উড়ান

উড়ান

“হরিণ! হরিণ,” আচমকা চিৎকার করে সামনের সিটে হুমড়ি খেয়ে পড়ল ঋক।

রাজু পাকা ড্রাইভার।পাহাড়ে গাড়ি চালানোর জন্য যে বিশেষ সতর্ক থাকতে হয়, যে কোনো আচমকা বিপদে যে মাথা স্থির রাখতে হয় সে বিষয়ে পূর্ণ সচেতন।তবু তারও হাত কেঁপে গেল সামান্য। নিপুণ হাতে তাল সামলে ধমকে উঠল, “ও কী করছ খোকাবাবু? আ্যক্সিডেন্ট হয়ে যেত একটু হলে।”

এন. জে.পি স্টেশন থেকে যখন জিপে উঠছিল তখনই রাজুর সংগে ধুন্ধুমার হয়ে গিয়েছিল ঋকের। কারণটা আর কিছু না। রাজু ঋককে খোকাবাবু বলে ডেকেছিল।

“খোকাবাবু? আমি? কভি নেহি।” ক্লাস সিক্সে পড়া ঋক গর্জন করে উঠেছিল।

বচসা অনেকদূর গড়াতে পারত। তবে তার আগেই ঋকের বাবা মনোময় এক প্যাকেট চিপস কিনে ঋকের হাতে দিয়ে টেনেটুনে জিপে তুলে দিয়েছিল। চিপস মুখে নিয়ে তো আর ঝগড়া করা যায় না। জিপের জানালার পাশে বসেও না। ফলে ঝগড়া মুলতুবি রেখেছিল ঋক।

কিন্তু এখন রাজুর খোকাবাবু সম্বোধন ভালো করে কানেই ঢোকে নি ঋকের। এতটাই উত্তেজিত হয়ে রয়েছে সে। আবারও চিৎকার করল, “হরিণ। দেখলে তোমরা? ইশ। ছবি তোলা হল না। কখন থেকে বলছি বাবা, তোমার মোবাইলটা আমার হাতে দাও। তুমি শুনছই না। ও কী? তোমরা সবাই হাসছ কেন?”

সামনের সিটে বাবা কৌশিকের কোল ঘেষে বসেছিল পাঁচ বছরের তিতলি। ও বলে বসল, “হরিণ না গো ঋকদাদা, ওটা তো ছাগল। ধ্যাত।তুমি না—”

আবারও হাসির তুফান উঠল চারদিকে। মরীয়ার মত বলে উঠল ঋক, “কক্ষনো না। আমি হরিণ আর ছাগলের ফারাক বুঝি না নাকি? ছাগল নাকি আমি? ছাগল কখনো অত বড় হয়? অত বড় শিং থাকে? যত্তসব।”

একটু কেশে গলা পরিষ্কার করে মনোময় বললেন, বলছিলাম কি ঋক,ওটা কিন্তু ছাগলই। পাহাড়ি ছাগল। আকারে একটু বড়। শিংটাও বাহারি। না না, তাই বলে তোকে কিন্তু আমরা ওই প্রাণীটা মানে ইয়েটা ভাবছি না। তুই নিজেই বললি যদিও।”

মা কস্তুরী হাত বাড়িয়ে ঋকের চুলে আদর দেন, “ঘুমিয়ে পড়েছিলি তুই?”

“না। ঠিক ঘুম না। চোখটা একটু লেগে গিয়েছিল।” ঋক লজ্জিত মুখে বলে।

“সেইজন্যই। চটকা ভাঙতেই ছাগল দেখে হরিণ ভেবেছিস।”

ও পাশ থেকে মীনা কাকিমা বলেন, “তাই বলে ছাগলকে হরিণ? কোথায় হরিণের সোনালী গা, আর কোথায় ছাগলের মিশকালো শরীর! তোর কল্পনাশক্তি আছে বটে ঋক!”

জানালার বাইরে দৃষ্টি ছড়ায় ঋক। রাগ হয় নিজের ওপর। ছাগলকে হরিণ ভাবার বোকামি করেছে বলে শুধু নয়, কেমন করে ঘুমিয়ে পড়ল সেই কথা ভেবেও। চারপাশে প্রকৃতি আর অপরূপ সৌন্দর্য মেলে বসে আছে। সবুজ পাহাড়।এ কটা করে বাঁক ঘুরছে জিপটা,আর সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্য বদলাচ্ছে। কোথাও পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসছে ঝর্না। কোথাও পাহাড়ের ঢালে অজস্র রংচঙা ফুল ফুটিয়ে হাসছে বুনোলতা। আবার কোথাও দিনের বেলাতেই ছায়া ঘনিয়েছে গাছপালার ঘনতার কারণে। সবই কী রোমাঞ্চকর!

তার ওপর তিস্তা নদী তো আছেই! নাচতে নাচতে লাফাতে লাফাতে যেন ঋকদের সংগেই চলেছে। অদ্ভুত সবজেটে জল। তীব্র স্রোত। নদীর এমন রঙ, পাহাড়ের এমন রূপ, ঝরনার এমন আওয়াজ আগে কখনো দেখেনি শোনেনি ঋক। সব মনের মধ্যে রেখে দিতে হবে। ফিরে গিয়ে গল্প বলতে হবে বন্ধুদের। বন্ধুরা ওকে গোয়া, শিমলা, আন্দামান, মন্দারমনির কম গল্প তো শোনায়নি! এতদিন শুধু চুপ করে শুনেই গিয়েছে ঋক। এবার ওর শোনানোর পালা। ওর কালিম্পং ভ্রমণের গল্প। যাতে কোনো গল্প বাদ না পড়ে যায় সেজন্য একটা ডায়েরি এনেছে ঋক। লিখে লিখে রাখবে সব জায়গার নাম। জানালায় থুৎনি নামিয়ে রেখে নিবিষ্ট হয়ে বাইরের দৃশ্য দেখে ঋক।

ভিতরে আবার গল্প শুরু হয়ে গিয়েছে বড়দের মধ্যে। ঋকের বাবা মনোময়, মা কস্তুরী, বাবার বন্ধু কৌশিককাকু, মীনা কাকিমা আর কাকুর মেতে তিতলি। এই ছয়জনের টিম বানিয়ে ঘুরতে আসা হয়েছে। অবশ্য সাড়ে পাঁচও বলা যায়। পাঁচ বছরের তিতলিকে তো গোটা মানুষ বলা যায় না! যদিও গলার জোরে একাই দেড় মানুষ বরাবর। আর দুষ্টুমিতে পুরো এক ডজন মানুষের বরাবর। এই ঋককে চিমটি কেটে দৌঁড়াল। এই ঋকের জুতো লুকিয়ে রাখল। এইসবই চলছে। তবে ঋক রাগ করছে না। এতদিন পর বেড়াতে আসা হল! মন এত ফুরফুরে হয়ে আছে যে রাগ করার কথা ভাবতেই পারছে না।

সত্যি বহুদিন পর বেরোনো হল। সেই কোন ছোট্টবেলায় বাবা মায়ের সঙ্গে কন্যাকুমারীকা গিয়েছিল। আবছা আবছা মনে পড়ে সমুদ্রের ঢেউ ফেনা আর শঙ্খ কিনতে মায়ের দরকষাকষি। ব্যাস। তারপর সব ছুটি তো বাড়িতে বসেই কেটেছে। পচা কলকাতায়। গরমের ছুটিতে গরমে ঝলসাও। পূজার ছুটিতে ভিড়ে হিমসিম খাও। আর পরীক্ষার পরের ছুটি? তখন তো শুনতে হবে, সারাদিন খেলে আর টিভি দেখে নষ্ট না করে একটু ডিকশনারিটা তো ঘাঁটতে পারো ঋক! স্টক অফ ওয়ার্ড বাড়বে। দূর দূর। জীবনটাই হেল হয়ে গেল।

এই কথাটাই বলা শুরু করেছিল ইদানিং বাড়িতে। যদিও জানত লাভ নেই। ঘুরতে যাওয়ার পরিস্থিতি ওদের বাড়িতে নেই। ঠাকুরদা প্যারালাইজড হয়ে বিছানায় ছিলেন বহুদিন। বাড়িটাই হাসপাতাল হয়ে উঠেছিল। ওই অবস্থায় কেউ যে ঘুরতে যায় না তা ছোট হলেও জানে ঋক।

তারপর ঠাকুরদা তো একদিন আকাশের তারা হয়ে গেলেন। ঠাম্মি ঘর থেকে বেরোতেই চান না। আর ঠাম্মিকে একা ঘরে রেখে তো ঘুরতে যাওয়ার প্রশ্নই নেই। বোঝে ঋক। অবুঝ বায়নাদার ছেলে তো সে নয়। তবু মন তো খারাপ হয়! বিশেষ করে বন্ধুরা যখন ঘুরতে যাওয়ার ছবি দেখায়, গল্প বলে, স্যুভেনির উপহার দেয়, মন মেঘলা হয়।

একদিন বন্ধুদের থেকে উপহার পাওয়া সব স্যুভেনির, শঙ্খের পেনস্ট্যান্ড, চাবির রিং, কড়ির পুতুল সব বের করে মাকে গিয়ে বলেছিল, “এগুলো নিতে আমার লজ্জা করে। আমি তো কাউকে কিছু দিতে পারি না।”

এক পলক তাকিয়েই মা আবার রান্নায় মন দিয়েছিলেন। কিছুই বলেননি।

দুদিন পর মা নিজে থেকেই ডেকে বলেছিলেন, “আমরা ঘুরতে যাচ্ছি। চারদিনের জন্য।কোথায় যাচ্ছি বল তো?”

কোথায় যাওয়া হচ্ছে এ নিয়ে মাথা ঘামায় নি ঋক। যাওয়া হচ্ছে এতেই আহ্লাদে আটখানা হয়ে গিয়েছিল। বরং কবে যাচ্ছি কবে যাচ্ছি করে করে মায়ের মাথা খারাপ করে দিয়েছিল।

জেনেছিল যাওয়া হবে কালিম্পং। তার পাশের ডেলো পাহাড়, লাভা লোলেগাঁও, রিশপ। লোলেগাঁওতে থাকা হবে একরাত। সব মিলিয়ে চারদিনের ট্যুর। ঋকের ছোটপিসি এসে এ কয়েকদিন ঠাম্মির কাছে থাকবেন। তাইনা যাওয়া হচ্ছে! শুনে ঋকের তো ইচ্ছে হচ্ছিল ছোটপিসিকে জড়িয়ে ধরে আদর করে দেয়।

সেই বড় সাধের ট্যুর এটা। ঋক জানালা দিয়ে মাথা বের করে পাহাড় অরণ্যের গন্ধ মাখে। আর জিপটা পাহাড়ি পথে পাক খেতে খেতে, আকাশের নীল আর বনের সবুজ মাখতে মাখতে এক সময় পৌঁছে যায় কালিম্পং।

ফুলে ফুলে আলো হয়ে আছে ডেলোর উপত্যকা।চারদিক যেন ছবির মত সাজানো,গোছানো। আকাশ এত নীল,বাতাস এত শুদ্ধ!কলকাতায় কোনদিন বোঝেনি তো ঋক! বাবা বললেন, “অনেক ওপরে উঠে এসেছি যে! এখানে দূষণ নেই। তাই সব এত ঝলমলে উজ্জ্বল।”

আর সেই উজ্জ্বল ফুলের ওপরে ঘুরে বেড়াচ্ছে ঝলমলে ডানার প্রজাপতি। তিতলির কী খেয়াল হল! ছুটল প্রজাপতি ধরতে। একটা প্রজাপতি দেখে। ছুটে যায় ধরতে। প্রজাপতি কি আর অত বোকা? ডানা ঝাপটে উড়ে পালায়। খিলখিল করে হাসে তিতলি। প্রজাপতির সংগে বুদ্ধির লড়াইতে হেরে গিয়েও হাসে। সেই হাসির ঝলমলানিতে চারপাশ আরো আলো হয়ে যায়।

ঋক বলে, “তিতলিকেও প্রজাপতির মত দেখাচ্ছে।”

ও পাশ থেকে কস্তুরী বলে উঠলেন, “তিতলি মানে তো প্রজাপতিই। জানতি না?”

“হুঁ,” মাথা নাড়ল ঋক, “আমার বয়স একটু কম হলে আমিও তিতলির মত প্রজাপতি ধরা প্রজাপতি ধরা খেলা করতাম।”

কস্তুরী আর মীনা খুব জোরে হাসলেন, “বয়স কম হলে মানে কী? ও ঋক? তুই কি বুড়ো হয়ে গিয়েছিস নাকি?”

“না। বুড়ো হব কেন? বড় হয়েছি। বলতে বলতে দু’পকেটে দু’হাত ঢুকিয়ে ঋক হাঁটে এগিয়ে যাওয়া বাবা আর কৌশিককাকুর দিকে।

কস্তুরী বলেন, ঘুরতে এসে ঋক কিন্তু বেশ খোশমেজাজে আছে। হবেই তো। আজকালকার বাচ্চার এত একা। স্কুলটুকুই যা বন্ধু পায়। ঘরে এসে সেই তো একা। কাঁহাতক আর টিভি দেখে সময় কাটাবে?

“ঠিক বলেছ। সায় দেন মীনা, “আমরা কত ভাইবোন একসঙ্গে বড় হয়েছি! পাড়াতেও কত বন্ধু ছিল! বিকেলে দল বেঁধে হইহই। হুল্লোড়। খেলা।”

অবাক চোখে তাকায় ঋক। বড়রা বোঝেন! এত বোঝেন! আর ঋক ভাবত, বড়রা বোঝেনই না! ঋকের একা একা লাগে। স্কুলের সময়টা বাদ দিলে আর তো একটাও বন্ধু নেই ঋকের। ঋকদের পাড়ায় ঋকের সমবয়সী একটা বাচ্চাও নেই। লম্বা ছুটিগুলো দমবন্ধ হয়ে আসে ঋকের। সেইজন্যই তো একটা পুষ্যি আনতে চেয়েছিল। কুকুর। বিড়াল। পাখি। যা হোক।

মা বললেন, “কুকুরের অনেক হ্যাপা।”

ঠাম্মি বললেন, “বিড়াল খুব ঘর নোংরা করে, মাগো!”

আর পাখি? বাবা বলে দিলেন, “খাঁচায় পাখি পোষা নিষ্ঠুরতা। মুক্ত আকাশেই পাখির অধিকার।”

আরে বাহ। একটা বাচ্চার অধিকার তবে কী? শুধু সব কিছুতে না না শোনা?

তবে হাল ছেড়ে দেওয়ার পাত্র তো ঋক নয়। পাখি জোগাড় করেছে ঠিকই। টিয়া পাখি। খাঁচাসুদ্ধ। রৌনক। ওর ক্লাসেই পড়ে। ওদের বাড়িতে এক পাখিওয়ালা পাখি দিয়ে যায়। লুকিয়ে। খাঁচায় পাখি পোষা আইনত নিষিদ্ধ কিনা! ওদের বাড়ির লোক লুকিয়েই পোষে। রৌনকই জোগাড় করে দিয়েছে। জন্মদিনে উপহার পাওয়া টাকা থেকে দাম মিটিয়েছে ঋক। অনেক কান্ড করে লুকিয়ে ঘরে ঢুকিয়েছে সেদিন পাখির খাঁচা।

ঋকদের বাড়িতে পিছন দিকে মানে বাগানের দিকে একটা সিঁড়ি আছে যেটা দিয়ে ছাদে উঠে যাওয়া যায় সরাসরি। ছাদের ওপরেও আছে ছোট ছাদ। চিলেকোঠার ওপর আরেকটা ঘর। হান্ডুলপান্ডুল দিয়ে ভর্তি। কেউ বিশেষ যায় না ও ঘরে। সেখানেই রেখেছে। রোজ সকালে ছাদে ব্যায়াম করতে যাচ্ছি বলে ছাদে উঠে পাখিকে জল দেয়। ছোলা দেয়। বিকেলে মায়ের রান্নাঘর থেকে লুকিয়ে আনে ভাত। বকবক করে। নাহলে পাখি কথা শিখবে না জানে। যদি ও দু’মাস হয়ে গেল। পাখি শুধুই ট্যাঁ ট্যাঁ করে। তবু আশা ছাড়ে না ঋক। রোজই ঋক খাঁচার কাছে গিয়ে বলে, “বল পান্না,গুড মন্নিং।” পান্না শুধুই ঘাড় ঘোরায় আর একফালি জানালা দিয়ে একটুকরো আকাশ দেখে।

মনোময় ডাকেন, “এদিকে আয়। দেখ,কী সুন্দর উড়ছে মানুষ।”

মানুষ উড়ছে? দৌড়ে যায় ঋক। দেখে প্যারা গ্লাইডিং করছে লোকে। কী সুন্দর প্যারাশুটের মত কী একটা করে আকাশে ভেসে পড়ল একজন। পিছনে দাঁড়িয়ে রইল গাইড। সুতো টেনে আর ছেড়ে হাওয়ার দিক অনুযায়ী ভাসিয়ে দেবে বলে।

“আমিও। আমিও,” ঋক লাফাতে শুরু করল। কস্তুরী চোখ পাকিয়ে তাকাচ্ছেন। কিন্তু দেখবে না ঋক। প্যারা গ্লাইডিং না করলে জীবনই বৃথা। বন্ধুদের শোনানোর মত একটা অভিজ্ঞতা হবে বটে। এর আগে বন্ধুদের কেউ আকাশে ভাসেনি।

এমন সময় মনোময়ের পকেটে রাখা সেলফোনটা শব্দ করে বেজে উঠল। মনোময়ের কথা শুনে বুঝতে পারল, ছোটপিসি ফোন করেছেন। মনোময় তারপর ফোনটা ঋকের হাতে দিয়ে, “পিসির সঙ্গে কথা বল,” বলে একটু ওদিকে সরে গেলেন। ইশারা করে যে কস্তুরীকেও ডেকে নিলেন তা নজর এড়াল না ঋকের। তার মানে এখন ঋকের আবদার নিয়ে দুজনের আলোচনা চলবে। ভালোই হয়েছে। এই ফাঁকে পিসির সঙ্গে দরকারি গোপনীয় কথাটা সেরে নিতে পারবে ঋক।

“ হ্যাঁ পিসি।পান্নাকে খেতে দিয়েছ ঠিকঠাক?”

“দিয়েছি রে বাপু দিয়েছি। একী অনাসৃষ্টি কান্ড রে বাপু? গুরুজনদের লুকিয়ে পাখি পোষা?”

“তোমাকে তো বলেছি। তুমি কি গুরুজন না নাকি? একজনকে বললেই তো হল!”

“আমাকে তো বলেছিস ঠেলায় পড়ে। না হলে এই ক’দিন তোর টিয়াকে ভাত জল দিত কে? কিন্তু দাদা বৌদি জানতে পারলে তোর পিঠে স্কেল ভাঙবে।”

“দূর! কেমন করে জানবে? ছাদে ওঠে নাকি কেউ? শুধু আমি উঠি। আর মিন্তিমাসি কাপড় মেলতে আর তুলতে আসে। মিন্তিমাসি কানে কম শোনে। পান্না ডাকলে বুঝবেও না। আর মা? পান্না ডাকলে ভাবেন, বাগানের গাছে টিয়া এসেছে। পান্না ছোলা খেয়েছে?”

“শুধু কি ছোলা? লংকা দিলাম। তাও কুটকুট করে খেল। তবু কাজটা তুই ভালো করছিস না।”

ঋক দেখল বাবা আসছেন এদিকে। তাই, “ঠিক আছে পিসি, পরে কথা হবে,” বলে ফোন কেটে দিল।

মনোময় বললেন, “রিস্ক কিন্তু আছে। বায়না করার আগে ভেবে দেখ।”

একুশ বাইশ বছরের একটা নেপালি ছেলে এগিয়ে এল, “রিস্ক তো সব কিছুতেই আছে স্যার। লিটিল মাস্টার যখন সাইকেল নিয়ে রাস্তায় বেরোয়, তখনও তো রিস্ক থাকে। আমি সাত বছর ধরে কাজ করছি। কোনো আ্যক্সিডেন্ট হয় নাই। আমার নাম সুরেশ। আমিই নিয়ে যাব লিটল মাস্টারকে। আমার রিস্কে।”

প্রথমটায় ভয় পেয়েছিল একটু ঋক।তারপরেই দারুণ এক শিহরণ। অনাবিল আনন্দে যেতে একটু সময় লাগল। কত নিচে ঘরবাড়ি, গাছপালা, আঁকাবাঁকা রাস্তা! ঘরগুলোকে তো দেশলাই বাক্সের মত দেখাচ্ছে। এইটুকুন এইটুকুন। কত উপরে চলে এসেছে ওরা! কেমন সুন্দর ভেসে যাচ্ছে। ঠান্ডা বাতাস লাগছে চোখেমুখে। মেঘগুলোকে ছুঁয়ে ফেলতে পারবে নাকি? ওই যে চিলদুটো উড়ছে,ওদের? ঘাড় না ঘুরিয়েই সুরেশকে বলল, “আরো একটু উঁচুতে যাবে? চিলগুলোর কাছে?”

সুরেশ বলল, “চিড়িয়া তো আকাশের জীব আছে। ওদের মত উড়তে মানুষ থোড়াই পারে।”

আকাশ আরো তীব্র নীল। চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছিল ঋকের। চোখের কোন জ্বালা করছিল। দু’ফোঁটা জল গড়িয়ে নামল চোখ বেয়ে। পড়ল সুরেশের সুতো ধরা হাতে। সুরেশ চমকে বলল, “ভয় পাচ্ছ? ফিরব?”

মাথা নাড়ল ঋক। না। ভয় নয়।

“না ফিরতে হবে না।”

কেমন করে বোঝাবে ওর এই মূহুর্তে পান্নার জন্য মন খারাপ করছে। দু’মাস পান্নার উড়ান বন্ধ করে রেখেছে খাঁচায় পুরে রেখে। দুমাস আকাশের জীবকে আকাশ থেকে বঞ্চিত রেখেছে। কলকাতা ফিরেই খাঁচার দরজা খুলে উড়তে দেবে ওকে। আহা। উড়তে এত সুখ!

একটা সিদ্ধান্তই হালকা করে দিল ঋকের মন। ইয়াহুউ বলে চিৎকার করে আবার ভেসে গেল আনন্দে। পিছন থেকে মুচকি হাসল সুরেশ, এই লিটিল মাস্টারের মাথায় পোকা আছে নাকি? এই কাঁদে। এই হাসে।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত