্গিতে মাঝে মাঝে বুঝানোর চেষ্টা করতাম যে, আপনাকে আমার ভালো লাগে। কিন্তু আমি কখনো তাকে আমার ভালো লাগার কথা বলিনি। আমার যে তাকে ভালো লাগতো সে কখনো বুঝতেই চেষ্টা করেনি। ভালো লাগার মানুষটাকে বলতে হয় যে আপনাকে আমার ভালো লাগে। না বলা অব্যক্ত কথা গুলো যদি প্রকাশ না করা হয়, দেখা যায় কোন এক সময় সে হারিয়ে যায়। আমার সে ভালো লাগা মানুষটা আপনার মত দেখতে। খুব মিল আপনার সাথে। জানেন আমি খুব চেষ্ট করি আপনার সাথে কথা বলবো না, আপনার সামনে আসবো না কিন্তু এই বেহায়ইয়া মন বুঝে না। আচ্ছা যাই হোক বৃষ্টি কমছে আমি যাই কেমন।”

চট্টগ্রাম এসেছি আমি সবে মাত্র দশ দিন। আফজাল ভাইয়ের একটা ঔষধের ফার্মেসির দোকান আছে। এই ফার্মেসীর দোকানেই আফজাল ভাইয়ের সাথে আমার পরিচয় হয়। যেদিন আমি চট্টগ্রাম আসি সেদিনই মনে হয়ছিল আমার মাথার উপর যে আকাশ টা আছে সেটা উলোট পালোট হয়ে গেছে। রাস্তা পার হতেই সিএনজির সাথে ধাক্কা খেয়ে লুটিয়ে পড়ে যখন কপাল কেটে ফেলি তখন সিএনজির ড্রাইভার মতিন ভাই আমাকে আফজাল ভাইয়ের দোকানে নিয়ে আসে। এতে সিএনজির ড্রাইভারে কোন দোষ ছিল না। সব কিছু করার পর তিনটা সেলাই দিতে দিতেই আফজাল ভাই বলে” মানুষ যে কেন দেখে শুনে চলে না। অবশ্য কার কপালে কি লিখা ছিল কে জানে। আমি কিছু বলিনি। অবশ্য এখানে কি বলার উচিৎ ছিল আমার অচেতন চিন্তায় কোন বাক্যই আসেনি। আমার পাঞ্জাবীটা ছিড়ে গিয়েছিল। তিন বছর আগে আমার ছোট বোন ‘‘বিনি” সাদা পাঞ্জাবীটা দিয়েছিল। গত তিন বছর ধরে এই পাঞ্জাবীটা দিয়েই ঈদ কাটিয়েছিলাম। আমার হাতের বগলের নিচ থেকে অনেকটা ছিড়ে গেছে। আমার চুপ থাকা দেখে আফজাল ভাই বলেছিল”কোথায় থাকেন?

আমি উনার দিকে তাকিয়ে বলি আপনাদের শহরে আমি নতুন। পাঞ্জাবীর পকেট থেকে কাগজের টুকরায় লিখা ঠিকানাটা দেখিয়ে বললাম “এই ঠিকানায় আসছিলাম। আমজাদ সাহেবের কাছে। আমজাদ সাহেবের সাথে আমাদের গ্রামে পরিচয় হয়। চট্টগ্রাম কাষ্টমে চাকরি করে। আমাকে চাকরি দিবে বলে পচিঁশ হাজার টাকা নিয়েছিল। আমাকে চট্টগ্রাম আসতে বলে। কিন্তু এসে এই ঠিকানায় গেলে তার অস্থিত্বের কোন গন্ধও পাইনি আমি। সিএনজির ড্রাইভার মতিন ভাই একটা জোড়ে দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলেছিল “ও এইবার বুঝছি একটা ভন্ডের পাল্লায় পরছেন। এই জন্য তো বলি উদাস হয়ে হাটতাছিলেন ক্যান। আর আইসা পরলেন আমার সিএনজির সামনে।” এইটা বলে উনি আফজাল ভাইকে আমার ড্রেসিং বিল ও ঔষধের টাকা দিয়ে চলে যায়। আমি কাধের ব্যাগটা ঠিক করতে করতে যেই উঠলাম আফজাল ভাই বলে”এখন কোথায় যাবেন? গ্রামে চলে যাবেন?

আমি মাথা নেড়ে বলি জানি না ভাই। উনি আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। এই শহরের আলো আধারের রুপ কেমন আমার মস্তিস্ক কে ভাবায়। আমাকে ভাবায় এই শহরের মানুষ গুলো কি আমজাদ সাহেবের মতো ঠকবাজ? এইসব ভাবতে ভাবতেই ফার্মেসীর দোকান থেকে বের হতেই আফজাল ভাই বলে আমার সাথে চলেন। ভাই বলে ডাকছেন,এই ভাই থাকতে চিন্তার কোন কারণ নাই। তারপর উনার বাসায় আসি। দরজার ঠকঠক আওয়াজে এক যুবতী মেয়ে দরজা খুলে। মাথায় কাপড় ছিল না। আমাকে দেখে মাথায় কাপড় দিয়ে আফজাল ভাই কে বলে “আজকে এতো তাড়াতাড়ি এলেন যে? দুপুরের খাবার তো এখনো হয় নাই। আফজাল ভাই ভিতরে গিয়ে বলে আমাদের উপরের যে রুম টা আছে ওটাতে কেউ থাকে না।

আজ থেকে উনি থাকবে। তোমার কি অসুবিধা হবে?” আমি বাহিরে দাড়িয়ে ছিলাম। আইরিন ভাবী বলছিল চেনা নাই জানা নেই বাড়ির ভিতরে একজন লোককে ভাড়া দিবেন? আমার এইসব পছন্দ না।” আফজাল ভাই বলেছিল “ছেলেটা অসহায়। গ্রাম থেকে আসছে। একটা বিপদে পরছে। ভাড়া দিচ্ছি না। তারপর কি মনে করে যেন আমাকে ভিতরে ডাক দেয় আইরিন ভাবী তারপর আমার দিকে অনেকক্ষন তাকিয়ে থাকে নিষ্পলক ভাবে। বললো “কি নাম আপনার?” আমি বললাম জ্বি আমার নাম জাহেদ। এরপর আর কিছু বলেনি। আমাকে এক তলা বাড়ির ছাদে নিয়ে যায়। রুমটা বেশ অপরিষ্কার ছিল। দেখে বুঝা গিয়েছিল কেউ অনেক দিন ধরে থাকে না। আইরিন ভাবী সব কিছু পরিষ্কার করে নতুন একটা বিছানার চাদর আর বালিশ দিয়ে যায়। এভাবেই আমি আফজাল ভাইয়ের বাসায় উঠি।

আমজাদ সাহেবের মত এই শহরের মানুষ গুলোকে যেমন ঠকবাজ মনে হতো তেমনি মনো হতো এই শহরের মানুষ গুলো কি আফজাল ভাই এর মতো ভালো? এদিকে আমি প্রতিনিয়ত সেই আমজাদ সাহেবকে খুঁজি। এই শহর অনেকটা বড়। সেই হিসেবে আমি অনেক ক্ষুদ্র। তবুও এই বিশাল শহরে আমজাদ সাহেবকে খুঁজতে আমার মন একটুও কার্পন্য বোধ করে নি। আফজাল ভাই এর বাসায় থাকাকালীন দুই দিন অতিক্রম হওয়া পর্যন্ত আইরিন ভাবী আমার সাথে কথা বলতো না। কাপড় শুকাতেও একতলা ছাদে আসতো না। বাড়ির আঙ্গিনায় কাপড় শুকাতো। এক তলা ছাদের উপর আমাকে যে রুমটা দেওয়া হয় তার উপরে টিনের চাল। এমনি খাওয়া দাওয়ার সময় উনার স্বাক্ষাত পেতাম। ঠিক দুদিন বাদে সকালের নাগাত আইরীন ভাবী দরজায় টোকা আর কাশি দিয়ে ভিতরে ঢুকে। দরজাটা খোলাই ছিল। আমি উনাকে দেখে একটু স্বাভাবিক হয়ে বসে বললাম “কেমন আছেন ভাবী? উনি কিছুক্ষন চুপ করে থেকে ভালো আছি বলে শব্দ উচ্চারন করলো।

আমি আর কি বলবো ভেবে পাইনি। তারপর উনি বললো “আপনি এতো বোকা কেন?” উনি কেন বোকা বলেছে আমার অজানা। তবে আমি অনুমান করেছি চাকরির জন্য কাউকে টাকা দিয়েছি বলে হয়তো বোকা বলেছে। আমি বললাম মানুষের মনে কি আছে বলতে পারবেন? এই যে আমার মনে কি আছে বলতে পারবেন? মানুষ মানুষকে বিশ্বাস করে। বিশ্বাস মানুষকে আশা দেখায়। আমিও বিশ্বাস করে টাকা দিয়েছিলাম। আর আশা করেছিলাম সদ্য অনার্স পাশ করা এই ছেলেটা একটা চাকরি করবে। প্রথম বেতন পেয়ে আম্মার জন্য একটা শাল আর আমার ছোট বোনের জন্য একটা শাড়ি কিনবো। কিন্তু দেখুন কিছুই হয় নি। আম্মাকে কি বলবো ছোট বোনকে কি বলবো আমি জানি না। উনারা আমার বর্তমানে এই হালের অবস্হা কেউ জানে না। এসেই আম্মাকে একটা চিঠি দিতে বলেছে অথচ দেইনি। কি লিখবো বলুন তো? আমি কি মিথ্যে শান্তনা দিব? এই যে আপনারা আমাকে বিশ্বাস করে থাকতে দিলেন আমার কথা গুলা তো একটা বানানো গল্পও হতে পারে।

দেখা গেল আমি আপনাদের মেরে সব কিছু নিয়ে পালিয়েছি। ঠিক তখন আপনাদেরকে মানুষ বলবে আপনারা এতো বোকা কেন? ঠিক যেমন আমাকে এখন বললেন।” আইরিন ভাবী আমার কথা শুনে দ্রুত চলে যায়। আফজাল ভাই অনেকটা সাদা সিধে মানুষ। মানুষটার মনে কোন অহংকার, রাগী ভাব, সন্দেহ কিছু নেই। এর পরের দিন রুম থেকে যখন নিচে নামলাম তখন আইরীন ভাবী আমার সামনে পরে। উনি একটু চুপ করে থেকে বললো “আসলেই কি আপনি আমাদেরকে মেরে সব কিছু নিয়ে চলে যাবেন? আমি এটা নিয়ে অনেক ভেবেছি। রাতেও তেমন ঘুমাই নি। আমার স্বামিকে ভেবেছিলাম বলবো কিন্তু বলি নি। কারন আপনাকে দেখে আমার এমন মনে হয় না আপনি এমন কাজ করতে পারবেন।” উনার কথা শুনে আমি ইতস্তত হয়ে বলেছিলাম রক্তিম বিষাদ চোখে কতটুকু আস্হা, রোদের পরবর্তী ছায়ার মাঝে সময়ের দীর্ঘ পূর্নতা।

পূর্ণ আস্হায় স্বস্হি ফেলুন, আমি শান্ত,  আধাঁরের কালো রুপ নই, অগ্নি নই যে পুড়িয়ে যাবো। আমি জল, শান্ত জল যার স্রোত বয়ে যায় উনি শুধু চুপ করে করে তাকিয়েছিল। বিকেলের দিকে আইরীন ভাবী আমার রুমে আসে। এসেই আমাকে বলে “আপনি এতো কঠিন করে কথা বলেন কেন হ্যাঁ? আমি চুপ করে আইরিন ভাবীর দিকে তাকিয়ে আছি। তারপর বাহিরে বের হয়ে আসি। এক তলার ছাদের রেলিং নেই। আমি ছাদের মাঝখানে বা আমার রুমের সামনে আসি। আইরিন ভাবী বললো ”কথা বলেন না কেন?” আমি তারপরো চুপ করে রইলাম। আকাশের দিকে তাকালাম। নীল আকাশে কাক উড়ে বেড়াচ্ছে।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উনার দিকে তাকালাম। আমি কিছু বলতে যাবো ঠিক তখনি উনি বলে উঠলো “কি ব্যাপার একটু কথা বলতে আসলাম। বাসায় তেমন আপনার ভাই থাকে না। সকালে রান্না বান্না করে আমার তেমন কিছুই করার থাকে না। একটা মানুষের সাথে যে দুটো ভালো মন্দ কথা বলবো সেটাও হয় না। টেলিভিশন দেখি, শুয়ে থাকি। এইসব যেন আমার কাছে কেমন মনে হয়। ভাবলাম আপনার সাথে দু চারটে কথা বলা যাবে। আচ্ছা থাক আমি যাই।” তারপর আমি ভাবীকে ডাক দেই। সেদিন অনেক কথা বলেছিলাম আইরিন ভাবীকে। আমাদের গ্রামের কথা বলেছিলাম, দীর্ঘ চলে যাওয়া বহমান নদীর কথা বলেছিলাম, যে নদীতে শৈশবে আমি গোশল করতাম। মানুষের আম গাছের আম চুরি করতাম। উনিও গালে হাত দিয়ে চুপটি করে শুনেছিল। এতো ভাব জমে যাবে আমি বুঝি নি।

বৃষ্টি টা কমে গেছে তার কান্নার শব্দ বন্ধ হয়েছে। আইরিন ভাবী আস্তে আস্তে হেটে নিচে চলে যায়। দশ দিন হয়ে গেল আম্মাকে এখনো জানাই নি আমি কেমন আছি। এই শহরের আলো বাতাস, আমাকে স্বস্হি দেয় না। বড় বড় দালানের দিকে যখন তাকাই আমার মাথাটা কেমন যেন ঘুরতে থাকে। মনে হয় আমি ঠিক নেই। যেমনটা আমার বাবার কথা মনে পরলে আমার মাথাটা কেমন যেন হয়ে যায়।

আমি তখন ক্লাস সিক্সে পড়ি। শরীরে তখন তাজা রক্ত বহমান নদীর মত বয়ে চলছে। স্কুলে গেলে আমার মন পড়ে থাকতো বিনির কাছে। তখন ওর বয়স চার বছর। কখন ওকে নিয়ে বিলের কাছে যাবো। বড়সি ফেলে আমি মাছ ধরবো আর বিনি দাড়িঁয়ে থাকবে। সবুজ ধান ক্ষেতের মাঝখানে পায়ের চিহ্ন বসিয়ে ওরে কাধে নিয়ে হাটবো। আমার মনে অস্হিরতার আভা লেগে থাকতো। একদিন স্কুল থেকে এসে দেখি বাসায় নতুন অথিতি। আম্মা বিনিকে কোলে নিয়ে উঠানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কান্না করছিল। আম্মা আমাকে দেখে কাছে টেনে জড়িয়ে ধরে আরো জোরে কান্না করতে থাকে। আমি কিছুই বুঝতে পারিনি। আমি বার বার বলছিলাম কি হইছে মা? কানতাছো ক্যান? আব্বা তোমারে আবার মারছে? আম্মা কিছু বলে নি।

আমি আম্মার কাছ থেকে ছাড়িয়ে বাড়ির ভিতরে গিয়ে স্কুল ব্যাগটা রেখে সেই নতুন অথিতির দিকে তাকিয়ে থাকি। আব্বা জোরে জোরে বলতে থাকলো “আমার ভাত খাওয়ার ইচ্ছা হইলে থাক না হলে তোর বাপের বাড়ি যা। তোর পোলা মাইয়ার খরচ পাঠাইয়া দিমু। আর আমার ভাত খাইলে পাশের রুমে আইজ থেইকা থাকবি।” আমি আব্বারে বলি ”এই মহিলা কে?” উনি আমাকে একটা থাপ্পড় মেরে বলে মহিলা কিরে হারামজাদা? আইজ থেইকা ছোট আম্মা ডাকবি। ডাক ছোট আম্মা।” আমি চুপ করেছিলাম। আমার শরীরে বহমান সেই রক্তের প্রবাহ টগবগ টগবগ করে বাড়তে থাকে। আমি আমার ছোট মার কাছে গিয়ে বললাম “এইটা আমার মায়ের ঘর। আপনি এইখান থেইকা যান। ক্যান আমার মায়ের ঘরে আইছেন?

আব্বা আমাকে মারতে মারতে ঘর থেকে বাহির করে। আম্মা দৌড়ে এসে আমাকে ধরে বলে “খবরদার আমার ছেলেরে মারবেন না। খুব খারাপ হইয়া যাইবো। বিনি ভয়ে কান্না করতে থাকে। আব্বা মায়ের চুল গুলা ধরে বলে ”মা* কি করবি আমারে? দেমাগ বাইড়া গেছে?” আমার শরীরের রক্ত জ্বলে উঠে। কি করবো আর না করবো ভেবে না পেয়ে ঘর থেকে বটি এনে কুত্তার বাচ্চা বলে পায়ে তিনটা কোপ দেই। আমার তখন ইচ্ছা করছিল কলিজা টান দিয়ে নিয়ে ফেলি।

গ্রামের শালিসী হওয়ার পর আম্মা আমাকে আর বিনিকে নিয়ে নানুর বাড়ির চলে আসে। এরপর বাকি শৈশবটা নানার বাড়ির ঝড়, তুফান, আলো, বাতাসেই কেটে যায়। কেটে যায় আমার শৈশবের দুরন্তপনার বয়স টা। স্কুল জীবনের অধ্যায়টা অতিক্রম করে কলেজে ভর্তি হওয়ার কিছু দিনের মাথায় আফিয়ার সাথে পরিচয় হয়। জীবনের প্রফুল্লতার সন্ধ্যান তখনো আমার হাতের মুঠোয় আসেনি। কাঠফাটা রোদের আলোটা যখন আফিয়ার মুখমন্ডলে পরে আমি উদ্ভেগপূর্ণ হয়ে খুব তাকিয়ে থাকি। তার পায়ের নুপুরের ঝনঝন শব্দ আমার হৃদয়টাকেও নাড়া দেয়। এরপর আমার জীবনের সূচিপত্র ক্রমান্বয়ে বদলাতে থাকে। সূচিপত্রের প্রতিটা চ্যাপ্টারের নাম মনে হতো আফিয়া। নির্দিষ্ট বয়সে প্রতিটা মানবের মনে কোন ভালো লাগার ছোয়া স্পর্শ পায় যার ব্যাতিক্রম আমারো হই নি। অধ্যক্ষ জাফর স্যারের ছোট মেয়ে আফিয়া।

স্যারের মেয়ে বলে আমি কখনো তার সাথে কথা বলতাম না। আমার মনও খুব চাইতো তার সাথে কথা বলতে। না বলা বাক্য গুলো আমাকে নিশ্তব্য রাতে শান্তিতে ঘুমাতে দিত না। একটা ছটফটের ছায়া তাড়া করে বেড়াতো কেন তার সাথে আমি কথা বলতে এতো দ্বিধাবোধ করি? কিসের এতো ভয়? কিন্তু এই দ্বিধাবোধ আর ভয়টা আমাকে বেশিদিন গ্রাস করতে পারে নি। এর কয়েকদিন পরেই আমি আফিয়ার সন্নিকটে গিয়ে ইতস্তত হয়ে বললাম “তোমার সাথে কি একটু কথা বলা যাবে? ও আশ্চর্য টাইপের ভাব ধরে আমার দিকে তাকিয়েছিল। তারপর মাথা নেড়ে ইশারা দিয়ে বুঝালো হ্যাঁ বলো কি বলবা? আমি একটু চুপ করে থেকে বললাম “আমি জানি না কতটুকু বিশ্বাস করবে। বেশ কিছুদিন ধরে তোমার সাথে কথা বলবো বলবো বলে কথা বলি না। কারন তুমি জাফর স্যারে মেয়ে। কিন্তু তোমার সাথে কি নিয়ে কথা বলবো তাও জানি না। এই সব চিন্তা ভাবনা আমার মাঝে অস্হিরতার কাজ করে।

আমি ছটফট করতে থাকি। কেন করি তাও জানি না। আমার শুধু এইটুকুই মনে হচ্ছে তোমার সাথে একটু কথা বললে স্বস্হি লাগবে তাই কথা বলতে আসছি। বিশ্বাস করো তোমার সাথে আমি প্রতিদিন কথা বলতে চাই না। যখন অস্হিরতার মাত্রাটা মাত্রাতিরিক্ত ছাড়িয়ে যাবে তখন একটু কথা বলতে আসবো আর কিছু না।” আমার কথা শুনে আফিয়া কি বলবে হয়তো বুঝতে পারেনি বা আশা করেনি। ওর চুপ থাকা দেখে আমি আবার বলেছিলাম এই যে এখন কথা বলেছি এখন একটু ভালো লাগছে আমি যাই কেমন। এইটা বলেই আমি চলে যাই। এরপর দিনই ও নিজে আমার সাথে কথা বলতে আসে। আমাকে বলে “আমার সাথে কথা না বললে তোমার অস্হিরতা কেন লাগে? এই কথার কোন উত্তর দেই না আমি। আমাকে আবার জিজ্ঞেস করলে আমি বলি… তা তো জানি না। তবে তোমার সাথে কথা বিনিময় করতে খুব ইচ্ছা হয়। সে আমাকে বলে তাহলে কথা বলো না কেন?

সেদিনের পর থেকে ওর সাথে আমার প্রতিদিন কথা হয়। নানান জায়গায় ঘুরতে যাই। ধান ক্ষেতের মাঝখানে হাটি। বাশের সাকো পার হই। বয়ে যাওয়া শান্ত নদীতে পা ডুবিয়ে থাকি। কখন যে এতোবছর কাটিয়ে দিলাম তা বুঝে উঠতে পারি না। দুজনে এক সাথেই অনার্সটা কমপ্লিট করি। ওকে আমার ভালো লাগে। আর আমিও জানি আফিয়ার কাছে আমিও ভালো লাগার পাত্র। কিন্তু আমরা কেউ কাউকে বলি নি। চট্টগ্রাম আসার আগে ও আমায় বলেছিল “তুমি আমার সাথে কথা না বলে থাকতে পারবা?

আমি চুপ করেছিলাম। তার চোখে মুখে মন খারাপের আভা ফুটে উঠেছিল। মনে হচ্ছিল আকাশের কালো মেঘের ছায়া তাকে ভর করেছে। ঐদিনই ও আমাকে খুব জড়িয়ে ধরেছিল। এর আগে কখনো ও আমাকে জড়িয়ে ধরে নি। আইরিন ভাবীর কথাটা মনে পড়লো ভালো লাগার কথা প্রিয় মানুষটাকে বলতে হয়। না হয় কোন এক সময় নদীর স্রোতে ভেসে চলে যায় আর তলিয়ে যায় গভীর তলদেশে।

এগারোটা দিন কেটে যায় আমি আমজাদ সাহেব কে খুঁজে পাই না। ভোরের আলো ছড়িয়ে যেতেই বাহিরে বের হয়ে যাই। এই শহরের বদ্ধ ঘরে থাকতে থাকতে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। আমার শহরে সবুজে ঘেরা পরিবেশে প্রান ভরে নিশ্বাস নিলে মনে কত শান্তি ছড়িয়ে যায় কিন্তু এই শহরে নিশ্বাস আমাকে তৃপ্তি দেয় না। বাহিরের আলো বাতাস শরীরে লাগিয়ে যেই বাড়ির ভিতরে ঢুকলাম আফজাল ভাই আমাকে দেখে বলে “কোথায় গেছিলেন? আপনার ভাবী আপনাকে খুঁজতে খুঁজতে শেষ। নাস্তা সেই কখন তৈরি করে রেখেছে।

“একটু হাটতে গিয়েছিলাম। আইরিন ভাবী ভিতর থেকে এসে একটু চুপ করে থেকে বললো ”বাহিরে গেছেন বলে গেলে কি হতো?” আমি একটু ইতস্তত করে বললাম আপনারা ঘুমোচ্ছিলেন তাই আর জাগাতে ইচ্ছা করেনি। আফজাল ভাই বলে “তো সেই ভন্ড মিয়ারে পাইলেন?” আমি না সূচক ইশারা দিয়ে বুঝাই পাই নি। তারপর বলি আমি আগামীকাল চলে যাবো। আফজাল ভাই বলে রাতে কথা হবে এখন ফ্রেশ হয়ে নাস্তা করেন আমি দোকানে গেলাম এইটা বলে আফজাল ভাই চলে যায়। আমি সিড়ি দিয়ে আস্তে আস্তে উঠতে থাকি আইরিন ভাবী আমাকে ডাক দেয় “আগামীকাল তাহলে চলে যাবেন?

আমি মাথা নেড়ে বলি জ্বি ভাবী। এটা বলেই রুমে চলে আসি। একটু পর ভাবী নাস্তা নিয়ে এসে নাস্তার প্লেট টা টেবিলের উপরে রেখে বলে খেয়ে নিন। আমি চুপ করে থাকি। ভাবী জানালার কাছে গিয়ে জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। আকাশটা আজকে অনেক মেঘলা হয়তো কখন যেন হুট করে আবার বৃষ্টি নামে। আমাকে বললো “আমাকে নিয়ে পালাবেন? আমি কি বলবো বা আমার কি বলা উচিত্‍ আমার মস্তিস্কে কোন কিছুই কাজ করছে না। তারপর উনি আমার দিকে তাকিয়ে হাসতে থাকে আর বলে ”এমা চেহারা এমন করেছেন কেন? আমি তো দুষ্টামী করেছি। আপনার ভাইকে ছেড়ে আমি কোথাও যাবো না, কোথাও না। আমি ছাড়া তার কেউ নেই। আপনার ভাই এর আগের একটা বউ ছিল।

একটা মেয়েও ছিল সাত বছরের। মেয়ের নাম ছিল নাবিলা। গ্রীষ্মের আম কাঠাল মৌসুমে তার নানার বাড়ি বেড়াতে গিয়েছিল। কে জানতো এই যাওয়া শেষ যাওয়া। লঞ্চ ডুবিতে মারা যায় দুজনেই। কি করে এই মানুষটাকে আমি ফেলে যাবো বলেন তো? আমি চলে গেলে এই মানুষটা বেঁচে থাকার ইচ্ছা হারিয়ে ফেলবে। খুব সাদা মনের মানুষ আমার স্বামীটা। এই কয়দিনে আমার কথা বার্তায় কষ্ট পেয়ে থাকলে আমাকে মাফ করে দিবেন কেমন? আমি সারাদিন একা একা থাকি বলে আপনার সাথে কথা বলতে আসতাম। কিছুু মনে করবেন না। খেয়ে নিন।” এইটা বলে আইরিন ভাবী দরজা দিয়ে বের হয়ে যায়। তারপর কয়েক সেকেন্ড পর আবার এসে বললো ”আপনার কি খেতে ভালো লাগে? আমাকে বলবেন? কাল তো চলে যাবেন আপনার জন্য আপনার ভালো লাগার রান্না করবো। আমি বলি খিচুড়ি। উনি একটা হাসি দিয়ে চলে যায়।

আমি বাসে উঠি এক শহর ছেড়ে আরেক শহরে যাওয়ার জন্য। আফজাল ভাই আইরিন ভাবীর কথা মনে পড়ে। এই শহরের মানুষ গুলো কেমন আমি জানি না তবে আমি অনুধাবন করি এই শহরের কিছু কিছু মানুষ আছে আফজাল ভাই আইরীন ভাবীদের মত মিশুক, ভালো। বাস চলতে থাকে। আমি জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকি বাতাসে আমার চুল এলোমেলো করে দেয়। বাসের রেডিওততে গান চলে আমি চোখ বুজে সেই গান শুনি এই শহরের গান এই শহরের ভাঙ্গা বাড়ি নানা রঙ্গের মানুষগুলো ফাকা পথে খুঁজে বেড়াই  একটু খানি অলস সময়  এই শহরের বাঁকে বাঁকে স্বপ্ন বেচার বিজ্ঞাপন আর রোজকার গল্পগুলোয় সহজ প্রানের বিচরণ তাই আমি গাইছি এই শহরের গান…

এই শহরের গান শুনতে শুনতে আমার নিদ্রা চলে আসে। আমি আরেক শহরে যাওয়ার প্রশ্তুতি নেই। আমার শহর। যে শহরে আমার কৈশরের দুরন্তপনার ছোয়া লেগে আছে। আমার মায়ের শহর। যে শহর আমাকে কাছে টানে। যার ছোয়ায় জীবনের বাকিটা সময় সবুজে ঘেরা সতেজ নিশ্বাসে আমার দিন চলে যাবে। সেই শহরে গিয়েই আফিয়াকে এতো বছর পর আমার ভালো লাগার কথা জানাবো। যেই শহর ছেড়ে আমি আর অন্য শহরে যাবো না। মা আমি আবার আসছি তোমার শহরে…

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত