শিবু স্যার আর ফিল্ম ডাইরেক্টর

শিবু স্যার আর ফিল্ম ডাইরেক্টর

“তোদের এই রূপকুমারের কথায় আমারও অনেক পুরোনো কথা মনে পড়ে গেল,” শিবুস্যার স্বগতোক্তির ভঙ্গিতে বললেন।

ব্যস, ওই একটি কথায় আমাদের এতক্ষণের যুদ্ধটা এক লহমায় থেমে গেল। একটা আস্ত গল্পের ইঙ্গিত পেয়ে সব্বাই গোল্লা গোল্লা চোখে স্যারের দিকে ঘুরে গেল।

কথাটা হচ্ছিল আজকালকার বাংলা সিনেমার জনপ্রিয়তম নায়ক রূপকুমারকে নিয়ে। ওঁর নতুন ছবি রিলিজ করবে আগামী শুক্রবার, তাই খবরের কাগজের পাতায় তার বিজ্ঞাপন পড়েছে। পাড়ার রক উত্তাল ওঁকে নিয়ে। রূপকুমারের উচ্চারণ নিয়ে অনেকেই খুব হাসাহাসি করছে। প্রায় পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই রূপকুমারের বাচনভঙ্গি একটু বাচ্চাদের মতো আধো আধো। সেটাই অনেকের হাসির কারণ। কিন্তু অনেকে আবার সেই ভঙ্গিটাই ওঁর প্লাস পয়েন্ট বলছেন। কেউ কেউ বলছেন, রূপকুমার নাকি মোটেই অভিনয় পারেন না, সুদ্ধু ঢিসুম-ঢিসুম করেই দর্শকদের মন জয় করে চলেছেন। অন্যদের বক্তব্য, রূপকুমার যদি অভিনয় নাই পারতেন তাহলে আজ এতগুলো বছর ধরে ওঁর ছবিতে বক্স অফিস তোলপাড় হয় কী করে? ঘটনাটা নিয়ে আমাদের বন্ধুরাও দ্বিধা বিভক্ত।

আমরা বলতে আমি, ডাকু, পিন্টু, রাজা আর পিলু। সক্কলে ক্লাস নাইনে পড়ি। আর শিবুস্যার হলেন আমাদের কোন্নগর হাইস্কুলের অঙ্কের মাস্টার। আমাদের কারোরই আত্মীয় নন। নগেনজেঠুর বাড়ির নিচের তলায় ভাড়া থাকেন। একটি ঘর আর কমন বাথরুম নিয়েই ওঁর সংসার। বাড়ির নিচের তলায় আরও দুটি পরিবার ভাড়া থাকেন। তাদের সঙ্গেই চানঘরটি শেয়ার করতে হয়। স্যার একা মানুষ। বিয়ে-থা করেননি। নিজের লোক বলতেও কেউ নেই। তাই ওঁর কোনও সমস্যাও নেই। রোজ সকালে ন’টার মধ্যে স্নান-খাওয়াদাওয়া সেরে রওনা দেন ইস্কুলে। বিকেল পাঁচটায় ফের বাড়ি। আর বাকিটুকু সময় বসে কাটান লাইব্রেরি থেকে আনা গল্পের বই পড়ে। হপ্তায় তিনদিন সন্ধেয় আমাদের অঙ্ক কষান। ভুল হলেই প্রাপ্য একটি করে গাঁট্টা। শুধু গাঁট্টা নয়, রামগাঁট্টা! যে না খেয়েছে সে কী বুঝবে তার মর্ম!

শিবুস্যারের একটি গুণ আছে। চমৎকার গল্প বলতে পারেন। প্রতি গল্পই আনকোরা। বই থেকে ঝাড়া নয়। সবই নাকি তাঁর জীবনের উপলব্ধ জ্ঞান। স্যারের গল্পের স্টক অফুরন্ত। হেন জায়গা নেই যে উনি যাননি। হেন কাজ নেই উনি করেননি। এখন সব ছেড়েছুড়ে এই কোন্নগরে এসে থিতু হয়েছেন। ফি রোববার আমরা বেলা দশটা দিকে পড়া না থাকলেও হানা দিই স্যারের বাড়ি। স্যার তাঁর চৌকির ওপর বাবু হয়ে বসে একটি জমজমাট গল্প বলেন, আর আমরা মেঝেতে শতরঞ্জির ওপর হাঁ করে বসে গিলতে থাকি। ওঁর গল্প শুনতে আমাদের হেব্বি লাগে। স্যারের গল্পের একটি বিশেষত্ব আছে। গল্প বলা হয়ে গেলে উনি আমাদের সামনে এমন এক-একটি নমুনা পেশ করেন যা দেখে ওঁর ওইসব অবিশ্বাস্য গল্পগুলোর ওপর আমাদের বিশ্বাস-ভক্তি-শ্রদ্ধা অটুট থেকে যায়।

ডাকু উত্সুক কন্ঠে বলে ওঠে, “শুরু করুন স্যার, আপনার আজকের গপ্পো।”

“প্রথমেই বলে রাখি, এই ঘটনাটার সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক খ্যাত-বিখ্যাত মানুষের নাম। তাই এঁদের নাম প্রকাশ করা যাবে না।” স্যার আমার দিকে চেয়ে বললেন, “বাবিন, তুই তো শুনেছি আজকাল লিখতে-টিখতে শুরু করে দিয়েছিস। তা লেখ মন্দ নয়, কিন্তু খবরদার, এঁদের সত্যিকারের নাম প্রকাশ করলে কাজটা খারাপ হয়ে যাবে। বুঝলি?”

আমি মুচকি হেসে বলি, “ঠিক আছে, লিখলে নাম পাল্টে দেব। কেমন?”

স্যার খুশি হয়ে চৌকির ওপর ভালো করে বাবু হয়ে বসে বলতে শুরু করেন, “তখন আমি কাজ করি এক ফিল্ম ডাইরেক্টরের সঙ্গে।”

“আপনি সিনেমা করতেন?” পিন্টু প্রায় আর্তনাদ করে ওঠে, “কী বলছেন, স্যার!”

“উফ্!” শুরুতেই ব্যাঘাত পেয়ে স্যার যারপরনাই বিরক্ত হন, “কখন বললুম যে আমি সিনেমা করতুম? বলছি যে এক নামকরা সিনেমার ডাইরেক্টরের সঙ্গে কাজ করতুম।”

“ওহ্‌, তাই বলুন।“ পিন্টু আশ্বস্ত কন্ঠে বলে, “তা কী কাজ করতেন?”

রাগত চোখে পিন্টুর দিকে চেয়ে শিবুস্যার বললেন, “সবুর কর তো ছোঁড়া! মধ্যিখান থেকে কি গল্প বলা যায়? যখন যেটা বলার আপনা আপনিই আসবে।”

আমি পিন্টুকে থামাই, “তুই চুপ কর তো, পিন্টু। স্যার, আপনি বলতে থাকুন।”

স্যার আবার বলতে শুরু করলেন, “ভদ্রলোকের নাম ধরে নে, কান্তি চট্টোপাধ্যায়। আমি স্ক্রিপ্ট লিখে দিই ওঁর ফিল্মের জন্য। উনি গল্প বেছে দেন আর আমি তার ডায়ালগ লিখি; শট ডিভিশনও করে দিই নিজের মতো করে। কান্তিবাবু তাতে কারেকশন করে নিতেন আমাকে পাশে বসিয়ে। তার থেকে আমারও জ্ঞান বাড়তে থাকত। যখনকার কথা বলছি তখন এত ফিল্ম স্কুলের রমরমা ছিল না। খুব কম মানুষই পুনে গিয়ে ফিল্ম ইনস্টিটিউট থেকে ছবি বানানো শিখে আসত। তখন ছবি তৈরি শিখতে গেলে ডাইরেক্টরদের পিছু ধরা ছাড়া আর কোনও উপায় ছিল না। তা কান্তিবাবু মানুষ ভালো ছিলেন। কম বাজেটে ছবি বানাতেন। নতুনদের সুযোগ দিতেন। তার কাছে প্রথম কাজ করে কালে অনেক নাম করেছে এমন হিরো অঢেল আছে।

“কথাটা মিথ্যে নয় যে এককালে আমারও অভিনেতা হবার ভারি ইচ্ছে ছিল। সদ্য গ্রাম থেকে আসার পর বেশ কিছুদিন আমি টালিগঞ্জে ডিরেক্টরদের ঘরে হত্যে দিয়ে পড়েছিলুম। কিন্তু পরে বুঝলুম, আমার দ্বারা অভিনয় হবে না। কারণ, ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালেই আমার হাত-পা কাঁপতে শুরু করে দিত। দু-একটা ফিল্মে সাইড রোলও করেছিলুম অবিশ্যি। পরে ফিল্ম পাড়ার কয়েকজন আমাকে সুবুদ্ধি দিল। ভেবে দেখলুম, ক্যামেরার সামনে দাঁড়াবার চেয়ে পিছনে দাঁড়ানো এমন কিছু খারাপ নয়। বরং চোখের সামনে নতুন নতুন হিরো-হিরোইনদের উত্থান পতন দেখাও কম রোমাঞ্চকর নয়!

“সেইমতো একদিন কান্তিবাবুর কাছে হাজির হয়েছিলুম। কিছুদিন ঘোরাবার পর উনি আমাকে নিজের দলে ঢুকিয়ে নিলেন। প্রথম প্রথম কান্তিবাবুর ব্যক্তিগত জিনিসপত্র দেখা শোনা করতুম। তারপর ক্যামেরার দেখভাল করা। কীভাবে ছবি ওঠে এসবও দেখাশোনা করতুম। টাকাপয়সা তেমন কিছুই পেতুম না বললেই চলে। তবে দুপুরে খাওয়াদাওয়া পেতুম আর সামান্য যাতায়াত খরচা। তাতেই আমি খুশি ছিলুম। হপ্তায় তিনদিন এক বন্ধুর দাদার ক্লাস থ্রিতে পড়া ছেলেকে টিউশনি পড়িয়ে আমার হাতখরচা উঠে যেত সেই সময়। থাকতুম বড়বাজারের এক মেসবাড়িতে। খাওয়াদাওয়া একটা পাইস হোটেলে।”

এই সময়ে দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হতে পিন্টু গিয়ে দরজা খুলতে কিকিদিদি এল একটা থালায় করে চা আর আমাদের জন্য খানিকটা ঘরে ভাজা কুঁচো নিমকি নিয়ে। দিদি জানত যে রোববার এইসময় আমরা থাকি স্যারের কাছে। কিকিদিদি নগেনজেঠুর মেয়ে। আমরা দিদি বললেও, ওঁকে মধ্যবয়সী বলা যেতেই পারে। অল্প বয়সে বিধবা হয়ে গিয়ে আবার বাবার আশ্রয়েই থাকত ওই বাড়িতে। নগেনজেঠুর আর কোনও সন্তান ছিল না। ওই একটি মাত্রই কন্যা। শিবুস্যার একা মানুষ বলে রান্নাবান্নার ঝঞ্ঝাট রাখেননি। নগেনজেঠুর বাড়িতেই যখন যা রান্না হত তাই জুটত ওঁর কপালে। উনি বাড়িভাড়ার সঙ্গে খাইখরচ বাবদ একটা মূল্য ধরে দিতেন। স্যারের খুব চায়ের নেশা। তাই কিকিদিদি মাঝে মাঝে চা করে দিয়ে যেত। সঙ্গে মুখরোচক কিছু।

চা আর নিমকি শেষ হতে স্যার আবার শুরু করলেন তার কাহিনি।

“একটু একটু করে মন দিয়ে কাজ করে আমি কান্তিবাবুর সুনজরে পড়ে গেলুম। উনি আমাকে স্ক্রিপ্ট লেখার কাজ শেখাতে শুরু করলেন। তা শিখলাম। উনি বলতেন, আমার লেখার হাত নাকি মন্দ নয়। খুশি মনে আমি লিখতে থাকলুম। রোজগারও বেশ হতে লাগল।

“সেই সময় কান্তিবাবুর হাতে বেশ কিছু নতুন অভিনেতা উঠে এসেছিলেন। উনি নিজের হাতে গড়ে পিঠে অভিনেতা তৈরি করতেন। তাই প্রতিদিনই ইন্দ্রপুরী স্টুডিওতে ওঁর অফিসে নতুন নতুন প্রচুর ছেলেমেয়ের ভিড় লেগেই থাকত। সকলেরই স্বপ্ন নায়ক-নায়িকা হবার। কিন্তু সবার দ্বারা কি সব কাজ হয়? যেটা আমি বুঝতে পেরেছিলুম, সেটা সবাই বুঝতে পারত না। তাই আমি সবার থেকে বায়োডাটা আর পোর্টফোলিও জমা নিয়ে ভিড় হালকা করে দিতুম।”

“এই পোর্টফোলিও ব্যাপারটা কী?” পিলু জিজ্ঞেস করল।

“পোর্টফোলিও জানিস না?” স্যার ভারি বিরক্ত হন, “সিনেমাতে নামতে গেলে প্রথম কাজটি হল কোনও নামী ফটোগ্রাফারের কাছে গিয়ে নিজের বেশ কিছু ভালো ভালো ফটো তুলিয়ে একটা সুন্দর অ্যালবাম বানিয়ে নিয়ে যেতে হয় ডাইরেক্টর-প্রডিউসারদের কাছে। একেই বলে পোর্টফোলিও।”

“ওহ্‌, আচ্ছা। বুঝলাম।” পিলু বলে।

স্যার আবার বলতে শুরু করেন, “তো সেবার কান্তিবাবু একটা নতুন বই ঠিক করলেন।”

“বই?” পিলু ফুট কাটল।

স্যার ভারি বিরক্ত হয়ে বললেন, “আমি জানি যে অনেকেই সিনেমাকে ভুল করে বই বলে। কিন্তু তাদেরও খুব একটা দোষ দেওয়া যায় না। কারণটা কী, জানিস?”

পিলু ঘাড় নাড়ে।

“হুহ্‌!” স্যার নাক সিঁটকে বলেন, “এই হল তোদের মস্ত দোষ! সামান্য কিছু শিখলেই সক্কলকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার বদভ্যাস। একেই বলে ফ্লকসিন্যসিনিহিলিপিলিফিকেইশন!”

“কী? কী? কী বললেন?” আমরা সবাই একযোগে প্রায় আঁতকে উঠি!

স্যার মুচকি হেসে ওই বিদঘুটে শব্দটা আবার উচ্চারণ করে বললেন, “জানি তোরা বুঝতে পারবি না কথাটার মানে। শুনে রাখ, এর মানে সব কিছুকে তুচ্ছ জ্ঞান করা।”

ডাকু জিজ্ঞেস করে, “কোথায় পেলেন এই শব্দটা?”

“আ মোলো যা!” স্যার আকাশ থেকে পড়েন, “তোরা কি ভাবলি আমি শব্দটা এক্ষুনি বানালুম তোদের শোনাবার জন্য? ওটা হল ইংরেজি ডিকশনারির সবচেয়ে বড়ো শব্দ। বিশ্বাস না হয় বাড়ি গিয়ে খুলে দেখিস।” স্যার বানান করে করে উচ্চারণ করলেন শব্দটা, “Floccinaucinihilipilification!”

পিলু মিচকে হেসে বলে, “না, আমি বলছিলাম কী, ওই সিনেমাকে বই বলাটা…”

স্যার একবার পিলুর দিকে চেয়ে একটা ‘হুহ্’ গোছের শব্দ করে রুপোর ডিবে থেকে এক খিলি পান নিয়ে মুখে ফেলে বললেন, “একেই বলে অল্পবিদ্যা ভয়ংকরী! শোন, আগেকার দিনে সিনেমা তৈরি হত নামী দামী সাহিত্যিকদের গল্প অবলম্বনে। তাই লোকে সিনেমাকে বই বলত। তবে ছায়াছবি বা শুধু ছবি বলাটাই সঠিক। বলি, মাথায় কিছু ঢুকল?”

আমি বলি, “পিলু, তুই থামবি? গল্পটাকে বারবার আটকে দিচ্ছিস কেন?”

পিলু ঠোঁটে আঙুল রেখে বলল, “এই আমি মুখে কুলুপ দিলুম। আর একটি কথাও বলব না। স্যার, আপনি চালিয়ে যান।”

স্যার ব্যাজার মুখে ফের বলতে লাগলেন, “হ্যাঁ, তা যা বলছিলুম। তখন আমি কান্তিবাবুর অ্যাসিস্ট্যান্ট ডাইরেক্টর হয়ে গেছি। সেবার উনি সাহিত্যিক মন্দোদরী সামন্তের একটি বই বাছলেন সিনেমা তৈরি করার জন্য। সেই সময় মন্দোদরী সামন্তের বই ছিল হটকেক। জমজমাট গল্প-উপন্যাস লেখায় ওঁর জুড়ি পাওয়া ভার। তাঁর একটি জনপ্রিয় উপন্যাস কান্তিবাবু আমায় দিলেন চিত্রনাট্য লেখার জন্য। সিনেমার কাগজগুলোও কী করে যেন খবরটা পেয়ে গেল। তারা ফলাও করে খবরটা ছেপে দিল। সঙ্গে এটাও লিখে দিল যে আগামী সিনেমার বিভিন্ন রোলের জন্য কান্তিবাবু প্রচুর নতুন অভিনেতা খুঁজছেন। ব্যস, কান্তিবাবুর বাড়ি-অফিস সর্বত্র উঠতি অভিনেতাদের মেলা লেগে গেল। সব্বাই একটা রোল চায়। অনেকে তো সোজাসুজি নায়ক হবার জন্য পাগল। এমনও হয়েছে যে স্পটবয়দের দিয়ে আমার কাছে খবর পাঠিয়েছে, যদি তাকে নায়কের রোল দেওয়া হয় তো আমাকে খুশি করে দেবে। অনেক খরচ করতেও পিছপা হবে না!

“এসব শুনে আমার মাথা গরম হয়ে যেত। আমি বিশ্বাস করি যে, ট্যালেন্ট থাকলে নির্ঘাৎ তাকে সুযোগ দেওয়া উচিত। কিন্তু যারা এভাবে সিনেমায় চান্স পাবার জন্য পয়সা খরচা করতে চায় তাদের ট্যালেন্টই নেই, অথবা নিজের ওপর বিশ্বাসটুকুই নেই। এদের দ্বারা কিস্যু হবে না। মিষ্টি মিষ্টি করে দু’কথা শুনিয়ে দিতুম এসব পাবলিককে।

“যাই হোক, স্ক্রিপ্ট লেখা, কারেকশন সবই প্রায় শেষের পথে। সেই সময় একদিন আমি আর কান্তিবাবু যাব চুঁচুঁড়োর দিকে একটা শুটিং স্পট ফাইনাল করতে। আমি সক্কাল সক্কাল চলে এসেছি কান্তিবাবুর বাড়ি। ওঁর সঙ্গে বেরুব আটটার সময়। ওঁর বাড়িতে ঢোকার সময়ই দেখলুম, একটা সুন্দরমতো ছেলে দাঁড়িয়ে রয়েছে। বুঝলুম, সিনেমায় চান্স পাবার জন্য হত্যে দিচ্ছে। আমি দেখেও না দেখার ভান করে ভেতরে ঢুকে গেলুম। কান্তিবাবু তৈরি হয়েই ছিলেন। ওঁর ড্রাইভার আমাদের হাওড়া স্টেশনে ছেড়ে দেবে। সেখান থেকে ট্রেনে করে যাব চুঁচুঁড়ো।”

“ট্রেনে করে?” এবার রাজা বলে উঠল, “এত বড়ো পরিচালক ট্রেনে চাপবে?”

শিবুস্যার এবার আর রাগ করলেন না। বরং দুঃখু দুঃখু একটা হাসি হেসে বললেন, “তখন ডাইরেক্টররা মোটেও বেশি পয়সাওয়ালা হতেন না। অনেকেরই গাড়ি কেনা বা তার পেট্রল যোগাবার মতো অবস্থা ছিল না। কান্তিবাবুরও গোটা আষ্টেক সিনেমা করে নামডাক ঢের হলেও একটা সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়ির ওপরে উঠতে পারেননি। অবিশ্যি সিনেমার কাজে প্রোডিউসারের ঘাড় ভেঙে এসব খরচা আদায় করাই যেত, কিন্তু কান্তিবাবু বড়ো সাদাসিধে আর ভালোমানুষ ছিলেন। প্রোডিউসারের টাকাকে নিজের টাকা বলেই ভাবতেন। চুঁচরো পর্যন্ত গাড়িতে গেলে যা খরচা তার চেয়ে হাওড়া পর্যন্ত গাড়িতে গিয়ে তারপর ট্রেনে গেলে অনেক সাশ্রয় হয় বলে এই ব্যবস্থা।

“তা বাড়ি থেকে বেরিয়ে গাড়িতে চাপব আমরা, এমনি সময় সেই ছেলেটা হামলে পড়ল কান্তিবাবুর ওপর, ‘স্যার আমার নাম মদনমোহন জানা। বড়ো আশা নিয়ে অনেক দূর থেকে এসেছি, একটু যদি দেখতেন!”

“বাবা! এত্তদিন পরেও নামটা মনে রেখেছেন?” পিলু ফের ফুট কাটল।

আমি একটু ভয় পেয়ে গেলাম। এই বুঝি স্যার খাপ্পা হয়ে গল্প বলা না বন্ধ করে দেয়! তাই পিলুকে একটু ধমক দিয়েই বললাম, “কী হচ্ছে, পিলু? এমন একটা নাম একবার শুনলেই মনে থেকে যায়। আমি হলে আমারও ঠিক মনে থেকে যেত।”

গল্পের ফ্লো এসে যাওয়াতে স্যারের মুড ভালোই রয়েছে দেখছি। তাই রাগ না করে শিবুস্যার সহাস্যে বললেন, “শুধু তাই নয়, গল্পটা শেষ হলে তোরাও জানতে পারবি যে কেন ওই নামটা আমি ভুলিনি। যাক, তারপর শোন…” এই বলে স্যার ফের গল্পে ফিরে গেলেন।

“কান্তিবাবু বিরক্ত মুখে বললেন, ‘স্টুডিওতে অফিসে পোর্টফোলিও জমা দিন। যদি ফিট হয় তো নিশ্চয়ই জানাব।’

“ছেলেটি নাছোড়বান্দা, ‘স্যার ওখানে তো অনেকেই এমন জমা দিয়ে থাকে। তার ভিড়ে হারিয়ে যায় হয়তো। প্লিজ, একটু যদি কনসিডার করতেন…. আমি বর্ধমান থেকে এসেছি। অনেক থিয়েটার করেছি, প্রচুর সার্টিফিকেট…’

“আমি ছেলেটিকে বললাম, ‘তুমি স্টুডিওতে এস। রাস্তাঘাটে এসব কথা হয় নাকি?’

“ছেলেটি তবুও অনুনয় করে বলতে লাগল, ‘স্যার আমাকে মাত্র দশটা মিনিট দিন, আমি আপনাদের একটা ডেমো দেখাতে পারতুম…”

পিন্টু উসুখুসু করছিল কিছু একটা বলার জন্য। স্যার সেটা আন্দাজ করেই ওর দিকে চেয়ে বললেন, “ডেমো বলতে কোনও সিনেমার বা নাটকের খানিকটা অংশ অভিনয় করে দেখাবার কথা বলতে চাইছিল।”

পিন্টু বিজ্ঞের মতো যেন কত বুঝেছে এমনি ভাব করে বলল, “ও!”

স্যার আবার গল্পে ফিরে গেলেন, “ওকে আর কোনও কথা না বলতে দিয়ে আমরা গাড়িতে উঠে পড়লুম। কান্তিবাবু মন দিয়ে সকালের খবরের কাগজটা দেখতে দেখতে উচ্চারণ করলেন, ‘ডিসগাস্টিং!’

“হাওড়া স্টেশনে পৌঁছে আমরা নির্দিষ্ট প্লাটফর্ম থেকে চুঁচুঁড়ো যাবার জন্য ব্যান্ডেল লোকাল ট্রেনে উঠে পড়লুম। ট্রেনে বসার জায়গাও পেয়ে গেলুম। মিনিট পনেরো পর ট্রেন ছাড়ল। রোববারের সকাল বলেই বোধহয় কামরায় খুব একটা ভিড় নেই। আমরা মৃদু স্বরে ফিল্ম নিয়েই আলোচনা করছিলুম। খানিক পর বালি স্টেশন থেকে একটা ভিখিরি উঠে হেঁড়ে গলায় সিনেমার গান গেয়ে ভিক্ষা করতে লাগল। প্রচন্ড কর্কশ কন্ঠ। সুর-তাল-লয়ের মা-বাপ নেই। আমাদেরও আলোচনার সুর কেটে গেল। কান্তিবাবু বিরক্ত কন্ঠে বললেন, ‘এই হয়েছে এক জ্বালা। আর কিছু পেল না তো ভিক্ষে করতে নেমে পড়ল পথে!’

“গায়কটি চলে যাবার খানিক পরে গাড়ি শ্রীরামপুরে থামতে অতি নোংরা শতছিন্ন পোষাক পরা এক ভিখিরি উঠল ভিক্ষা করতে। মুখভর্তি দাড়িগোঁফ। মাথার চুল এলোমেলো। হাতে একটি পুরনো টুপি। সেটাকেই সবার দিকে বাড়িয়ে অতি বিচ্ছিরি আর ভুল উচ্চারণে ‘হেল্প মি, প্লিজ হেল্প মি’ বলে কিছু সাহায্য করার জন্য অনুরোধ করতে লাগল। অনেকেই দয়াপরবশ হয়ে ওর টুপিতে সিকিটা কি আধুলিটা রাখছিল। চেহারা দেখে আমারও ভারি মায়া হল। আমি পকেট থেকে একটা সিকি বের করে ভিক্ষে দিতে যাচ্ছিলুম, কিন্তু কান্তিবাবু আমাকে আলতো করে চিমটি কেটে ধীর স্বরে বললেন, ‘এইসব লোকগুলোকে আমি একদম পছন্দ করি না। চেয়ে দেখ, হাট্টাকাট্টা জওয়ান একটা লোক ভিক্ষে করছে! লজ্জাও করে না! ছিঃ!’

“ভিখিরিটি বোধহয় কান্তিবাবুর কথাটা শুনে ফেলেছিল। সে এগিয়ে এসে কান্তিবাবুর সামনে দাঁড়িয়ে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল। কান্তিবাবু বিব্রত বোধ করে বলে উঠলেন, ‘এসব কী হচ্ছে? কাঁদছ কেন?’

“সে বলতে লাগল, ‘বাবু, বিশ্বাস করুন, আমি ভিখিরি নই। আজ তিনমাস হয়ে গেল আমাদের চটকল বন্ধ হয়ে গেছে। কোনও দিকে কোনও রাস্তা দেখতে পাচ্ছি না। আত্মীয়স্বজন, সব জায়গায় হাত বাড়িয়েছি, কিন্তু সবাই মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। একটা কাজের খোঁজে কোথায় না কোথায় গেছি, কেউ কোনওরকম সাহায্য করল না। এদিকে কাল রাত থেকে মেয়েটার জ্বর, পেটে খাবার নেই। তাই বাধ্য হয়েই আমি এই পথে নামলুম। দেবেন, বাবু? একটা কাজ দেবেন? তাহলে তো আমাকে এই ভিক্ষেটা করতে হয় না।’

“কান্তিবাবু একটুক্ষণ চুপ করে থেকে পকেট থেকে মানিব্যাগটা বার করলেন। তারপর বেশ কয়েকটা নোট ওর টুপিতে দিলেন। এরপর নিজের একটা কার্ড ওর হাতে দিয়ে বললেন, ‘মেয়ে সুস্থ্ হয়ে উঠলে আমার সঙ্গে যোগাযোগ কোরো, হয়তো কোনও রাস্তা দেখাতেও পারি।’

“ভিখিরিটি হাউ হাউ করে কাঁদতে কাঁদতে কান্তিবাবুর পাদুটো জড়িয়ে ধরে বলতে লাগল, ‘আপনি ভগবান স্যার, আপনি ভগবান।’ প্রসন্ন হাসিতে কান্তিবাবুর মুখটা ভরে উঠল।

“ট্রেন থেকে নেমে কান্তিবাবু বললেন, ‘আমি শুধুমাত্র তাদেরই সাহায্য করি যাদের সত্যিকারের দরকার আছে আমার সাহায্যের। এই যে লোকটিকে কার্ড দিলুম, দেখো জীবনে ও অনেক উন্নতি করবে। ও কিন্তু ভিক্ষা করতে চায়নি। নেহাত পরিস্থিতির বশবর্তী হয়েই কাজটা করেছে। সৎভাবে বাঁচতে চাইছে। আমার একটু সাহায্য ওকে অনেক দূর নিয়ে যাবে, মিলিয়ে নিও।’

“তা কান্তিবাবু ভুল কিছু বলেননি। জীবনে অনেক উন্নতি করেছে মদন।” শিবুস্যার স্বগতোক্তির ভঙ্গিতে কথাটা বললেন।

“অ্যাঁ! কী বলছেন?” আমরা পাঁচজনেই প্রায় একই সঙ্গে উচ্চারণ করলুম কথাগুলো।

“হ্যাঁ, ওটা মদন ছিল। অভিনেতা মদনমোহন জানা।” স্যার হাতের কাছে পড়ে থাকা একটা পেনের উল্টোদিক দিয়ে কান চুলকাতে চুলকাতে বললেন, “জীবনে অনেক সিনেমা করেছে মদন। আজকাল তোরা তো বটেই তোদের বাপ-মাও সেকালে ওর ফিল্মের খুব ভক্ত ছিল। তিরিশ বছর ধরে পর্দা কাঁপিয়ে বেড়াচ্ছে! তবে ওকে প্রথম সুযোগ দেন কান্তিবাবুই। সেদিন সকালে কান্তিবাবুর বাড়ি থেকে খেদিয়ে দেবার পরও বেচারি হাল ছাড়েনি। ও একটা ডেমো দেখাতে চেয়েছিল, তাই আমাদের পিছুপিছু ট্যাক্সি করে হাওড়া স্টেশন চলে যায়। আমাদের অভিনয় করে দেখাবার জন্য সঙ্গে ভিখিরির বেশভূষা নিয়ে গিয়েছিল। ট্যাক্সিতে বসে সেসব ধড়াচুড়ো পরে নিয়ে কুলিদের রাস্তা দিয়ে স্টেশনে কায়দা করে ঢুকে পড়ে। তাড়াহুড়োয় প্রথমে অন্য একটা কামরায় উঠে পড়েছিল। শ্রীরামপুরে কামরা বদলে আমাদের কামরায় এসে ভিক্ষে করার অভিনয় করতে থাকে। ব্যস, বাকিটা তো ইতিহাস।”

আমি ভারি অবাক হয়ে বলি, “আপনি যে এই মদনমোহন জানার কথা বলছেন, কই আমি তো এই নামে কোনও অ্যাক্টরকে চিনি না!”

“আরে বাবা, এই নামের কোনও হিরোকে কি লোকে মন থেকে মেনে নেবে?” স্যার আমাদের অজ্ঞতায় যেন ভারি বিরক্ত হন, “ওকে তোরা চিনিস রূপকুমার নামে।”

“রূপকুমার!” আমরা আঁতকে উঠি, “আপনি, আপনি রূপকুমারের সঙ্গে কাজ করেছেন?”

“হুঁ হুঁ বাবা, বিশ্বাস হল নি তো?” শিবু স্যার মুচকি মুচকি হাসতে লাগলেন, “কান্তিবাবুই ওকে প্রথম সুযোগ দেন।”

“কিন্তু এই গল্পটা তো রূপকুমার কোনওদিন কোনও ইন্টারভিউতে বলেননি! আর রূপকুমারের নাম যে মদনমোহন জানা, এটাও তো প্রথমবার শুনলাম!” ডাকু আমাদের সবার হয়েই যেন প্রশ্নটা করে।

“নামডাক হয়ে যাবার পর সব্বাই এসব কথা ভুলেই যায়।” স্যার নির্বিকারভাবে কান চুলকোতে চুলকোতে বলেন, “কান্তিবাবুকেই বা কতজন মনে রেখেছেন বল? রূপকুমারকে নিয়ে প্রথম ছবি করার পরই উনি রিটায়ার করে নেন। আমিও ফিলিমের দুনিয়াকে টাটা বাই বাই করে চলে যাই অন্যদিকে। সে আর এক গপ্পো।”

আমি জিজ্ঞেস করি, “তা আপনি ফিল্ম লাইন ছেড়ে দিলেন কেন? বেশ তো লিখছিলেন স্ক্রিপ্ট।”

“না রে, ভাই,” স্যার বলেন, “খুব গোলমেলে লাইন, বাপু। আমার পোষাল না। তাছাড়া কান্তিবাবুর মতো ভালোবাসা কারও কাছে পাইনি যে।”

এই বলে স্যার চৌকি থেকে নিচে নেমে দেয়ালে ঝোলা চাবিটা দিয়ে তাঁর সেই বিখ্যাত তোরঙ্গটা খুলতে লাগলেন। আমরা গোল গোল চোখ করে তাকিয়ে রইলুম কী রাজৈশ্বর্য্য বেরিয়ে আসে তার জন্য। আমরা জানতুম, স্যার নির্ঘাত গল্পের শেষে একটা কিছু নমুনা পেশ করবেন আমাদের কাছে।

অল্পক্ষণের মধ্যেই স্যার তোরঙ্গ থেকে বের করে নিয়ে এলেন একটা জটাজুট দাড়ি। আমাদের জিজ্ঞাসু দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে স্যার বললেন, “এটা সেই মদনমোহন জানা ওরফে রূপকুমারের দাড়ি, যেটা পরে ট্রেনে ও আমাদের ভিখিরির অভিনয় করে ধোঁকা দিয়েছিল।”

আমরা সবাই হইহই করে সেটা টানাটানি করে দেখতে লাগলুম। আমি আরও কিছু জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিলুম, এমন সময় কিকিদিদি আর একপ্রস্থ চা নিয়ে ঢুকল। টেবিলে চায়ের ট্রেটা রাখতে গিয়ে কিকিদিদি যেন থমকে দাঁড়িয়ে গেল। তারপর আমাদের হাত থেকে দাড়িটা টেনে নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে বলল, “গেলবার রামায়ণ পালার পর বাল্মীকির যে দাড়িটা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না, এটা মনে হচ্ছে…”

আমরা ভারি অবাক হয়ে স্যারের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালুম।

স্যার ঠোঁটে আঙুল ঠেকিয়ে বললেন, “আর প্রশ্ন নয়। চা এসে গেছে, এবার আমি চা খেয়ে নাইতে যাব। আজ আবার খাসির মাংস রান্না হয়েছে। চটপট না খেলে সব ঠান্ডা জল হয়ে যাবে। চল বাবা-সকল, এবার নিজের নিজের ঘরকে চল।”

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত