জীবন ভাগ্য

জীবন ভাগ্য

তিন বোনের মধ্যে আমি ছিলাম মেজো। দেখতে শুনতে সবাই বলত আমি নাকি তিন বোনের মধ্যে বেশি সুন্দর। তবু কি কারণে যেন আমার বিয়ে হচ্ছিলনা। বিয়ে জন্ম মৃত্যু আসলে ভাগ্যের ব্যাপার। অবশেষে পয়ঁত্রিশ বছর বয়সে আমার বিয়ে হল। বাবা মার হাসি মুখটা দেখে মনে হল এক বিশাল সমুদ্র পাড়ি দিয়ে তারা তীরে উঠেছেন। বিয়ের সময় আমি ঢাকায় একটা বেসরকারী চাকুরী করতাম। নিজের খরচ নিজে চালাতাম। বাবা মার কোন বোঝা হয়ে ছিলামনা তবু বাবামার সমস্ত চিন্তা আমার বিয়ে না হওয়া নিয়ে। শুধু কি বাবামা সেই সাথে ভাইবোন আত্মীয় স্বজনও নানারকম কথা বলত।তবে নতুন জীবনে প্রবেশের দিনে সবকিছু ভুলে গিয়ে সবাই এক হয়েছিলাম। বিশেষ করে বাবা মার হাসিমুখটা দেখে অনেক শান্তি লেগেছিল।

চারদিকে হৈ চৈ পড়ে গেল এত ভাল বিয়ে হচ্ছে আমার, পাত্র বুয়েট থেকে পাশ করা ইন্জিনীয়ার। ছেলের বাবাও সরকারী ইন্জিনীয়ার। ঢাকায় বাড়ি গাড়ি আছে। সবাই কানাকানি করল সবুরে মেওয়া ফলে যে মেয়ের বিয়ে হচ্ছেনা তার এখন রাজ কপাল। যাক এমন পাত্র ম্যানেজ করেছে ঢাকায় থাকা আমার বড়বোন। তাই সকল প্রশংসার দাবীদার আমার বড়বোন। তার বাড়ি থেকে আমার বিয়ে হল। বিয়ের পর মনে হল সত্যি আমি অনেক ভাগ্যবতী। আমি মফস্বলে বেড়ে উঠা মেয়ে। পড়াশুনার জন্যই ঢাকায় আসি। তারপর চাকুরীর সুবাদে ঢাকায় থাকলেও আমার সবকিছুতে মফস্বলের স্পর্শ ছুঁয়ে আছে। তাই নতুন পরিবেশে নিজেকে খাপ খাওয়ানো কঠিন হলেও সেটা কঠিন হয়নি আমার হ্যাসব্যান্ডের কারণে। সে আমাকে সব ব্যাপারে সাহায্য করত। আর একজন আমার পাশে ছিল আমার শাশুড়ি। তাই আমার কোন সমস্যা হতনা।

প্রায় ও আমাকে লং ড্রাইভে নিয়ে যেত। মাঝে মাঝে আমাকে নিয়ে নিজে ড্রাইভ করে ঢাকা থেকে দিনাজপুর শ্বশুর বাড়ি যেত। আমার গ্রামের আত্মীয় স্বজনের সাথে খুব সহজেই মিশে যেত। একটুও অহংকারবোধ তার মধ্যে ছিলনা । জীবন যে এত সুন্দর তখনই বুঝলাম।বিয়ের কয়েকটা মাস খুব রঙ্গিন ভাবে কেটে গেল। সময়টা আমরা খুব উপভোগ করলাম। তার কিছুদিন পর আমার বড় ছেলের জন্ম হলো। আনন্দে পুরো বাড়িটা ভাসতে লাগল। শুধু আমার শাশুড়ি মা আমার ছেলেকে দেখে যেতে পারলনা যদিও তিনি অন্যান্য ছেলেমেয়েদের ঘরের নাতি নাতনী দেখে গেছেন। সেদিন শাশুড়ী মায়ের মুখটা খুব মনে পড়েছিল।

ছেলে, সংসার চাকুরী নিয়ে খুব ব্যাস্ত জীবন কাটাতে লাগলাম। ছেলের বয়স যখন এক বছর নয় মাস তখন আবার কনসিভ করলাম। আমার আরও কষ্ট হবে দেখে ও বলল বেশি সমস্যা হলে চাকুরীটা ছেড়ে দাও। সেদিন বলেছিলাম দেখা যাক। তার কয়দিন আগে থেকে আমার হাজব্যান্ডের একটু একটু করে বুকের ব্যাথা করতেছিল । তাকে বললাম ডক্টর দেখাও। সে বলল এসব গ্যাসের ব্যাথা কিচ্ছু হবেনা। এর মধ্যে আমি ডক্টর দেখিয়ে কনর্ফাম হলাম আমার দুই মাস প্রেগন্যান্সি চলে। এর মধ্যে তাকে ডক্টরের কাছে নিয়ে যেতে চাইলে বলে দরকার নেই আমি ভাল আছি। আমারও শরীরটা তেমন ভাল যাচ্ছিলনা শুধু বমি বমি লাগছিল। যেদিন প্রেগন্যান্সি খবরটা চারদিকে ছড়াতে শুরু করল সেদিন রাতেই আমি আর ও পাশাপাশি শুয়ে আছি বড় ছেলেটার বয়স তখন এক বছর নয় মাস। ঘুম থেকে জেগে উঠে বুকের দুধ খাচ্ছিল। হঠাৎ দেখি ও চিৎকার করে খাট থেকে পড়ে গেল। আমরা দেবর ভাসুররা সবাই এক বিল্ডিংয়ে থাকতাম। সঙ্গে সঙ্গে হসপিটালে নিয়ে যেতে যেতে সব শেষ।

আমার রাজকপাল শেষ হয়ে গেল। কেবল মাত্র দুই বছর নয় মাসের সংসার। বড় ছেলেটার বয়স এক বছর নয় মাস আবার আমি দুই মাসের প্রেগন্যান্ট । আমার নতুন একটা জীবন যুদ্ধ শুরু হল। চাকুরীটা ধরে রাখার জন্য মরিয়া হয়ে উঠলাম। যে শ্বশুর বাড়িতে রাজা নেই সেখানে রানী হয়ে থাকা কি যায়? কি অসহায় জীবন পার করা শুরু করলাম। প্রেগন্যান্সিতে হাসব্যান্ডের সেবা পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে যেতাম। প্রায় প্রতিরাতে পেটে হাত দিয়ে কাদঁতাম আর খোদার কাছে চাইতাম আমাকে আরও শক্ত কর। কত মানুষ কত কথা বলেছে হাসব্যান্ড নেই অথচ প্রেগন্যান্ট। মাকে কাছে নিয়ে রাখলাম। ঐ সময়টা মা আমাকে অনেক সার্পোট দিয়েছিল।

ছোট ছেলেটার বয়স যখন সাড়ে তিন বছর তখন একদিন হঠাৎ করে কাছে এসে বলে মা ভাইয়ার সাথে বাবার ছবি আছে আমার ছবি নেই কেন? আমি এ প্রশ্নের জবাব দিতে পারিনি। সেদিন শুধু হু হু করে কেঁদেছিলাম। হাসব্যান্ড মারা যাবার পর অবিবাহিত চাকুরীজিবী ননাসই আমার শাশুড়ির দায়িত্ব পালন করেছে কখনও ভালবেসে কখনও তীক্ষ চোখে। এভাবেই আমার জীবনের একটা বড় অংশ কেটে গেল ।

এখন আমার দুই ছেলে ইন্জিনীয়ার । দুজনেই বুয়েট থেকে পাশ করেছে। বুকের দুপাশে দুজনকে রেখে বড় করেছি। জীবনে শত ঝড় ঝাপটা এসেছে তাদেরকে কখনও বুঝতে দেয়নি। জীবনের এ সময় এসে আমি বড্ড ক্লান্ত। আমার ছায়ায় নয় আমি কারো ছায়ায় এখন বাচঁতে চাই। তাইতো আজ খুব ভয় লাগছে কিছু হারানোর ভয়। ত্রিশ বছর আগে যেমন করে হারিয়েছিরাম আমার রাজাকে। আজ বড় ছেলেটার বিয়ে অথচ আমার মনে কোন আনন্দ নেই শুধু ভয় লাগছে আমার বৌমারা কি আমাকে আমার ছেলেদের মত করে আমাকে ভালবেসে কাছে টেনে নিবে। না আমার ছেলেরা তাদের মাকে দূরে ঠেলে দিবে? না আর না রাতে মুখে পানির ঝাপটা দিয়ে বেসিনের আয়নায় তাকালাম , না দেখতে পাচ্ছি আমার ছেলেরা আমাকে সুখে ভাসিয়ে রেখেছে ত্রিশ বছর আগের কথা খুব ঝাপসা লাগছে।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত