ডাইনি

ডাইনি

এইযে, এইযে শুনছেন? আমি নিজের দিকে নিজেই ইঙ্গিত করে বললাম

– আমাকে বলছেন?
– হ্যাঁ, আপনাকে।
– জ্বী বলুন।
– আজকে কী ইংলিশ ক্লাস আছে?
– হ্যাঁ আছে।
– যাবেন না?
– হ্যাঁ, যাবো।
– তো চলুন একসাথে যাই।

আমি মেয়েটির দিকে কিয়ৎকাল দৃষ্টি রাখলাম। চোখে সরু ফ্রেমের পাওয়ারওয়ালা চশমা, চুলগুলো সামান্য এলোমেলো, মুখে অনন্য, মিষ্টি এক হাসি, শ্যামবর্ণের গা, সব মিলিয়ে মেয়েটি অপরূপা। এমন একটা মেয়ে যে আমাকে ডেকেছে, সেটা ভাবতেই মনের মধ্যে আনন্দের জোয়ার বয়ে গেলো। আমি বললাম,

– চলুন।
– হুম।
– চলুন লিফটে উঠে যাই।

আমি সিড়ি দিয়ে উপরে ওঠার জন্য মাত্রই সিড়িতে পা রেখেছি। ঠিক সে সময় মেয়েটি উক্ত কথাটি বলে উঠলো। আমি তার কথাতে দ্বিমত পোষণ না করে বললাম, হুম চলুন। কিন্তু আমার মন চেয়েছিলো অন্যটা। যদি সিড়ি করে উপরে উঠি, তবে এমন অপরূপা একটি মেয়ের সাথে একটু বেশি সময় কাটানো যাবে। কিন্তু দূর্ভাগ্য আমার, তা আর হলো না।

৬ নং ভবনের ৫৫৩ নম্বর রুমে আমাদের ইংলিশ ক্লাস নেওয়া হয়। এতদিন ধরে ক্লাস করে এসেছি, কিন্তু এই মেয়েটিকে কখনো আমার চোখেই পড়ে নি। আসলে না পড়ারই কথা। কেননা সবসময় প্রথম বেন্চে বসার কারণে ঘাড় ঘুরিয়ে আর পেছনে তাকানো হয়ে ওঠে না। তবে একটা বিষয় ভেবে খুব ভালো লাগলো। আমি কাউকে না চিনলেও আমাকে অনেকেই চিনে। লিফট থেকে বের হয়ে ক্লাসের সামনে গিয়ে দেখি মারিয়াম আপু দাঁড়িয়ে আছেন। আমি আপুকে জিজ্ঞেস করলাম, আপু আজকে কী ক্লাস হবে না? আপু বললেন, না আজ কোনো ক্লাস হবে না। আমি বললাম,

– কেন?
– অডিটোরিয়ামে আজ তোমাদের স্যারের অনুষ্ঠান ছিলো।
– আমরা সেখান থেকেই এসেছি। ভেবেছিলাম আজকে হয়তো ঈমাম স্যার ক্লাস নিতে পারবেন না, কিন্তু অন্য স্যার হয়তো নিতে পারবেন।
– না, আজকে ক্লাস হবে না, আগামী রবিবার এসো তোমরা।
– ঠিক আছে আপু। আপুর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমি মেয়েটিকে বললাম,
– আমি সরি, আসলে বুঝতে পারিনি যে আজ ক্লাস হবে না।
– ওকে, ইট’স ওকে।
– চলুন সিড়ি দিয়ে নিচে নামি। মেয়েটি কিছু একটা ভেবে বললো,
– চলুন।

আমি আর মেয়েটি সিড়ি দিয়ে নিচে নামছি। এদিকে আমি মনে মনে ভাবছি, মেয়েটির সাথে আর কিছু সময় কাটানো যায় কিভাবে। হঠাৎ মাথায় একটা বুদ্ধি এলো। আমি মেয়েটিকে বললাম,

– আপনার হাতে কিছু সময় থাকলে চলুন আমাদের ডিপার্টমেন্ট থেকে ঘুরে আসি।

মেয়েটি আমতা আমতা করতে করতে বললো, উমম ঠিক আছে চলুন। মনে মনে বললাম, বাহ্ মেয়েটি বেশ তো! যা বলছি তাই শুনছে দেখছি। মেয়েটির সাথে বন্ধুত্ব করা যেতেই পারে। লক্ষ্য স্থির করলাম এই রূপবতীর সাথে আমার বন্ধুত্ব করতেই হবে। লাজুক একটি মেয়ে। ঠোঁটের কোণে যেন সবসময় হাসি লেগেই থাকে।

আমি মার্কেটিং ডিপার্টমেন্টের স্টুডেন্ট। আমাদের ডিপার্টমেন্টে যেতে হলে সিড়ি করে যেতে হয়। মেয়েটিকে সাথে নিয়ে ডিপার্টমেন্টের দিকে পা বাড়ালাম। যখন আমরা ডিপার্টমেন্টের তলাতে চলে এসেছি। ঠিক তখন আমার মাথায় একটা দুষ্টু বুদ্ধি উঁকি দিলো। আমি ইচ্ছে করেই মেয়েটিকে সাথে নিয়ে উপর তলাতে চলে গেলাম। এদিকে মেয়েটিও আমাদের মার্কেটিং ডিপার্টমেন্ট চেনে না। উপরে গিয়ে আমি বললাম, “ওহহো, আমাদের ডিপার্টমেন্ট তো নিচের তলাতে।”

এর মধ্যে আমি একবার মেয়েটির দিকে চক্ষু গোচর করেছি। নাহ, মেয়েটির মধ্যে বিরক্তের কোনো ছাপ নেই। মেয়েটি আমাকে কিছু বললোও না। আমি আর মেয়েটি ডিপার্টমেন্টের দিকে যত এগোচ্ছি, আমার মনে হচ্ছে আমি ঠিক ততটাই মেয়েটির থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। কেননা ডিপার্টমেন্ট থেকে বের হওয়ার পর মেয়েটিকে আর কোনো অজুহাত দিয়েও ধরে রাখা যাবে না। যদি বলি, “আমাকে যদি আরেকটু সময় দিতেন, তবে অমুক কাজটা করতে পারতাম। আর তখন যদি মেয়েটি বলে ওঠে, আমার বাসায় যেতে হবে। আপনি প্লিজ কষ্ট করে নিজেই কাজটা করুন।” তখন আমি কী বলবো। তার চেয়ে বরং ডিপার্টমেন্ট থেকে বের হয়ে মেয়েটির সাথে পরিচয় আদান প্রদান করে তাকে আজকের মতো বিদায় দেওয়াটাই শ্রেয় হবে।

– আসসালামুঅলাইকুম ম্যাম…
– অলাইকুমআসসালাম।
– কেমন আছেন?
– হ্যাঁ, ভালো।
– ম্যাম মাহবুব স্যারের সাথে দেখা করতে এসেছিলাম।
– স্যার তো মাত্রই বের হয়ে গেলেন। কোনো জুরুরি দরকার কী?
– না ম্যাম, ধন্যবাদ। আসি…

অবশ্য স্যারের সাথে আমার তেমন কোনো জুরুরি দরকার ছিলো না। তবে স্যার যদি ডিপার্টমেন্টে থাকতেন, তাহলে আমাকে একটা উপায় বের করতে হতো ‘স্যারের সাথে কোন বিষয়ের উপর কথা বলবো তা নিয়ে।’ আমি আর মেয়েটি ডিপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে এলাম। ভার্সিটির গেটের সমীপে এসে মেয়েটি নিজেই আমাকে জিজ্ঞেস করলো, আপনার নাম কী? আমি বললাম, মোঃ রাব্বি হোসেন।

– আমি ডাইনা?
– কী?
– কোথায় কী?
– আপনার নামটা!
– ডাইনা।
– ডাইনা নাকি ডাইনি? বলে মুচকি হাসলাম। মেয়েটি বললো,
– হ্যাঁ, আমার নাম হোসনে আরা ডাইনা।
– বেশ মজার নাম তো! তবে আমি ডাইনি বলে ডাকবো।

আমার কথা শুনে মেয়েটি তার সেই অপরূপ হাসিটা আমাকে উপহার দিলো। অবশ্য হাসিটাকে উপহার বললে ভুল হবে। বরং আমি নিজেই হাসিটাকে উপহার স্বরুপ নিলাম। আমি জিজ্ঞেস করলাম,

– কোন ডিপার্টমেন্ট? সে বললো,
– বায়ো-ক্যামেস্ট্রি।
– ও, গুড। বাসা কোথায়?
– পুরান ঢাকা।
– স্থানীয়?
– হুম।
– বাহ্, বেশ তো!
– আপনার?
– মিরপুর-১।
– স্থানীয়?
– না।
– তবে?
– গ্রামের বাড়ি পাবনা।
– পাবনার পাগল।
– বলতে পারেন।

মেয়েটি আবারও হাসলো। আহা! মেয়েটির হাসি যেন মুক্তার ন্যায়। হাসির মাঝে তার সকল সৌন্দর্য বিরাজমান। যদি হাসিটাকে সাথে নিয়ে যেতে পারতাম, তবে নিজেকে ধন্য মনে করতাম। সেদিনের মতো মেয়েটির সাথে কথা শেষ করে তাকে বিদায় জানিয়ে আমি আমার গন্তব্যের উদ্দেশ্যে বাসে উঠে পড়লাম। বাসের মধ্যে বসে বসে ভাবছি, মেয়েটিকে নিয়ে কিছু একটা লিখতে হয়। কী লেখা যায়! গল্প নাকি কবিতা? নাহ, গল্প লেখা যাবে না। কবিতা লিখলেই বরং বেশ মানানসই হবে। তার অনন্য হাসিটা কবিতার ভাষাতেই মানাবে ভালো, তার রূপের বর্ণনা কবিতা ছাড়া সুন্দর রূপে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। বাসের মধ্যেই খাতা কলম বের করে তাকে নিয়ে চরণ দু’য়েক কবিতা লিখে ফেললাম। মনঃস্থির করলাম কবিতাটা পরিপূর্ণরূপে লিখে তাকে উপহার দেবো। যেই ভাবা সেই কাজ। কবিতা লেখাতে মনযোগ বসালাম। যতক্ষণ বাসের মধ্যে ছিলাম, ঠিক ততক্ষণ মেয়েটি তথা ডাইনি ছাড়া অন্য কোনো কিছু মাথার মধ্যে আসতে দিইনি। বাস থেকে নামার আগ মুহূর্তে ডাইনিকে নিয়ে লেখা কবিতাটা একবার পড়ে দেখলাম। নাহ, কবিতার সমাপ্তিটা দেওয়া দরকার।

বাসায় গিয়ে স্নানাহার শেষে একটু বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। ঠিক সে সময় হঠাৎ করেই ডাইনি মেয়েটা আমার মন প্রাঙ্গনে প্রবেশ করে বসলো। আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না, মেয়েটাকে আমার মনটা কেন এতো বারবার মনে করছে! তাহলে কী আমার মনটা তার মনের সাথে জুড়ে গিয়েছে? না না, এসব কী ভাবছি আমি! আমি তো জেবুকে পছন্দ করি, পছন্দের সীমা অতিক্রম করে তা ভালোবাসায় রূপান্তরিত হয়েছে। মৃদুমন্দভাবে কিছুটা সময় অতিবাহিত হলো। হাত ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখি বিকেল তিনটা বেজে চব্বিশ মিনিট। খানিক বাদে আমাকে আমার চাকরিস্থলে রওনা দিতে হবে।

পড়ালেখার পাশাপাশি একটা পার্ট টাইম জব করি। যা দিয়ে পড়ালেখার খরচ বহন না করা গেলে অন্তত ঢাকা শহরে থাকা খাওয়াটা মোটামোটি হয়ে যায়। এটাই বা কম কিসে? তবে দূর্ভাগ্যের বিষয়, বন্ধু বান্ধবদের সাথে ঘুরতে বের হলে আমাকে শূন্য পকেটে বের হতে হয়। অবশ্য তাতে আমি নিজেকে কখনও শূন্য মনে করি না। কেননা আমার বন্ধু, বান্ধবেরা আমাকে সেটা মনে করতে দেয় না। ঘুরতে বের হলে যাবতীয় খরচাদি তারাই করে। তবে একেবারে যে সবসময়ই তারা করে তাও নয়। মাঝে মাঝে পার্সোনালিটি রক্ষার্থে নিজেরও করতে হয়।

বাসা থেকে বের হওয়ার আগে আমি ডাইনিকে নিয়ে লেখা কবিতার খাতা আর কলমটা সঙ্গে নিয়ে বের হলাম। যাতে অফিসে বসে অবসর সময়টাতে তাকে নিয়ে কবিতার বাকি অংশটুকু লিখতে পারি। সেদিনের মধ্যেই আমি ডাইনিকে একটি রম্য কবিতা লিখে ফেললাম। এখন শুধু কবিতাটা ডাইনিকে দেওয়া এবং আবৃতি করে শোনানোর পালা। সেই রাতে আমি একটুও ঘুমাতে পারিনি। মেয়েটিকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে কখন যে প্রহরের পর প্রহর কেটে গিয়েছে তা খেয়ালই করিনি। রুমমেট আমাকে বারবার বলেছে, ভাই তুমি ঘুমাবে না? কালকে সকালে না তোমার ভার্সিটি আছে?

আমি তার কথায় তাকে শুধু এটুকু বলেছি, আমি শ্রাবণ কখনও কথার বরখেলাপ করি না। আমি সারারাত না ঘুমালেও কালকে সকাল সকাল ভার্সিটি যেতে পারবো। তুমি ঘুমিয়ে পড়ো। আর কালকে সকালে দেখে নিও তুমি দিব্যি ঘুমাচ্ছো, আর এদিকে আমি ভার্সিটির উদ্দেশ্যে বের হয়ে গিয়েছি। শেষ রাতে একটু তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলাম। তবুও সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে রওনা দিলাম ভার্সিটির উদ্দেশ্যে। যাওয়ার আগে রুমমেটকে বলে গেলাম, ভাই আসি। আজকে ভার্সিটিতে গিয়ে ডাইনির থেকে তার কন্ট্রাক নাম্বারটা সংগ্রহ করতে হবে। তবে কৌশলে। যেন সে প্রশ্ন না করে বসতে পারে, কেন নাম্বার দিবো!

এদিকে আমার প্রিয়তমা জেবুকে কল দিলাম। সে আমাকে জানালো, সে নাকি অসুস্থ। গরম ঠান্ডা নাকি তাকে বশ করে রেখেছে। ও হ্যাঁ, জেবু মেয়েটা আমার ভালোবাসার মানুষ বটে। তবে মেয়েটাকে শুধু আমি, নিজে পছন্দ করি। সে কিন্তু আমাকে পছন্দ করে না। মেয়েটাকে যেদিন প্রথম দেখেছিলাম, সেদিন সরাসরি তার সম্মুখে তার রূপের প্রশংসা করেছিলাম। সাথে হাসির ছলে এও বলেছিলাম যে, তোকে আমার ভালো লাগে, ভীষণ ভালো লাগে। ঠিক তারই দিন কয়েক পর তাকে আমি প্রপোজ করি। প্রপোজের উত্তরে সে আমাকে সরাসরি না করে দেয়। অবশ্য না করে দেওয়াটাই স্বাভাবিক। একদিকে মাত্র কয়েকদিনের পরিচয়, অন্যদিকে আমি দেখতে কারো মনের মতো না। আর সেই থেকেই মেয়েটিকে আমি একতরফা ভালোবেসে চলেছি। সে বিষয়ে যাক, এখন গল্পে ফিরে আসি। যথা সময়ে ভার্সিটি পৌঁছে আমি আমার নিজ ক্লাসরুমে চলে গেলাম। আমি জেবু,ডাইনি এবং আমার অন্য সকল বান্ধবীদের নিয়ে যতই নিজের মনে কল্পনা জল্পনা আঁকি না কেন, ভার্সিটিতে গিয়ে প্রথমে আমি আমার পড়ালেখার বিষয়টাকেই অধিক প্রাধান্য দেই।

ক্লাস শেষ হলে ডাইনিকে খোঁজার জন্য প্রথমে তার ক্লাস রুমের অনুসন্ধান করি। কারণ তার ক্লাস রুমটা খুঁজে পেলেই তাকে খুঁজে পাওয়া সহজ হবে। এদিকে আমার কাছে তার কন্ট্রাক নাম্বারও নেই। অনেক খোঁজা-খুঁজির পর বায়ো-ক্যামেস্ট্রির ক্লাস রুমটা খুঁজে পেলাম। ক্লাসে উঁকি দিতেই দেখি ক্লাসের মধ্যে স্যার রয়েছেন। পরে আর উঁকি দেওয়ার সাহস হয়নি। ভাবলাম কিছু সময় দাঁড়িয়ে থাকি। স্যার বের হলেই ক্লাসে ঢুকা যাবে। দশ মিনিট যায়, বিশ মিনিট যায়, স্যার আর বের হয় না। এদিকে আমিও বিরক্ত হই না। কারণ আমার ধৈর্যশক্তি প্রখর। আল্লাহ আমাকে অধিক ধৈর্যশক্তি প্রদানের জন্য আমি তার কাছে শুকরিয়া আদায় করি। প্রায় পঁয়ত্রিশ মিনিট পর স্যার রুম থেকে বের হলে আমি ভেতরে গিয়ে চারিদিকে দৃষ্টি রাখি। না, ডাইনি তো কোথাও নেই। তাহলে সে কী আজ ভার্সিটিতে আসেনি? নাকি সে চলে গিয়েছে! আমি বিষয়টা সঠিকভাবে জানতে একটা ছেলেকে জিজ্ঞেস করলাম, ভাই এটাতো বায়ো-ক্যামেস্ট্রির ক্লাসরুম তাই না?

ছেলেটি হ্যাঁ বললো। আমি বললাম, কোন ইয়ার? ছেলেটি উত্তরে যা বললো, তা শুনে আমি পুরো আহম্মক হয়ে গেলাম। পরে ছেলেটি আমাকে বললো, ঐ যে ঐটা বায়ো-ক্যামেস্ট্রির প্রথম বর্ষের ক্লাসরুম। আমি দ্রুত সেখান থেকে প্রস্থান করে ডাইনিদের ক্লাস রুমে গিয়ে দেখি, ক্লাস রুম পুরো ফাঁকা। তার মানে আজকের মতো ক্লাস শেষ। হায়রে! যদি আগে জানতাম এটা ডাইনির ক্লাসরুম, তবে আধা ঘন্টা যাবত তৃতীয় বর্ষের বড় ভাইদের ক্লাসের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো না। হয়তো সেই আধা ঘন্টা আগে এখানে এলে আমার সেই চশমিশ ডাইনিটার দর্শন পেতাম।
ঐ যে কথায় আছে না, “কপালে থাকলে হার, কী করবে চাচা খাজিনদার।”

ডাইনির সাক্ষাৎ পেতে হলে আমাকে আরও একটা দিন অপেক্ষা করতে হবে। আজ যেহেতু বৃহঃস্পতিবার। সুতরাং শনিবারে হয়তো মেয়েটির সাথে দেখা হতে পারে। মনে একরাশ দুঃখ নিয়ে বাসার পথে যাত্রা শুরু করলাম। শনিবার ভার্সিটি গিয়ে প্রথমেই তার ক্লাসের সামনে উপস্থিত হলাম। ক্লাসে আর উঁকি দেওয়ার সাহস পেলাম না। একটু অপেক্ষা করতেই একটি ছেলে বাইরে এলে তাকে ডাইনির কথা জিজ্ঞেস করতেই ছেলেটি বললো, সে তো আজ ভার্সিটিতে আসেনি। কেন কোনো দরকার রয়েছে কী? আমি ছেলেটির কথার বিপরীতে বললাম,

– না, ঠিক তেমন কোনো দরকার না। যদি ওর সাথে কখনও দেখা হয়, তবে বলবেন শ্রাবণ নামে একটি ছেলে তার সাথে দেখা করতে এসেছিলো।

বলেই আমি চলে এলাম সেখান থেকে। ভাবলাম, আজ দেখা হয়নি তো কী হয়েছে। কালকে অবশ্যই দেখা হবে। কেননা কালকে রবিবার। রবিবার আর মঙ্গলবার এই দুইটা দিন আমাদের ইংলিশ ক্লাস হয়ে থাকে। যেখানে সবাই ইংলিশ শেখার জন্য জড়ো হয়। প্রিয় ডাইনি, তোমার সাথে আমার আজ না হলো, কালকে তো অবশ্যই দেখা হবে। আমি না হয় আরও একটা দিন অপেক্ষা করলাম। পরদিন একাডেমিক ক্লাস শেষ করে ইংলিশ ক্লাস করতে ৫৫৩ নম্বর রুমে গেলাম। কতজন ছিলো এলো, তবু সেই ডাইনিটার আশার কোনো নাম গন্ধটুকুও পাওয়া গেলো না। অন্য কারো থেকে যে তার কন্ট্রাক নাম্বারটা নিবো, তারও কোনো উপায় ছিলো না। যদি কেউ বলে ওঠে, তার নাম্বার আপনাকে কেন দেবো? আপনি তার কে হন?

আমি মাঝে মাঝে একটা জিনিস প্রায়ই উপলব্ধি করি। যখন আমি কোনো কিছু পাওয়ার আশায় ব্যাকুল থাকি। তখন সেটা হাজার চেষ্টা করেও পাই না। আবার যখন সেটার কথা ভুলে যেতে থাকি, ঠিক সেই মুহূর্তে তা হঠাৎ করেই আমার সম্মুখে আপনাআপনি এসে হাজির হয়ে যায়। আবার আমি যা আশা করি তা পূরণ হয় না, কিন্তু যা আশা করি না সেটাই হয়। তবে দুইটার ক্ষেত্রই স্বল্পমেয়াদী। অর্থ্যাৎ উক্ত ঘটনাগুলো দীর্ঘমেয়াদে পা রাখে না। যা হয় অতি শিঘ্রই হয়। আমি পরে আর ডাইনিকে খোঁজার জন্য তেমন আবেগপ্রবণ হয়ে উঠিনি। আমি জানতাম এই ভার্সিটিতে থাকাকালীন সময়ে তার সাথে কোনো না কোনো একদিন ঠিকই দেখা হবে, কথা হবে। আর সেদিনই তাকে নিয়ে লেখা কবিতাটা উপহার স্বরূপ তার হাতে অর্পন করবো এবং তার ফোন নাম্বারটা চেয়ে নিবো।

মঙ্গলবারে একাডেমিক ক্লাস শেষ করে মাহবুব স্যারকে একটা কাজে সাহায্য করতে গিয়ে ইংলিশ ক্লাসে উপস্থিত হতে সামান্য দেরি হয়ে যায়। আমি চুপচাপ ক্লাসে গিয়ে বসে পড়ি। আমার ইংলিশ ক্লাসে যাওয়ার মূল কারণ হলো, আমার প্রিয় এবং শ্রদ্ধেয় স্যার “ঈমাম হোসেনের” বলা কথাগুলো শোনা। তিনি একজন হাস্যরসিক বটে। তবে উনার কথা বলা, উপস্থাপন ভঙ্গিমা, পুরোটাই ব্রিটিশদের মতো। যা আমাকে বিমোহিত করেছিলো। স্যার বললেন, কোনো কিছু শেখার ক্ষেত্রে তা যদি মজার মধ্য দিয়ে শেখা যায়, তবে তা অতি শিঘ্রই আয়ত্ত করা যায়। তিনি বোর্ডে কিছু একটা লিখে আমাদেরকে তার সমাধান করতে বললেন। আমরা সবাই স্যারের দেওয়া সমস্যাটির সমাধান উদঘাটনে ব্যস্ত। ঠিক সেই সময় স্যার বলে উঠলেন, ডাইনা পেরেছো তুমি? “ডাইনা” নামটা বলতেই আমি আমার পাশের বেন্চে তাকিয়ে দেখি সেই ডাইনিটা চুপচাপ বসে আছে। অথচ সে আমাকে একটিবার ডাকও দেয়নি।

চশমা পড়া ছেলে মেয়েরা একটু বুদ্ধিমান হয়ে থাকে। ভেবেছিলাম ডাইনি হয়তো সবার আগে সমস্যাটির সমাধান করতে সক্ষম হবে। কিন্তু না, একটি চশমাবিহীন ছেলে সমস্যাটির সমাধান করে দেখালো। ওদিকে স্যার ক্লাস নিচ্ছেন। আর এদিকে আমি ডাইনির সাথে কথা বলার চেষ্টা করছি। চেষ্টার অন্তে তাকে বললাম, তোমার জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে। ক্লাস থেকে বের হয়ে একটু দেখা করো। সে “আচ্ছা” বললো। ক্লাস শেষ করে তাকে নিয়ে লেখা কবিতাটা তার হাতে দিলাম। সে বললো আমাকে পড়ে শোনাতে। আমি কবিতা লিখি বটে, তবে আমি তা মনের মাধুর্য মিশিয়ে সুন্দর করে আবৃতি করতে পারি না। তবুও মেয়েটি যখন অনুরোধ করলো, তখন যেমনই হোক না কেন আবৃতি করতেই হবে। আবৃতি শেষে কবিতাটা তার হাতে দিলে সে বললো, তুমিই সেই শ্রাবণ? আমি বললাম, কোন শ্রাবণ?

– যে আমাকে আমার ডিপার্টমেন্টে গিয়ে খুঁজেছিলো। অমুক (নাম মনে নেই) আমাকে জানালো যে শ্রাবণ নামে একটা ছেলে তোকে খুঁজছিলো।
– ও আচ্ছা!

কথা বলা শেষে সে চলে যাওয়ার সময় তার থেকে তার ফোন নাম্বারটা রেখে দিলাম। যাতে তাকে আর খুঁজে পেতে এতোটা বেগ পোহাতে না হয়। এরপর থেকে ডাইনিটার সাথে আমার মোটামোটি ফোনালাপ, ভার্সিটিতে একটু আধটু কথা বলা, দেখা সাক্ষাৎ চলতে থাকে। তার ফোন নাম্বারটিও আমি আমার ফোনে “ডাইনি” নামে সেভ করে রেখেছি। অবশ্য তাকে ডাইনি বললে সে রাগ করে না, বরং খুশিই হয়। বন্ধুত্বটা যখন ‘তুমি’ থেকে ‘তুই’ তে মোড় নিয়েছে। ঠিক তখন মেয়েটিকে আমি আমার ভালোবাসার মানুষটার কথা অর্থ্যাৎ জেবুর কথা বলি। তাকে আমি পুরো বিষয়টি খুলে বলি যে, জেবুকে আমি প্রপোজ করেছিলাম। কিন্তু সে আমাকে সরাসরি না করে দিয়েছিলো। আর সে এখন আর আমার সাথে কথা বলে না। আমি ডাইনির থেকে বুদ্ধি চাই, কী করলে তার মনে আমি জায়গা করে নিতে পারি। উত্তরে সে আমাকে বলে, পিছে লেগে থাক। কাজ হয়ে যাবে। আর তা না হলে অন্য কাউকে দেখ।

মাঝখানে আমার প্রাণপ্রিয় বান্ধবী ডাইনিটার সাথে কিছুদিন কথা হয় না। আমি রুমে শুয়ে আছি, ঠিক সেই মুহূর্তে হঠাৎ করে মোবাইলটা কেঁপে উঠলো। আমি স্কিনের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেলাম। আর যাই হোক মনের মতো একটা বান্ধবী পেয়েছি, যে আমাকে ফোন করে আমার খোঁজ খবর নিচ্ছে। একদিন তার সাথে ফোনে কথা বলার সময় তাকে বললাম, তোর এটা আবার কেমন নাম্বার? কল দিলে মুহূর্তের মধ্যে ব্যালেন্স শেষ হয়ে যায়। সেদিন সে আমাকে অবাক করিয়ে দিয়ে বলেছিলো, ওকে টেনশন নিস না। আজ থেকে যখনই তুই কল দিবি, আমি তোর কল কেটে তোকে কলব্যাক করবো। ঠিক আছে? আমি প্রত্যুত্তরে ‘হুম’ বললাম। আর মনে মনে বললাম, যাক কপাল গুনে একটা বান্ধবী পেয়েছি।

এইতো পনেরো বিশ দিন হবে। এক সন্ধ্যায় সে আমাকে ফোন করে বললো, তোর থেকে একটা পরামর্শ চাই।
আমি বললাম, নির্ভয়ে নিঃসংকোচে বলে ফেল। সে বললো, আগামী চৌদ্দ তারিখ আমার বয়ফ্রেন্ডের জন্মদিন। এমনিতে এখন রোজা চলছে। তাকে কখন জন্মদিনের উইশটা করলে ভালো হয়? তেরো তারিখ রাতে করবো নাকি চৌদ্দ তারিখ সন্ধ্যায় করবো? আমার ডাইনিটার বয়ফ্রেন্ড আছে, সেটা শুনতেই বুকের মধ্যে শূন্যতা অনুভুত হলো। তবে কেন এমনটা হলো, সেটা অজানা। তবে কী ডাইনিকে আমি ভালোবাসতে শুরু করেছি? না না এটা হতে পারে না। সে আমার একজন ভালো বন্ধু। আমি তাকে সঠিকভাবে কোনো পরামর্শ দিতে পারলাম না। তবে কয়েকটা পরামর্শ দিয়েছিলাম, যা গ্রহণযোগ্য না। পরে তাকে বললাম, তোর যেটা ভালো মনে হয় সেটাই কর।

এইতো কিছুদিন আগে তাকে বলেছিলাম, এবার ঈদে বাড়ি গিয়ে আমি আমার স্মার্ট ফোনটা বের করে আবার লেখালেখি শুরু করবো। আর এবার প্রথম গল্পটা লিখবো তোকে নিয়ে। কথাটা শুনে সে বেশ খুশিই হয়েছিলো।
আজ দুপুরে আমি আমার ডাইনিটাকে কল করলাম। আহ! তার মিষ্টি মিষ্টি আহ্লাদি বাচ্চাসুলভ কণ্ঠটা শুনলেই মনটা খুশিতে ভরে যায়। যখন তাকে বললাম, তোর কণ্ঠটা অনেক সুন্দর। একদম বাচ্চাদের মতো। তখন যেন সে খুশি কিংবা লজ্জায় লাল হয়ে গেলো। এটা নিতান্তই আমার ক্ষুদ্র অনুমান মাত্র। তার লাল হয়ে যাওয়া সেই মুখটা আমার খুব, খুব দেখতে ইচ্ছে করছিলো।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত