আফিম-রোমান্টিক গল্প

আফিম-রোমান্টিক গল্প

সকালের কুয়াশা ভেজা চাদর গায়ে মুড়িয়ে পূর্ব দিগন্তে ফুটে উঠলো এক টুকরো সোনালী আভা। সেই তেজস্ক্রিয় আভা পুরো ধরণীকে তার রঙে রাঙিয়ে তুললো। এক টুকরো রোদ নিজের ঝলকানি ফুটিয়ে মূহুর্তেই একটা রাতের অন্ধকারকে কাটিয়ে তুলে, নিজের আধিপত্য বিস্তার করতে লাগলো অনায়াসে।এই আধিপত্য আবারও চলবে বারো ঘণ্টা অব্দি। তারপর স্ব স্ব নিয়মে আবারও আগমন ঘটবে তিমিরের। সকালেবেলা পাখিদের মিষ্টি মধুর কলরবে চারদিকে গুঞ্জন হতে শুরু করলো। ফাল্গুনের এই সকালটা যেন,আজ নিজের রুপের ডালি নিয়ে বসেছে প্রকৃতিকে সাদরে বরণ করতে। কিন্তু তখনও অচৈতন্য হয়ে বসে আছে স্নিগ্ধা!আজ যেন প্রকৃতির এই রুপ-যৌবন তাকে আকৃষ্ট করে উঠতে পারেনি!

গাছের পাতা ভেদ করে এক খণ্ড রোদ এসে পরছে স্নিগ্ধার মুখে।তবুও কোনো ভাবান্তর নেই তার মধ্যে। থাকবেই বা কী করে? সে তো গভীর চিন্তাতে মগ্ন।সকালের মিষ্টি রোদ পৃথিবীর বুকে উঁকি দিতেই,সে এসে ব্যলকনিতে বসলো,হাতে এক কাপ কফি নিয়ে। রকিং চেয়ারে দুলছে অন্যমনস্কভাবে। আজ যেন সে শূন্যে ভাসছে।মাথার চুলগুলো খুব বেশিই এলোমেলো হয়ে পুরো পিঠ জুড়ে এলিয়ে রয়েছে।পরনের শাড়ির আঁচলটা, দোলনীর তালে তালে ফ্লোরে গড়াগড়ি খাচ্ছে। উষ্ণ ঠোঁট জোড়া ক্ষণিক বাদে বাদেই কফির মগে ডুবাচ্ছে।আর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আকাশ পানে!হয়তো কোনো হিসাব কষছে চোখের ঈশারায় আকাশের সঙ্গে।যার উত্তর আধেও মিলবে কিনা বলা বাহুল্য!

স্নিগ্ধা আর দিহান স্বামী-স্ত্রী।পারিবারিকভাবেই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে দু’জন। স্নিগ্ধার বাবা একজন কৃষক। স্নিগ্ধা ওর বাবার বড় মেয়ে। এছাড়াও স্নিগ্ধার আরও দুইটা ছোট বোন আছে। মিহাদের বাবা-মা বলতে কেউই নেই। একটা এক্সিডেন্টে বাবা-মা দু’জনকেই হারিয়ে ফেলেছে সে। বড় পরিবার থেকে বিয়ের সম্বন্ধ আসায় আর না করতে পারলেন না স্নিগ্ধার বাবা। এছাড়া মিহাদ ছেলে হিসেবেও যথেষ্ট ভাল।খোঁজ নিয়ে দেখেছিলেন স্নিগ্ধার বাবা। সব জেনেশুনেই বড় ঘরে মেয়ের বিয়ে দিলেন।ভালই চল ছিল সব কিছু। স্নিগ্ধার সংসারে সুখের কোনো কমতিই ছিল না। কিন্তু ইদানিং খুব বেশিই বদলে যাচ্ছে দিহান।বেশ রাত করে অফিস থেকে ফিরছে। স্নিগ্ধাকে সময় দেয় না বললেই চলে। এ নিয়ে স্নিগ্ধার খুব অভিমান স্বামীর ওপর।প্রথম প্রথম স্নিগ্ধা এ নিয়ে দিহানকে কিছু জিজ্ঞেস করলেই বলতো… “অফিসে খুব কাজের চাপ তাই সময় দিতে পারছে না।”

কিন্তু দিহানের এমন কথায় কিছুতেই মন সায় দিচ্ছিলো না স্নিগ্ধার। এক পর্যায়ে এমন চলতে চলতে স্নিগ্ধার অভিমান ক্রমেই রাগে পরিনত হলো। গতকাল এ নিয়ে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে চরম ঝগড়া বাধে দু’জনের মধ্যে। দিহান যা নয় তাই বলেই অনেক কথা শুনিয়ে দেয় স্নিগ্ধাকে। তারপর রাগ করে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যায়। স্নিগ্ধাও ভেবে ছিল এ বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে। আর আসবে না কখনো। কিন্তু তার বাবার মাথার ওপর আরও দুইটা বোন রয়েছে।যাদের এখনও কোনো গতি হয়নি। এখন যদি স্নিগ্ধাও বাবার ঘাড়ে গিয়ে ওঠে তাহলে,ওর বাবা সংসার চালাতে হিমশিম খাবে। আর সব শুনলে খুব কষ্ট পাবে। এমনিতেই স্নিগ্ধা সেই ছোটবেলা থেকেই দেখেছে ওর বাবাকে। মা মরা তিনটা মেয়েকে নিয়ে কত কষ্টই না করে সাংসারটা টেনেটুনে নিয়ে এসেছে। তাই এখন আর বাবাকে নতুন করে কষ্ট দিতে মনও সায় দিচ্ছে না। বি বি এ কমপ্লিট করার পর আর পড়া হয়নি। চেয়ে ছিল একটা জব করবে, কিন্তু কিছুতেই চাকরি করতে দিলো না দিহান।যদি এখন একটা চাকরি করতো,তাহলে আজ হয়তো এভাবে কথা শুনতে হতো না। বাবার কষ্ট হবে ভেবে বছর খানেক হয়ে গেল বাবার বাসায় বেড়াতেও যাওয়া হয় না। ছোট্ট একটা ঘরে মাথা গুঁজে পরে থাকে তিনটা মানুষ! যখনই খুব দেখতে ইচ্ছে করে তখনই স্নিগ্ধা ওর বাবা আর বোন দু’টোকে নিজের বাড়িতে ডেকে আনে। আর আজ সেই বাড়িটাই বড্ড পর হয়ে গেল তার।নিজের বলতে কিছুই রইলো না!

এসব ভাবতে ভাবতেই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। রোদটার ঝাঁজ খুব লাগছে,আর সহ্য করা যাচ্ছে না। কাল রাতে খুব ভয়ে ভয়ে কাটিয়েছে। সারারাত ভয়ে একটুখানি হয়ে ছিল। আজ আর এত বড় বাড়িতে একা থাকা সম্ভব না। যার বাড়ি সেই যদি না থাকে তবে ও কোন অধিকারে থাকবে!এসব ভেবেই আলমারি থেকে নিজের কাপড়গুলো নিয়ে,গোছাতে লাগলো।

তখনই বাসার কলিংবেলটা বেজে উঠলো।সহাসাই বুকটা ধক করে উঠলো স্নিগ্ধার! এত সাকলবেলা কে আসলো ভেবে পাচ্ছে না।যদি অন্য কেউ হয়? এখন এমনিতেই পেপার-পত্রিকায় কত ভয়ানক কিছু দেখা যাচ্ছে। বাড়ি বউকে একা পেয়ে ধর্ষণ,গুম,হত্যা,ছিনতাই,ডাকাতি আরও কত রকম ক্রাইম। আস্তে আস্তে পা ফেলে সদর দরজার দিকে এগিয়ে চললো স্নিগ্ধা। মনের মধ্যে এসে ভিড় জমিয়েছে একরাশ ভয়। তবুও হেঁটে চলেছে সামনের দিকে। কোনভাবেই বুঝতে পারছে না দরজার ওপারে কে আছে!তবুও কিচ্ছু করার নেই।একের পর এক কলিংবেল বেজেই যাচ্ছে। স্নিগ্ধা লম্বা একটা শ্বাস ফেলে দরজাটা খুললো।সঙ্গে সঙ্গে শত শত গোলাপের পাপড়ি পরলো তার মাথার ওপর।ভয়ে চোখ দু’টো বন্ধ করে ফেললো স্নিগ্ধা।আর তখনই কয়েকটা কণ্ঠ একত্রে কানে এসে বাজতে শুরু করলো,
“হ্যাপী বার্থ ডে স্নিগ্ধা”!
আস্তে আস্তে চোখের পাতা মেলে তাকালো সামনের মানুষগুলোকে দেখার জন্য। চোখ মেলতেই খুশিতে চোখ জোড়া ঝলকাতে লাগলো। তার সামনে তার বাবা আর বোন দু’টোতে দাঁড়িয়ে আছে।মুহূর্তেই বাবার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লো। কিন্তু ক্ষণিক বাদেই ঠোঁটের কোণ লেগে থাকা হাসির রেশটুকু মিলিয়ে গেল। চোখ জোড়া হন্যে হয়ে কাউকে খুঁজতে লাগলো। সহসাই সেই চোখ জোড়ার সাথে নিজের চোখের মিলন ঘটলো স্নিগ্ধার! ঠোঁটের কোণের মিলিয়ে যাওয়া হাসি,পুনরায় এসে ভিড় জমালো ঠোঁট জোড়াতে। সবাই মিলে বেশ হৈ – হুল্লোড় করে কেক কাটলো।রাতে খাওয়া-দাওয়া শেষে স্নিগ্ধার বাবা আর বোনেরা চলে গেল। অনেক করে থাকতে বললেও কেউই থাকলো না। সবাই চলে যেতেই স্নিগ্ধা এসে নিজের রুমে খিল দিলো। সকালে যেই রাগটা মনের মধ্যে পুষে রেখে ছিলো “ওই কথা গুলো শুনেই সব রাগ গলে জল হয়ে গেল।”তবে সেটা অভিমানে রুপ নিলো!
– স্নিগ্ধা দরজাটা খোল।”
স্নিগ্ধা দরজায় ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
– খুলবো না।”
– প্লিজ…বউ!ভুল হয়ে গেছে আমার…স্যরি।”
– কান ধরো আগে, তবেই মাফ পাবে।”
– তাহলে দরজা খুলবে তো?”
– হুম।”
বলছে আর মিটিমিটি হাসছে।
সত্যি সত্যিই দিহান কান ধরে উঠবস করতে লাগলো। আর জোরে জোরে গুনতে লাগলো।স্নিগ্ধা আর বেশিক্ষণ অভিমান করতে পারলো না। দরজা খুলেই এসে মুখ লুকালো দিহানের বুকে। আর্দ্র কণ্ঠে বলতে লাগলো,
– এত পাগল কেন তুমি?”
– কেন…জানো না তুমি?আমি আমার আফিমের নেশায় পাগল!”
– তুমি তো বললেই পারতে যে, তুমি আমাদের বাড়ি তৈরী করছো।তাই আমাকে খুব একটা সময় দিতে পারছো না।অফিস শেষে আমাদের বাড়িতে যাচ্ছো।তাই বাসায় আসতে এত লেট হচ্ছে।এইটুকুনি কথা বললে কী এমন হতো?তখন তো আর আমি তোমাকে ভুল বুঝতাম না।”
– আমি তো চেয়েছিলাম তোমাকে সারপ্রাইজ দেব।কিন্তু তুমি যেভাবে সন্দেহ করা শুরু করলে,তাতে আমার প্ল্যান পুরো বানচাল হয়ে গেল।”
– জানি ভুল হয়েছে।তাই বলে আমাকে একা এই বাড়িটায় রেখে চলে যাবে?আমার ভয় লাগেনি বুঝি?কী করে পারলে আমাকে ছাড়া থাকতে?”
– কে বলল? আমি তোমাকে ছাড়া থেকেছি।সারারাত দরজার কাছে বসে ছিলাম। যেন তোমার ভয় না লাগে।তুমি যে আমার আফিম!যার নেশায় আমি আসক্ত।আমি চাইলেও তো এই নেশার কবল থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারবো না। জানো…রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কী বলেছিলেন?”
স্নিগ্ধা পরম আবেশে দিহানের বুকে মুখ গুঁজলো! মৃদু কণ্ঠে জবাব উঠলো,

– কী?”
– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, ছেলেরা বাঁধে শিকল দিয়ে বাঁধে! যেমনটা আমি আমার শিকলে তোমাকে বেঁধে রেখেছি।চাইলেও তুমি আমার পরিয়ে দেওয়া শিকল ছেড়ে কখনো পালাতে পারবে না। কারণ শিকলের এক প্রান্ত যে আমার কাছে। যতবারই পালাতে চাইবে ততবারই মুখ থুবড়ে পরবে আর আমি শিকল টেনে এনে আবারও তোমাকে আমার বন্ধনে আবদ্ধ করবো। আরও একটা কথা বলেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর….মেয়েরা বাঁধে আফিম খাইয়ে বাঁধে।যেমন তুমি আমায় তোমার আফিমের নেশায় আসক্ত করেছো। সারাদিন কাজকর্মে নিজেকে আটকে রাখতে পারলেও, রাতটুকুতে যে,আমার আফিমের নেশা খুব টানে আমায়।খুব উতলা হয়ে উঠি আমি।তোমার নেশায় ডুব দেওয়ার আকাঙ্ক্ষায় উন্মত্ত হই। তাই তো আমি আফিমের নেশায় স্ব দূরে গিয়েও তোমার কাছে ফিরে আসি। নয়তো যে আমার নিজেকে বড্ড উন্মাদ উন্মাদ লাগে।সারাদিনের সব ক্লান্তি শুধু তোমার মুখটার পানে তাকালেই,নিমিষেই দূর হয়ে যায়। তাইতো কাল রাতেও তোমার নেশায় বাড়ির দরজায় এসে ঠায় বসে ছিলাম। কিন্তু অনেক ছটফট করে কাটিয়েছি কালকের রাতটুকু। কখন সকাল হবে, আর আমি আমার প্রিয়তমার মুখটা দর্শন করবো।”

স্বামীর মুখের প্রতিটা বাক্য যেন, অমৃতের মত লাগছে স্নিগ্ধার। হয়তো সেটা মুখে দিয়ে তার স্বাদ অনুভব করতে পারছে না। তবে মনের টানে কথাগুলোর যথার্থতা ঠিকই অনুধাবন করতে পারছে। সহসাই চোখ জোড়া ভিজে উঠলো স্নিগ্ধার।দিহানের বুকটা ভিজে যাচ্ছে, উষ্ণ পানির স্রোতে। দিহান আলতে করে মুখটা তুলে ধরলো স্নিন্ধার। ভালবাসার হাত বুলিয়ে মুছে দিলো সুখের কান্না।পরম স্নিগ্ধতায় ঠোঁট ছোঁয়ালে তার স্নিগ্ধার ললাটে!

সমাপ্ত

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত