প্রতীক্ষা

প্রতীক্ষা

নীল একটা বিছানার চাদরের উপরে বসে আছি আমি। আমার পড়নে গোধূলি লাল একটি শাড়ি। আজ আমার বিয়ে হয়েছে। কানে দুটি ঝুমকার সাথে আমার হাতে দুটি সোনার কাঁকন। লাল রেশমি চুড়িও আছে কিছু। আমি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আমার হাত দেখি। এই রুমে খাট ছাড়া আর কিছু নেই। একটা ড্রেসিং টেবিল থাকলে ভালো হোতো। আমি একটু নিজেকে দেখতাম।

শশী বলতো আমাকে কাজলে খুব মানায়। আর নীল টিপে। আজ খুব যত্ন করে ভাবি আমাকে সাজিয়ে দিয়েছে। লিপস্টিক দিতে গিয়ে ভাবি কি সব বলছিলো। আমিতো লজ্জায় শেষ। ভাবির ধারণা বাংলাদেশে আমার চে সুন্দর মেয়ে আর নেই। ভাবির সব সময় বাড়িয়ে বলার অভ্যাস। শশী বলেছিলো ও আজ আমার জন্য জোনাকি ধরে আনবে। পুরো ঘরে জোনাকি উড়বে। আর ও সেই জোনাকি ধরে এনে আমার চুলে সাজিয়ে দেবে। আমার চুল যেনো মেঘ, আর তাতে তারা হয়ে ফুটবে রাতের জোনাকি। আমি হেসে বলেছিলাম মিঃ চন্দ্র, জোনাকি একটা মাছি। যদি আমার নাকে ঢুকে যায় তোমায় বোঝাবো মজা। ঢুকবেনা, ভরসা করতে পারো।

আমি একজন বেস্ট পাহারাদার। তোমার নাক কান ঠোঁট সব পাহারা দিয়ে রাখবো। পুরো রাত ঘুমাবো না। শুধু পাহারা আর পাহারা। আমি হাতের খাতাটা গোল করে ওকে পিটাতে থাকি আর ও ঘাসের মাঝে ছোট্ট বেড়ালের মতো গড়াতে থাকে, আর হাসতে থাকে । শশীকে আমি ভালোবেসেছি ওর গান শুনে। মুগ্ধ হয়ে ওর গান শুনেছিলাম মেডিকেল কলেজের নবীন বরন অনুষ্ঠানে। আমি তখন মাত্র ভর্তি হতে এসেছি। আর শশী অলরেডি ফাইনাল ইয়ার। তারপর কেটে গেছে চারটি বছর। শশী এখন পাশ করা ডাঃ আমি সেকেন্ড প্রফের প্রস্তুতি নিচ্ছি। শশীর মায়ের ইচ্ছে এবছরই বিয়ে। আর শশী তো পারলে এখুনি বিয়ে করে।

আমাদের বিয়ের কেনাকাটা চলছে। আমি একদিন শশীর সাথে গিয়ে বিয়ের শাড়ি পছন্দ করে এসেছি। নীল শাড়ি পাড় আর আঁচলে রুপোলি কাজ। শশীর মায়ের নাকি শাড়ি পছন্দ হয়নি। উনার ইচ্ছে আমি লাল শাড়ি পড়বো।
আজ আর ভালো লাগছেনা। বিয়ের মেহমান রা আসতে শুরু করেছে। সবার সামনে ওর সাথে বের হওয়া খুব লজ্জা লাগে। বাইক নিয়ে এসেছে শশী। নিচে থেকে খুব খানিকক্ষণ – তিতলি, তিতলি বলে চেঁচিয়ে চলে গেছে। আমি ফোন দিয়েছিলাম – যতো বলি যাও, আমি যাবোনা। ও ততো চিৎকার করে – কই আসো, এবার কিন্তু আমি রাগ করলাম। শাড়ির টাকা মেরে দিয়ে সুন্দরবনে জোনাকি পোকা ধরতে গেলাম।

আমি চুপ থাকি। একঘণ্টার মাঝেই আবার ফোন শাড়ি একটা কিনেছি বুঝলা? সবাই দেখলে ভিরমি খাবে। আর কয়দিন বিয়ের বাকি বলোতো আমি উত্তর দেবার আগেই একটা জোড়ে শব্দ শুনি আর তারপর মোবাইল টা অফ হয়ে যায়। আমি কিভাবে জানি সেখানে গিয়েছিলাম। দেখি লাল কিছু রক্ত আর একটা লাল শাড়ি রাস্তায় পড়ে আছে। আমি শাড়িটা দিয়ে রক্তগুলো মুছতে চাইলাম। শাড়িটা খুলে রাস্তায় ছড়িয়ে গেলো। চারদিকে শুধু লাল রঙ আর লাল রঙ। আচ্ছা এখন কি বসন্ত কাল? রাস্তায় এতো ভেজা ভেজা লাল ফুল কেনো? আজকাল কোথায় থাকি জানিনা। ভয়ে চোখ মেলিনা। যদি ভেজা লাল ফুলগুলো দেখি। এমনিতেই মাথায় শুধু লাল রঙের খেলা, অসহ্য।

চোখ মেললেই ইদানীং দেখি শশী আমার সামনে বসে আছে। আমি হাসতে চাই। কিন্তু পারিনা। শুধু মাথা ব্যাথা করে। হাত দিয়ে ওকে ছুঁতে চাই। হাত খুঁজে পাইনা। খুব ইচ্ছে করে ওর কোলে একটু মাথা রাখি। একবার অল্প সময়ের জন্য হলেও ঘুমাই। এরপরে অনেকগুলি শীত বর্ষা পার হয়ে যাবার পরে একদিন পূর্ণ ভাবে চোখ মেললাম। দেখি শশী আমার পাশে বসে আছে। আমি ওকে ধরতে যাই, পারিনা। হুমড়ি খেয়ে পড়ে যাই। শশী আমাকে ধরে চিৎকার করে কাঁদে। আমি কাঁদতে পারিনা। আমার চোখে জল নেই।

শশী কাঁদতে কাঁদতে আমাকে বুকে চেপে ধরে ” তিতলি ঘরে চলো”। আমি শশীর গলার স্বর শুনে চমকে তাকাই। এ শশী না, এতো আবির ! শশীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ও আমাকে দেখলেই ছড়া কাটতো। “চাঁদের গায়ে প্রজাপতি ভালবাসলে দিতাম এনে সাতটি অমরাবতী ” আমি ঘরে ফিরে এলাম। পুরো একবছর ধরে নানান ট্রিটমেন্ট নিচ্ছি। এখন পড়াশোনা আবার শুরু করেছি। আজকাল রাতে লাল রঙ আর মাথায় হানা দেয়না। চার বছর পাগল থাকার পরে ডাঃ আমাকে সুস্থ্য ঘোষনা করেছে। আমার সেই পাকা ধানের গায়ের রঙ হারিয়ে গেছে। অসুস্থ্যতার প্রথম বছরই আমার চুল কেটে দেয়া হয়। আজকাল চুল কাঁধ ছাড়িয়েছে। শশীর মা একদিন এসে আমায় ধরে খুব কাঁদলেন। তিনি চান আবিরের সাথেই আমার বিয়ে হোক। শশী নাকি মারা গেছে আজ পুরো চার বছর। আমি অস্বস্তি নিয়ে তাকাই। আমার চোখ খোঁজে যেনো কাকে। একটু ভরসার, একটু আশ্রয়ের।

একদিন লাজুক মুখে বাবা মায়ের কাছে আবির বলে বিয়ের কথা। তারা রাজী। আজ আমাদের বিয়ে হয়েছে। পাঁচ বছর আগে এই দিনেই আমার বিয়ে হবার কথা ছিলো। ঘরে ঢুকেছে শশী ওর হাতে অসংখ্য মোমবাতি। ও লাইট নিভিয়ে একটার পরে একটা মোম জ্বালছে। পুরো ঘরে মোম জ্বলছে। বিছানার চাদরে শত শত জুঁই আমার প্রিয় ফুল। শশী আমায় ডাকছে ” এই আসোতো আমায় মোম গুলো পুরোরাত জ্বালিয়ে রাখতে সাহায্য করো।” কথা বলার সাথে সাথে শশী বদলে “আবির” হয়ে গেলো। সব এক রকম। শশী ভালোবাসতো আবির ও হয়তো ভালবাসে।

আমি আস্তে খাট থেকে নামতে যাই। আমি পা বাড়ানোর আগেই দেখি “আবির” তার হাত বাড়িয়েছে। আমি আমার বহু প্রতীক্ষার হাত ওর হাতে রাখি। আচ্ছা ও কি কাঁদবে? নাহ থাক ওর প্রশস্ত বুকে মাথা রেখে আজ না হয় আমিই কাঁদি। আমার ভেতরের সব কান্না দুঃক্ষ হয়ে আমার জীবন থেকে সরে যাক। আজ আমি নিশ্চিন্তে বলি “আমায় একটু ভালোবাসবে! “

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত