দিপুনি

দিপুনি

কালো ওড়না খুঁজে না পেয়ে পুরো ঘর উল্টেপাল্টে ফেলেছে অনি। মেজাজ খারাপ হচ্ছে। ক্লাস নটায় শুরু। তারপর আবার থানা মোড় পর্যন্ত হেঁটে যেতে হবে। বাজে আটটা পঁচিশ। আজকের প্রথম ক্লাসই আবার সামাদ স্যারের৷ উফ! মাকে ডাকার আগেই কানে এলো রিনরিনে গলায় কেউ বলছে,
-দ্যাখ তো আরমান,আমারে শাড়িতে কেমন লাগে?
অনি জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়েই তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো। ওর সাত বছর বয়সী ছোট বোন কালো ওড়না গায়ে পেঁচিয়েছে শাড়ির মতো করে৷ তা আবার পাশের বাড়ির ওরই বন্ধু আরমানকে দেখাতে নিয়ে গেছে। অনি দাঁত কিড়মিড়িয়ে চিল্লিয়ে উঠলো,
-দিপুরে…
দিপু পেছনে তাকিয়ে বোনকে দেখেই পিট্টি দৌড় দিলো। অনি দিপুকে ধরে চ্যাং-দোলা করে বাসায় নিয়ে এলো।
-তোকে না করছি না? আমার জিনিস ধরবি না। আজকে তোকে এমন মাইর দিবো।
দিপু অনির হাত থেকে ছোটার জন্য মোচড়ামুচড়ি করতে করতে বললো,
-তোর বিয়ে হয়ে গেলে তো সব আমার হবে।
মিসেস হোসেন এসে দিপুকে ছুটিয়ে নিয়ে গেলো। নইলে আজ অনির হাতে শক্ত পিটুনি খেতো৷ ক্লাসের সময় হয়ে যাচ্ছে দেখে অনিও আর কিছু না বলে চলে গেলো৷

ব্যারিস্টার আনোয়ার হোসেনের ছেলে মেয়ে হাফ ডজন প্লাস দুই। অর্থাৎ আট জন। ছয় ছেলের পর দুই মেয়ে। ভাইবোনের সবাই একে অন্যকে ভালোবাসলেও অনিন্দিতা আর দিপ্তী হলো সংসারের টম এন্ড জেরী। সারাক্ষন একজন অন্যজনের পিছু লেগে আছে। কিন্তু যদি একজন অন্যায় করে অন্য জন সুন্দর করে পক্ষ নিয়ে একাট্টা হয়ে যায়। মাঝে মাঝে মিসেস হোসেন পুত্রবধূদের সাথে বলেন ‘দুই মেয়েকে এক বাড়িতেই না বিয়ে দিতে হয়। ‘ সারাক্ষন এ ওর পেছনে লাগলেও দুজন রাতে খাবে একজন সাথে। ঘুমোবে এক সাথে। এখনো দিপু অনির বুকে মাথা রেখে আদুরে বেড়ালছানার মত গুটিশুটি মেরে ঘুমায়। দুবোনকে একসাথে তাই বাড়ির সবাই ভালোবেসে ডাকে ‘দিপুনি’।

অনি সবসময় বলে ‘ আমি কক্ষনো বিয়ে করবো না। ‘ দিপুও সাথে সাথে বলে ‘আমিও না। ‘ । যদিও ওর বিয়ে সংসার বোঝার বয়স হয়নি।যেহেতু আপুলি বলেছে, সেহেতু ওকেও বলতে হবে৷ দিপু অনিকে সবসময় ‘আপুলি ‘বলে ডাকে৷ সেদিন সন্ধ্যায় অনিদের বাসায় পার্টি । ঘরোয়াভাবে। নানা-নানি, চাচা-চাচী, ভাবীরা সবাই আছে। মেয়েরা একসাথে রান্নার আয়োজন করছে। অনির ছোট চাচী আচমকা ওর মাকে বললো,
-ভাবী, একটা ছেলে আছে। অনির জন্য। দেখবা নাকি?
অনির মা কিছু বলার আগেই অনি বললো,
-আমি বিয়ে করবো না৷
দিপুও বললো,
-আমিও বিয়ে করবো না।
সবাই হেসে অন্য প্রসংগে চলে গেলো।কথায় কথায় নানী বললো,
-ছেলে মেয়ে মানুষ করা ঝামেলা। সারাদিন কাজ করে মাত্র ঘুমাবো,তখনই দেখা যায় বাচ্চা কাঁথা ভিজিয়ে ট্যাঁ করে কেঁদে উঠেছে৷ ছেলে মেয়ে গুলো বিয়ে দিয়ে বেঁচেছি।
দিপু হঠাৎ বললো,
-আমিও আমার ছেলেমেয়ে গুলো বড় করে বিয়ে দিব।
অনি বারান্দায় বসে বসে ফোন চাপছিলো।দিপুর কথা শুনে লাফিয়ে উঠলো।
-তবেরে! তুই নাকি বিয়ে করবি না?
দিপু সুন্দর করে বললো,
-না,ধরো তোমরা জোর করলে আমি কি আর না বলতে পারি!
মুহূর্তে সবাই একসাথে হেসে উঠলো। এই না হলো বাচ্চাকাচ্চা।

দিপু সবসময় অনির সাথে থাকে। স্কুলে কি হলো, কোন টিচার কি পড়ালো, কোন বান্ধবীকে চিমটি দিলো,কি টিফিন দিলো সব অনির শোনা চাই। অনিও দিপুকে সব বলে। কোন স্যার কি পড়ালো, ফ্রেন্ডের সাথে কি খেলো, কোন ছেলে প্রপোজ করলো। সব। দিপু সব না বুঝলেও বড় মানুষের মতো মাথা নাড়ে৷ উপদেশ দেয়।
-বেশি ছেলেপিলেদের সাথে মিশিস না। পড়াশোনা করিস৷
অনি দিপুর গাল টেনে দেয়৷

সকাল বেলায় দিপু-অনির এক চোট হয়ে গেছে। বাথরুমে কে আগে যাবে তাই নিয়েই লেগেছিলো একচোট৷ দিপুকে আচ্ছামত পিটুনি দিয়েছে৷ মেয়ে ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলেছে,
-আব্বু আসলে আজ সব বলে দিবো।
-কি বলবি?
-তুই রাত জেগে ফোন চালাও।
-আমিও বলে দিবো।
-কি?
-তুই দুপুরে না ঘুমিয়ে দিয়ার সাথে খেলতে যাস।
-বলগে
-তুইও বলগে।
বিকেলে অনি ছাদে বসে আছে। দিপু মুখটা করুণ করে ডাকলো,
-আপুলি
-কি হইসে?
-আব্বুরে বলিস না
-তুইও বলিস না
দিপু ঝপ করে অনির কোলে এসে বসলো।বুকে মুখ ঘষতে ঘষতে বললো,
-তাইলে দশ টাকা দে।
অনি ফিক করে হেসে ফেললো।বললো,
-ফ্রিজে দ্যাখ আইসক্রিম এনে রেখেছি।
একটু পরে দেখা গেলো দুই বোনের নাকে মুখে আইসক্রিম। দুজনই খিলখিল করে হেসে গড়াগড়ি দিচ্ছে আর আইসক্রিম খাচ্ছে।

এরপর অনেক দিন কেটে গেছে। রাজকন্যারা বড় হয়ে গেছে। অনির মাস্টার্স শেষের দিকে। দিপু কলেজে। কিন্তু দুই বোনের ঝগড়া,মারামারি কমেনি।সময়ের সাথে বেড়েছে। বাড়ি থেকে অনির বিয়ের কথা প্রায় পাকা। ছেলে সুপ্রিম কোর্টের জাজ। অনিকে বাড়ির সবাই ছেলের সাথে পারসোনালি দেখা করতে পাঠাচ্ছে৷ অনি দিপুর দারস্থ হলো।
-বুড়িরে
দিপু বত্রিশ পাটি দাঁত বের করে বললো,
-আমি আছি তো আপুলি।ডোন’ট ওরি!
অনি দিপুকে সাথে নিয়ে বনলতাতে গেলো। ঈশ্বরদী ট্রাফিক মোড়ের অপজিটে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের নিচেই কফিশপটা৷। দিপু-অনি ভেতরে যেতেই কোনের দিক থেকে একটা ছেলে হাত নাড়লো।অনি একটা ধাক্কা খেলো। ছেলেটির চুলগুলো উস্ক খুষ্ক, মুখ ভর্তি দাঁড়ি গোফ, শার্টের বোতাম বুকের কাছ অব্দি খোলা।ফর্সা বুকে পশম দেখা যাচ্ছে।ছেলেটিকে দেখলেই বুকে ধাক্কার মতো লাগে। ছেলেদের এত সুন্দর হতে নেই।অনির খুব তৃষ্ণা পেয়ে গেলো হঠাৎ৷ অনি প্রায় কোনো কথাই বলতে পারলো না।দিপুই বললো।ছেলেটিও দিপুর সাথে মজা করে কথা বলছিলো।বেরিয়ে এসে দিপু ঘোষণা দিলো,
-ঋষি ভাই খারাপ না।আমার পছন্দ হয়েছে।একেই বিয়ে করতে হবে।
অনি দাঁত কিড়মিড় করে বললো,
-তোকে এনেছিলাম বিয়ে ভাঙানোর জন্য।
দিপু দাঁত বের করে শয়তানি মার্কা হাসি দিলো।

অনির মেজাজ প্রচণ্ড খারাপ হয়ে আছে৷ সারাদিন বিয়ের ধকল।তায় বেনারসী যে ভারী।তারসাথে ইলেকট্রিসিটি চলে গেছে।ঋষি গেছে জেনারেটর কেন চালু হচ্ছেনা সেটা দেখতে। ঋষি ফিরলো মোমবাতি হাতে৷
-অনি,আপ…তোমাকে আজ অন্ধকারেই কাটাতে হবে। ট্রান্সমিটার মার গেছে। জেনারেটরেও কি যেন গন্ডগোল হয়েছে।
আচমকা একটা কচরমচর শব্দ হলো। অনি -ঋষি দুজনেই চমকে গেলো।কারণ শব্দটা আসছে খাটের নীচ থেকে। ঋষি মোমবাতি নিয়ে উঁকি দিলো খাটের নিচে। দিপুকে দেখা গেলো।চিপস খাচ্ছে৷ ঋষিকে দেখে বললো,
-হাই দুলাভাই। বসে থাকতে থাকতে খিদে পেয়ে গেছিলো।
ঋষি কান চেপে দিপুকে বের করলো।অনি চোখ কপালে তুলে বললো,
-তুই কি করছিস খাটের নিচে!
-আমি কি তোকে ছাড়া কখনো ঘুমিয়েছি নাকি।হুহ।
অনি-ঋষি দুজনেই হেসে ফেললো।
ঋষি বললো,
-আচ্ছা, থাকিস তুই আপুর কাছে।
দিপু মহা উৎসাহে বললো,
-আজকে পূর্নিমা। আপুলি খুব পূর্নিমা ভালোবাসে। আপুলিকে নিয়ে যাই?
ঋষি হেসে ফেললো।মনে মনে ভাবলো চাঁদের হাট বুঝি এদেরই বলে৷ মুখে বললো,
-আমিও যে জোৎস্না ভালোবাসি। আমাকে না নিলে যেতে দিবো না।
এবার দিপু অনি হেসে ফেললো। দুজন একসাথে বললো,
-তথাস্তু।।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত