নাটকীয় বিবাহ

নাটকীয় বিবাহ

বোরকার পিস হাতে নিয়ে শ্রাবণ হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একজন দর্জি এসে ওর মাপ নিচ্ছে। ওর পাশেই আমি দাঁড়িয়ে আছি। ভাল করে বুঝিয়ে দিচ্ছি কিভাবে বোরকা বানানো হবে। শ্রাবণের মত দর্জিও হতভম্ব। এই প্রথম কোন ছেলের জন্যে বোরকার অর্ডার এসেছে। আমি শ্রাবণের আতঙ্কিত মুখের দিকে একবার তাকালাম। ফর্সা কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে আছে। আমি অবশ্য এখনও এই বোরকার ব্যাপারটা ক্লিয়ার করিনি। সবকিছু দর্জিকে বুঝিয়ে দিয়ে আমি ওকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। বাইরে প্রচন্ড রোদ। কপালে ওপর ডানহাত উঁচু করে ধরে বললাম,

–“তিনদিনের ভেতর দিয়ে দিবে বলেছে। নেক্সট যেদিন দেখা করবে, সেদিন বোরকা পড়েই আসবে। ঠিক আছে?
শ্রাবণ কিছু বললোনা। গাল ফুলিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে রইলো। আমি ওর গালটা ঘুরিয়ে নিজের দিকে নিয়ে বললাম,

–“আগামী সপ্তাহে বাবা দেশে আসছেন। উনার একটা বিশ্রি অভ্যাস আছে। প্রত্যেকবার দেশে আসলে বাবা লুকিয়ে লুকিয়ে আমার পিছু নেন। প্রতিদিন অবশ্য না, মাঝে মধ্যে। আমি সত্যি ক্লাসে যাই কি-না, কার সাথে মিশি, আমার কোন ছেলে বন্ধু আছে কি-না সম্ভবত এসবই চেক করেন। এগুলো উনার একমাত্র কন্যা হওয়ার শাস্তি কিনা আমি জানিনা। তবে আমার ছয় সাতটা বোন থাকলে বেশ হতো। বাবা কাকে ছেড়ে কাকে ধরতেন সেটাই দেখতাম। ছোটবেলা থেকেই আমাকে নিয়ে বাবা অনেক পাগলামী করে আসছেন। আমার বয়স বাড়ার সাথে সাথে উনার পাগলামীর মাত্রাও বাড়ছে। যাইহোক, প্রত্যেকবার দেশ ছাড়ার আগে তিনি ছোট মামাকে এই দায়িত্ব দিয়ে যান। ছোট মামা ঘাড় নেড়ে আশ্বস্ত করেন ঠিকই, কিন্ত একদিনও দায়িত্ব পালন করেন না। আমি যখন প্রথম কলেজে ভর্তি হই তখন থেকেই বাবা এই কান্ডগুলো করে যাচ্ছেন। বাবার ধারণা এই পিছু নেওয়ার ব্যাপারটা আমি মোটেও টের পাইনা। কিন্তু এ পর্যন্ত উনার কোন ধারণা কোন কালেই ঠিক হয়নি। তবে একটা ব্যাপার কিভাবে যেন ঠিক হয়ে গেলো!” এতক্ষণে শ্রাবণের ফোলা মুখ দিয়ে কথা বেরুলো। ভ্র কুচকে জিজ্ঞেস করলো,

–“কোন ব্যাপারটা? আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম,
–“এইযে তোমার পাল্লায় পড়ে গেলাম।
–“ওটা “পাল্লা” না তিথী। প্রেম হবে।
–“ওই একই কথা। গতবার বাবাকে এয়ারপোর্টে বিদায় দিয়ে আসার পথেই তোমার দেখা পেয়ে গেলাম। যাইহোক, তুমি আসল ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছ তো?”
গাল চুলকাতে চুলকাতে শ্রাবণ বললো,

–“হুঁ। উনি কতদিন থাকবেন?
–“দুইমাস।
–“এই দুইমাস আমাকে বোরকা পড়ে দেখা করতে হবে?
–“তোমার কাছে এরচেয়ে ভাল কোন আইডিয়া আছে?
–“আছে।
–“বলে ফেলো।
–“এই দুইমাস দেখা না করলেই তো হয়!

শুধু শুধু আমার বোরকা পড়ে সঙ সাজা লাগলোনা। বুদ্ধি কেমন? আমি অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে আকাশে দিকে তাকিয়ে রইলাম। হুটহাট করে চোখে জল চলে এলে এটা করতে হয়। দুইমাস দেখা না হলে কার বেশি কষ্ট হবে আমি জানিনা। তবে এই মাথামোটার “মাথায়” বেশি স্বাস্থ্য হয়ে গেছে। কমানো দরকার। আমার এভাবে আকাশে তাকিয়ে থাকার অর্থ শ্রাবণ ভালোই বুঝতে পারে। অস্থির হয়ে সে জিজ্ঞেস করলো,

–“কী হয়েছে?

আমি মুখ নামিয়ে হাসলাম। চোখে জল, ঠোঁটে হাসি। শ্রাবণের ভাষ্যমতে হাসিকান্নার এই মিশ্রনে আমাকে দেখতে অপূর্ব লাগে। আমি আমার অপূর্ব চেহারায় একরাশ মুগ্ধতা যোগ করে বললাম,

–“কিছুনা। মাঝে মাঝে তুমি এত সুন্দর করে কথা বলো যে, তুমি নিজেই জানোনা কি বলছো! যাইহোক, বুদ্ধি কিন্তু খারাপ নাহ। তাহলে দুইমাস পরেই আমাদের দেখা হবে। তবে যদি কখনো দেখা করতে ইচ্ছে করে তাহলে অবশ্যই বোরকা পড়ে আসবে। আমি কোন রিস্ক নিতে চাইনা। তুমি প্রমিস করো।”

–“প্রমিস।

আমি আর কথা না বাড়িয়ে রিক্সা ডাকলাম। শ্রাবণ আমাকে রিক্সায় তুলে দিল। বাড়িতে ফিরেই বাবা হাসিমুখে একটা বিশাল সারপ্রাইজ দিলেন। এবার তিনি দুইমাস নয়, চারমাসের ছুটি নিয়ে দেশে এসেছেন। এটা আমাদেরকে আগে জানানো হয়নি। সারপ্রাইজ হিসেবে রেখে দিয়েছিলেন। ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে আমি শ্রাবণকে কল দিলাম। তাঁরও সারপ্রাইজ হওয়ার অধিকার আছে। শ্রাবণ ঠান্ডা গলায় জানতে চাইলো এত লম্বা ছুটির কারন কি? আমি বললাম,

–“তোমারতো অনেক বুদ্ধি। অনুমান করো।
–“অনুমান সঠিক হলে কি হবে?
–“তুমি যা বলবে তাই হবে। শ্রাবণ সময় নিলোনা। গড়গড় করে বলতে লাগলো,
–“গতবার তুমি বায়না ধরেছিলে কাশ্মীর ঘুরতে যাবে।

তোমার বাবা বলেছিলেন সামনের বার এসে নিয়ে যাবেন। সো এবার তোমরা অনেকটা সময় নিয়ে কাশ্মীরসহ নানান জায়গায় বেড়াতে যাচ্ছো। শুধু ঘুরতে ঘুরতে বাবার সাথে ডুবাই চলে যেওনা। তাহলে দেখা যাবে আমার হৃদয়খানাই মরুভূমি হয়ে যাবে। হে হে হে। বাই দ্যা ওয়ে, আমার অনুমান কেমন হলো?

–“একদম হনুমানের মতো। শ্রাবণ ব্যাথাভরা কন্ঠে বলে উঠলো ,
–“এভাবে বলেনা তিথী। আমার কষ্ট হয়।
–“যথেষ্ট কথা বলেছো।

এবার আসল কথা শোনো। বাবা এই দুইমাস আমাকে নিয়ে ঘুরতে আসেন নি। এসেছেন বিয়ে দিতে। পাত্র বাবার দূরসম্পর্কের ভাইয়ের ছেলে। কোন এক বিয়ের অনুষ্ঠানে আমাকে দেখে আমার পাল্লায় পড়ে গেছে। আমেরিকা থাকে। বিয়ে করে আমাকেও নিয়ে যাবে।

–“ও আচ্ছা।
–“তোমার কি মন খারাপ হচ্ছে?
–“হচ্ছে।
–“কী করলে মন ভালো হবে?
–“তোমার বাবাকে এক্ষুনি ডুবাই পাঠিয়ে দিলে।
–“সেটাতো সম্ভব না।
–“তাহলে উনাকে আমার কথা বলে দাও।
–“এটাও সম্ভব না। বাবা কষ্ট পাবেন। শ্রাবণ উশখুশ করতে করতে বলল,

–“ভেবেছিলাম এমবিএ কমপ্লিট করে বিয়েটা করবো। কিন্তু তোমার বাবা এত তাড়াহুড়ো কেন করছেন বুঝলাম না।
–“ভাল ছেলে হাতে পেলে সব বাবারই তাড়াহুড়ো লেগে যায়।
–“কি এমন ভাল ছেলে পেয়েছেন বুঝলাম না। আচ্ছা তুমিই বলোতো, ঐ ছেলের এক্সট্রা এমন কিছু কী আছে, যা আমার মধ্যে নেই?
–“তোমার কী কী আছে আগে সেটা শুনি?
–“একটা মেয়েকে আর্থিক দিক দিয়ে সুখী রাখতে যা যা প্রয়োজন তার সবই আছে। তুমিতো জানোই সব। নতুন করে কি বলবো।
–“আমি জানি তোমার সব আছে। কিন্তু একটা জিনিস নেই।
–“কী?
–“দাড়ি।
–“আমাদের দুই দুইটা বাড়ি কি তোমার চোখে লাগেনা?
–“বাড়ি নারে ভাই, দাড়ি বলেছি।
–“কীহ!

–“দাড়ি দাড়ি। ছেলেদের গালে আর থুতনীর নিচে যে” শ্রাবণ আমাকে থামিয়ে বললো,
–“বুঝতে পেরেছি। সঙ্গাসহ উদাহরণ দিতে হবেনা।
–“গুড!
–“সিরিয়াসলি! তোমার বাবা দাড়িওয়ালা ছেলে পছন্দ করেন?
–“হুঁ। স্টাইলিশ দাড়ি না আবার। সুন্নতি দাড়ি। একদম “হাশিম আমলা” টাইপ। এখন বলো, এই যুগের ছেলে হয়ে একমুঠ দাড়ি রাখার মতো কলিজা আছে তোমার?
–‘থাকবেনা কেন। কলিজা, গিলা, গোরদা, মাংস সবই আছে। গাল চুলকাতে একটু সমস্যা হবে। তবে ব্যাপার নাহ।”
–“আমি কিন্তু সিরিয়াস।
–“আমিও সিরিয়াস। আমি হাসি চেপে বললাম,
–“আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখে নিজেই ক্রাশ খাও। আর তুমি রাখবে দাড়ি! ইম্পোসিবল। শ্রাবণ হেসে বলল,
–“শ্রাবণের কাছে অসম্ভব বলে কোন কাজ নেই। শ্বশুরবাবাকে খুশি করার জন্য এটুকু আমি করতেই পারি।
–“খুশিটা করবে কিভাবে? আরেকজনতো অলরেডি বাবাকে পটিয়ে ফেলেছে।
–“সেটা তোমাকে ভাবতে হবেনা। কিন্তু তোমার বাবা এত আজিব মানুষ আগে বলোনি কেন? আমি থমথমে গলায় বললাম,

–“আমার বাবাকে মোটেও আজিব বলবেনা। একদম কঠিন ব্রেকাপ করে দিবো। এরপর একহাত লম্বা দাড়ি বানিয়ে আমার সামনে ঘুরঘুর করলেও লাভ হবেনা।
–“আচ্ছা ঠিক আছে, বলবোনা। রেগে যাচ্ছো কেন? রাগলে তোমাকে মোটেও ভাল দেখায়না।
–“কী করলে ভাল দেখায়?
–“ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁঁদলে। তুমি তো এত সহজে কাঁঁদোনা। তাই ঐ দৃশ্য দেখাও হয়না।

হঠাৎ করেই আমার চোখ ভিজে গেল। ঝাপসা চোখে মানুষটাকে দেখতে ইচ্ছে করছে খুব। আচ্ছা ওর ও কি আমাকে দেখতে ইচ্ছে করছেনা? আমার জন্য একটাদিন বোরকা পড়লে কি এমন ক্ষতি হয়ে যাবে! ভেজা চোখে আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলাম। শ্রাবণ বলল,

–“এভাবে হা করে আকাশের দিকে না তাকিয়ে একটু নিচে তাকাও। তোমার কান্নামুখটা একটু দেখি।” আমি ঝট করে নিচে তাকালাম। কিন্তু ওকে দেখতে পেলাম না। জিজ্ঞেস করলাম,
–“কোথায় তুমি?
–“নিচে নেমে তোমাদের গ্যারেজে এসো। এভাবে সারাজীবনেও খুজে পাবেনা।
–“একমিনিট দাড়াও। বাবা কি করছে দেখে আসছি।

দুপুর বেলা খাওয়া-দাওয়া করে বাবা রুমে শুয়ে আছেন। আশা করছি এই ঠান্ডা ঠান্ডা বৃষ্টির দিনে আমার পিছু না নিয়ে বাবা লম্বা ঘুম দিবেন। তারপরও যদি ফলো করেন, তাহলে বাকিটা আল্লাহ ভরসা। সিড়ি ভেঙে নিচে নামতেই কেউ একজন একহাতে আমার চোখ আর অন্যহাতে মুখ চেপে ধরলো। প্রথমে একটু ঘাবড়ে গেলেও, শ্রাবণের জঘন্য বডি স্প্রের গন্ধে ঠিকই ওকে চিনে ফেললাম। চোখ খুলে দেখলাম বেচারা সত্যি সত্যি বোরকা পড়ে এসেছে। মুখের ওপর থেকে কালো কাপড়টা সরিয়ে গম্ভীর মুখে শ্রাবণ বলল,

–“ঠিকঠাক আছে তো? নাকি একটু লিপস্টিক লাগাবো? ওটাই বাকি আছে।”

আমি এবার হেসে ফেললাম। শ্রাবণ একটু নরম হলো। সে এক’পা দু’পা করে আমার দিকে এগিয়ে আসছে আর আমি তিন’পা চার’পা করে পিছিয়ে যাচ্ছি। একসময় দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেল আমার। শ্রাবণ এক হাত দেয়ালে রাখলো। একদম আমার মাথার কাছেই। তারপর আমার চোখের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,

–“আমার সত্যি সত্যি লিপস্টিক লাগাতে ইচ্ছে করছে কিন্তু।” আমার হাসি থেমে গিয়ে চোখ বড় বড় হয়ে গেল। গলা শুকিয়ে আসছে। তোতলাতে তোতলাতে বললাম,
–“সরো বলছি। নাহলে কেঁঁদে ফেলবো কিন্তু!
–“কাঁঁদোনা প্লিজ! খুব দেখতে ইচ্ছে করছে।
–“তুমি সরবে নাকি কাতুকুতু দিবো?

কথায় কাজ হয়েছে। লাফ দিয়ে শ্রাবণ সরে দাড়াতেই দেখলাম বাবা কপাল কুচকে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছেন। আমি বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। শ্রাবণের বোরকা পড়াটা পুরোই জলে গেল! এভাবে আহাম্মকের মত ধরা খেয়ে যাব ভাবিনি। বাবা শ্রাবণের মুখটা ভালো করে স্ক্যান করছেন। গাধাটা এতই শকড হয়েছে যে, মুখটা যে ঢাকবে সেই বুদ্ধিটাও মাথায় আসছেনা। অতঃপর বাবা আমাকে নিয়ে উপরে চলে আসলেন। বাবার অনেকগুলো চমৎকার রেকর্ডের মধ্যে একটা হলো, এইজীবনে তিনি কখনোই আমাকে বকাঝকা করেন নি। গায়ে হাত তুলাতো দূরের কথা। কিন্ত আমার ক্ষীণ আশংকা হচ্ছিলো যে এবার বোধহয় সেই রেকর্ড ভেঙে ফেলবেন। বাবার কপালটা এখনও কুঁচকে আছে। তারমানে তিনি এখন সিরিয়াস। সিরিয়াস মুডে থাকলে বাবা আমাকে ‘তুমি’ করে বলেন। এবারও তার ব্যাতিক্রম হলোনা। শান্ত কন্ঠে বললেন,

–“ওটা কি ছেলে ছিল? আমি মাথা ঝাকিয়ে বললাম,
–“জি বাবা।
–“সত্যি ওটা একটা ছেলে ছিল? আমি আবার মাথা ঝাকালাম,
–“জি বাবা।
–“তুমি কি ওটাকে পছন্দ করো?

আমার মন খারাপ হয়ে গেলো। বারবার “ওটা, ওটা” বলার কি আছে বুঝলাম না। মানুষটার নাম জিজ্ঞেস করলেইতো হয়। আমি আস্তে করে বললাম,

–“ওর নাম শ্রাবণ বাবা। খুবই ভালো ছেলে।
–“ভালো ছেলেরা বোরকা পড়ে ঘুরায়? লিপস্টিক লাগাতে চায়? আমি চুপ করে আছি। বাবা কিছুক্ষন ভেবে বললেন,
–“বিয়ের জন্য প্রস্তুত হও। একসপ্তাহের মধ্যে তোমার বিয়ে হবে।”

কথাটা বলেই তিনি উঠে চলে গেলেন। পুরো ব্যাপারটা আমার মাথার ওপর দিয়ে গেলো। এতবড় ধাক্কা সহ্য করতে না পেরে ঘামতে ঘামতে আমি জ্ঞ্যান হারিয়ে ফেললাম। বিয়ের আগের দিন সকালবেলা কাউকে কিছু না বলে পাত্র আমেরিকা চলে যাওয়ায় আমার বিয়েটা হলোনা। পাত্র কেন এমন করলো কেউ জানেনা। তবে আমি নিশ্চিত এর পেছনে শ্রাবণই আছে। কিন্তু আমি ওর কাছে কিছু জানতে চাইলাম না। কোন এক গভীর রাতে আমার যখন ঘুম আসবেনা, তখন ওর কাচা ঘুম ভেঙে এই গল্পটা শুনতে চাইবো। আপাতত এই রহস্য অজানাই থাকুক। এদিকে বাবা প্রচন্ড ক্ষেপে গেছেন। আমি এই প্রথম মুগ্ধ হয়ে বাবার রাগ দেখলাম। হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে চেচাচ্ছিলেন। আমি সেই অবস্থাতেই বাবাকে জড়িয়ে ধরলাম। বাবা সঙ্গে সঙ্গে শান্ত হয়ে গেলেন। বিষন্ন কন্ঠে বললেন,

–“তোর অমতে বিয়ে দেওয়ার শাস্তি আমি পেয়েছি মা। তবে আমি কথা দিচ্ছি, যেদিন তুই নিজে থেকে বিয়ের জন্য প্রস্তত হবি, সেদিনই তোর বিয়ে দেব।” আমি কিছু না বলে বাবাকে জড়িয়ে ধরে বসে রইলাম। সবকিছু আগের মত স্বাভাবিক হয়ে গেল। শ্রাবণ এমবিএ কমপ্লিট করার জন্য কানাডায় চলে গেল। দুই বছর পর যখন সে দেশে ফিরলো, তখন খুশিতে আমার কান্না চলে আসার মতো অবস্থা হলো। কিন্তু কাঁঁদলাম না। এই ছেলের সামনে এত মহাব্বত দেখানো ঠিক হবেনা। টলমল চোখে আমি দেখা করতে গেলাম। কিন্তু ওকে দেখার পর আমার টলমল চোখের সব পানি শুকিয়ে গেলো। শ্রাবণ হাসতে হাসতে ওর গালভর্তি দাড়িতে হাত বুলিয়ে বলল,

–“সারপ্রাইজ কেমন লাগলো? ভিডিও কলে সামনে না আসার রহস্যটা এবার ক্লিয়ার হয়েছে তো?”

আমি উপর নিচে মাথা নাড়লাম। এই দুইবছর ভিডিও কলে সে শুধু আমাকেই দেখে গেছে। আমি ওকে দেখিনি। কারণ জিজ্ঞেস করলে বলতো, কানাডায় এসে আরো হ্যান্ডসাম হয়েছি। তোমার নজর লাগতে পারে। দেশে ফিরলেই নাহয় নজরটা দিও!”- তবে এই চেহারায় নজর লাগার কোন চান্স আছে বলে মনে হয়না। ওকে যে কি পরিমাণ অদ্ভুত লাগছে সেটা বলে বুঝানো যাবেনা। বাবাকে খুশি করার জন্য শ্রাবণ সত্যি সত্যি এটা করবে আমি ভাবিনি। প্রথমদিকে আমি ওকে চিনতেই পারিনি। ভাগ্যিস সেই বডি স্প্রেটা এখনও ব্যবহার করে। তবে একদিক দিয়ে ভালোই হয়েছে। শ্রাবণের আগের চেহারা আর এখনকার চেহারার মধ্যে স্কাই-গ্রাউন্ড পার্থক্য। সেইক্ষেত্রে বাবার “ওটাকে” চিনতে পারা অসম্ভব।

একমাস পর কোনো এক শুক্রবার দিন আমার সাথে আসিফুল হকের বিয়েটা হয়ে গেল। শ্রাবণের ভালো নাম আসিফুল হক। নিরাপত্তার সুবিধার্থে “শ্রাবণ” নামটা গোপন রাখা হয়েছে। আমি হলে বসে আছি। যাকে পাচ্ছি তাকেই বলছি একটু চিমটি কেটে দিতে। এটা স্বপ্ন নাকি সত্যি ঘটছে সেটাই বুঝতে চাচ্ছি। দূর থেকে দেখলাম ছোটমামার ছেলে সিয়াম হেলতে দুলতে আমার দিকে এগিয়ে আসছে। ও কাছে আসতেই আমি বললাম,

–“আমার হাতে চিমটি কাট তো। সিয়াম আমার হাতে চিমটি কেটে বললো,
–“আসিফ ভাইয়ার আরেক নাম কি “ওটা”? ফুপার মুখে শুনলাম।” আমি বুকের ভেতর ধক করে উঠলো। বাবা শ্রাবণকে চিনে ফেলেননি তো! কিন্তু এটা কিভাবে সম্ভব? আমি সিয়ামকে জিজ্ঞেস করলাম,

–“কিছু হয়েছে নাকি?
–“কিছু না, অনেক কিছুই হয়েছে। ঘটনা তো বিশাল।
–“কি হয়েছে বল না ভাই।
–“ঘটনা হচ্ছে,

কাজীসাহেব বিয়ে পড়ানোর পর ফুপা একটা খেজুরের প্যাকেট বের করলেন। আসিফ ভাইয়ের জন্য স্পেশাল খেজুর। আসিফ ভাইয়া খুব আগ্রহ করে একটা খেজুর খেলেন। ফুপা হাসিমুখে বললেন, আরেকটা খাও বাবা। আমার ভালো লাগবে। আসিফ ভাই ফুপাকে খুশি করার জন্যে আরেকটা খেজুর মুখে দিলেন। কিন্তু খাওয়ার মাঝে হঠাৎ করেই উনার কাশি শুরু হয়ে গেল। সে কী কাশিরে বাবা। আমি ভাবছিলাম যক্ষা টক্ষা নেই তো আবার! সেটা হলে খুব মুশকিল হয়ে যাবে। শুক্রবার দিনে বেশির ভাগ ফার্মেসি বন্ধ থাকে। এমন দিনে ফুলকোর্স অসুধ কোথায় পাবো?” আমি সিয়ামের মাথায় চাটা মেরে বললাম,

–“ঢঙ বন্ধ করে আসল কাহিনী বল!
–“আচ্ছা ঢঙ বন্ধ। যা বলছিলাম।

ফুপা খুব যত্ন করে নিজ হাতে পানি খাইয়ে দিলেন। কিন্তু আসিফ ভাইয়ার কাশি থামেনা। কাশতে কাশতে হঠাৎ ভাইয়ার ডানগালের দাড়ি খুলে ঝুলে পড়লো। এবং ফাইনালি উনার কাশি থামলেও, নতুন উদ্যমে হেচকি শুরু হয়ে গেল। আমার মনে হল, এভাবে ঝুলে থাকা দাড়ি নিয়ে খেজুর খেতে উনার অসুবিধা হবে। তাই একটানে পুরোটা খুলে টেবিলে রেখে দিলাম। শালা হিসেবে এতটুকু হেল্প তো করাই যায়। কি বলো আপা? ছোটমামা ডাক দেওয়ায়, সিয়াম যেভাবে হেলেদুলে এসেছিলো সেভাবেই চলে গেল। গাড়িতে উঠার পর থেকেই শ্রাবণ বকবক করে যাচ্ছে। যেন কিছুই হয়নি। বাবার জন্য খুব খারাপ লাগছে। আমার ওপর সাংঘাতিক রেগে আছেন। কঠিন মুখে আমাকে গাড়িতে তুলে দিয়ে ঠাশ করে দরজা লাগিয়ে দিয়েছিলেন। আমি ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে শ্রাবণের দিকে তাকালাম। একটা মানুষ যে এতটা নাটকীয় হতে পারে, সেটা ওকে না দেখলে বুঝতে পারতাম না। গাল চুলকাতে চুলকাতে শ্রাবণ বললো,

–“নদী পেরিয়ে ঘাটে উঠে গেছি। এখন নৌকা ডুবলেও সমস্যা নেই। কি বলো? আমি চুপ করে থাকলাম। কথা বলতে ইচ্ছে করছেনা। শ্রাবণ আবার বললো,
–“আচ্ছা তুমি আজকের দিনটাতেও কাঁদলে না কেন বলতো!

কত আশা করে অপেক্ষা করছিলাম তোমার কান্না দেখবো বলে। কিন্তু অশ্রুর বদলে ঐ চোখ দিয়ে তো রীতিমত আগুন ঝরছিলো! যাক, বাদ দাও। আজ প্রথম তুমি আমার বাড়িতে পা রাখবে। আমি নিজের হাতে রান্না করে তোমাকে খাওয়াতে চাই। তুমি শুধু একবার বলো কি খেতে চাও।” আমি এবার শ্রাবণের দিকে ঘুরে বসলাম। তারপর ওর কলার ধরে দাতে দাত চেপে বললাম,

–“তোমার কলিজা, গিলা, গোরদা আর মাংস ভূনা। ঝাল ঝাল করে। চিন্তা করোনা। আমিও হেল্প করবো। রান্নার আগের কাটাকুটিটা আমি শখ করেই করি!

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত