অপরাধ চাপা থাকে না

অপরাধ চাপা থাকে না

(১)

বেশ কয়েকদিন ধরে গগন গাইনের মগজাস্ত্রটি বিশ্রামে রয়েছে। আর এই বিশ্রামটা পরিবারের সাথে ভালোভাবে উপভোগ করছে ও। আর এই সময়টাকে কাজে লাগিয়ে স্ত্রী ও পুত্রের সকল অভিযোগ দূর করার চেষ্টা করছে। কাজের মধ্যে ডুবে থাকলে ক্ষুধা, তৃষ্ণা, স্ত্রী, পুত্র সব কিছুই ভুলে যায় গগন। আর স্বাভাবিক কারণে অভিমানের মেঘ জমে পরিবারের মনে। তাই এই অবসর সময়টাকে যথার্থ ভাবে কাজে লাগাতে সপরিবারে পুরী বেড়াতে এসেছে ও। এখন সে একা সমুদ্রের পাড়ে। অলস সূর্য এখনো হালকা লালচে চাদর মুড়ি দিয়ে উঠি উঠি করেও উঠছে না। আর সমুদ্র তাকে লুকিয়ে রেখে, গগনের পায়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে সূর্যকে আরও ঘুমোতে দেওয়ার অনুমতি চাইছে। শুধু অনুরোধ নয়, বকাবকিও করছে সে। গগন গাইন সেই বকাবকি, অনুরোধ শুনেও অধীর আগ্রহে সূর্যের ঘুম ভাঙার প্রতীক্ষা করছে। গগনকে নিরাশ না করে অল্পক্ষণের মধ্যেই সূর্য উঠল, আর গগন তা চোখের সিরিঞ্জ দিয়ে শুষে নিল। মস্তিষ্ককে পরিশ্রম করিয়ে দিন যাপন করা প্রত্যেকটি মানুষেরই এমন ভাবে নিয়ম করে সূর্যোদয় দেখা উচিৎ। পাখির গান শোনা উচিৎ। ভোরের নরম আলোতে নিরুদ্বেগ চিত্তে বেড়ানো উচিৎ। ঠিক যেমনটা আজ গগন করছে। এতে মগজাস্ত্রটির ধার বাড়ে।

তিন দিনের ছুটি কাটিয়ে পুরী থেকে ফিরল গগনরা। বাড়ি ফিরে রাতের খাওয়া সেরে রোজের চেয়ে একটু তাড়াতাড়িই শুয়ে পড়ল আজ। আর তার ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই একটা অচেনা নম্বর থেকে ফোন এলো গগনের। নম্বরটি ভারতের নয়, বাইরের। একটু ইতস্তত করেই ঘুম চোখে ফোন ধরল গগন।

গগন, আমি অন্বেষণ দা বলছি। ঘুমিয়ে পড়েছিলে নাকি?

হ্যাঁ, কিন্তু আপনি এই নম্বরে? কোথা থেকে বলছেন?

বাংলাদেশ থেকে। এখানে একটা খুন হয়েছে। তোমাকে আমার খুব দরকার। তুমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ভিসা করে, ফ্লাইটে এখানে চলে এসো। ততক্ষণ আমি তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছি।

সে আসছি। কিন্তু আপনার মত প্রবীণ সি.বি.আই অফিসার থাকতে আমাকে কি দরকার আছে?

অবশ্যই দরকার আছে। তুমি তো সম্প্রতি বেশ কয়েকটা কাজ ভালোভাবেই উৎরেছ। আমার বয়েস হয়েছে। আমি এখন বাতিলের খাতায়। তোমার কেরিয়ারের শুরুতে তুমি আমাকে অ্যাসিস্ট করেছ, এখন নয় আমি তোমাকে অ্যাসিস্ট করব।

না, না। আমি চিরকাল আপনার সাহায্যকারী, আপনার ছাত্র হয়েই থাকতে চাই।

ঠিক আছে। তাড়াতাড়ি চলে এসো। দুজন মিলেই কেসটা শলভ করা যাবে। কালই তোড়জোড় শুরু করে দাও। আমি তোমার অ্যাকাউন্টে কিছু টাকা পাঠাবার ব্যবস্থা করছি।

ওকে, আপনার কথামতই কাজ হবে।

ফোন রেখে আবার চোখ বুজল গগন। তবে ঘুম এলো না। নানা রকম চিন্তা মাথার মধ্যে ঘুর পাক খেতে লাগলো।

(২)

রনজিত মজুমদারের সাথে অন্বেষণের বন্ধুত্বটা বংশ সূত্রে পাওয়া। দুজনের ঠাকুরদা ছিল একেবারে হরিহর আত্মা। এরপর দেশ ভাগের পর দুই পরিবার দুই দেশে চলে আসায় সম্পর্কে একটা বিচ্ছেদ ঘটে। তবে ফেসবুকের মাধ্যমে দুটি পরিবার পরস্পর পরস্পরকে আবার খুঁজে পায়। এরপর মেসেঞ্জার, হোয়াটস-অ্যাপ, ভিডিও চ্যাটের দৌলতে আর দূরত্বটা কোনও বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। এরপর হঠাৎ একদিন রণজিতের সেরিব্রাল অ্যাটাক হয়। বাংলাদেশে চিকিৎসা করে তেমন সুফল না পাওয়ায় অন্বেষণের সাহায্যে চেন্নাই-এ এসে চিকিৎসা করে। চিকিৎসায় রনজিত মজুমদার সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেলেও তার প্রেসোপ্যাগ্নোসিয়া অর্থাৎ ফেস ব্লাইন্ডনেস হয়। তা থেকে এখনো সেরে উঠতে পারেনি রনজিত। কারো মুখ দেখেই উনি তাকে চিনতে পারেন না। গলার স্বর, কথা বলার প্রকৃতি শুনে ও চেহারা দেখে মানুষ চিনতে হয় রনজিত কে। সে সময়ে রনজিত ও তার স্ত্রী অনুপমা কয়েকদিন অন্বেষণের বাড়িতে থেকে ছিল। তখনই রনজিত ও অনুপমা, অন্বেষণদের বাংলাদেশে যাওয়ার জন্য আন্তরিক ভাবে অনুরোধ করেছিলেন। রনজিতরা বাংলাদেশে পৌঁছেও ফোন ও নানা প্রকার সামাজিক মাধ্যমের সাহায্যে সেই অনুরোধ চালিয়ে যান। বন্ধুর এই আবদার অনুরোধ ফেলতে না পেরে স্ত্রী ভাস্বতীকে নিয়ে বাংলাদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন এই এক্স সি.বি.আই অফিসার অন্বেষণ কর। ভাস্বতীর আকাশ পথে একটা ভীতি রয়েছে। মূলত সে কারণে, এবং যাত্রাপথে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ভালভাবে অনুভব করার জন্য ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী এক্সপ্রেসে স্লিপার ক্লাসে টিকিট কাটেন অন্বেষণ।

ইমিগ্রেশন সেরে ট্রেনে ওঠেন অন্বেষণরা।  স্লিপার ক্লাসে ছোটো ছোটো ক্যুপ রয়েছে। কোনও ক্যুপে ওপর নিচ মিলে দুটি বার্থ, কোনোটতে চারটি। দুটি বার্থের ক্যুপে তিনজনের বসার সিট।  স্লাইডিং ডোর টেনে দিলে সম্পূর্ণ পৃথক একটি ঘর। প্রতিটি ঘরেই দরজার ওপরের দিকে একপাশ করে একটি সাদা চারকোনা বাক্স লাগানো আছে। বাক্সটির ঠিক মাঝখানে একটি বৃত্তাকার নব রয়েছে। যেটি ঘোরালেই বাক্সটির পাশে থাকা সহস্র ছিদ্র যুক্ত স্পিকার থেকে বাংলা গান শোনা যায়। দুই বার্থের একটি কামরায় অন্বেষণ ও ভাস্বতীর সিট। স্পিকারে মান্না দের গান চলছে। ওনাদের সঙ্গে চলেছেন এক ভদ্রমহিলা। বয়স আনুমানিক ষাট। পোশাক–আশাক বলছে যে ভদ্রমহিলা মুসলিম। মুখশ্রীতে একটা আভিজাত্যের ছাপ রয়েছে। জানালা দরজায় রঙ্গিন পর্দা টাঙানো। স্বচ্ছ কাঁচ লাগানো জানালার পর্দা সরালে সুদৃশ্য প্রকৃতি, বাংলাদেশের গ্রাম বাংলা ধরা দেয়। জানালার ধারে বসে সেই শস্য শ্যামলা বাংলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অনুভব করে চলেছে অন্বেষণ। চারিদিকে সবুজের সমারোহ। আর নীল আকাশে ছড়িয়ে আছে সাদা মেঘ। যেন থোকা থোকা তুলো বিছিয়ে রেখেছে কেউ নীল বেড কভারে। ভাস্বতী অবশ্য মহিলাদের চিরাচরিত ধর্ম অনুযায়ী অপরিচিত ভদ্রমহিলার সাথে আলাপ জমিয়ে পরিচিত হওয়ার চেষ্টায় মেতেছে। ভদ্রমহিলার দুই মেয়ে। বড় মেয়ে ডাক্তার। আর ছোটো মেয়ে সম্প্রতি দিল্লিতে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে দিল্লিতেই একটি চাকরিতে ঢুকেছে। সেই মেয়ের কাছেই কিছুদিনের জন্য বেড়াতে গিয়েছিলেন এই ভদ্র-মহিলা। এখন ঢাকায় বড় মেয়ের কাছে চলেছেন। সেখানে দু-একদিন থেকে পৈত্রিক ভিটেতে ফিরবেন উনি।

ভাস্বতী হট-পটে করে পরোটা ও চিকেন নিয়ে এসেছিলেন। তা দিয়েই লাঞ্চ সারলেন ওরা। সহ-যাত্রী ভদ্র-মহিলাকেও তাদের খাবারের ভাগ দিলেন, আর ওনার আনা রুটি তরকারি থেকে তরকারির ভাগ বসালেন ভাস্বতী। ওপরের বার্থটিতে ওঠার জন্য নিচের বার্থটির পাশে তিন ধাপের সিঁড়ি রয়েছে। লাঞ্চ সেরে ভাস্বতীর বারণকে অগ্রাহ্য  করে অন্বেষণ সেই সিঁড়ি দিয়ে ওপরের বার্থে উঠলেন। বয়স হলেও তার শরীর এখনো যথেষ্ট সতেজ রয়েছে। ওপরে উঠে একটু গড়িয়ে নিলেন। স্পিকারে এখন গান বন্ধ হয়ে নামাজ হচ্ছে। প্রতিটি কামরাতে মোবাইল বা ল্যাপটপ চার্জ দেওয়ার সুব্যবস্থা রয়েছে। নিজের মোবাইলটি চার্জে দিয়ে, তাতে হেড ফোন গুজে রবীন্দ্রসঙ্গীত চালালেন উনি।

ট্রেন বাংলাদেশীয় সময় বিকেল পাঁচটা নাগাদ ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট পৌঁছল। স্টেশনে নেমে  ইমিগ্রেশন সেরে অন্বেষণরা বাইরে বেরিয়েই দেখলেন যে “ঢাকা মেট্রো–খ/৫৬-৪৫৬১” নম্বরের গাড়িটি ও গাড়ির সামনে বন্ধু রণজিতের ছোটো ছেলে স্বাগত দাঁড়িয়ে তাদের  জন্য অপেক্ষা করছে। নম্বরটি আগেই অন্বেষণকে মেসেজ করে দেওয়া হয়েছিল। তাছাড়া ফেসবুকের সহায়তায় বন্ধুর ছেলেকে চিনতেও কোনও অসুবিধে হল না অন্বেষণদের। গাড়িতে উঠে ঢাকা শহরের বিখ্যাত যানজট কাটিয়ে, অন্বেষণরা যখন ঢাকার ধানমন্ডিতে বন্ধু রণজিতের বাড়ি পৌঁছলে্‌ন, তখন স্থানীয় সময় রাত আটটা।

পাঁচিল ঘেরা একটি বাড়ির লোহার গেটের সামনে গাড়ি থামল। বেশ অনেকটা জমি নিয়ে ধানমন্ডিতে রনজিত মজুমদারের বাড়ি। পাশাপাশি দুটি দালান বাড়ি।  রনজিত ও তার ভাই প্রসেনজিৎ সপরিবারে বসবাস করেন এখানে। রনজিত মজুমদারের বাড়িটি একতলা ও প্রসেনজিতেরটি দোতলা। প্রসেনজিতের অর্থনৈতিক অবস্থা যে দাদা রণজিতের থেকে যথেষ্ট ভাল, তা দুটি বাড়ি দেখলেই বোঝা যায়। দুটি বাড়ির সামনে রয়েছে গাছ-পালা ঘেরা একটি উঠোন। উঠোনের একপাশে টিনের শেড দেওয়া গ্যারাজে দুটি গাড়ি থাকে। গাড়ি দুটিই প্রসেনজিতের। গ্যারাজ লাগোয়া একটা কাঁঠাল গাছে, আর অপর পাশে একটা বেল গাছে, একটা করে এল.ই.ডি লাইট লাগানোতে সারা উঠোনটা একটা স্নিগ্ধ নরম আলোর চাদরে ঢাকা রয়েছে। অন্বেষণরা পৌঁছানো মাত্রই ওদের আপ্যায়ন শুরু হল। উঠোনে চেয়ার এনে ওদের বসতে দেওয়া হল। কেউ ওদের লাগেজ ঘরে নিয়ে গেল। কেউ বা গ্লাসে জল এনে মুখের সামনে ধরল। অন্বেষণ ও ভাস্বতীর সাথে পরিবারের সকলে আলাপ পরিচয় করে নিল।

রনজিত মজুমদার, বয়স পঁয়ষট্টির মত, মাথার পিছন দিকে একসারি পাকা চুল, আর  সামনের দিকে একটা বড় টাক রয়েছে। একটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন বিজ্ঞান শিক্ষক। ওনার স্ত্রী অনুপমা সাধারণ গৃহবধূ হলেও রন্ধনে বেশ পটু। নিরামিষ ও আমিষ কত রকমের রান্না যে তিনি জানেন, তা গুনে শেষ করা যাবে না। ওনাদের এক মেয়ে, দুই ছেলে।

মেয়ে সংযুক্তা সবার বড়। তার শ্বশুরবাড়ি চট্টগ্রামে। সংযুক্তার একটি বছর দশেকের মেয়ে আছে।

রণজিতের বড় ছেলে শাশ্বতর বয়স ত্রিশ–বত্রিশ হবে। দোহারা চেহারা। ধানমন্ডিতেই ওর একটা ওষুধের দোকান আছে। বছর দুয়েক হয়েছে তার বিয়ে হয়েছে। তার স্ত্রী মণিকা, বয়স বছর পঁচিশ ছাব্বিশ হবে। একটি বেসরকারি নার্সিংহোমে নার্সের চাকরি করে। একটু স্বাস্থ্যবতী তবে মুখশ্রী বেশ সুন্দর।

ছোট ছেলে স্বাগত। ওর বয়সও ওই পচিশ ছাব্বিশ হবে। পেটানো চেহারা। সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে একটা বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরী করছে।

রণজিতের ছোট ভাই প্রসেনজিতের বয়স ষাটের কাছাকাছি। ছোটো খাটো চেহারা, মাথায় কাঁচা পাকা চুল, আর একটি ভুঁড়ি রয়েছে। প্রোমোটারি ব্যবসা করে। সেই সুবাদে অনেক অর্থ ও পরিচিতি, নাম ও বেশ খানিকটা বদনাম উপার্জন করেছে। ওর স্ত্রী বিমলা এখন সম্পূর্ণ রূপে গৃহবধূ হলেও, সে একজন পাশ করা হোমিওপ্যাথি ডাক্তার। এক সময়ে নিয়মিত প্র্যাকটিসও করত সে। তাদের এক ছেলে ও এক মেয়ে। ছেলে শতায়ু সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে কোনও চাকরীতে না ঢুকে বাবার ব্যবসাই দেখছে। আর মেয়ে তনুজা কেমিস্ট্রিতে গ্র্যাজুয়েশন করে মাস্টার্স করছে।

অন্বেষণরা সবার সাথে প্রাথমিক পরিচয় সেরে জার্নির জামাকাপড় চেঞ্জ করে ফ্রেস হয়ে নিলেন। রণজিৎদের ঘর সংখ্যা সীমিত। তাই প্রসেনজিৎদের বাড়ির একতলার একটি ঘরেই আস্তানা হল অন্বেষণদের। স্বাগত একটা সিম কার্ড অন্বেষণের হাতে দিয়ে বলল,

কাকু এইটা আপনার মোবাইলে ভরে নেন। এইটা এইখানকার সিম। যত খুশি কথা বলেন, ইন্টারনেট দেখেন, কোনও সমস্যা নাই।

ধন্যবাদ। এটার খুব দরকার ছিল। বাঃ, তোমার কথা তো দেখছি বেশ পরিষ্কার। বাংলাদেশীয় টান খুব একটা নেই।

বাবা, কাকার কথায় বাংলাদেশীয় টান থাকলেও, আমাদের কথায় তেমনটা পাইবেন না। তাছাড়া ঢাকা, ময়মনসিংহের আঞ্চলিক ভাষার সঙ্গে আপনেদের পশ্চিমবঙ্গের ভাষার অনেকটাই মিল পাইবেন। তবে সিলেট, চিটাগাঙের ভাষা শুনলে আপনে কিছুই বুঝতে পারবেন না।

স্বাগতর সাথে কথা বলে রনজিতদের সাথে ডিনারে বসলেন অন্বেষণ ও ভাস্বতী। খেতে খেতে শারীরিক কুশল বিনিময়ের মাধ্যমেই কথা শুরু করলেন অন্বেষণ।

রনজিত, তোর এখন শরীর কেমন আছে?

এমনিতে তো ঠিকই আছে, মানুষ চিনতেই যা হমস্যা। প্রথম প্রথম কেওরেই চিনন যাইত না। খুব ভাইঙ্গা পড়ছিলাম। এরপর রুবানারে ঠিক করলাম। সে অহন আইস্যা থেরাপি আর কাউন্সিলিং কইরা যায়। অহন কিছুটা ঠিক হইসে। চুল, পোশাক-আশাক দেইখ্যা, গলার স্বর শুইন্যা অহন পরিচিত মাইনসেরে অনেকডাই ঠাহর হয়।

রুবানা? ইনি কে?

এইহানের নামকরা স্পিচ থেরাপিস্ট। মাইয়াডার কথায় যাদু আছে। ও তো আইয়া আমার সাথে নানা রকম গল্প করে। তাইতেই আমার পরিসানী অনেক কাইট্যা গ্যাসে। আর আমাগো পরিবারের একজন হইয়া গ্যাসে। অহন তো আমিও নানারকম কথা ওর লগে কইয়া শান্তি পাই। কইতে পারস ওর লগে একখান দোস্তি গইরা উঠসে।

তাহলে তো মেয়েটার ট্যালেন্ট আছে বলতে হবে। অসম বয়েসের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে তোলা সহজ কথা নয়।

হঃ, এই বয়সেই ছেমরিটার নতুন ঢাকা শহরে ব্যাশ নাম হইসে। তবে শুধু স্পিচ থেরাপিস্ট না, অল্প বিস্তর ডাক্তারিটাও শিখসে। আমাগো টুকিটাকি প্রয়োজনে ডাক্তারি পরামর্শও হেয় দেয়।

ভাস্বতী এতক্ষণ কোনও কথা না বলে এক মনে খেয়ে যাচ্ছিল। অত্যন্ত সুস্বাদু রান্না, সামান্য বেশী তেল মশলা, তাও জমিয়ে রুই মাছটার স্বাদ আস্বাদন করছেন ভাস্বতী। একটু তেল ঝাল, মশলা বেশী দিয়েই রান্না করার চল এই শহরে। ঝালে জিভ বার করে বড় বড় শ্বাস ফেলতে লাগলেন ভাস্বতী।

ঝাল লাগছে? একটু পানি খাও। তবে এই ঝালে সমস্যা নাই। কাঁচা মরীচের ঝাল, প্যাট খারাপ হইব না। বলল অনুপমা।

এক-চুমুক জল খেয়ে, এক গরাস ভাত মুখে দিয়ে ভাস্বতী জিজ্ঞাসা করল, কিছুক্ষণ আগে প্রসেনজিতের ঘরে দেখলাম একটি অল্প বয়সী মেয়ে এসেছে। ও কে?

ঠাকুরপোর সেক্রেটারি, সুপর্ণা। সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল অনুপমা।

শুধুই সেক্রেটারি! তা হইলে আর এতো রাত কইরা আইত না। কিসে যে আমার ভাইটার মন জুড়াইব, ভাইবা কুল পাইনা। রণজিতের কথার মধ্যে দিয়ে ওনার ভেতরকার চাপা রাগ বেরিয়ে এলো।

কেন? প্রসেনজিৎ কি এমন করেছে? মাছের কাঁটা বাছতে বাছতে প্রশ্নটা করল অন্বেষণ।

কি করে নাই? অনেক ছল চাতুরী কইরা, বহু মানুষের চরম ক্ষতি কইরা, ম্যালা সম্পত্তির মালিক হইসে ও। তার ওপর আছে মাইয়া মানুষের উপর লোভ। নিজেগো মাইয়ার বয়সী ছেমড়ীগোরেও ছাড়ে না। এহন ওর মনে নেতা হওনের সাধ জাগছে। কথা-বার্তা আউগাইয়া গ্যাসে। নেক্সট ইলেকশনেই খাড়াইব। রুলিং পার্টির হইয়া লরতাসে, তার উপর আবার টেহা-কড়িও ম্যালা খরচ করব। জিতনের সম্ভাবনাই বেশী। এমনিতেই ও ভয়ঙ্কর, তার ওপর পলিটিকাল পাওয়ার পাইলে অমন মাইনসের কি অবস্থা হইব হেইটা তো বুঝনই যায়। এই বাসাটা তখন আর বাসা থাকব না, মস্ত বড় অ্যাপার্টমেন্ট হইয়া যাইব। আগে অনেকবার আমারে প্রস্তাব দিসে, রাজি হই নাই। বুঝাইয়া বাঝাইয়া আটকাইছি। হে এম.পি হইলে আর ঠেকান্ যাইব? এক নাগাড়ে অনেকগুলো কথা বলে মনের ভেতরে জমে থাকা একরাশ রাগ, দুঃখ, অভিমান বের করে দিলেন রনজিৎ মজুমদার।

তা তুই ওকে কিছু বলিস না? বড় ভাই হিসেবে তোরও তো ওকে শুধরে দেওয়ার রাইট আছে।

হ, উপদেশ হুননের পাত্র তো? তাও আমি একদিন কইসি, এইভাবে নিজের শত্তুর বাড়াইস না। তোরও তো বয়স হইতাছে। বাইরের লোক ছাড়ান দে। পরিবারের লোকজনেরই তোর কাজকর্ম সব নাপসন্দ। প্রায়শই তো তর পোলার লগে তোর খিচিমিচি লাইগা থাকে দেখি। কইছি, কিন্তু কোনও ফল হয় নাই। ব্যাবাক তেমনই আছে।

অন্বেষণ রণজিতের কথার আর কোনও জবাব না দিয়ে, শুধু “হুঁ” বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করে, উঠোনে কি যেন ভাবতে ভাবতে দুবার পায়চারী করলেন উনি। অতঃপর কি একটা ভেবে প্রসেনজিতের ঘরে ঢুকলেন অন্বেষণ।

বাড়ির দোতলায় শতায়ু, তনুজা ও প্রসেনজিৎদের শোবার ঘর আর ডাইনিং রুম। আর একতলায় প্রসেনজিতের অফিস, ড্রইং রুম ও একটি গেস্ট রুম। তার পাশে একটি ঘর। এই ঘরেই সন্ধ্যের পর থেকে অনেকটা সময় কাটায় প্রসেনজিৎ। বেশ সাজানো গোছানো ঘরটি। বিছানার পাশে একটি টেবিল ও চেয়ার। সেখানে বসেই  মদ্যপান করতে করতে ল্যাপটপে মেল চেক করছিল প্রসেনজিৎ। প্রসেনজিতের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে, অনুমতি নিয়ে ঘরে ঢুকলেন অন্বেষণ। অন্বেষণ এক নজরে ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে দেখলেন যে সেখানে সুপর্ণা, রুবানার মেলও রয়েছে। অন্বেষণকে ভেতরে আসতে বলে নিজের চেয়ারটি এগিয়ে দিয়ে নিজে খাটে উঠে বসলেন।

তোমার সাথে আলাপ করতে এলাম। চেয়ারে বসতে বসতে বললেন অন্বেষণ।

হ্যঁ আয়েন। আপনারেই আমি ডাকতাম। আপনার লগে আমার কিসু কথা আছিল।

আমার সঙ্গে! কি কথা?

কইতাসি। তার আগে জিগাই আপনি আমার বিষয়ে কিছু শুনছেন?

তেমন বিশেষ কিছু নয়। এই তুমি প্রোমটারি ব্যবসা কর।

হ্। আর ব্যবসায় তার ল্যাইগা কিসু পয়সাও কামাই হইসে। আর সেই লগে যশ, পরিচিতিও যথেষ্ট হইসে। বুঝেনই তো পরের সুখ হগ্যলের সয় না। তাই আমারও শত্তুরের অভাব নাই। হের লাইগ্যা অহন আমার খালি মনডা কয় আমারে কেউ শ্যাষ কইরা দিব। নিজেগো লোকেরাই করব। আপনি তো ইন্ডিয়াতে সি.বি.আই অফিসার আসিলেন। তাই আপনেরে আমার মনের কথা খান কইয়া একটু হালকা হওনের চেষ্টা করলাম আর কি!

সেটা ঠিক আছে। কিন্তু তোমাকে খামাখা লোকে মারতে যাবে কেন? আমার মনে হয় একটু বেশীই ভেবে ফেলেছ তুমি।

না, প্রসেনজিৎ মজুমদারের কোনও ভুল হয় না। হের ল্যাইগা আমি সম্প্রতি আমার উইল বদলাইছি। উইলে লিখসি যে, আমার মরণের পর যদি জানন যায় যে আমারে আমাগো পরিবারের কেউ খুন করসে, তবে আমার পরিবারের কেউই আমার সম্পত্তির কোনও ভাগীদার হইব না। যে পুলিশ অফিসার বা গোয়েন্দা আমার খুনিরে ধরতে পারবো, সে আমার সম্পত্তির অর্ধেক পাইবো। আর বাকী অর্ধেক একটা অনাথ আশ্রমে চইলা যাইবো।

তা, তোমার এই উইলের কথা সবাইকে জানিয়েছ তো?

পোলা মাইয়ারে কই নাই। বৌ আর দাদারে কইসি।

আমি বলি কি তোমার মাথা থেকে এই মৃত্যুর ভূত সরিয়ে দাও। এই ভাবে মরার ভয় নিয়ে বেঁচে থাকা, এক প্রকার মরারই সামিল। তার থেকে যতদিন বাঁচো সব ভুলে আনন্দ করে বাঁচো। মরতে তো আমাদের সবাইকেই একদিন না একদিন হবেই। কিন্তু সেই ভয়ে বাঁচার আনন্দটা মাটি করে কি লাভ?

বাঁচতে তো আমিও চাই। হের লাইগ্যাই তো এই প্যাচ লাগাইয়া সিগারেটটা ছাড়সি। দ্যাহেন, বলতে বলতে প্রসেনজিৎ, তার হাতে লাগানো ইঞ্চি দুয়েকের স্কয়ার শেপে স্বচ্ছ ব্যান্ডেজের মতো জিনিষটা দেখায়। এইডারে নিকোটিন প্যাচ কয়। সিগারেট ছাড়নের জন্য রোজ দুইবার কইরা লাগাইতাসি। আগে দৈনিক ২০ -২২টা সিগারেট খাইতাম। আমার হার্টের অবস্থা সুবিধার না। তাই রুবানার অ্যাডভাইস শুইনা এইডা রেগুলার লাগাইতাসি। সুফল ও পাইসি। সিগারেট তো প্রায় ছাইড়াই দিসি।

এইসব প্যাচ ব্যবহার করার তো অনেক ঝামেলা। দুবেলা লাগাও, খোলো। শুনেছি কি একটা ইনজেকশন বেরিয়েছে না, যা কয়েকদিন নিলে সিগারেটের নেশা চলে যায়।সেটা তো ট্রাই করতে পার।

কন কি? ইনজেকশন! ব্যাবাক ভয় ঐডাতে। একবার একডা টিটেনাস ইনজেকশন লওনের সময়, চেঁচাইয়া ব্যাবাক পাড়া মাথায় তুলসিলাম।

তাহলে ইনজেকশন দেওয়ার দরকার হলে কি কর? ঘুমের মধ্যে নাও?

হেই চেষ্টাও একবার করা হইছিল। কোনও লাভ হয় নাই। আমার ঘুম খুব পাতলা, ছুচ ছোয়ন মাত্র আমার ঘুম ভাইঙ্গা গ্যাসে, আর চ্যাঁচাইতে লাগসি। এইবারে আপনার কথা কন। হেই থেইকা শুধু আমার কথাই কইয়া যাইতাসি। আইতে কোনও সমস্যা হয় নাই তো?

না, তেমন কোনও অসুবিধে হয় নি। তবে মারাত্মক ট্র্যাফিক।

হ, ঢাকার জ্যাম দুনিয়ায় জানে। এই শহরে রোজ প্রায়  চার থেকে  সাড়ে চার লক্ষ শুধু রিকশাই চলাচল  করে, গাড়ির কথা ছাইড়াই দিলাম। হের ল্যাইগাই এতো জ্যাম।  আইয়া যখন  পড়সেন, ঘুইরা  ন্যান। মজা পাইবেন। অনেক  কিছু  দ্যাহনের আসে এই শহরে। ঢাকায় যে কয়দিন থাকবেন, আমার একটা গাড়ি ব্যবহার করতে পারেন। সমস্যা হইব না। আমি ড্রাইভাররে কইয়া দিমু হনে।

তাহলে তো ভালোই হয়। আর ঘুরতেই তো এসেছি। কক্সবাজারের দিকে যাওয়ারও ইচ্ছে আছে।

ও আপনার কিছু ভাবন লাগব না। এইহানের লোকাল ট্যুর, কক্সবাজার, সব আমি ব্যবস্থা কইরা দিমু। সবখানে আমারে চিনে। কক্সে ফাইভ স্টার হোটেলে রুম বুক কইরা দিমু।

ফাইভ স্টার দরকার নেই। মোটামুটি একটা ভালো হোটেল হলেই চলবে।

ঠিক আসে, আমি ফোনে ফোনে সব ব্যবস্থা কইরা দিমু। স্বাগত আপনারে গাইড কইরা দিব। কথা গুলো বলে একটা বালিশ বুকের কাছে টেনে অর্ধ শায়িত হয় প্রসেনজিৎ।

অন্বেষণ দেখলেন, প্রসেনজিতের চোখ দুটি ছোটো হয়ে আসছে। সান্ধ্যকালীন সুরাপানের পরিনতি আর কি! নিজেরও বেশ ঘুম পাচ্ছে। আজ তিনি অনেক ভোরে উঠেছেন। একটা বড় হাই তুলে বললেন, যাই এবার শুয়ে পড়ি গিয়ে।

আসেন গিয়া। হেই পাশের ঘরডায় আপনাগো শোয়নের ব্যবস্থা করা হইসে। কাইল আবার কথা হইব। বলে প্রসেনজিৎ শুয়ে পড়ল আর ল্যাপটপটা ওভাবেই খোলা অবস্থায় পড়ে রইল।

(৩)

পরদিন বেশ একটু দেরীতেই ঘুম ভাঙল অন্বেষণের। গতরাতের ঘুমের ঘাটতি বেশ ভাল ভাবেই পূর্ণ করেছেন উনি। হয়তো আরও কিছুক্ষণ বিছানায় থাকতেন, যদি না পাশের ঘরে প্রসেনজিৎ ও শতায়ুর মধ্যে কথা কাটাকাটিতে ওনার ঘুম ভাঙত। একটু কাছে গিয়ে শোনার কৌতুহলে অন্বেষণ ঘরের বাইরে এলেন।

কোনো একটা জমি কেনা নিয়েই বাপ-ছেলের মধ্যে কথা কাটাকাটি চলছিল। জমিটি এক প্রাক্তন শিক্ষক ইসমাইল খানের। ইনি রণজিৎ মজুমদারের বিশেষ পরিচিত। এরা একই স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। ইসমাইল খানের আশেপাশের তিনটি বাড়ি ভাল দাম দিয়ে প্রসেনজিৎরা কিনে নিয়েছেন। কিন্তু ইসমাইল খান তার বাড়ি বেচতে রাজি হচ্ছে না। ভালো দাম ও দু কামরার ভালো ফ্ল্যাটের প্রলোভন সত্ত্বেও ইসমাইল খান তার পৈত্রিক ভিটা ছাড়তে রাজি নন। কিন্তু ঐ জমি না পেলে শতায়ুদের হাউজিং কমপ্লেক্স তৈরি করা সম্ভব নয়।

প্রসেনজিতের বক্তব্য যে এই প্রজেক্টের জন্য সে অনেক টাকা অলরেডি ইনভেস্ট করে ফেলেছে। এই প্রজেক্ট না হলে তার মোটা টাকার লস হবে। এরকম লস করতে সে রাজি নয়। সোজা আঙ্গুলে ঘি না উঠলে আঙ্গুল বেঁকাতে সে দ্বিধা করবে না। তবে নিজে কিছুই করবে না। সামনের ইলেকশনে সে দাঁড়াচ্ছে। তাই এখন তার ইমেজ খারাপ করতে সে চায় না। এমন ভাবে প্রসেনজিৎ কাজটা করতে চায়, যে সাপ ও মরবে, আবার লাঠি ও ভাঙ্গবে না।

শতায়ুর বক্তব্য যে একসময়ে তার বাবা অনেক ঝুট-ঝামেলা সামলে অনেক প্রোজেক্ট করেছে। তখন সে এই ব্যবসায় যুক্ত ছিল না। এখন সে ব্যবসায় ঢুকে সঠিক পথে, কোনরকম ঝামেলা ছাড়া কাজ করতে চায়। তাছাড়া এই বয়সে তার বাবা কোনও ঝামেলায় জড়িয়ে পরুক, সেটাও শতায়ু চায় না। সর্বোপরি ইসমাইল খান তার এক সময়ের শিক্ষক ও জেঠার বন্ধু। তাই তাকে সে কোনও ভাবে অসন্তুষ্ট করতে চায় না। তাতে যদি প্রোজেক্ট না হয় না হবে। ভগবানের আশীর্বাদে তাদের তো অর্থের অভাব নেই। এখন ঝুট-ঝামেলা হীন অনেক ছোটো ছোটো প্রোজেক্ট আসে। সেগুলো করতে পারলেই যথেষ্ট।

কিন্তু প্রসেনজিৎ দৃঢ় ভাবে ছেলের মতের বিরোধী। সে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে যে, সে বেঁচে থাকলে এই প্রোজেক্ট সে করবেই। সে চোখ বুজলে তার ছেলে যা খুশি করুক, সে দেখতে আসবে না।

অন্বেষণ বাবা-ছেলের কথার মাঝখানে ঘরে ঢোকায় বাক-বিতন্ডা বেশিক্ষণ স্থায়ী হল না। কোনরকম সিদ্ধান্তে না এসেই বাবা-ছেলে তাদের বিতর্কিত আলোচনা বন্ধ করল।

ব্রেকফাস্ট সেরে অন্বেষণ রণজিতের ঘরে ঢুকে দেখল ডঃ রুবানা তার থেরাপি করছে।  অন্বেষণ ঘরে ঢুকলে রনজিত ডঃ রুবানার সাথে তার পরিচয় করিয়ে দিলেন। লেয়ার্ড হিজাবে চোখ দুটো ছাড়া মুখের বাকি অংশ সম্পূর্ণ ঢাকা। তবে সুন্দর চোখ দুটি দেখলেই তার পরিপূর্ণ মুখশ্রী অনুমান করা যায়। বেশ লম্বাও মেয়েটি। রনজিতকে প্রয়োজনীয় নানা রকম পরামর্শ দিল রুবানা। অন্বেষণ মন দিয়ে শুনলেন তা। রুবানার কথাবার্তা সংক্ষিপ্ত, যথাযথ, মার্জিত আর কণ্ঠস্বরটিও বেশ মিষ্টি। তার নিজস্বতা বোঝা যায়। তবে একটি কথাও বাজে খরচ করে না সে। যারা কম কথা বলে, প্রয়োজনের চেয়েও কম কথা বলে, তাদের লোকে একটু সম্ভ্রমের চোখে দেখে। রুবানাও তার ব্যতিক্রম নয়।

কাকা, ড্রাইভার সাহেব এখুনি আইসা পড়ব। তাড়াতাড়ি রেডি হইয়া নেন। কাকিমারে নিয়া একটু শহরটা ঘুইরা আসেন। স্বাগত ঘরে ঢুকেই এক নাগাড়ে কথাগুলো বলল।

তুমি সাথে যাবে না?

না, আমার অফিস আছে। তবে সমস্যা নাই। ড্রাইভার সাহেব আজ আর কাল আপনাদের পুরা ঢাকা ঘুরাইয়া দিব। কাল রাতের এসি স্লিপার কোচে বাসের টিকিটের ব্যবস্থা হইব। হোটেল বুকও হইয়া যাইব। দুই দিন কক্সবাজার ঘুইরা আসেন।

আমিও কাল রাতের বাসে কক্সবাজার যাইতে পারি। আমার চট্টগ্রামের এক বন্ধু অনেকদিন ধরেই বলতেছিল যাবার জন্য। আপনারা যখন যাচ্ছেন, তাহলে একসাথেই যাওয়া যাবে। বলল রুবানা।

ভালোই তো। আমারও ভ্রমন সঙ্গী পেয়ে গেলাম। বললেন অন্বেষণ।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর,  জাতীয় শহীদ মিনার, লালবাগের কেল্লা  ঘুরে মাঝে একটা হিন্দু হোটেলে লাঞ্চ সেরে ওনারা যখন ধানমন্ডি লেকের পার্কে এলেন তখন পরন্ত বিকেল। গাড়ি থেকে নামতেই হঠাৎ রিনি-ঝিনি নূপুর বাজিয়ে হেমন্তের অতিথি বৃষ্টি এলো। হলদে রোদে স্নাত এক অপরূপ রূপালী বৃষ্টি। অন্বেষণ ও ভাস্বতী একটু দৌড়ে একটা গাছের নিচে গিয়ে দাঁড়ালেন। আর ঠিক তখনি হঠাৎ একটা দৃশ্য দেখে অন্বেষণকে সেই দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করালেন ভাস্বতী। অন্বেষণ দেখলেন একটু দূরের একটা গাছের নিচে  বেশ ঘনিষ্ঠ ভাবে একটি মেয়ের সাথে বসে আছে শতায়ু। মেয়েটিকে দেখেই ভাস্বতী চিনতে পারলেন। কাল রাতে তাকে প্রসেনজিতের ঘরে দেখেছেন উনি। প্রসেনজিতের সেক্রেটারি সুপর্ণা। আড়ালে থেকে ওদের কথা শোনার চেষ্টা করলেন অন্বেষণ।

শতায়ু বলছে, আরে তুমি ভয় পাইতাস ক্যান? আমার বাবা তোমার আমার মধ্যে কোনও বাধাই তৈরি করতে পারবো না। আর বাবা আজ আছে কাল নাই। তুমি আমার। তোমাকে আমার থিকা আলাদা করে, এমন শক্তি কারো নাই। আমার বাবারে আমি বুইঝ্যা নিমু।

তুমি জানো না লোকটা কি ভয়ানক। আর লোকটা পারে না, এমন কোনও কাজই নাই।

আমার বাবারে তুমি আমায় চিনাইবা। তুমি শুধু আমার কথা শুইন্যা চল। বাকিটা আমি সামলাইতাসি।

কথাগুলো শুনে উল্টো দিকে দৃষ্টি ঘোরালেন ভাস্বতী ও অন্বেষণ। তারপর বৃষ্টি থামলে  তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে এলেন ওনারা।

(৪)

পরদিন সকাল সকালই ঘুম ভাঙল অন্বেষণের। ভাস্বতী অবশ্য তার আগেই উঠে পড়েছিলেন। অন্বেষণ উঠতেই ভাস্বতী ওনার কানের কাছে মুখ নিয়ে আসতে আসতে বললেন, বুঝলে, মনে হচ্ছে এ বাড়িতে কোনও অঘটন হতে চলেছে।

কেন? তোমার হঠাৎ এরকম মনে হচ্ছে কেন?

আমি কাল রাত্রে যখন টয়লেটে গিয়েছিলাম, তখন শতায়ু দোতলা থেকে নেমে ফোনে কথা বলছিল। বলছিল, না আমার বাবাকে নিয়ে আর পারছি না। দরকার পড়লে বুড়াটাকে সরিয়ে ফেলতে হবে।

আরে ছাড়তো, মুখে অনেকেই অনেক রকম কথা বলে। মানুষ মারা অতো সহজ? আর বাপ-ছেলের মান অভিমান বেশী দিন টিকবে না। এখন মাথা গরম আছে, তাই বলছে। মাথা ঠাণ্ডা হলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। অন্বেষণ, ভাস্বতীর কথার কোনও গুরুত্ব না দিয়ে প্রাতঃকালীন কাজকর্ম সারতে চলে গেলেন।

সকাল সকাল স্নান সেরে ধোয়া জামা কাপড় পরে অন্বেষণরা ঢাকেশ্বরী মন্দিরের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। ড্রাইভারকে আগে থেকেই বলা ছিল। সকালের নরম রোদ থাকতে থাকতেই ওনারা ওখানে পৌঁছলেন। ঢাকার সব থেকে প্রাচীন মন্দির ঢাকেশ্বরী। বল্লাল সেন সিংহাসনে আরোহণের পর  একবার  স্বপ্নে  দেখেছিলেন  এই  জায়গায়  ঢাকা  অবস্থায়  পড়ে  আছেন  দেবী। বল্লাল  সেন দেবীকে  উদ্ধার  করে  এই  মন্দির  স্থাপন  করেন। তাই তিনি এই দেবীর নাম দেন ঢাকেশ্বরী। মন্দিরে  ঢুকে  অন্বেষণ লক্ষ্য করলেন যে একটা লোক ওদের অনুসরণ করছে। উনি ব্যাপারটা কে সেরকম গুরুত্ব না দিয়ে পূজা সেরে ধানমন্ডির বাসায় ফিরে আসেন। রাতে বাস জার্নি করতে হবে বলে আর বেশী ঘোরাঘুরি করেন না ওনারা।

সারাদিনটা নানা রকম গল্প করেই কাটল। দুই ভাইয়ের সাথে যে তেমন সদ্ভাব নেই, তা দুজনের সাথে আলাদা ভাবে কথা বললেই বোঝা যায়। জ্যাঠ-তুতো খুড়তুতো ভাইদের মধ্যেও যে একটা চাপা রেষারেষি রয়েছে, তাও সহজে অনুমেয়। আর এই রেষারেষির কারণটা যে বিষয় সম্পত্তি, তা সহজেই বোধগম্য হচ্ছে অন্বেষণের।

রাত নটায় বাস। তাই তাড়াতাড়ি খাওয়া দাওয়া সেরে বাস-স্ট্যান্ডে পৌঁছলেন অন্বেষণরা। বাসে তুলতে এলো শাশ্বত ও স্বাগত। শাশ্বত নিত্য প্রয়োজনীয় কিছু ওষুধ একটা প্যাকেট বন্দি করে অন্বেষণের হাতে তুলে দিল। বাস স্ট্যান্ডে রুবানার সাথে দেখা হল। সৌজন্য মূলক সামান্য কিছু কথা হল। হ্যাঁ, না ও মাথা নেড়ে নিজের বক্তব্য রাখল রুবানা। ওনারা সবাই বাসে উঠলে, শাশ্বত ও স্বাগত হাত নেড়ে বিদায় জানাল।

(৫)

বাস যখন কক্সবাজারে পৌঁছল তখন স্থানীয় সময় সকাল আটটা। বাস থেকে ওরা নামা মাত্র সি.এন.জির ড্রাইভাররা ওদের ঘিরে ধরল। সি.এন.জি হল স্থানীয় তিন চাকার যান, যা কমপ্রেসড ন্যাচারাল গ্যাসে চলে।

রুবানা বাস থেকে নেমেই ইশারায় খুব জোর টয়লেট পেয়েছে বুঝিয়ে, বাসস্ট্যান্ডের ওখানে একটা পাবলিক টয়লেটে ঢুকল। বাসস্ট্যান্ডের সামনে একটা সিলভার কালারের টয়োটা স্টারলেট দাঁড়িয়ে ছিল। অন্বেষণদের দেখে ঐ গাড়ির ড্রাইভার জিজ্ঞাসা করল, আপনারা কি প্রসেনজিৎ স্যারের গেস্ট?

হ্যাঁ।

আমি হোটেল থেইক্যা আইসি। আপনারা গাড়িতে উইঠা পড়েন।

মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই অন্বেষণরা নির্দিষ্ট হোটেলে পৌঁছলেন। গাছ-পালায় ঘেরা হোটেলটায় একটি সুদৃশ্য সুইমিং পুল রয়েছে। এখনে একটি মাল্টি-স্টোরীড বিল্ডিং ছাড়াও অনেকগুলো দোতলা কটেজ রয়েছে। প্রত্যেকটি কটেজের নাম বাংলা ঋতু বা বাংলা মাসের নামে। যেমন হৈমন্তী, বর্ষা, ফাল্গুনি, শ্রাবণী, প্রভৃতি। ফাল্গুনির একতলায় অন্বেষণদের বুকিং রয়েছে। হোটেলের রুমে  ঢুকে একটু ফ্রেস হয়ে রেস্টুরেন্টে গিয়ে ব্রেকফাস্ট সেরে নিলেন ওনারা। তারপর পোশাক বদলে সমুদ্রের দিকে চললেন। হোটেলের সামনের রাস্তাটি পেরলেই ঝাউ-বন। আর সেটা টপকালেই সমুদ্র সৈকত। পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত। ভাস্বতী জলে নামলেন না। এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে রইলেন, যেখানে সমুদ্রের ঢেউ এসে শুধুমাত্র পা ভিজিয়ে যায়। অন্বেষণ জলে নেমে ঢেউয়ের দাপট সামলাচ্ছেন। এমন সময় একটা স্পীড বোট, জল ছিটিয়ে ওনার সামনে দিয়ে চলে গেল। উনি একটু লক্ষ করলেই সে স্পীড বোটের দুজন আরোহীর একজনকে চিনতে পারলেন। রুবানা। রুবানারা স্পীড বোট থেকে নামলে অন্বেষণ ও ভাস্বতী একটু এগিয়ে ওর কাছে গেল। রুবানারা তখন সমুদ্র স্নানে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। রুবানার মুখ আর হিজাবে ঢাকা নেই। চিবুকের তিলটি বিউটি স্পট হয়ে তার রূপকে যেন আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। অন্বেষণ রুবানাদের সাথে দাঁড়িয়ে ভাস্বতীকে ছবি তুলতে বললেন। রুবানার ছবি তোলাতে খুব একটা ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও তার বান্ধবীর জোরাজুরিতে সে ছবির জন্য দাঁড়াতে বাধ্য হল। ভাস্বতী তা মোবাইলে বন্দী করলেন।

অন্বেষণ  সমুদ্র স্নান  করতে  করতে হঠাৎ  লক্ষ  করলেন  যে  ঢাকেশ্বরী  মন্দিরে  যে লোকটি ওনাদের ফলো করছিল সেই লোকটাই তীক্ষ্ণ  নজরে  ওনাকে  দেখছে।  অন্বেষণের  চোখে চোখ  হতেই লোকটা ভিড়ে মিলিয়ে গেল।  অন্বেষণ আর  লোকটাকে  দেখতে  পেলেন  না। এরপর  অল্পক্ষণ  সমুদ্রে  থেকে,  উঠে  এলেন  ওনারা। রুবানারা  তখনও  সমুদ্রের  জোয়ারে  গা  ভাসিয়ে  তৃপ্ত হচ্ছে। তারই  মধ্যে  হাত  নাড়িয়ে  অন্বেষণদের  বিদায়  দিল  ওরা। হোটেলে ঢোকার  আগে  সুইমিং  পুলের  সামনে  একটা  জলের  কল  রয়েছে,  সেখানে  ওনারা  গা  হাত পা  ধুয়ে  যথা  সম্ভব  গায়ের  বালি  সরিয়ে হোটেলের  রুমে  ঢুকলেন। এরপর  স্নান, লাঞ্চ  করলেন।

লাঞ্চের পর অন্বেষণ রিসেপসনে জিজ্ঞাসা  করলেন যে, এখানে কাছে-পিঠের মধ্যে ঘোরার জায়গা কি আছে? রিসেপশনের ছেলেটি বলল, একটু  দূরে হিমছড়ি সিবীচ রয়েছে। ঘুইরা আসেন। ভালো লাগবে। বিকেলে একটা সি.এন.জি করে হিমছড়ি সিবীচের উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন ওনারা। এবড়ো খেবড়ো রাস্তা পেরিয়ে সি.এন.জি মেইন রোডে পড়ল। কক্সবাজার থেকে এই সৈকতে যাওয়ার  পথটি  স্বপ্নের  মত  সুন্দর ও  রোমাঞ্চকর। একপাশে  বিস্তীর্ণ  সমুদ্রের  বালুকা  বেলা,  আরেক পাশে সবুজ পাহাড়ের সারি, মাঝে পিচ ঢালা মেরিন ড্রাইভ। হিমছড়ি সী-বীচ পেরিয়ে গাড়ি মায়ানমার  বর্ডারের দিকে এগোতেই একটা মোটর বাইক সামনে এসে পথ আটকালো। অন্বেষণ দেখলেন, যে লোকটা দুদিন ধরে ওনাকে ফলো করছে, সেই লোকটা।

আপনি কে মশাই? দুদিন ধরে আমাদের ফলো করে যাচ্ছেন? রাগ ও বিরক্তির সঙ্গে বললেন অন্বেষণ।

আমি কে, তা জেনে আপনাদের লাভ নাই। আপনারা আর বেশী দূর যাইবেন না। এই বীচেই ঘোরাফেরা করেন। সামনে সমস্যা হইতে পারে। বেশ দৃঢ়তার সাথে কথাগুলো বলে লোকটা চলে গেল।

সি.এন.জি আর এগোল না। অন্বেষণরা আর কথা না বাড়িয়ে হিমছড়ি সী-বীচেই চলে এলেন। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে এই সমুদ্র সৈকতের নাম হিমছড়ি। এখানকার সমুদ্র  সৈকতটি কক্সবাজারের  চেয়ে  অপেক্ষাকৃত  নির্জন ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন।  সমুদ্র  পাড়ে  দাঁড়িয়ে দেখা  যায়  সুদূর বিস্তৃত  ঝাউ  গাছের সারি। আকাশটা সোনালী চাদরে ঢাকা। সূর্যদেব খানিক বাদেই অস্ত যাবেন, তারই আয়োজন চলছে আকাশ জুড়ে। সমুদ্রকে পিছনে নিয়ে, আর ঝাউ-বনকে পিছনে নিয়ে বেশ কয়েকটা সেলফি তুললেন দুজনে। ভাস্বতী ও অন্বেষণ একে অপরের ছবিও মোবাইল বন্দী করলেন। সূর্যের ধীরে ধীরে সমুদ্রের জলে ডুবে যাওয়ার প্রতিটি ক্ষণ মোবাইলে ধরে রাখলেন অন্বেষণ। ধীরে ধীরে অন্ধকার নেমে এলো। ওনারাও হোটেলে ফিরলেন।

রাত্রে  ডিনার  সেরে  শুয়েছেন,  ঘণ্টা  খানেকের মধ্যেই  হঠাৎ অন্বেষণের  ফোন  বেজে  উঠল।

একটু  চিন্তিত  হয়েই  ফোন  ধরলেন  অন্বেষণ।  রণজিৎ  ফোন  করেছে,  একটু  ধরা  গলায়  উনি         বললেন, আমার  ভাইটা  আর  নাই  রে।

কেন? কি হল? কাল তো সুস্থ সবল দেখে এলাম।

ডাক্তার তো হার্ট  অ্যাটাক  কইতাসে।

নরমাল হার্ট অ্যাটাক? নাকি…

না, অস্বাভাবিক কিছু বইলা তো ঠাহর হয় না। ওর হার্টের অবস্থা সুবিধার আছিল না। তুই কাল ফ্লাইট ধইরা আইয়া পর। আমি টিকিটের ব্যবস্থা করতাসি।

হ্যাঁ, আমি আসছি। কিন্তু  আমি  না যাওয়া  পর্যন্ত তোরা বডির কিছু করবি না। কেউ হাতও লাগাবি না।

কেন?  তুই  কি  কিস্যু  সন্দেহ  করতাছস?

তেমন নিশ্চিত ভাবে কিছু বলতে পারছি না। তবে আমি যা বললাম, তাই কর। আমি  কাল  পৌঁছৈ  অবস্থা  বুঝে  ব্যবস্থা  নেব।

রণজিতের ফোন রেখে অন্বেষণ ভাবতে লাগল। প্রসেনজিতের অনুমানটাই সত্যি হয়েছে। অন্বেষনের অভিজ্ঞতায় এটা খুন বলেই মনে হচ্ছে ওনার। আর যদি তা নাও হয়, তবুও একটা তদন্ত হওয়া দরকার। না হলে প্রসেনজিতের উইল মানা হবে না। একটু ভেবে গগনকে ফোন করলেন উনি। রিং হয়ে যাচ্ছে, অনেকক্ষণ পরে ফোন ধরল গগন। ওর “হ্যালো” শুনেই বোঝা গেল যে, ও বেশ গভীর ঘুমেই ছিল।  ওকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাংলাদেশে আসতে বলে ফোন রাখল অন্বেষণ।

ভাস্বতী বেশ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিল। অন্বেষণের ফোনে কথা বলার শব্দে ওনার ঘুম ভেঙে গেছে। ফোনের কথা শেষ হলে ভাস্বতী জিজ্ঞাসা করলেন, কি হয়েছে?

প্রসেনজিৎ মারা গেছে। খুব সম্ভবত খুন হয়েছে। কাল আমাদের ফ্লাইট ধরে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ঢাকা পৌঁছতে হবে।

সেই ফ্লাইট! যেটা অ্যাভয়েট করতে চেয়েছিলাম, সেটা দেখছি আমার পিছু ছাড়বে না।

ভয় নেই। অল্প সময়ের জার্নি। প্লেন ছাড়তে ছাড়তে নামার সময় হয়ে যাবে। আর চিন্তা করছ কেন? মরলে তো দুজনে এক সাথেই মরবো।

ভাস্বতী, অন্বেষণের কথার কোনও উত্তর না দিয়ে, পাশ ফিরে শুয়ে পড়লেন। অন্বেষণও আর কোনও কথা না বলে, নানা রকম চিন্তার ঢেউয়ের দাপট সামলাতে সামলাতে কখন যে ঘুম সাগরে ডুব দিলেন, তা নিজেও টের পেলেন না।

(৬)

ভোরে উঠে রুবানাকে ফোন করলেন অন্বেষণ। কিন্তু রুবানার ফোন বেজে গেল। ও ধরল না। তবে অল্পক্ষণের মধ্যেই ও কলব্যাক করল। অন্বেষণ ওকে প্রসেনজিতের খবরটা দিল। খবরটা শুনে রুবানা বেশ অবাক হল, আর দুঃখও পেল। অল্পক্ষণ চুপ করে থেকে ও বলল, আপনারা যান। আমি একটা কাজ সেরে কাল সকাল সকাল বাসে রওনা হব। সন্ধ্যার দিকে ঐ বাসায় যাবো।

অন্বেষণরা রণজিৎদের বাড়ি পৌঁছে দেখল বাড়ি ভর্তি লোক। প্রসেনজিতের দেহ তখনও তার ঘরের বিছানাতেই শায়িত ছিল। স্ত্রী বিমলা স্বামীর দেহ ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। অন্বেষণকে দেখা মাত্র সে বলল, জল জ্যান্ত সুস্থ মানুষটার হঠাৎ এমনটা হইল ক্যামনে, তা ভগবানই জানে।

পোস্টমর্টেম রিপোর্ট এলেই সব বোঝা যাবে। অন্বেষণের কোনও কিছু বলার আগেই প্রসেনজিতের লিগাল অ্যাডভাইজর কথাটা বলল।

কেন্? বাবার তো নর্মাল ডেথ হইসে। পোস্টমর্টেম করার তো কোনো প্রশ্নই আসে না। শতায়ুর বক্তব্য।

প্রসেনজিৎ স্যার সম্প্রতি ওনার উইলে বদলাইসেন। এই নতুন উইল অনুযায়ী ওনার মৃত্যুর পর যদি প্রমাণ হয় যে ওনারে খুন করা হইসে, আর সেই খুন পরিবারের কেউ করসে, তবে পরিবারের কেউই ওনার সম্পত্তির কোনও ভাগীদার হইব না। যে পুলিশ অফিসার বা গোয়েন্দা ওনার খুনিরে ধরতে পারবেন, তিনি সম্পত্তির অর্ধেক পাইবেন।  আর বাকী অর্ধেক একটা অনাথ আশ্রমে যাইব। সকলের সামনে কথা গুলো বললেন, প্রসেনজিতের লিগাল অ্যাডভাইজর নইমুল হোসেন।

আচ্ছা, আগের উইলটায় কি লেখা ছিল সেটা বলতে পারেন? নইমুলকে অন্বেষনের প্রশ্ন।

হঃ, কেন কইতে পারুম না? সম্পত্তির বেশীর ভাগ অংশ উনি ওনার স্ত্রী, পুত্র ও কন্যার মধ্যে ভাগ কইরা দিলেও, ওনার দাদার ছেলে মেয়েরেও একদম বঞ্চিত করেন নাই উনি সেই  উইলে। প্রত্যেকের নামে ঢাকা শহরে বেশ ভালো পজিশনে একটা কইরা ওয়েল ফার্নিশড দুই কামরার ফ্ল্যাট লিখ্যা দিছিলেন উনি।

আর সেই উইল যখন উনি চেঞ্জ করিয়ে ছিলেন, তখন ডেফিনিটলি ওনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের কিছু আঁচ পেয়েছিলেন উনি। অন্বেষনের বক্তব্য।

হঃ, বেশ কয়েকদিন ধইরাই ওর মনে হইতাছিল যে চারিদিকে ওর সব শত্রুরা ঘুরতাসে। আর পরিবারের লোকেদের উপরে বেশী সন্দেহ। সেই জন্যই উইল বদলাইয়া ছিল। তখন ভাবছিলাম ওর মনের ভুল। ও মিথ্যাই লোকেরে সন্দেহ করতাসে। বুঝি নাই যে ওর ধারনা এইভাবে সত্য হইয়া যাইব। বিমলার কথাগুলোর মধ্যে দিয়ে ওর ভেতরকার দুঃখ যন্ত্রণা বেরিয়ে এলো।

তাহলে তো একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভ ঠিক করতে হয়। বলল শতায়ু।

তার লিগা বেশী দূর যাওন লাগবো না। আমার বন্ধু অন্বেষণই আসে, এক্স সি.বি.আই অফিসার। রণজিতের বক্তব্য।

আমার বয়স হয়েছে। এখন আমি আর তেমন ছোটাছুটি করতে পারিনা। তবে এর জন্য চিন্তার কারণ নেই। আমি অলরেডি আমার পরিচিত একজন ডিটেকটিভকে খবর দিয়ে দিয়েছি, আর বলেছি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এখানে চলে আসতে। আর ও না আসা পর্যন্ত আমি যতটা পারি কাজ এগিয়ে রাখবো।

ও, সব ব্যবস্থা তাহলে হইয়াই গেস্যে। আমার বাবা, আর আমিই কিছু জানতে পারলাম না? বেশ রাগের সঙ্গে কথাটা বলে শতায়ু।

সব ব্যবস্থা কি আমি করতে পারবো? অচেনা জায়গা। লোকাল পুলিশ, ফরেনসিক সার্জেন্ট কাউকেই চিনি না। আর এদের সাহায্য ছাড়া তদন্ত সম্ভব নয়।

সেসব নিয়া আপনি কিছু ভাববেন না অন্বেষণ বাবু। আমি সবার সাথে যোগাযোগ করাইয়া দিমু। আর ওনাদের ফোন নম্বরও দিয়া দিমু। তাছাড়া আপনি আমার ফোন নম্বরটা রাখেন। যেকোনো প্রয়োজনে ফোন দিবেন। কথাগুলো বলে একটা ভিজিটিং কার্ড অন্বেষণের দিকে এগিয়ে দেয় নইমুল।

সে দরকার তো হবেই। তবে এখন আর কথা না বাড়িয়ে বডি ময়না তদন্তে পাঠানোর ব্যবস্থা করুন। বলল অন্বেষণ।

অন্বেষণের কথা অনুযায়ী কাজ হল। বডি ময়না তদন্তে পাঠানো হল। বডি বাড়ি থেকে বের হলে সারা ঘরটা ভালো ভাবে দেখতে লাগলেন অন্বেষণ। কাল ঘটনাটা ঘটার পর কেউ এ ঘরের কোনও জিনিষে হাত দেয়নি তো?

না, জেঠু সব্বাইরে বারণ কইরা দিছিল এ ঘরের কিছু ধরতে। তাই আমরা কেউই এ ঘরের কিছুতে হাত দেই নাই। বলল তনুজা।

অন্বেষণ লক্ষ্য করল যে ঘরটা আগের দিন উনি যেরকম দেখেছিলেন, আজও সেরকমই আছে। বিছানাটা আগের দিনের মতোই গোছানো। শুধু বেড কভারটা চেঞ্জ হয়েছে। বিছানাটা খুব ভালো ভাবে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন উনি। কিন্তু কোথাও কোনও রক্তের দাগ, বা সন্দেহ জনক কিছু পেলেন না। বিছানা ছেড়ে এবার টেবিলের দিকে নজর ঘোরালেন অন্বেষণ। টেবিলে আধ খোলা ল্যাপটপ। তার পাশে একটা কাচের গ্লাস, একটা হুইস্কির বোতল আর প্রসেনজিতের মোবাইল ফোন। তবে টেবিলের ওপর নিকোটিন প্যাঁচের প্যাকেটটা রয়েছে, যা আগের দিন টেবিলের ওপর ছিল না। ঘরের অন্যান্য আসবাব পত্র আগের দিনের মতোই যথাস্থানে রয়েছে। ঘরটা ভালোভাবে দেখে প্রসেনজিতের মোবাইল ফোনটি পকেটে ঢুকিয়ে প্রথমে বন্ধু রণজিতের সাথে কথা বলতে গেলেন অন্বেষণ।

তোকে কটা প্রশ্ন ছিল।

কি জানতে চাস কইয়া ফ্যালা।

কাল রাতের দিকে তুই কোথায় ছিলি?

ঘরেই আছিলাম। বিমলা ডাকাতে ওর ঘরে যাই। ডাকাডাকি কইরাও প্রসেনের কোনও সারা পাই না। ব্যাপারটা স্বাভাবিক না দেইখ্যা ডাক্তার ডাকি। ডাক্তার আইয়া কয়, ভাইডা আর বাইচ্চা নাই।

কাল রাতে তুই সারাক্ষণ ঘরেই ছিলি? একটুও বেরোসনি।

হঃ, আমার ঘরেই আছিলাম। তবে একটা ফোন আইসিল, কথা কইতে কইতে বাইরইছিলাম একবার।

তখন কি কাউকে দেখেছিলি?

আমি কাউরে দেখলেই বা কি লাভ? এমনিতেই কারো মুখ দেইখ্যা চিনতে পারি না। তার ওপর রাতের অন্ধকারে।

তবুও, কাউকে কি দেখেছিলি?

হঃ, একডা বোরখা পরা কাউরে ঘর থিকা বাইরইয়া যাইতে দেখছিলাম।

কেমন হাইট হবে?

খুব একটা লম্বা না, বেটে খাটোই চেহারা।

আর কাল রাত্রে প্রসেনের কি কোনও রকম চিৎকার বা গোঙ্গানি শুনেছিলি?

না, একদমই না। ওর কোনও রকম আওয়াজই পাইনাই।

আর ঐ বাড়ির কাউকে দোতলা থেকে সন্ধ্যের পর নামতে দেখেছিলি?

হঃ, তনুজা একবার মণিকার কাছে, কি একডা কাজে যেন আইছিল।

আচ্ছা, তোর কি কাউকে সন্দেহ হয়?

না, তেমন ভাবে কাউরে হয় না। ইনফ্যাক্ট প্রথমটা আমার এইডা স্বাভাবিক মৃত্যুই মনে হইসিল। কারণ কোনও আওয়াজ পাওন যায় নাই। আর কোনও রক্তের দাগও আছিল না কোথাও। তবে অহন মনে হইতাছে যে, ওর তো শত্তুরের অভাব আছিল না। তাই যে কেউ যা খুশি করতেই পারে।

আচ্ছা, তুই তো বলেছিলি যে প্রসেনজিৎ লোকটা ভয়ঙ্কর। ও বহু মানুষের চরম ক্ষতি করেছে। তা সেরকম ঘটনা কিছু জানা থাকলে বল না।

দ্যাখ, নিজের চোখে কিছু তো দেখি নাই। তবে ওর লগে ওর সাকরেদগো থেইকা কিসু কথা শুনসি।

সেগুলোই বল না। প্রত্যেকটা ইনফরমেশন এখন আমাদের কাছে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। কোন ঘটনা থেকে কোন ক্লু বেড়িয়ে আসবে, তা তোরা ভাবতেও পারবি না।

বহু বছর আগের কথা। তখন হ্যার দুতলা হয় নাই। আমরা পাশাপাশি ঘরেই থাকতাম। একদিন হঠাৎ ওর এক সাকরেদের কথা শুইনা আঁতকাইয়া উঠলাম। ব্যাটায় কইতাছিল,

ওস্তাদ, একদম খতম কইরা দিসি মালডারে।

যেমনটা কইছিলাম, তেমনটাই করছস তো? কেউ কিছু সন্দেহ করবো না তো?

না, ওস্তাদ। গাছ থেইক্যা এক গোছা নারকেল মাথায় পইড়্যা মরসে। এই ঘটনাতে কার মনে কি সন্দেহ হইব?

গাছে কি তুই উঠছিলি?

হঁ।

তোরে নামতে উঠতে কেউ দ্যাহে নাই তো?

না, রাতের অন্ধকারে কেউ ঠাওর করতে পারে নাই। আর জায়গাটা শুনশানই ছিল। গোসল খানায় যাইতাছিল। আমি মাথা লক্ষ্য কইরা এক গোছা নারকেল ফেইলা দিছি।

বেশ ভাল। এই ল তোর বকশিস।

বেশ কিছু ট্যাহা দিয়া লোকটারে বিদায় করসিল সেদিন প্রসেন। এক নাগাড়ে কথাগুলো বলে থামল রণজিৎ।

আর কোনও ঘটনা মনে পড়ে? কি একটা চিন্তা করতে করতে জিজ্ঞাসা করল অন্বেষণ।

হ, এই ঘটনাডা বেশী দিন আগের নয়। বছর খানেক হইব। আমার বড় পোলার বউ, মণিকার বাপের বাড়ি নেত্রকোনা জেলার দূর্গাপুরে। মণিকার বিয়া আর হের ভাইয়ের উচ্চশিক্ষার খরচের লাইগা মণিকার বাপে ব্যাশ কিছু জমি বেইচ্চা দিতে বাইধ্য হয়। আর তখন হ্যাদের ট্যাহার খুবই দরকার আছিল। আর সেই সুযোগ লইয়া ব্যাশ সস্তায় বিঘা খানেক জমি খরিদ করে প্রসেন। জমি খরিদ কইরা সেই জমি বেশ কয়েক মাস ফ্যালাইয়াই রাখছিল ও। দূর্গাপুর জায়গাডার একডা ঐতিহাসিক তাৎপর্য আস্যে। চিনামাটির পাহাড়, কমলা রানীর দিঘী, কুমুদিনী স্তম্ভ, সোমেশ্বরী নদী আস্যে এই দুর্গাপুরে। হেইর ল্যাইগা পর্যটকদের ম্যালা ভিড় হয়। কিন্তু পর্যটকদের থাকার মত তেমন কোনো সুব্যাবস্থা নাই হেইখানে। এইসব ভাইবা ঐ জমিতে কয়েকটা বাংলো করব বইল্যা ঠিক করে প্রসেন। তার ল্যাইগা খোঁড়াখুঁড়িও শুরু হয়। আর সেই খোঁড়াখুঁড়ির ফলে সুলতানী আমলের বেশ কিছু দুর্মূল্য মুদ্রা মিলস্যে হেইখানে। সম্ভবত তা বাংলার সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের আমলের। কিন্তু প্রসেন সেই মুদ্রার কথা সম্পূর্ণ চাইপা যায়। এমন কি যারা সেই মুদ্রা উদ্ধার করসিল, হ্যাদেরকেও ও তেমন কিছুই দেয় নাই। অথচ হেই মুদ্রা বেইচা বেশ মোটা ট্যাহা কামাইছে প্রসেন। এরপর মণিকার বাপের কিছু টাকার দরকার হইয়া পড়লে, মনিকা প্রসেনের থেইকা কিছু ট্যাহা ধার চায়। প্রসেন এক পয়সাও দেয় নাই তারে। হেই থেইকা মনিকা ও হ্যার বাপের বাড়ির লোকজন প্রসেনরে দুই চক্ষে দেখতে পারে না।

এই সুলতানি মুদ্রা উদ্ধারের কথা তোরা কি করে জানতে পারিস?

যারা হেই মুদ্রা উদ্ধার করছিল, তাদের একজনের থেইকাই এই খবরডা আমরা পাইসি।

ঠিক আছে। আর কিছু তোর থেকে জানার নেই। দেখি অন্য সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করে, রহস্য উদ্ধারের কোনও ক্লু পাওয়া যায় কি না।

রণজিতের পর শতায়ুর সাথে কথা বলতে গেল অন্বেষণ।

কাল রাতে তোমার বাবা যখন মারা যায়, তখন তুমি কি করছিলে?

আমি কালকে বাবার কথা অনুযায়ী বাবার ল্যাপটপে আমাদের কারেন্ট প্রোজেক্টের ডিউ পেমেন্টের হিসাব করতাছিলাম। বাবা তখন ড্রিংক কইরা খাটে শুইয়া ছিল। আমার কাজটা হইয়া গেলে আমি বাবারে বললাম। বাবা আমারে ল্যাপটপটা খুলা র‍্যাইখাই চলে যেতে বলল। বাবা হিসাবটা একবার দেখব। আমি বাবার কথামত ল্যাপটপটা খুলা রাইখ্যাই উপরে আমার ঘরে চইল্যা আসলাম। মা ও বোন দুতলাতেই ছিল। তার কিছুক্ষণ পরে মা বাবারে ডিনারের জন্য ডাকতে গিয়া দেখল বাবা আর নাই। আমার কিন্তু এইটা স্বাভাবিক হার্ট ফেলিওর বইলাই মনে হয়। বাবার হার্টের কন্ডিশন ভাল ছিল না। তার উপরে বাবা যেই ভাবে রেগুলার ড্রিংক করত, তাতে এমন ঘটনা অস্বাভাবিক কিছু না।

স্বাভাবিক মৃত্যু না মার্ডার, সেতো আমরা যাচাই করেই নেব। তবে তোমার সাথে তো তোমার বাবার সম্পর্কও বিশেষ ভালো ছিল না। তর্ক বিতর্ক লেগেই থাকত দেখেছি।

দ্যাখেন, ব্যবসায় বাবার সব সিদ্ধান্তের সঙ্গে আমি সহমত হইতাম না। তাই বইলা আমি বাবারে মাইরা ফ্যালাবো, এইটা ভাববেন না।

তুমি তো সুপর্ণাকে বিয়ে করতে চাও। প্রসেনজিৎ বেঁচে থাকলে সেটা তো কখনই সম্ভব হোতো না। ঠিক তো।

সেটা ঠিক, কিন্তু এর থিকা আপনে কি প্রমাণ করতে চাইছেন বলেন তো?

এখনি কিছু প্রমাণ করতে চাইছি না। সত্যিটা বললাম মাত্র।

আমার তো ব্যাপারটা অন্য রকম মনে হয়। বাবার নতুন উইল অনুসারে, এই পরিবারের কাউরে আপনি বাবার খুনী প্রমাণ করতে পারলে, বাবার অর্ধেক সম্পত্তি তো আপনেরই পাওয়ার কথা। তাই এনি হাউ সেইটা প্রমাণ করার চেষ্টা করতাসেন, তাই তো?

আমি কি চাইছি, আর কি করছি, তার কৈফিয়ত আমি তোমাকে দেব না। সময় হলে আমার কাজের মাধ্যমেই তার জবাব আমি দিয়ে দেব। আর আপাতত আমার আর তোমার থেকে কিছু জানার নেই। পরে দরকার হলে ডেকে নেব।

বিমলা বলল, সে কাল সন্ধ্যে থেকে দোতলাতেই ছিল। ডিনারে প্রসেনজিৎকে ডাকতে নিচে নামে। ডাকলে কোনও সারা না পেয়ে ভেবেছিল যে ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু গায়ে হাত দিয়ে ঝাঁকাতেই মনে সন্দেহ হয়। তখন বিমলা ছেলেকে আর রণজিৎদের ডাকে। সবাই এসে ব্যাপারটা স্বাভাবিক নয় দেখে ডাক্তার ডাকে। উনি এসে প্রসেনজিৎকে মৃত ঘোষণা করেন।

তনুজা, অনুপমা, মণিকা, শাশ্বত ও স্বাগতর সাথে কথা বলে বিশেষ কিছু তথ্য পায় না অন্বেষণ। প্রত্যেকেই যে যার ঘরে, নিজের নিজের কাজে ছিল। এই ঘটনা সম্পর্কে তারা কেউই কিছু জানে না। অন্বেষণ রিসেন্ট কল চেক করার জন্যে প্রত্যেকের মোবাইল কিছু সময়ের জন্য নিজের কাছে নিয়ে রাখলেন। আর প্রথমেই শতায়ুর কল লিস্ট চেক করলেন।

সন্ধ্যে গড়াতেই বেশ কয়েকজন এলো খোঁজ খবর নিতে। তার মধ্যে অন্বেষণের চেনা সুপর্ণা রয়েছে। আরেক জন লোককেও অন্বেষণ চেনে। আর তাকে দেখে উনি বেশ অবাকই হলেন। সে হল ঢাকেশ্বরী মন্দিরে, কক্সবাজারে অন্বেষণদের পিছু নেওয়া সেই লোকটি। আপনি এখানে? লোকটিকে দেখেই অন্বেষণ জিজ্ঞাসা করল।

ওস্তাদ মারা গ্যাসেন, আর আমি আমু না। আইজ সকালে কক্সবাজারেই খবরটা পাইছি। শোনা মাত্রই বাস ধইরা আইয়া পরছি।

আপনার নাম কি? আর আপনি আমাদের পিছু নিয়েছিলেন কেন?

আমি আবদুল। ওস্তাদ কইছিল সর্বদা আপনেগো চোখে চোখে রাখতে। আপনেগো যেন কোথাও কোনও অসুবিধা না হয়, তা দ্যাখতে। তাই সব সময় আপনেগো লগে লগে আছিলাম। ওস্তাদই চইলা গেল। ওস্তাদরে কারা মারছে, খুঁইজা বাইর করেন। আমি আপনার লগে আছি। আমার নম্বরটা রাইখা দ্যান। কোনও দরকার লাগলে একটা ফোন দিবেন। হাজির হইয়া যামু।

আবদুলের কথায় সম্মতি জানিয়ে, ওর নম্বরটা মোবাইলে সেভ করে নেয় অন্বেষণ। এরপর সুপর্ণার সাথে কথা বলেন অন্বেষণ।

কাল তুমি এখানে এসেছিলে?

হ্যাঁ, সন্ধ্যা নাগাদ। স্যারের সাথে কারেন্ট প্রোজেক্ট সংক্রান্ত কিছু কথা বইল্যা, পরের দিনের শিডিউল ঠিক কইরা বাড়ি যাই।

তারপরে আর এদিকে আসো নি, বা কারো সাথে কোনও কথাও বলনি?

না।

কিন্তু শতায়ুর ফোনের কল লিস্টে যে তোমার নম্বর দেখলাম।

ও, হ্যাঁ। প্রোজেক্টের একটা ইনফরমেশন নেওয়ার জন্য উনি আমারে কাল রাতে একবার ফোন দিছিল।

শুধু কি সেই কারণেই ও ফোন করে ছিল?

হ্যাঁ, আর কি কারণ থাকতে পারে?

কিন্তু আমি যদি বলি, শতায়ুর সাথে তোমার একটা রিলেশন আছে। তোমরা নিয়মিত বিভিন্ন জায়গায় মিট কর। দু-এক দিন আগেও ধানমন্ডি লেকের পার্কে শতায়ুর সাথে তোমাকে ঘনিষ্ঠ ভাবে দেখা গেছে। কিছু কি ভুল বললাম?

না, মানে, আপনে এতসব জানলেন কি করে? শতায়ু বলছে?

সে আমি যেভাবেই খবর পাই, খবরটা তো সত্যি! আর যদ্দুর আমি জানি, তুমি তোমার প্রসেনজিৎ স্যারকে খুব একটা পছন্দও করতে না। রীতিমত ভয় পেতে ওকে। ঠিক তো?

দ্যাখেন, আপনে যখন এতো কিছু জানেন, তখন আপনারে কিছু লুকাবো না। প্রসেনজিৎ স্যার লোকটা মোটেই সুবিধার ছিলেন না। মেয়েদের প্রতি লোভ আছিল ওনার সাংঘাতিক। আমার শরীরটারে ভীষণ ভাবে চাইতেন উনি। সুযোগ পাইলেই আমার গায়ের যেখানে সেখানে হাত দিতেন। কতবার ভাবছি চাকরিটা ছাইড়া দিব। কিন্তু টাকার জন্য ছাড়তে পারি নাই। স্যার এমনিতে যাই হোন, টাকাটা ভালো আর সময় মতনই দিতেন। এই মাইনার চাকরি আমি অনেক চেষ্টা কইরাও জোগাড় করতে পারিনাই। আর টাকাটা আমার এখন ভীষণ দরকার।

আর শতায়ুর সাথে আপনার রিলেশনটা?

আমরা একে অপররে ভালোবাসি। খুব শীঘ্রই আমরা বিয়েটা সাইরা ফেলতে চাই।

প্রসেনজিৎ বেঁচে থাকলে সেটা তো কখনই সম্ভব হোতো না। ঠিক আছে, আমার যা জানার জানা হয়ে গেছে। পরে যদি দরকার হয়, কথা বলা যাবে। তবে এ কেসের সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত এলাকা ছেড়ে কোথাও যাবে না।

অন্বেষণ আর কারো সাথে কথা না বলে, আজ সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করে যে সমস্ত তথ্য পেলেন, তা মাথায় নিয়ে চিন্তার সমুদ্রে ডুব দিলেন।

(৭)

সকালে উঠে অন্বেষণ নিয়মিত কাজকর্ম সেরে, শতায়ু ছাড়া আর বাকি সবার মোবাইলের কল লিস্ট আর মেসেজ ও হোয়াটস অ্যাপ মেসেজ চেক করতে থাকেন। মনিকা গতকাল রাত্রে শাশ্বতকে ওর বাড়ি আসার ঠিক আগে ফোন করেছিল। একটু পরেই যে লোকটা বাড়ি ঢুকবে, তাকে ফোন করা কেন? নিশ্চয়ই কিছু আনার জন্যই হবে। কিন্তু এদের দুজনকেই নানা ধরনের প্রশ্ন করেও এই ফোনের ব্যাপারে তারা কেউ কিচ্ছু বলেনি। ঘটনাটা অন্বেষনের কাছে একটু খটকা লাগলেও এখনি এ ব্যাপারে কাউকে কিছু বললেন না উনি। সবার মোবাইল ফেরত দিয়ে, ব্রেকফাস্ট সেরে নইমুলকে ফোন করে ওর থেকে ফরেনসিক সার্জেন্ট সজল আহমেদের ফোন নম্বর নিয়ে, ওনাকে ফোন করে অন্বেষণ।

আমি অন্বেষণ কর বলছি। প্রসেনজিৎ মজুমদারের কেসটা আমি তদন্ত করছি। ওনার মৃত্যুর কারণ কিছু কি জানা গেল?

হ্যাঁ, ওনার হাইপার ক্যালসেমিয়ার ফলে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়েছে।

আচ্ছা, এটা কি আপনার স্বাভাবিক মৃত্যু বলে মনে হয়?

দ্যাখেন, ওনার হার্টের কন্ডিশন ভালো না থাকলেও এতো খারাপও ছিল না, যে হঠাৎ এমনটা হইতে পারে। আমি তেমন কোনও ব্লকেজও খুঁইজা পাইনাই।

তাহলে হঠাৎ এমন মৃত্যু কিভাবে হতে পারে বলে আপনার মনে হয়।

ক্যালসিয়াম গ্লুকোনেট ইনজেক্ট করা হইলে ব্লাড প্রেশারটা নাইমা যাইতে পারে। তাতে এমনটা হতেই পারে।

আপনি শরীরে কি কোনও ইনজেকশন ফোটানোর চিহ্ন পেয়েছেন?

না, তা এখনও পাইনাই।

ওনার ইনজেকশনে বেশ ভীতি ছিল। ইনজেকশন দিলে সবাই টের পেত। আচ্ছা কোনও ওষুধ খাওয়ার ফলে কি হাইপার ক্যালসেমিয়া হতে পারে?

না, ওষুধে এতো দ্রুত কাজ হয় না। ওনারে, আমি আরও ভালো ভাবে পরীক্ষা কইরা দেখব। আপনি বরং বিকালের দিকে এখানে চইলা আসেন।

ঠিক আছে, আমি আজ বিকেলে আপনাদের ল্যাবে যাচ্ছি। তখন ডিটেলে কথা বলা যাবে।

ফোন রাখলেন অন্বেষণ। আজ সবাই বাড়িতেই আছে। কেউ কারো কর্মস্থলে যায়নি। অন্বেষণ প্রথমে মণিকার ঘরে ওর সাথে কথা বলতে গেলেন।

মনিকা, তোমার সাথে আমার কিছু কথা ছিল।

ক্যান্? কালকেই তো আপনার সাথে কথা হইল। আমি যা জানি সবই তো বললাম। এর বেশী আমি কিছু জানি না।

তুমি যে ঐ দিন রাতে তোমার হাজবেন্ড বাড়ি আসার ঠিক আগে ওকে ফোন করেছিলে, সে কথা তো কাল বলনি।

এ আর বলার কি আছে? হাজবেন্ড ওয়াইফের কথা থাকতে পারে না?

সে পারে। তবে যে লোকটা খানিকক্ষণের মধ্যেই বাড়ি ঢুকবে, তাকে খুব আর্জেন্ট না হলে তো কেউ ফোন করে না। তা ফোনটা কেন করেছিলে জানতে পারি কি?

আমার কিছু ওষুধ আনার ছিল, তাই ফোন দিছিলাম।

কি ওষুধ?

ওষুধের নাম গুলো কি কাকার খুনের তদন্ত করতে খুব দরকার?

দরকার নিশ্চয়ই আছে। নইলে শুধু শুধু তোমাকে বিরক্ত করব কেন?

আমার প্রেগ্নেন্সির কারণে ডাক্তারের প্রেস্ক্রাইব করা কিছু ওষুধ আনতে বলছিলাম ওকে।

ও তুমি প্রেগন্যান্ট? এই ভালো খবরটা জানা ছিল না তো?

এই দুই সপ্তাহ আগেই কনফার্ম হইছি। বাড়ির কয়েকজন ছাড়া বিশেষ কাউরেই এখনো কিছু বলি নাই।

ওকে, তা শাশ্বত কোথায় গেছে?

ও কিছু কেনাকাটা করতে বাজারে গ্যাছে।

ঠিক আছে। এলে আমার সাথে কথা বলতে বল। দরকার আছে?

মণিকার সাথে কথা বলে অন্বেষণ, একটা চেয়ার নিয়ে উঠোনে বসে খবরের কাগজটা ওলটাতে লাগলেন। ভেতরের পাতায় প্রসেনজিতের মৃত্যুর খবরটা ছেপেছে। ওটাই ভালো করে পড়ছিলেন উনি। পড়া হলে অন্যান্য খবরের দিকে চোখ রাখলেন। এমন সময়ে শাশ্বত বাজার থেকে ফিরলে অন্বেষণ ওকে নিয়ে একটা ফাঁকা ঘরে বসলেন।

তোমাকে ঐ দিন রাতে, তোমার বাড়ি আসার সময় মনিকা ফোন করেছিল?

হ্যাঁ করছিল। স্যানিটারী ন্যাপকিন কেনার জন্য।

স্যানিটারী ন্যাপকিন? তোমার বৌ তো প্রেগন্যান্ট শুনলাম। তাহলে স্যানিটারী ন্যাপকিন তার কি কাজে লাগবে শুনি?

হ্যাঁ, সে অবশ্য ঠিক। তাহলে ওইটা আনতে বলল কেন বলেন তো? দাঁড়ান, ওকে জিজ্ঞাসা কইর‍্যা দেখি।

থাক, তোমাকে কিছু জিজ্ঞাসা করতে হবে না। দরকার পড়লে আমি জেনে নেব। তা তুমি তোমার দোকান থেকেই কি ওটা নিয়ে এলে?

না। সেদিন আমি একটু তাড়াতাড়িই দোকান বন্ধ কইর‍্যা দিছিলাম। ও যখন ফোন দিছিল, তখন আমি খানিকটা চইল্যা আইছি। তাই পথের একটা দোকান থিকা ওইটা কিনছিলাম। ও, আরেকটা কথা কাল আপনারে বলতে ভুইল্যা গেছিলাম। আজ আপনি ওষুধ কেনার কথা জিজ্ঞাসা করাতে মনে পড়ল। সেদিন যখন আমি ঐ দোকান থিকা ন্যাপকিন কিইন্যা ফিরা আইতাছিলাম, তখন কালো বোরখা পরা সুপর্ণারে একটা রিক্সা থিকা নাইমা ঐ দোকানে ঢুকতে দেখলাম।

তাই? তা কি ওষুধ কিনেছিল বলতে পারবে?

না। তখন আমি ন্যাপকিন নিয়া ঐ দোকান থিকা বাইরিয়া গ্যাছিলাম। তাই ও কি ওষুধ নিছে, আমি দেখি নাই।

এই ইনফরমেশনটার জন্য ধন্যবাদ। আমার আপাতত আর কিছু জানার নেই। তবে তুমি ঐ দোকানের নাম ও লোকেশনটা আমাকে একটু লিখে দাও।

ঠিক আছে। দিতাছি। কথাটা বলে একটা রাইটিং প্যাডে দোকানের নাম ও লোকেশনটা লিখে দেয় শাশ্বত।

লাঞ্চ সেরে একটু বিশ্রাম করলেন অন্বেষণ।বিকেলের দিকে রুবানা এলো।

কখন ফিরলে রুবানা?

এইতো অল্প আগে। ফিরেই এইখানে চলে আসলাম। আপনাদের ফ্লাইটে কোনও অসুবিধা হয় নাই তো?

না, আর তোমার ভাবীর ফ্লাইট ভীতিটা একটু কেটেছে। ভাবছি ইন্ডিয়াতে ফ্লাইটেই ফিরবো।

আপনাদের ফেরা কবে?

প্ল্যান ছিলো তো তাড়াতাড়িই ফেরার। কিন্তু এখন তো এই কেসে ফেঁসে গেলাম। এটার সুরাহা না করে ফিরি কি করে?

ও, এই কেসটা বুঝি আপনি ইনভেস্টিগেট করবেন?

হ্যাঁ, আপাতত।

আচ্ছা, আপনার কি মনে হয় উনি মার্ডার হয়েছেন?

এখনি ডেফিনিটলি কিছু বলা যাচ্ছে না।

আমার কিন্তু সেইরকম মনে হয় না। আসলে বাই প্রফেশন, হিউম্যান সাইকোলজিটা তো আমারে একটু বুঝতে হয়। উনাকে যতটা দেখছি, শুনছি, আর উনার সাথে কথা বলে যতটুকু বুঝতে পেরেছি, তাতে মনে হয়েছে উনি সর্বক্ষণ একটা আতঙ্কে থাকতেন। আশেপাশের সবাইকে উনার শত্রু মনে করতেন। কাউকেই মন থেকে বিশ্বাস করতে পারতেন না। সব সময়ে কেউ যদি এরকম একটা টেনশনে দিন কাটায়, তার তো হার্টের উপর চাপ পড়বেই। তার উপর ওনার হার্টের অবস্থা একদমই ভালো ছিল না। স্মোক আর ড্রিংক করে শরীরটাকে ব্যাশ খারাপ করে ফ্যালছিলেন। তাও আমি নিকোটিন প্যাচ ব্যবহার করতে বলে সিগারেটটা ছাড়াইয়া ছিলাম।

কথাগুলো তুমি একদম সঠিক, আর যুক্তি সঙ্গত বলেছ। তবু আমার ওপর দায়িত্বটা যখন চাপানো হয়েছে, আমার ডিউটি তো আমাকে করতেই হবে।

সে তো নিশ্চয়ই। আর সে জন্য আমার যদি কোনও সাহায্যের দরকার হয়, জানাইতে সংকোচ করবেন না। আমার ফোন নম্বর তো আপনার কাছে আছেই। প্রয়োজনে এনি টাইম ফোন দিবেন।

এটা তো আমার এলাকা নয়। এখানকার সব কিছুই আমার অপরিচিত। তাই তোমাদের সাহায্য তো দরকার হবেই।

রুবানার সাথে কথা বলে, অন্বেষনের মনের জোরটা যেন বেড়ে গেল। সত্যি মেয়েটার কথায়, কণ্ঠস্বরে যাদু আছে। ওর সাথে কথা শেষ করে গাড়ি নিয়ে যখন ফরেনসিক ল্যাবে পৌঁছলেন অন্বেষন। ওনাকে দেখেই সজল আহমেদ বললেন,

ওনারে ইনজেকশনই পুশ করা হইছে। আর সেই লোকেশনও আমি আইডেনটিফাই কইরা ফেলছি।

তাই? কোথায় সেটা।

যেইখানে নিকোটিন প্যাচটা উনি লাগাইয়া ছিলেন, সেইখানে। ঐ প্যাচটা লাগানো ছিল বইল্যা সিরিঞ্জ ফোটানোর চিহ্নটা আমার চোখে পড়ে নাই।

আচ্ছা, নিকোটিন প্যাচ লাগানোতে ঐ জায়গাটা কি অবশ হয়ে যেতে পারে? যাতে ইনজেকশন পুশ করা হলে কিছু টেরই পাওয়া যাবে না।

না, সেরকম তো হওয়ার না।

এইখানেই আমার খটকা লাগছে। ঠিক আছে, আপনি আরও ভালো করে ব্যাপারটা পর্যবেক্ষণ করুন। নতুন কিছু তথ্য পেলে অবশ্যই ফোন করবেন।

আরও কিছু প্রয়োজনীয় ও সাধারণ কথা সেরে ফরেনসিক ল্যাব থেকে বেরলেন অন্বেষণ। বেড়িয়ে পকেট থেকে শাশ্বতর দেওয়া কাগজটা বের করে ওষুধের দোকানের নাম ও লোকেশনটা দেখে নিলেন উনি। তারপর ঐ দোকানে উপস্থিত হলেন।

নমস্কার আমি প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর অন্বেষণ কর। প্রসেনজিৎ মজুমদারের মার্ডার কেসটা আমি দেখছি। আর সেই ব্যাপারেই কয়েকটা কথা জানতে আমার এখানে আসা।

প্রসেনজিৎ মজুমদার মার্ডার হইছে? ওনার ভাইপো শ্বাশতদা তো সেদিন আমাগো দোকানে আইছিল, স্যানিটারি ন্যাপকিন নিতে। আমি অবাক হইয়া জিজ্ঞাসা করছিলাম, নিজের দোকান ছাইড়া হঠাৎ আমাগো দোকানে?

ও কি সেদিন শুধু স্যানিটারি ন্যাপকিনই নিয়েছে? নাকি সঙ্গে আর কোনও মেডিসিনও নিয়েছে?

না, শাশ্বতদা তো কোনও ওষুধ নেয় নাই সেইদিন।

আচ্ছা, ঠিক ঐ সময় একজন কালো বোরখা পরা মহিলা কি এসেছিল ওষুধ নিতে।

কালো বোরখা পরা মহিলা তো সারাদিন কতই আসতেছে দোকানে। তবে শাশ্বতদা যেই সময়ে আইছিল, সেই সময় একজন বোরখা পরা মহিলাও আইছিল ওষুধ লইতে।

ও কি ওষুধ কিনেছিল বলতে পারবেন?

তা তো মনে নাই। তবে আমাদের সব মেডিসিন সেলিং-এর বিল থাকে। বিল দ্যাইখ্যা কইতে হইব।

তা বিল দেখে, কাইন্ডলি একটু বলুন না, ও কি মেডিসিন কিনেছিল।

খারান, কইতাসি। লোকটা একটা বিল বই নিয়ে তার কাউন্টার পাতা গুলো ওলটাতে থাকে। অনেকগুলো পাতা উল্টে একটা পাতাতে থেমে যায়। মেডিসিন না, একটা ইনজেকশন নিসিল ও ঐ দিন।

ইনজেকশনের নামটা বলবেন?

ক্যালসিয়াম গ্লুকোনেট।

ওর কি কোনও প্রপার প্রেসকিপশান ছিল? নাকি এমনি এসেছিল ঐ ইনজেকশন নিতে।

না, না। প্রেসকিপশান আছিল। ডঃ তানভীর আহমেদের প্রেসকিপশান। এই দ্যাখেন না, কাউন্টার প্যাডে ডক্টর নেম, পেসেন্ট নেম সব রইছে।

আমার এই কাগজটার একটা ফটোকপি দরকার।

খাঁড়ান, করাইয়া দিতাছি।

লোকটা দোকানের একটি জুনিয়র ছেলেকে দিয়ে ঐ কাগজটার একটা ফটোকপি করে দিলেন। অন্বেষণ ওটা নিয়ে দোকানের লোকটাকে ধন্যবাদ জানিয়ে ওখান থেকে বেড়িয়ে এলেন। গাড়িতে ওঠার পরই ওনার ফোন বেজে উঠল। গগন ফোন করেছে। ও কাল সকালের ফ্লাইটে ঢাকা আসছে। বাড়ি এসে অন্বেষণ সবাইকে ডেকে প্রথমে কাল গগনের আসার খবরটা দিলেন। তারপর বললেন, প্রসেনজিতের মৃত্যু স্বাভাবিক নয়, ওকে ক্যালসিয়াম গ্লুকোনেট ইনজেকশন পুশ  করে  খুন করা হয়েছে। কথাটা শুনে প্রায়  সবাই একসাথে বলে উঠল, অসম্ভব।

রণজিৎ বললেন, ওরে ইনজেকশন দেওনের মেলা ঝামেলা। আর  দেওন গেলেও সে চ্যাঁচাইয়া সারা পাড়ারে জানান দিত।

অন্বেষণ  বললেন,  সে আমি জানি। প্রসেনজিৎ নিজেই আমাকে তা বলেছে। কিন্তু ল্যাব টেস্টে তো ওটাই পাওয়া গেছে। রিপোর্টে যা আছে, তা অস্বীকার করি কি করে? তবে এরমধ্যে কিছু একটা রহস্য তো রয়েছেই, যেটা  আমরা এখনো  ধরতে  পারিনি। একটু সময় দিন। তদন্ত চলছে, আশাকরি খুব শীঘ্রই প্রকৃত  সত্যি  বেরিয়ে  আসবে। কথা গুলো বলে গেস্ট রুমে চলে এলেন উনি।

ঘরে  এসে এ  পর্যন্ত  পাওয়া  তথ্যগুলো  একটা  ডায়রিতে  লিখে  ফেললেন  অন্বেষণ। আর সেই সময়েই ওই ঘরে শতায়ু ঢুকল।

আপনার সাথে কিছু কথা আছিল।

হ্যাঁ, বল না, কি বলবে।

বলতাছি, আপনে এই  তদন্তের কাজটা  ছাইড়া  দেন।

ছেড়ে দেব?

হ্যাঁ, কিন্তু তাতে আপনার কোনও ক্ষতি হইব না। বরং লাভই হইব। কোনও পরিশ্রম না করেই আপনে আপনার  যথাযথ  পারিশ্রমিক পাইয়া যাবেন।

তুমি কি বলতে চাইছ বলত? তুমি কি আমাকে ঘুষ দিয়ে আমার ইনভেস্টিগেশন বন্ধ করতে চাইছ?

না, না। আপনি আমার কথাটা ঐ ভাবে নিতাছেন কেন? আপনি তো একটা কিছুর আশাতেই এই পরিশ্রমটা করতাছেন। তাই বলছিলাম…

আর কিছু বলার দরকার নেই। তবে শুনে রাখ যে আমি শুধুমাত্র টাকা-পয়সার জন্যই এই কাজ করি না। সত্যটা খুঁজে বার করার মধ্যে যে একটা আনন্দ আছে, সেটাই আমার পারিশ্রমিক। তাই টাকা দিয়ে আমার এই কাজ বন্ধ করা যাবে না। আমি খুব শীঘ্রই প্রকৃত দোষীকে খুঁজে বার করে তার যথাযথ শাস্তির ব্যবস্থা করব। আর সেই অপরাধী যদি তুমি হও, তাহলে তুমিও রেহাই পাবে না। লাখ লাখ টাকা খরচ করেও পাবে না।

সে তো আমি জানি। আপনারা যেইভাবেই হোক আমাদের পরিবারের কাউরে দোষী প্রমাণ করবেন। তারপর বাবার অর্ধেক সম্পত্তির ভাগীদার হইবেন। আর বাকী অর্ধেক চইলে যাবে সেই অনাথ আশ্রমে, যার প্রধান অধিকর্তা হইল বাবার লিগাল অ্যাডভাইজর অ্যাডভোকেট নইমুল হোসেন।

তুমি একটু বেশীই বুঝে গেছ। আমি বলি কি, তুমি যদি নিজে কোনও দোষ না করে থাকো তবে এতো সব ভেবো না। সময়ের ওপর ছেড়ে দাও। দেখ না কি হয়। আর এখন কথা না বাড়িয়ে নিজের ঘরে যাও। আমাকে একটু কাজ করতে দাও।

শতায়ু আর কোনও কথা না বলে, একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘর থেকে বেড়িয়ে গেল। শতায়ু বেড়িয়ে গেলে অন্বেষণ অল্পক্ষণ কি একটা চিন্তা করে মণিকার ঘরে গেল।

মনিকা, তুমি আমাকে আজ সকালে মিথ্যে কথা বললে? শ্বাশতকে তো তুমি ওষুধ আনতে বলনি। স্যানিটারি ন্যাপকিন আনতে বলেছিলে। কি তাইতো। ঘরে ঢুকেই সরাসরি প্রসঙ্গে ঢোকে অন্বেষণ।

হ্যাঁ, আসলে ঐসব নিয়া আপনার সঙ্গে কথা বলতে সঙ্কোচ বোধ করছিলাম।

তা তোমার এই অবস্থায় হঠাৎ স্যানিটারি ন্যাপকিন দরকার হয়ে পড়ল কেন বলবে?

আমার জন্য নয়, তনুজার জন্য ওইটা আনতে বলছিলাম। বলল মনিকা।

হ্যাঁ, এটা আমি অনুমান করে ছিলাম। তোমার থেকে কনফার্ম হয়ে নিলাম। আর একটা কথা, ভবিষ্যতে আমাকে কোনও কারণেই মিথ্যে বোলো না। তাতে তোমারই সমস্যা হবে। কথা গুলো বলে ওর ঘর থেকে বেড়িয়ে এলো অন্বেষণ।

 

 

(৮)

রোজের থেকে আজ একটু আগেই ঘুম থেকে উঠল অন্বেষণ। নিয়মিত কাজগুলো সেরে  চা বিস্কুট খেয়ে তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নিল। অল্পক্ষণ পরেই ড্রাইভার চলে এলো। গাড়ি নিয়ে গগনকে আনতে এয়ারপোর্টে ছুটলেন অন্বেষণ। গগনের ফ্লাইট ঠিক সময়েই ছিল। গগন এয়ারপোর্ট থেকে বেরলে ওকে গাড়িতে তুলে ধানমন্ডি রওনা হলেন অন্বেষণ। গাড়িতে বসেই প্রসেনজিতের কেসটা বিস্তারিত ভাবে গগনকে বললেন উনি। এখন পর্যন্ত যে যে তথ্য পাওয়া গেছে, তাও গগনের সাথে শেয়ার করলেন উনি। বাড়ি পৌঁছে ফ্রেশ হয়ে নিয়ে চা জল খাবার খেয়ে অন্বেষণের সাথে পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনায় বসল গগন। প্রসেনজিতের একতলার ঘরটি, যে ঘরে ও মারা গিয়েছিলো, সেই ঘরেই আপাতত আস্তানা হল গগনের। আর ওই ঘরেই ওরা আলোচনায় বসল। নানারকম সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হতে হতে হঠাৎ অন্বেষণের ফোন বেজে উঠল। সজল ফোন করেছে।

অন্বেষণ বাবু, আমি সজল আহমেদ । আপনে কি এখন একটু আমার এখানে আসতে পারবেন?

– সে আসতেই পারি, কিন্তু হঠাৎ জরুরি তলব?

– ইনজেকশন কিভাবে ভিক্টিমের গায়ে পুশ করা হইছে, সেটা বোঝা গেছে। খুনী এমনভাবে কাজটা করছে যে ভিকটিম টেরও পায় নাই।  তাড়াতাড়ি আমার এইখানে চইলা আসেন। আমি আপনাকে ব্যাপারটা বুঝাইয়া দিমু।

সজল  আহমেদের কথা  অনুযায়ী  গগন ও  অন্বেষণ  ডাঃ সজল আহমেদের ওখানে  পৌঁছালেন। পৌঁছেই  অন্বেষণ  সজলের  সাথে  গগনের  পরিচয়  করিয়ে দিলেন। তারপর  উনি বললেন,  ইনজেকশন পুশ  নিয়ে  আমার   মনে   সত্যিই  একটা  বড়  প্রশ্ন  ছিল। আপনি  এটা  এত  তাড়াতাড়ি সল্ভ  করে  ফেলেছেন  শুনে  খুব  ভালো  লাগলো।

খুনি যে-ই হোক ভীষণ বুদ্ধিমান ও শিক্ষিত। এইবারে আমি আপনারে, খুনি কিভাবে কাজটা করছে সেইটা দেখাই। কথাটা বলে ডাঃ সজল আহমেদ দু হাতে দুটো ইঞ্চি দু-একের স্কয়ার সেপের স্বচ্ছ ব্যান্ডেজের মতো জিনিষ দেখায়।

এগুলো তো চিনি। নিকোটিন প্যাচ তো?

হ্যাঁ, ডাইন হাতের টা হল নিকোটিন প্যাচ। তবে বাম হাতের টা না। এইটা এমলা প্যাচ।

কিন্তু দুটো তো একদম একই রকম দেখতে।

তবে দুইটার কাজ একদমই আলাদা।

নিকোটিন প্যাঁচের কাজ তো জানি। কিন্তু এমলা প্যাচটা কি?

এমলা হইল লিনগোকেন ও প্রিলোকেন নামক দুটা লোকাল অ্যানাস্থেটিসের মিশ্রণ। ইমলা, ক্রিমের আকারে পাওয়া যায়। আর এই এমলাই প্যাঁচে ব্যাবহার করা হয়। এটা গায়ে লাগাইলে লোকালি সেই যায়গাটা অবশ হইয়া যায়। ফলে সেখানে ইনজেকশন ফোটাইলেও কোনও ফিলিং হয় না।

বুঝেছি। খুনি এই ইমলা প্যাচ, নিকোটিন প্যাঁচের প্যাকেটে রেখে দিয়েছিল। আর প্রসেনজিৎ নিকোটিন প্যাচ মনে করে ইমলা প্যাচটি গায়ে লাগিয়ে ফেলে। তাই খুনি যখন তার গায়ে ইনজেকশন ফোটায়, সে টের পায় না।

একদম ঠিক।

অসংখ্য ধন্যবাদ ডাঃ আহমেদ। আপনি এই ইনফরমেশনটা দিয়ে আমাদের ইনভেস্টিগেশনকে অনেকটা এগিয়ে দিলেন। এখন আমরা আসছি। আবার দেখা হবে।

অন্বেষণ ও গগন  বাড়িতে এসে আবার আলোচনায় বসলো। গগন বলল যে এ কাজ বাড়ির কারোরই। কারণ বাইরের কারো পক্ষে প্রসেনজিৎ কখন ঘুমোচ্ছে, কখন জেগে আছে, সেটা জানা অসম্ভব।

অন্বেষণ বলল একদম ঠিক কথা বলেছো। কিন্তু কাজটা কে করতে পারে বলতো? মোটিভ তো প্রায় সবারই রয়েছে। আমার মনে হচ্ছে শতায়ু আর সুপর্ণা মিলেই এটা করেছে। সুপর্ণা যে ইনজেকশনটা কিনেছে সে প্রমাণ তো আমরা আগেই পেয়ে গেছি। আর রণজিৎ যাকে দেখেছে, মনে হচ্ছে সে সুপর্ণাই। সুপর্ণা কে একবার ভালো করে জেরা করতে হবে। দাঁড়াও শতায়ুর থেকে আগে ওর ফোন নম্বর ও অ্যাড্রেসটা নেওয়া যাক।

সুপর্ণার ফোন নম্বর ও অ্যাড্রেস নেওয়া হল। ওর বাড়ি নেত্রকোনার বেখৈরহাটী নামক এক গ্রামে। ওর বাবা বিকাশ দত্ত, কয়েক বছর আগে মারা গেছে। গ্রামের বাড়িতে এখন ওর মা আর ছোটো ভাই থাকে। সুপর্ণা ঢাকাতে একটা লেডিস হোস্টেলে থাকে। সুপর্ণার ফোন নাম্বারে ফোন করে ওকে পাওয়া গেল না। ফোন সুইচ অফ।

গগন বলল, দাঁড়ান আমি একবার ওর হোস্টেলটা ঘুরে আসি।

সুপর্ণার হোস্টেলে গিয়েও সুপর্ণাকে পাওয়া গেল না।

অন্বেষণ গগনকে বললেন যে লোকাল পুলিশের সাহায্য নিয়ে ওর ফোন নম্বরটা ট্রেস করতে হবে। আর প্রয়োজনে ওর গ্রামের বাড়িতেও যেতে হতে পারে।

আমার মনে হয়  শতায়ুকে আরেকবার ভালোভাবে জেরা করা দরকার। বলল গগন।

এরপর শতায়ুকে নানারকম প্রশ্ন করেও কোনও রকম কিছু জানা গেল না।

অন্বেষণ বলল, আমার মনে হয়না শতায়ু তেমন কিছু জানে।

এমনও তো হতে পারে সুপর্ণা একাই কাজটা করেছে, গগনের বক্তব্য।

সেটা কি করে সম্ভব? প্রসেনজিতের গতিবিধির খবর ও জানবে কি করে?

জানা যেতে পারে, ঘরে যদি কোথাও কোন স্পাই ক্যামেরা লুকোনো থাকে, তবে জানা সম্ভব। আসুন আমরা আগে এই ঘরটা ভালোভাবে সার্চ করে দেখি।

গগন ও অন্বেষণ খুব ভালো করে প্রসেনজিতের ঘরটা সার্চ করলেন। কিন্তু কোথাও কোন লুকোনো ক্যামেরার হদিশ পেলেন না ওরা। পুলিশের সাহায্য নিয়ে সুপর্ণার  মোবাইল ফোন ট্রেস করা হলো। দুদিন ধরে ওর ফোন সুইচ অফ। তাই ওর বর্তমান লোকেশন জানা যাচ্ছে না। তবে লাস্ট লোকেশন দুদিন আগে নেত্রকোনায় দেখাচ্ছে। ওখানেই ফোনটা সুইচ অফ হয়েছে। সুপর্ণা লাস্ট কাকে কাকে ফোন করেছে, তার লিস্টও বের করতে বলেছে গগন। বাংলাদেশে এসে প্রথম দিনটা নানা জায়গায় ছোটাছুটি করেই কেটে গেল গগনের।

রাতে খাবার টেবিলে অন্বেষণ গগনকে বললেন, কাল তাহলে চলো সুপর্ণার গ্রামের বাড়ি ঘুরে আসি। আমার মন বলছে, ওখানে গেলে কিছু ক্লু পাওয়া যাবে। আর মণিকার বাপের বাড়িও তো নেত্রকোনাতেই। ওদের বাড়িও একবার ঘুরে আসা যাবে।

সে তো খুব ভালো। বাংলাদেশের গ্রাম-বাংলা কখনো দেখা হয়নি। এই সুযোগে গ্রাম বাংলার সবুজ প্রকৃতিও ভালোভাবে উপভোগ করা যাবে। আপনি তবে সুপর্নাকেই সন্ধেহ করছেন? বাইরের কেউ কাজটা করলে সে তো রুবানাও হতে পারে।

প্রাথমিক পর্যায়ে কেউই সন্ধেহের বাইরে নয়। তবে খুনের সময় রুবানা আমার সাথে কক্সবাজারে ছিল। তাই ওকে আপাতত সন্দেহের বাইরে রাখছি। আর রণজিতের বর্ণনা অনুযায়ী সুপর্নাকেই সন্ধেহ হয়।

অন্বেষণের যুক্তি মেনে নিয়ে নেত্রকোনাতে যাওয়ার মানসিক প্রস্তুতি নেয় গগন।

(৯)

সকালে উঠে প্রতিদিনের নিয়মিত কাজগুলি সারার সাথে সাথে স্নানটা ও সেরে নিল অন্বেষণ ও গগন।  গগন বাথরুমে ঢুকে শাওয়ারের নবটা ধরে কিছুক্ষণ কি যেন চিন্তা করল। তারপর শাওয়ারের নবটা ঘুরিয়ে তার নিচে চুপচাপ দাঁড়িয়ে  থাকলো।   বুলেটের মতো একঝাঁক ঠাণ্ডা জল নেমে এলো ওর গায়ে।  তীব্র তীক্ষ্ণ জলকণার নির্দয় আক্রমণ সমস্ত শরীর দিয়ে শুষে  নিতে নিতে গগনের মাথায় ঘুরছে নানা রকম চিন্তা।  হঠাৎ কি একটা চিন্তা মাথায় আসায় গগন মনে মনে বেশ আনন্দিত হয়ে উঠলো। তারপর তাড়াতাড়ি স্নান সেরে বাথরুম থেকে বেরিয়ে অন্বেষণ কে বলল, ওই ঘরে ক্যামেরা ছিল। আমরা তা কেউ খেয়ালই করিনি।

অন্বেষণ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, কোথায় বলতো?

কেন ল্যাপটপে। ওয়েবক্যাম রয়েছে না?

হ্যাঁ ঠিক বলেছ। কিন্তু ওই ক্যামেরা দিয়ে কি বাইরের কেউ ঘরের ভেতরের সব কিছু দেখতে পারে?

ল্যাপটপ অন থাকলে নিশ্চয়ই পারবে। তবে আমার এ ব্যাপারে বেশী কিছু জানা নেই। আমার একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার বন্ধু আছে। ওকে একবার জিজ্ঞাসা করে  দেখি। গগন জামা প্যান্ট পরে রেডি হয়ে, ইন্ডিয়াতে ওর ঐ সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার বন্ধুকে ফোন করল। কিন্তু বন্ধু ফোন ধরল না।

ওরা জল খাবার খেয়ে রেডি হয়ে নেত্রকোনার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেল। ঢাকা শহরের বিখ্যাত যানজট অতিক্রম করার পর সুন্দর বিস্তৃত পিচের রাস্তা বরাবর গাড়ি চলছে। হঠাৎ গগনের ফোন বেজে উঠলো। গগনের সেই সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার বন্ধু ফোন করেছে।

তুই ফোন করেছিলি? আমার ফোনটা সাইলেন্ট ছিল। তাই শুনতে পাইনি।

হ্যাঁ তোর থেকে একটা ইনফরমেশন নেওয়ার ছিল।

হ্যাঁ বল কি জানতে চাস?

ল্যাপটপের ওয়েব ক্যাম ব্যবহার করে কি কোনভাবে বাইরের কারো পক্ষে ঘরের ভেতরের কিছু দেখা সম্ভব?

হ্যাঁ সম্ভব।

কিভাবে?

রিমোট অ্যাকসেস ডিভাইস দিয়ে। ওই ল্যাপটপে একটা সফটওয়্যার ইন্সটল থাকতে হবে। আর যে ল্যাপটপে থেকে এটা দেখা হবে, তাতেও ঐ সফটওয়্যারটা থাকতে হবে।

আচ্ছা ওই সফটওয়্যারটা কি কোনভাবে ল্যাপটপের ইউজার কে না জানিয়ে ইন্সটল করা সম্ভব?

হ্যাঁ সম্ভব। ইমেল করে কোনরকম লিংক পাঠিয়ে বা জোকস পাঠিয়ে সেটা করা যেতে পারে। ইউজার যখন সেই লিংক বা টেক্সটে ক্লিক করবে, অটোমেটিক্যালি সেই সফটওয়্যারটা ইন্সটল হয়ে যাবে। ইউজার টেরও পাবে না।

ঠিক আছে। অসংখ্য ধন্যবাদ। তুই আমার একটা বড় উপকার করলি।

কেন, কি হয়েছে? এসব তোর হঠাৎ দরকার হচ্ছে কেন?

একটা ইনভেস্টিগেশনের জন্য দরকার হচ্ছে। ঠিক আছে, আজকে রাখছি রে।  পরে কথা হবে।

গগনের ফোন রাখার কিছুক্ষণের মধ্যেই অন্বেষনের ফোন বেজে উঠল। থানা থেকে ফোন করেছে। সুপর্ণার কল লিস্ট বের করেছে ওরা। লাস্ট যে নাম্বার থেকে সুপর্ণার ফোনে কল এসেছিল তা শতায়ুর নম্বর। আর লাস্ট যে নাম্বারে সুপর্ণা ফোন করেছিল তা ডঃ তানভীর আহমেদের, যে ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনে সুপর্ণা ইনজেকশন কিনে ছিল তার নম্বর। এখান থেকে ফিরে ওই ডাক্তারের সাথেও একবার মিট করতে হবে। বলল অন্বেষণ।

গাড়ি ছুটে চলেছে। দু পাশে সবুজের সমারোহ। ময়মনসিংহে গাড়ি দাঁড় করিয়ে লাঞ্চ সেরে, দুপুর নাগাদ গাড়ি নেত্রকোনার বেখৈরহাটী পৌঁছল। বেখৈরহাটী গ্রামটি নেত্রকোনার প্রায় শেষ প্রান্তে। গগন ও অন্বেষণ গাড়িটাকে রাস্তার এক পাশে দাঁড় করিয়ে রেখে, পাকা পিচের রাস্তা ছেড়ে মেঠো রাস্তায় হাঁটা ধরল। ফুট তিনেক চওড়া উঁচু নিচু ছোটো ছোটো গর্ত যুক্ত মাটির রাস্তা। বা পাশে সবুজ ধান ক্ষেত। ডান পাশে পুকুর, বাঁশবন, শাল বন, আর নানারকম গাছের সারি।  আর সেই গাছের ওপর হাওয়া আর আলো-ছায়ার  খেলা চলছে। উত্তরের বাতাস এসে  কলকল  করে কথা  বলে চলেছে গাছ পাতার সঙ্গে। আবার মাঝে মাঝে টানা দীর্ঘশ্বাস তুলে যাচ্ছে ডালপালায়। খসিয়ে দিয়ে যাচ্ছে শালের শুকনো পাতা। একটি ছেলে মোবাইলের স্পিকারে গান বাজিয়ে উল্টো দিক থেকে আসছিল। গগনরা তাকে বিকাশ দত্তের বাড়ি কোথায় জিজ্ঞাসা করলে, সে “ওদু” বলে চলে গেল। “ওদু” মানে সামনে। কিছুটা যাওয়ার পর ওরা দেখল এক ভদ্রমহিলা স্নান সেরে, ভেজা কাপড়ে, পায়ে হাওয়াই চটি পড়ে, হাঁসের ডাকের মত আওয়াজ করতে করতে ওদের দিকে আসছে। ভদ্রমহিলাকে দেখে অন্বেষণ চিনতে পারলেন। এই ভদ্রমহিলার সাথেই ট্রেনের কামরা শেয়ার করে, কলকাতা থেকে বাংলাদেশে এসেছেন ওনারা।

আরে আপনে এইখানে? অন্বেষণ কে দেখে ভদ্রমহিলা অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন।

বিকাশ দত্তের বাড়ি যাবো। আপনি এই গ্রামেই থাকেন নাকি?

হঃ, এই দুই খান বাড়ী পড়েই আমার বাসা। আসেন না আমার বাসায়।

ঠিক আছে। বিকাশ দত্তের বাড়ির কাজ সেরে ফেরার সময় আপনার ওখানে আসবো খণ। ওনাদের বাড়িটা কোথায় বলতে পারেন?

হঃ, সোজা চইল্যা যান। সামনে একটা পুকুর পড়বো। তারপরের বাড়িটাই এগো। ফেরার পথে আইবেন কিন্তু। আমি  অপেক্ষা করুম।

সুপর্ণাদের বাড়ি খুঁজতে অন্বেষণদের কোনও অসুবিধা হলো না। লেবু, কাঁঠাল, জলপাই, জাম, কামরাঙা প্রভৃতি গাছে ঘেরা মাটির মেঝে, টিনের চাল, টিনের দেওয়াল যুক্ত বাড়ি। সামনে বড় উঠোন। তাতে মুরগী, পায়রা চরে বেড়াচ্ছে। ঘরের পেছনের দিকে গরু, বাছুর বাঁধা আছে।

আপনারা কোনখান থিকা আইছেন। এইহানে কি কাম? অন্বেষণদের দেখে জানতে চাইল সুপর্ণার ভাই।

আমরা ঢাকা থেকে আসছি। তোমার দিদি যার সাথে কাজ করতেন, তিনি খুন হয়েছেন। আমরা সেই ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করতে এসেছি।

আয়েন, ঘরে আয়েন। সুপর্ণার ভাই অন্বেষণদের ঘরে নিয়ে বসালেন।

সুপর্ণার মা খাটে শুয়ে ছিলেন। ওনাদের দেখে উঠে বসলেন।

ওনার সাথে কথা বলে অন্বেষণরা জানলেন যে উনি অষ্টিওপোরোসিসে ভুগছেন। ঠিকমতো হাঁটতে পারেন না। হাঁটুতে একদমই জোর নেই। একসাথে বেশিক্ষণ কাজ করতে পারেন না। অন্বেষণ ওনার প্রেসক্রিপশনটা দেখলেন। হ্যাঁ ক্যালসিয়াম গ্লুকোনেট ইনজেকশন প্রেসক্রাইব করেছেন ডঃ তানভীর আহমেদ। অদৃষ্টের কি পরিহাস। একজনের বেঁচে থাকার ওষুধ আরেক জনের মৃত্যুর কারণ। মনে মনে ভাবলেন অন্বেষণ। জিজ্ঞেস করলেন সুপর্ণা কবে এসেছিল?

এই তো দুইদিন আগেই আইছিল। ইনজেকশনটা দিয়া পরের দিন সকালে উইঠ্যাই গ্যাসে গিয়া।

তার মানে প্রসেনজিতের মার্ডার হওয়ার পরের দিন। অন্বেষণের কানের কাছে মুখ নিয়ে আস্তে আস্তে বলল গগন।

অন্বেষণ জিজ্ঞেস করলেন, ইনজেকশন কি সুপর্ণাই দিল?

হঃ, হ্যায় ইনজেকশনডা ভালোই দেয়।

আপনি কতদিন ধরে ভুগছেন?

এই  তো  বছর দুয়েক  হইলো  বেশ  কষ্ট  পাইতাসি। কি  একটা  অপারেশন  করাইতে হইব। না  হইলে নাকি ঠিক হইব না। অগো বাবা চইল্যা যাওনের পর সুপর্ণাই সংসারে হাল ধরসে। আমার   চিকিৎসার সব খরচা  চালাইতাসে। তার লগে আমার পোলাডার কলেজে পড়নের খরচাটাও জুগাইতাছে। চাষবাসে  আর  কয়  পয়সা  আহে? ধানের  জমি  যা  আছিল  তার  বেশির ভাগটাই বেইচ্যা দেওয়া হইসে, হ্যাদের বাপের  চিকিৎসা  করনের ল্যাইগা। তাও  তো  ওনারে  বাঁচানো  যায় নাই। দিনরাত  পরিশ্রম  করতাসে মাইয়াডা। খারাপ লাগে, কিন্তু  কিছুই  করতে  পারি  না।

ওনার  সাথে কথা  বলে  অন্বেষণরা ওনার বাড়ির চার পাশটা  ভালো  করে  দেখে, ওনাদের  বাড়ি থেকে  বেরলেন।

গগন জিজ্ঞাসা করলো, ওই  ভদ্রমহিলার  বাড়ি  যাবেন  নাকি?

হ্যাঁচলো,একবারঘুরেআসি।এতকরেযখনবললেন, তখন না গেলে খারাপ দেখাবে। এখানকার মানুষের আতিথেয়তা বেশ ভাল।

কিন্তু দেরি হয়ে যাবে না?

বেশিক্ষণ বসবো  না। দু’চারটে  কথা  বলেই  বেরিয়ে  পড়বো।

অন্বেষণরা ওই বাড়িতে গেলে বেশ আদর যত্ন করে বসালেন ওই ভদ্রমহিলা। একতলা দালান ঘর, টিনের চাল। বেশ সুন্দর পরিপাটি করে সাজানো ঘরটি। খাট, আলমারি ও একটা ড্রেসিং টেবিল রয়েছে ঘরটিতে। দেওয়ালে টাঙানো একটি ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট ছবি দেখে অন্বেষণ জিজ্ঞেস করলেন, এটা আপনার সপরিবারে ছবি মনে হচ্ছে!

হঃ, ওর বাপের লগে আমাগো এই একটাই ছবি আসে। আমার মাইয়াগো বয়স তহন বছর ছয়েক হইব।

তবে টেবিলের ওপরে আপনার দুই মেয়ের সাথে আপনার ছবিটা তো রিসেন্ট মনে হচ্ছে।

হ, আমার ছোট মাইয়া সেলফি তুলসে।

তা আপনার মেয়েরা আসে না এখানে?

ওরা তো নিজেদের কামে খুব ব্যস্ত থাহে। তাও আহে মইধ্যে মইধ্যে। এইবার তো আমি বড় মাইয়ার লগেই এইহানে আইসি। আমারে পৌঁছাইয়া দিয়া পরদিন ভোরে চইলা গ্যাসে ও।

এরপর অন্বেষণের ছোট-খাটো প্রশ্নে ভদ্রমহিলা নিজের কথা, পরিবারের কথা, মেয়েদের কথা, স্বামীর কথা, সব বলে চললেন। ভদ্রমহিলা এখন মূলত একাই থাকেন এই বাড়িতে। কথা বলার লোক বিশেষ নেই। তাই কাউকে পেলে অনবরত বকে চলেন। অন্বেষণ শ্রোতা হিসেবে বেশ ভালো। গগন পাশে বসে অবশ্য বেশ বিরক্তই হচ্ছিল। ভদ্রমহিলা যা বললেন তা হল, এটা ওনার পৈতৃক বাড়ি। ওনার এক দাদা, ইন্ডিয়াতে থাকেন। শ্বশুর বাড়ি ঢাকার বিক্রমপুরে। ওনার স্বামীর মাথায় একগাছা নারকেল পড়ে মৃত্যু হয়েছে। তারপর ওনারা বিক্রমপুরের বাড়িটি এক প্রোমোটার কে বিক্রি করে এই নেত্রকোনার গ্রামের বাড়িতে উঠে আসেন।  চাষবাস ও জমি বিক্রির টাকায় মেয়েদের পড়াশোনা করান। ওনার দাদা অবশ্য সে সময় বেশ হেল্প করেছেন।

বেশ কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে অন্বেষণরা উঠতে চাইলে উনি বললেন, খালি মুখে তো যাইতে দিমু না। বলে রান্না ঘর থেকে ওনার হাতে বানানো আমসত্ত্ব ও কয়েকটা নাড়ু নিয়ে এলেন। অন্বেষণ ও গগন সেগুলো উদরস্থ করে, ওখান থেকে রওনা হলেন। তখন পড়ন্ত বিকেল। একটু পরেই সন্ধ্যা নামবে।

অন্বেষণ বললেন আজ আর দুর্গাপুরে যাব না। সরাসরি ঢাকায় ফিরব।

কিন্তু ওখানে গেলে কিছু ক্লু পাওয়া গেলেও যেতে পারত। প্রসেনজিতের ওপর মণিকার বাপের বাড়ির লোকজনের বেশ রাগ ছিল। আর মনিকা একজন নার্স। ওর পক্ষে এই কাজটা করা অসম্ভব কিছু নয়।

সে তুমি কথাটা একদম ভুল বলনি। তবে ওখানে গেলে আজ ঢাকায় ফেরা বেশ চাপ হয়ে যাবে।

তবে আজ এখানে এসে লাভ কি কিছু হল?

একদম যে লাভ কিছু হয়নি সে নয়। তবে কয়েকটা অঙ্কের উত্তর এখনো মেলেনি। ঢাকায় ফিরে স্বাগতর সাথে কিছু কথা বলতে হবে। প্রয়োজনে তোমার ঐ সফটওয়্যার বন্ধুর সাথে কথা বলতে হতে পারে। মন বলছে খুব তাড়াতাড়ি এই তদন্তের কিছু কুল করতে পারব।

হয়তো। তবে আমার এখনি তেমন কিছু মনে হচ্ছে না। বলল গগন।

বেশ রাত করে ধানমন্ডিতে ঢুকলেন অন্বেষণরা। ঘরে ঢুকে একটু ফ্রেশ হয়ে স্বাগত কে ডেকে নিল গগন। ওর কাছে রিমোট এক্সেস ডিভাইস সম্পর্কে জানতে চাইলে স্বাগত যা বলল, তা মোটামুটি গগনের বন্ধু যা বলেছিল সেই রকমই।

গগন ওকে জিজ্ঞাসা করলো, তোমার কাকার ল্যাপটপে এই সফটওয়্যারটা ইন্সটল করা আছে কিনা, সেটা একটু দেখতে পারবে?

হ্যাঁ, কেন পারব না? ল্যাপটপটা আনেন, দেইখা দিতাছি।

সে আনছি, কিন্তু তার আগে তো ল্যাপটপের পাসওয়ার্ডটা শতায়ু থেকে জানতে হবে।

হ্যাঁ, জানলে ভাল। তবে না জানলেও সমস্যা নাই। পাসওয়ার্ড হ্যাক করতেও আমি পারি। আরে বলো কি? জানা রইল। প্রয়োজন হতে পারে। আচ্ছা তুমি মোবাইল হ্যাক করতে পারো? অন্বেষণের প্রশ্ন।

সে একটু ঘাটাঘাটি করলেই পারবো। কিন্তু কার মোবাইল হ্যাক করার দরকার হইয়া পড়ল কাকু?

সে সময় মত বলব। তবে এই ব্যাপারটা নিয়ে আমাকেও একটু পড়াশোনা করতে হবে।

সে আর সমস্যা কি? ইন্টারনেট তো আছেই। স্বাগত জানালো।

গগন শতায়ুর থেকে পাসওয়ার্ড জেনে স্বাগতকে দিলে, স্বাগত প্রসেনজিতের ল্যাপটপটা খুলে দেখল যে রিমোট এক্সেস ডিভাইসের সফটওয়্যারটা ল্যাপটপে ইন্সটল করা আছে।

তার মানে বাইরে থেকেই কেউ কলকাঠি নাড়িয়েছে এটা নিশ্চিত। বলল গগন।

হ্যাঁ। তাই তো মনে হচ্ছে। তবে বাড়ির কেউ যে একদম ইনভল্ব নেই, সেটাও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। গগন, তুমি কাল ডঃ তানভীর আহমেদের সাথে যোগাযোগ করো। ওনাকে জেরা করে দেখো, কিছু জানতে পারো কিনা। প্রয়োজনে রুবানাকে ফোন করে ওর সাহায্য নিতে পার। তাহলে কাজটা সহজ হতে পারে। আমাকে আবদুল কে দিয়ে আরেকটা কাজ করাতে হবে। আর স্বাগত, তোমাকেও কাল একটু কাজে লাগতে পারে।

নো প্রবলেম। কি দরকার বলবেন, সাধ্যমত চেষ্টা করব। বলল স্বাগত।

আজ সারাদিনের পরিশ্রমে তদন্ত যে কিছু হলেও এগিয়েছে, তা অন্বেষণের মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে।

(১০)

 

সকালে উঠে চা খেতে খেতে অন্বেষণ বললেন, আজ ছোটাছুটি বিশেষ নেই। শুধু ডঃ তানভীর আহমেদকে মিট করতে হবে। আর যদি সুপর্ণাকে পাওয়া যায় তাহলে ওকেও একটু জিজ্ঞাসাবাদ করা দরকার। আর আমাকে একটু ইন্টারনেট ঘাটতে হবে। দেখি এই বুড়ো বয়েসে পড়াশোনা করে যদি একটা না মেলা অংক মেলাতে পারি।

নেট পরে ঘাঁটবেন। আগে আপনি রুবানাকে একটা ফোন করে নিন। ওর পরামর্শ অনুযায়ী প্রোগ্রাম করা যাবে। বলল গগন।

তোমাদের তদন্ত শেষ হলো? বেড়াতে এলাম। কোথায় একটু ঘুরবো, আনন্দ করবো, না সেখানেও কাজ নিয়ে বসল। তোমরা তো ঘুরে বেড়াচ্ছ। আমার সারাটা দিন কিভাবে কাটে তা কি কখনো ভেবে দেখেছো? বেশ অভিমানের গলায় বললেন ভাস্বতী।

হ্যাঁ, দুদিন একটু বেশি ব্যস্ত ছিলাম। ঠিক আছে আজ নয় একটু বেলার দিকে বেরিয়ে আমি তুমি আর গগন ঢাকার মার্কেট ঘুরে একটু মার্কেটিং করে আসবো ক্ষণ।  আসলে বাড়িতে এমন একটা দুর্ঘটনা ঘটে যাবে, আগে থেকে কেউ জানত বল?

চা জলখাবার খেয়ে রুবানা কে ফোন করলেন অন্বেষণ।

রুবানা, ডঃ তানভীর আহমেদের সাথে কি তোমার আলাপ আছে?

হ্যাঁ, সে আছে। ক্যান? উনারে আবার কি দরকার?

তদন্তের প্রয়োজনে ওনাকে কিছু প্রশ্ন করার আছে। গগন যাবে ওনার কাছে। তোমার সাথে যখন ওনার পরিচয় আছে, তখন তুমি সঙ্গে গেলে ভালো হয়।

আজকে একটু ব্যস্ত আছি। চট্টগ্রাম থ্যাইকা আমার ঐ বান্ধবী আসছে। যার সঙ্গে আপনের কক্সবাজারে দেখা হইছিল। আজই ও চলে যাবে। তাছাড়া দুইজন পেসেন্টের অ্যাপয়েন্টমেন্টও আছে আজকে। তবে রাতের দিকে সময় হইতে পারে।

ঠিক আছে। তাতে কোন অসুবিধা নেই। তুমি একটু সম্ভব হলে ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করে, একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে রেখো।

ওকে, আমি সময় সুযোগ মত, একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট কইরা রাখবো।

তুমি কি রাতের দিকে তোমার বাসাতেই থাকবে? গগনকে কোথায় পাঠাবো?

আজ সারাদিন আমি আমার বাসাতেই আছি। উনারে এখানেই পাঠাইয়া দিবেন। আমার অ্যাড্রেস তো আছেই। আসার সময় আমারে যেন ফোন দিয়া আসে।

ওকে তাই হবে। এখন তবে রাখছি।

ফোন রেখে একটু নেট ঘাঁটাঘাঁটি করলেন অন্বেষণ। শতায়ু এসে বলল, আর কয়টা দিন পরেই তো বাবার কাজ। আমি আজকে কয়েকজন রে দাওত(নিমন্ত্রণ) দিতে যাবো। আপনারা আমার সাথে যাইতে পারেন। আমি আপনাদের নিউ মার্কেটে ছাইড়া দেব। আর আপনাদের মার্কেটিং হইয়া গেলে আমাকে ফোন দিবেন। সম্ভব হইলে আমি ফেরার সময় আপনাদের নিয়াও আসব।

শতায়ুর কথামত ওনারা তিনজন রেডি হয়ে ওর সঙ্গে বেরুলেন। ঢাকার নিউমার্কেটে অনেকগুলো দোকান ঘুরে, তার পাশে হকার মার্কেটে গেল ওরা। ঢাকাই জামদানি শাড়ির প্রচুর কালেকশন এখানে। যেমন রয়েছে শাড়ির ভ্যারাইটি, তেমন রয়েছে দামের ভ্যারাইটি। রনজিত বলে দিয়েছিলেন যে একটু দরাদরি করে কিনতে, না হলে ঠকতে হবে। মেয়েরা শাড়ি পরার চেয়ে, শাড়ি কিনতে বেশি ভালোবাসে। ভাস্বতী তার ব্যতিক্রম নয়। এতরকম শাড়ি দেখে মনের  সকল অভিমান অভিযোগ মুহূর্তের মধ্যেই ধুয়ে গেল ভাস্বতীর। অনেক বাছাবাছি করে, একটা ঢাকাই জামদানি কিনলেন উনি। গগন বলল, বৌদি আমার ওয়াইফ এর জন্য একটা বেছে দিন। বাংলাদেশ থেকে খালি হাতে ফেরা ঠিক হবে না। নানা দোকান ঘুরে দুটো শাড়ি কিনে, শতায়ুকে ফোন করে একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকলেন ওনারা। লাঞ্চ শেষ হওয়ার আগেই শতায়ু চলে এল। খাওয়া দাওয়া সেরে দুপুর দুপুরই ফিরলেন ওনারা।

বাড়িতে ফিরে আবার নেট ঘাঁটাঘাঁটি করলেন অন্বেষণ। আর শুয়ে বসে অলস ভাবে  বেশ কিছুটা সময় কাটাল গগন। বিকেলের দিকে অন্বেষণ আব্দুলকে একটা ফোন করে, রনজিতদের এই বাড়িতে আসতে বললেন। সন্ধ্যের পর গগন  রুবানার বাসায় গেল। রুবানা গগন কে দেখে বলল, সকালেই আমি ওনারে ফোন দিছিলাম। কিন্তু ফোনটা এনগেজ ছিল। এরপর আমার আর কাজের চাপে ফোন করা হয় নাই।  বলতে পারেন আমার মাথায় আছিল না ব্যাপারটা। দাঁড়ান এখন একবার ফোন দিয়া দেখি।

গগনের সামনেই রুবানা ওনাকে ফোন করলো। কিন্তু ফোন বেজে গেল। উনি ফোন ধরলেন না। রুবানা গগন কে বলল উনার ফ্লাট আমি চিনি। একবার ওইখানে যাওয়া যাক। আশা করি রাতের দিকে গেলে ওনারে পাওয়া যাইব।

নিজের ঘরে তালা দিয়ে ওই ডাক্তারের ফ্ল্যাটের উদ্দেশ্যে রওনা হল রুবানা। বেল বাজানোর অনেকক্ষণ পর বেশ বিরক্ত হয়ে দরজা খুললেন ডঃ তানভীর আহমেদ।

রুবানা তুমি হঠাৎ আমার ফ্ল্যাটে?

উনি একজন প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর। একটা মার্ডার কেসের তদন্তের ব্যাপারে আপনার সঙ্গে কিছু কথা বলতে চান। গগনের সাথে ডঃ আহমেদের পরিচয় করাল রুবানা।

এইভাবে হুট কইরা চইলা আসলে হয়? ফোন দিয়া অ্যাপয়েন্টমেন্ট কইরা আসবেন তো?

ফোন দিছিলাম। সকালে একবার করেছিলাম, আবার কিছুক্ষণ আগেও ট্রাই করছি। কিন্তু আপনে না ধরায় আপনার ফ্ল্যাটে চইলা আসতে বাধ্য হইলাম। বলল রুবানা।

ঠিক আছে কি জানতে চান তাড়াতাড়ি বলেন, আমার বেশি সময় নাই।

গগন সুপর্ণার মেডিকেল বিলের জেরক্স ড: আহমেদ কে দেখিয়ে বলে, এই পেসেন্টকে ক্যালসিয়াম গ্লুকোনেট ইনজেকশন কি আপনিই প্রেস্ক্রাইব করেছেন?

হ্যাঁ, করছি। কেন বলেন তো?

না, এই ইনজেকশনের কি খুব প্রয়োজন ছিল?

দরকার বুঝছি বইলাই দিছি। ডাক্তারিটাও আপনেদের থিকা শিখতে হইব নাকি?

কে আইসে গো? তোমার পেশেন্ট? কথা বলতে বলতে ভেতরের বেডরুম থেকে বেরিয়ে এলো সুপর্ণা।

সুপর্ণাকে দেখে প্রায় ভুত দেখার মতন ভঙ্গিতে রুবানা ওকে জিজ্ঞাসা করল, আরে সুপর্ণা, তুমি এইখানে?

গগন সুপর্ণা কে চিনতো না। মেয়েটি সুপর্ণা জানতে পেরে গগন বলল, আপনাকেই তো ক’দিন ধরে খুঁজছিলাম। আপনার সাথে কিছু কথা আছে।

আমারে কি আপনের আর কোনও প্রশ্ন করার আছে? বেশ বিরক্তির সাথে কথা গুলো বললেন ড: আহমেদ।

ঠিক আছে সুপর্ণাকে যখন পেয়ে গেছি, তখন আর আপনাকে বিরক্ত করবো না। আমরা সুপর্ণার থেকেই যা জানার জেনে নিচ্ছি। পরে যদি প্রয়োজন হয় তবে আপনার সাথে কথা বলা যাবে খন।

সুপর্ণা বলল, আপনারা একটু অপেক্ষা করেন। আমি রেডি হয়ে আপনাদের সাথে যাবো।

মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই সুপর্ণা একটা কালো বোরখা পরে বেরিয়ে এলো।

রুবানা বলল, আমারে তবে দরকার নাই। আমি তাইলে বাসায় যাই। আপনারা কথা বলেন।

রুবানা চলে যাওয়ার পর গগন ও সুপর্ণা একটা রেস্টুরেন্টে বসল। গগন বলল, রাত তো হয়েছে। ডিনারের অর্ডারটা দিয়ে দি? তারপর ডিনার করতে করতে কথা বলা যাবে ক্ষন।

গগনের কথায় সুপর্ণা তেমন আপত্তি করল না।

গগন বলল, আপনাকে তো কদিন ধরে পাওয়া যাচ্ছে না। ফোনটাও সুইচ অফ। আপনার গ্রামের  বাড়ি গেছিলাম বাধ্য হয়ে। কিন্তু সেখানেও আপনাকে পেলাম না।

হ্যাঁ ,আমি গ্রামের বাসাতে চার্জার নিয়া যাইতে ভুইল্যা গেছিলাম। তাই মোবাইলটা চার্জ আউট হইয়া যাওয়ার পরে আর চার্জ দিতে পারিনাই। কিন্তু আজ তো ফোন চালু আছিল।

না, আজ আর আপনাকে ফোন করা হয়নি।

এবারে বলেন হঠাৎ আমারে এমনভাবে প্রয়োজন হইয়া উঠল কেন আপনেদের?

আপনি যে ইনজেকশনটা মেডিসিন সপ থেকে কিনেছিলেন, সেই ইনজেকশনটা দিয়েই প্রসেনজিৎ বাবুকে মার্ডার করা হয়েছে। আর আপনি কালো বোরখা পড়েই বা কেন সেই ইনজেকশনটা কিনতে গেছিলেন? তারপরেই আপনাকে আর ফোনে পাওয়া যায় না। সবকিছু একটু ডিটেলে এবং কোনরকম মিথ্যের আশ্রয় না নিয়ে বলবেন। না হলে কিন্তু আপনি সমস্যায় পড়ে যাবেন। কোন কিছু আড়াল করার চেষ্টা করবেন না।

না, আমি আপনারে কিছুই লুকাবো না। সবটাই পরিষ্কার কইরা বলতাছি। কিন্তু একটা অনুরোধ, কথাগুলো শতায়ুরে বা ওদের বাসার কাউরে না জানাইলেই ভালো হয়।

ভয় নেই। আপনি আমাকে বিশ্বাস করতে পারেন। আমরা প্রাইভেসি রক্ষা করি। আর এটাই আমাদের পেশা।

আমার মা অস্টিওআর্থারাইটিস এ ভুগতাছে। ইমিডিয়েটলি নী রেপ্লেসমেন্ট করাতে হইব। আর এইর জন্য অনেক টাকা দরকার। আমাদের পরিবারে আর্নিং মেম্বার একমাত্র আমি। ভাইয়ের পড়াশুনার খরচ ও আমারে চালাইতে হয়। আর এই টাকাটা জোগাড় করা খুব সহজ ব্যাপার না। তাই ইচ্ছা না থাকলেও আমারে একটা অন্য রাস্তা দেখতে হয়। নিজেরে পণ্য করতে হয়। এই ডাক্তার আমার মা রে প্রায় বিনা পয়সায় চিকিৎসা করেন এবং অপারেশনের খরচ এর অধিকাংশটাই উনি জোগাড় করবেন বইলা কথা দিছেন। কিন্তু সব কিছু তো আর ফ্রিতে হয় না। কিছু পাইতে গেলে কিছু তো দিতেই হয়। তাই ওনার ফ্ল্যাটে আমারে ঘন ঘন আসতে হয়। তাছাড়া ডঃ তানভীর ইনজেকশনটা লইয়া ওনারে একবার দ্যাখাইয়া নিতে বলছিলেন। তাই ঐদিন ইনজেকশনটা লইয়া আমি ওনার ফ্ল্যাটে গেছিলাম। কেউ যাতে আমারে চিনতে না পারে, সেই জন্য আমি কালো বোরখা পইরাই ওনার ফ্ল্যাটে যাতায়াত করি। আশা করি আপনি আমার অবস্থাটা বুঝছেন।

সুপর্ণার সাথে কথা বলে ডিনার সেরে গগন বাড়ি ফিরল। বাড়ি ফিরে অন্বেষণকে সব কিছু বিস্তারিত ভাবে বলল গগন। বলল ওর কথা শুনে মনে হলো ও সত্যিই বলছে।

অন্বেষণ কিছু না বলে শুধু হুম করল। তারপর ডিনার সেরে শুতে গেল। ঠিক সেই সময়  রুবানার ফোন এলো।

রুবানা বলল, আমার বাড়িতে একটা বড় চুরি হইয়া গেছে। আমি আপনার কথা মত মিঃগগনরে  নিয়া ড: আহমেদের ওখানে গেছিলাম। আইসা দেখি আমার বাড়িতে সব ঘাটাঘাটি কইরা ঘড়ি, দামী কসমেটিক্স, ল্যাপটপ একটা ব্লুটুথ স্পিকার, কিছু দামি শোপিস প্রভৃতি নিয়া গেছে।

পুলিশে রিপোর্ট করোনি? অন্বেষণ প্রশ্ন করল।

হ্যাঁ করছি, থানা থিকা ফির‍্যাই আপনাকে ফোন দিলাম।

খুব ভালো কাজ করেছো। আমি ব্যাপারটা দেখছি। কথা বলে ফোন রাখল অন্বেষণ।

(১১)

আজ প্রসেনজিতের পরলৌকিক কাজ। বাড়িতে অনেক লোকজনের সমাগম হয়েছে। প্রসেনজিতের আত্মীয় বন্ধু-বান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশী, প্রসেনজিতের লিগাল এডভাইজার নইমুল হোসেন, রুবানা, সুপর্ণা সকলেই উপস্থিত হয়েছে এই অনুষ্ঠানে। প্রসেনজিতের খুনের রহস্য উন্মোচনের জন্য আজকের দিনটাকেই বেঁছে নিয়েছেন অন্বেষণ। তাই থানা থেকে দুজন পুলিশ অফিসারও এসেছেন এখানে। পরলৌকিক কাজ মিটে যাওয়ার পর বিকেলের দিকে সবাইকে এক জায়গায় করলেন অন্বেষণ।

অন্বেষণ বললেন প্রসেনজিতের আত্মার শান্তি কামনার উদ্দেশ্যেই আজকের এই পরলৌকিক কাজ। আজ আমরা ওনার খুনিকে শনাক্ত করে এই শান্তি কামনার অনুষ্ঠান আরও সার্থক করব।

অপরাধীরে ধইরা ফেলসস? সে কি আমাগো বাসার লোক? প্রশ্ন করলেন রনজিত মজুমদার।

বলছি, সবটাই বলছি। একটু ধৈর্য ধর। প্রসেনজিৎ মজুমদার লোকটি খুব একটি চরিত্রবান লোক ছিলেন না। ব্যবসার প্রয়োজনে অনেক অন্যায় কাজ উনি করেছেন। এমন কি কোন মানুষকে প্রয়োজনে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতেও দ্বিধা বোধ করেননি উনি। একবার ওনার একটি প্রজেক্ট এর প্রয়োজনে বিক্রমপুরের বেশ খানিকটা জমির প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। কিন্তু সেই জমির মালিকের বেঁচে থাকাকালীন তা পাওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছিল। প্রসেনজিৎ তাই তাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি তার লোককে ওনার বাড়ির একটি নারকেল গাছে উঠে থাকতে বললেন। গাছটি ছিল ওনাদের বাথরুমের পাশেই। ঐ ভদ্রলোক যখন ওই গাছতলার নিচে দিয়ে যাচ্ছিলেন, ঠিক তখন ওনার মাথা লক্ষ্য করে বেশ কয়েকটা নারকেল নিক্ষেপ করা হয়। ভদ্রলোক তৎক্ষণাৎ মারা যান।

এই ঘটনা এখন কওনের কি কাম আছে? এইডা তো আমাগো জানাই আছিল। আমিই তো তোরে এই কথাগুলি কইছিলাম। বললেন রনজিত।

দরকার তো অবশ্যই আছে। কারণ বাবার খুনের বদলা নেওয়ার জন্যই তার মেয়ে, প্রসেনজিৎকে খুন করেছে। তাইতো রুবানা? কথাটা বলেই রুবানার দিকে মুখ ঘোরালেন অন্বেষণ।

আপনে কি বলতে চান? প্রসেনজিৎ বাবু রে আমি খুন করছি? আমি তো ওইদিন আপনার সঙ্গেই কক্সবাজারে ছিলাম। কি যা-তা বলতাছেন আপনে! ভীষণ রাগের সঙ্গে কথাগুলো বলল রুবানা।

কক্সবাজারে তুমি যাওনি। গিয়েছিল তোমার যমজ বোন। তোমার মুখের হিজাবটা একটু সরাবে?

কেন? আমি হিজাব সরাবো ক্যান?

তুমি না সরালে, আমাকে অন্য কাউকে দিয়ে বলপূর্বক সরাতে হবে।

অন্বেষণের কথায় মুখের সকল আবরণ সরিয়ে ফেললো রুবানা। অন্বেষণ বললেন, তোমার চিবুকে তিলটা কোথায়? আমাদের সাথে কক্সবাজারে যে রুবানা গিয়েছিল, তার চিবুকে তো একটা তিল ছিল। কথাটা বলে মোবাইল বের করে রুবানা ও তার বান্ধবীর সাথে অন্বেষণের কক্সবাজারের সমুদ্রে তোলা ছবিটা সবাইকে দেখান অন্বেষণ।

একটা তিল দিয়া আপনে কি প্রমাণ করতে চাইতাছেন? আর আমার যমজ বোনই বা আসলো কোথা থিকা? আমি তো কক্সবাজারে আপনার সঙ্গে কথা বলছি। আপনাকে ফোন দিছি। আমার ফোনের লোকেশন ট্র্যাক করলেই বোঝা যাবে যে আমি কোথা থেকে ফোন দিছিলাম। বেশ দৃঢ়তার সাথে কথা গুলো বলে রুবানা।

না, কক্সবাজারে তুমি আমার সাথে কোন কথা বলোনি। তোমার সাথে যা কথা হয়েছিল সবই হয়েছিল ফোনে। আর সেই কথাগুলো তুমি বলেছিলে স্নুফিং সফটওয়্যারের সাহায্যে।

স্নুফিং সফটওয়্যার! সেইটা কি? নইমুল হোসেনের প্রশ্ন।

স্নুফিং সফটওয়্যার, এমন একটি সফটওয়্যার, যার সাহায্যে খুব সহজেই ফোনের লোকেশন চেঞ্জ করা যায়। তাইতো স্বাগত?

স্বাগত মাথা নেড়ে অন্বেষণের কথার সম্মতি জানায়।

রুবানা তুমি সেদিন কক্সবাজার না গিয়ে তোমার মায়ের সঙ্গে ঢাকাতেই ছিলে। আর এই কাজটা করে পরদিন ভোরেই তোমার মা কে নিয়ে, নেত্রকোনার গ্রামের বাড়ি চলে গিয়েছিলে। আমি তোমার গ্রামের বাড়িতে গিয়ে সেই খবর জানতে পারি। তোমার যমজ বোনের কথাটাও আমি ওখানেই জানি।

আপনি আমার গ্রামের বাড়ি গেছিলেন? সেখানকার ঠিকানা পেলেন কোথা থেকে?

সে অনেক গল্প। বলতে পারো তোমার আল্লাহ তোমার গ্রামের ঠিকানা ও তোমার মায়ের সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল।

তর্কের খাতিরে আমি যদি আপনের সব কথা মাইন্যাও নেই, তবুও আপনার কথাগুলো কি বিশ্বাসযোগ্যতা পাইতাছে? একজন বাইরের লোকের পক্ষে কি এই কাজটা করা সম্ভব? আর আপনে বলতাছেন উনারে ইনজেকশন দিয়া মারা হইছে। কিন্তু যতদূর জানি উনারে ইনজেকশন দেওয়া অত সহজ ছিল না। আপনের কথাগুলো গল্প কথাই মনে হইতাছে না?

ইনজেকশন টা দেওয়া হয়েছিল এমলা প্যাচ ব্যবহার করে। অন্বেষণের উত্তর।

তবে এটা ঠিক যে, বাইরের লোকের পক্ষে এই কাজটা করা অত সহজ হইব না। বললেন নঈমুল।

সম্ভব। বাইরের লোকের পক্ষেও এই কাজটি করা সম্ভব, যদি বাইরে থেকেও সে ঘরের সবটা দেখতে পায়। আর যেটা দেখেছিল রুবানা প্রসেনজিতের ল্যাপটপে রিমোট এক্সেস ডিভাইস লোড করে। রুবানার ল্যাপটপ ঘেঁটেও আমি সেই সফটওয়্যার দেখতে পাই।  শুধু তাই নয়, ওর ল্যাপটপে আরও অনেক ইনফরমেশন পাই যাতে প্রমাণ হয় যে খুনটা রুবানাই করেছে।  খুনের আগে বেশ কয়েকদিন ধরে রুবানা যে নেট সার্চিং করেছে, তার প্রায় সবই এই খুন সংক্রান্ত।

ও তাহলে আমার বাড়ির চুরিটা আপনে করিয়েছেন।

হ্যাঁ, আব্দুল কে দিয়ে আমি তোমার বাড়িতে চুরি করাই। শুধু ল্যাপটপ নিলেই আমার কাজ চলে যেত। কিন্তু তাতে তোমার সন্দেহ হতে পারে। তাই আরও কয়েকটা জিনিস আমি তোমার ওখান থেকে সরাতে বলি। তবে চিন্তার কিছু নেই। সবকিছুই সুরক্ষিত আছে, আর সব তুমি ফেরত পেয়ে যাবে। তোমার সকল প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়ে গেছে রুবানা। কেন করলে এসব?  তুমি তোমার বাবার খুনিকে আইনের সাহায্য নিয়ে শাস্তি দিতে পারতে। আইন নিজের হাতে তুলে নিলে কেন রুবানা?

আইন! আইন উনাকে কিছুই করতে পারত না। করলে অনেকদিন আগেই করত। আর আমি ওনারে খুন করছি শুধু আমার আব্বার খুনের জন্যই নয়। জানেন এই প্রসেনজিৎ মজুমদার আমার আম্মার কলেজ জীবনে আম্মাকে ওনার প্রেমের জালে ফাঁসাইয়া ছিলেন। আর সেই সম্পর্কের কারনে দু একবার আম্মাকে গর্ভপাতও করাতে হয়। আর তারপর আম্মাকে নিকা করতে অস্বীকার করেন উনি। আম্মার ওই গর্ভপাতের জন্য পরবর্তীকালে আম্মার বিবাহিত জীবনেও সন্তান ধারনে সমস্যা হইছিল। অনেক চিকিৎসার পর সে সমস্যার সমাধান হইছিল। আর উনি শুধু আমাদের ক্ষতিই করেন নাই। আরও অনেকরেই পৃথিবী থেকে সরাইয়া ছিলেন। অনেক মেয়ের সম্মান নষ্ট কর ছিলেন। খুব শীগগিরি উনি পলিটিকাল পাওয়ার পাইতে চল ছিলেন। আর ওইটা পাইলে উনি আরও কত মানুষের যে ক্ষতি করতেন, তার হিসাব থাকত না। তাই সকলের স্বার্থে আমি উনারে পৃথিবী থেকে সরাইয়া দিলাম। এমন একটা মানুষ পৃথিবীতে থাকলে কোন মানুষের উপকারে তো আসবই না। বরং পৃথিবীরে কলুষিত করব।

কিন্তু এই অপরাধের শাস্তি তো তোমাকে পেতেই হবে। ইনস্পেক্টর ওকে অ্যারেস্ট করুন।

ইন্সপেক্টর রুবানাকে অ্যারেস্ট করে ওনাদের গাড়িতে তুললেন।

রুবানারা বেরিয়ে গেলে নইমুল বললেন, যাউক, প্রসেনজিতের সম্পত্তি তাহলে অন্যত্র যাইতাছে না। পরিবারের লোকজনদের মধ্যেই থাকবো।

শতায়ু অন্বেষণ এর কাছে এসে বিনীত ভাবে বলল, আমারে ক্ষমা করবেন জেঠু। আমি আপনারে ভুল বুইঝ্যা, যা নয় তাই বলছিলাম।

ভুলের উপলব্ধিটাই আসল। সেখানেই সব ভুলের ক্ষমা হয়ে যায়।

জেঠু আপনি যেভাবে আমার বাবার খুনিরে ধরছেন, তার কত পারিশ্রমিক হওয়া উচিত আমার জানা নাই। যেকোনো মূল্যের পারিশ্রমিক দিয়াও এই কাজের মূল্যায়ন করা সম্ভব নয় বলে আমার ধারনা। তবুও আমি একটা ব্ল্যাংক চেক আপনারে দিব। আপনি দয়া কইর‍্যা আপনার ইচ্ছে মত অ্যামাউন্ট বসাইয়া নিবেন। বেশ নম্রতার সাথে কথা গুলো বলে শতায়ু।

সে হবে খন। তুমি আগে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাদের দেশে ফেরার ব্যবস্থা কর।

সে করছি, কিন্তু কিভাবে যাবেন?

ফ্লাইটের টিকিটই কর। একবার প্লেনে চড়েই তোমার জেঠির সকল ভীতি কেটে গেছে। বললেন অন্বেষণ।

(১২)

আজ অন্বেষণদের ভারতে ফেরা। তারই প্রস্তুতি পর্ব চলছে সকাল থেকে। গতকাল রাতেই মোটামুটি লাগেজ গুছিয়ে রেখেছিল ভাস্বতী ও গগন। এখন সকলে রেডি হয়ে নিচ্ছে। অন্বেষণ রেডি হয়ে রণজিতের ঘরে ঢুকলেন। একা ঘরে খাটের উপর বসে পেপার পড়ছিলেন রনজিত মজুমদার।

অন্বেষণ বললেন, চললাম রে।

আয়। এতদিন থাইক্যা চইলা যাইতাছস তো। তাই কেমন একটা লাগতাসে। বাড়িটা ফাঁকা ফাঁকা লাগবো কদিন।

হ্যাঁ কয়েকদিন লাগবে। তারপর সব ঠিক হয়ে যাবে। যেমনটা প্রসেনজিৎ চলে যাওয়ার পর হয়েছে।

হ্যাঁরে ভাইটা আমার অকালে চইল্যা গেল। এই জায়গাটা কখনোই পূরণ হইব না।

প্রসেনজিৎ পৃথিবী থেকে চলে যাক সেটা তুই চাস নি?

কি যে কস? দাদা হইয়া ভাইয়ের মরণ কেউ চায়?

আমি যদি বলি তুই চেয়েছিলি। প্রসেনজিতের মনে যে মৃত্যু ভয়টা জেগেছিল, সেটা তো তুই তৈরি করে দিয়েছিলি। আর রুবানার বাবাকে যে প্রসেনজিৎ লোক দিয়ে খুন করেছিল, রুবানার মায়ের সাথে ওর কলেজ লাইফে প্রসেনজিতের যে একটা সম্পর্ক ছিল, সেসব খবর তো রুবানার জানার কথা নয়। সেটাও তো তুই বলেছিলি, তাই না? রুবানার মনে প্রসেনজিতের ওপর যে ক্রোধ জন্মেছিল, তার জন্য তো তুই দায়ী। প্রসেনজিৎ যে ইলেকশনের টিকিট পেতে চলেছে সে খবরটা ও তুই দিয়েছিলি। আর সেদিন তুই রুবানা কে প্রসেনজিতের ঘর থেকে বেরোতে দেখেছিলি। ওকে না চিনলেও চেহারার আকৃতি দেখে তুই বুঝতে পেরেছিলি যে ও রুবানা। রুবানা তো বেশ লম্বা। তবু তুই আমাকে বলেছিলি, যে মেয়েটি কালো বোরখা পড়ে ওর ঘর থেকে বেরিয়ে ছিল, সে বেটে মতন ছিল। অনেকটা সুপর্ণার চেহারার বর্ণনা দিয়েছিলি তুই। যাতে আমি ভুল পথে চলে যাই। রুবানা যে খুন করেছিল, সেটা তোর জানা ছিল। আর ও ধরা পড়ে সেটাও তুই চাস নি। কি আমি ভুল বলছি?

অন্বেষণ এর প্রশ্নের উত্তরে রনজিত কোন কথা না বলে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে হু হু করে কেঁদে ফেলেন, তারপর নিজেকে সামলিয়ে বলেন, হ আমার লিগাই ও খুন হইসে। প্রসেন টা বড্ড বার বারছিল। কথাগুলো বলে আবার কাঁদতে থাকে রনজিত।

ভালো করে কাঁদ। তুই যা করেছিস সেজন্য কোন আইন তোকে শাস্তি দিতে পারবে না। তবে তোর বিবেকের কাছে তুই চিরকালই অপরাধী হয়ে থাকবি। আর এটাই হল তোর চরম শাস্তি। কথাগুলো বলে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো অন্বেষণ।

ফ্লাইটে জানলার ধারে বসেছে ভাস্বতী। তার পাশে অন্বেষণ ও গগন। ভাস্বতী অন্বেষণকে বললেন, আচ্ছা, তুমি যেখানেই যাবে, সেখানেই কি কোন রহস্য তোমার জন্য অপেক্ষা করে থাকবে? আর তুমি তা সমাধান করবে?

অন্বেষণ একটু হেসে বললেন, সেটাই তো স্বাভাবিক। কথায় আছে না, ঢেঁকি স্বর্গে গিয়েও ধান ভাঙ্গে।

সমাপ্ত

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত