দাদা-দাদীর কোঁচকা

দাদা-দাদীর কোঁচকা

৪১ তম বিবাহ বার্ষিকী আজ আমার দাদা-দাদীর।প্রতি বছরের মত এবছরেও উদযাপন করা হচ্ছে তাদের বিবাহ বার্ষিকী। বৃদ্ধ বয়সেও দাদীর প্রতি ভালোবাসা,শ্রদ্ধা, দায়িত্বশীলতা দেখে সবাই মুগ্ধ।কর্ম ক্ষমতা কিছুটা লোপ পেলেও,কাপা কাপা হাতে অনুষ্ঠানের রকমারি আয়োজনটা নিজের হাতেই করছেন দাদা।দাদার সাথে একটু হাত লাগাচ্ছি আমরাও। আব্বু ব্যবসার কাজে বেশিরভাগ সময় বাসার বাহিরে থাকে।কিন্তু আজকের এই দিনে আব্বুর শত ব্যস্ততা থাকলেও সময় দেয় আমাদের সাথে।আজকের এই দিনটায় ছুটে আসে বড় ফুফু,মেজো ফুফু, ছোট ফুফুও।সবাই এক সাথে উদযাপন করি দাদা-দাদীর বিবাহ বার্ষিকী। আম্মু রান্নাকরা নিয়ে ব্যস্ত।দাদার জন্য সরিষা ভর্তা,শুঁটকি ভর্তা,গরুর মাংস, ভুনাখিচুড়ি ও পায়েস রান্না করতেছে।দাদী অসুস্থ থাকায় আম্মুর করতে হচ্ছে।প্রতিবছর দাদীই করেন, হুইল চেয়ারে বসে আম্মুকে এটা ওটা বলে দিচ্ছে দাদী।

আমাদের বিয়েটা হয়েছিলো ভালোবেসে।তোদের দাদীর সাথে প্রথমে দেখা হয়েছিলো আমার ছোট বেলার বন্ধু রাসেদের বিয়েতে। আমি প্রথম দেখাতেই প্রেমে পড়ে যাই।তোদের দাদীর গায়ের রং তেমন ফর্সা না, কিছুটা শ্যাম বর্ণের কিন্তু চেহারার গঠনটা বেশ মহনীয়। যেটা সুন্দর চেহারাকে হার মানায়।আমি তো তোদের দাদীর প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছি রীতিমত। বন্ধু যে একা বসে আছে সেদিকে আমার কোন খেয়াল নেই,সারাটা সময় তোদের দাদীকে দেখায় মগ্ন ছিলাম।তোদের দাদীর পিছে ঘুরঘুর করতে আমি প্রায় বিরক্ত হয়ে যেতাম কিন্তু না দেখলেও ভালো লাগতো না। তোদের দাদীর সাথে একটু কথা বলার জন্য কত যে কথা শুনতে হয়েছে,কত অপমান হয়েছি ঠিক নেই। তোদের দাদী তখন মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ করেছে।কিছু দিন পর মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ হয়।খুব ভালো একটা ফলাফল করে তোদের দাদী,গঞ্জের মধ্যে ৩য় হয়।

সেদিন অনেক খুশি হয়ে ছিলাম আমি,তোদের দাদীর মুখের হাসিটা দেখে।ঐ হাসিটার মাঝে যে আমি আমার সুখ খুজে পেয়েছিম।তোদের দাদীর হাসিটা যে কত মধুর ছিলো বলে বোঝাতে পারবো না রে দাদু ভাই’রা।আমি প্রতিদিন রাস্তার পাশে বটগাছের নিচে অধীর আগ্রহে বসে থাকতাম তোদের দাদীকে এক পলক দেখার জন্য।আমার এমন আচরণে তোদের দাদী আমার দিকে তির্যক চোখে তাকাতো,সাথে তো সেই মধুর হাসিটা উপহার দিত আমায়।আমি! সেদিনও, প্রতিদিনের মত তোদের দাদীকে এক পলক দেখার জন্য বটগাছটার কাছে যাই, কিন্তু তোদের দাদী আর আসে না।মন খারাপ করে ফিরে আসি।কোন কিছুতেই মন বসাতে পারি না,শুধু তোদের দাদীকে দেখার প্রবলতা বেড়েই যায়।এভাবে ৪ দিন কেটে যায় কিন্তু তোদের দাদী আর আসে না।আমার ভিতর কেমন একটা ভয় কাজ করা শুরু হয়।অনেক আজেবাজে চিন্তা মাথায় আসে।আমি ছুটে যাই তোদের দাদীর বাড়ির দিকে কিন্তু ঘরটা ছিলো তালাবন্ধ।

তোদের দাদীর জন্য প্রতিদিন পথ চেয়ে বসে থাকি,কিন্তু তার কোন খবর নেই। ১৫ দিন পর তোদের দাদীর দেখা পাই,দৌড়ে যাই তার কাছে।জিগাসা করার আগেই আমায় বলে, কষ্ট পেয়ছেন এত দিন আসি নি বলে।আমার নানু অসুস্থ ছিলো,উনাকে দেখতে গিয়েছিলাম। আপনাকে বলে যেতে পারি নি।এবারের মত ক্ষমা করুন পরের বার থেকে কোথাও গেলে আপনাকে বলে যাবো।আচ্ছা যাই কলেজের সময় হয়ে গিয়েছে।আমার কোন উত্তর না নিয়েই হন হন করে হেটে চলে যায় তোদের দাদী।কিছু সময় তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকি। দাদু ভাই’রা তোমরা বাকি গল্পটা তোমাদের দাদীর থেকে শুনো।আমি একটু আসছি। দাদী তারপর কি হলো বলো তো,তোমাদের প্রেম কাহিনিটা শুনতে ভালোই লাগছে।

আচ্ছা শোন তাহলে,তখন তো মোবাইল ছিলো না।আমরা প্রতিদিন চিঠি আদান-প্রদান হতো।তোদের দাদা খুব সুন্দর করে তার মনের কথা গুলো সাজিয়ে-গুছিয়ে লিখতো।মাঝে মাঝে কবিতাও লিখে দিতো আমায় নিয়ে।আমি তোদের দাদার লেখার প্রেমে পড়ে গেলাম।যেদিন চিঠি না দিত সেদিন খুব মন খারাপ হতো।আস্তে আস্তে তোদের দাদাকে ভালোবাসতে শুরু করি।তার পর কি আর করার রাজি হয়ে যাই তার প্রেম প্রস্তাবে।এভাবেই সম্পর্কটা সামনের দিকে এগিয়ে নিতে থাকি।তোদের দাদা আমার জন্য,চুল বাঁধার ফিতা,কাচের চুড়ি,আলতা কিনে নিয়ে আসতো।নদীর পাড়ে দক্ষিণা হাওয়াতে আমার চুলগুলো বেশ মনযোগ দিয় বেঁধে দিতো।নিজ হাতেই চুড়ি পরিয়ে দিতো।আলতা দিয়ে রাঙিয়ে দিত আমার পা দুটোকে।তোদের দাদার এ পাগলামী গুলো নিজের কাছে খুব ভালো লাগতো। বকুল ফুলের মালা গেঁথে নিয়ে আসতো আমার জন্য।বকুল ফুল খুব পছন্দ ছিলো আমার।গঞ্জে গেলে আমার জন্য বাতাসা,গরম গরম জিলাপি নিয়ে আসতো।

এগুলো আমার খুব পছন্দ ছিলো।তোর দাদা আমাকে মেলায় ঘুরতে নিয়ে যেত।শিমুল তলায় বসে তোর দাদার হাতে হাত রেখে সুখ-দুঃখের গল্প করতাম।আমাদের সময়টা বেশ ভালোই যাচ্ছিলো কিন্তু হটাৎ করে অন্ধকার নেমে আসে আমাদের মাঝে।ছোট কাকা সব জানতে পেরে যায় আমাদের সম্পর্কের ব্যপারে।প্রতিদিনের মত শিমুল তলায় বসে গল্প করতেছি,তখন ছোট কাকা এসে হাজির হন।সেদিন অনেক মেরেছিলো তোদের দাদাকে।মেরে রক্তাক্ত করে ফেলে।আমি চিৎকার দিয়ে কাঁদতে থাকি, তোদের দাদাকে মারা জন্য নিষেধ করি কিন্তু আমার কথা শুনে নি।ঐ যে তোদের দাদার কপালে যে দাগটা দেখিস ওটা তখনকার সময়ের।তোদের দাদাকে মেরে বেঁধে রাখে।গ্রামের লোকজন কে ডেকে জড় করে।এ খবর পেয়ে ছুটে আসেন আমার শ্বশুড় মশাই।তাদেরকে গ্রামের সকলের সামনে অপমান করেন।সবাই অপমানের কষ্ট বুকে নিয়ে তোদের দাদাকে নিয়ে চলে যায়।

টপ করে দাদীর চোখের পানি গড়িয়ে পড়লো।যেটা সবাই দেখতে পেলাম।দাদী আচঁল দিয়ে চোখের কোনে আসা পানি মুছে নেয়।তোদের দাদা আমার জন্য অনেক কষ্ট সহ্য করেছে।মানুষটা আমাকে অনেক ভালোবাসা দিয়েছে।তোদের দাদার মত মানুষ হয় না।আঁচল দিয়ে চোখটা মুছে আবার বলা শুরু করে তার পর, ছোট কাকা গ্রামের মাতবরের ছেলের সাথে আমার বিয়ে ঠিক করেন।আমি বিয়ের আগের দিন রাতে তোদের দাদার হাত ধরে পালিয়ে আসি।তখন তোর দাদা বেকার ছিলো,অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ জেনেও চলে আসি।শুধু মানুষটার ভালোবাসার টানে।কিন্তু আমার শ্বশুড় আমাদের মেনে নেয় নি।বাড়ির বাহিরেই কাটিয়েছি প্রথম রাত।সেদিনের বলা কথায় তোর দাদার প্রতি ভালোবাসা বেড়ে যায় আমার। কথাটা, তোমার হাত ধরেছি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এভাই ধরে রাখবো।নিজে না খেয়ে তোমাকে খাওয়াবো।আল্লাহ আমাকে দুটি হাত,দুটি পা দিয়েছে।কাজ করার ক্ষমতা আল্লাহ আমায় দিয়েছে একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে।তুমি চিন্তা করো না।তোদের দাদার প্রতি বিশ্বাস এবং আস্থা দুটোই ছিলো আমার।

শ্বশুড় আমার খুব ভালো মনের মানুষ ছিলো।হয়তো সেদিনের অপমান মেনে নিতে পারে নি, তাই আমাদের প্রথমে মেনে নেয় নি।যদিও এটা উনার মন থেকে ছিলো না।কিছু দিন যেতেই উনি আমাদের মেনে নেয়।আমাদের পরিবার থেকেও মেনে নেয়।আমাদের নতুন জীবনের পথ চলা শুরু হয়।তোদের বড় আব্বু বছর খানিক পর মারা যান।তিনার চলে যাওয়াতে তোদের দাদা ভেঙে পড়েন খুব।পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হতেই তোদের বড় আব্বুর রেখে যাওয়া ব্যবসাটার হাল ধরেন।ব্যবসাটা নিজের মত করে গুছিয়ে নিয়েছিলো।অনেক কষ্ট করেছে আমার মুখের হাসিটা ফুটিয়ে রাখার জন্য।বিয়ের পরে আমিও ইচ্ছা করেই চুল বাঁধতাম না।

তোদের দাদা এলে বায়না করতাম চুল বেঁধে দেওয়ার জন্য।খুব সুন্দর করে চুল বাঁধতে পারতো তোদের দাদা। লাল ফিতা দিয়ে আজও সেই একই ভাবে চুল বেধে দেয় প্রতি রাতে।মানুষটাকে কখনও রাগ করতে দেখিনি আমি।সব কিছুই নিরবে মেনে নিয়ছে।কখনও কোন অভিযোগ করে নি আমার কোন কিছুতে।রান্নাটা ভালো না হলেও হাসি মুখে খেয়ে নিয়েছে,যেটা খেতে গিয়ে বমি করেছি আমি।কিন্তু মানুষটা চুপচাপ খেয়ে নিয়েছে কখনও বলে নি রান্নায় তেল-ঝাল কম হয়েছে। আমি ভুল মানুষের হাত ধরে আসিনি।ঠিক মানুষটার হাত ধরেছি জীবনের বাকি সময়টা এক সাথে কাটানোর জন্য।

আজও দাদা কাপা কাপা হাতে দাদীর পেকে যাওয়া সাদা চুল গুলো বেঁধে দিচ্ছে।পেকে যাওয়া সাদা চুলের ভিতর লাল রঙের ফিতা বেশ অমানান।হয়তো আমাদের কাছে অমানান হতে পারে কিন্তু দাদার কাছে নয় এই সাদা চুলের ভিতর লাল ফিতাটাই দাদার ভালোবাসা,যেটার মাঝে খুজে পায় তার অনুভূতি গুলোকে।তাদের সম্পর্কটা কতটা মধুর ছিলো সেটা বুঝতে কারো বাকি নেই।এই বৃদ্ধ বয়সে দাদা-দাদীর পাগলামী গুলো দেখার জন্য এই দিনটায় ছুটে আসে তার ছেলে-মেয়ে’রা। বাবা-মায়ের এই মধুর সম্পর্ক দেখে নিজেদের অশ্রু বিসর্জন দিয়ে তাদের এই ভালোবাসার সাক্ষী হয়ে থাকে।একে-অপরের প্রতি বিশ্বাস,আস্থা,ভালোবাসা,দায়িত্বশীলতা, শ্রদ্ধা বোধ ই এ সম্পর্ক এত দূর নিয়ে এসেছে। তাদের এ বিবাহ বার্ষিকী কোন কেক কেটে উদযাপন করা হয় না।সবাই মিলে এক টেবিলে বসে খাবার খাওয়াতেই সীমাবদ্ধ।

দাদীর জন্য নিজের হাতে বকুলের মালা গেঁথেছে দাদা আজও।বাজার থেকে নিয়ে এসেছে বাতাসা,গরম জিলাপি।হুইল চেয়ারে বসে থাকা দাদীর গলায় বকুলের মালা পরিয়ে দেয় দাদা।জিলাপি খাইয়ে দিচ্ছে আজ নিজ হাতেই।আজও দাদীর প্রতি সেই প্রথম দিনের মত ভালোবাসা বিরাজমান রয়েছে দাদার মনের মাঝে।দাদীর প্রতি ভালোবাসা,দায়িত্বশীলতা দেখে দাদীর চোখে পানি এসে ভিড় জমাতে থাকে।দু ফোটা চোখের পানি গড়িয়ে পড়ার আগেই মুছে দেয় দাদা।তোমার চোখের পানি আমি সইতে পারি না,তুমি কাঁদবে না।তোমার মুখে হাসিটাই বেশ সুন্দর দেখায়।তোমার হাসির মাঝে আমি আমার সুখ খুজে পাই।তোমার হাসিটাই আমার জন্য শ্রেষ্ট উপহার।

গল্পের বিষয়:
গল্প
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত