চশমা

চশমা

পুরোপুরি সেজেগুজে পাত্রপক্ষের সামনে যাওয়ার আগে ভাবী চোখ থেকে চশমা খুলে রেখে বললো, পাত্রপক্ষের সামনে চশমা পরে যাওয়ার দরকার নাই। এমনিই যাও। আমি গেলাম। বসার ঘরে অনেকে বসে আছেন। বয়স্কা কেউ একজন বলে উঠলেন, মা! ছেলের পাশে বসো। আমি বসে পড়লাম। সেই ভদ্রমহিলা আবার হায়হায় করে উঠে‌ বললেন, আরে আরে! এইটা তো ছেলের চাচা! ছেলের পাশে বসো মা। আমি বলতে যাচ্ছিলাম, আমি দেখতে পাচ্ছি না ছেলে কোনটা।‌ কার পাশে বসবো একটু দেখিয়ে দেন।

এমন সময় ভাইয়া আমার হাত ধরে নিয়ে গিয়ে ছেলের পাশে বসিয়ে দিলো। নানান আলাপ আলোচনার পর ছেলের বাবা বললেন, শোনো মা! আমরা আধুনিক মানুষ! ছেলে মেয়ে দুজনের‌ মতামতের আমাদের কাছে সমান গুরুত্ব। তোমার কি ছেলে পছন্দ? যদি পছন্দ হয় হ্যাঁ বলো। না হলে না বলবা আমরা কিছু মনে করবো না।

আমি ছেলের দিকে তাকালাম। বিস্কিট কালারের একটা মুখ আমার চোখের সামনে ভাসছে। সাদা সাদা দাঁত বের করে হাসলো। এর বেশী আর কিছু আমি দেখতে পেলাম না। সুতরাং মাথা নিচু করে হ্যাঁ সূচক মাথা নেড়ে দিলাম। সব‌ দোষ ভাবীর। আমাকে যদি চশমাটা আনতে দিতো। আজ চশমার অভাবে না দেখে বিয়ে করতে হবে! বিয়ে পাকা হয়ে গেল। তারা চলে যেতেই আমি ঘরে এসে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। গতরাতে পাত্রপক্ষ আসবে সেই টেনশনে ঘুমাইনি।

সকাল দশটার দিকে ফুফাতো বোন ইরা ফোন দিয়ে বললো, আপু! এক্ষুনি ক্যাফেতে আসো। সারপ্রাইজ আছে। আমি কোনো কথা না বলে উঠে হাতমুখ ধুয়ে রেডি হতে হতে ভাবছি, আজ কি? আমার জন্মদিন? না! ঈদ? না! পহেলা বৈশাখ? না! এপ্রিল ফুল? না! তাহলে কিসের সারপ্রাইজ? বিয়ে হয়ে যাওয়ার আগে সিঙ্গেলস পার্টি হয় সেরকম কিছু হবে হয়তো! আমি ক্যাফেতে গেলাম। ইরা পেছন থেকে দুইহাতে খানিকক্ষণ আমার চোখ ধরে রেখে তারপর ছেড়ে দিয়ে বললো, সারপ্রাইজ! দেখোতো কে আসছে!!!

আমি খানিকক্ষণ অপলক তাকিয়ে রইলাম। একটা ছেলে আসছে। কিন্তু তাতে আমার কি? আমি কেন সারপ্রাইজ হবো? আমি ইরার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললাম, এটা কে? ইরা অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ছেলেটা নিজেই জবাব দিলো, আমি হলাম সে যার সাথে আপনার বিয়ে ঠিক হয়েছে। এতক্ষনে আমি সবটা বুঝতে পেরে মাথা নাড়লাম। নাহ! ছেলেটা ভালোই দেখতে। ছেলেটার সাথে সেদিন অনেকক্ষণ গল্প করলাম। সে আসলেই অনেক ভালো একজন মানুষ। অন্তত কথা বলে তাই মনে হলো।

জানলাম অফিসের কাজে খুব শিগগিরই তিন মাসের জন্য ছেলেকে সুইজারল্যান্ড যেতে হবে। তাই সে চায় তাড়াতাড়ি বিয়েটা হয়ে যাক। যেহেতু আমার কোন অমত নেই সুতরাং আমিও আর কিছু বললাম না। বিয়ে পাকা হয়ে গেল। আজ শুক্রবার। আমার বিয়ের দিন। পার্লার থেকে সাজ কমপ্লিট করে চোখে চশমা দিতে যাবো এমন সময় ভাবী হাত থেকে চশমা কেড়ে নিয়ে বললো, তুমি কি পাগল? বিয়ের আসরে চশমা পরলে আত্নীয় স্বজন কি বলবে জানো? বলবে, মেয়ে কানা। রাখো চশমা।

অসহায়ভাবে আমি বিয়ের আসরে গিয়ে বসলাম। কাজী সাহেব যখন কাগজ কলম বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, মা! এইখানে স‌ই করো! আমি স‌ই করতে গিয়ে জান্নাতুল লিখলাম কাগজে, আর ফেরদৌস লিখলাম কাজীর হাতে। কাজী সাহেব তাড়াতাড়ি হাত সরিয়ে নিয়ে বললেন, মা! আমার হাতে লিখতেছো কেন? এখানে স‌ই করো! এখানে! আমি অসহায় ভাবে কাজী সাহেবের মুখের দিকে তাকিয়ে আছি এমন সময় ভাবী আমার চশমাটা বাড়িয়ে ধরলো। স‌ই শেষে আবার চশমাটা খুলে নিয়ে চলে গেল।

আমার নতুন শ্বাশুড়িমা কাকে যেন নিয়ে এসে আমার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন, এ আমাদের অনেক কাছের আত্নীয়। সেই পিরোজপুর থেকে এসেছে। আমি অনুমানে তাকে সালাম করে বললাম, ভাইয়া বসেন! কিন্তু সে মেয়েলী গলায় বললো, কে ভাইয়া! আমি তো রুবেল ভাইয়ের ফুফাতো বোনের ননদ। তুমি আমাকে ভাইয়া বলছো কেন? আমি জবাব দিলাম না। অসহায় ভঙ্গিতে এদিক ওদিক তাকাতে লাগলাম। তখন কে যেন এসে ওকে ডেকে নিয়ে চলে গেল।

অনেক ঝামেলা করে বিয়ে শেষ করে বাসরঘরে এসে বসেছি। এতক্ষনে মনে হচ্ছে প্রাণে বেঁচেছি। চশমা ছাড়া আমি যে কতটা অসহায় তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। এখন আমার বাসররাত,বর,বিয়ে এসব কিছুই মাথায় ঢুকছে না। আমার মাথায় শুধু ঘুরছে, ভাবী কি আজ চশমাটা দেবে? অলরেডি আমার মাথা ঘুরতে শুরু করেছে চশমার অভাবে।

একজন এসে আমার বরকে ঘরের ভেতর দিয়ে ঠাট্টা করে বললো, আপু! দুলাভাই টাকা দিতে ঝামেলা করছিলো তাই একটু দেরী হয়ে গেল। গলা শুনে বুঝলাম আমার ফুফাতো বোন ইরা। ওকে বললাম, তুই ভাবীকে একটু ডাক দে। তাড়াতাড়ি প্লিজ। অবশেষে আমি চশমা পেয়েছি। এতক্ষনে বুকভরা একটা প্রশান্তি নিয়ে বাসরঘরে ঘোমটা টেনে বসে আছি। দেখলাম আমার বর দরজা বন্ধ করে ফিরে আসতে গিয়ে একটা হোঁচট খেল। বেচারা! বিয়ের টেনশন! সে এসে আমার ঘোমটা তুলে দিশাহারা ভঙ্গিতে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললো, লাবণ্য! একটা ছোট্ট সমস্যা আছে। অভয় দিলে বলি।

আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকালাম। তবে কি ওর প্রেমট্রেম আছে? আগে এত কথা হলো তখন তো বলেনি! আমি ভয়ে ভয়ে বললাম,শিওর! বলুন। সে নিচু স্বরে বললো, চশমাটা খুঁজে পাচ্ছি না। বিয়ের ঝামেলায় কোথায় যে পড়েছে! আসলে চশমা ছাড়া আমি কিছুই দেখি না। তোমার সাথে যে কয়বার দেখা হয়েছে আমার মা চশমা পরে যেতে দেননি। বলেছেন, মেয়ে ভাববে তুই কানা। তোমাকে আমি এখনো দেখিনাই। এই মুহূর্তেও দেখতে পারছি না। আমি অত্যাশ্চর্য হয়ে প্রশ্ন করলাম, আপনার চশমার পাওয়ার কতো?

-থ্রি পয়েন্ট জিরো।

আমি আমার চশমাটা খুলে তারদিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললাম, আমারো সেম। কিছুক্ষণ আপনি আমাকে দেখেন তারপর চশমা ফিরিয়ে দিলে আমি আপনাকে দেখবো।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত