কফি

কফি

রেস্টুরেন্টের সবাই আমার দিকে হা করে তাকিয়ে আছে। তাকিয়ে থাকার অবশ্য কারণ আছে। কিছুক্ষণ আগে আমার ছাত্রী শ্রাবণী আমার মাথায় কফি ঢেলে দিয়ে চলে গেছে। সেই কফি আমার কপাল বেয়ে সারা মুখে পড়ছে। আমি এক অদ্ভুত ভঙ্গিতে জিভ দিয়ে গালে বেয়ে পড়া কফি খাওয়ার চেষ্টা করছি। সেই দৃশ্য দেখে সবাই অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমার পাশের টেবিলে বসা ভদ্রলোক লুকিয়ে সেই দৃশ্য ভিডিও করার চেষ্টা করছে। আমি ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললাম,

— ভাই, আপনার কফিটাও আমার মাথায় ঢালেন। তারপর আমি চেটে চেটে কফি খাবো আর আপনি সুন্দর করে ভিডিও করবেন ভদ্রলোক মনে হয় আমার কথা শুনে লজ্জা পেয়েছে। তাই ফোনটা নিজের পকেটে ঢুকিয়ে চুপচাপ কফি খাচ্ছে আর আড়চোখে আমায় দেখার চেষ্টা করছে শ্রাবণীকে আমি ২ বছর পড়িয়েছি। এই ২ বছরে শ্রাবণী আমাকে ২ হাজারবার বুঝানোর চেষ্টা করেছে সে আমাকে ভালোবাসে কিন্তু বরাবর আমাকে না বুঝার অভিনয় করতে হয়েছে গরীব ঘরে জন্ম নিলেও আমার চেহারা ছবি খুব একটা খারাপ ছিলো না।বাবা অনেক কষ্ট করে এইচএসসি পাস করিয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন চান্স পাই তখন আমার বাবা মনে হয় খুশি হওয়ার বদলে কষ্ট পেয়েছিলেন। তিনি আমার সামনে বসে বলেছিলেন,

-তোমার আরো ২ টা ছোট ভাই বোন আছে। তোমায় যেহেতু এইচএসসি পর্যন্ত পড়িয়েছি ওদের ও তো পড়াতে হবে। এখন যদি আমি তোমায় পড়ার খরচ দেয় তাহলে ওদের পড়াতে পারবো না। তাই তুমি যদি পড়তে চাও তাহলে তোমার খরচ তোমাকেই চালাতে হবে আমার মা তার কিছু জমানো টাকা আমার হাতে দেয়। সেই টাকা নিয়ে আমি ঢাকা শহরে পা রাখি। এক বড় ভাইয়ের সহযোগিতায় শ্রাবণীকে পড়ানোর সুযোগ পায় শ্রাবণী তখন ইন্টার ফাস্ট ইয়ারে পড়ে।প্রথম প্রথম শ্রাবণী আমায় বিন্দু পরিমাণ পছন্দ করতো না। অবশ্য পছন্দ না করার অনেক কারণ ছিলো। প্রথম যেদিন আমি শ্রাবণীকে পড়াতে যায় সেদিন আমাকে নাস্তা দিয়েছিলো ১ কাপ চা আর ৫ টা বিস্কিট। আমি যখন বিস্কিট খাচ্ছিলাম তখন শ্রাবণী বিরক্তিকর মুখে আমার দিকে তাকিয়ে বলেছিলো,

– আপনি কি এইভাবেই শব্দ করে বিস্কিট খান? আমি কিছু না বলে শুধু মুচকি হেসেছিলাম পরের দিন যখন পড়াতে যায় তখন দেখি আমাকে বিস্কিট দিয়েছে ১০ টা। আমিও খুশি মনে শব্দ করে একটার পর একটা বিস্কিট খেতে লাগলাম। শ্রাবণী আমার খাওয়া দেখে বললো,

– আপনি কি বিস্কিট কখনো খান নি? এমন রাক্ষসের মত করে খাচ্ছেন কেন? ছাত্রীর মুখ থেকে রাক্ষস শব্দটা শোনা একটা শিক্ষকের কাছে সত্যি লজ্জা জনক। কিন্তু আমার লজ্জা তেমন নেই। গরীবদের ছোটখাটো বিষয়ে লজ্জা পেতে নেই পরদিন শ্রাবণীকে পড়ানো শেষ হয়ে গেলো কিন্তু তারপরেও কেউ নাস্তা নিয়ে এলো না। আমি শ্রাবণীকে বললাম,

— আজ কি নাস্তা দিবে না? শ্রাবণী আমার দিকে তাকিয়ে বিরক্ত হয়ে বলেছিলো,
– বাসায় বিস্কিট নেই আমি তখন মাথাটা নিচু করে বলেছিলাম,

— বিকালে এই নাস্তাটা খেলে আমার রাতে ক্ষুধা লাগে না আর রাত জেগে অনেকক্ষণ পড়া যায়। ঢাকা শহরে ৩ বেলা খাওয়া অনেক খরচের ব্যাপার। তাই শুধু আমি দুপুরে খাওয়া দাওয়া করি আমার কথা শুনে এই প্রথম আমি খেয়াল করেছিলাম শ্রাবণী আমার দিকে বিরক্তিকর দৃষ্টিতে তাকাই নি। ওর তাকানোর মাঝে এইবার একটা মায়া ছিলো। আগে শ্রাবণীকে তেমন ভাবে লক্ষ্য করি নি আজ ওর দিকে তাকিয়ে বুঝলাম মেয়েটা সত্যি অনেক সুন্দরী তারপর থেকে শ্রাবণী আমার প্রতি অন্যরকম ব্যবহার করতে শুরু করলো। আগে নাস্তার আইটেম থাকতো ২টা কিন্তু তারপর থেকে ৪ টা ৫ টা হলে গেলো। একদিন শ্রাবণী আমার হাতে একটা প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে বললো,

– এটা আপনার জন্য আর অবশ্যই এটা কাল পড়ে আসবেন… মেসে এসে প্যাকেট খুলে দেখি একটা লাল রঙের পাঞ্জাবি। তখনি বুঝতে পারি মেয়েটা হয়তো আমার প্রতি দূর্বল। পরদিন আমি ঠিকিই শ্রাবণীকে পড়াতে যায় কিন্তু সেই পাঞ্জাবিটা পড়ে যায় নি। কলিংবেল বাজাতেই শ্রাবণী দরজা খুললো। মেয়েটা আজ খুব সুন্দর করে সেজেছে। চোখে কাজল কপালে ছোট টিপ খোলা চুল আর লাল শাড়িতে মেয়েটাকে অদ্ভুত সুন্দর লাগছে। শ্রাবণী আমাকে এই পাঞ্জাবি ছাড়া অবস্থায় দেখে হয়তো খুব কষ্ট পেয়েছিলো। মেয়েটা তখন আমার দিকে একবারও তাকায় নি। শুধু নিচের দিকে তাকিয়ে একমনে লিখে যাচ্ছে। হঠাৎ খেয়াল করলাম সাদা কাগজের উপর কৃষ্ণ বর্ণের একফোঁটা জল পড়লো। তারমানে শ্রাবণী কান্না করছে। শ্রাবণীর সেই কান্না ভেজা চোখ দেখে কেন জানি আমার বুকের ভিতর কেমন জানি লাগছিলো। খুব ইচ্ছে করছিলো নিজ হাতে ওর চোখের জলটা মুছে দেয়। আমি যখন পড়ানো শেষ করে চলে যাবো তখন পিছন থেকে শ্রাবণী আমার হাতটা ধরে বলেছিলো,

– আপনি কেন এমনটা করলেন? আমি শ্রাবণীর হাতটা সরিয়ে বললাম,
— আমি আজ কেন এমনটা করেছি আমি তোমায় কোনএকদিন বলবো।

তুমি আগে মেডিকেলে চান্স পাও তখন আমার মনের সব কথাগুলো তোমায় খুলে বলবো আজ সকালে শ্রাবণী ফোন করে বললো সে মেডিকেলে চান্স পেয়েছে। আর আজ বিকালেই যেন আমি ওর সাথে দেখা করি। আর দেখা করার সময় অবশ্যই যেন ওর দেওয়া লাল পাঞ্জাবিটা পড়ে আসি আমি শ্রাবণীর পাঞ্জাবিটা পড়ে ওর সাথে দেখা করতে রেস্টুরেন্টে যায়। গিয়ে দেখি শ্রাবণী আমার আগেই এসে পড়েছে। সেই আগের মত লাল শাড়ি পড়েছে আগের মতই সেজেছে। আমাকে দেখে শ্রাবণী বললো,

– আপনি সেদিন বলেছিলেন আমি মেডিকেলে চান্স পেলে আপনি আপনার মনের সব কথা খুলে বললেন। আজ আপনি বলুন। আমি শ্রাবণীর কথা শুনে কি বলবো না বলবো বুঝতে পারছিলাম না। তারপর একদমে শ্রাবণীকে বললাম,

— তোমার মুখটা অবিকল আমার বোনের মত, তোমার চোখ গুলো আমার মায়ের মত, তোমার হাত গুলো আমার খালার মত, তোমার চুল গুলো আমার ফুফুর মত। তোমাকে দেখলেই আমার বোন, মা, খালা, ফুফুর কথা মনে পড়ে। আজ থেকে তোমাকে আমি বোন খালা ফুফু মা আর বলতে পারলাম না তার আগেই শ্রাবণী আমার মাথার উপর কফি ঢেলে রাগে আগুন হয়ে চলে গেলো একটু পর খেয়াল করলাম শ্রাবণী আবার আমার দিকে আসছে। রাগলে যে মেয়েটাকে এতটা সুন্দর লাগে আগে জানা ছিলো না। শ্রাবণী রাগে দাঁতের সাথে দাঁত চেপে বললো,

— আপনাকে দেখে যতটা সহজ সরল মনে হয় আপনি ততটা সহজ সরল না। আপনি একটা মিসকে শয়তান। আপনাকে আমি সহজে ছাড়বো না। সারাটা জীবন আপনার পিছনে লেগে থাকবো এই কথা বলে শ্রাবণী পাশের টেবিলে বসা ভদ্রলোকের কফিটা নিয়ে আবার আমার মাথায় ঢেলে দিলো। আমি গাল দিয়ে বেয়ে পড়া কফিটা জিভ দিয়ে চেটে খাওয়ার চেষ্টা করছি আর সেই ভদ্রলোক আমার সামনে দাঁড়িয়ে সেটা ভিডিও করছে..

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত