চাপাবাজ জামাই

চাপাবাজ জামাই

বাসা থেকে বের হওয়ার সময় শ্বাশুড়ী আম্মা বলে দিয়েছেন, “বউমা আসার সময় গ্রাম থেকে বেশি করে হাতপাঁখা নিয়ে এসো, এই গরমে হাতপাঁখার খুব প্রয়োজন” আমি একটু করুণ কণ্ঠে বললাম, “জ্বি মা নিয়ে আসবো”

আমার বর ব্যাগপত্র রিক্সায় তুলছে, আমি নিচে নেমে আসার পর বর বললো, “মাইক্রোওভেনের সুইচ আর এসির সুইচ বন্ধ করেছো?” বরের কথা শুনে আমি হা হয়ে গেলাম, আমাদের ঘরে মাইক্রোওভেন আর এসি কিনলো কবে!! বিয়ে হয়েছে এক মাস হলো,কই আমি তো দেখতে পেলাম না!! আমি কিছু বলার আগে বর বলে উঠলো, “ওহহ দেখেছো একদম ভুলেই গিয়েছি, বের হওয়ার সময় বুয়াকে বলেছিলাম, বুয়া সব সুইচ বন্ধ করে দিয়েছে” আমি চোখ বন্ধ করে ভাবলাম, “আমরা তিনজন ছাড়া আর কেউ কি বাড়িতে ছিলো!! কই না তো! শ্বাশড়ী আম্মা, আমি আর আমার বর ছাড়া তো বাড়িতে কেউ থাকে না, তাহলে বুয়া আসলো কোথা থেকে!!”

বর রিক্সায় উঠতে বললো, আমি রিক্সায় উঠে বসলাম, বর রিক্সাওয়ালা’কে বলতে লাগলো, “আরে মামা কি আর বলবো আপনাকে! ব্যবস্থাবানিজ্য নিয়ে বেশির ভাগ সময় দেশের বাহিরে থাকতে হয়, দেশে এত গরম! কি যে করি! হয়তো কাল-পরশু লন্ডন চলে যাবো কিছুদিনের জন্য” আমি মাথা ঘুরিয়ে বরের দিকে তাকালাম, যে লোক ১৫ হাজার টাকার চাকুরী করে সে যাবে লন্ডন!! তাছাড়া আগামী সাত দিন তো আমাদের বাড়িতে থাকবে এর মধ্যে লন্ডন আসলো কোথা থেকে!!” আমি কিছু বুঝে উঠার আগে বাস টার্মিনালে পৌঁছে গেলাম, আমি জানতাম না কোন বাসে করে আমরা যাচ্ছি তবে গতরাতে বর বলেছে আমরা বিআইপি মানুষ তাই বিআইপি বাসে করে যাবো, টার্মিনালের টুলে বসে আছি, বাস আসতে আর কিছুক্ষণ, প্রায় দশ মিনিট যাওয়ার পর বর বললো,

– উঠো উঠো আমাদের বাস এসে গেছে।

– তুমি ভুল করছো,ডিপজল বাস এসেছে, আমাদের বাস আসেনি।

– আরে তুমি কি পাগল!! এটায় আমাদের বাস, চলো, চলো…

আমি হতভম্ব হয়ে চেয়ে আছি, এই ডিপজল বাস আমাদের বিআইপি বাস!! রাগে শরীর জ্বলে যাচ্ছিলো কিন্তু মানুষের সামনে কিছু বলতে পারছিলাম না, কোনরকম বাসে গিয়ে বসলাম।  বাসের মধ্যে আমি তার সঙ্গে কথা বলছিলাম না, ও নিজেও কথা বলছিলো না, কয়েনদিন আগের একটা খবরের কাগজ বের করা মুখের সামনে ধরে রাখলো, তবে আমার মনে হয় না সে খবরের কাগজটা পড়ছে!! বাসের মধ্যে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম জানি না।  ও যখন ডাকলো তখন ঘুম ভাঙ্গলো, খাওয়ার জন্য ২০ মিনিট বিরতি দিয়েছে, ও আমায় জিজ্ঞেস করলো,

– কিছু খাবে? আমি কিছু বলার আগে ও বলে উঠলো,

– অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তুমি কি খাবে! আমিও না পাগল! তোমার যত্ন নিতে জানি না, তুমি অপেক্ষা করো আমি শুধু এক বতল পানি এনে দিচ্ছি এ বলে সে গাড়ি থেকে নেমে গেলো, দুঃখে আমার কান্না চলে আসছিলো প্রায়, এ কেমন মানুষ!!  একটু পানি খেয়ে গা হেলিয়ে দিলাম সিটে, গন্তব্যে নেমে দাড়িয়ে রইলাম, ও একটা ব্যান নিয়ে আসে, ব্যানে করে বাড়ি পৌঁছালাম, আমাদের দেখে সবাই অবাক কারণ আমরা বলে আসিনি, এটা ছিলো সারপ্রাইজ। ও সবার সাথে কৌশল বিনিময় করতে ব্যস্ত, আমি বাধ্য হয়ে মাকে বললাম,

– মা খাওয়ার মতো কিছু আছে?

মা কিছু বলার আগে ও বলে উঠলো,

– কি বলো? এখনি তো খেয়ে আসলে, এখন আবার মা’কে কি খাওয়ার কথা বলছো? আমি নির্বাক হয়ে চেয়ে রইলাম, ও মা’কে বললেন,

– আর বলবেন না মা! বাস যখন বিরতি দিয়েছিলো তখন আপনার মেয়েকে বিরিয়ানি খাইয়ে ছিলাম তারপরও দেখুন এখন কেমন খাওয়ার বায়না করছে!!!

আমার খাওয়ার ইচ্ছে সবাই হেসে উড়িয়ে দিলো।  আমি রাগে ফেঁটে যাচ্ছিলাম, রাগ করে নিজের রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে বসে রইলাম। হঠাৎ করে আসাতে কারো কোন প্রস্তুতি ছিলো না তাই দ্রুত খাবারদাবারের ব্যসস্থা করা হচ্ছিলো। ও আমার দরজায় নক করে বললো,

– তোমার আবার কি হলো? দরজা খুলো…

– খুলবো না!

– আহা রাগ করছো কেন? দেখো আমার শালাকে আমি কি উপহার দিয়েছি…

তার কথা শুনে আমি চমকে গেলাম, এই মানুষ আমার ভাইকে উপহার দিয়েছে!! আমি দ্রুত দরজা খুলে চিৎকার দিয়ে উঠলাম! আমার এই ছোট ভাইটাকে এভাবে কে সাজিয়েছে!!
ও হেসে বললো,

– দেখো ওকে আদিম যুগের মানুষের মতো সাজিয়েছি, কেমন লাগছে?

– তুমি! তুমি করেছো একাজ!!

– হ্যাঁ, সুন্দর হয়নি?

– তাই বলে তুমি আমার ছোট ভাইকে কচুপাতা দিয়ে সাজাবে?

ও হেসে দিয়ে চলে গেলো, কিছুক্ষণ পর দেখি অনেক বাচ্চা বাড়িতে ভীর করেছে, জানতে পারলাম তারা ঢাকায়্যা জামাই দেখতে আসছে, ভীরের মাঝে খেয়াল করলাম প্রায় সব বাচ্চা কচুপাতা হাতে করে নিয়ে এসেছে আদিম যুগের মানুষদের মতো সাজতে, আমি নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম!! আমার বান্ধবীরা আমার বরকে দেখতে এসেছে, ওরা রুমে বসে গল্প করছে, ওদের হাসির শব্দে আমি ওদের কাছে গিয়ে বসলাম, আমার বর ওদের গল্প শুনাচ্ছে, এর মাঝের ওর একটা কল আসে, ও কল রিসিভ করে বলে,

– আরে দোস্ত এটা আবার বলতে হয়! আমার গাড়ি মানেই তো তোর গাড়ি, তুই গাড়ি নিয়ে যা ওর কথার শেষে আমার বান্ধবীরা জিজ্ঞেস করলো-

– দুলাভাই আপনার গাড়ি আছে?

– আরে কি যে বলো তোমরা! আমার তিনটা গাড়ি আছে, একটা আমার,একটা মায়ের আরেকটা বন্ধুদের জন্য ফেলে রাখি সব সময় আমি চোখ বড়বড় করে তাকিয়ে রইলাম।  সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নেমেছে, রাতের খাবারের জন্য ওকে ডাকতে গিয়ে দেখি ও মন খারাপ করে বসে আছে, আমি জিজ্ঞেস করলাম,

– মন খারাপ কেন?

– আর বলো না! আমার মানিব্যাগে দেখি দশ টাকার একটা নোট নেই!! ওর কথা শুনে আমি চোখ বড়বড় করে তাকালাম, ও আমার দৃষ্টি দেখে বললো,

– না না ঠিক আছে, আমি খাবার টেবিলে যাচ্ছি কিছুক্ষণ পর ও খাবার টেবিলে আসলো। খাবার টেবিলে সবাই মিলে গল্প করছে। আমার মেঝ ভাই ওকে জিজ্ঞেস করলো-

– দুলাভাই আপনি আসবেন আগে তো বললেন না! বললে আমরা রিসিভ করতে যেতাম।

– কি যে বলো! তোমাদের কষ্ট দিতে যাবো কেন? আমরা গাড়িতে করে বাস টার্মিনালে এসে বিআইপি এসি কোর্সে করে চলে এসেছি, আমাদের কোন অসুবিধে হয়নি। এসির ঠান্ডা বাতাসের মতো আমার মাথা ঠান্ডা হয়ে গেলো! এত মানুষের সামনে কিছু বলতেও পারছি না! খাবারের বিভিন্ন টাইটেমের মধ্য থেকে ও আলু ভর্তা নিয়ে খাচ্ছিলো, ছোট ভাই জিজ্ঞেস করলো,

– দুলাভাই কেমন লাগলো আলু ভর্তা?

– আরে আমার প্রিয় শালা, কি যে বলো তুমি! আমি আলু ভর্তার প্রেমে পড়ে গেলাম, আগে কখনো আলু ভর্তা খাইনি, আজ প্রথম। অসম্ভব সুন্দর টেস্ট হয়েছে…! ওর কথা শুনে আমার মাথা ঘুরে উঠলো, আজ সকালে বের হওয়ার আগেই তো ঠান্ডা ভাতের সঙ্গে আলু ভর্তা খেয়ে বাড়ি থেকে বের হলো আর সে কি বলছে আগে কখনো খায়নি!! মা ওর পাতে কাতলা মাছের পিস দিতে গেলে সে বলে,

– না না মা! আমি কাতলা মাছ খাবো না, তিন বেলা কাতলা মাছ খেতে খেতে আমার অরুচি এসে গেছে আমি ওর কথা শুনে আর জ্ঞান রাখতে পারলাম না, আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলাম, জ্ঞান ফেরার পর তাকে জিজ্ঞেস করলাম,

– তুমি কাতলা মাছ খাওনি কেন?

– আর বলো না! এত দামি মাছ খেলেই তো শেষ হয়ে যাবে,খাওয়ার দরকার কি? তোমার মাকে বলো ফ্রিজে রেখে দিতে তাহলে আর শেষ হবে না আমি জ্ঞান রাখতে পারলাম না। আবারও অজ্ঞান হয়ে গেলাম….

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত