প্রফেসর বৈদ্যনাথ ও প্রফেসর বৈদ্যনাথ

প্রফেসর বৈদ্যনাথ ও প্রফেসর বৈদ্যনাথ

প্রফেসর বৈদ্যনাথ বর্তমান বৈজ্ঞানিক সমাজে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম। বাস কোচবিহার শহরে। দেশবিদেশের বিভিন্ন কনফারেন্স, সিম্পজিয়ামে ভারতের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেছেন বহুবার। প্রফেসর বৈদ্যনাথ যে ধরনের বৈজ্ঞানিক, সে ধরনের বৈজ্ঞানিক আজকালকের দিনে সত্যই খুব অল্প। এককথায় হি ইজ অফ রেয়ার কাইন্ড। পদার্থ, রসায়ন, গণিতশাস্ত্র, প্রাকৃত-অপ্রাকৃত জীবন এমনকি মরণোত্তর জীবন কিছুই তার কাজের এলাকার বাইরে নয়। তথাপি গত কয়েক বছর ধরে তিনি যে বিষয়ে মনোনিবেশ করেছেন তা এসবের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। তিনি যে বিষয়ে কাজ করছেন তা হল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স। তবে এটি কনভেনশনাল জন ম্যাকার্থের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স থেকে খানিকটা আলাদা। তারই প্রবর্তিত বিজ্ঞানের এই নতুন শাখার নাম রাখা হয়েছে কেমিকো আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স যা প্রধানত পদার্থবিদ্যা, রসায়ন ও কম্পিউটার সায়েন্সের এক মসৃণ ব্লেন্ড।

প্রফেসর বৈদ্যনাথ আটান্ন বছর বয়স্ক এক বৃদ্ধ বৈজ্ঞানিক। তবে তার কাজের উদ্যম, উৎসাহ তাকে আটান্ন বছরের যুবক বানিয়ে রেখেছে। প্রফেসরের মাথাভরতি টাক, মাথার পেছনের দিকে শুভ্র লম্বা চুল, গোঁফটাও কিছুটা পেকে গেছে। বুদ্ধিদীপ্ত চেহারায় বিজ্ঞানীর সাথে কিছুটা সাহিত্যিকের ভাব এনে দিয়েছে।

আজ কয়েকদিন হল প্রফেসর বৈদ্যনাথ সাদা বালির সমুদ্রসৈকত জাপানের অকিওয়ানাতে আছেন। প্রফেসর বৈদ্যনাথের এই বর্তমান গবেষণার পৃষ্ঠপোষকতা করছে জাপানের একটি বেসরকারি সংস্থা। সংস্থার প্রেসিডেন্ট ফিউমা নাকামুরা কগ্নিটিভ সায়েন্সে বিশ্বে নামীদামী নামগুলোর মধ্যে গোনা হয়। দুই শতাধিক গবেষণাপত্র শুধুমাত্র কগ্নিটিভ সায়েন্সে অর্থাৎ মস্তিষ্কের কার্যপ্রণালীর ওপর। তার অনুরোধেই জাপানে আসেন প্রফেসর বৈদ্যনাথ। নাকামুরার সঙ্গে বৈদ্যনাথের প্রথম কথা হয় জার্মানিতে কোনও এক বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে। সেখানেই প্রফেসর বৈদ্যনাথ প্রথম কেমিকো আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের কথা বলেন। যা ম্যাকার্থের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স থেকে হবে অনেকটাই আলাদা। যাতে মস্তিষ্ক তৈরি হবে জটিল সার্কিট আর হাজারো রাসায়নিক পদার্থের সমন্বয়ে।

এই অভিনব প্রস্তাবে চমৎকৃত নাকামুরা বক্তৃতা শেষে প্রফেসর বৈদ্যনাথের সঙ্গে চা-বিরতির সময় আলাপ শুরু করে দিলেন। সকলে বেশ চমৎকৃত ও উৎসাহিত বিজ্ঞানের এই নতুন শাখা নিয়ে। কিন্তু ফিউমা নাকামুরা নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন, “আমার সংস্থা আপনাকে অর্থনৈতিক সাহায্য করতে প্রস্তুত। আপনি চাইলে আগামী বছর থেকেই কাজটি শুরু করতে পারেন।”

এর আগে প্রফেসর বৈদ্যনাথের নাকামুরা সম্পর্কে শুধু শুনে বা গবেষণাপত্রে পড়ে এসেছেন। এই প্রথমবার দেখা। উচ্চতায় পাঁচ ফুট দুই ইঞ্চির বেশি নয়। সামনের দিকের চুল খাড়া খাড়া, দাড়িগোঁফের বালাই নেই। নীল স্যুটের ভেতরে ধবধবে সাদা শার্ট, অত্যন্ত কম বয়স। অত্যন্ত কম বয়স বলছি কারণ, তিনি প্রফেসর বৈদ্যনাথের থেকে বয়েসে প্রায় বিশ বছরের মতো ছোটো আর এই বয়সেই এই সাফল্য একেবারেই খাপ খায় না।

এ অবধি জাপানে আসা প্রফেসর বৈদ্যনাথের জন্য তেমন কার্যকর হয়নি। কারণ, নাকামুরা যে মিটিংয়ের জন্য তাঁকে এখানে ডেকেছিলেন, তাতে বিজ্ঞান কম ব্যবসায়িক আলোচনাই বেশি হয়েছে। এই প্রজেক্টের প্রোডাক্ট কী আকারে বাজারজাত করা হবে, এইসব বিষয়ে আলোচনা প্রফেসর বৈদ্যনাথকে কিছুটা ক্লান্ত করে দিয়েছে। এইবার প্রফেসর বৈদ্যনাথ বুঝতে পারছেন নাকামুরার এই ব্যবসায়িক সাফল্যের কারণ। প্রফেসর বৈদ্যনাথ শুধু অবাক হলেন বিজ্ঞানের এত বড়ো হস্তি মিটিংগুলোতে একবারের জন্য বিজ্ঞানের কথা বললেন না, মানব কল্যাণের কথা বললেন না!

প্রফেসর ফিউমা নাকামুরা আরও কয়েকটা মিটিং রেখেছেন। মিটিং শিডিউল দেখে বৈদ্যনাথ কিছুটা ব্যথিত। কারণ, সবকটি মিটিংই ব্যবসা-সংক্রান্ত। তাই নাকামুরাকে বুঝিয়ে বলে এসব থেকে দূরে অকিওয়ানেতে এক নিরিবিলি জায়গায় একটা হোটেলে আছেন প্রফেসর বৈদ্যনাথ। সমস্ত খরচা বহন করছে নাকামুরার সংস্থা।

নাকামুরা অর্থ নিয়ে এত ব্যতিব্যস্ত হওয়ার কারণও বোধহয় অনর্থক নয়। কারণ, এই প্রজেক্টে তারা পয়সাও ঢেলেছে প্রচুর। বৈদ্যনাথ এবং নাকামুরার মিটিং ছিল টোকিওতে। কিন্তু প্রফেসর বৈদ্যনাথের এখন প্রায় দু’হাজার কিমি দূরে অকিওয়ানাতে পরম শান্তিতে নিজের কাজে মনোনিবেশ করার চেষ্টা করছেন। এতদূরে আসার একমাত্র কারণ কোলাহল থেকে দূরে থেকে নিজের গবেষণায় মনোনিবেশ করা। তিনি আছেন এক নিরিবিলি পার্সোনাল স্যুইটে। বৈদ্যনাথ এত ঐশ্বর্য্য পছন্দ না করলেও সংস্থার অনুরোধে এবং নিঃসঙ্গতার প্রয়োজনীয়তায় এখানে তিনি থেকে যান।

এবার প্রফেসর বৈদ্যনাথের বর্তমান প্রজেক্ট সম্পর্কে একটা ধারণা দেয়া যাক। এই কেমিকো আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের প্রবক্তা স্বয়ং প্রফেসর বৈদ্যনাথ হলেও সমস্ত দায়িত্ব তিনি একা বহন করছেন না। সারা বিশ্বের নামীদামী দশজন বৈজ্ঞানিক একসাথে কাজ করছে। তবে অনেকগুলি মডিউল আছে প্রফেসর বৈদ্যনাথের হাতে। সমস্ত রোবোটিক ইঞ্জিনিয়ারিং দেখছেন প্রফেসর বৈদ্যনাথের জার্মান বন্ধু কার্ল হ্যান। তবে রসায়ন ও কম্পিউটার সায়েন্স দেখছেন প্রফেসর বৈদ্যনাথ নিজে। এই প্রজেক্টের প্রোডাক্ট যা তৈরি হবে তা হল একটি হিউম্যানয়েড ব্রেইন। যার অপার ক্ষমতা মানব সভ্যতাকে এগিয়ে দেবে অনেকটা। এই ব্রেইন প্রধানত কাজ করবে ননলিনিয়ার পলিনমিয়াল প্রবলেম বা এনপি প্রবলেমের ওপর। কাজ করবে গড পার্টিকেলের ওপর। ওজনে মানুষের মস্তিষ্ক থেকে বেশি হবে না। তৈরি হবে জটিল সার্কিট। যার বিল্ডিং ব্লক হবে কৃত্রিম স্নায়ু বা আর্টিফিশিয়াল নিউরন। নিউরনের মধ্যে তথ্য সরবরাহ ইলেকট্রিক সিগন্যালের মাধ্যমে। এই সিগন্যাল আসবে এক ধরনের তরল থেকে যা মানুষের ক্ষেত্রে আমরা রক্ত হিসেবে জানি। এই মস্তিস্কের সমস্ত কার্য্যপ্রণালী নিয়ন্ত্রত হবে একটি ছোট্ট চিপের নির্দেশ অনুসারে। এই চিপে যা থাকবে তা হল একটি অ্যালগোরিদম লাইব্রেরি। আর এই লাইব্রেরির কাজ করবার জন্যই প্রফেসর বৈদ্যনাথের অকিওওানাতে আসা। এই হিউম্যানয়েড ব্রেইনটি মানুষের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করবে কিছু ইনপুট এবং আউটপুট ডিভাইস দ্বারা।

প্রফেসর বৈদ্যনাথ গতকাল অনেক রাত অবধি অ্যালগোরিদম সম্বন্ধে অনেক ভেবেছেন। কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। গতকাল অনেক রাত অবধি জাগাতে তার মাথাটা ঝিমঝিম করছে। রাত্রি জাগার ঘটনা এই প্রথম নয়। কোনও জটিল গবেষণায় তাকে প্রায়শই অনেক রাত্রি জাগতে হয়। আজ মাথা ঝিমঝিম করার কারণ অন্য। কাল রাতে দুঃস্বপ্নরকমের কিছু একটা দেখেছেন। দেখেছেন পৃথিবী ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়ার জন্য তিনিই দায়ী। তাঁকে সবাই দোষারোপ করছে। নাকামুরার হিংস্র চেহারা দেখে হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায়। তখনও ঠিকঠাক ভোর হয়নি। প্রফেসর আবার ঘুমিয়ে পড়লেন।

কলিং বেল বেজে ওঠায় আবারও ঘুম ভাঙল সোয়া সাতটা নাগাদ। দরজা খুলতেই প্রফেসর বৈদ্যনাথ দেখলেন ফিউমা নাকামুরা। বললেন, “ওহা ইও” অর্থাৎ, শুভ সকাল।

প্রফেসর বৈদ্যনাথও বললেন, “গুড মর্নিং।”

“আপনি ফ্রেশ হয়ে নিন। তারপর কথা বলব।” এই বলে নাকামুরা হোটেল স্যুইটের ব্যালকনিতে বৈদ্যনাথের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন।

হাতেমুখে জল দিতে দিতে প্রফেসর বৈদ্যনাথ বুঝে উঠতে পারছেন না, এত সকাল সকাল নাকামুরা এত বড়ো বিজনেস মিটিং ছেড়ে কেন তার সঙ্গে করতে এলেন? প্রফেসর বৈদ্যনাথ ঘরে প্রবেশ করে দেখলেন নাকামুরা এরই মধ্যে চা ও ব্রেকফাস্ট আনিয়ে রেখেছে। ধূমায়িত চা অপেক্ষা করছে প্রফেসরের জন্য, যা এখন খুবই প্রয়োজন।

আজকে নাকামুরাকে দেখে একটু বিষণ্ণ বলে মনে হচ্ছে। নাকামুরা একটু তীক্ষ্ণ সুরে বললেন, “তো প্রফেসর, আপনার লাইব্রেরির কী খবর?” একটু বিনয়ী হওয়ার চেষ্টা করে, “আই অ্যাম সরি, মানে আপনার অ্যালগোরিদম লাইব্রেরির কী খবর?”

শেষটায় খানিকটা উদাসীনতা।

“ও হ্যাঁ, কাজ হচ্ছে।” বৈদ্যনাথ স্বাভাবিকভাবেই বললেন। আরও বললেন, “একক অ্যালগোরিদম তৈরি, কিন্তু ওদের সমন্বয় বা ইনট্রিগেশন শুধু বাকি। আর প্রধান সমস্যা হল সেখানেই।”

নাকামুরা হঠাৎ আগ্রহী হয়ে বললেন, “ও প্রফেসর, হ্যাভ ইট।” এবং চা ও প্রাতরাশের দিকে ইশারা করলেন।

প্রফেসর বৈদ্যনাথ চা নিতে নিতে বললেন, “আপনি আপনার এত বড়ো বিজনেস মিটিং ছেড়ে কেন আমার সঙ্গে দেখা করতে এলেন আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না।”

নাকামুরা একটু সন্দেহের সুরে বললেন, “গতকাল রাতে আপনি প্রোডাকশন প্ল্যান্টে কী করছিলেন, আর আপনি আমায় মিথ্যা কেন বলেছেন? আপনার অ্যালগোরিদম লাইব্রেরির ইনটিগ্রেশন তো হয়ে গেছে।” কথা শেষ করেই হাতের ফাইলটা দেখিয়ে বলল, “এই তো তার ব্লু প্রিন্ট।”

প্রফেসর বৈদ্যনাথ আকাশ থেকে পড়লেন। নাকামুরা যে প্রোডাকশন প্ল্যান্টের কথা বলছে তা অকিওয়ানা থেকে দু’হাজার কিমি দূরে। তাছাড়া তিনি ওখানে যাবেনই বা কেন। এই মুহূর্তে তিনি অ্যালগোরিদম নিয়ে এতটা ব্যস্ত। তার ওপর নাকামুরা এ কোন ফাইল নিয়ে এসেছে?

বৈদ্যনাথ ফাইল খুলে দেখলেন, শেষে দিকটায় গতকালের তারিখ। তারই হাতের কাটাকুটি লেখা আবার কাটাকুটি করা। আবার লেখা এবং শেষ অবধি সমীকরণ মিলে যাওয়ার মতো অ্যালগোরিদমের ইনটিগ্রেশন সম্পন্ন করা। প্রফেসর বৈদ্যনাথ মনে মনে আওড়াতে লাগলেন, “আমি সফল, আমি সফল।” বলতে বলতে শরীর যেন কেমন অবসন্ন হয়ে গেল। কথা জড়িয়ে আসতে লাগল। শুধু দেখা গেল নাকামুরার ঠোঁটের কোণে এক তীক্ষ্ণ পৈশাচিক হাসি। কালো কাপড় পরা কয়েকজন এসে বৈদ্যনাথকে ধরাধরি করে কোথাও একটা নিয়ে যেতে থাকল। শুধু বোঝা গেল, এরা নাকামুরার শাগরেদ। তবে কি নাকামুরাই চায়ের সঙ্গে কিছু মিশিয়েছে? প্রফেসর ঘুমের কোলে ঢলে পড়লেন।

যখন ঘুম ভাঙল তখন বৈদ্যনাথ নিজেকে একটা চেয়ারের সঙ্গে বাঁধা অবস্থায় পেলেন। তেষ্টায় বুক ফেটে যাচ্ছে। যে প্রফেসর বৈদ্যনাথকে জলের গ্লাস এগিয়ে দিল তাকে দেখে তার আক্কেল গুড়ুম হয়ে গেল।

অজ্ঞান হয়ে যাওয়ায় বৈদ্যনাথের মাথা ঝুঁকে ছিল। জল হাতে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটির জুতো আর গাউন প্রফেসর বৈদ্যনাথের সঙ্গে একই ব্র্যান্ড। মুখ তুলে যা দেখলেন তাতে রক্ত হিমশীতল হয়ে গেল। সামনে দাঁড়িয়ে আছেন বৈদ্যনাথ নিজে।

গ্লাস মুখের সামনে এগিয়ে দিয়ে জল খেতে দিয়ে সে বলল, “শান্ত হও, সব বুঝিয়ে বলছি।”

প্রফেসর বৈদ্যনাথ ক্লান্ত, শ্রান্ত। এখনও ঘুমপাড়ানি ওষুধের নেশা কাটিয়ে উঠতে পারেননি। তিনি ভাবছেন, ‘আবারও কোনও স্বপ্ন-টপ্ন দেখছি না তো?’

জলদাতা বৈদ্যনাথ এবার একে একে সমস্ত ঘটনা বলতে শুরু করল। তার কথার সারমর্ম যা দাঁড়ায় তা হল কিছুটা এইরকম।

এই দ্বিতীয় বৈদ্যনাথ এসেছে পৃথিবী থেকে কয়েক লক্ষ আলোকবর্ষ দূরে পৃথিবীর মতো এর একটি গ্রহ থেকে। নাম আরস্ভেনাস। যা অবিকল পৃথিবীর মতোই। মতো বললে ভুল হবে, ওটা ওই সৌরজগতের পৃথিবী। কিন্তু সেটি ভেনাস বা শুক্রের মতো অত কাছে না হলেও পৃথিবী থেকে সূর্যের যা দূরত্ব তার থেকে কম। পৃথিবীর সাথে এই আরস্ভেনাসের মিল হল পৃথিবীর সমস্ত কিছুর অর্থাৎ কীটপতঙ্গ, গাছপালা, পশুপাখি থেকে শুরু করে সবকিছুর প্রতিরূপ বা রেপ্লিকা সেখানে আছে। তাই প্রফেসর বৈদ্যনাথেরও রেপ্লিকা থাকাটাই স্বাভাবিক। শুধু রেপ্লিকা বললে ভুল হবে কারণ, এই রেপ্লিকার কাজকর্মও থাকে একই। কিন্তু আরস্ভেনাস ওই সৌরজগতের সূর্যের কিছুটা কাছাকাছি থাকায় প্রতিমুহূর্তে একটু একটু করে প্রায় বিশ বছর এগিয়ে গেছে অর্থাৎ আজ আরস্ভেনাসে যা একই ঘটনা বিশ বছর পরে পৃথিবী ঘটে। তারই সূত্র ধরে আরস্ভেনাসের বৈদ্যনাথের পৃথিবীতে পদার্পণ।

এসব ঘটনা শুনে বৈদ্যনাথ অবাক ও স্তম্তিত। কত বিচিত্র জিনিসই না প্রকৃতিতে আছে। আরস্ভেনাসের বৈদ্যনাথের কথায় বৈদ্যনাথ চমকে উঠলেন, “তুমি বা আমি যে অ্যালগোরিদম লাইব্রেরি বানিয়েছি তাতে কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল, যা তোমাকে ছাড়া সম্পন্ন করা যেত না। যার ব্লু প্রিন্ট আমি নিয়ে এসেছিলাম, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত গতকাল রাতে তা বেহাত হয়ে যায়। নাকামুরার হাতে পড়ে যায়।”

প্রফেসর বৈদ্যনাথ বললেন, “হিসেব মতো আমি তো অতীতের বৈদ্যনাথ। তুমি যা করেছ ভবিষ্যতে আমি তাই করব, কিন্তু হঠাৎ আমাকে কী দরকার?”

ভিনগ্রহের বৈদ্যনাথ রহস্যময় হাসি হেসে বলল, “মানুষকে অনেক সময় নিজের অতীতের সাথে কথা বলতে হয়। না হলে সে ভবিষ্যতে এগোতে পারে না।”

প্রফেসর বৈদ্যনাথ প্রশ্ন করলেন, “তোমার কাছ থেকে অ্যালগোরিদম লাইব্রেরির ব্লু প্রিন্ট কী করে বেহাত হয়ে গেল?”

“এ হল আমার বন্ধু কোকা নাকামুরা।” বলে আধ আলোছায়া ঘরের অন্যদিকটায় ইশারা করল।

এতক্ষণ প্রফেসর বৈদ্যনাথ দেখতে না পেলেও অন্য বৈদ্যনাথের কথা অনুসারে ঘরের অন্যদিকটায় ঘুরতেই দেখতে পেলেন একজন ছিন্নবস্ত্র পরিহিত, অত্যাচারিত লোক তার দিকে নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।

প্রফেসর বৈদ্যনাথ উদ্বিগ্নতার সাথে প্রশ্ন করলেন, “এ কে?”

ভিনগ্রহের বৈদ্যনাথ বলল, “এ হল ফিউমার ভাই। বয়সে ফিউমার থেকে বছর পাঁচেকের বড়ো। কগনিটিভ সায়েন্সে ফিউমার যত নাম যশ, যা কিছু আছে, তার আসল মালিক এ। নাম কোকা নাকামুরা। প্রথম প্রথম আত্মকেন্দ্রিক, গবেষণামগ্ন, ঘরোয়া কোকা বুঝতেই পারেনি তার সহযোগী ভাই তার আত্মকেন্দ্রিকতার সুযোগ নিয়ে দিনের পর দিন বিশ্বাসঘাতকতা করে এসেছে। যখন সে বুঝতে পারল নিজের গবেষণার বিন্দুমাত্র কপিরাইট তার দখলে নেই ততক্ষণে সময় অনেকটাই পেরিয়ে গেছে। যখন কপিরাইটের কথা কোকা বলেছে এবং আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছে ঠিক তখনই ফিউমা ওকে ঘরে বন্দি করে রেখেছে। লক্ষ করে দেখবে গত কয়েক বছরে ফিউমা নাকামুরার কোনও ভালো গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়নি।”

প্রফেসর বৈদ্যনাথ মাথা নাড়লেন, “সবই বুঝলাম, কিন্তু এটা বুঝলাম না ব্লু প্রিন্ট কীভাবে ওর হাতে গেল।”

অন্য বৈদ্যনাথ বলল, “অ্যালগোরিদম সম্পূর্ণ করার জন্য তোমাকে যতটা প্রয়োজন ছিল ততটাই প্রয়োজন ছিল কোকা নাকামুরাকে। মনে করে দেখ যেদিন মিটিং শেষে তুমি ফিউমাকে কগনিটিভ সায়েন্সের কিছু জটিল সমীকরণ সমাধান করতে অনুরোধ কর, কারণ সেগুলো অ্যালগোরিদম লাইব্রেরির জন্য খুবই প্রয়োজনীয় ছিল, কিন্তু সেটা প্রবঞ্চক ফিউমার পক্ষে সমাধান করা একেবারেই অসম্ভব ছিল। তাই ও কোকার কাছে আসে জোর করে সমীকরণের সমাধান করে নিতে। ফিউমা যখন সেখানে যায় আমরা দু’জনে অর্থাৎ আমি ও কোকা ততক্ষণে মোটামুটি সফল হয়ে গেছি। দুর্ভাগ্যবশত ফাইলটা কোকার হাতে থাকে এবং আমাকে সরে যেতে হয়। কোকার হাতের ব্লু প্রিন্ট সম্পূর্ণ ভেবে ফিউমা ওটা কেড়ে নেয়। গোপন ক্যামেরা বা সিসিটিভি ফুটেজে ওরা আমাদের অনেকক্ষণ নজর রাখছিল। আমাকে দেখে ভুলবশত ভাবে যে তুমি ওখানে ছিলে এবং তুমি কোকা সম্পর্কে সব জেনে গিয়েছ। তাই ও গতরাতেই অকিওয়ানা গিয়ে সকাল পর্যন্ত তোমার ওপর নজর রেখে তারপর তোমাকে বন্দি করে। তবে এখন আমি সিসিটিভি ক্যামেরা হ্যাক করেছি আমার এই ছোট্ট ঘড়িটির মাধ্যমে। এখন আমি ওদের যা দেখাতে চাইব ওরা তাই দেখতে পাবে।”

এসব আলোচনা হওয়ার সময় হঠাৎ দরজা খোলার শব্দে ভিনগ্রহের বৈদ্যনাথ নিজের হাতের ঘড়িতে একটা বোতাম টিপতেই খানিকটা আবছা হয়ে বাতাসে মিলিয়ে যাওয়ার মতো অদৃশ্য হয়ে গেল। ঘরে প্রবেশ করল ফিউমা নাকামুরা ও তার কয়েকজন সাথী। ফিউমা বলে উঠল, “ধন্যবাদ প্রফেসর। আমাদের হিউম্যানয়েড মস্তিষ্ক তৈরির কাজ কয়েকদিনের মধ্যেই শুরু হয়ে যাবে। তাই তোমার ও কোকার আর কোনও প্রয়োজন আমার জীবনে নেই। আর আমি কয়েকদিনের মধ্যে সবার ভগবান হয়ে যাব। তাই তোমাদেরকে তোমাদের ভগবানের কাছে পাঠাতে এসেছি।”

কথা শেষ করেই টাইপ-২৬-এর একটা রিভলবার বার করতেই অদৃশ্য এক ঘুষি ফিউমা নাকামুরাকে ধরাশায়ী করে দিল। আশেপাশের নাকামুরার দলের মধ্যে চঞ্চলতা দেখা গেল। অদৃশ্য মার খেয়ে ফিউমার দল এদিক ওদিক ছিটিয়ে গেল। অবাক করে দিয়ে একদল পুলিশ ঘরের ভেতর ঢুকে নাকামুরাকে ও তার সাথীদেরকে ধরে নিয়ে গেল।

প্রফেসর বৈদ্যনাথ আবারও কিছুই বুঝতে না পারলে অন্য বৈদ্যনাথ সব ঘটনা খুলে বলল। পুলিশকে খবর করেছিল আরস্ভেনাসের বৈদ্যনাথ। এবার আরস্ভেনাসের বৈদ্যনাথ প্রফেসর বৈদ্যনাথকে একটা খবরের কাগজ দিল, দি জাপান টাইমস। প্রথম পাতায় ফিউমা নাকামুরার উদ্ভ্রান্তের মতো ছবি ও পুলিশের হাতে বন্দি। তারিখ প্রায় ছয়মাস পরের। কাগজে যা লেখা ছিল তা পড়ে ফিউমার মাথা ঘুরে গেল। তাতে যা দেখা গেল তার কিছুটা এরকম,

বিখ্যাত কগনিটিভ বৈজ্ঞানিক ও বহুজাতিক সংস্থার সিইও-এর ষড়যন্ত্র ফাঁস ও গ্রেফতার।

সংবাদ সংস্থাঃ বিখ্যাত কগনিটিভ বৈজ্ঞানিক ও বহুজাতিক সংস্থার সিইও ফিউমা নাকামুরা গ্রেফতার হয়েছেন। তিনি ও তার সংস্থা সমসাময়িক কালে একধরনের হিউম্যানয়েড মস্তিষ্ক তৈরি করছিলেন যা মানব কল্যাণের জন্য তৈরি হলেও নাকামুরা তা ব্যবহার করতে চান পৃথিবীর ওপর রাজত্ব করার জন্য। তারই প্রজেক্টে কাজ করছিলেন কেমিকো আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের জনক প্রফেসর বৈদ্যনাথ বলে প্রশাসন জানতে পারে। নাকামুরার উদ্দেশ্য ছিল পৃথিবীর বড়ো বড়ো রাষ্ট্রনেতার মস্তিষ্কে ভরে দেয়া হবে এই হিউম্যানেড ব্রেইন। যার মাধ্যমে তার ইশারায় চলবে গোটা বিশ্ব…

প্রফেসর বৈদ্যনাথের বললেন, “সবকিছু ঠিকঠাকই হত। কিন্তু তোমার আসার কোনও গুরুত্বপূর্ণ কারণ?”

আরস্ভেনাসের বৈদ্যনাথের বলল, “হ্যাঁ, প্রথমত ফিউমা কোকাকে মেরে ফেলত। তা আটকানো দরকার ছিল। দ্বিতীয়ত যে অ্যালগোরিদম লাইব্রেরি তৈরি হচ্ছিল তার সীমাবদ্ধতা দূর করা একমাত্র সম্ভব হত শুধু বর্তমান বৈদ্যনাথ, ভবিষ্যৎ বৈদ্যনাথ ও কোকা নাকামুরার দ্বারাই।”

আজ ক’দিন হল বৈদ্যনাথ ঘরে ফিরেছেন। জাপানে কাজ শেষ হয়েছে। মনে হচ্ছে প্রবল ঝড়ের পরে শান্তি। কিন্তু কিছু আক্ষেপ থেকে গেল। ভবিষ্যতের বৈদ্যনাথের কাছে অনেক কিছু জানার ছিল ভবিষ্যৎ সম্পর্কে। কিন্তু এই ভেবে বৈদ্যনাথ খুশি হলেন ভবিষ্যৎ ভবিষ্যতেই থাকা ভাল।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত