চুইয়ে পড়া ভালোবাসা

চুইয়ে পড়া ভালোবাসা

দিনের মধ্যে এই গোধুলীবেলার সময়টা আমার সবচেয়ে প্রিয়। এসময় পশ্চিমাকাশের এক কোণে জমে থাকা মেঘগুলোকে একেকটা স্বর্নের টুকরো মনে হয়। আমার আগে থেকেই খুব ইচ্ছে ছিলো এই সময়টা আমি কোনো বিস্তির্ন উপকুলে কারও হাত ধরে কাটাবো, স্বর্নের টুকরোগুলো তাকে দেখিয়ে বলব,”শোনো মেয়ে,তুমি কি আমার জীবনের প্রতিটি গোধুলিতে গল্প বলার সঙ্গি হবে? তাহলে আমার আকাশের সব স্বর্ন তোমার নামে লিখে দেবো।” সেসব ইচ্ছের কথা মনে পড়লে এখন নিজেরই হাসি পায়। আমার এই ছোট্ট এপার্টমেন্টের সুন্দর ব্যালকনিটাতে বসে সন্ধার আগাআগি সময়ে যখন কফির মগে চুমুক লাগাই, তখন এখান থেকে অদুরেই সমুদ্রের বুকে প্রতিফলিত হওয়া গোধুলীর রক্তলাল আভা শুধু আমার ভালোলাগার অংশ হয়ে দাড়ায় বললে ভুল হবে। এই আভার একটা অংশ আমার বুক চিরে ভিতরে প্রবেশ করে অতীতের কষ্টগুলোকে বেত্রাঘাতও করে।

আজ কফির মগে কয়েকটা চুমুক দিতেই আম্মার কল পাই। তিনি খুব মমতা নিয়ে আমাকে বলেন,”দেশে কবে আসবি বাবা? আমার খুব ইচ্ছে তোর জন্য লাল টুকটুকে একটা বউ আনবো। তোকে কত মেয়ে দেখালাম সবাই বিয়ের আগাআগি সময়ে বেঁকে বসে। আমি বুঝিনা আমার ছেলের মাঝে কি কম আছে। এবার দেশে আয় তোর একটা ব্যবস্থা করেই ছাড়বো।”
আমি হাসতে হাসতে মাকে বলি,”শোনো মা তুমি তো জানোই মেয়েরা আমাকে বারবার প্রত্যাক্ষ্যান করে। তাই আমি ভাবছি বাকি জীবনটা বৈরাগী হয়েই কাটাবো।” আমার কথা শুনে আম্মার রাগ চুড়ান্ত পর্যায়ে চলে যায়। তিনি বলেন,”তোর আর জীবনে বিয়ে দেবোনা বেয়াদব ছেলে। এবার তোকে হাতের কাছে পাই তোর বৈরাগ্য ঝাড়ু দিয়ে সারাবো।” তারপর তিনি কলটা কেটে দেন। আমি কফি খাওয়ায় মনোযোগ দেই। আমি জানি এখন আম্মা ফোন রেখে কিছুক্ষন আপন মনে আমাকে বকা দিবেন। তারপর আগামীকাল থেকে আবার বিয়ের জন্য আমার পিছনে লাগবেন। আমার মাঝে মাঝে মনেহয় আমি আম্মার সাথে অবিচার করছিনাতো! আমার কি রিফাকে ভুলে অন্য কাউকে বিয়ে করে সংসারী হওয়া উচিত? আমার অতীত আমার কাছে মাঝে মাঝেই জীবন্ত হয়ে ওঠে। জেগে ওঠে রিফাও।

আমার অতীতের সুবিশাল একটা অংশ রিফার দখলে আছে। রিফা নামক চমৎকার মেয়েটার সাথে আমার দেখা হয় ২০০৭ সালের একটা মেঘলা বিকেলে। সেদিন হটাৎ করে আকাশের বিষন্নতা ভরা অশ্রুতে ধৌত হচ্ছিলো ছোট্ট মফস্বলটি। ইন্টার দ্বিতীয় বর্ষে পড়ুয়া আমি সেদিন ক্যালকুলাসের বিশাল বিশাল সুত্র মাথায় নিয়ে রাকিব ভাইয়ের কোচিং এর সামনে দাড়িয়ে ভাবছিলাম বৃষ্টিতে ভিজে বাসা যাবো কিনা। ঠিক তখনি আমি রিফাকে দেখি। খুব সুন্দর এবং হাসিখুশি মেয়েটি তার বান্ধবীদের সাথে বৃষ্টিতে ভিজছিলো। জীবনের আঠারোটা বর্ষা পার করার পর সেদিন প্রথম আমার মনে হয়েছিলো বৃষ্টিতে ভিজতে হলেও কিছু নিয়ম জানা থাকা দরকার। যেগুলোর কোনোটাই আমি জানিনা। খুব সুন্দরভাবে দুহাত উচিয়ে প্রতিটি বৃষ্টির ফোটাকে অনুভব করছিলো মেয়েটি। আমি জানিনা সেদিন আমার কি হয়েছিলো। খুব চুপচাপ এবং লাজুক স্বভাবের আমি ক্যালকুলাসের সুত্র মাথা থেকে ফেলে দৌড়ে তার কাছে গিয়ে বলেছিলাম,”আপনি কি আমাকে বৃষ্টিতে ভিজতে শিখাবেন। জানেন আমি আপনার মতো করে বৃষ্টিকে অনুভব করতে পারিনা। আমাকে শিখিয়ে দিবেন?” সে তখন লজ্জা পেয়ে হাসি থামিয়ে দেয়।

আমি পরে জানতে পারি রিফার ঠিকানা সিলেট। আমাদের সাথেই উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ুয়া মেয়েটি তার মামার বাসায় ঘুরতে এসেছে। এক দেখায় কউকে ভালোবাসা যেতে পারে সেটা আমি কোনোদিনই বিশ্বাস করিনি। কিন্তু সেদিন আমার মনেহয় রিফাকে আমার খুব দরকার। নিজেকে ভালো রাখার শতভাগ দাবি নিয়ে একদিন আমার ভালোবাসার কথাগুলো একটা চিরকুটে লিখে তাকে জানাই। রিফা চারদিন সাতঘন্টা পয়ত্রিশ মিনিট ঝুলিয়ে রেখে আমার ভালোবাসাকে গ্রহন করে। শুরুহয় আমাদের একসাথে পথচলা। রিফা সুদুর সিলেটে থাকতো আর আমি উত্তরবঙ্গের সৈয়দপুরে। আমাদের মাঝখানের দুরুত্বটা অনেক বেশি ছিলো কিন্তু ভালোবাসার কমতি ছিলোনা একটুও। রিফা আমাকে খুব বুঝতো কিন্তু আমি তাকে বুঝতে পরতামনা কখোনোই। আমি শুধু তাকে ভালোবাসাটাই দিতাম আর সেটুকুর জন্যই সে তার পুরো পৃথিবী উৎসর্গ করতেও পিছপা হতোনা।

পরেরদিন ছোটখালা কল করে বলেন,”তোর মা খুব অসুস্হ আদিত্য। তুই যত তাড়াতাড়ি পারিশ দেশে আয়। মায়ের পাশে বসে তাকে একটু সময় দে নাহয়।” আমি পাথর হয়ে যাওয়া শামীম আদিত্য সেদিন ছয়বছর নয়মাস পর কেঁদে ফেলি। আমি আমার ডিপার্টমেন্টের ডিন কে একটা ছুটির এপ্লিকেশন দিয়েই তিনদিন পর দেশের জন্য যাত্রা করি। আমি ঠিক চারবছর দুইমাস পর যেদিন দেশের মাটিতে পা রাখি সেদিন খুব বৃষ্টি হচ্ছিল। আমি এয়ারপোর্ট থেকেই সোজা হাসপাতালে যাই। মায়ের শিয়রে বসে বলি,”মা তোমার যোগ্য ছেলে কোনোদিনও হতে পারিনি। তবুও এই পাহাড় সমান অযোগ্যতা নিয়ে তোমার কাছে আবদার করি, সুস্থ হয়ে ওঠো মা।” মা আমার গালে খুব আস্তে একটা থাপর দিয়ে বলেন,” আমি সুস্থ হলে তুই আমার সাথে মেয়ে দেখতে যাবি?” আমি হ্যা সুচক মাথা নাড়ি।

মাকে যেদিন হাসপাতাল থেকে রিলিজ দেওয়া হয় তার পরেরদিনই তিনি আমাকে নিয়ে মেয়ে দেখতে সিলেটে যান। কনের ছবি আমি দেখিনি। দেখার ইচ্ছেও ছিলোনা। কনের ডাকনাম হিয়া। একটা পর্যায়ে আমাদের আলাদা করে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয়। আমি ছাদের এক কোনে দাড়িয়ে সিলেটের মেঘলা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি। আমি তাকে প্রথম যে প্রশ্নটা করি সেটা হলো,”আচ্ছা হিয়া ভালোবাসা জিনিসটা সম্পর্কে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি কিরকম?” আমার প্রশ্ন শুনে সে চুপ করে দাড়িয়ে থাকে। তার ঠোটের কোনের তিলটা খুব আস্তে করে কেঁপে ওঠে। আমি তাকে আবার বলি,”হিয়া তিরিশ বছর বয়স পর্যন্ত আমার কেনো বিয়ে হয়নি জানেন? আমি বিয়ের আগে প্রতিটা মেয়েকে স্বামী হিসেবে আমার অযোগ্যতার কথাটা বলে দিতাম। আসলে হিয়া একটা সম্পর্কের অস্তিত্ব টিকে থাকে ভালোবাসার গভীরতার মাধ্যমে। আর আমার জীবনের ডায়েরিতে ভালোবাসার কাব্য লেখার জন্য আর কোনো পাতা অবশিষ্ট নেই। এর পরও আমি স্বামী হিসেবে কতটুকু যোগ্য বলুনতো?”
হিয়া অর্ধমিনিট চুপ করে থেকে বলে,”আজকের আকাশটা দেখেছেন? দেখুন একটুকরো মেঘের আড়ালো সূর্যের অস্তিত্বটা কিভাবে হারিয়ে গেছে! ওই মেঘের মতো ভালোবাসা জিনিসটাও মানুষের অনুভূতিগুলোকে একটা চাদরে জড়িয়ে নেয়। নতুন কোনো সম্পর্কের অস্তিত্ব সেখানে ওই সূর্যটার মতোই দূর্বল। আচ্ছা আপনি কাউকে ভালোবেসেছেন কখোনো?”

আমি হিয়ার টানা টান চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে বলি,”হিয়া আপনাদের এই শহরটার সাথে আমার সম্পর্কটা অনেক গভীর জানেন। এই শহরটা আমার ভালেবাসার দিনগুলোর সাক্ষী হয়ে আছে। আমার কাছে ভালোবাসা একটা ঝড়ের মতো যাকে কখোনোই দাবিয়ে রাখা যায়না। সে সবকিছুর বুক চিরে নিজে থেকেই বেরিয়ে পড়ে। আর কোনোদিন যদি ভালোবাসার মানুষটি হারিয়ে যায়,তাহলে সেই ঝড়ের শেষের একটুকরো রংধনুর মতোই কিছু মুহুর্তের রঙ্গিন স্মৃতি রেখে যায়। যেগুলোকে কোনো কিছুর সাথে তুলনা করা যায়না, কখোনও ভুলেও থাকা যায়না। আমার কাছে এই রংধনুটাই সম্বল হিয়া! কিছু মনে করবেন না একটু অনধিকার চর্চা করছি। আপনার ভালোবাসার মানুষটি কি দেশের বাইরে কোথাও থাকে?”
হিয়া খুব অবাক চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলে,”আপনি কিভাবে জানলেন? তবে আপনার ধারনা সঠিক। সে কানাডাতে থাকে। আপনি যে ইউনিভার্সিটির লেকচারার সে তার আশেপাশেরই কোনো একটা মেডিকেলের ডাক্তার। সে যখন কানাডায় যায় আমি অনেক কেঁদেছিলাম জানেন। আমার মনে হচ্ছিল আমি তাকে হারিয়ে ফেলছি। অবশেষে দেখুন হলোও তাই। সে এখন সেখানকারই তার কোনো কলিগকে বিয়ে করেছে। আমার কথা বাদ দিন। আপনার গল্পটা এবার বলুন?”

আমি বলি,”হিয়া আমার গল্পটা একটু ভিন্ন। আপনাকে অন্য একদিন বলবো কেমন। আপাতত আপনার পরিবার থেকে আমার ব্যাপারে জানতে চাইলে আপনি বলে দিবেন আমাকে আপনার পচ্ছন্দ হয়নি। কেমন।” হিয়া হ্যা সুচক মাথা নাড়িয়ে বলে,”আপনার সাথে কথা বলে খুব ভালো লাগল আদিত্য। অনেকদিন পর কারো কথাগুলো আমার ভিতরটা ছুয়ে দিলো।”
আমি হেসে হিয়াকে বলি,”ভালোলাগার গভিরতা বজায় রাখবেন। প্রেমে পড়ে যাবেন না যেন।” আমার কথা শুনে হিয়া খুব লজ্জা পেয়ে যায়।

ঢাকায় ফেরার পরদিন সন্ধায় মা রুদ্রমূর্তি ধারন করে আমার সামনে এসে দাড়ান। আমি সম্ভাব্য অবস্থা বিবেচনা করে বাথরুমে ঢোকার চেষ্টা করি। তিনি আমার পথ আগলে বলেন,”এই বেয়াদব থাম। তোর সমস্যা কি বলতো? বারবার মেয়েরা তোকে রিজেক্ট করে কেন?” আমি তখন মাকে বলি,”মা হিয়াকে আমার খুব পছন্দ হয়েছিলো। সে আমাকে প্রত্যাক্ষ্যান করেছে শুনে আমার নিজেরই কান্না পাচ্ছে। তোমার তো আমাকে শান্ত্বনা দেওয়া উচিত।” মা তখন আরও রেগে বলেন,”আর জীবনেও তোকে নিয়ে মেয়ে দেখতে যাবোনা বেয়াদব ছেলে। আজীবন বিয়ে হবেনা তোর।”
মায়ের এত সুন্দর ভবিষ্যতবানির জন্য আমি খুশি হয়ে তাকে ধন্যবাদ দেই। তিনি হনহন করে রুম থেকে বেরিয়ে যান।

সারাদিনের সমস্ত ব্যাস্ততা কাটিয়ে রাত হলেই আজও অতীতের স্মৃতি গুলো একটা মায়াময় অবয়ব নিয়ে আমার সামনে দাড় হয়। আমি কল্পনায় রিফাকে ছুয়ে দেই আলতো করে। তার চুলের গন্ধে মাতাল হয়েই রোজ রাতে ঘুমিয়ে পড়ি। আমার মনেহয় রিফা আমার মাথায় তার কোমল হাতটা বুলিয়ে দেয়।

সেদিন রাতে আমার রিফাকে খুব মনে পড়ে। আমার মনেহয় যে সীমাহীন ভালোবাসার সমুদ্রে রিফা আমাকে একবার নামিয়েছে সেটাকে দ্বিতীবার অনুভব করতে চাইলে রিফাকে অবমাননা করা হবে। রিফাকে এই কষ্ট দেয়ার কথা আমি দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারিনা।
আমাদের সম্পর্ক শুরুর তিনমাস নয়দিন পর আমাদের প্রথম দেখা হয়। সিলেটের এক কোনার ছোট্ট একটা পার্কে আমরা দেখা করি। পার্কের বেঞ্চে বসে রিফা যেন লজ্জায় মরে যায়। আমি তার হাতটা ধরে তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলি,”রিফা ভালোবাসা মানে জানো?” সে মাথা ঝাকিয়ে বলে,”না। আমি শুধু জানি আমি তোমাকে ভালোবাসি। ভালোবাসার মানেটা তুমি আমাকে বলে দিবে?”
আমি তখন বলি,”ভালোবাসা মানে জীবনের খুব দুর্গম পথগুলো একসাথে পাড়ি দেয়া। নিজের ভাবনাগুলোতে আরেকজনকে অংশীদারিত্ব দেয়া। ভালোবাসার মানুষটার সামনে লজ্জা আসেনা। নিঃসংকোচে তার সাথে নিজের অনুভূতিগুলোকে প্রকাশ করা যায়। আমাকে লজ্জা পেওনা কেমন?” সে মাথা নেড়ে সম্মতি দেয় আর আমার কাধে মাথা রেখে শালিক পাখির প্রেম দেখে।

পরেরদিন আমরা যখন দেখা করি তখন হটাৎ করেই সিলেট শহরের বুকে বৃষ্টি নামে। রিফা আমার হাত ধরে বলে,”চলো তোমাকে বৃষ্টিতে ভিজতে শেখাবো।” রিফাদের বাসার অল্প দুরেই খুব ছোট্ট একটা পাহাড়ের বুকে দাড়িয়ে রিফা আমাকে বৃষ্টিতে ভিজতে শেখায়। আমরা পাহাড়টার নাম দেই “মৃন্ময়ী”।
মৃন্ময়ীর বুকে দাড়িয়ে রিফা যখন দুহাত উচিয়ে বৃষ্টির ফোটাগুলোকে অনুভব করছিল তখন তাকে খুব বাচ্চা মনে হচ্ছিল। পবিত্র প্রকৃতির সাথে যেন মিশে গিয়েছিলো মেয়েটি। আর আমি শুধু বাকরুদ্ধ হয়ে তার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। তাকে মনে হচ্ছিল সুশ্রী এক সাহিত্য, আর আমি তার পাঠক। চারদিকে শুধু বৃষ্টির শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ ছিলোনা। মনে হচ্ছিল পৃথিবীতে আর কোনো প্রানী নেই। শুধু আমরা দুই মানব মানবী মৃন্ময়ীর ওপরে দাড়িয়ে আকাশকে ছুয়ে দিচ্ছি, জন্ম দিচ্ছি একটুকরো অবিনশ্বর স্মৃতির। আমার তখন খুব ইচ্ছে করছিল রিফাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরতে।

ওই দিনটি আমার জীবনের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ দিন ছিলো। সময়গুলো ফুরিয়ে গিয়েছিল খুব দ্রুত, কিন্তু মনের মাঝে রেখে গিয়েছিলো একটুকরো ভালোবাসার রঙ্গিন অনুভূতি যেগুলো কখোনও ভুলবার নয়। রিফা আমাকে বিশ্বাস করতো, আর আমি তাকে সম্মান।

এরপর থেকে আমাদের প্রায় চারমাস পরপরই দেখা হত। আমি খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্ডারগ্রাজুয়েশনে যন্ত্রকৌশল বিভাগে ভর্তি হই আর রিফা খুলনার এম সি কলেজে।
সুযোগ পেলেই আমি রিফার শহরে ছুটে যেতাম তার সাথে একটা দিন সময় কাটানোর জন্য। সেই দিনটার জন্য আমরা দুজনেই গভীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করতাম। স্বপ্নের জাল বুনতে বিভোর হয়ে থাকতাম দুজনে।

তেমনি একটা মেঘলা দিনে আমি এই মৃন্ময়ী নামক পাহাড়টার উপর দাড়িয়ে রিফার নাকটা আলতো করে টেনে দিয়ে বলি,”এই মেয়ে আমাকে এত ভালোবাসো কেন?” সে খিলখিল করে হাসতে হাসতে বলে,”তুমিও যে আমাকে বড্ড ভালোবাসো, তাই। তোমার ভালোবাসাই তোমাকে ভালোবাসতে বাধ্য করে। বুঝলে বুদ্ধু?” কথা শেষ করেই সে আবার খিলখিল করে হাসতে থাকে। আমি অবাক চোখে তার লিপস্টিকহিন গোলাপি ঠোটের দিকে তাকিয়ে থাকি। রিফাকে দেখে মাঝে মাঝে আমার কবি হতে ইচ্ছে করে। কিন্তু আমি কবিতা লিখতে পারতামনা। আমার মনেহয় আমি যদি কবি না হই তাহলে তো রিফা নামের সুন্দর কবিতাটা সবার অজানা থেকে যাবে! পরদিন রিফাকে ভালোবেসেই আমি আমার জীবনের প্রথম কবিতাটা তাকে পড়ে শোনাই,
“তুমি উচ্ছ্বাস,
তুমি যুদ্ধের শেষে বিজয়ার বেশে
মোর জীবনের নিশ্বাস।
তুমি অভ্র,
তুমি অবিরত শীতে মোর ফাটফাটা ঠোটে
লেগে থাকা সেই কাব্য।

তুমি বিশ্বাস,
তুমি মোর কষ্টের বুকে কাঠফাটা রোদে
মেঘে ঝরে পড়া অভিলাষ।
তুমি অর্ক,
তুমি মোর আধারের দিনে ভয় পাওয়া মনে
নিঃস্বার্থ এক সর্গ।”

আমার কবিতা শুনে রিফা কেঁদে ফেলে। আমাকে জড়িয়ে ধরে বলে,”আমি তোমার কবিতার নায়িকা হতে চাইনা। আমাকে তোমার জীবনের নায়িকা বানাবে?” তার মায়ামায়া চোখের দিকে তাকিয়ে আমি বলি,”বানাবো।”
এই মেয়েটার সবকিছুই আমার ভালোলাগে। আমি তার হাতটা খুব শক্ত করে ধরে রাখি। আমার ভয় হয় যদি সে আমার থেকে হারিয়ে যায়! প্রিয় পাঠক আমি ব্যর্থ হয়েছি। রিফাকে নিজের করে ধরে রাখতে পারিনি। তাইতো আজ সে পৃথিবী ছেড়ে আমার আকাশের তারা হয়ে আছে। তাকে আমি আর স্পর্শ করতে পারিনা, ভালোবেসে দুহাতে জড়িয়ে নিতে পারিনা, শুধু কল্পনার জগতে ডুব মেরে তাকে ভালোবাসতেই পারি।

মোবাইলের রিংটোনের শব্দে আমার কল্পনায় ছেদ পড়ে। আননোন নাম্বারটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে একজন বলে,”আমি হিয়া, আপনি আগামী সপ্তাহে আমার সাথে একবার দেখা করতে পারবেন? আসলে আপনার গল্পটা শোনার লোভ সামলাতে পারছিনা।” আমি তাকে মৃন্ময়ী পাহাড়টার ঠিকানা দেই। সেখানে আসতে বলি।
হিয়ার সাথে আমার দুপুর দুইটায় দেখা হয়। কিন্তু সেদিনের মোলায়েম বাতাস সূর্যের প্রতাপ বুঝতে দেয়নি। আমি হিয়াকে বলি,”হিয়া এই পাহাড়টাতেই আমাদের ভালোবাসার গল্পটা শুরু হয়। আমার ভালোবাসার মানুষটার নাম রিফা। সেই এই পাহাড়টার নাম কি দিয়েছিল জানেন? মৃন্ময়ী। সুন্দর না নামটা?” হিয়া মাথা ঝাকিয়ে হ্যা সুুচক ইঙ্গিত করে বলে,”আজকে কিন্তু লুকাবেন না। পুরো গল্পটা বলবেন” আমি হিয়াকে রিফা আর আমার ভালোবাসার গল্পটা বলি। সে আমাকে বলে,”আপনাদের এত গভীর ভালোবাসার সমাপ্তি কিভাবে হলো?”
আমি হেসে বলি,”হিয়া ভালোবাসার তো সমাপ্তি হয়না! আমাদের ভালোবাসার কোনো সমাপ্তি হয়নি। রিফা আমাকে ভালোবাসার যে রঙ্গিন খন্ডটি দিয়েছিলো সেটা আমি একটা মুহূর্তের জন্যও ভুলতে পারিনি।” হিয়া চুপ করে থাকে। আমি তাকে মৃন্ময়ীর নিচে থাকা একটা পাথর দেখিয়ে বলি,”ওই পাথর টা দেখছেন হিয়া? ওটাই আমার রিফাকে আমার থেকে কেড়ে নিয়েছে। ২০১১ সালের কথা, আমি তখন খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের যন্ত্রকৌশল বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। কঠিন বাস্তবতা,ভবিষ্যত নিয়ে হাজারো দুশ্চিন্তা আমাদের ভালোবাসাটাকে এতটুকু কমাতে পারেনি। হটাৎ রিফার পরিবার আমাদের ব্যাপারে জেনে যায়। রিফার রক্ষনশীল পরিবারের আমাদেরকে মেনে নেয়ার মানসিকতা ছিলোনা হিয়া। রিফার পরিবার থেকে তাকে বিয়ের জন্য খুব চাপ দিতে থাকে। একদিকে আমার অনিশ্চিত ভবিষ্যত,অন্যদিকে রিফাকে হারানোর তীব্র ভয় প্রতিটি মুহূর্তে আমাকে কুরে কুরে খায়। আমি দিশেহারা হয়ে পড়ি। হিয়া আমি আমি আসলে খুব ভীতূ একটা মানুষ হিয়া। তারপরও একদিন খুব সাহস করে রিফাকে পালানোর কথা বলি। আমি জানতাম না তাকে আমি কোথায় নিয়ে যাবো,কোথায় রাখব, আমি শুধু এটুকু জানতাম আমার নিজেকে বাচিয়ে রাখার জন্য হলেও তাকে আমার খুব দরকার । শুধু আমার এই একটা কথাতেই রিফা কোনোকিছু না জেনেই তার সবকিছু ছাড়তে রাজি হয়ে যায়। জানো হিয়া আমাদের এখানেই দেখা করার কথা ছিল ২০১১ সালের ২৩ এপ্রিল। সেদিনও খুব বৃষ্টি হচ্ছিল। আমি এই মৃন্ময়ীর বুকে উঠার পরপরই রিফা আমার চোখের সামনে পাহাড়ের একটা ধ্বসের সাথে ওই পাথরটায় পড়ে যায়। তারপর থেকে সে আর কখোনো আমাকে ভালোবাসার কথা বলেনি। হিয়া সেদিন আমি একটুও কাঁদিনি জানো। আমি শুধু এই পাথুরে মস্তিষ্ক নিয়ে রিফার চোখদুটোর দিকে তাকিয়ে ছিলাম। আমার মনে হচ্ছিলো হারিয়ে তখনও তার চোখে আমার জন্য গভীর ভালোবাসা লুকানো ছিলো। তারপর আমি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে তিননাস হাসপাতালে ছিলাম হিয়া। আজ প্রায় সাতবছর পর এই মৃন্ময়ীর উপরে দাড়িয়ে আছি। আমি এখন রিফার সাথে সময় কাটাবো। তুমি চলে যাও।”

হিয়া ধীর পায়ে যখন পাহাড় থেকে নেমে যায় তখন তার দুচোখ ভরা অশ্রু। হিয়া যাওয়ার পরেই হটাৎ করে বৃষ্টি আসে। আমি দুহাত উচিয়ে বৃষ্টিকে অনুভব করি। আমার মনেহয় রিফা আমার কানে কানে তার ভালোবাসার কথা বলছে। আমি চিৎকার করে বলি,”রিফা তাকিয়ে দেখ আমি তোমার ছিলাম আজও তোমারই আছি। তোমার ভালোবাসাটাকে খুব যত্ন করে আগলে রেখেছি। তুমি খুশি হওনি?”

ঢাকায় ফেরার পরের সন্ধায় সেতু ভাই আমাকে কল করেন। আমি কল ধরতেই তিনি ওপাশ থেকে বলে ওঠেন,”কিরে আদিত্য তুই দেশে ফিরেছিশ আমাকে জানাশনি কেন? আজকেই মহেশখালীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা দে। আমার বাগানে খুব সুন্দর দেশি পেয়ারা হইছে। খেয়ে যা।” আমি তার কথা শুনে হাসতে হাসতে বলি,”দেশি পেয়ারা আমার পেটে হজম হয়না ভাই। আপনি সমুদ্রতীরের নারিকেল খাওয়াইয়েন। আমি আগামীকাল রওনা দিচ্ছি।” একমাত্র সেতু নামের আমার দুইবছরের বড় এই ভাইটাই আমার জীবনের পুরো গল্পটিই জানেন আর আমি ভাইয়ের গল্পটা। আমি যখন সিলেটে রিফার সাথে দেখা করতে যেতাম তখন ভাইয়ের মেসে থাকতাম। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি রসায়ন নিয়ে পড়াশোনা করতেন। কোয়ান্টাম কেমিস্ট্রির উপর কানাডা থেকে পিএইচডি করার পর বছর কয়েক তিনি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। এবং আপাতত আমার এই শ্রদ্ধেয় বড়ভাই সবকিছু ছেড়েছুড়ে বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপ মহেশখালিতে একটা অবৈতনিক স্কুল চালাচ্ছেন।

পরদিন মা কে হাবিজাবি বুঝিয়ে কমলাপুর থেকে দশটাকা দিয়ে একঠোঙ্গা বাদাম কিনে আমি মহেশখালির উদ্দেশ্যে ট্রেনে উঠি। আমি যখন মহেশখালিতে পৌছাই তখন সেতু ভাই বাশ দিয়ে তার স্কুলঘর মেরামত করছেন। তাকে মনেপ্রানে সাহায্য করছেন তার ১০-১২ বছরের কয়েকজন ছাত্র। আমাকে দেখেই তিনি বলেন,”বুঝলি আদিত্য এই দ্বীপটা যেমনি সুন্দর তেমনি প্রতিকূল। এখান থেকে পাহাড়ের কোনায় বসে সমুদ্র দেখে যেমন চোখ জুড়াতে পারবি, তেমনি মাঝরাতে বাতাস আর বৃষ্টির ঝাপটায় ঘর ছেড়ে পালাতেও কুল পাবিনা। তিনদিন আগেই ঘর মেরামত করলাম। গতরাতে বাতাসের কবলে পড়ে আবার এই অবস্থা। এখন বল তোর কি খবর?”
আমি সেতু ভাইকে বলি,” ভাই আপনি সবকিছু ছেড়েদিয়ে এই মহেশখালিতে এসে ঠিকানা গাড়লেন কেন বলেনতো?”
সেতু ভাই হাসতে হাসতে বলেন,”আমার তো কোনো পিছুটান নাই রে। শোন আমার জীবনের পুরো গল্পটা আজ তোকে বলি।”
আমি গভীর আগ্রহ নিয়ে মাথা নাড়ি।

তিনি বলতে শুরু করেন,” আমার বাবা যখন আমার মাকে ছেড়ে অন্য এক মহিলাকে বিয়ে করে আমাদের লাথি মেরে বাড়ি থেকে বের করে দেয় তখন আমার বয়স চারবছর দুইমাস। আমার মা তখন গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় আসেন। তিনি তখন আমাকে বুকে নিয়ে ঢাকা শহরের ফুটপাতে ভিক্ষা করতেন। তখন আমাদের একমাত্র চাহিদা সকালে একটা বাসি রুটি আর রাতে সবজি দিয়ে আধাপ্লেট ভাত। হটাৎ করে আমার মায়ের ইচ্ছে হলো তিনি আমাকে পড়ালেখা করাবেন। সেজন্য তিনি উত্তরার কাছেই একটা বস্তিতে আমাকে নিয়ে আশ্রয় নেন। তিনি তখন বাসাবাড়িতে বুয়ার কাজ করতেন। তিনি যখন রাতে বস্তিতে ফিরতেন আমি মায়ের কোলে বসে তাকে ইংরেজী কবিতা পড়ে শোনাইতাম। আমার মা তখন সীমাহিন মমতা নিয়ে আমার কপালে একটা চুমু দিয়ে বলতেন, আমার বাজান একদিন অন্নেক বড় হইব। তখন আমার চাহিদা ছিল দুবেলা খেয়ে না খেয়ে পড়াশোনার খরচ চালানো। আদিত্য আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার পর আমার মা ঢাকায় একা হয়ে যান। তারপর একদিন আমাকে একা করে তিনি খোদার ডাকে সাড়া দিয়ে চলে যান। আদিত্য আমি আজীবন আমার জন্য সংগ্রাম করে যাওয়া মাকে নিজের উপার্জনের টাকা দিয়ে একটা চাল ও কিনে খাওয়াতে পারিনি। এই দুঃখ আমি কই রাখি বলতো?
আমি আমার পিএইচডি শেষ করার আগে কাউকে ভালোবাসিনি। ওইসময় ভালোবাসা নামক বিলাসিতা করার মতো পুজি আমার ছিলোনা। ইউনিভার্সিটিতে লেকচারার হিসেবে যোগ দেবার পর প্রথম যেদিন নীলাকে দেখি আমার কি মনে হয়েছিলো জানিস? আমার মনে হয়েছিলো বাকি জীবন এই মেয়েটাই আমার একমাত্র চাওয়া। কিন্তু সে চাওয়া সাময়িক পূরন হলেও আজ এত অপূর্ণতা। তাই আজ আমার কোনো চাহিদা থেকেও নাইরে আদিত্য। তবে একটা ইচ্ছে আছে আমার। আমি নীলাকে একটা প্রশ্ন করতে চাই, সে আমাকে বিয়ে করার পরও কেন তার পুরোনো প্রেমিকের সাথে পালিয়ে গেল বলতে পারিশ আদিত্য? সে কি জানতোনা এই আধাপাগল আমি তাকে ছাড়া কতটা উদ্দেশ্যহীন? সে কি জানতোনা যেই জীবনে সে নেই সেই সময়গুলো আমার জন্য কতটা ব্যাথাতুর?
নীলাকে হারানোর পর আমার একটা সময় মনে হতো পৃথিবীতে আমার চাহিদা ফুরিয়ে গেছে,আমি জীবনের কক্ষপথ থেকে বিচ্যুত হয়ে গেছি,আমার মতো একজন অযোগ্য মানুষের মরে যাওয়া উচিত। তারপর এই মহেশখালিতে এসে আমার মনে হল,এই শিশুদের সাথে বাকি জীবনটা কাটালে খুব একটা মন্দ হয়না। তখন থেকে এখানেই আছিরে আদিত্য। জীবনের অর্থ নতুন করে খোঁজার চেষ্টা করছি।”

সেতু ভাই কথাগুলো বলার সময় আমি খেয়াল করি তার চোখের কোনে পানি জমে গেছে। আমি আমার অনুভূতিহীন মস্তিষ্ক নিয়ে ভাইকে বলি,” তিরিশ বছরের জীবনে আমিও আমার মা কে কিছুই দিতে পারিনি। আমার এই ব্যর্থতা যে পরিমাপ করার মতো নয় ভাই। আমাদের ভগ্ন ললাটে আর কতটুকুই বা সুখ ধরে বলেন! তাইতো সুখ ফেটে বারবার জীবনে রংচটা কষ্টেরা নেমে আসে। আমিও আজও রিফাকে ভুলতে পারিনাই ভাই। মাঝে মাঝেই আতীতের প্রতীক্ষিত স্বপ্নগুলো জমাট বেধে আমার দম আটকে দেয়। আমি মরতে মরতে বেঁচে যাই।”

মহেশখালী দ্বীপটা আমার অসম্ভব রকমের ভালো লাগে। সন্ধার পর আমি সমুদ্রতীরের ছোট্ট একটা পাহাড়ের গোড়ায় বসে সারাজীবনের পাওয়া না পাওয়ার সমীকরনটা মিলানোর চেষ্টা করি। পাহাড়ের সাথে আমার সম্পর্কটা অনেক গভীর। এমনি একটি পাহাড়ে আমার ভালোবাসার হাজারো স্মৃতি জড়িয়ে আছে।
আমি যখন এসব সাতপাঁচ ভাবছিলাম তখন হটাৎ হিয়া আমাকে কল করে। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে বলে ওঠে,”আমি দুপুর থেকে আপনাকে কল করছি কিন্তু আপনার নাম্বার বন্ধ। আপনার কি হয়েছে বলুনতো? কোথায় আপনি?”
আমি বলি,”আমি এখন মহেশখালি নামক বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপে আছি। এখানে নেটওয়ার্কের খুব সমস্যা। আপনি কিছু বলবেন?”
হিয়া খানিকক্ষণ চুপ থেকে বলে,”আচ্ছা আদিত্য আমরা কি জীবনটাকে এগিয়ে নিতে পারিনা? হয়তো সৃষ্টিকর্তা আমাদের থেকে অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছেন আমাদের কি উচিত নয় যতটুকু পাচ্ছি ততটুকু দিয়েই সামনের সময়গুলো সুন্দরভাবে সাজিয়ে নেওয়া? আমি রিফার জায়গাটা কখোনোই চাইনা, শুধু আপনার সীমাহীন ভালোবাসার ছোট্ট একটা টুকরো দিতে পারবেন? আমি জানি আমার কথাগুলো এভাবে বলা উচিত হচ্ছেনা। কিন্তু আমি নিজের অনুভূতিগুলোকে গোপন করতে পারলাম না। দুঃখিত।”

হিয়ার কাছ থেকে এমন কথা শোনার মানসিক প্রস্তুতি আমার ছিলোনা। আমি কিছুক্ষনের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে যাই। একটু সময় নিয়ে তাকে বলি,” জানো হিয়া একদিন রিফা আমাকে প্রশ্ন করেছিলো,” আদিত্য আমি যদি কখোনো তোমার থেকে হারিয়ে যাই তখন তুমি অন্য কারো সাথে জীবন সাজাবে। কেমন?” আমি তখন তাকে বলেছিলাম,”গল্পের নায়িকাদের হয়তো বারবার বদলে ফেলা যায় রিফা। কিন্তু জীবনের নায়িকাকে বদলানো যায়না। সে একজনই থাকে। ভালোবাসার রাজ্যের সিংহাসনে বসে সে তার একচ্ছত্র রাজত্য চালায়। তুমি আমার জীবনের নায়িকা। তোমাকে হারিয়ে ফেললেও হয়তো আমি বেঁচে থাকতে পারবো। কিন্তু আমার ভালোবাসার রাজ্যে আর কোনো রাণী থাকবেনা।” তখন রিফা আমার কথা শুনে খুশিতে কেঁদে দিয়ে বলেছিলো,” আমি এত ভাগ্যবতী কেন বলতে পারো আদিত্য?”
হিয়া যে মেয়েটা আমাকে ভালোবেসে তার সবকিছু বিসর্জন দিলো আমি তাকে দেওয়া ওয়াদা কিভাবে লঙ্ঘন করি বলোতো?”

আমার কথা শেষ হলে হিয়া আমাকে বলে,” হুম,আমি বুঝতে পেরেছি আদিত্য। আসলে কিছু সময়ের জন্য আমিও আমার ভালোবাসার দিনগুলোকে ভুলে গিয়েছিলাম। আপনি এত সুন্দর করে কিভাবে কথা বলেন আদিত্য? আপনার কথা শুনে মাঝে মাঝে আমার আপনাকে খুব ভালোবাসতে ইচ্ছে করে।”
আমি একটা চাঁপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হিয়াকে বলি,” হিয়া আমাকে সেভাবে ভালোবাসবেন না। আমরা যখন কাউকে মন থেকে ভালোবাসি তখন ভালোবাসার অনুভূতিগুলো আমাদের মনের পুরোটা দখল করে নেয়। তখন পার্থিব সুখগুলো আর সেখানে স্থান খুজে পায়না। আজ সাত বছর পরেও আমি একটা মুহুর্তের জন্যেও রিফাকে ভুলতে পারিনি জানো!”

এরপর হিয়া হেসে বলে,”আপনি সত্যিই খুব ভালো একজন মানুষ। ভালোবাসার জায়গা না পেলেও একজন ভালো বন্ধুর জায়গাটা ছাড়ছিনা।”

আমি হিয়াকে ধন্যবাদ জানাই পুরো বিষয়টা বুঝতে পারার জন্য।
কল কাটার পর থেকেই আমার রিফাকে মনে পড়ে। আমি ভাবি রিফাকে ভালোবেসে বাকি জীবনটা এই দ্বীপে কাটিয়ে দিলে কি খুব মন্দ হবে? এবার নাহয় কানাডায় গিয়ে ইউনিভার্সিটি অব টরেন্টোতে পদত্যাগ পত্রটা জমা দিয়ে এই দ্বীপেই মাকে নিয়ে আশ্রয় নেব!
আমি যেন আজকের এই চাঁদনী রাতের মায়াবী আলোতে আমার রিফাকে স্পষ্ট দেখতে পাই। সে নিঃশব্দে আমার পাশে এসে বসে। আমি রিফার চঞ্চলা হরিণীর মতো চোখদুটোর দিকে তাকিয়ে বলি,” সাতবছরে স্মৃতির পাতায় অনেক কথা জমে গেছে রিফা। অনেক কিছু বদলেও গেছে। কিন্তু দেখ আমি আগের মতোই আছি। আমি আমার কথা রেখেছি রিফা। তোমার ভালোবাসা আজও আমার চোখে,মুখে,ঠোটে লেগে আছে। আজ আমি আমার অতীতের হিসাবের খাতা নিয়ে বসেছি। আমার একমাত্র প্রাপ্তি তুমিই ছিলে,আজও তুমি আছো আর তুমিই তুমি থাকবে। তুমি খুশি হওনি?”
রিফা কথা বলেনা। আমার দিকে তাকিয়ে খুব মিষ্টি একটা হাসি দেয়। রিফার এই হসিটাই আমার বেঁচে থাকার মূলধন। রিফার চোখ থেকে চুইয়ে পড়া ভালোবাসাগুলো আমি কুড়িয়ে নেই, সেগুলো দুহাত ভরে আমার সারাটা শরীরে মাখি। তারপর আমার আকাশে আলো ছড়ানো রিফা নামের চাঁদটির গোলাপীরঙ্গা ঠোটের দিকে তাকিয়ে থাকি।
তখন আমার সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের “কবিতা” নামের কবিতাটা মনে পড়ে,

“আমি তোমাকে এত বেশি স্বপ্নে দেখেছি যে তুমি
তোমার বাস্তবতা হারিয়ে ফেলেছো
এখনো কি সময় আছে তোমার জীবন্ত শরীর স্পর্শ করার
এবং যে ওষ্ঠ থেকে আমার অতি প্রিয় স্বর জন্ম নেয়
সেখানে চুম্বন দেবার?…
আমি তোমাকে এত বেশি স্বপ্ন দেখেছি যে হয়তো
আমার পক্ষে আর জাগাই সম্ভব হবে না
আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘুমোই, আমার শরীর সব
রকম জীবন ও ভালোবাসার জন্য উন্মুক্ত……
আমি তোমার ভুরু ছুঁতে পারি, ওষ্ঠ ছুঁতে পারি এত কম……
আমি তোমাকে এত বেশি স্বপ্ন দেখেছি…..”

লেখকের কথা: প্রায় দেড়মাস থেকেই গল্পটা লেখার চেষ্টা করছি, কিন্তু বাস্তবতার সাথে মেলাতে পারছিলামনা। অবশেষে গল্পটা আমার জীবনের সাথেই অনেকটা মিলিয়ে লিখলাম। গল্পের প্রতিটা অভিব্যক্তি আমি খুব কাছ থেকে অনুভব করেছি। জীবনের হারিয়ে যাওয়া রংচটা স্বপ্নগুলোকে গল্পে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত