নতুন অধ্যায়ের সূচনা

নতুন অধ্যায়ের সূচনা

আমার প্রথম হাজবেন্ড যখন মারা যায় তখন আমি সাত মাসের গর্ভবতী ছিলাম, আর আমার দ্বিতীয় বিয়েটা যার সাথে হয় সম্পর্কে সে আমার দেওয়ার হতো। সমাজের নানা সমস্যার জাল থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য, আমি আমার সন্তানকে বাবার হারানোর আঘাত থেকে মুক্ত দেবার জন্য মোহন মানে আমার দেওয়ারের সাথে বিয়েটা মেনে নেই।
আমার বাবা- মা কেউই নেই। সেই হিসেবে শাশুড়ি আর শ্বশুরঘরেই আমার সবছিলো, তাই শাশুড়ি যখন তার ছোট ছেলের বউ হিসেবে আমাকে গ্রহণ করতে চায়, সন্তানের সুখের জন্য স্বার্থপরের মতো সে বিয়েতে আমি রাজি হয়ে যাই।নিজেকে স্বার্থপর বললাম কেন জানেন?

কারন ঢাকায় সরকারি চাকরি করা ছেলেটি যখন একটি সুন্দরি পবিএ স্নিগ্ধতায় স্নিগ্ধিত এক রাজকুমারীর সন্ধান তার মাকে দিতে এসেছিলো, ঠিক তখনি আমার শাশুড়ি মা তাকে দায়িত্ব – আর কর্তব্যের বাঁধনে বেধে ফেললো, আর আমি ও স্বার্থপরের মতো তাতে শায় দিলাম। আমার স্বামী মারা যাওয়ার একমাস পরেই মোহনের সাথে আমার বিয়েটা ঘরোয়া ভাবে সম্পন্ন হয়ে যায় । আমার এখন ও মনে আছে যখন ওকে কাজী সাহেব কবুল বলতে বলেছিলো ছেলেটি তখন কীরুপ রাগান্বিত ছিলো। ওর ওই মায়াবী মুখে আর চোখে এক পশলা বৃষ্টি দেখেই বুঝে ফেলেছিলাম ও এই বিয়েতে রাজি নয়। কিন্তু আমরা সকল মা রাই যে স্বার্থপর, তাইতো দুনিয়াতে এখন ও যে শিশুটি আসেনি,দুনিয়ার আলোয় এখন ও ঠিক করে দেখেনি, তার শরীরে এতিম শব্দটার ছোয়া যাতে না লাগে সেই সংকল্পে আমি মানুষটির চোখের জলগুলোকে নিষ্ঠুর – অমানবিক মানুষের মতো উপেক্ষা করতে লাগলাম।

বিয়ে সম্পন্ন হয়ে যাওয়ার পর যখন মোহন আর আমাকে এক ঘরে সকলে দিয়ে আসলো, ঘৃনায় তখন আমার নিজেকে গলা টিপে মেরে ফেলতে ইচ্ছে করছিলো, এরুপ পরিস্থিতি কখনো পড়তে হবে আমাকে ভাবতেই পারিনি, ঘরের মাঝে সাঈফের ছবির দিকে তাকিয়ে টপটপ করে চোখের জল ফেলতেই মোহন এসে ছবিটা খুলে ফেললো, জিগাসু দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকাতেই ছেলেটি নিচু স্বরে আমাকে বললো না আসলে এই সময় আপনার এতো ভেঙ্গে পড়াটা বাচ্চার জন্য ক্ষতিকর হবে, আর এই ছবিটা দেখলে আপনে নিজেকে সামলে রাখতে পারবেন না, তাই খুলে ফেললাম।

ভুল হলে মাফ করে দিবেন।এই বলে মোহন ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো, যেনো ছেলেটি হাফ ছেড়ে বাঁচলো।
ওর চোখে মুখে যে রাগটি আমি দেখেছিলাম তা নিমিষেই স্নেহে পরিনত হতে দেখে আমি বড্ড বেশি অবাক হলাম।
আসলে বিয়ের পর থেকেই মোহনকে আমি বরাবরি কখনো সামনাসামনি দেখিনি ওতো, তাই ওর সম্পর্কে আমি অবিদিত। তবে, সাঈফের কাছ থেকে শুনেছি ও খুব লাজুক, আর একটু ইসলামিক মাইন্ডের ছেলে, তাই মেয়েদের থেকে সবসময় দশ হাত দূরেই থাকতো।আর সেই ছেলেটির জিবনে যখন আজ ভালবাসা শব্দটি আসলো তখন আমার কারনে সব ভেস্তে গেলো। এসব ভাবতে- ভাবতে খাটে বসতেই মোহন রুমে আসলো , কিছু না ভেবেই ছেলেটিকে প্রশ্ন করে বসলাম আসলে ওই ফটো টি কার ছিলো?

— কোন ফোটোটি?
— ওই যে মাকে দেখিয়েছিলেন যেটা।

প্রশ্নটি শুনে ছেলেটি নিশ্চুপ হয়ে গেলো, তারপর গম্ভীর কন্ঠে বললো– রাত জাগবেন না, ঘুমিয়ে পড়ুন, আর হ্যা বিছানায় ঘুমুন আমাকে নিয়ে ভাবার দরকার নেই। আর এসব প্রশ্ন কখনো আর করবেন না। এই বলে মোহন ঘর থেকে আবার ও বের হয়ে গেলো, আর আমি সাঈফের ছবিটাকে ঝাঁপটে ধরে কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম বুঝতেই পারিনি। ফজরের আজান কানে আসতেই, চোখ মেলতে দেখি নামাজের বিছানায় বসে মোহন অজর দ্বারা কাঁদছে, ওর কান্না দেখে নিজেকে বড্ড বেশি অপরাধী লাগছিলো , নিজের উপর রাগ করে নিচে পা ফেলতেই, মোহন বলে উঠলো সাবধানে নামুন।

গলার আওয়াজটি পেয়ে পাশে তাকাতেই দেখি মোনাজাত শেষ করে ছেলেটি আমার সামনে এক বালতি পানি নিয়ে এসে বললো কল চিপতে আপনারা খুব কষ্ট হবে, আর তাছাড়া রাতে খুব বৃষ্টি হয়েছে, বাইরে কাদা, পানিতে আপনে পড়ে ও যেতে পারেন তাই এখানে ওযু করে নিন। ওর এরুপ আচরণ আর আমার প্রতি এমন যত্ন দেখে আমি অবাক হয়ে যায়, পরক্ষনে বুঝতে পারি হয়তো এসব দায়িত্বের থেকেই করছে, একজন মানুষ হিসেবে আরেকজন মানুষকে সাহায্য করছে, এই যা। নামাজ পড়ে কখন যে আবার একটু ঘুমিয়ে পড়লাম বুঝতেই পারিনি , ইদানিং যাবত শরীরটা একটু বেশিই খারাপ লাগছে, যাইহোক সকাল আটটায় ঘুম থেকে উঠতেই দেখি শাশুড়ি মা পাশে বসে আছে, মাকে দেখে তাড়াতাড়ি করে উঠতেই মা ধমকি দিয়ে বলে উঠলো  এতো তাড়াহুড়ো করার কিছুই নেই, এই সময় সাবধানে চলতে হয়, যাইহোক তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নেও, ঢাকায় যেতে হবে, মোহন টিকেট আনতে গেছে। কথাটি বলেই মা চলে গেলো।

কিছুই বুঝলাম না, কিছুসময় পর মোহন আসতেই ওকে জিজ্ঞাসা করলাম –আমরা কেন ঢাকায় যাচ্ছি? ও তখন গম্ভীর কন্ঠে বললো কারন আমার চাকরী ঢাকায় তাই। আমি তখন বললাম তা আপনার চাকরী ঢাকায় আপনে যান, আমি যাবো কেন? ও তখন একটু জোরেশোরে বলে উঠলো– কারন আপনার জন্য এই জায়গা টা সেভ নয়। এই বলে চলে গেলো , আর আমি? কী আর করবো তৈরি হয়ে নিলাম ঢাকায় যাওয়ার জন্য। সকাল সাড়ে এগারটায় ঢাকার জন্য আমরা রওয়ানা দিলাম দুপুর তিনটে ঢাকায় এসে পৌছালাম, জানিং এ, আমি এক প্রকার ক্লান্ত হয়ে যাই , শরীর ভীষন দূর্বল লাগছিলো , হঠ্যাৎ মাথাটা ঘুরতে লাগলো, সব আধার হয়ে যায়, তারপর কী হলো মনে নেই।

কিছুসময় পর চোখ মেলতেই আমি দেখতে পেলাম আমি বিছানায় শুয়ে আছি, পাশে মা বসে কাঁদছে আর মোহন নিশ্চুপ অসহায়ের মতো আমার দিকে চেয়ে রয়েছে, সাথে ডাক্তার। আমার জ্ঞান ফিরতে দেখতেই ডাক্তার মুচকি হেসে বললো,  নিন দেখুন আমার কথা মিলছে কিনা, এখন তো এমন একটু হবেই এতো টেনশন করলে হয়? আমাকে ইশারা দিয়ে বললো আপনার শাশুড়ি আর স্বামী তো আর একটু হলে টেনশনে মারাই যেতো, যাই হোক ভাল করে খাওয়া দাওয়া করবেন আর নিজের একটু কেয়ার করবেন? এই বলে ডাক্তার চলে গেলো, মোহন ও ডাক্তারের সাথে গেলো, মা ও কেন জানি আমার উপর অভিমান করে চলে গেলো, বুঝেছি আমি ঠিকমত খাওয়া- দাওয়া করছিনা শুনে মা রাগ করেছে। কিন্তু যত এসব দেখছি আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি, এতো ভালবাসা, এতো কেয়ার আদৌ কয়জনের কপালে জুটে।

সেদিন থেকে মোহনের আমার প্রতি যত্নটা আর ও বেশি বেড়ে গেলো, নিজের হাতে খায়িয়ে দেওয়া, মাথায় তেল দিয়ে আচড়ে দেওয়া, ভারী সব কাজ করে দেওয়া, এমন কী মাঝেমাঝে মা আর ও মিলেই রান্না করতো। আমার
এতোটাই যত্ন করতো যে মাঝেমাঝে আমি ভাবতাম যে এই সন্তানটি ওনার নিজেরেই সন্তান। একদিন তো মুখ ফসকে বলেই ফেললাম  এমন খেয়াল রাখছেন আমার যে মনে হচ্ছে আপনারেই সন্তান এটি? সেদিন আমার কথায় মোহন খুব কষ্ট পায়, রাতে ঘরে ও আসেনি পরেরদিন ঘরে আসতেই আমি রাগ করে ওকে বললাম কালকে রাতে ঘরে আসেন নেই কেন? লোকটি কোনো জবাব দিলোনা, পরক্ষণে আমি আবার রাগান্বিত স্বরে বললাম সত্যি কথা বললে কী গায়ে ফোসকা পড়ে। আমার কথাটি শুনতেই ছেলেটি রেগে গিয়ে আমার সামনে এসে আমার হাতটাকে শক্ত করে ধরে বললো কোনটা সত্য? কালকের কথাটা? না ওটা সত্য না, আমি যেহুতো আল্লাহকে সাক্ষী রেখে তোমাকে বিয়ে করেছি, তার মানে তুমি আমার স্ত্রী, আর তোমার গর্ভে যে সন্তান তার বাবা ও আমি।

সেদিন ওর চোখে- মুখে তীব্র আর প্রখর রৌদের মতো রাগ আর এই কথাটি শুনে সেদিন থেকেই মন থেকে আমি সমস্ত প্রশ্নকে ঝেড়ে ফেলে দিলাম আর শক্ত করে মানুষটির হাতটি ধরে আজ ৩৫ টা বছর কাটিয়ে দিলাম, বুঝলেন।
এই বলে মহিলাটি নিশ্চুপ হয়ে গেলো, আমি মহিলাটির পানে তাকিয়ে তখন বললাম — তা কাটিয়ে তো দিলেন বুঝলাম, কিন্তু আজ ও কী দুজন – দুজনকে ভালোবেসেছেন? আমার কথাটি শুনে মহিলাটি হেসে বলে উঠলো ভালবাসি! চার অক্ষরে শব্দটি না সবসময় বলতে হয়না, অনেকসময় বুঝে নিতে হয়, আর আমি তো সেদিনেই মানুষটিকে ভালবেসে ফেললাম, যেদিন ও আমাকে তার স্ত্রী বলে স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে আজ অবদি বলে উঠতে পারিনি।

-আমি তখন বললাম আর ওনি?
-বয়স্ক মহিলাটি তখন বললো কে মোহন?

এই কথাটি বলেই মহিলাটি মুচকি হেসে উঠলো, তারপর বললো ও যে আমাকে কতটা ভালবাসে, এটা তো আমি সেদিনেই বুঝতে পারি, যেদিন আমি প্রসব বেদনায় বারবার চিৎকার করছিলাম, আর ছেলেটি আমার চিৎকার দেখে শক্ত করে ও আমার হাতটি ধরে বলেলো  অনিন্দিতা প্লিজ তুমি আমায় ছেড়ে যেওনা? আমি যখন ওকে বললাম কেন আমি চলে গেলে তোমার কী হবে, আমি তোমার কে লাগি? ছেলেটি তখন কেঁদে – কেঁদে বললো  জানিনা তুমি আমার কে লাগ। তবে তুমি পাশে না থাকলে আমার সব শূন্য লাগে, তোমায় ভালবাসি কিনা ও জানিনা, তবে তুমি কষ্ট পেলে আমার তার চেয়ে দ্বিগুণ বেশি কষ্ট হয়।

সেদিনেই বুঝলাম মানুষটি আমায় কত ভালবাসে। আসলে ” ভালবাসি ” এটা শুধু চার অক্ষরের একটা শব্দেই নয়, এটার সাথে জড়িয়ে থাকে বিশ্বাস, সম্মান, শ্রদ্ধা, আর একজনের প্রতি আরেক জনের দায়িত্ব – কর্তব্য যার সবটুকুই এই মানুষটা করেছে এবং আমাকে দিয়েছে ও অতএব ভালবাসি এ শব্দটি মুখ দিয়ে বলাটা খুব জরুরী নয়।।
এই বলে মহিলাটি থামতে হঠ্যাৎ দেখি নিচ থেকে পানি নিয়ে লম্বা, ফর্সা আধপাকা চুলের মাথার লোকটি আর দুটো চকলেট নিয়ে বাসে উঠলেন।এবং মহিলাটির পাশে এসে বসেই ওনার হাতে পানির বতলটা দিয়ে বলে উঠলো— এই নাও অনিন্দিতা।

সাথে চকলেট দুটো ও দিলো, মহিলাটি চকলেট দুটো দেখে লোকটিকে বলে উঠলো — মোহন এখন ও তোমার এই স্বভাব গেলো না, যেখানে যাবে এখন ও আমার জন্য চকলেট আনবে, বোঝো না কেন আমার বয়স হয়েছে।
লোকটি তখন হেসে বললো– তো কী হয়েছে, তুমি তো আমার কাছে সেই একই রকম, খুব আপনজন মানুষের খাতার এমন একজন মানুষ যে রোজ সকাল- বিকেল আমার কাছে চকলেট আবদার করতো, আর তাইতো মৃত্যু অবদি এই প্রজা তোমার এই আবদার মিটাবে রানী , এই বলে হাসতে লাগলো।

বুঝে ফেললাম মানুষ দুটো দুজনকে বড্ড বেশি ভালোবাসে, আসলে ভালবাসি কথাটি কখনো বলতে হয়না বুঝে নিতে হয়। আর এই সমাজে এমন কত দম্পতি আছে যারা ভালবাসি শব্দটি বলে ও ৩৫ বছর তো দূরে থাক ৫ বছর ও একসাথে কাটাতে পারেনি , তার আগেই ডিভোর্স নামক জঘন্য শব্দটি তাদের সম্পর্কের মাঝে চলে আসে।
যাই হোক আমি আমার গন্তব্যে চলে আসলাম, তাই বাস থেকে নেমে যেতেই হচ্ছে, কিন্তু কী যেনো মনে করে হঠ্যাৎ পিছনে তাকিয়ে রুক্ষ চুলের মহিলাটিকে একটু হেসে প্রশ্ন করলাম — তা অনেক কথায় তো বললেন , কিন্তু কই আপনে কোথায় যাচ্ছেন সেটা তো একবার বললেন না? মহিলাটি ওমনেই হেসে অনায়াসে বলে ফেললো — আমার প্রথম হ্যাজবেন্ডের আজ মৃত্যু বার্ষিকী প্রতি বছরেই আমি আর ও এই দিনটিতে সাঈফের কবর জিয়ারত, ও দান সদকা করি, তাই গ্রামে যাচ্ছি।

কথাগুলো শুনে অবাক হয়ে গেলাম, আনমনে কিছুসময় মানুষ দুটোর দিকে তাকিয়ে রইলাম, আসলে সত্যিই ভালবাসাটা অদ্ভুত, এটাতে যদি সম্মান আর শ্রদ্ধা থাকে তাহলে ভালবাসা মানুষকে ভালো ভাবে বাঁচতে শিখায়, প্রথম ভালবাসাকে আকড়ে ধরে মানুষ আবার ভালবাসতে ও শিখে, নতুন করে বিচিএ জিবনের শেষ থেকেই আবার নতুন অধ্যায় ও শুরু করে, যা আগের চেয়ে ও অনেক বেশি রঙ্গীন। তবে সেই রঙ্গীন জীবনের স্পর্শ আগের মানুষটিকে কখনো ভুলিয়ে দেয় না বরং, তার জন্য হৃদয়ের এককোনে শ্রদ্ধা রেখে, নতুন মানুষটিকে হৃদয়ের মাঝখানে বসিয়ে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করা যায়, সূচনা।

( সমাপ্ত)

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত